পর্ব ৯: আহমাদ মূসার শেষ পরিচয়
১. দরজার ওপাশে কে?
চারদিকে অন্ধকার।
মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে সেই রহস্যময় দরজার সামনে। তার হাতে তিনটি ভাঙা চাবি।
দরজার ওপাশ থেকে আবার আহমাদের কণ্ঠ ভেসে এলো।
— মেহরিন, দরজা খোলো।
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,
— তুমি কি সত্যিই আহমাদ?
— হ্যাঁ।
— তাহলে বলো, আমাদের প্রথম দেখা কোথায় হয়েছিল?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর উত্তর এলো,
— পুরোনো লাইব্রেরিতে। তুমি মমের ইতিহাস খুঁজছিলে।
মেহরিন চোখ বন্ধ করল।
উত্তরটি ঠিক।
কিন্তু তার মনে হলো, কিছু একটা মিলছে না।
সে আবার জিজ্ঞেস করল,
— আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দিন তুমি আমাকে কী বলেছিলে?
দরজার ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
— তুমি বলেছিলে, ভালোবাসা কখনো কাউকে ধ্বংস করতে পারে না।
মেহরিনের চোখ খুলে গেল।
— মিথ্যা!
কারণ কথাটা আহমাদ বলেনি। বলেছিল মেহরিন নিজেই।
দরজার ওপাশ থেকে এবার ভয়ংকর হাসি শোনা গেল।
ডক্টর রাশেদ বলল,
— বুদ্ধিমতী মেয়ে! মনে রেখো, মম শুধু শরীর নয়, স্মৃতিও নকল করতে পারে।
মেহরিন পিছিয়ে গেল।
ঠিক তখনই তার সামনে একটি আয়না তৈরি হলো।
আয়নার ভেতরে আহমাদ দাঁড়িয়ে।
সে বলল,
— মেহরিন, এবার আমার কথা শোনো। তোমাকে আমার জন্মের সত্য জানতে হবে।
২. ১৭ অক্টোবর ১৯৯৮
আয়নার ভেতরে দৃশ্য বদলে গেল।
১৭ অক্টোবর ১৯৯৮।
একটি পুরোনো হাসপাতাল।
একজন নারী সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
শিশুটির নাম রাখা হলো আহমাদ মূসা।
কিন্তু জন্মের তিন মিনিট পর শিশুটির হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল।
চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও তাকে ফিরিয়ে আনতে পারলেন না।
শিশুটির বাবা ভেঙে পড়লেন।
তিনি শিশুটিকে বুকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও!
সেই সময় হাসপাতালের দরজায় এসে দাঁড়ালেন নূরজাহান।
তিনি বললেন,
— আমি তাকে ফিরিয়ে আনতে পারি।
শিশুটির বাবা তাকালেন।
— কী করতে হবে?
নূরজাহান উত্তর দিলেন,
— আপনার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটা আমাকে দিতে হবে।
লোকটি এক মুহূর্তও দেরি করলেন না।
— আমার সব স্মৃতি নিয়ে নিন। শুধু আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন।
নূরজাহান শিশুটির শরীরে মমের একটি ফোঁটা দিলেন।
কিছুক্ষণ পর শিশুটি চোখ খুলল।
কিন্তু তার চোখে ছিল অস্বাভাবিক সাদা আলো।
নূরজাহান ফিসফিস করে বললেন,
— ফিরে এসেছ, আহমাদ।
মেহরিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল।
— তাহলে আহমাদের বাবা নিজের স্মৃতি দিয়ে তাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন?
আয়নার ভেতর থেকে আহমাদ বলল,
— হ্যাঁ। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়।
৩. আহমাদের বাবা কে ছিলেন?
দৃশ্য আবার বদলে গেল।
হাসপাতালের একটি ঘরে শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে আছেন একজন পুরুষ।
মেহরিন লোকটিকে দেখে চমকে উঠল।
এই মুখ সে আগে দেখেছে।
অন্ধকার দরজার ওপাশে দাঁড়ানো সেই মানুষ।
ডক্টর রাশেদ!
মেহরিন চিৎকার করে উঠল,
— তুমি আহমাদের বাবা?
ডক্টর রাশেদ হাসল।
— আমি তার জৈবিক বাবা নই। কিন্তু আমার কারণেই সে পৃথিবীতে ফিরে এসেছিল।
— তুমি তার জন্য নিজের স্মৃতি দিয়েছিলে?
— না। আমি আমার স্মৃতি দিইনি। আমি দিয়েছিলাম অন্য একজনের স্মৃতি।
মেহরিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
— কার?
ডক্টর রাশেদ উত্তর দিল,
— নূরজাহানের।
মেহরিন স্তব্ধ।
ডক্টর রাশেদ বলতে লাগল,
— নূরজাহান আমাকে বিশ্বাস করেছিল। সে ভেবেছিল, মম দিয়ে মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যাবে। কিন্তু আমি জানতাম, এই পদার্থের ভেতরে একটা আত্মা বন্দি আছে। আমি সেই আত্মাকে মুক্ত করতে চেয়েছিলাম।
— কেন?
— কারণ আমি মৃত্যুকে ভয় পেতাম। আমি চেয়েছিলাম, পৃথিবীতে কেউ যেন আর মরতে না পারে।
মেহরিন বলল,
— আর সেই জন্য তুমি অসংখ্য মানুষকে মমের অভিশাপে ফেলেছ?
ডক্টর রাশেদ উত্তর দিল,
— আমি তাদের ধ্বংস করিনি। আমি তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করেছি।
মেহরিন কঠিন গলায় বলল,
— মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণ আর মানুষকে জীবন্ত কবর দেওয়া এক কথা নয়!
ডক্টর রাশেদ চুপ করে গেল।
৪. যে বিশ্বাসঘাতকতা সবকিছু বদলে দিয়েছিল
আয়নায় এবার আরেকটি দৃশ্য ফুটে উঠল।
নূরজাহান তার গবেষণাগারে দাঁড়িয়ে।
তার সামনে ডক্টর রাশেদ।
নূরজাহান বলছেন,
— এই পরীক্ষা বন্ধ করতে হবে। মম মানুষের আত্মা গ্রাস করছে।
রাশেদ হেসে বললেন,
— তুমি কি জানো, এই পদার্থ দিয়ে আমি কী করতে পারব?
— আমি জানি। তুমি নিজেকে অমর করতে চাও।
— শুধু আমি নই। পুরো পৃথিবীকে অমর করব।
নূরজাহান বললেন,
— অমরত্বের নামে মানুষকে ধ্বংস করতে দেব না।
রাশেদ তার হাতে থাকা কাচের পাত্রটি কেড়ে নিলেন।
তারপর নূরজাহানকে একটি ঘরে আটকে রাখলেন।
সেই ঘরের দরজায় লেখা ছিল—
মমের প্রথম কারাগার।
মেহরিন বুঝতে পারল, ডক্টর রাশেদই নূরজাহানকে বন্দি করেছিলেন।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেল—
নূরজাহান কীভাবে পরে আহমাদকে ফিরিয়ে আনলেন?
আহমাদ বলল,
— কারণ নূরজাহান মমের ভেতর থেকেও বেঁচে ছিলেন। তিনি নিজের স্মৃতি ব্যবহার করে আমাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
মেহরিন জিজ্ঞেস করল,
— আর তুমি কেন অভিশপ্ত হলে?
আহমাদ বলল,
— কারণ আমার শরীরে মমের প্রথম বীজ ছিল। আমি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বীজ জেগে উঠেছিল।
৫. মেহরিনের আসল পরিচয়
মেহরিনের সামনে এবার একটি পুরোনো ছবি ভেসে উঠল।
ছবিতে ছোট্ট একটি মেয়ে।
তার নাম লেখা—
মেহরিন। জন্ম: ১৮৯৮। মৃত্যু: ১৮৯৮।
মেহরিন কেঁপে উঠল।
— তাহলে আমার জন্ম ১৮৯৮ সালে?
আহমাদ বলল,
— হ্যাঁ। তুই নূরজাহানের মেয়ে ছিলি। কিন্তু জন্মের কিছুদিন পরই তোর মৃত্যু হয়েছিল।
— তাহলে আমি এতদিন কীভাবে বেঁচে ছিলাম?
— নূরজাহান তোকে মমের সাহায্যে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু তোর আত্মা সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসেনি। তোর স্মৃতি আর অনুভূতির একটা অংশ মমের ভেতরে রয়ে গিয়েছিল।
মেহরিন বলল,
— আর দ্বিতীয় মেহরিন?
— সে তোর হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ও অনুভূতির সমষ্টি। কিন্তু ডক্টর রাশেদ সেই অংশকে ব্যবহার করে নিজের আত্মার জন্য একটা নতুন শরীর তৈরি করেছে।
মেহরিন বুঝতে পারল, দ্বিতীয় মেহরিন আসলে পুরোপুরি শত্রু নয়।
সে তারই হারানো অংশ।
মেহরিন বলল,
— তাহলে তাকে ধ্বংস করলে আমার কী হবে?
আহমাদ উত্তর দিল,
— তোর স্মৃতি ফিরে আসবে। কিন্তু সেই সঙ্গে তুই নিজের মৃত্যুর সত্যটাও অনুভব করবি।
মেহরিন নীরব হয়ে গেল।
৬. আহমাদের শেষ সিদ্ধান্ত
আয়নার ভেতরে আহমাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
তার শরীরের কিছু অংশ মোমের মতো গলে যাচ্ছে।
মেহরিন চিৎকার করে বলল,
— তোমাকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় নেই?
আহমাদ বলল,
— আছে। কিন্তু সেই উপায়টা খুব কঠিন।
— কী করতে হবে?
— মমের হৃদয় ধ্বংস করতে হবে।
— কোথায় সেটা?
আহমাদ উত্তর দিল,
— ডক্টর রাশেদের বুকে।
মেহরিন স্তব্ধ।
— তাহলে তাকে হত্যা করতে হবে?
— না। তার শরীরের ভেতরে যে মমের মূল আত্মা বন্দি, সেটাকে মুক্ত করতে হবে।
— কীভাবে?
আহমাদ বলল,
— নূরজাহানের শেষ স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়ে।
মেহরিন বুঝতে পারল, ডক্টর রাশেদ নূরজাহানের স্মৃতি নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।
সেই স্মৃতিই মমের মূল শক্তি ধরে রেখেছে।
আহমাদ বলল,
— কিন্তু একটা বিপদ আছে।
— কী?
— মমের হৃদয় ধ্বংস হলে আমার শরীরও ভেঙে যাবে। কারণ আমার শরীরে সেই প্রথম বীজ রয়েছে।
মেহরিন কাঁদতে লাগল।
— তাহলে তোমাকে বাঁচানো যাবে না?
আহমাদ মৃদু হাসল।
— আমাকে বাঁচানোর জন্যই তো এতদিন চেষ্টা করেছ। এবার আমাকে মুক্তি দাও।
৭. ডক্টর রাশেদের শেষ ফাঁদ
হঠাৎ প্রাসাদের সব আলো নিভে গেল।
ডক্টর রাশেদের কণ্ঠ ভেসে এলো।
— মেহরিন, তুমি অনেক কিছু জেনে গেছ।
মেহরিন ঘুরে দাঁড়াল।
ডক্টর রাশেদ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
তার হাতে একটি কাচের পাত্র।
পাত্রের ভেতরে সাদা মোমের মতো কিছু একটা নড়ছে।
সে বলল,
— এর ভেতরে নূরজাহানের শেষ স্মৃতি বন্দি।
মেহরিন বলল,
— আমাকে সেটা দাও।
রাশেদ হাসল।
— অবশ্যই দেব। তবে তার আগে একটা কাজ করতে হবে।
— কী কাজ?
— আহমাদকে নিজের হাতে শেষ করতে হবে।
মেহরিন মাথা নাড়ল।
— না।
রাশেদ বলল,
— তাহলে এই স্মৃতি কোনোদিন পাবে না।
মেহরিন দৃঢ় গলায় বলল,
— আমি আর তোমার ফাঁদে পা দেব না।
রাশেদ হঠাৎ কাচের পাত্রটি মাটিতে ছুড়ে ফেলল।
পাত্র ভেঙে গেল।
তার ভেতর থেকে সাদা ধোঁয়া বেরিয়ে এসে পুরো প্রাসাদ ঢেকে দিল।
সেই ধোঁয়ার মধ্যে নূরজাহানের কণ্ঠ শোনা গেল—
— মেহরিন! মা, আমাকে ক্ষমা করো!
মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে সামনে এগিয়ে গেল।
কিন্তু ধোঁয়ার ভেতর থেকে একটি হাত বেরিয়ে এসে তার গলা চেপে ধরল।
রাশেদ ফিসফিস করে বলল,
— এবার তোর আত্মা আমার হবে।
৮. শেষ পর্বের আগে শেষ সত্য
মেহরিনের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
ঠিক তখনই তার বুকের ভেতর থেকে আহমাদের কণ্ঠ শোনা গেল।
— মেহরিন, আমার কথা মনে আছে?
মেহরিন কোনো উত্তর দিতে পারল না।
আহমাদ বলল,
— তুমি আমাকে একদিন বলেছিলে, ভালোবাসা কাউকে নিজের করে রাখার নাম নয়। ভালোবাসা হলো, তাকে মুক্ত করে দেওয়া।
মেহরিনের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে রাশেদের হাত সরিয়ে দিল।
তারপর চিৎকার করে বলল,
— আমি তোমাকে আর ভয় পাই না!
তার হাতে থাকা ভাঙা তিনটি চাবি একসঙ্গে জ্বলে উঠল।
একটি বিশাল আলো পুরো প্রাসাদকে ঢেকে ফেলল।
ডক্টর রাশেদ পিছিয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর থেকে একটি কালো হৃদয় বেরিয়ে এলো।
হৃদয়ের ভেতরে নূরজাহানের মুখ।
নূরজাহান কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— মেহরিন, আমাকে মুক্ত করো।
মেহরিন হাত বাড়াল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আহমাদের শরীর আয়নার ভেতরে সম্পূর্ণ গলে যেতে শুরু করল।
মেহরিন চিৎকার করে উঠল,
— আহমাদ!
আহমাদ শেষবারের মতো বলল,
— মেহরিন, মনে রেখো, আমি তোমাকে কখনো অভিশাপ দিইনি।
তারপর আয়না ভেঙে গেল।
মেহরিনের সামনে শুধু আহমাদের একটি আংটি পড়ে রইল।
সে আংটিটি হাতে তুলে নিল।
আংটির ভেতরে ছোট্ট করে খোদাই করা—
“১৭ অক্টোবর ১৯৯৮ — দ্বিতীয় জীবন।”
মেহরিন হঠাৎ বুঝতে পারল, আহমাদের দ্বিতীয় জীবন শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু তার প্রথম জীবনের রহস্য এখনো বাকি।
ডক্টর রাশেদ মাটিতে পড়ে হাসতে লাগল।
— তুমি এখনো বুঝতে পারোনি, মেহরিন!
মেহরিন তাকাল।
রাশেদ বলল,
— আহমাদ মূসা কোনো সাধারণ মানুষ নয়। সে আমার নিজের আত্মার একটি অংশ। তাকে ধ্বংস করলে আমিও মারা যাব। আর আমি মারা গেলে মমের সঙ্গে পৃথিবীর সব স্মৃতিও ধ্বংস হয়ে যাবে!
মেহরিন স্তব্ধ হয়ে গেল।
তাহলে আহমাদকে বাঁচানো মানে শুধু একজন মানুষকে বাঁচানো নয়।
পৃথিবীর সমস্ত স্মৃতিকে বাঁচানো।
ঠিক তখনই দূরে একটি ঘণ্টা বেজে উঠল।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
তারপর আকাশে লেখা ভেসে উঠল—
১৭ অক্টোবর ২০২৬।
মেহরিনের হাতে থাকা আংটিটি গরম হয়ে উঠল।
আংটির ভেতর থেকে আহমাদের ক্ষীণ কণ্ঠ শোনা গেল—
— মেহরিন, শেষবারের মতো আমার কাছে এসো।
চলবে...
পর্ব ১০: মম — শেষ ভালোবাসা
শেষ পর্বে প্রকাশ পাবে মমের অভিশাপের সম্পূর্ণ রহস্য। মেহরিনকে নিতে হবে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত—আহমাদকে ফিরিয়ে আনবে, নাকি পৃথিবীর কোটি মানুষের স্মৃতি রক্ষা করবে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: অভিশাপ ধ্বংস হলে কি ভালোবাসাও মুছে যাবে?

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।