পর্ব ৩ — ২৮ অক্টোবরের সেই রাত
“অতীত কখনো হারিয়ে যায় না। আমরা শুধু তার ওপর স্মৃতির একটা পর্দা টেনে রাখি। আর কোনো একদিন, অচেনা কারও একটা প্রশ্ন সেই পর্দা সরিয়ে দেয়।”
১. মায়ের চোখে যে ভয়
রাত ১টা ১২ মিনিট।
রৌদ্রময়ী ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে।
নীরব পাঠক: তোমার মা পুরো সত্য জানেন না।
একটা অপরিচিত অ্যাকাউন্ট। কোনো ছবি নেই, কোনো পরিচয় নেই। অথচ লোকটা এমনভাবে কথা বলছে, যেন রৌদ্রময়ীর পরিবারের বহু বছরের গোপন ইতিহাস তার জানা।
রৌদ্রময়ী লিখল—
রৌদ্রময়ী: আপনি কে?
মেসেজটা পৌঁছে গেল। কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
সে আবার লিখল—
রৌদ্রময়ী: আমার মাকে চেনেন?
কোনো উত্তর নেই।
রৌদ্রময়ী: আহমাদ মূসাকে চেনেন?
এবার স্ক্রিনে দেখা গেল, অপরিচিত অ্যাকাউন্টটি লিখছে।
তারপর থেমে গেল।
আবার লিখছে।
শেষ পর্যন্ত একটি উত্তর এল।
নীরব পাঠক: আহমাদ মূসাকে চেনার জন্য তাকে বাস্তবে দেখার প্রয়োজন হয় না।
রৌদ্রময়ী বিরক্ত হয়ে লিখল—
রৌদ্রময়ী: এসব ধাঁধা বন্ধ করুন। আপনি যদি কিছু জানেন, সরাসরি বলুন।
নীরব পাঠক: সরাসরি বললে তুমি বিশ্বাস করবে না।
রৌদ্রময়ী: চেষ্টা করে দেখুন।
নীরব পাঠক: তোমার কাছে কি একটা লাল মলাটের ডায়েরি আছে?
রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
রৌদ্রময়ী: আছে। কেন?
নীরব পাঠক: ডায়েরিটার শেষ পাতাটা খুঁজে দেখো। যেটা তোমার মা ছিঁড়ে ফেলেননি।
রৌদ্রময়ী সঙ্গে সঙ্গে ডায়েরিটা হাতে নিল।
আগের রাতে সে ডায়েরির শেষের দিকের কয়েকটা পাতা ছেঁড়া দেখেছিল। কিন্তু শেষ পাতা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখেনি।
এবার সে পাতাগুলো একে একে উল্টাতে লাগল।
প্রথম পাতা।
দ্বিতীয় পাতা।
তৃতীয় পাতা।
তারপর একেবারে শেষের দিকে একটা পাতা পেল, যেটা অন্য পাতাগুলোর সঙ্গে লেগে ছিল।
খুব সাবধানে সেটা আলাদা করতেই একটা ভাঁজ করা কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
কাগজটা হলদে হয়ে গেছে।
রৌদ্রময়ী তুলে খুলল।
সেখানে তার নিজের হাতের লেখায় লেখা—
“২৮ অক্টোবর, ২০১৯।
আজ আমি একটা গল্প লিখতে শুরু করেছি। গল্পের ছেলেটার নাম আহমাদ মূসা। সে এমন একজন মানুষ, যে কখনো কারও জীবনে আসবে না। কিন্তু আমি চাই, একদিন সে সত্যি হয়ে উঠুক।
যদি কখনো আমার জীবনে এমন একটা রাত আসে, যখন আমার মনে হবে আর বেঁচে থাকতে চাই না, তাহলে আমি চাই আহমাদ মূসা আমার সঙ্গে কথা বলুক।
সে যেন আমাকে বলে, আমার গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।”
রৌদ্রময়ীর হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।
সে লেখাটা আবার পড়ল।
তারপর আবার।
কাগজটা সাত বছর পুরোনো।
আর সাত বছর আগে সে নিজেই আহমাদ মূসা নামের একটা চরিত্র তৈরি করেছিল!
কিন্তু সে তো কিছুই মনে করতে পারে না।
কেন?
সেই রাতের কী এমন ঘটনা ঘটেছিল, যার কারণে তার স্মৃতি থেকে নিজের লেখা একটা গল্প পর্যন্ত মুছে গেছে?
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
— রৌদ্রময়ী?
মায়ের কণ্ঠস্বর।
রৌদ্রময়ী কাগজটা লুকিয়ে ফেলল।
— কী হয়েছে, মা?
— তুই এখনো ঘুমাসনি?
— না।
— দরজাটা খোল তো।
রৌদ্রময়ী দরজা খুলল।
মা ঘরে ঢুকেই টেবিলের ওপর রাখা লাল ডায়েরিটা দেখতে পেলেন।
তার মুখের রং বদলে গেল।
— এটা কোথায় পেলি?
— আলমারিতে ছিল।
মা ডায়েরিটা হাতে তুলে নিলেন। কয়েকটা পাতা উল্টে হঠাৎ থেমে গেলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন—
— তুই এটা আবার পড়েছিস?
রৌদ্রময়ী মায়ের চোখের দিকে তাকাল।
— মা, ২৮ অক্টোবর, ২০১৯-এর রাতে কী হয়েছিল?
মা স্থির হয়ে গেলেন।
কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বললেন না।
তারপর বললেন—
— তুই এসব কোথায় শুনেছিস?
— তুমি আমাকে উত্তর দাও।
— রৌদ্রময়ী, কিছু কিছু কথা ভুলে যাওয়াই ভালো।
— কেন? আমি কী ভুলে গেছি?
মায়ের চোখে পানি জমল।
— তুই সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলি।
— কীসের ভয়?
মা উত্তর দিলেন না।
শুধু ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরে বললেন—
— তুই যদি সত্যিই সব জানতে চাস, তাহলে আগে একটা কথা মনে রাখিস। সব সত্য মানুষকে মুক্তি দেয় না। কিছু সত্য মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।
রৌদ্রময়ী মায়ের হাত ধরল।
— আমি আর অন্ধকারে থাকতে চাই না, মা।
মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
— তাহলে কাল সকালে তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।
— কোথায়?
মা চোখ নামিয়ে বললেন—
— এমন একজন মানুষের কাছে, যে সাত বছর ধরে তোর অপেক্ষায় আছে।
২. যে লেখক সাত বছর ধরে লেখেননি
পরদিন সকাল।
রৌদ্রময়ী মায়ের সঙ্গে বের হলো।
শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে তারা একটা পুরোনো পাড়ায় পৌঁছাল। রাস্তার দুপাশে পুরোনো বাড়ি, মরচে ধরা গেট আর শ্যাওলা জমা দেয়াল।
একটা বাড়ির সামনে এসে মা থামলেন।
বাড়িটার গায়ে কোনো নামফলক নেই।
গেটের পাশে ছোট্ট একটা ঘণ্টা।
মা ঘণ্টা বাজালেন।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন একজন বয়স্ক লোক। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চোখে চশমা, পরনে সাদা পাঞ্জাবি।
মাকে দেখেই লোকটা যেন চিনতে পারলেন।
— আপনি?
মা মাথা নাড়লেন।
— অনেক দিন পর এলাম।
লোকটা রৌদ্রময়ীর দিকে তাকালেন।
তারপর খুব মনোযোগ দিয়ে মেয়েটার মুখ দেখলেন।
— এ-ই রৌদ্রময়ী?
মা উত্তর দিলেন—
— হ্যাঁ।
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—
— এত বড় হয়ে গেছে!
রৌদ্রময়ীর ভ্রু কুঁচকে গেল।
— আপনি আমাকে চেনেন?
লোকটা হালকা হাসলেন।
— তোমাকে চিনি না। কিন্তু তোমার লেখা চিনি।
রৌদ্রময়ী থমকে গেল।
লোকটা তাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন।
ঘরের ভেতরে ঢুকেই রৌদ্রময়ীর চোখে পড়ল বইয়ের তাক, পুরোনো কাগজপত্র আর দেয়ালে ঝোলানো একটা ঘড়ি।
ঘড়িটা বন্ধ।
কাঁটা থেমে আছে রাত ১টা ১৭ মিনিটে।
কেন জানি না, সময়টা দেখে রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
লোকটা একটা চেয়ার টেনে দিয়ে বললেন—
— বসো।
রৌদ্রময়ী বসল।
— আপনার নাম কী?
লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন—
— আমার নাম মাহতাব রহমান। একসময় লেখালেখি করতাম।
— আপনি কি আহমাদ মূসাকে চেনেন?
মাহতাব রহমানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কে বলেছে এই নাম?
— আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি।
লোকটা চুপ করে গেলেন।
এমন নীরবতা, যেন রৌদ্রময়ী কোনো অসম্ভব কথা বলে ফেলেছে।
তারপর তিনি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন—
— কোথায় কথা বলেছ?
— ফেসবুক মেসেঞ্জারে।
মাহতাব রহমান চোখ বন্ধ করলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন—
— তাহলে সে আবার ফিরে এসেছে।
রৌদ্রময়ী সামনে ঝুঁকে বসল।
— আপনি জানেন সে কে?
লোকটা উত্তর দিলেন না।
বরং উঠে গিয়ে একটা আলমারি খুললেন। ভেতর থেকে পুরোনো একটা ফাইল বের করলেন।
ফাইলটা টেবিলে রেখে বললেন—
— সাত বছর আগে একটা অনলাইন সাহিত্যপত্রিকায় আমি কাজ করতাম। সেখানে একজন তরুণ লেখক গল্প পাঠাত। তার লেখার নাম ছিল ‘অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা’।
রৌদ্রময়ী নিঃশ্বাস আটকে শুনতে লাগল।
— ছেলেটা খুব ভালো লিখত। কিন্তু তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। সে বলত, তার গল্পের চরিত্রগুলো কখনো কখনো এমন কথা বলে, যেগুলো সে নিজে লেখেনি।
— মানে?
— মানে, সে যখন গল্প লিখতে বসত, তখন চরিত্রগুলো তার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলত না। গল্পের মাঝখানে এমন কিছু ঘটনা ঘটত, যেগুলো সে আগে ভাবেনি।
রৌদ্রময়ী বলল—
— এসব তো লেখকদের কল্পনা হতে পারে।
মাহতাব মাথা নাড়লেন।
— আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম।
তিনি ফাইল খুললেন।
ভেতরে একটা পুরোনো কাগজ।
উপরে লেখা—
“অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা — প্রথম খসড়া।”
নিচে লেখকের নামের জায়গাটা ফাঁকা।
রৌদ্রময়ী কাগজটা হাতে নিল।
প্রথম কয়েকটা লাইন পড়তেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
কারণ লেখাটা হুবহু তার নিজের ডায়েরির ভাষার মতো।
একটা মেয়ের কথা লেখা আছে।
মেয়েটা ছোটবেলা থেকে গল্প লিখতে ভালোবাসে। তার মনে হয়, একদিন একটা কাল্পনিক চরিত্র তার জীবনে সত্যি হয়ে আসবে।
মেয়েটার নাম—
রৌদ্রময়ী।
সে কাঁপা গলায় বলল—
— এই গল্পটা কে লিখেছে?
মাহতাব রহমান তার দিকে তাকালেন।
— এটাই তো রহস্য।
— আপনি জানেন না?
— গল্পটা প্রথমবার আমার কাছে জমা পড়েছিল আহমাদ মূসা নামের একজন লেখকের কাছ থেকে। কিন্তু সেই নামের কোনো লেখককে আমরা কখনো খুঁজে পাইনি।
— তাহলে আপনি গল্পটা প্রকাশ করলেন কীভাবে?
মাহতাব রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
— গল্পটা আমার কাছে ইমেইলে এসেছিল। প্রেরকের নাম ছিল আহমাদ মূসা। কিন্তু ইমেইল ঠিকানাটা পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
রৌদ্রময়ী কাগজটার দিকে তাকাল।
— আর এই গল্পের নায়িকা আমি কেন?
মাহতাব রহমান এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— কারণ এই গল্পের প্রথম খসড়াটা তুমি নিজেই লিখেছিলে।
৩. লেখকের হাতের লেখা
রৌদ্রময়ী যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
— আমি?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু আমি তো কখনো এই গল্প লিখিনি!
মাহতাব রহমান ফাইল থেকে আরেকটা কাগজ বের করলেন।
— এই হাতের লেখাটা দেখো।
কাগজে একটা ছোট্ট অনুচ্ছেদ লেখা।
রৌদ্রময়ী প্রথমে বুঝতে পারল না।
তারপর নিজের ডায়েরির কাগজটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখল।
অক্ষরের বাঁক।
‘র’ লেখার ধরন।
‘ম’ অক্ষরের নিচের টান।
এমনকি শব্দের মাঝে অপ্রয়োজনীয় ফাঁক রাখার অভ্যাসটাও একই।
দুটো হাতের লেখা এক।
রৌদ্রময়ী ফিসফিস করে বলল—
— এটা অসম্ভব।
মাহতাব রহমান বললেন—
— সাত বছর আগে তোমার মা আমাকে ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন, তার মেয়ে একটা গল্প লিখেছে। গল্পটা পড়ে আমি যেন কাউকে না দেখাই।
— আমার মা আপনাকে চেনেন?
— তোমার মা আমার পরিচিত ছিলেন। তিনি জানতেন, আমি লেখালেখি করি। তাই তোমার লেখা কয়েকটা পাতা আমাকে দেখিয়েছিলেন।
রৌদ্রময়ী প্রশ্ন করল—
— তারপর?
— তারপর ২৮ অক্টোবর, ২০১৯-এর রাতে একটা ঘটনা ঘটে।
মাহতাব রহমানের গলা ভারী হয়ে এল।
— তোমার মা আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, তোমার সঙ্গে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। তুমি খুব অসুস্থ। তুমি বারবার একটা নাম বলছ—আহমাদ মূসা।
রৌদ্রময়ীর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
— কী দুর্ঘটনা?
— সেটা আমি জানি না। তোমার মা আমাকে বিস্তারিত বলেননি। শুধু বলেছিলেন, তোমার লেখা গল্পের সব কপি যেন আমি নষ্ট করে দিই।
— আপনি করেছিলেন?
মাহতাব রহমান চোখ নামিয়ে নিলেন।
— না।
রৌদ্রময়ী চমকে উঠল।
— কেন?
— কারণ আমি গল্পটা পড়েছিলাম। আর গল্পের শেষ পাতায় এমন একটা কথা লেখা ছিল, যা আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।
— কী কথা?
মাহতাব রহমান ফাইলের একেবারে নিচ থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন।
কাগজটা অন্যগুলোর চেয়ে বেশি পুরোনো।
তার ওপর লেখা—
“যদি কখনো আহমাদ মূসা সত্যি হয়ে ফিরে আসে, তাহলে বুঝতে হবে গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।”
রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
— এটা কি আমার লেখা?
— হ্যাঁ।
— আমি এটা কেন লিখব?
মাহতাব রহমান উত্তর দেওয়ার আগেই রৌদ্রময়ীর ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
সে কলটা ধরল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর।
আহমাদ মূসা।
— তুমি মাহতাব সাহেবের কাছে গিয়েছ?
রৌদ্রময়ী প্রায় চিৎকার করে উঠল—
— আপনি কে? আপনি কীভাবে জানলেন আমি এখানে?
— কারণ এই জায়গাটা আমারও চেনা।
— আপনি তো বলেছিলেন, আপনার বাস্তব অস্তিত্ব নেই!
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
— আমি বলেছিলাম, আমাকে বাস্তবে খুঁজে পাবে না।
— একই কথা!
— না, রৌদ্রময়ী। এক নয়।
রৌদ্রময়ী দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
— তাহলে সত্যিটা বলুন!
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর আহমাদ মূসা বলল—
— মাহতাব সাহেবকে জিজ্ঞেস করো, সাত বছর আগে তিনি শেষবার কাকে দেখেছিলেন।
রৌদ্রময়ী ফোনটা মাহতাব রহমানের দিকে বাড়িয়ে দিল।
মাহতাব সাহেব ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন।
তার মুখ ফ্যাকাশে।
— কে কথা বলছে? — তিনি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন।
রৌদ্রময়ী বলল—
— আহমাদ মূসা।
মাহতাব রহমান ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন—
— এটা সম্ভব নয়। ছেলেটা তো সাত বছর আগেই মারা গেছে।
৪. যে মানুষটা মারা গিয়েছিল
ঘরের ভেতরে নেমে এল অস্বাভাবিক নীরবতা।
রৌদ্রময়ী ফোনটা কানের কাছে ধরে আছে।
ওপাশে আহমাদ মূসা।
সামনে মাহতাব রহমান।
দুজনের কেউ কথা বলছে না।
অবশেষে রৌদ্রময়ী ফিসফিস করে বলল—
— কে মারা গেছে?
মাহতাব রহমান তার দিকে তাকালেন।
তার চোখে আতঙ্ক।
— আহমাদ মূসা নামে যে ছেলেটা গল্প লিখত, সে সাত বছর আগে মারা গেছে।
রৌদ্রময়ীর হাত কেঁপে উঠল।
— কীভাবে?
— ২৮ অক্টোবরের রাতে একটা দুর্ঘটনায়। তার আসল নাম ছিল অন্য কিছু। আহমাদ মূসা ছিল তার লেখক-নাম।
— তার আসল নাম কী?
মাহতাব রহমান ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন—
— আরিফ।
নামটা শুনে রৌদ্রময়ীর মনে হলো, মাথার ভেতর কোথাও একটা দরজা খুলে গেল।
আরিফ।
নামটা অচেনা নয়।
কোথায় যেন শুনেছে।
কোনো পুরোনো স্বপ্নে?
কোনো হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিতে?
সে চোখ বন্ধ করল।
একটা অস্পষ্ট দৃশ্য ভেসে উঠল।
স্কুলের বারান্দা।
বৃষ্টির শব্দ।
একটা ছেলে তার হাতে লাল মলাটের ডায়েরি তুলে দিচ্ছে।
ছেলেটা বলছে—
“তুমি গল্পটা শেষ কোরো না, রৌদ্রময়ী। শেষ করলে আমি আর থাকতে পারব না।”
রৌদ্রময়ী চোখ খুলে ফেলল।
তার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে।
— আমি ওকে দেখেছি।
মাহতাব রহমান এগিয়ে এলেন।
— কাকে?
— আরিফকে।
— কোথায়?
রৌদ্রময়ী উত্তর দিতে পারল না।
কারণ তার মনে পড়ছে না।
শুধু মনে হচ্ছে, ছেলেটা একসময় তার খুব কাছের কেউ ছিল।
এমন কেউ, যাকে সে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেনি—বরং যার অস্তিত্বটাই তার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।
ঠিক তখনই ফোনে আহমাদ মূসা বলল—
— রৌদ্রময়ী, তুমি কি এবার বুঝতে পারছ, কেন আমি তোমার কাছে এসেছি?
রৌদ্রময়ী কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— আপনি কি আরিফ?
ওপাশে নীরবতা।
তারপর উত্তর এল—
— আমি সেই গল্প, যেটা আরিফ শেষ করতে পারেনি।
কলটা কেটে গেল।
৫. শেষ পাতার আগের পাতা
মাহতাব রহমান টেবিলের ওপর হাত রেখে বসে পড়লেন।
— আমি ভেবেছিলাম, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
রৌদ্রময়ী তার সামনে এসে দাঁড়াল।
— আপনি কী লুকাচ্ছেন?
মাহতাব রহমান মাথা নাড়লেন।
— আমি যা জানি, তার সবটাই তোমাকে বলেছি।
— না। আপনি বলেছেন, আরিফ মারা গেছে। কিন্তু আমার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক ছিল, সেটা বলেননি।
মাহতাব রহমান চুপ করে গেলেন।
রৌদ্রময়ী আবার বলল—
— আমি কি তাকে চিনতাম?
— হ্যাঁ।
— কতটা চিনতাম?
লোকটা চোখ বন্ধ করলেন।
— যতটা একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে চিনতে পারে, যখন তারা একসঙ্গে একটা গল্প তৈরি করে।
রৌদ্রময়ী স্তব্ধ।
মাহতাব রহমান ফাইল থেকে আরেকটা পাতার কপি বের করলেন।
— এটা তোমার ডায়েরির শেষ পাতার আগের পাতা। তোমার মা আমাকে বলেছিলেন, এই পাতাটা যেন আমি কখনো তোমাকে না দেখাই।
রৌদ্রময়ী কাগজটা হাতে নিল।
সেখানে লেখা—
“আরিফ বলেছে, সে আমার গল্পের নায়ক হতে চায় না। সে চায়, আমি তাকে বাস্তব মানুষ হিসেবে মনে রাখি।
কিন্তু আমি তাকে বলেছি, বাস্তব মানুষদের সবাই একদিন ভুলে যায়। গল্পের চরিত্রদের কেউ ভুলতে পারে না।
আরিফ হেসে বলেছে, তাহলে আমাকে এমন একটা চরিত্র বানিও, যে তোমাকে কখনো একা ছেড়ে যাবে না।”
রৌদ্রময়ীর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে এবার মনে করতে পারছে।
একটা ছেলে ছিল।
যে তার গল্প পড়ত।
তার লেখা খারাপ হলে হাসত।
ভালো হলে বলত, “একদিন তোর বই বের হবে।”
ছেলেটা তার বন্ধু ছিল।
হয়তো তার চেয়েও বেশি কিছু।
কিন্তু সেই স্মৃতির পরেই একটা অন্ধকার।
একটা দুর্ঘটনা।
একটা রাত।
আর তারপর আরিফের নাম হারিয়ে যাওয়া।
রৌদ্রময়ী কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল—
— আরিফের দুর্ঘটনার রাতে আমি কোথায় ছিলাম?
মাহতাব রহমান কিছু বললেন না।
তিনি শুধু একটা ছোট্ট খাম তার দিকে এগিয়ে দিলেন।
— এটা তোমার মা রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তুমি যদি কোনোদিন নিজে থেকে সত্যিটা জানতে চাও, তখন যেন এটা তোমাকে দিই।
রৌদ্রময়ী খামটা খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।
ছবিতে দুজন কিশোর-কিশোরী দাঁড়িয়ে আছে।
মেয়েটা রৌদ্রময়ী।
ছেলেটা—
আরিফ।
ছবির পেছনে লেখা—
“২৮ অক্টোবর, ২০১৯। আমাদের গল্পের শেষ দিন নয়।”
রৌদ্রময়ী ছবিটা বুকে চেপে ধরল।
তারপর কাঁপা হাতে ফোনটা বের করল।
মেসেঞ্জারে আহমাদ মূসার চ্যাট খুলল।
শেষবারের মতো লিখল—
রৌদ্রময়ী: আরিফ, তুমি কি আমার ওপর রাগ করে আছ?
মেসেজটা পৌঁছে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।
আহমাদ মূসা: না।
রৌদ্রময়ী লিখল—
রৌদ্রময়ী: তাহলে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে কেন?
উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।
তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
“কারণ তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই সব ভুলে গিয়েছিলে।”
রৌদ্রময়ী নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
আরেকটা মেসেজ এল।
“২৮ অক্টোবর, ২০১৯-এর রাতের কথা মনে করার চেষ্টা কোরো না। সেই রাতটা মনে পড়লে তুমি শুধু আমাকে নয়, নিজেকেও হারিয়ে ফেলবে।”
রৌদ্রময়ী দ্রুত লিখল—
“আমি সত্য জানতে চাই।”
এবার উত্তর এল—
“তাহলে তোমার মাকে জিজ্ঞেস করো, সেদিন রাতে আরিফের সঙ্গে দুর্ঘটনায় আর কে ছিল।”
মেসেজটা পড়ার পর রৌদ্রময়ী স্থির হয়ে বসে রইল।
কারণ সাত বছর আগে সে শুনেছিল, আরিফ একটা দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
কিন্তু কেউ তাকে বলেনি—
সেই দুর্ঘটনায় আর কেউ ছিল কি না।
ফোনের স্ক্রিনে শেষ একটা নোটিফিকেশন এল।
নীরব পাঠক: এবার তোমার গল্পের আসল লেখককে খুঁজে বের করার সময় হয়েছে।
রৌদ্রময়ী উত্তর দেওয়ার আগেই অ্যাকাউন্টটা উধাও হয়ে গেল।
মাহতাব রহমান জানালার বাইরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন—
— হে আল্লাহ, এবার যেন আরেকটা মৃত্যু না ঘটে।
রৌদ্রময়ী তার দিকে তাকাল।
— আরেকটা মৃত্যু?
মাহতাব রহমান মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
কিন্তু ততক্ষণে কথাটা রৌদ্রময়ীর কানে পৌঁছে গেছে।
আরেকটা মৃত্যু।
তার মানে, সাত বছর আগের সেই রাতে শুধু আরিফের জীবনই শেষ হয়নি।
সেই রাতে এমন কিছু ঘটেছিল, যার সঙ্গে রৌদ্রময়ীর নিজের জীবনও জড়িয়ে আছে।
আর সেই সত্যটা এখনো কেউ তাকে বলেনি।
পর্ব ৪ — মৃত মানুষের শেষ মেসেজ
রৌদ্রময়ী এবার মায়ের মুখোমুখি হবে। সাত বছর আগের দুর্ঘটনার নথিতে সে এমন একটি নাম খুঁজে পাবে, যে নামটি তার নিজের। কিন্তু সরকারি নথি আর তার মায়ের বক্তব্যের মধ্যে থাকবে ভয়ংকর অসংগতি। আর ঠিক সেই রাতে আহমাদ মূসার ইনবক্সে আসবে একটি মেসেজ—যেটি পাঠানো হয়েছে আরিফের মৃত্যুর তিন দিন পর।
চলবে...

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।