পর্ব ৮: অভিশপ্ত রাজ্যের পথে
১. শেষ স্মৃতির দরজা
মেহরিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
দরজার ওপাশ থেকে তার নিজের কণ্ঠ ভেসে আসছে।
— এসো, মেহরিন। আর কতদিন পালাবে?
মেহরিন চোখ বন্ধ করল।
তার বুকের ভেতর থেকে আহমাদের কণ্ঠ শোনা গেল।
— দরজাটা খুলবে না। ওটা তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।
মেহরিন বলল,
— তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে চাই না।
আহমাদ উত্তর দিল,
— কিন্তু আমি চাই তুমি বেঁচে থাকো।
মেহরিন দরজার হাতল ঘুরিয়ে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের পৃথিবী বদলে গেল।
সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক অদ্ভুত রাজ্যে।
আকাশ রক্তের মতো লাল। গাছের পাতাগুলো সাদা। নদীতে পানি নয়, গলিত মোম প্রবাহিত হচ্ছে।
দূরে একটি বিশাল কালো প্রাসাদ।
প্রাসাদের ওপর লেখা—
মমের রাজ্য।
মেহরিন বুঝতে পারল, সে এমন এক জায়গায় এসেছে, যেখানে জীবিত আর মৃত মানুষের কোনো পার্থক্য নেই।
২. দ্বিতীয় মেহরিন
প্রাসাদের দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে সিংহাসনে বসে আছে একজন নারী।
তার মুখ মেহরিনের মতোই।
পোশাক কালো।
চোখ দুটি সাদা।
মেহরিন বলল,
— তুমি কে?
নারীটি হাসল।
— এতদিন পর নিজের পরিচয় ভুলে গেলে?
— তুমি কি দ্বিতীয় মেহরিন?
— হ্যাঁ। তবে আমি দ্বিতীয় নই। আমি প্রথম।
মেহরিন অবাক হলো।
— কী বলতে চাও?
নারীটি সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়াল।
— তুই যে মেহরিনকে নিজের জীবন বলে জানিস, সে আসলে আমার তৈরি স্মৃতি।
— মিথ্যা!
— তোর জন্ম, তোর মা, তোর শৈশব—সবই মমের তৈরি গল্প।
মেহরিন পিছিয়ে গেল।
নারীটি বলল,
— তুই কোনোদিন মানুষ ছিলি না, মেহরিন। তুই ছিলি একটা অসমাপ্ত আত্মা।
মেহরিনের চোখে পানি চলে এলো।
— তাহলে আহমাদ?
নারীটি হাসল।
— আহমাদ সত্যি। কিন্তু তুই তাকে যে ভালোবাসিস, সেই ভালোবাসাটাও আমার তৈরি।
৩. ১৮৯৮ সালের গোপন পরীক্ষা
দ্বিতীয় মেহরিন হাত তুলতেই প্রাসাদের দেয়ালে একটি দৃশ্য ভেসে উঠল।
১৮৯৮ সাল।
একটি গবেষণাগার।
সেখানে একজন নারী সাদা পোশাক পরে একটি কাচের পাত্রে সাদা পদার্থ তৈরি করছেন।
নারীটি নূরজাহান।
তার পাশে দাঁড়িয়ে এক তরুণ।
তরুণটি বলল,
— এই পদার্থ দিয়ে কি মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
নূরজাহান বললেন,
— সম্ভব। কিন্তু তার বিনিময়ে অন্য কারও স্মৃতি, অনুভূতি এবং আত্মা দিতে হবে।
তরুণটি জিজ্ঞেস করল,
— তাহলে প্রথম পরীক্ষাটা কার ওপর করবেন?
নূরজাহান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
— আমার নিজের মেয়ের ওপর।
মেহরিন কেঁপে উঠল।
দৃশ্য বদলে গেল।
একটি ছোট্ট শিশু বিছানায় শুয়ে আছে।
তার শরীর নিথর।
নূরজাহান শিশুটির পাশে বসে কাঁদছেন।
তিনি বললেন,
— মেহরিন, মা, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।
তারপর তিনি মম শিশুটির শরীরে প্রবেশ করালেন।
কিছুক্ষণ পর শিশুটি চোখ খুলল।
কিন্তু তার চোখে কোনো অনুভূতি নেই।
নূরজাহান আনন্দে কেঁদে উঠলেন।
ঠিক তখনই শিশুটি বলল,
— মা, আমি কে?
নূরজাহান স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
দৃশ্য শেষ হলো।
মেহরিন ফিসফিস করে বলল,
— তাহলে আমিই সেই শিশু?
দ্বিতীয় মেহরিন উত্তর দিল,
— হ্যাঁ। তুই নূরজাহানের মৃত মেয়ে। তোর শরীরে মম প্রবেশ করানোর পর তুই ফিরে এসেছিলি। কিন্তু তোর আত্মা সম্পূর্ণ ফিরে আসেনি।
৪. আহমাদের জন্মের সত্য
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,
— তাহলে আহমাদ আমার জীবনে এলো কীভাবে?
দ্বিতীয় মেহরিন বলল,
— আহমাদ ছিল সেই মানুষ, যে তোর অসমাপ্ত আত্মাকে সম্পূর্ণ করতে পারত।
— সে কি মানুষ ছিল?
— হ্যাঁ। তার জন্ম হয়েছিল ১৭ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে। কিন্তু জন্মের তিন মিনিট পর সে মারা যায়।
মেহরিনের চোখে পানি চলে এলো।
— তারপর?
— নূরজাহান তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এবার মমের প্রয়োজন ছিল এমন একজনের আত্মা, যে নিজের ভালোবাসা দিয়ে অন্যকে বাঁচাতে পারবে।
— তাই আহমাদকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল?
— ঠিক তাই।
মেহরিন বলল,
— তাহলে সে আমার সন্তান নয়?
দ্বিতীয় মেহরিন মাথা নাড়ল।
— না। সেই কথাটা ছিল মমের তৈরি মিথ্যা স্মৃতি। তোর মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে তোকে দুর্বল করার জন্য।
মেহরিনের বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল।
কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিতীয় মেহরিন বলল,
— তবে একটা সত্য এখনো বাকি।
— কী?
— আহমাদকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে তুই নিজেই তাকে অভিশাপ দিয়েছিলি।
৫. যে রাতে ভালোবাসা অভিশাপ হয়েছিল
দ্বিতীয় মেহরিন হাত বাড়াল।
মেহরিনের সামনে আরেকটি দৃশ্য ভেসে উঠল।
একটি পুরোনো ঘর।
আহমাদ বিছানায় শুয়ে আছে।
তার শরীরের ভেতর দিয়ে সাদা মোমের রেখা ছড়িয়ে পড়ছে।
মেহরিন তার হাত ধরে কাঁদছে।
আহমাদ বলছে,
— আমাকে ছেড়ে দাও, মেহরিন। আমি আর পারছি না।
মেহরিন উত্তর দিচ্ছে,
— না। তোমাকে আমি মরতে দেব না।
আহমাদ বলল,
— ভালোবাসা মানে কাউকে আটকে রাখা নয়।
কিন্তু মেহরিন নূরজাহানের তৈরি মমের পাত্র তুলে নিল।
সে বলল,
— তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও, আমি তোমাকে এমনভাবে ফিরিয়ে আনব, যেন মৃত্যু তোমাকে আর কখনো ছুঁতে না পারে।
তারপর সে আহমাদের বুকে মম ঢেলে দিল।
আহমাদের চোখ সাদা হয়ে গেল।
তারপর সে গলে যেতে শুরু করল।
দৃশ্য মিলিয়ে গেল।
মেহরিন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
— আমি... আমি নিজের হাতে আহমাদকে অভিশাপ দিয়েছিলাম!
দ্বিতীয় মেহরিন বলল,
— তুই তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলি। কিন্তু ভালোবাসার নামে তার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিলি।
মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি কীভাবে এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করব?
দ্বিতীয় মেহরিন বলল,
— আমাকে হত্যা করে।
৬. তৃতীয় চাবির মূল্য
প্রাসাদের মাঝখানে একটি কালো দরজা খুলে গেল।
দরজার ভেতরে একটি ছোট্ট কক্ষ।
সেখানে একটি কাচের বাক্সের মধ্যে তৃতীয় চাবি রাখা।
চাবিটি দেখতে সাদা, কিন্তু তার ভেতর লাল আলো জ্বলছে।
দ্বিতীয় মেহরিন বলল,
— এটাই তৃতীয় চাবি। নিজের আত্মার মৃত্যু।
মেহরিন বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু চাবির সামনে লেখা—
'যে নিজের আরেকটি অস্তিত্বকে হত্যা করতে পারবে, সে-ই মমের শেষ দরজা খুলতে পারবে।'
মেহরিন দ্বিতীয় মেহরিনের দিকে তাকাল।
— তোমাকে হত্যা করলে কি আহমাদ বেঁচে যাবে?
— হয়তো।
— আর তুমি?
দ্বিতীয় মেহরিন হেসে বলল,
— আমি তো তোরই অংশ। আমাকে হত্যা করলে তুইও আর আগের মতো থাকবি না।
মেহরিন বলল,
— আমি প্রস্তুত।
দ্বিতীয় মেহরিন এগিয়ে এলো।
— তাহলে আমাকে হত্যা কর।
মেহরিন হাত বাড়াল।
ঠিক তখনই তার বুকের ভেতর থেকে আহমাদের কণ্ঠ চিৎকার করে উঠল।
— না, মেহরিন! ওকে হত্যা করো না!
মেহরিন থমকে গেল।
— কেন?
আহমাদ বলল,
— কারণ ও-ই তোমার আত্মার শেষ অংশ!
৭. আসল শত্রু
দ্বিতীয় মেহরিন হঠাৎ হেসে উঠল।
তার হাসিতে পুরো প্রাসাদ কেঁপে উঠল।
— আহমাদ, তুমি এখনো সব বুঝতে পারোনি!
আহমাদের কণ্ঠ এবার আরও স্পষ্ট হলো।
— তুমি কে?
দ্বিতীয় মেহরিন বলল,
— আমি সেই মম, যার জন্য তোমাদের এত মৃত্যু।
মেহরিন চমকে উঠল।
— তুমি মম?
— আমি মমের মূল আত্মা। নূরজাহান আমাকে তৈরি করেনি। সে শুধু আমাকে জাগিয়ে তুলেছিল।
মেহরিন বলল,
— তাহলে মমের স্রষ্টা কে?
দ্বিতীয় মেহরিন ধীরে ধীরে নিজের মুখ বদলাতে লাগল।
তার মুখে এক বৃদ্ধ মানুষের অবয়ব ফুটে উঠল।
মেহরিন চিনতে পারল।
এ সেই অন্ধকার মানুষ, যে আয়নার জগতে এসেছিল।
সে বলল,
— অবশেষে চিনতে পেরেছ?
মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,
— তুমি কে?
বৃদ্ধ উত্তর দিল,
— আমি সেই মানুষ, যে ১৮৯৮ সালে নূরজাহানের গবেষণাগারে প্রথম মমের বীজ রেখে গিয়েছিল।
— তোমার নাম কী?
বৃদ্ধ হাসল।
— আমার নাম ছিল ডক্টর রাশেদ।
মেহরিন স্তব্ধ হয়ে গেল।
বৃদ্ধ বলল,
— আমি মৃত্যুকে হারাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নিজের আত্মাকে মমের মধ্যে বন্দি করে ফেলেছিলাম। এখন তোমাদের দুজনের ভালোবাসাই আমাকে মুক্ত করতে পারবে।
৮. শেষ যুদ্ধের শুরু
প্রাসাদের ছাদ ভেঙে পড়তে শুরু করল।
চারদিকে সাদা মোমের স্রোত।
মেহরিন বুঝতে পারল, মমের রাজ্য ধ্বংস হচ্ছে।
ডক্টর রাশেদ বলল,
— তৃতীয় চাবি নিয়ে নাও। তারপর আহমাদকে হত্যা করো। তাহলেই তুমি মুক্তি পাবে।
মেহরিন চাবির দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু হঠাৎ কাচের বাক্সের ভেতর থেকে একটি শিশুর হাত বেরিয়ে এলো।
মেহরিন চমকে উঠল।
বাক্সের ভেতরে একটি ছোট্ট মেয়ে।
তার মুখ মেহরিনের ছোটবেলার মতো।
মেয়েটি বলল,
— মা, আমাকে আবার মরতে দেবে?
মেহরিনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
— তুমি কে?
মেয়েটি উত্তর দিল,
— আমি তোমার সেই আত্মা, যাকে নূরজাহান ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
মেহরিনের মাথা ঘুরে গেল।
একই সময়ে আহমাদের কণ্ঠ ভেসে এলো—
— মেহরিন, মনে রেখো, মমকে ধ্বংস করার জন্য কাউকে হত্যা করতে হবে না। সত্যকে স্বীকার করতে হবে।
ডক্টর রাশেদ চিৎকার করে উঠল,
— চুপ করো!
তারপর সে মেহরিনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মেহরিনের হাতে থাকা প্রথম দুটি চাবি জ্বলে উঠল।
তৃতীয় চাবির বাক্স ভেঙে গেল।
চাবিটি নিজে থেকেই মেহরিনের হাতে চলে এলো।
তিনটি চাবি একত্রিত
কিন্তু চাবি হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেহরিনের শরীরের ভেতর থেকে সাদা আলো বের হতে লাগল।
আহমাদ চিৎকার করে বলল,
— মেহরিন! তোমার আত্মা মমের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে!
মেহরিন বলল,
— আমি আর পালাব না।
ডক্টর রাশেদ অট্টহাসি দিয়ে বলল,
— এবার তোকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না!
ঠিক তখনই প্রাসাদের দেয়ালে একটি নতুন দরজা দেখা গেল।
দরজার ওপরে লেখা—
'মমের হৃদয়: শেষ বিচার।'
দরজার ওপাশ থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
— মেহরিন, আমি তোমার মা।
মেহরিনের চোখ বড় হয়ে গেল।
সে তো এতদিন জানত, তার মা মারা গেছেন।
কণ্ঠটি আবার বলল,
— দরজা খোলো, মা। তোমার জন্য আমি ১২৮ বছর ধরে অপেক্ষা করছি।
মেহরিন দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু ডক্টর রাশেদ পেছন থেকে চিৎকার করে বলল,
— দরজা খুলবে না! ওপাশে তোর মা নেই। ওপাশে অপেক্ষা করছে সেই মানুষ, যে আমাকে মম বানাতে বাধ্য করেছিল!
মেহরিন থেমে গেল।
দরজার ওপাশ থেকে এবার আরেকটি কণ্ঠ ভেসে এলো।
সেটি আহমাদের কণ্ঠ।
— মেহরিন, আমি তোমার মা নই। আমি তোমার ভবিষ্যৎ!
মেহরিনের হাতে থাকা তিনটি চাবি একসঙ্গে ভেঙে গেল।
চারপাশ অন্ধকার।
তারপর একটি বাক্য ভেসে এলো—
'শেষ পর্বের আগে তোমাকে জানতে হবে, আহমাদ মূসা আসলে কে!'
চলবে...
পর্ব ৯: আহমাদ মূসার শেষ পরিচয়
পরের পর্বে প্রকাশ পাবে আহমাদের জন্মের প্রকৃত রহস্য, ডক্টর রাশেদের ভয়ংকর অতীত এবং মমের অভিশাপের পেছনে থাকা সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার সত্য।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।