পর্ব ১ • ইনবক্সের ওপাশে যে মানুষটা নেই
“পৃথিবীর সব মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই—কিন্তু কখনো কখনো এমন একজন মানুষ তোমার বিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার পৃথিবীতেই কোনো অস্তিত্ব নেই।”
রাত ২টা ১৭ মিনিট।
শহরের সমস্ত আলো তখনো নেভেনি। অথচ রৌদ্রময়ীর পৃথিবীতে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার।
জানালার বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। ঘরের বাতিটা নিভিয়ে বিছানার এক কোণে বসে আছে মেয়েটি। তার চোখের নিচে জমে থাকা কালি, এলোমেলো চুল আর ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা কিছু ছবি বলে দিচ্ছে—গত কয়েকটা রাত সে ঠিকমতো ঘুমায়নি।
ফোনের গ্যালারিতে একটা ছবি।
নীল শার্ট পরা একটা ছেলে। তার কাঁধে মাথা রেখে হাসছে রৌদ্রময়ী।
ছেলেটার নাম আরিশ।
তিন বছর ধরে যে ছেলেটাকে নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছে, যে ছেলেটার সঙ্গে সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখেছে, সেই ছেলেটাই আজ বিকেলে তাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছে।
“রৌদ্রময়ী, আমাদের আর একসঙ্গে থাকা সম্ভব না। প্লিজ, আমাকে খোঁজার চেষ্টা কোরো না। আমার জীবনে অন্য কেউ আছে।”
মাত্র তিনটি বাক্য।
অথচ এই তিনটি বাক্যেই একটা মেয়ের তিন বছরের ভালোবাসা, অসংখ্য রাতের অপেক্ষা আর অনাগত ভবিষ্যৎকে হত্যা করার ক্ষমতা ছিল।
রৌদ্রময়ী বারবার মেসেজটা পড়েছে। বারবার নিজেকে বুঝিয়েছে, নিশ্চয়ই কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে।
কিন্তু সন্ধ্যার পর আরিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে সে যখন অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে তার নতুন সম্পর্কের ঘোষণা দেখল, তখন আর কোনো ভুলের অবকাশ থাকল না।
ছবির নিচে আরিশ লিখেছে—
“Finally found my peace. ❤️”
রৌদ্রময়ী ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
এমন হাসি, যার মধ্যে আনন্দের কোনো চিহ্ন নেই।
— বাহ, আরিশ! তোমার শান্তি খুঁজে পেতে গিয়ে আমার পৃথিবীটাই অশান্ত করে দিলে?
কথাটা বলেই সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল।
তারপর চোখ তুলে তাকাল সিলিংয়ের দিকে।
কিছু মানুষ কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ে। আর কিছু মানুষ এত বেশি কাঁদে যে একসময় তাদের চোখের পানিও ফুরিয়ে যায়।
রৌদ্রময়ী দ্বিতীয় দলে পড়ে গেছে।
সে ফোনের নোটসে একটা লেখা খুলল।
লিখল—
“মা, আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। আমি অনেক চেষ্টা করেছি ভালো থাকতে। কিন্তু আর পারছি না। তোমার মেয়েটা বড্ড ক্লান্ত...”
এরপর আর লিখতে পারল না।
মায়ের মুখটা মনে পড়ল।
ছোটবেলায় জ্বর হলে যে মানুষটা সারারাত তার মাথায় পানি দিত, সেই মানুষটাকে সে কীভাবে একা রেখে যাবে?
রৌদ্রময়ী চোখ বন্ধ করল।
তারপরও বুকের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর উঠল—
“আর কতদিন এভাবে বেঁচে থাকবি?”
সেই কণ্ঠস্বরটা তার নিজের।
আর নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরের চেয়ে ভয়ংকর শত্রু বোধহয় পৃথিবীতে আর নেই।
ফোনটা হাতে নিয়ে সে শেষবারের মতো ফেসবুক খুলল।
কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা করছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোথাও কি এমন একজন মানুষ আছে, যে তাকে কোনো প্রশ্ন না করে তার কষ্টটা শুনবে?
এমন একজন, যে বলবে না—‘ভুলে যাও’।
এমন একজন, যে বলবে না—‘আরও ভালো কাউকে পেয়ে যাবে’।
এমন একজন, যে শুধু বলবে—
“কাঁদো। আমি শুনছি।”
ঠিক তখনই একটা নোটিফিকেশন এল।
New message request.
প্রেরকের নাম—আহমাদ মূসা।
রৌদ্রময়ী নামটা চিনল না।
প্রোফাইল ছবিতে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর সাদা অক্ষরে লেখা—
“Some people exist only to save a story.”
প্রোফাইলে ঢুকে সে আরও অবাক হলো।
বন্ধু মাত্র ১ জন।
কোনো ব্যক্তিগত ছবি নেই।
কোনো পোস্ট নেই।
জন্মতারিখ নেই।
কর্মস্থল নেই।
শুধু বায়োতে একটা বাক্য—
“আমি সেই মানুষ, যার সঙ্গে তোমার পরিচয় হওয়ার কথা ছিল না।”
রৌদ্রময়ী ভ্রু কুঁচকে হাসল।
— বাহ! আরেকজন দার্শনিক!
মেসেজ রিকোয়েস্ট খুলতেই দেখল, সেখানে মাত্র একটা লাইন লেখা।
আহমাদ মূসা: রৌদ্রময়ী, তুমি কি সত্যিই চলে যেতে চাও?
মেয়েটার হাসিটা মিলিয়ে গেল।
সে দ্রুত টাইপ করল—
রৌদ্রময়ী: আপনি কে?
উত্তর এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
আহমাদ মূসা: এমন একজন, যে তোমার গল্পের শেষটা এখনো পড়েনি।
রৌদ্রময়ী: আমার গল্প? আপনি আমাকে চেনেন?
আহমাদ মূসা: চিনি।
রৌদ্রময়ী: কীভাবে?
কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না।
তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
আহমাদ মূসা: কারণ তুমি যখন হাসতে, তখন তোমার ডান গালে ছোট্ট একটা টোল পড়ত। গত কয়েক মাসে তুমি আর একবারও মন খুলে হাসোনি।
রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
তার ডান গালে সত্যিই একটা টোল আছে।
কিন্তু এই তথ্য তো তার ফেসবুকের কোথাও লেখা নেই!
সে নিজের প্রোফাইলে ঢুকে ছবিগুলো দেখতে লাগল। পুরোনো কিছু ছবিতে টোলটা স্পষ্ট। হয়তো এই লোক সেগুলো দেখেছে।
নিজেকে বোঝাল সে।
তারপর লিখল—
রৌদ্রময়ী: আমার প্রোফাইল ঘেঁটে এসব বের করেছেন? আপনি কি আমাকে ফলো করেন?
আহমাদ মূসা: না।
রৌদ্রময়ী: তাহলে জানলেন কীভাবে?
আহমাদ মূসা: সবকিছুর উত্তর প্রথম রাতেই পেয়ে গেলে গল্পটা এগোবে কীভাবে?
রৌদ্রময়ী বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলল।
লোকটা হয় পাগল, নয়তো ভয়ংকর রকমের বিরক্তিকর।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবার ফোনটা হাতে তুলে নিল সে।
অদ্ভুতভাবে, লোকটার সঙ্গে কথা বলতে তার খারাপ লাগছিল না।
সে লিখল—
রৌদ্রময়ী: আপনি কি লেখক?
আহমাদ মূসা: লেখক হতে চেয়েছিলাম।
রৌদ্রময়ী: এখন কী করেন?
আহমাদ মূসা: মানুষকে গল্পের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি।
রৌদ্রময়ী: খুব অদ্ভুত কথা বলেন তো!
আহমাদ মূসা: তোমার রাতটাও তো স্বাভাবিক নয়।
মেয়েটা থমকে গেল।
তারপর লিখল—
রৌদ্রময়ী: আপনি আমার সম্পর্কে আসলে কী জানেন?
এবার উত্তর আসতে একটু বেশি সময় লাগল।
দশ সেকেন্ড।
বিশ সেকেন্ড।
এক মিনিট।
তারপর—
আহমাদ মূসা: জানি, আজ বিকেলে তুমি এমন একজন মানুষের কাছ থেকে বিদায় পেয়েছ, যার কাছে তুমি কখনো বিদায় চাওনি।
রৌদ্রময়ীর আঙুল থেমে গেল।
আহমাদ মূসা: জানি, তুমি নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারছ না। কারণ তুমি ভয় পাচ্ছ, মানুষ তোমার কষ্টকে ভালোবাসার দুর্বলতা বলে হাসাহাসি করবে।
রৌদ্রময়ীর চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
আহমাদ মূসা: আর এটাও জানি, এই মুহূর্তে তুমি ভাবছ—তোমার বেঁচে থাকার আর কোনো কারণ নেই।
মেয়েটা এবার সোজা হয়ে বসল।
তার হাত কাঁপছে।
রৌদ্রময়ী: আপনি কে? আমার ফোন ট্র্যাক করছেন?
আহমাদ মূসা: না।
রৌদ্রময়ী: তাহলে কীভাবে জানলেন আমি কী ভাবছি?
আহমাদ মূসা: কারণ কিছু কষ্ট মানুষের মুখে লেখা থাকে না, রৌদ্রময়ী। লেখা থাকে তাদের নীরবতায়।
মেয়েটা ফোনটা শক্ত করে ধরে রইল।
বাইরে তখন বৃষ্টি বেড়েছে।
অনেক দিন পর কেউ তার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছে, যেন তার কষ্টটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।
সে লিখল—
রৌদ্রময়ী: আপনি কি আমাকে বাঁচাতে এসেছেন?
উত্তরটা আসতে এবার মাত্র দুই সেকেন্ড লাগল।
আহমাদ মূসা: না।
রৌদ্রময়ী অবাক হলো।
আহমাদ মূসা: আমি তোমাকে বাঁচাতে আসিনি। আমি শুধু চাই, তুমি নিজেকে শেষ করে দেওয়ার আগে নিজের গল্পটা একবার পড়ে দেখো।
রৌদ্রময়ী: আমার গল্পে আর কিছু বাকি নেই।
আহমাদ মূসা: আছে।
রৌদ্রময়ী: কী আছে?
আহমাদ মূসা: একটা প্রশ্ন।
রৌদ্রময়ী: কী প্রশ্ন?
আহমাদ মূসা: আরিশ যদি তোমার জীবনের ভালোবাসা হয়ে থাকে, তাহলে তোমার জীবনের বাকি সব ভালোবাসার কী হবে?
রৌদ্রময়ী উত্তর দিতে পারল না।
লোকটা কথাটা এমনভাবে বলেছে, যেন তার ভেতরের কোনো বন্ধ দরজায় কেউ ধাক্কা দিয়েছে।
কয়েক মিনিট ধরে দুজনের আর কোনো কথা হলো না।
তারপর আহমাদ মূসা আবার লিখল—
আহমাদ মূসা: একটা কাজ করবে?
রৌদ্রময়ী: কী?
আহমাদ মূসা: আজ রাতে একা থেকো না। মায়ের কাছে যাও, অথবা বিশ্বাস করো এমন কাউকে ফোন করো। নিজের ক্ষতি করতে পারে এমন জিনিসগুলো থেকে দূরে থাকো। আর আমাকে একটা কথা দাও—এই রাতটা পার না করে তুমি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না।
রৌদ্রময়ী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
রৌদ্রময়ী: আপনি কি কালও থাকবেন?
উত্তর এল—
আহমাদ মূসা: তুমি যদি কাল সকাল পর্যন্ত থাকো, আমিও থাকব।
রৌদ্রময়ী অনেক দিন পর কাঁদল।
তবে এবারের কান্নায় শুধু কষ্ট ছিল না।
সামান্য একটা আশাও ছিল।
সে মাকে ফোন করল।
মা ফোন ধরতেই বলল, “কী হয়েছে, মা?”
রৌদ্রময়ী আর কিছু বলতে পারল না। শুধু কেঁদে বলল, “মা, তুমি একটু আমার কাছে আসবে?”
ওপাশ থেকে মা বললেন, “আমি আসছি, মা। তুই ফোনটা রাখিস না।”
সেই রাতে রৌদ্রময়ী আর একা থাকল না।
পরদিন সকাল ৮টা ১০ মিনিট
ঘুম ভাঙতেই রৌদ্রময়ী প্রথমে ফোনটা খুঁজল।
মেসেঞ্জার খুলে আহমাদ মূসার চ্যাটে ঢুকল।
সর্বশেষ মেসেজটা তখনো সেখানে আছে।
“তুমি যদি কাল সকাল পর্যন্ত থাকো, আমিও থাকব।”
মেয়েটা লিখল—
রৌদ্রময়ী: আমি আছি।
কোনো উত্তর এল না।
সে অপেক্ষা করল।
দশ মিনিট।
আধঘণ্টা।
এক ঘণ্টা।
কোনো উত্তর নেই।
রৌদ্রময়ী প্রোফাইলে ঢুকে দেখল, লোকটা অনলাইনে নেই।
শেষ সক্রিয় থাকার সময়ও দেখা যাচ্ছে না।
সে একটা মেসেজ পাঠাল—
রৌদ্রময়ী: আপনি কি ঘুমাচ্ছেন?
তারপর আরেকটা—
রৌদ্রময়ী: শুনছেন?
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো।
কোনো উত্তর এল না।
রৌদ্রময়ী এবার লোকটার প্রোফাইল ভালো করে পরীক্ষা করতে শুরু করল।
একজন মাত্র বন্ধু।
বন্ধুটার নাম—নীরব পাঠক।
প্রোফাইলটাও অদ্ভুত। কোনো ছবি নেই। কোনো পোস্ট নেই। প্রায় শূন্য একটা অ্যাকাউন্ট।
আহমাদ মূসার প্রোফাইলে ঢুকে রৌদ্রময়ী আরও একটা জিনিস লক্ষ করল।
প্রোফাইল তৈরির তারিখ—আজ থেকে ঠিক সাত বছর আগে।
অথচ কোনো পুরোনো কার্যকলাপ নেই।
কোনো কমেন্ট নেই।
কোনো লাইক নেই।
কিছুই নেই।
মেয়েটার কৌতূহল বাড়ল।
সে আহমাদ মূসার নাম লিখে ফেসবুকে সার্চ করল।
শত শত মানুষ এল।
কিন্তু এই মানুষটা এল না।
গুগলে সার্চ করল।
কোনো নির্ভরযোগ্য ফলাফল নেই।
তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল, গত রাতে লোকটা বলেছিল—
“লেখক হতে চেয়েছিলাম।”
রৌদ্রময়ী এবার অন্যভাবে সার্চ করল।
“আহমাদ মূসা লেখক”
কয়েকটা ফলাফল এল। কোনোটা অন্য মানুষের, কোনোটা অসংলগ্ন।
কিন্তু একদম নিচে একটা লিংক দেখে তার চোখ আটকে গেল।
একটা পুরোনো বাংলা গল্পের ওয়েবসাইট।
ওয়েবসাইটটার নাম—অলিখিত অধ্যায়।
লিংকের নিচে ছোট্ট একটা শিরোনাম—
“অস্তিত্বহীন আহমাদ মূসা: প্রথম খসড়া”
রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে লিংকটায় ক্লিক করল।
পাতাটা খুলতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।
তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল কিছু লাইন—
“আহমাদ মূসা এমন একজন মানুষ, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে একটি গল্পের প্রয়োজনে। সে মানুষের জীবনে আসে তখনই, যখন কোনো গল্প তার শেষ অধ্যায়ে পৌঁছাতে চায়।”
রৌদ্রময়ী নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়তে লাগল।
পাতার নিচে লেখকের নাম—
আহমাদ মূসা।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা ছিল অন্য কোথাও।
গল্পটার প্রকাশের তারিখ সাত বছর আগের।
আর তার নিচে লেখা ছিল—
“এই গল্পের নায়িকা রৌদ্রময়ী। যে একদিন ভালোবাসার মানুষের কাছে প্রতারিত হয়ে নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেবে। ঠিক সেই রাতে তার ইনবক্সে আসবে আহমাদ মূসা।”
রৌদ্রময়ীর হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তার নাম!
তার জীবনের ঘটনা!
তার গত রাতের কথা!
সবকিছু সাত বছর আগে লেখা একটা গল্পে কীভাবে থাকতে পারে?
এটা কি কোনো কাকতালীয় ঘটনা?
কেউ কি তাকে অনুসরণ করছে?
নাকি সে এমন একটা গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে, যেটা কেউ অনেক আগেই লিখে রেখেছে?
কাঁপা হাতে সে আবার মেসেঞ্জার খুলল।
আহমাদ মূসাকে লিখল—
রৌদ্রময়ী: আপনি আসলে কে?
এবার উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গেই।
আহমাদ মূসা: এবার কি বিশ্বাস হলো, আমি তোমাকে চিনি?
রৌদ্রময়ী লিখল—
রৌদ্রময়ী: আপনি কি মানুষ?
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একটা মেসেজ এল।
আহমাদ মূসা: এই প্রশ্নের উত্তর জানলে হয়তো তুমি আমার সঙ্গে আর কথা বলবে না।
রৌদ্রময়ী এবার লিখল—
রৌদ্রময়ী: ওই গল্পটা কে লিখেছে?
উত্তর এল—
আহমাদ মূসা: তুমি যার নাম জানতে চাইছ, সেই নামটাই আমার পরিচয়।
রৌদ্রময়ী স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শেষবারের মতো লিখল—
রৌদ্রময়ী: তাহলে আপনি কি নিজের গল্পের ভেতর থেকে আমার সঙ্গে কথা বলছেন?
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর আহমাদ মূসা একটা মেসেজ পাঠাল।
আহমাদ মূসা: রৌদ্রময়ী, একটা কথা মনে রেখো। মানুষ গল্প লেখে নিজের কল্পনা দিয়ে। কিন্তু কোনো কোনো গল্প একসময় তার লেখককেও লিখতে শুরু করে।
ঠিক তখনই ফোনের স্ক্রিনে একটা নতুন নোটিফিকেশন এল।
আহমাদ মূসা একটা ছবি পাঠিয়েছে।
ছবিটা খুলতেই রৌদ্রময়ীর বুকের রক্ত যেন জমে গেল।
ছবিতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় হাতে লেখা—
“লেখক: আহমাদ মূসা।”
আর পাতার নিচে তারিখ—
২৭ অক্টোবর, ২০১৯।
ডায়েরির পরের পাতায় একটা বাক্য।
“রৌদ্রময়ীর সঙ্গে আমার পরিচয় হবে ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ সালে। কিন্তু সে জানবে না, আমি তার গল্পের লেখক নই।”
রৌদ্রময়ী স্তব্ধ হয়ে গেল।
আজকের তারিখ ২৭ অক্টোবর, ২০২৬।
ঠিক সেই দিন, যেদিন সাত বছর আগের ডায়েরিতে তাদের পরিচয়ের কথা লেখা ছিল।
সে দ্রুত টাইপ করল—
রৌদ্রময়ী: আপনি যদি লেখক না হন, তাহলে কে?
মেসেজটা পড়া হলো।
আহমাদ মূসা উত্তর দিল না।
তার বদলে একটা নতুন মেসেজ এল।
আহমাদ মূসা: তোমার গল্পের লেখককে খুঁজে বের করো, রৌদ্রময়ী। তার সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমাকে বিশ্বাস কোরো না।
রৌদ্রময়ী: লেখক কোথায়?
এবার উত্তর আসতে প্রায় এক মিনিট লাগল।
তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
আহমাদ মূসা: তোমার গল্পের লেখক তোমার মতোই একজন মানুষ। তার নামও আহমাদ মূসা।
রৌদ্রময়ী: তাহলে আপনার সঙ্গে তার পার্থক্য কী?
শেষ মেসেজটা আসার পর রৌদ্রময়ী অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
আহমাদ মূসা লিখেছে—
“পার্থক্য শুধু একটাই। সে জানে, আমি তার কল্পনা। কিন্তু সে জানে না, আমি কীভাবে তার কল্পনার বাইরে চলে এসেছি।”
তারপর প্রোফাইলটা অফলাইনে চলে গেল।
আর কোনো মেসেজ এল না।
রৌদ্রময়ী জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
কিন্তু তার জীবনে এমন একটা ঝড় শুরু হয়েছে, যার শেষ কোথায়—সে জানে না।
শুধু একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরছে।
যে মানুষটার বাস্তব পৃথিবীতে কোনো অস্তিত্ব নেই, সে যদি সত্যিই তার ইনবক্সে এসে থাকে—তাহলে গত সাত বছর ধরে কে লিখে চলেছে তার জীবনের গল্প?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
আহমাদ মূসা কি সত্যিই অস্তিত্বহীন, নাকি তার অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য কেউ সাত বছর ধরে একটা গল্প লিখে চলেছে?
পরবর্তী পর্বে: বন্ধ প্রোফাইলের গোপন দরজা
পর্ব ২-এ রৌদ্রময়ী খুঁজবে সেই লেখককে, যার নাম আহমাদ মূসা। কিন্তু অনুসন্ধান করতে গিয়ে সে এমন একটি পুরোনো অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাবে, যেটি সাত বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর সেই অ্যাকাউন্টে থাকবে রৌদ্রময়ীর এমন একটি ছবি, যা সে জীবনে কখনো কাউকে দেখায়নি...
চলবে...

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।