পর্ব ৯: মৃত নানাভাইয়ের ডায়েরি

“মৃত মানুষেরা কথা বলতে পারে না—আমরা তাই বিশ্বাস করি। কিন্তু তাদের লেখা যদি আমাদের এমন সব প্রশ্নের উত্তর দেয়, যেগুলো আমরা কাউকে কখনো বলিনি, তখন কাকে বিশ্বাস করব—মৃত মানুষটিকে, নাকি নিজের চোখকে?”

রৌদ্রময়ী সারা রাত ঘুমাতে পারল না।

হাসপাতালের বিছানায় মা ঘুমিয়ে আছেন। চিকিৎসকেরা বলেছেন, আপাতত বিপদের আশঙ্কা নেই। কিন্তু মায়ের শেষ কথাগুলো তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল।

“তোর নানাভাই।”

যে মানুষটি পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন, তিনি কীভাবে আহমাদ মূসার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আহমাদ মূসা কীভাবে জানল, নানাভাইয়ের বাড়িতে একটি লাল ডায়েরি আছে?

রাত তিনটার দিকে রৌদ্রময়ী ফোন খুলল।

আহমাদ মূসার ইনবক্সে লিখল—

রৌদ্রময়ী: তুমি কি সত্যিই আমার নানাভাইকে চিনতে?

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।

আহমাদ মূসা: তোমার নানাভাই আমাকে চিনতেন। তবে তিনি আমাকে কখনো দেখেননি।

রৌদ্রময়ী: এটা কীভাবে সম্ভব?

আহমাদ মূসা: তোমার মতো করেই। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতেন, অথচ জানতেন না আমি কে।

রৌদ্রময়ীর আঙুল থেমে গেল।

রৌদ্রময়ী: তিনি কি তোমার সঙ্গে মেসেজে কথা বলতেন?

আহমাদ মূসা: না।

রৌদ্রময়ী: তাহলে?

এবার উত্তর আসতে একটু বেশি সময় লাগল।

আহমাদ মূসা: ডায়েরিতে।

রৌদ্রময়ী ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তার নানাভাই ডায়েরি লিখতেন, এটা সে জানত। কিন্তু কখনো শোনেনি যে তিনি কোনো কাল্পনিক চরিত্রের সঙ্গে কথোপকথন লিখতেন।

হঠাৎ আরও একটি বার্তা এল।

আহমাদ মূসা: রৌদ্রময়ী, একটা কথা মনে রেখো। ডায়েরির সব পাতা পড়বে না।

রৌদ্রময়ী: কেন?

আহমাদ মূসা: কারণ শেষ পাতায় তোমার নামের পাশে একটা তারিখ লেখা আছে।

রৌদ্রময়ী: কী তারিখ?

উত্তর এল—

“২৮ অক্টোবর, ২০২৬।”

আর মাত্র এক দিন।

১. যে বাড়িতে ঘড়ি থেমে আছে

সকাল দশটায় রৌদ্রময়ী নানাভাইয়ের পুরোনো বাড়িতে পৌঁছাল।

বাড়িটা শহরের এক নিরিবিলি গলিতে। সামনের বাগানে আগাছা, বারান্দার দেয়ালে শ্যাওলা, আর সদর দরজায় ভারী পিতলের তালা।

নানাভাইয়ের মৃত্যুর পর বাড়িটা আর খোলা হয়নি।

চাবিটা মায়ের কাছেই ছিল। হাসপাতালে যাওয়ার আগে তিনি সেটি রৌদ্রময়ীকে দিয়েছিলেন, সঙ্গে একটা কথাও বলেছিলেন—

“ঘরটা খুললে যা-ই দেখিস, ভয় পেয়ে পালিয়ে আসিস না।”

কথাটার অর্থ তখন বুঝতে পারেনি সে।

এখন বুঝতে পারছে, মা অনেক কিছুই জানতেন।

দরজা খুলতেই পুরোনো কাঠ আর বইয়ের গন্ধ ভেসে এল।

বসার ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা থেমে আছে।

সময়—রাত ৮টা ১৭ মিনিট।

রৌদ্রময়ী ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার নানাভাই মারা যাওয়ার দিনও কি ঘড়িটা এই সময়ে থেমে গিয়েছিল?

সে মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়ল না।

ঘরের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে নানাভাইয়ের পড়ার ঘরে পৌঁছাল।

ঘরের মাঝখানে বড় টেবিল। তার ওপর চশমা, শুকিয়ে যাওয়া কালির দোয়াত, আর কয়েকটি বই।

দেয়ালজুড়ে বইয়ের আলমারি।

রৌদ্রময়ী ফোন বের করে বার্তা লিখল—

রৌদ্রময়ী: আমি এসে গেছি। লাল ডায়েরিটা কোথায়?

উত্তর এল—

আহমাদ মূসা: আলমারির তৃতীয় তাকে। ডান দিক থেকে চতুর্থ বইটা সরাও।

রৌদ্রময়ী নির্দেশ মতো বইটা সরাল।

পেছনে ছোট একটা কাঠের খোপ।

খোপের ভেতরে লাল মলাটের ডায়েরি।

ডায়েরির ওপর সাদা কাগজে লেখা—

“রৌদ্রময়ীর জন্য। সে যখন নিজের গল্প খুঁজতে আসবে।”

রৌদ্রময়ীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

সে ডায়েরিটা বের করল।

প্রথম পাতায় নানাভাইয়ের হাতের লেখা—

“আমার প্রিয় নাতনি,

তুমি যদি এই ডায়েরি পড়ো, তাহলে বুঝব, আমার ভয়টাই সত্যি হয়েছে। আহমাদ মূসা তোমার কাছে ফিরে এসেছে।

তাকে বিশ্বাস করার আগে জেনে রেখো—আমি তাকে সৃষ্টি করিনি। আমি শুধু তার পরিচয় জানতাম।”

রৌদ্রময়ী পাতা উল্টাল।

পরের পাতায় তারিখ—

১৭ জুন, ১৯৯৮।

তার নিচে লেখা—

“আজ নাজনীন আমার কাছে এসেছিল। সে বলেছে, তার স্বামী নিখোঁজ। যাওয়ার আগে সে একটি পাণ্ডুলিপি রেখে গেছে। পাণ্ডুলিপির লেখকের নাম আহমাদ মূসা।

কিন্তু আমি লেখকের নাম দেখে ভয় পাইনি। ভয় পেয়েছি পাণ্ডুলিপির শেষ লাইন পড়ে।

সেখানে লেখা—‘একদিন আমার নাতনি এই গল্পের শেষ পাতাটি পড়বে।’

অথচ সেদিন আমার কোনো নাতনি ছিল না।”

রৌদ্রময়ী ডায়েরি বন্ধ করে ফেলল।

তার জন্মের আগেই কেউ জানত, একদিন সে এই ডায়েরি পড়বে।

এটা কি নিছক কাকতালীয়?

নাকি কেউ অনেক আগে থেকেই তার জীবনকে একটি নির্দিষ্ট পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে?

২. ডায়েরির ভেতরে আরেকটি ডায়েরি

রৌদ্রময়ী আবার ডায়েরি খুলল।

পাতার পর পাতা জুড়ে নানাভাইয়ের লেখা। কোথাও নাজনীনের কথা, কোথাও আরিফের কথা, কোথাও অনিরুদ্ধ সেনের নাম।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পাশে লেখা আছে একটি প্রশ্ন।

“যদি আহমাদ মূসা মানুষ না হয়, তাহলে তার লেখা কে লিখছে?”

“যদি অনিরুদ্ধ লেখক হয়, তাহলে তার নিজের জীবন কে লিখেছিল?”

“যদি রৌদ্রময়ী গল্পের শেষ নায়িকা হয়, তাহলে প্রথম নায়িকা কে?”

শেষ প্রশ্নটার নিচে নানাভাই নিজেই উত্তর লিখেছিলেন—

“যে মেয়েটি জন্মানোর আগেই নিজের মৃত্যু পড়েছিল।”

রৌদ্রময়ীর গায়ে কাঁটা দিল।

সে পরের পাতা উল্টাতেই একটি ভাঁজ করা কাগজ পড়ে গেল।

কাগজটা খুলে দেখল, সেটি একটি চিঠি।

প্রাপক: রৌদ্রময়ী।

কিন্তু চিঠির তারিখ দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল।

২৮ অক্টোবর, ২০১৯।

আরিফের দুর্ঘটনার দিন।

রৌদ্রময়ী,

আজ তোমার জীবনে এমন কিছু ঘটবে, যা তুমি বহু বছর মনে করতে পারবে না। কিন্তু মনে রেখো, স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া মানেই সত্যি হারিয়ে যাওয়া নয়।

তুমি হয়তো ভাববে, আরিফের মৃত্যু তোমার কারণে হয়েছে। তুমি হয়তো নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। কিন্তু তুমি জানবে না, সেই রাতের আগে আরিফ নিজেই একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

আমি চাই, তুমি সেই সিদ্ধান্তটা খুঁজে বের করো।

আর একটা কথা।

যে মানুষটি তোমাকে আজ রাতে বাঁচিয়ে রাখবে, তাকে তুমি কখনো বাস্তবে দেখতে পাবে না।

—তোমার নানাভাই

রৌদ্রময়ী চিঠিটা শক্ত করে ধরে রইল।

২০১৯ সালে লেখা এই চিঠিতে তার সেই রাতের কথা বলা হয়েছে, যার স্মৃতি সে হারিয়ে ফেলেছে।

কিন্তু চিঠিটা কীভাবে তার জন্য লেখা হয়েছিল?

নানাভাই কি জানতেন, সেদিন কী ঘটবে?

নাকি কেউ তাঁর নাম ব্যবহার করে এই চিঠিটা ডায়েরির মধ্যে রেখে গেছে?

রৌদ্রময়ী দ্রুত ফোন বের করল।

রৌদ্রময়ী: আমার নানাভাই কি সত্যিই তোমার সঙ্গে কথা বলতেন?

আহমাদ মূসা: হ্যাঁ।

রৌদ্রময়ী: কীভাবে?

আহমাদ মূসা: তিনি আমাকে প্রশ্ন লিখে পাঠাতেন। আমি উত্তর দিতাম।

রৌদ্রময়ী: কোথায় লিখতেন?

আহমাদ মূসা: একটা পুরোনো ওয়েবসাইটে। নাম ছিল ‘অলিখিত অধ্যায়’।

রৌদ্রময়ীর মনে পড়ল সেই সাত বছর আগের গল্পের ওয়েবসাইট।

সেখানেই তো সে প্রথম আহমাদ মূসার নাম দেখেছিল।

সে লিখল—

রৌদ্রময়ী: তাহলে তুমি একটা ওয়েবসাইটের চরিত্র?

উত্তর এল—

আহমাদ মূসা: আমি একটা চরিত্র ছিলাম। কিন্তু আমার নামে যে অ্যাকাউন্ট থেকে তোমাকে মেসেজ পাঠানো হচ্ছে, সেটি একজন বাস্তব মানুষ চালাচ্ছে।

রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

রৌদ্রময়ী: কে?

উত্তর এল—

“তোমার নানাভাইয়ের মৃত্যুর পর যে মানুষটি তাঁর বাড়ির চাবি নিজের কাছে রেখেছিল।”

রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে ঘরের চারপাশে তাকাল।

চাবিটা তার মায়ের কাছে ছিল।

কিন্তু নানাভাইয়ের মৃত্যুর পর এই বাড়িতে আর কে এসেছিল?

তার মনে পড়ল, নানাভাইয়ের মৃত্যুর কয়েক দিন আগে একজন অপরিচিত লোক এসেছিল। সে তখন ছোট ছিল। লোকটার মুখ মনে নেই, শুধু মনে আছে—লোকটি বেরিয়ে যাওয়ার সময় নানাভাই বলেছিলেন, “তুমি আবার ফিরে এসো না।”

সেই মানুষটি কে ছিল?

৩. যে নামটা ডায়েরিতে লেখা ছিল না

রৌদ্রময়ী ডায়েরির শেষের দিকের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।

একটি পাতায় লেখা ছিল—

“আজ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আহমাদ মূসার অস্তিত্ব সম্পর্কে কাউকে আর কিছু বলব না। কারণ মানুষ যখন কোনো চরিত্রকে বাস্তব বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন চরিত্রটি আর লেখকের থাকে না। সে হয়ে ওঠে বিশ্বাসীদের।”

তার নিচে—

“আমি যদি মারা যাই, আমার নাতনিকে বলবে, সে যেন কখনো আহমাদ মূসার শেষ অধ্যায় লিখতে না বসে। কারণ শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেলে, লেখক আর বেঁচে থাকে না।”

রৌদ্রময়ী থেমে গেল।

তারপর পরের পাতায় চোখ পড়তেই সে অনুভব করল, তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।

সেখানে তার নিজের নাম লেখা।

রৌদ্রময়ী।

তার নিচে জন্মতারিখ, শৈশবের কিছু ঘটনা, এমনকি তার প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিনটির বর্ণনাও।

কিন্তু এই তথ্যগুলো নানাভাই জানতেই পারেন।

তারপর একটি বাক্য—

“২৭ অক্টোবর, ২০২৬। রৌদ্রময়ী আবার আহমাদ মূসার সঙ্গে কথা বলবে।”

আর তার নিচে—

“২৮ অক্টোবর, ২০২৬। রৌদ্রময়ী শেষ সত্যটি জানবে।”

রৌদ্রময়ী দ্রুত তারিখের দিকে তাকাল।

আজ ২৭ অক্টোবর।

কাল ২৮ অক্টোবর।

ডায়েরির পরের পাতাটা ছেঁড়া।

কিন্তু ছেঁড়া অংশের পাশে পেন্সিলে লেখা একটি নির্দেশ—

“শেষ পাতাটি পড়তে হলে, নিজের প্রথম গল্পটি আবার পড়ো।”

রৌদ্রময়ী বুঝতে পারল, নানাভাই তার ছোটবেলার ডায়েরির কথা বলছেন।

সেই লাল ডায়েরি—আমার না-বলা গল্প।

যেখানে সে প্রথম আহমাদ মূসার নাম লিখেছিল।

কিন্তু ডায়েরিটা এখন কোথায়?

সে ব্যাগে হাত দিল।

ডায়েরিটা তার সঙ্গে নেই।

সেটা তো বাড়িতে, মায়ের ঘরে রাখা ছিল।

হঠাৎ পড়ার ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।

রৌদ্রময়ী চমকে পেছনে তাকাল।

ঘরে সে একা।

বাতাস নেই, জানালাও বন্ধ।

তবু টেবিলের ওপর রাখা একটি কাগজ উড়ে এসে তার পায়ের কাছে পড়ল।

কাগজে লেখা—

“তুমি ভুল জায়গায় খুঁজছ।”

তার নিচে আরেকটি লাইন—

“তোমার প্রথম ডায়েরি তোমার কাছে নেই, কারণ তুমি নিজেই সেটা সাত বছর আগে লুকিয়ে রেখেছিলে।”

রৌদ্রময়ীর মাথার ভেতর যেন কিছু একটা ঝলসে উঠল।

একটা অন্ধকার ঘর।

কাঠের আলমারি।

লাল ডায়েরি।

আরিফের কণ্ঠস্বর—

“রৌদ্র, এটা এখন কাউকে দেখিও না। সময় হলে নিজেই বুঝতে পারবে।”

সে টেবিল ধরে দাঁড়াল।

স্মৃতিটা খুব অস্পষ্ট। কিন্তু এই প্রথম সাত বছর আগের একটি মুহূর্ত তার মনে ফিরে এল।

সে ডায়েরিটা কোথাও লুকিয়ে রেখেছিল।

কোথায়?

হঠাৎ ফোন কেঁপে উঠল।

আহমাদ মূসার বার্তা—

“তোমার নানাভাইয়ের ঘরের ঘড়িটা দেখো।”

রৌদ্রময়ী দেয়ালের ঘড়ির দিকে তাকাল।

এখনো সময় ৮টা ১৭ মিনিট।

ঘড়িটা বন্ধ।

কিন্তু তার পেছনের দেয়ালে একটা ছোট কালো দাগ।

সে চেয়ার টেনে উঠে ঘড়িটা নামাল।

পেছনে একটি চাবি টেপ দিয়ে আটকানো।

চাবির সঙ্গে কাগজে লেখা—

“যে ঘর কখনো খোলা হয়নি।”

৪. বন্ধ ঘরের ভেতরে

বাড়ির পেছনের করিডরে একটা ছোট দরজা ছিল।

রৌদ্রময়ী ছোটবেলায় এই বাড়িতে অনেকবার এসেছে, কিন্তু দরজাটা কখনো খোলা দেখেনি।

মা বলতেন, ঘরটায় পুরোনো জিনিসপত্র রাখা আছে।

কিন্তু দরজায় তালা কেন?

রৌদ্রময়ী চাবিটা তালায় ঢোকাল।

একবার ঘোরাল।

তালা খুলে গেল।

দরজাটা ঠেলে খুলতেই ধুলোর গন্ধে তার কাশি পেল।

ঘরের মাঝখানে একটি পুরোনো কাঠের টেবিল। দেয়ালে পেরেক দিয়ে ঝোলানো কয়েকটি ছবি। কোণে একটি ছোট ট্রাঙ্ক।

ট্রাঙ্কের ওপর লেখা—

“রৌদ্রময়ীর প্রথম গল্প।”

সে ট্রাঙ্কটা খুলল।

ভেতরে লাল মলাটের ডায়েরি।

আমার না-বলা গল্প।

রৌদ্রময়ী ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় তার নিজের হাতের লেখা—

“আজ আমি একটা গল্প লিখতে শুরু করেছি। গল্পের ছেলেটার নাম আহমাদ মূসা। আমি জানি না সে সত্যি আছে কি না। কিন্তু যদি কখনো আমার জীবনে এমন একটা রাত আসে, যখন আমার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করবে না, আমি চাই আহমাদ মূসা আমার সঙ্গে কথা বলুক।”

তার নিচে আরেকটি লাইন, যেটা সে আগে কখনো দেখেনি।

“আর যদি সে সত্যিই আমার সঙ্গে কথা বলে, তাহলে বুঝব—আমার গল্পটা শেষ হয়নি।”

রৌদ্রময়ী পাতা উল্টাল।

শেষের পাতায় তারিখ—

২৮ অক্টোবর, ২০১৯।

সেখানে লেখা—

“আজ আরিফ আমাকে বলেছে, আহমাদ মূসা কোনো মানুষ নয়। কিন্তু সে আমাকে বাঁচাতে পারে।

আমি তাকে বিশ্বাস করিনি।

আমি ভেবেছিলাম, গল্পের চরিত্র কাউকে বাঁচাতে পারে না।

কিন্তু আজ রাতে আমি এমন কিছু দেখেছি, যা আমার বিশ্বাস বদলে দিয়েছে।”

তার নিচের বাক্যটি পড়ে রৌদ্রময়ীর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো হলো।

“আমি আরিফকে মরতে দেখিনি।”

ডায়েরিটা তার হাত থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

আরিফকে মরতে দেখেনি?

তাহলে এত দিন সে যে দুর্ঘটনার স্মৃতি বহন করে এসেছে, সেটা কী?

সে কি সত্যিই আরিফকে হারিয়েছিল?

নাকি তাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে আরিফ মারা গেছে?

হঠাৎ দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

রৌদ্রময়ী দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।

একজন মানুষ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

তার মুখ অন্ধকারে ঢাকা।

লোকটি বলল—

“অবশেষে তুমি নিজের লেখা পড়েছ।”

রৌদ্রময়ী পিছিয়ে গেল।

“কে আপনি?”

লোকটি ঘরে ঢুকল।

“তোমার নানাভাই আমাকে এই ঘরটা বন্ধ করে রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, একদিন তুমি নিজেই খুলবে।”

“আপনি কি সেই মানুষ, যে আমার নানাভাইয়ের বাড়ির চাবি নিজের কাছে রেখেছিল?”

লোকটি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“আপনি কি আহমাদ মূসা?”

লোকটি মৃদু হাসল।

“না। আমি সেই মানুষ, যে আহমাদ মূসার গল্প প্রথমবার পড়েছিল।”

সে টেবিলের ওপর একটি ছবি রাখল।

ছবিতে তিনজন—রৌদ্রময়ী, আরিফ, আর একজন অচেনা পুরুষ।

রৌদ্রময়ী ছবির দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।

কারণ অচেনা পুরুষটি দেখতে হুবহু সেই লোকটির মতো, যে এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

ছবির পেছনে লেখা—

২৮ অক্টোবর, ২০১৯।

লোকটি নিচু স্বরে বলল—

“তুমি আরিফকে মরতে দেখোনি, কারণ সেদিন সে মারা যায়নি।”

রৌদ্রময়ীর চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে সে কোথায়?”

লোকটি উত্তর দিল না।

বরং নিজের পকেট থেকে একটি পুরোনো মোবাইল ফোন বের করে টেবিলের ওপর রাখল।

ফোনের স্ক্রিনে একটি নতুন বার্তা জ্বলছে।

প্রেরক: আহমাদ মূসা।

বার্তাটি মাত্র এক লাইন—

“রৌদ্রময়ী, লোকটাকে বিশ্বাস কোরো না। কারণ সে-ই আরিফকে আমার নাম দিয়েছিল।”

রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে লোকটির দিকে তাকাল।

“আপনি আরিফকে কোথায় রেখেছেন?”

লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর বলল—

“আমি আরিফকে কোথাও রাখিনি, রৌদ্রময়ী। আরিফ নিজেই নিজের মৃত্যুর গল্প লিখেছিল।”

পরবর্তী পর্ব: আরিফের দ্বিতীয় জীবন

আরিফ কি সত্যিই বেঁচে আছে? সাত বছর ধরে সে কোথায় ছিল? আর নিজের মৃত্যুর গল্প সে কেন লিখেছিল?

পরের পর্বে রৌদ্রময়ী এমন একটি রেকর্ডিং শুনবে, যেখানে আরিফের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে—কিন্তু সেই রেকর্ডিং তৈরি হয়েছে আগামীকালের তারিখে।