পর্ব ৫: প্রথম নায়িকার মৃত্যু

“কিছু গল্পের নায়িকা মারা যায় গল্পের শেষ পাতায়। আর কিছু নায়িকার মৃত্যু হয়—গল্পটা লেখা শুরু হওয়ার আগেই।”

কালো বাক্সটা মায়ের হাত থেকে নেওয়ার সময় রৌদ্রময়ীর মনে হলো, বাক্সটার ওজন তার ভেতরে থাকা কাগজের চেয়ে অনেক বেশি।

যেন এর ভেতরে কেবল একটা পুরোনো পাণ্ডুলিপি নেই—আটকে আছে সাতাশ বছরের চাপা কান্না, কিছু মিথ্যে, আর এমন এক সত্য, যেটা জানার পর হয়তো নিজের জীবনকেই আর আগের মতো চিনতে পারবে না সে।

মা বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখলেন।

“খোলার আগে একটা কথা বলি, রৌদ্র।”

“কী কথা?”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ভেতরে যা পাবি, তার সবটা বিশ্বাস করিস না।”

রৌদ্রময়ী মৃদু হেসে বলল, “তুমি এত দিন সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছ। এখন আবার সত্যি আর মিথ্যের পার্থক্যও তুমি ঠিক করে দেবে?”

মায়ের চোখ নেমে গেল।

“আমি তোকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।”

“কিসের হাত থেকে?”

মা উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই রৌদ্রময়ীর ফোন কেঁপে উঠল।

আহমাদ মূসা: বাক্সটা খুলেছ?

রৌদ্রময়ী দ্রুত লিখল—

রৌদ্রময়ী: তুমি জানো বাক্সের ভেতরে কী আছে?

উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গেই।

আহমাদ মূসা: জানি। কিন্তু আমি চাই, এবার তুমি নিজের চোখে পড়ো।

রৌদ্রময়ী: তুমি কি সত্যিই সব জানো?

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর—

আহমাদ মূসা: সব জানলে তোমাকে এত বছর অপেক্ষা করতে হতো না।

রৌদ্রময়ী ফোনটা নামিয়ে বাক্সের তালা খুলল।

ভেতরে ছিল কয়েকটা হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ, কালো ফিতায় বাঁধা একটা চিঠির গোছা, আর নীল মলাটের একটি পাণ্ডুলিপি।

মলাটে বিবর্ণ কালিতে লেখা—

অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা

লেখকের নামের জায়গায় লেখা, আহমাদ মূসা।

কিন্তু পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতায় তারিখ দেখে রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

১৭ জুন, ১৯৯৮।

তার জন্মেরও আগে।

প্রথম পাতায় লেখা—

“এই গল্পের প্রথম নায়িকার নাম নাজনীন। সে এমন একজন মানুষকে ভালোবাসে, যার কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ সেই অস্তিত্বহীন মানুষটির জন্যই একদিন তাকে নিজের সন্তানকে পৃথিবী থেকে আড়াল করতে হবে।”

রৌদ্রময়ী থমকে গেল।

“মা…”

মা চোখ বন্ধ করলেন।

“নাজনীন কে?”

দীর্ঘ নীরবতার পর মা বললেন, “আরিফের মা।”

“কিন্তু আরিফ তো—”

“জানি। আরিফের মা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন।”

“তাহলে এই পাণ্ডুলিপি কে লিখেছে?”

মা এবার রৌদ্রময়ীর দিকে তাকালেন।

“সেটাই তো আমি আজও জানি না।”

১. যে নারী নিজের ছেলেকে ভয় পেতেন

পাণ্ডুলিপির পরের পাতাগুলোতে নাজনীনের গল্প লেখা ছিল।

১৯৯৮ সালে নাজনীন একটি পুরোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছোট ছেলে আরিফকে নিয়ে থাকতেন একা। লেখালেখির প্রতি তাঁর গভীর টান ছিল। রাতে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে তিনি ডায়েরিতে গল্প লিখতেন।

তাঁর গল্পের প্রধান চরিত্র ছিল একজন পুরুষ—আহমাদ মূসা।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নাজনীন কখনো আহমাদ মূসাকে নিজের কল্পনার চরিত্র বলে ভাবতেন না।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষটি কোথাও আছে।

কখনো চিঠিতে, কখনো পুরোনো বইয়ের ভাঁজে, কখনো আবার নিজের স্বপ্নে তিনি তার উপস্থিতি খুঁজে পেতেন।

পাণ্ডুলিপির একটি পাতায় লেখা—

“আহমাদ আজ আবার আমাকে বলেছে, আরিফকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখতে। সে বলেছে, ছেলেটি বড় হলে এমন একটি গল্প লিখবে, যে গল্প তার নিজের জীবনকেই শেষ করে দেবে।”

রৌদ্রময়ী পড়া থামিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।

“এটা কি সত্যি?”

“আমি জানি না।”

“তুমি আরিফের মাকে চিনতে?”

মা এবার ধীরে মাথা নাড়লেন।

“একবার দেখা হয়েছিল। তোর জন্মের কয়েক মাস আগে।”

“কোথায়?”

“হাসপাতালে।”

“কেন?”

মা উত্তর দেওয়ার আগেই ফোনে নতুন বার্তা এল।

আহমাদ মূসা: ১৯৯৮ সালের শেষ পাতাটা পড়ো।

রৌদ্রময়ী পাণ্ডুলিপির শেষ দিকের পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।

হঠাৎ একটা পাতা দেখে তার হাত থেমে গেল।

পাতার ওপরে বড় করে লেখা—

প্রথম নায়িকার মৃত্যু।

তার নিচে মাত্র কয়েকটি লাইন।

“নাজনীন জানত, তার মৃত্যু দুর্ঘটনা বলে লেখা হবে। কিন্তু সে মরতে চায়নি। সে শুধু চেয়েছিল, তার ছেলে যেন কোনোদিন আহমাদ মূসার অস্তিত্বে বিশ্বাস না করে।

তবু মৃত্যুর আগের রাতে সে নিজের ছেলের হাতে একটি নাম লিখে দিয়েছিল—রৌদ্রময়ী।”

রৌদ্রময়ী অনুভব করল, ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে।

“আমার নাম!”

মা উঠে দাঁড়ালেন।

“ওটা পড়া বন্ধ কর।”

“কেন? আমার নাম এখানে এল কীভাবে?”

“রৌদ্র, দয়া করে!”

“নাজনীন আমাকে চিনতেন? আমার জন্মের আগেই তিনি আমার নাম জানতেন?”

মায়ের চোখে জল এসে গেল।

“তোর নামটা আমি তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।”

রৌদ্রময়ী যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।

“কী বললে?”

মা কাঁপা গলায় বললেন, “তোর জন্মের আগে আমি নাজনীনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি তখন খুব অসুস্থ। আমাকে বলেছিলেন, মেয়ে হলে যেন তার নাম রাখি রৌদ্রময়ী।”

“কেন?”

“তিনি বলেছিলেন, এই নামটা একদিন একটা গল্পকে শেষ করবে।”

“কোন গল্প?”

মা উত্তর দিলেন না।

২. যে ছবিতে তিনজন মানুষ ছিল

রৌদ্রময়ী কালো বাক্সের ভেতর থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।

খামের ওপর লেখা—

নাজনীনের শেষ চিঠি।

চিঠিটা খুলতেই একটি ছবি মেঝেতে পড়ে গেল।

ছবিতে তিনজন মানুষ।

একজন তরুণী—সম্ভবত নাজনীন।

তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন অচেনা পুরুষ। মুখটা ছবিতে অস্পষ্ট, কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট।

আর তাদের মাঝখানে একটি ছোট ছেলে।

ছেলেটির হাতে ধরা একটি কাগজ। কাগজে লেখা—

আহমাদ মূসা।

রৌদ্রময়ী ছবিটা মায়ের সামনে ধরল।

“এই লোকটা কে?”

মা ছবির দিকে তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

“আমি জানি না।”

“তুমি মিথ্যে বলছ।”

“রৌদ্র—”

“তুমি সব জানো! আরিফের মা, আহমাদ মূসা, আমার নাম—সবকিছুর সঙ্গে তুমি জড়িত। শুধু আমাকে কিছু বলছ না!”

মা এবার ভেঙে পড়লেন।

“আমি তোকে হারাতে চাইনি!”

“কাকে হারানোর ভয় তোমার? আমাকে, নাকি আহমাদ মূসাকে?”

মা দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন।

রৌদ্রময়ী আর কথা বাড়াল না। সে চিঠিটা খুলল।

নাজনীনের হাতের লেখা কাঁপা কাঁপা।

“যে এই চিঠি পড়বে, তাকে বলছি—আহমাদ মূসাকে খুঁজতে যেয়ো না। কারণ সে মানুষ হলে তাকে খুঁজে পাওয়া যেত। সে যদি কেবল গল্প হতো, তাহলে তাকে এত ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না।

আমি জানি না সে কী। আমি শুধু জানি, সে আমার জীবনের এমন সব ঘটনা আগে থেকে লিখে রেখেছে, যেগুলো তখনো ঘটেনি।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো—সে আমার মৃত্যুর তারিখও লিখে রেখেছে।”

চিঠির শেষে একটি তারিখ।

২৮ অক্টোবর, ১৯৯৮।

রৌদ্রময়ীর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

২৮ অক্টোবর।

আরিফের দুর্ঘটনার তারিখও ছিল ২৮ অক্টোবর—২০১৯ সালে।

সে তাড়াতাড়ি ফোন তুলে আহমাদকে লিখল—

রৌদ্রময়ী: ২৮ অক্টোবরের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী?

উত্তর এল না।

সে আবার লিখল—

রৌদ্রময়ী: নাজনীন কীভাবে আমার নাম জানতেন?

এবারও নীরবতা।

তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি বাক্য।

আহমাদ মূসা: তোমার মা-ই শুধু নাজনীনের কাছ থেকে তোমার নাম পাননি।

রৌদ্রময়ীর আঙুল জমে গেল।

রৌদ্রময়ী: তাহলে আর কে?

উত্তর এল—

আহমাদ মূসা: আরিফ।

৩. সাত বছর আগের অসমাপ্ত বাক্য

রৌদ্রময়ী এবার পাণ্ডুলিপির প্রথম পাতায় ফিরে গেল।

পাতার নিচের কোণে পেন্সিলে ছোট করে কিছু লেখা ছিল, যা আগে তার চোখে পড়েনি।

“রৌদ্রময়ীকে যদি কখনো এই পাণ্ডুলিপি পড়তে দেওয়া হয়, তাহলে বুঝতে হবে—আরিফ ব্যর্থ হয়েছে।”

তার নিচে আরেকটি বাক্য।

“সে তাকে বাঁচাতে পারেনি।”

রৌদ্রময়ী চেয়ারে বসে পড়ল।

সাত বছর আগে আরিফের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল?

কেন তার নাম আরিফের মায়ের পাণ্ডুলিপিতে ছিল?

আর আহমাদ মূসা কেন বারবার তাকে বাঁচানোর কথা বলছে?

হঠাৎ তার মনে পড়ল, আরিফের সঙ্গে তোলা সেই ছবির পেছনে একটা তারিখ ছিল—২৮ অক্টোবর ২০১৯।

ছবিটা সে আবার বের করল।

এবার ছবির পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা একটি বাক্য দেখতে পেল।

“যদি আমি ফিরে না আসি, রৌদ্রময়ীকে বলবে—প্রথম মৃত্যুটা নাজনীনের ছিল না।”

তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

প্রথম মৃত্যুটা নাজনীনের ছিল না?

তাহলে কার?

ঠিক তখনই দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

টক। টক। টক।

রাত অনেক হয়েছে। এই সময় কেউ আসার কথা নয়।

মা আতঙ্কিত চোখে দরজার দিকে তাকালেন।

“কেউ দরজা খুলবি না।”

কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।

“রৌদ্রময়ী? আমি মাহতাব রহমান।”

রৌদ্রময়ী দরজা খুলতে যাচ্ছিল, মা তার হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন।

“না!”

“কেন?”

মা ফিসফিস করে বললেন—

“কারণ মাহতাব রহমান সাত বছর আগে মারা গেছেন।”

দরজার ওপাশে আবার কণ্ঠস্বর।

“রৌদ্রময়ী, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো। তোমার হাতে যে পাণ্ডুলিপি আছে, তার শেষ পাতাটা তুমি এখনো পড়োনি।”

রৌদ্রময়ীর ফোন কেঁপে উঠল।

আহমাদ মূসার বার্তা।

“দরজা খুলবে না। ও মাহতাব রহমান নয়।”

পরের বার্তাটি আসতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল।

“ও সেই মানুষ, যে ১৯৯৮ সালে নাজনীনকে মরতে দেখেছিল।”

দরজার ওপাশে এবার মৃদু হাসি শোনা গেল।

তারপর লোকটি বলল—

“রৌদ্রময়ী, তুমি কি জানতে চাও তোমার আসল বাবা কে?”

মায়ের হাত রৌদ্রময়ীর কবজি থেকে সরে গেল।

তিনি নিঃশব্দে মেঝেতে বসে পড়লেন।

আর দরজার ওপাশের মানুষটি শেষ কথাটা বলল—

“আমি আহমাদ মূসাকে চিনতাম, কারণ নাজনীনের মৃত্যুর রাতে… আমিই তার চরিত্রটাকে প্রথমবার খুন করেছিলাম।”

পরবর্তী পর্ব: যে মানুষটি মৃত হয়েও বেঁচে ছিল

দরজার ওপাশের লোকটি কে? মাহতাব রহমান কি সত্যিই মারা গেছেন? আর রৌদ্রময়ীর আসল বাবা—এই রহস্যের সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক?

পরের পর্বে খুলতে শুরু করবে সেই অধ্যায়, যেটা এত বছর ধরে কেউ পড়তে চায়নি।