পর্ব ১৩: যে শিশুর জন্ম হয়নি

“কখনো কখনো মানুষ নিজের অতীত ভুলে যায়। আর কখনো এমনও হয়—তার অতীত বলে কিছু ছিলই না, অথচ সে সেই অতীতের শোক বয়ে বেড়ায় সারাজীবন।”

১. ২৮ অক্টোবরের সকাল

সকাল ছয়টা।

জানালার বাইরে আলো ফুটছে। অথচ আমার মনে হচ্ছে, রাতটা এখনও শেষ হয়নি।

লাল ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা বাক্যটা বারবার পড়ছি—

“২৮ অক্টোবর ১৯৯৮-এ জন্মেছিল যে শিশু, সে-ই ২৮ অক্টোবর ২০২৬-এ আহমাদ মূসার মৃত্যু ঘটাবে।”

আজ ২৮ অক্টোবর ২০২৬।

আহমাদ মূসার মৃত্যুর দিন।

কিন্তু একজন মানুষকে মারতে হয় তার মৃত্যু ঘটানোর জন্য। আর আহমাদ মূসা যদি একজন মানুষ না হয়? যদি সে একটা নাম হয়, একটা পরিচয় হয়, একটা গল্প হয়?

তাহলে তাকে কীভাবে মেরে ফেলা যায়?

ফোনে আহমাদ মূসার অ্যাকাউন্ট খুললাম।

প্রোফাইল ছবি নেই। পুরোনো মেসেজগুলো আছে। কিন্তু নামের নিচে একটা নতুন লাইন দেখা যাচ্ছে—

Account scheduled for deletion: 12 hours remaining.

আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

বারো ঘণ্টা পর অ্যাকাউন্টটা মুছে যাবে।

আমি লিখলাম,

“তুমি কি সত্যিই আজ মারা যাবে?”

কোনো উত্তর এল না।

আমি আবার লিখলাম,

“তুমি কি আমার বাবা?”

উত্তর এল মাত্র তিনটি শব্দে—

“তোমার বাবা অপেক্ষায়।”

তারপর একটা ঠিকানা।

পুরোনো প্রকাশনা সংস্থা—অলিখিত অধ্যায়।

সেই জায়গা, যেখানে প্রথমবার শুনেছিলাম আহমাদ মূসা নামের কোনো লেখককে কেউ খুঁজে পায়নি।

আমি তৈরি হতে শুরু করলাম।

দরজার কাছে পৌঁছাতেই মা আমাকে থামালেন।

—কোথায় যাচ্ছিস?

—যেখানে আমার বাবা অপেক্ষা করছেন।

মা ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন।

—কে তোকে বলেছে?

—আহমাদ মূসা।

মা চোখ বন্ধ করলেন।

তারপর এমন একটা কথা বললেন, যা শুনে আমার পা থেমে গেল।

—রৌদ্রময়ী, আহমাদ মূসা যদি তোকে ডেকে থাকে, তাহলে বুঝবি তোর বাবা আর বেঁচে নেই।

আমি মায়ের দিকে তাকালাম।

—কিন্তু তুমি তো বলেছিলে, তুমি জানো না বাবা কোথায়!

মা ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

—আমি বলেছিলাম, আমি জানি না তিনি কোথায় আছেন। আমি কখনো বলিনি, তিনি বেঁচে আছেন।

২. অলিখিত অধ্যায়ের শেষ ঘর

প্রকাশনা সংস্থার পুরোনো ভবনটা প্রায় পরিত্যক্ত। সাইনবোর্ডের অক্ষরগুলো মুছে গেছে। দরজার পাশে মরচে ধরা তালা ঝুলছে।

কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই বুঝলাম, কেউ এখানে নিয়মিত আসে।

টেবিলে সদ্য বানানো চায়ের কাপ। জানালার পাশে খোলা ল্যাপটপ। আর দেয়ালে টাঙানো এক সারি ছবি।

প্রথম ছবিতে নানাভাই।

দ্বিতীয় ছবিতে মাহতাব রহমান।

তৃতীয় ছবিতে অনিরুদ্ধ সেন।

চতুর্থ ছবিতে আরিফ।

আর শেষ ছবিতে আমি।

ছবির নিচে লেখা—

“প্রথম লেখক, দ্বিতীয় লেখক, মিথ্যা সাক্ষী, মৃত উত্তরাধিকারী, শেষ পাঠক।”

আমি ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম, কোন ছবির সঙ্গে কোন পরিচয় মেলে।

ঠিক তখন পাশের ঘর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

—এসেছ, আহমাদ?

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।

দরজার সামনে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। সাদা চুল, পাতলা মুখ, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।

তাঁর সামনে খোলা একটা পাণ্ডুলিপি।

আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম।

—আপনি কে?

বৃদ্ধ আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

—এই প্রশ্নটা তুমি তেরো পর্ব ধরে করে আসছ। আজও উত্তরটা বদলাবে না।

—আপনি কি আমার বাবা?

—না।

—তাহলে আহমাদ মূসা কে?

বৃদ্ধ পাণ্ডুলিপিটা বন্ধ করলেন।

—আহমাদ মূসা কোনো একজন মানুষ ছিল না। প্রথমে এটা ছিল একটা ছদ্মনাম। তারপর সেটা হয়ে গেল একটা গোপন পরিচয়। আর শেষে—একটা দায়িত্ব।

—কার দায়িত্ব?

—যারা নিজেদের সত্যিটা বলতে পারেনি, তাদের গল্প বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব।

আমি টেবিলের ওপর হাত রাখলাম।

—আপনি কি ১৯৯৮ সালের পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু সেখানে আমার নাম লেখা ছিল!

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

—তোমার নাম লেখা ছিল না। লেখা ছিল একটা নাম, যেটা একদিন তোমার হয়ে উঠবে।

—আমার নাম আহমাদ?

—তোমার জন্মের সময় তোমাকে সেই নাম দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমার মা তোমাকে রৌদ্রময়ী নাম দিয়েছিলেন।

আমি চমকে উঠলাম।

—আপনি আমার জন্মের সময় ছিলেন?

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—আমি তোমার জন্মের সময় ছিলাম না। আমি ছিলাম সেই রাতে, যখন তোমার জন্মের গল্পটা লেখা হয়েছিল।

আমার মাথা ঘুরে উঠল।

—জন্মের গল্প লেখা হয়েছিল মানে?

বৃদ্ধ পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।

সেখানে লেখা—

“২৮ অক্টোবর ১৯৯৮। আজ এমন একটি শিশুর জন্ম হলো, যে পৃথিবীতে আসার আগেই তার নিজের মৃত্যুর গল্প পড়ে ফেলেছে।”

নিচে লেখকের নাম—

আহমাদ মূসা।

আমি পাতাটা উল্টে দিলাম।

দ্বিতীয় পাতায় একটা নাম।

আরিফ।

তৃতীয় পাতায়—

রৌদ্রময়ী।

চতুর্থ পাতাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

—এখানে কিছু লেখা নেই কেন?

বৃদ্ধ বললেন,

—কারণ এই পাতা তোমার লেখার কথা ছিল।

৩. জন্মসনদের পেছনের সত্য

বৃদ্ধ আমাকে একটা খাম দিলেন।

ভেতরে তিনটি নথি।

প্রথমটি ১৯৯৮ সালের জন্মনিবন্ধনের অনুলিপি। তাতে একটি শিশুর নাম লেখা—আরিফ রহমান।

দ্বিতীয়টি ২০০৫ সালের জন্মনিবন্ধন। নাম—রৌদ্রময়ী মীরা।

তৃতীয়টি কোনো জন্মসনদ নয়। হাসপাতালের একটি নথি।

তাতে লেখা—

“২৮ অক্টোবর ১৯৯৮। সদ্যোজাত শিশু জীবিত। মায়ের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। শিশুটিকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

আমি কাগজটা নামিয়ে রাখলাম।

—এখানে তো আরিফের নাম নেই। কিন্তু আপনি বলছেন, ১৯৯৮ সালে আরিফের জন্ম হয়েছিল।

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

—আরিফের জন্ম হয়েছিল তারও আগে। এই নথিটা অন্য শিশুর।

—অন্য শিশু কে?

তিনি আমার দিকে তাকালেন।

—সেটা জানার জন্য তোমাকে একটা কথা বুঝতে হবে। একই দিনে একই হাসপাতালে দুটো শিশুর জন্ম হয়েছিল। একজনের পরিচয় ছিল নথিতে। অন্যজনের পরিচয় ছিল একটা গল্পে।

—আর সেই দ্বিতীয় শিশুটি আমি?

—আমি তা বলিনি।

আমার ধৈর্য শেষ হয়ে আসছিল।

—তাহলে বলুন! ১৯৯৮ সালের শিশুটি কে?

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—যে শিশুটির পরিচয় মুছে দেওয়া হয়েছিল, সে-ই ছিল আহমাদ মূসা নামের প্রথম উত্তরাধিকারী। তার জন্মের সঙ্গে তোমার পরিবারের একটা গোপন ঘটনার সম্পর্ক ছিল।

—সে কি আমার বাবা?

—না।

—আরিফ?

—না।

—তাহলে কে?

বৃদ্ধ এবার জানালার দিকে তাকালেন।

—তোমার নানাভাইয়ের ছেলে।

আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।

নানাভাইয়ের ছেলে?

মা তো বলেছিলেন, নানাভাইয়ের একমাত্র মেয়ে তিনি।

তাহলে তাঁর ছেলে কোথায় গেল?

বৃদ্ধ যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন।

—তোমার নানাভাইয়ের একটা ছেলে ছিল। তার নাম ছিল আহমাদ। সে নিখোঁজ হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ২৮ অক্টোবর।

আমি কাঁপা গলায় বললাম,

—তাহলে আহমাদ মূসা তাঁর নাম?

—হ্যাঁ। প্রথম আহমাদ মূসা ছিল তোমার নানাভাইয়ের ছেলে। তার নিখোঁজ হওয়ার পর তোমার নানাভাই তার নামটাকে একটা ছদ্মনাম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। পরে সেই নাম আরও কয়েকজন ব্যবহার করেছে।

—কিন্তু নানাভাই তো বলেছিলেন, আহমাদ মূসা তাঁর নিজের নাতনির সাক্ষী!

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

—কারণ তিনি জানতেন, একদিন তাঁর নাতনি সেই হারিয়ে যাওয়া নামের খোঁজ করবে।

আমি ছবিগুলোর দিকে তাকালাম।

নানাভাই।

মাহতাব।

অনিরুদ্ধ।

আরিফ।

আমি।

এরা সবাই কি একটা হারিয়ে যাওয়া মানুষের নামকে ঘিরে নিজেদের জীবন কাটিয়েছে?

তাহলে আমার গল্পটা কি আসলে সেই হারিয়ে যাওয়া আহমাদের গল্প?

৪. যে মানুষটি নিজের নাম ফিরে পেল

বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।

—এবার তোমাকে এমন একজনের সঙ্গে দেখা করাতে হবে, যাকে তুমি অনেক দিন ধরে খুঁজছ।

তিনি পাশের ঘরের দরজা খুললেন।

ভেতরে একটা চেয়ার। চেয়ারে বসে আছে একজন মানুষ। মুখে দাড়ি, চোখের নিচে গভীর ক্লান্তি। তার সামনে রাখা একটা সাদা কাগজ।

আমি তাকে দেখেই চিনতে পারলাম।

—আরিফ!

সে মাথা তুলল।

—না, রৌদ্রময়ী।

তার কণ্ঠ শুনে আমার চোখে পানি চলে এল।

—তুমি বেঁচে আছ!

সে মৃদু হাসল।

—শরীরটা বেঁচে আছে। কিন্তু যে মানুষটাকে তুমি আরিফ বলে চিনতে, সে সাত বছর আগে নিজের জীবন থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

আমি তার কাছে এগিয়ে গেলাম।

—তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছিলে কেন?

—কারণ তুমি সত্যিটা জানলে আমাকে খুঁজতে। আর আমি চাইনি, তুমি আমার অতীতের মধ্যে আটকে থাকো।

—তাহলে তুমি কোথায় ছিলে?

—আমি এমন একটা জীবন কাটাচ্ছিলাম, যেখানে কেউ আমাকে আরিফ বলে চিনত না।

—তোমার নতুন নাম কী?

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর টেবিলের ওপর রাখা কাগজটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

সেখানে লেখা—

আহমাদ মূসা।

আমি পিছিয়ে গেলাম।

—তুমি?

আরিফ মাথা নাড়ল।

—আমি এই নামটা ব্যবহার করেছি। কিন্তু আমি প্রথম আহমাদ মূসা নই। আমি শুধু সেই মানুষ, যে চেয়েছিল নামটার আড়ালে নিজের অতীতটাকে লুকিয়ে রাখতে।

—তাহলে ফেসবুকে যে আমার সঙ্গে কথা বলছিল?

আরিফের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—সে আমি নই।

—তাহলে কে?

আরিফ উত্তর দেওয়ার আগেই পাশের ঘরের বৃদ্ধ বললেন,

—ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা আমি চালাই।

আমি বৃদ্ধের দিকে তাকালাম।

—আপনি?

—হ্যাঁ। তোমার নানাভাইয়ের মৃত্যুর পর আমি তাঁর নথি আর পাণ্ডুলিপিগুলো সংরক্ষণ করছিলাম। তোমার পুরোনো ডায়েরি, আরিফের চিঠি, তোমার বাবার লেখা—সবকিছু আমার কাছে ছিল।

—তাহলে আপনি আমাকে মেসেজ করেছেন?

—হ্যাঁ।

—আমার সবচেয়ে খারাপ রাতে?

বৃদ্ধের চোখ নরম হয়ে এল।

—আমি জানতাম, তুমি ভেঙে পড়েছ। কিন্তু আমি তোমাকে বাঁচাতে চাইনি বলে মিথ্যে বলিনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুমি যেন রাতটা পার করো, সকালটা দেখো। বাকি সিদ্ধান্ত তোমার।

আমার চোখ ভিজে উঠল।

সেই প্রথম মেসেজটা মনে পড়ল—

“আজ রাতটা পার করো। কাল তোমার সামনে আরও একটা সকাল থাকবে।”

আহমাদ মূসা কোনো অলৌকিক মানুষ ছিল না।

সে ছিল একটা নাম, যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল অনেক মানুষের ভয়, অপরাধবোধ, ভালোবাসা আর অসমাপ্ত গল্প।

কিন্তু আমার বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন তখনও রয়ে গেছে।

—তাহলে আমার বাবা কে?

আরিফ আর বৃদ্ধ একে অন্যের দিকে তাকালেন।

কেউ উত্তর দিলেন না।

৫. আহমাদ মূসার মৃত্যু

দুপুর বারোটা বাজতে আর কয়েক মিনিট বাকি।

বৃদ্ধ ল্যাপটপ খুললেন। স্ক্রিনে আহমাদ মূসার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট।

তিনি বললেন,

—এই অ্যাকাউন্টটা আজ বন্ধ হয়ে যাবে। তুমি চাইলে শেষবারের মতো একটা মেসেজ পাঠাতে পারো।

আমি স্ক্রিনের সামনে বসলাম।

লিখলাম—

“আহমাদ মূসা, তুমি কি সত্যিই অস্তিত্বহীন?”

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।

“না।”

আমি চমকে উঠলাম।

বৃদ্ধ বললেন,

—এটা স্বয়ংক্রিয় উত্তর নয়। আমি লিখছি।

আমি আবার লিখলাম,

“তাহলে তুমি কে?”

উত্তর এল—

“আমি সেই নাম, যেটা মানুষ নিজের সত্যিটা বলতে না পেরে ধার করে।”

আমি লিখলাম,

“তোমার মৃত্যু হলে কী হবে?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন—

“একটা নাম মুছে যাবে। কিন্তু যারা সেই নামের আড়ালে নিজেদের গল্প লুকিয়েছে, তাদের গল্প শেষ হবে না।”

আমি শেষবারের মতো লিখলাম—

“আমার বাবা কে?”

দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর উত্তর এল—

“তোমার বাবা সেই মানুষ, যিনি তোমাকে জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু তোমার গল্পের লেখক তিনি নন।”

আমি আর কিছু লিখলাম না।

বৃদ্ধ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার বোতামে ক্লিক করলেন।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

Account deleted.

আহমাদ মূসা আর নেই।

অন্তত এই অ্যাকাউন্টে।

আমি ভাবলাম, এতদিন ধরে যে নামকে খুঁজেছি, সেই নামের মৃত্যু দেখলাম নিজের চোখে। অথচ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

ঠিক তখন আরিফ আমার হাতে একটা ছোট্ট খাম দিল।

—এটা তোমার জন্য। তোমার বাবা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আহমাদ মূসার শেষ দিনেই যেন তোমাকে দিই।

খামের ওপর লেখা—

“রৌদ্রময়ীর কাছে, তার বাবার পক্ষ থেকে।”

আমি খাম খুললাম।

ভেতরে একটা মাত্র বাক্য—

“মা, তুমি যদি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝব আমি তোমার কাছে ফিরতে পারিনি।”

আমি বাক্যটা বারবার পড়লাম।

তারপর নিচের স্বাক্ষরটা দেখলাম।

—তোমার ছেলে, আহমাদ।

আমার হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল।

আমার ছেলে?

আমার তো কোনো সন্তান নেই!

আমি আরিফের দিকে তাকালাম।

সে ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।

আরিফ ফিসফিস করে বলল,

—রৌদ্রময়ী, আমি একটা কথা তোমাকে এতদিন বলিনি।

—কী কথা?

সে আমার চোখের দিকে তাকাল।

—তুমি যে গল্পটা লিখেছিলে, সেই গল্পে তুমি শুধু আহমাদ মূসার মেয়ে ছিলে না। তুমি ছিলে তার মা।

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

আমি চিঠিটা তুলে আবার দেখলাম।

“মা…”

শব্দটা যেন কাগজের ওপর থেকে উঠে এসে আমার বুকের ভেতর বসে গেল।

আর ঠিক তখনই আমার ফোনে একটা নতুন মেসেজ এল।

প্রেরক—নীরব পাঠক।

“আহমাদ মূসার অ্যাকাউন্ট মুছে গেছে। কিন্তু তার গল্প এখনও শেষ হয়নি। কারণ রৌদ্রময়ী, তোমার ছেলে এখনও বেঁচে আছে।”

পরবর্তী পর্ব: ১৪ — “আমার ছেলে আহমাদ”

রৌদ্রময়ী কি সত্যিই এমন এক সন্তানের মা, যার জন্মের কথা তার নিজেরই মনে নেই?

যদি আহমাদ তার ছেলে হয়, তাহলে সে কোথায়? আর কেন তার জন্মের গল্প লেখা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে—রৌদ্রময়ীর জন্মের সাত বছর আগে?

সবচেয়ে বড় রহস্য এবার আরও গভীর: যে মানুষটিকে সবাই আহমাদ মূসা বলে চিনত, সে কি সত্যিই শুধু একটা ছদ্মনাম—নাকি রৌদ্রময়ীর হারিয়ে যাওয়া জীবনের কোনো বাস্তব অংশ?