পর্ব ৪ — মৃত মানুষের শেষ মেসেজ

“মৃত মানুষ কি ফিরে আসে? হয়তো না। কিন্তু তাদের অসমাপ্ত কথাগুলো কখনো কখনো এমন মানুষের কণ্ঠে ফিরে আসে, যার অস্তিত্বই কেউ স্বীকার করতে চায় না।”

১. মায়ের কাছে তিনটি প্রশ্ন

বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিট।

রৌদ্রময়ী বাড়ি ফিরেই মায়ের ঘরে ঢুকল।

তার হাতে সাত বছর আগের সেই ছবিটা। ছবিতে সে আর আরিফ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের মুখেই হাসি। ছবির পেছনে লেখা—

“২৮ অক্টোবর, ২০১৯। আমাদের গল্পের শেষ দিন নয়।”

মা জানালার পাশে বসে কাপড় ভাঁজ করছিলেন।

মেয়েকে দেখে থেমে গেলেন।

— কী হয়েছে?

রৌদ্রময়ী ছবিটা মায়ের সামনে রাখল।

— আরিফ কে ছিল?

মায়ের হাত থেকে কাপড়টা পড়ে গেল।

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর মা ধীরে ধীরে বললেন—

— তুই ওর কথা কোথায় শুনেছিস?

— আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।

— রৌদ্রময়ী...

— সাত বছর আগে কী হয়েছিল, মা?

মা চোখ নামিয়ে নিলেন।

রৌদ্রময়ী এবার কাঁপা গলায় বলল—

— আমি কি আরিফের মৃত্যুর জন্য দায়ী?

প্রশ্নটা শুনে মা যেন পাথর হয়ে গেলেন।

তারপর দ্রুত উঠে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

— না, মা! না! তুই কোনো কিছুর জন্য দায়ী না!

রৌদ্রময়ী মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে বলল—

— তাহলে আমার নাম কেন দুর্ঘটনার নথিতে আছে?

মায়ের চোখ বড় হয়ে গেল।

— কী বললি?

— আমি জানি, দুর্ঘটনার নথিতে আমার নাম ছিল। আরিফের সঙ্গে সেদিন রাতে আরেকজন ছিল। সেই মানুষটা আমি, তাই না?

মা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।

তিনি বিছানায় বসে পড়লেন। দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন।

রৌদ্রময়ী মায়ের পাশে বসে রইল।

অনেকক্ষণ পর মা বললেন—

— সেদিন রাতে তুই বাড়িতে ছিলি না।

— কোথায় ছিলাম?

— আরিফের সঙ্গে।

— কেন?

মা চোখ মুছে বললেন—

— কারণ তোরা দুজন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলি। এমন একটা সিদ্ধান্ত, যেটা আমাদের কারও নেওয়া উচিত ছিল না।

রৌদ্রময়ী মায়ের হাত ধরল।

— কী সিদ্ধান্ত?

মা উত্তর দেওয়ার আগেই ফোন বেজে উঠল।

অজানা নম্বর।

রৌদ্রময়ী কল ধরল।

ওপাশ থেকে একটা পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল—

— রৌদ্রময়ী? আমি মাহতাব বলছি।

— জি, বলুন।

— তুমি কি এখন তোমার মায়ের সঙ্গে আছ?

— হ্যাঁ।

— তাহলে ফোনটা স্পিকারে দাও। তোমাদের দুজনেরই একটা কথা শোনা দরকার।

রৌদ্রময়ী স্পিকার চালু করল।

মাহতাব রহমান বললেন—

— সাত বছর আগে যে দুর্ঘটনায় আরিফ মারা গিয়েছিল, সেই দুর্ঘটনার মূল নথিটা আমি খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু সেখানে এমন একটা তথ্য আছে, যা তোমাদের কেউ জানো না।

মা ফিসফিস করে বললেন—

— না... এটা হতে পারে না।

মাহতাব সাহেব থেমে গেলেন।

— আপনি কী জানেন? — রৌদ্রময়ী প্রশ্ন করল।

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

— দুর্ঘটনার সরকারি নথিতে আরিফের মৃত্যুর তারিখ ২৮ অক্টোবর, ২০১৯। কিন্তু তার মৃত্যুর তিন দিন পরও কেউ একজন তার অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজ পাঠিয়েছিল।

রৌদ্রময়ী স্থির হয়ে গেল।

— কে পাঠিয়েছিল?

— জানি না। তবে মেসেজটা আমি নিজে দেখেছি।

— মেসেজে কী লেখা ছিল?

মাহতাব রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— লেখা ছিল, “আমি মারা যাইনি। শুধু গল্প থেকে বেরিয়ে এসেছি।”

২. যে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়নি

সন্ধ্যা ৬টা ১২ মিনিট।

রৌদ্রময়ী নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপ খুলল।

মাহতাব রহমান তাকে একটা পুরোনো ইমেইল ঠিকানা দিয়েছেন। সেই ঠিকানায় একসময় আহমাদ মূসার গল্প আসত।

ইমেইল অ্যাকাউন্টটি এখনো চালু আছে কি না, জানা নেই।

তবু সে চেষ্টা করল।

লগইন পেজে একটা পুরোনো ব্যবহারকারীর নাম লেখা ছিল—

arif.writes

রৌদ্রময়ী নামটা দেখে থমকে গেল।

আরিফ।

তাহলে আহমাদ মূসা নামটা শুধু লেখক-নাম ছিল না। তার পেছনে সত্যিকারের একজন মানুষও ছিল।

সে পাসওয়ার্ড জানে না।

তবে পাসওয়ার্ড রিকভারি অপশনে ক্লিক করতেই একটা ইঙ্গিত এল—

Your first story's title.

তোমার প্রথম গল্পের নাম।

রৌদ্রময়ী চোখ বন্ধ করল।

তার নিজের ডায়েরির কথা মনে পড়ল।

“আমার না-বলা গল্প।”

সে নামটা লিখল।

ভুল।

আবার চেষ্টা করল—

“অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা।”

ভুল।

তারপর হঠাৎ একটা স্মৃতি মনে পড়ল।

স্কুলের লাইব্রেরি।

একটা ছেলে তার পাশে বসে আছে। ছেলেটা বলছে—

“তুই যদি কখনো প্রথম গল্প লিখিস, নাম রাখিস ‘শেষ পাঠক’। কারণ গল্পের শেষে সবাই চলে যায়, শুধু একজন পাঠক থেকে যায়।”

রৌদ্রময়ী দ্রুত টাইপ করল—

শেষ পাঠক।

স্ক্রিনে লেখা উঠল—

Password hint matched.

তারপর রিকভারি প্রক্রিয়া শুরু হলো।

কয়েক মিনিট পর ইমেইল খুলে গেল।

ইনবক্সে শত শত পুরোনো মেসেজ।

অধিকাংশই গল্প জমা দেওয়ার, সম্পাদনার, প্রকাশনার।

তারপর একটা নির্দিষ্ট তারিখে চোখ আটকে গেল।

৩১ অক্টোবর, ২০১৯।

প্রেরক: arif.writes

প্রাপক: mahtab.rahman

বিষয়: শেষ মেসেজ

রৌদ্রময়ীর হাত কাঁপতে লাগল।

সে মেসেজটা খুলল।

ভেতরে লেখা—

“মাহতাব ভাই,

যদি আপনি এই মেসেজটা পড়েন, তাহলে বুঝবেন আমি আমার গল্পটা শেষ করতে পেরেছি।

রৌদ্রময়ীকে বলবেন, সে যেন নিজেকে দোষ না দেয়। সেদিন যা ঘটেছিল, সেটা তার সিদ্ধান্ত ছিল না।

আর একটা কথা—আহমাদ মূসাকে কখনো বাস্তব মানুষ হিসেবে খুঁজবেন না। সে আমার নাম নয়, আমার মুখও নয়। সে এমন একটা চরিত্র, যাকে আমি তৈরি করেছি রৌদ্রময়ীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

যদি কোনোদিন সে আবার ফিরে আসে, তাহলে বুঝবেন রৌদ্রময়ী তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ে পৌঁছে গেছে।

তাকে বলবেন, গল্পটা যেন শেষ না করে।

— আরিফ”

রৌদ্রময়ী মেসেজটা দুবার পড়ল।

তিনবার পড়ল।

তারপর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

৩১ অক্টোবর।

আরিফের মৃত্যুর তিন দিন পর।

কিন্তু মেসেজে এমনভাবে লেখা, যেন সে বেঁচে আছে।

রৌদ্রময়ী ফোন তুলে আহমাদ মূসার প্রোফাইল খুঁজল।

কোনো ফলাফল নেই।

সে মেসেঞ্জার খুলে পুরোনো চ্যাটে লিখল—

রৌদ্রময়ী: আমি আরিফের ইমেইল পেয়েছি।

মেসেজটা পাঠানো হলো।

এক মিনিট পর উত্তর এল।

আহমাদ মূসা: তাহলে তুমি অবশেষে দরজাটা খুলেছ।

রৌদ্রময়ী: আপনি কি আরিফের তৈরি করা চরিত্র?

আহমাদ মূসা: হ্যাঁ।

রৌদ্রময়ী: তাহলে আপনি কীভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছেন?

উত্তর এল—

আহমাদ মূসা: এই প্রশ্নের উত্তর তোমাকে আমি দিতে পারব না।

রৌদ্রময়ী: কেন?

আহমাদ মূসা: কারণ আমি নিজেও জানি না, আমি কীভাবে ফিরে এসেছি।

রৌদ্রময়ী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রথমবারের মতো আহমাদ মূসার কথায় এমন কিছু ছিল, যা তার নিজের কাছেও অজানা।

হয়তো সে সত্যিই শুধু একটা কাল্পনিক চরিত্র।

কিন্তু তাহলে সাত বছর আগের ইমেইলে তার ফিরে আসার কথা লেখা ছিল কীভাবে?

৩. মৃত মানুষের ছবিতে যে ছায়া

রাত ৯টা ০৩ মিনিট।

মাহতাব রহমান রৌদ্রময়ীকে একটা ছবি পাঠালেন।

ছবিটা ছিল সাত বছর আগের একটা হাসপাতালের করিডরের।

দেয়ালে ঘড়ি।

ঘড়ির কাঁটা রাত ১টা ১৭ মিনিটে থেমে আছে।

একটা স্ট্রেচার।

আর স্ট্রেচারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষ।

একজন রৌদ্রময়ীর মা।

অন্যজন মাহতাব রহমান।

কিন্তু স্ট্রেচারে কে শুয়ে আছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

ছবির নিচে মাহতাব সাহেব লিখেছেন—

“এই ছবিটা দুর্ঘটনার রাতেই তোলা হয়েছিল। আমি এত দিন এটা তোমাকে দেখাইনি, কারণ ভেবেছিলাম, তুমি অতীত ভুলে গেছ।”

রৌদ্রময়ী ছবিটা বড় করল।

তারপর আরও বড় করল।

স্ট্রেচারের ওপর সাদা চাদর ঢাকা। চাদরের নিচে একজন মানুষের অবয়ব।

কিন্তু ছবির পেছনে, হাসপাতালের কাচের দরজায় একটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

একজন তরুণ।

কালো শার্ট পরা।

কবজিতে কালো সুতো।

রৌদ্রময়ীর শ্বাস আটকে গেল।

ছবির পেছনের মানুষটা আরিফের মতো দেখতে।

কিন্তু সে তো স্ট্রেচারের পাশে থাকার কথা নয়।

সে তো মারা গিয়েছিল!

রৌদ্রময়ী দ্রুত মাহতাব সাহেবকে ফোন করল।

— ছবিটা কে তুলেছিল?

— হাসপাতালের একজন কর্মী।

— আপনি কি নিশ্চিত, এটা ২৮ অক্টোবরের রাতের ছবি?

— হ্যাঁ।

— তাহলে কাচের দরজায় ওই মানুষটা কে?

ওপাশে নীরবতা।

— কোন মানুষ?

— পেছনে দাঁড়ানো ছেলেটা!

মাহতাব সাহেব কিছুক্ষণ পর বললেন—

— আমি তো কোনো ছেলেকে দেখছি না।

রৌদ্রময়ী আবার ছবিটা দেখল।

প্রতিফলনটা সেখানে আছে।

স্পষ্ট।

কালো শার্ট।

কালো সুতো।

আরিফের মুখ।

কিন্তু ছবিটা মাহতাব সাহেবের কাছে পাঠানোর পর তিনি বলছেন, সেখানে কোনো মানুষ নেই।

এটা কি তার চোখের ভুল?

নাকি ছবির ভেতরে এমন কিছু আছে, যা সবাই দেখতে পায় না?

ঠিক তখনই আহমাদ মূসার মেসেজ এল।

আহমাদ মূসা: ছবিটা মুছে ফেলো।

রৌদ্রময়ী লিখল—

রৌদ্রময়ী: কেন?

আহমাদ মূসা: কারণ ওটা দুর্ঘটনার ছবি নয়।

রৌদ্রময়ী: তাহলে কীসের ছবি?

উত্তর এল—

আহমাদ মূসা: আমার জন্মের ছবি।

রৌদ্রময়ী এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

রৌদ্রময়ী: আপনি তো একটা চরিত্র! আপনার জন্ম কীভাবে হয়?

আহমাদ মূসা: প্রতিটি চরিত্রের জন্ম হয় কোনো না কোনো মানুষের মনে।

রৌদ্রময়ী: তাহলে আপনার জন্ম কোথায় হয়েছিল?

অনেকক্ষণ পর উত্তর এল।

আহমাদ মূসা: তোমার মাথার ভেতরে।

৪. ২৮ অক্টোবর, রাত ১টা ১৭ মিনিট

রৌদ্রময়ী বিছানায় বসে পুরোনো ছবিটা দেখছিল।

তার মাথার ভেতরে টুকরো টুকরো স্মৃতি ভেসে উঠছে।

বৃষ্টি।

হাসপাতালের করিডর।

আরিফের কণ্ঠস্বর।

একটা সাদা দেয়াল।

আর একটা বাক্য—

“তুই যদি আমাকে ভুলে যাস, তাহলে আমার গল্পটা কে শেষ করবে?”

রৌদ্রময়ী দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল।

তার মনে হচ্ছে, স্মৃতির দরজাটা একটু একটু করে খুলছে।

কিন্তু প্রতিবার দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।

ফোনে আহমাদ মূসার মেসেজ এল।

আহমাদ মূসা: তুমি কি সেই রাতের কথা মনে করতে পারছ?

রৌদ্রময়ী লিখল—

রৌদ্রময়ী: একটু একটু করে।

আহমাদ মূসা: তাহলে আরেকটা কথা বলো। আরিফকে শেষবার তুমি কী বলেছিলে?

রৌদ্রময়ী চোখ বন্ধ করল।

স্মৃতিটা এবার আরও স্পষ্ট।

হাসপাতালের করিডর।

আরিফ একটা চেয়ারে বসে আছে।

তার হাতে একটা ডায়েরি।

রৌদ্রময়ী কাঁদছে।

আরিফ তার দিকে তাকিয়ে বলছে—

“তুই কাঁদিস না। তোর গল্পের শেষটা এখনো লেখা হয়নি।”

রৌদ্রময়ী উত্তর দিচ্ছে—

“তুই চলে গেলে আমি গল্প লিখব কীভাবে?”

আরিফ মৃদু হাসছে।

“তুই আমার জন্য লিখবি না। নিজের জন্য লিখবি।”

তারপর স্মৃতিটা হঠাৎ থেমে গেল।

রৌদ্রময়ী চোখ খুলল।

তার গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

সে লিখল—

রৌদ্রময়ী: আমি ওকে বলেছিলাম, ও চলে গেলে আমি আর কোনোদিন গল্প লিখব না।

উত্তর এল—

আহমাদ মূসা: আরিফ জানত, তুমি কথা রাখবে।

রৌদ্রময়ী: তাই কি আপনি ফিরে এসেছেন?

আহমাদ মূসা: আমি ফিরে আসিনি, রৌদ্রময়ী। তুমি আমাকে আবার লিখতে শুরু করেছ।

মেয়েটা থমকে গেল।

— আমি তো আপনাকে লিখিনি!

আহমাদ মূসা: তুমি যখন সাত বছর আগে আমার নাম লিখেছিলে, তখন আমি ছিলাম একটা কাগজের চরিত্র। তুমি যখন আমাকে ভুলে গেলে, তখন আমি হয়ে গেলাম একটা অসমাপ্ত গল্প। আর গত রাতে, যখন তুমি বেঁচে থাকার কারণ খুঁজছিলে, তখন তুমি আবার আমার কথা মনে করেছ।

রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে টাইপ করল—

রৌদ্রময়ী: আপনি কি আমার কল্পনা?

উত্তর এল—

আহমাদ মূসা: হয়তো।

রৌদ্রময়ী: তাহলে আপনি আমার এমন সব কথা জানেন কীভাবে, যেগুলো আমি নিজেও মনে করতে পারি না?

এবার উত্তর এল না।

বরং ফোনের স্ক্রিনে একটা পুরোনো মেসেজ ভেসে উঠল।

প্রেরক—আহমাদ মূসা।

তারিখ—৩১ অক্টোবর, ২০১৯।

কিন্তু এই মেসেজটা আগে চ্যাটে ছিল না।

লেখা—

“রৌদ্রময়ী, যদি তুমি কোনোদিন এই মেসেজ পড়ো, তাহলে জেনে রেখো—তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমাকে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে আমি এমন একটা সত্য জেনে গেছি, যেটা তোমার জানা উচিত নয়।”

রৌদ্রময়ী কাঁপা হাতে লিখল—

রৌদ্রময়ী: কী সত্য?

এবার উত্তর এল।

আহমাদ মূসা: আরিফ যেদিন মারা যায়, সেদিন তোমার পাশে আমি ছিলাম না।

রৌদ্রময়ী: তাহলে কে ছিল?

উত্তর এল—

আহমাদ মূসা: যে মানুষটা আরিফকে শেষবার দেখেছিল, সে আজও বেঁচে আছে।

রৌদ্রময়ী: কে সে?

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।

আহমাদ মূসা: তোমার মা।

রৌদ্রময়ী ফোনটা শক্ত করে ধরে রইল।

মায়ের মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।

সাত বছর ধরে যে মানুষটা তাকে আগলে রেখেছেন, তার কাছেই কি লুকিয়ে আছে আরিফের মৃত্যুর আসল রহস্য?

কিন্তু কেন?

মা কি আরিফের মৃত্যুর সাক্ষী ছিলেন?

নাকি এমন কিছু ঘটেছিল, যা জানলে রৌদ্রময়ী নিজের অতীতের দিকে আর আগের মতো তাকাতে পারবে না?

ঠিক তখনই দরজার বাইরে মায়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

— রৌদ্রময়ী, তুই জেগে আছিস?

সে উত্তর দিল না।

মা আবার ডাকলেন—

— মা, দরজাটা খোল। তোকে একটা কথা বলার আছে।

রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল।

দরজা খোলার আগেই ফোনে শেষ একটা মেসেজ এল।

আহমাদ মূসা: দরজা খোলার আগে তোমার মায়ের হাতে কী আছে, সেটা দেখে নিও।

রৌদ্রময়ী দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে তাকাল।

মায়ের পায়ের পাশে একটা পুরোনো কালো বাক্স।

বাক্সের ওপর সাদা কাগজে লেখা—

“আহমাদ মূসা — শেষ অধ্যায়।”

রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

মা দরজার ওপাশ থেকে বললেন—

“রৌদ্রময়ী, তুই যা-ই শুনিস, একটা কথা বিশ্বাস করিস। আমি তোকে বাঁচানোর জন্যই সবকিছু করেছি।”

মেয়েটা দরজার হাতলে হাত রাখল।

তারপর ধীরে ধীরে দরজা খুলল।

মায়ের চোখে পানি।

হাতে কালো বাক্স।

আর বাক্সের ভেতর থেকে ভেসে আসছে কাগজের মৃদু খসখস শব্দ।

মা কাঁপা গলায় বললেন—

“তোর জন্মের আগেই আহমাদ মূসার গল্প লেখা হয়েছিল, রৌদ্রময়ী।”

রৌদ্রময়ী স্থির হয়ে গেল।

— আমার জন্মের আগে?

মা মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। আর সেই গল্পের প্রথম নায়িকা তুই ছিলি না।

রৌদ্রময়ী ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—

— তাহলে প্রথম নায়িকা কে ছিল, মা?

মা বাক্সটা তার হাতে দিলেন।

তারপর বললেন—

“আরিফের মা।”

পর্ব ৫ — প্রথম নায়িকার মৃত্যু

কালো বাক্সের ভেতরে রৌদ্রময়ী খুঁজে পাবে এমন একটি পাণ্ডুলিপি, যার প্রথম পাতায় লেখা আছে ১৯৯৮ সাল। পাণ্ডুলিপির নায়িকা আরিফের মা, আর লেখকের নাম আহমাদ মূসা। কিন্তু সবচেয়ে অস্বাভাবিক তথ্যটি লুকিয়ে আছে শেষ পাতায়—সেখানে এমন একটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, যা ঘটেছিল রৌদ্রময়ীর জন্মের বহু বছর আগে, অথচ তার নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে যায় অবিশ্বাস্যভাবে।

চলবে...