পর্ব ১১: সকাল ৮টা ১৭ মিনিট
“কিছু দরজা খোলার জন্য চাবি লাগে না। লাগে শুধু সেই স্মৃতি, যেটাকে তুমি সাত বছর ধরে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছ।”
১. রাত পেরোনোর আগে
সারারাত আমি ঘুমাতে পারিনি।
আমার সামনে বারবার ভেসে উঠছিল একটা কফিন। সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটা মৃতদেহ। আর আমার নিজের হাতের লেখা—
“বিদায়, আহমাদ মূসা।”
কিন্তু আমি তো কখনো কোনো আহমাদ মূসাকে কবর দিইনি!
নাকি দিয়েছিলাম?
স্মৃতির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলেই মাথার মধ্যে একটা তীব্র চাপ অনুভব করছিলাম। যেন আমার মস্তিষ্কের কোনো অন্ধকার ঘরে একটা দরজা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে ডাকছে, কিন্তু তার কণ্ঠ আমার কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাচ্ছে।
ভোর পাঁচটার দিকে মায়ের ঘরে গেলাম।
মা জেগে ছিলেন। জানালার পাশে বসে ছিলেন চুপচাপ। আমাকে দেখে বুঝলেন, আমি সব জেনে গেছি।
—তুমি আজ হাসপাতালে যাবে, তাই না?
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
—তুমি জানো?
মা মাথা নিচু করলেন।
—জানতাম, একদিন তুই যাবি।
—মা, আমি সাত বছর আগে কাকে কবর দিয়েছিলাম?
মা চোখ বন্ধ করলেন।
—তুই কাউকে কবর দিসনি, রৌদ্রময়ী।
—তাহলে ওই স্মৃতিটা আমার মাথায় কেন?
—কারণ তুই নিজেই নিজের কাছে একটা মিথ্যে বলেছিলি। এমন একটা মিথ্যে, যেটা বিশ্বাস না করলে তুই বাঁচতে পারতিস না।
আমি মায়ের সামনে বসে পড়লাম।
—আমি কি কাউকে মেরেছিলাম?
মা সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত চেপে ধরলেন।
—না! তুই কাউকে মারিসনি। নিজের ওপর এমন অপরাধ চাপিয়ে দিস না, যার সত্যিটাই তুই জানিস না।
কিছুক্ষণ পর তিনি আলমারির নিচের তাকে রাখা একটা খাম বের করলেন।
খামের ওপরে লেখা—
“২৮ অক্টোবর ২০১৯ — রৌদ্রময়ীর স্মৃতি ফেরার আগে পড়বে না।”
—এটা তোর নানাভাই আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তুই যদি কোনোদিন আবার আহমাদ মূসার খোঁজ করিস, তখন যেন এটা তোকে দিই।
খামের ভেতরে ছিল একটা হাসপাতালের ছবি।
ছবিতে তিনজন মানুষ।
আমি।
আরিফ।
আর তৃতীয় জনের মুখ কালো কালি দিয়ে মুছে দেওয়া।
ছবির পেছনে লেখা—
“একজনকে বাঁচাতে দুজনকে মৃত হতে হয়েছিল।”
আমি মায়ের দিকে তাকালাম।
—দুজন কারা?
মা উত্তর দিলেন না।
শুধু আমার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে বললেন,
—আজ যদি সত্যিটা জানতে পারিস, তাহলে একটা কথা মনে রাখিস। সব সত্য জানার পরও তোর বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
সেই কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সাত বছর আগে আরিফও কি আমাকে এই কথাটাই বলতে চেয়েছিল?
২. ১৭ নম্বর কক্ষ
সকাল আটটা সতেরো মিনিটের পাঁচ মিনিট আগে আমি পুরোনো হাসপাতালের সামনে পৌঁছালাম।
হাসপাতালটা এখন পরিত্যক্ত। জানালার কাচ ভাঙা, দেয়ালে শ্যাওলা, করিডরে ধুলোর স্তর। তবু ভেতরে ঢুকতেই আমার মনে হলো, জায়গাটা আমি চিনি।
এই করিডর।
এই সিঁড়ি।
দেয়ালের ওই ঘড়ি।
ঘড়ির কাঁটা আটটা সতেরো মিনিটে থেমে আছে।
আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
করিডরের শেষ মাথায় ১৭ নম্বর কক্ষের দরজা খোলা ছিল।
দরজার বাইরে একটা সাদা কাগজ পড়ে ছিল। তুলে দেখি, সেখানে আমার হাতের লেখা—
“যদি আমি ফিরে আসি, আমাকে আমার নিজের কথা বিশ্বাস করতে দিও না।”
আমি কাগজটা পকেটে রাখলাম।
তারপর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।
ঘরটা প্রায় ফাঁকা। একটা লোহার বিছানা, একটা টেবিল, আর জানালার পাশে রাখা পুরোনো টেপ রেকর্ডার।
টেবিলের ওপর একটা খাম।
খামের ভেতরে মাত্র একটি ছবি।
ছবিতে আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। আমার চোখ বন্ধ। পাশে বসে আছে আরিফ।
ছবির তারিখ—২৮ অক্টোবর ২০১৯।
ছবির পেছনে আরিফের লেখা—
“ও জেগে উঠলে ওকে বলবে, আমি ওকে ছেড়ে যাইনি।”
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
ঠিক তখনই পেছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।
দরজার পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
তার মুখের অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা। চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু তার চোখ—
সেই চোখ আমি চিনি।
স্বপ্নে দেখেছি।
পুরোনো ছবিতে দেখেছি।
আর সাত বছর আগে হারিয়ে ফেলেছি।
লোকটা ধীরে ধীরে বলল,
—অনেক দেরি করে ফেলেছ, রৌদ্রময়ী।
আমার ঠোঁট কাঁপছিল।
—আরিফ?
সে চোখ নামিয়ে নিল।
—এই নামে আমাকে ডাকবে না।
—কেন?
—কারণ আরিফকে তুমি সাত বছর আগেই বিদায় জানিয়েছ।
আমি এক পা এগোলাম।
—তাহলে তুমি কে?
লোকটা আমার দিকে তাকাল।
—তোমার প্রশ্নটা ভুল। তুমি জানতে চাইছ আমি কে। কিন্তু তোমার আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—
সে একটু থামল।
—সাত বছর আগে তুমি নিজেকে কার কাছ থেকে বাঁচানোর জন্য আমাকে ভুলে গিয়েছিলে?
৩. যে স্মৃতি ফিরে এসেছিল
লোকটা টেবিলের ওপর রাখা টেপ রেকর্ডার চালু করল।
প্রথমে আমার নিজের কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
সাত বছর আগের কণ্ঠ। কাঁদতে কাঁদতে বলছি—
—আমি আর পারছি না, আরিফ। সবাই বলছে, এটা একটা গল্প। কিন্তু আমার কাছে সবকিছু সত্যি মনে হয়। আমি যখন লিখি, মানুষগুলো আমার সঙ্গে কথা বলে। আমি চোখ বন্ধ করলেও ওদের দেখতে পাই।
তারপর আরিফের কণ্ঠ।
—তুমি ওদের সৃষ্টি করেছ, রৌদ্রময়ী। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ওরা তোমার জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে।
আমি রেকর্ডারের সামনে এগিয়ে গেলাম।
—এটা কোথায় পেলে?
লোকটা বলল,
—এই ঘরেই রেকর্ড করা হয়েছিল।
রেকর্ডিং চলতে থাকল।
আমার কণ্ঠ বলল,
—আহমাদ মূসা বলেছে, কাল সব শেষ হয়ে যাবে।
আরিফ জিজ্ঞেস করল,
—আহমাদ মূসা কে?
—আমি জানি না। কখনো মনে হয়, সে আমার গল্পের চরিত্র। কখনো মনে হয়, সে এমন একজন মানুষ, যে আমাকে আমার চেয়েও ভালো চেনে।
—আর যদি সে তোমার নিজের ভেতরের কোনো কণ্ঠ হয়?
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর আমার কণ্ঠ ফিসফিস করে বলল,
—তাহলে আমি তাকে থামাতে চাই না। কারণ সে না থাকলে আমি বাঁচতে চাইব না।
রেকর্ডিং হঠাৎ থেমে গেল।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সেই রাতের স্মৃতি ফিরে আসছিল।
কিন্তু টুকরো টুকরো করে।
একটা সাদা ঘর।
আরিফের হাত আমার হাতে।
মায়ের কান্না।
আর একটা কাগজ, যেখানে লেখা—
“আহমাদ মূসাকে শেষ করতে হলে গল্পটা শেষ করতে হবে।”
আমি লোকটার দিকে তাকালাম।
—আমি কি নিজেই আহমাদ মূসার গল্প লিখেছিলাম?
সে মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—কিন্তু আমার গল্পে তো সে আমার সঙ্গে কথা বলে!
—গল্পের চরিত্রও মানুষের মনে কথা বলতে পারে। কখনো লেখকের কল্পনায়, কখনো পাঠকের বিশ্বাসে। আর কখনো কেউ সেই বিশ্বাসকে ব্যবহার করে বাস্তবের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।
—তাহলে ফেসবুকের আহমাদ মূসা?
লোকটা উত্তর দেওয়ার আগেই আমার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল—
Ahmad Musa
আমি কল ধরলাম।
ওপাশ থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠ।
—তুমি সেখানে পৌঁছে গেছ?
—হ্যাঁ।
—তুমি কি তাকে দেখেছ?
আমি লোকটার দিকে তাকালাম।
—দেখেছি।
আহমাদ মূসা বলল,
—তাহলে এখনই বেরিয়ে এসো। ওকে বিশ্বাস কোরো না।
আমি চিৎকার করে উঠলাম,
—তোমাকে কেন বিশ্বাস করব? তুমি কে?
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর কণ্ঠটা বলল,
—আমি সেই মানুষ, যে তোমাকে সাত বছর আগে বাঁচাতে চেয়েছিল।
—তুমি কি আরিফ?
—না।
—তাহলে আরিফ কোথায়?
ওপাশে দীর্ঘ নিঃশ্বাস শোনা গেল।
তারপর আহমাদ মূসা বলল,
—তোমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে আরিফের শরীর নিয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু তার স্মৃতি আরিফের নয়।
কল কেটে গেল।
আমি ধীরে ধীরে লোকটার দিকে তাকালাম।
—এটা কি সত্যি?
লোকটা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
—তোমার মনে আছে, ২৮ অক্টোবর ২০১৯-এর রাতে কী ঘটেছিল?
আমি মাথা নাড়লাম।
—না। শুধু কিছু ছবি মনে পড়ছে।
—তাহলে শোনো।
সে বিছানায় বসে পড়ল।
—সেদিন আরিফ তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। তুমি নিজের গল্পের শেষ অধ্যায় লিখতে গিয়ে এমন একটা সত্য জানতে পেরেছিলে, যেটা তোমার পরিবার সাত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিল। তুমি জানতে পেরেছিলে, তোমার বাবা বেঁচে আছেন। আর তিনি শুধু তোমার বাবা নন—আহমাদ মূসা নামের পরিচয়ের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক আছে।
আমার শ্বাস আটকে গেল।
—অনিরুদ্ধ সেন?
—অনিরুদ্ধ তোমার বাবার পরিচয় ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সে-ও পুরো সত্য জানত না।
—তাহলে আমার বাবা কে?
লোকটা উত্তর দিল না।
বরং টেবিলের নিচ থেকে একটা পুরোনো ফাইল বের করল।
ফাইলের প্রথম পাতায় একটা নাম।
রৌদ্রময়ী মীরা — রোগীর নথি।
তার নিচে লেখা—
“স্মৃতির বিচ্ছিন্নতা। তীব্র মানসিক আঘাতের পর ঘটনাক্রম মনে করতে অসুবিধা। রোগী নিজের লেখা চরিত্রের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্ত।”
আমি ফাইলটা বন্ধ করে দিলাম।
—তুমি কি বলতে চাইছ, আহমাদ মূসা বাস্তবে ছিল না?
লোকটা শান্তভাবে বলল,
—আমি বলছি না যে সে ছিল না। আমি বলছি, যে মানুষটাকে তুমি আহমাদ মূসা বলে চিনতে, সে হয়তো কখনোই ওই নামে তোমার সামনে আসেনি।
৪. মৃতদেহের পরিচয়
আমি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
বাইরে সূর্যের আলো পড়েছে। অথচ ঘরের ভেতর সবকিছু যেন অন্ধকার।
—তাহলে মৃতদেহটা কার ছিল?
লোকটা ফাইলের ভেতর থেকে একটা কাগজ বের করল।
হাসপাতালের নথি। মৃত ব্যক্তির নামের জায়গাটা কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া।
কিন্তু নিচে একটা স্বাক্ষর ছিল।
মাহাতাব রহমান।
আমার মনে পড়ল, মাহাতাব রহমানের মৃত্যুর কথা সবাই বলেছিল। অথচ এতদিন ধরে তাঁর নাম একের পর এক নথিতে ফিরে আসছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—মাহাতাব কি মৃতদেহটা শনাক্ত করেছিলেন?
—হ্যাঁ।
—তিনি কাকে শনাক্ত করেছিলেন?
লোকটা আমার চোখের দিকে তাকাল।
—আরিফকে।
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
—কিন্তু তুমি তো বললে, আরিফ বেঁচে আছে!
—কারণ মাহাতাব যে মৃতদেহ শনাক্ত করেছিলেন, সেটা আরিফের ছিল না।
—তাহলে তিনি মিথ্যে বলেছিলেন কেন?
—কাউকে রক্ষা করার জন্য।
—কাকে?
লোকটা এবার আর চোখ সরাল না।
—তোমাকে।
আমি হেসে ফেললাম। হাসিটা নিজের কানেই অচেনা শোনাল।
—সবাই আমাকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলেছে। মা, নানাভাই, মাহাতাব, শওকত। আর তুমি?
লোকটা চুপ করে রইল।
—তুমিও কি আমাকে বাঁচাতে মিথ্যে বলেছ?
সে ধীরে ধীরে বলল,
—হ্যাঁ।
আমার চোখে পানি চলে এল।
—তাহলে তোমার সত্যিটা কী?
লোকটা উঠে দাঁড়াল।
—আমার সত্যিটা হলো, আমি তোমাকে চিনতাম। তুমি আমাকে চিনতে। আর সেদিন রাতে তুমি আমাকে একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে।
—কী প্রতিশ্রুতি?
—যদি কোনোদিন আরিফ ফিরে আসে, তুমি তাকে তার পুরোনো নাম ধরে ডাকবে না।
আমি মাথা নাড়লাম।
—কেন?
লোকটা উত্তর দিল,
—কারণ সেই নামের সঙ্গে তার পুরোনো জীবনও ফিরে আসবে। আর সেই জীবনটাই তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল।
আমার ফোনে আবার মেসেজ এল।
আহমাদ মূসা।
“ওকে জিজ্ঞেস করো, তার ডান হাতের কবজিতে দাগটা কীভাবে হলো।”
আমি লোকটার দিকে তাকালাম।
তার ডান হাতের কবজিতে একটা পুরোনো দাগ।
আমি ফিসফিস করে বললাম,
—তোমার হাতে এই দাগটা কীভাবে হলো?
লোকটা নিজের কবজির দিকে তাকাল।
প্রথমবারের মতো তার মুখে ভয় ফুটে উঠল।
—তুমি এটা মনে করতে পারছ?
—না। কিন্তু আহমাদ মূসা জানতে চেয়েছে।
লোকটা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।
—তাহলে সে এখনও সবকিছু দেখছে।
—কে?
লোকটা দরজার দিকে তাকাল।
—যে মানুষটা এই গল্পের প্রথম পাতা লিখেছিল।
৫. শেষ অধ্যায়ের প্রথম লাইন
ঠিক তখনই ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে টেপ রেকর্ডারটা নিজে থেকেই চালু হলো।
একটা কণ্ঠ ভেসে এল।
পুরুষের কণ্ঠ।
বয়স বোঝা যায় না। শান্ত, স্পষ্ট, অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
—রৌদ্রময়ী, তুমি যদি এই রেকর্ডিং শুনতে পাও, তাহলে বুঝব আমার গল্প শেষ হওয়ার সময় এসেছে।
আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগলাম।
—তুমি এতদিন ধরে আহমাদ মূসাকে খুঁজেছ। কিন্তু তুমি ভুলে গেছ, কোনো চরিত্রের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য তার শরীরের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটা নামই যথেষ্ট। একটা নাম, যা মানুষকে নিজের জীবন বদলাতে বাধ্য করে।
একটু বিরতি।
—তোমাকে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই। তুমি কি সত্যিই জানতে চাও, তোমার বাবা কে?
আমি অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কণ্ঠটা আবার বলল,
—যদি জানতে চাও, তাহলে নানাভাইয়ের লাল ডায়েরির শেষ পাতাটা খুঁজে বের করো। সেখানে তোমার জন্মের আগের একটা ছবি আছে। ছবির পেছনে লেখা আছে তোমার বাবার আসল নাম।
রেকর্ডিং থেমে গেল।
ঘরের আলো আবার জ্বলে উঠল।
কিন্তু লোকটা আর সেখানে নেই।
দরজা খোলা। করিডর ফাঁকা।
টেবিলের ওপর শুধু একটা কাগজ পড়ে আছে।
আমি কাগজটা তুলে নিলাম।
সেখানে একটা বাক্য লেখা—
“আরিফকে তুমি খুঁজে পেয়েছ। এবার খুঁজে বের করো, আরিফের মুখ নিয়ে যে মানুষটি বেঁচে আছে, সে আসলে কে।”
আমি কাঁপা হাতে ফোনটা খুললাম।
আহমাদ মূসার ইনবক্সে শেষ মেসেজটা তখনও জ্বলজ্বল করছে।
“তোমাকে একটা কথা বলিনি, রৌদ্রময়ী। আরিফের দ্বিতীয় জীবন শুরু হয়েছিল ২৮ অক্টোবর ২০১৯-এ। কিন্তু তার প্রথম জীবন শুরু হয়েছিল তারও আগে।”
আমি লিখলাম,
“কোথায়?”
উত্তর এল—
“তোমার জন্মের আগে। তোমার বাবার বাড়িতে।”
তারপর আরেকটা মেসেজ।
“আজ রাত বারোটায় তোমার নানাভাইয়ের লাল ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলবে। সেখানে তুমি যে নামটা পাবে, সেই নামেই তোমার বাবা আজও বেঁচে আছেন।”
আমি ফোনটা নামিয়ে রাখলাম।
কারণ ঠিক তখনই আমার মনে পড়ে গেল—নানাভাইয়ের ডায়েরির শেষ পাতায় একটা নাম আমি আগেও দেখেছিলাম।
সাত বছর আগে।
কিন্তু মা আমাকে সেই নাম উচ্চারণ করতে নিষেধ করেছিলেন।
নামটা ছিল—
আহমাদ মূসা।
পরবর্তী পর্ব: ১২ — “বাবার আসল নাম”
রাত বারোটায় লাল ডায়েরির শেষ পাতা খুলবে রৌদ্রময়ী। কিন্তু সেখানে বাবার নামের পাশাপাশি সে খুঁজে পাবে এমন একটি জন্মসনদ, যেখানে তার জন্মের তারিখ লেখা আছে তার নিজের জন্মের সাত বছর আগে।
তাহলে রৌদ্রময়ী আসলে কে?
আর যদি তার জন্মের নথিই মিথ্যে হয়, তবে এতদিন ধরে সে যে জীবনটাকে নিজের বলে জেনে এসেছে—সেটা কার লেখা গল্প?

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।