পর্ব ৬: আয়নার ওপাশে আহমাদ
১. যে সত্য মেনে নেওয়া যায় না
মেহরিন মেঝেতে বসে আছে।
তার হাতে সেই পুরোনো ছবি।
ছবির পেছনে লেখা কথাগুলো বারবার পড়ছে।
'যাকে তুমি আহমাদ বলে খুঁজছ, সে তোমার নিজের সন্তান!'
মেহরিন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
সে বিড়বিড় করে বলল,
— এটা অসম্ভব! আহমাদ আমার সন্তান হতে পারে না। আমি তো কখনো মা হইনি!
হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
— তুই মা হয়েছিলি, মেহরিন।
মেহরিন ঘুরে তাকাল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আহমাদের বাবা।
কিন্তু এবার তার শরীর অক্ষত।
মেহরিন জিজ্ঞেস করল,
— আপনি আমাকে সব সত্য বলুন।
বৃদ্ধ বললেন,
— ১৯৯৮ সালের ১৭ অক্টোবর তুই একটি শিশুর জন্ম দিয়েছিলি। শিশুটির বাবা ছিল আহমাদ মূসা।
মেহরিন অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
— কিন্তু আহমাদ তো আমার জন্মের অনেক পরে পৃথিবীতে এসেছে!
— তুই সময়কে যেভাবে চিনিস, মমের জগতে সময় সেভাবে চলে না।
— তাহলে সেই শিশুটি কোথায়?
বৃদ্ধের চোখে পানি চলে এলো।
— সেই শিশুটিই এখন তোর খোঁজে মৃত্যুর ওপারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মেহরিনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি আমার সন্তানকে দেখতে চাই!
বৃদ্ধ বললেন,
— তাহলে তোকে আয়নার ওপাশে যেতে হবে।
২. আয়নার ভেতরের শহর
বৃদ্ধ মেহরিনকে নিয়ে গেলেন সেই পরিত্যক্ত বাড়িতে, যেখানে প্রথমবার আহমাদ নিজের প্রতিবিম্বের সঙ্গে কথা বলেছিল।
ঘরের মাঝখানে সেই বিশাল আয়না।
আয়নার চারপাশে অসংখ্য সাদা মোমবাতি জ্বলছে।
বৃদ্ধ বললেন,
— এই আয়নার ভেতরে একটা আলাদা পৃথিবী আছে। এখানে যারা প্রবেশ করে, তারা নিজেদের হারানো স্মৃতির সঙ্গে দেখা করে।
মেহরিন বলল,
— আহমাদ কি সেখানে আছে?
— আছে। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে আনতে হলে তোর নিজের অতীতের মুখোমুখি হতে হবে।
বৃদ্ধ একটি ছোট চাবি বের করলেন।
চাবির গায়ে লেখা—
M-1998
তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চাবিটি ঘোরালেন।
হঠাৎ আয়নার কাচ পানির মতো কেঁপে উঠল।
তারপর ভেতরে একটি দরজা তৈরি হলো।
মেহরিন পা বাড়াতেই বৃদ্ধ বললেন,
— একটা কথা মনে রাখিস। আয়নার ওপাশে কাউকে বিশ্বাস করবি না। এমনকি নিজেকেও না।
মেহরিন ভেতরে প্রবেশ করল।
দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল।
৩. নিজের অতীতের সঙ্গে দেখা
আয়নার ওপাশে প্রবেশ করেই মেহরিন অবাক হয়ে গেল।
এ যেন তার পরিচিত পৃথিবী।
কিন্তু সবকিছু উল্টো।
রাস্তার মানুষগুলো পেছন দিকে হাঁটছে।
ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরছে।
আকাশে সূর্যের বদলে একটি বিশাল কালো চাঁদ।
দূরে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি মেয়ে।
মেহরিন কাছে যেতেই মেয়েটি বলল,
— তুমি এত দেরি করলে কেন, মা?
মেহরিন থমকে গেল।
— তুমি কে?
মেয়েটি হাসল।
— তুমি আমাকে জন্ম দিয়েছিলে। তারপর ভুলে গিয়েছিলে।
মেহরিনের চোখে পানি চলে এলো।
— তুমি কি আমার সন্তান?
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ। আমার নাম ছিল আয়রা।
মেহরিন তাকে জড়িয়ে ধরতে গেল।
কিন্তু মেয়েটি পিছিয়ে গেল।
— আমাকে ছুঁয়ো না, মা। তোমার ভালোবাসা আমাকে আবার গলিয়ে দেবে।
মেহরিনের বুকের ভেতরটা ভেঙে গেল।
— আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
আয়রা বলল,
— তাহলে আহমাদকে খুঁজে বের করো। সে তোমাকে সব বলবে।
কথা শেষ হতেই মেয়েটি ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল।
মেঝেতে পড়ে রইল একটি ছোট্ট লাল ফিতা।
মেহরিন ফিতাটি তুলে নিল।
তার ওপর লেখা—
'আয়রার প্রথম জন্মদিন।'
৪. আয়নার বন্দি আহমাদ
অনেকক্ষণ হাঁটার পর মেহরিন একটা বিশাল ঘরের সামনে পৌঁছাল।
ঘরের ভেতরে শত শত আয়না।
প্রতিটি আয়নায় আলাদা আলাদা আহমাদ।
কোনো আয়নায় আহমাদ কাঁদছে।
কোনো আয়নায় আহমাদ হাসছে।
কোনো আয়নায় তার শরীর গলে যাচ্ছে।
আর একেবারে শেষ আয়নায় দাঁড়িয়ে আছে একজন যুবক।
মেহরিন তাকে দেখেই চিনতে পারল।
— আহমাদ!
যুবকটি চোখ তুলে তাকাল।
তারপর বলল,
— তুমি অবশেষে এসেছ!
মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে আয়নায় হাত রাখল।
— আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি।
আহমাদ বলল,
— আমাকে ফিরিয়ে নেওয়ার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।
— বলো।
— আমাদের মেয়ে আয়রা কোথায়?
মেহরিন চুপ করে গেল।
আহমাদ আবার বলল,
— তুমি কি তাকে মনে করতে পারছ?
মেহরিন চোখের পানি মুছে বলল,
— আমি আজ তাকে দেখেছি।
আহমাদের চোখ ভিজে উঠল।
— তাহলে তুই সব ভুলে গিয়েছিলি!
মেহরিন মাথা নিচু করল।
আহমাদ বলল,
— মেহরিন, আমাদের মেয়েকে বাঁচানোর জন্য তুই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলি, সেই সিদ্ধান্তই আজ আমাকে ধ্বংস করছে।
৫. আয়রার জন্মের আসল রহস্য
আহমাদ বলতে শুরু করল।
অনেক বছর আগে মেহরিন ও আহমাদ একসঙ্গে সুখের সংসার গড়েছিল।
তাদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।
নাম রাখা হয় আয়রা।
কিন্তু জন্মের কিছুদিন পরই আয়রা অদ্ভুত এক অসুখে আক্রান্ত হয়।
তার শরীরের কিছু অংশ মমের মতো সাদা হয়ে যাচ্ছিল।
চিকিৎসকেরা কিছু বুঝতে পারছিলেন না।
একদিন নূরজাহান এসে জানালেন,
— এই শিশুর শরীরে মমের অভিশাপ রয়েছে।
মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
— আমার মেয়েকে বাঁচান!
নূরজাহান বলেছিলেন,
— তাকে বাঁচানোর একটি উপায় আছে। কিন্তু বিনিময়ে কাউকে নিজের অস্তিত্ব দিতে হবে।
আহমাদ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গিয়েছিল।
সে বলেছিল,
— আমার জীবন নিয়ে নিন। শুধু আমার মেয়েকে বাঁচিয়ে দিন।
কিন্তু মেহরিন তা মানতে পারেনি।
সে গোপনে মমের মূল উৎসের কাছে গিয়ে নিজের অস্তিত্বের একটি অংশ উৎসর্গ করেছিল।
আয়রা বেঁচে গেল।
কিন্তু সেই উৎসর্গের কারণে মেহরিনের ভেতরে জন্ম নিল আরেকটি সত্তা।
সেই দ্বিতীয় মেহরিন।
আর আহমাদের জীবনে শুরু হলো অভিশাপের নতুন অধ্যায়।
আহমাদ বলল,
— তুই আমাদের মেয়েকে বাঁচিয়েছিলি। কিন্তু সেই সঙ্গে মমকে নতুন জীবন দিয়েছিলি।
মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি জানতাম না!
আহমাদ উত্তর দিল,
— জানতিস না, কিন্তু তোর সিদ্ধান্তের মূল্য আমাদের সবাইকে দিতে হয়েছে।
৬. যে মানুষটি আয়নার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল
হঠাৎ আয়নাগুলো একসঙ্গে কেঁপে উঠল।
সব আয়নায় একই দৃশ্য দেখা গেল।
একজন কালো পোশাকের মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
তার মুখ ঢাকা।
আহমাদ আতঙ্কিত হয়ে বলল,
— না! সে এখানে কীভাবে এলো?
মেহরিন জিজ্ঞেস করল,
— কে সে?
আহমাদ বলল,
— সে-ই মমের আসল স্রষ্টা।
মানুষটি ধীরে ধীরে মুখের কাপড় সরাল।
মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।
লোকটির মুখ আহমাদের বাবার মতো।
কিন্তু চোখ দুটি সম্পূর্ণ কালো।
সে হেসে বলল,
— অনেক দিন পর দেখা হলো, মেহরিন।
মেহরিন বলল,
— আপনি কে?
লোকটি উত্তর দিল,
— আমি সেই মানুষ, যে মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। নূরজাহান শুধু আমার গবেষণার বাহক ছিল।
— আপনি কী চান?
— আমার অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চাই।
— সেটা কী?
লোকটি এবার আহমাদের দিকে তাকাল।
— এই ছেলেটার শরীরে মমের প্রথম বীজ আছে। ওকে মুক্ত করলেই আমি মৃত্যুহীন হতে পারব।
মেহরিন চিৎকার করে বলল,
— আমি তা হতে দেব না!
লোকটি হেসে বলল,
— তুই কি জানিস, তোর নিজের শরীরেও আমার তৈরি অভিশাপ আছে?
মেহরিনের পায়ের নিচের মাটি গলে যেতে শুরু করল।
৭. আয়নার ভাঙন
আহমাদ আয়নার ভেতর থেকে চিৎকার করল,
— মেহরিন! দ্রুত এখান থেকে বেরিয়ে যাও!
মেহরিন বলল,
— তোমাকে ছাড়া আমি যাব না!
— আমার কথা শোনো। আয়নাটা ভেঙে ফেলো!
— তাহলে তুমি?
— আমি অন্য পথ খুঁজে নেব।
মেহরিন পাশের টেবিল থেকে একটি লোহার হাতুড়ি তুলে নিল।
সে আয়নার ওপর আঘাত করল।
প্রথম আঘাতে আয়নায় ফাটল ধরল।
দ্বিতীয় আঘাতে ফাটল আরও বড় হলো।
তৃতীয় আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে শত শত আয়না একসঙ্গে ভেঙে গেল।
ভয়ংকর শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।
মেহরিন মেঝেতে পড়ে গেল।
চোখ খুলে দেখল, সে আবার পুরোনো বাড়িতে ফিরে এসেছে।
তার হাতে আহমাদের হাতঘড়ি।
কিন্তু আহমাদ নেই।
বৃদ্ধ সালমা দৌড়ে এসে বললেন,
— তুই কী করেছিস?
মেহরিন বলল,
— আমি আয়নাটা ভেঙেছি।
সালমা আতঙ্কিত হয়ে বললেন,
— তাহলে তো মৃত্যুর দরজা খুলে গেছে!
ঠিক তখনই বাড়ির বাইরে হাজার মানুষের কান্না শোনা গেল।
জানালা দিয়ে তাকিয়ে মেহরিন দেখল, রাস্তার সব মানুষ একে একে সাদা মমে পরিণত হচ্ছে।
তাদের শরীর গলে যাচ্ছে।
শুধু একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
সে দূর থেকে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
সেই কালো পোশাকের মানুষ।
৮. শেষ দৃশ্য: সাত দিনের হিসাব
মেহরিন ছুটে বাইরে গেল।
লোকটি বলল,
— আয়নাটা ভেঙে তুই আমার কাজ আরও সহজ করে দিয়েছিস।
মেহরিন বলল,
— আহমাদকে কোথায় রেখেছ?
লোকটি হাসল।
— সে এখন আর আমার কাছে নেই।
— তাহলে কোথায়?
— সে তোর ভেতরে ফিরে আসছে।
মেহরিন নিজের বুকের দিকে তাকাল।
হঠাৎ তার হৃদস্পন্দন থেমে গেল।
তার বুকের ভেতর থেকে আহমাদের কণ্ঠ ভেসে এলো।
— মেহরিন! আমাকে বের করো!
মেহরিন চিৎকার করে উঠল।
কালো পোশাকের লোকটি বলল,
— সাত দিনের মধ্যে তুই যদি তিনটি চাবি সংগ্রহ করতে না পারিস, আহমাদ তোর শরীরের ভেতরেই চিরদিনের জন্য বন্দি হয়ে যাবে।
মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি তাকে বাঁচাবই!
লোকটি বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল,
— তাহলে প্রথমে সেই জায়গায় যা, যেখানে আগুন দিয়ে প্রথম মম তৈরি হয়েছিল।
হঠাৎ লোকটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
মেহরিন মাটিতে পড়ে থাকা একটা কাগজ তুলে নিল।
সেখানে লেখা—
'প্রথম চাবি: মৃত আগুনের পাহাড়।
দ্বিতীয় চাবি: রক্তের আয়না।
তৃতীয় চাবি: নিজের আত্মার মৃত্যু।'
ঠিক তখনই সালমা মেহরিনের কাঁধে হাত রাখলেন।
— তুই কি জানিস, মৃত আগুনের পাহাড় কোথায়?
মেহরিন মাথা নাড়ল।
সালমা ধীরে ধীরে বললেন,
— সেই জায়গার নাম কালাপাহাড়। সেখানে যারা যায়, তাদের কেউ ফিরে আসে না।
মেহরিন চোখ মুছে বলল,
— তাহলে আমিই প্রথম ফিরে আসব।
পর্ব ৬-এর শেষ রহস্য
এখন গল্পের সবচেয়ে ভয়ংকর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।
আয়রা কি সত্যিই বেঁচে আছে?
আহমাদ কি মেহরিনের শরীরের ভেতরে বন্দি?
মমের আসল স্রষ্টা কে?
কালো পোশাকের মানুষটির সঙ্গে আহমাদের বাবার সম্পর্ক কী?
মেহরিন কি নিজের আত্মা বিসর্জন না দিয়ে অভিশাপ ভাঙতে পারবে?
চলবে...
পর্ব ৭: শেষ স্মৃতির মৃত্যু
পরবর্তী পর্বে মেহরিন পৌঁছাবে কালাপাহাড়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে এমন একজনের দেখা পাবে, যাকে সে নিজের হাতে বহু বছর আগে কবর দিয়েছিল।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।