পর্ব ৫: ভালোবাসার অভিশাপ

১. একই মুখের দুই নারী

এতিমখানার অষ্টম ঘরে তখন অদ্ভুত এক নীরবতা।

মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানুষ।

একজন সেই মেহরিন, যাকে আহমাদ ভালোবেসেছে।

অন্যজন দেখতে অবিকল তার মতো, কিন্তু চোখে কোনো মায়া নেই।

দ্বিতীয় মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল,

— আমাকে চিনতে পারছিস না?

মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,

— তুমি কে?

— আমি তোর সেই অংশ, যেটাকে তুই নিজের ভেতর থেকে মুছে ফেলেছিলি।

— অসম্ভব!

— অসম্ভব? তাহলে বল, তুই কেন ১৭ অক্টোবর ১৯৯৮ তারিখটা ভুলে গেছিস?

মেহরিন মাথা চেপে ধরল।

হঠাৎ তার চোখের সামনে কিছু দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল।

একটি অন্ধকার ঘর।

একটি নবজাতক শিশু।

একজন নারী কাঁদছে।

আর সেই নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট মেহরিন।

শিশুটির কান্না থামছে না।

ছোট্ট মেহরিন শিশুটিকে কোলে নিয়ে বলছে,

— ভয় পেয়ো না, আহমাদ। আমি তোমাকে কখনো মরতে দেব না।

হঠাৎ দৃশ্যটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

মেহরিন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

দ্বিতীয় মেহরিন বলল,

— এবার মনে পড়েছে?

— না! আমি এসব কিছু করিনি!

— তুই করেছিলি। আর তোর সেই একটি ভুলের কারণেই পৃথিবীতে মমের অভিশাপ ছড়িয়ে পড়েছে।

২. মমের জন্মকথা

The Key: El Reto Mágico Kids | EscapeUp

দ্বিতীয় মেহরিন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।

অনেক বছর আগে, ১৮৯৮ সালে, মেহরিনের মা নূরজাহান ছিলেন একজন চিকিৎসক।

তিনি মানুষের শরীর নিয়ে গবেষণা করতেন।

তার স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি মৃত্যুকে পরাজিত করার উপায় খুঁজতে শুরু করেন।

বহু বছরের গবেষণার পর তিনি আবিষ্কার করেন এক অদ্ভুত সাদা পদার্থ।

এটি কোনো সাধারণ মোম ছিল না।

এটি মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি এবং আত্মার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারত।

তিনি এর নাম দেন—মম।

প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, এই পদার্থ দিয়ে মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

কিন্তু প্রথম পরীক্ষাতেই ভয়ংকর ঘটনা ঘটে।

একজন মৃত মানুষ চোখ খুলে তাকায়।

সে জীবিত হয় না।

বরং তার শরীর মোমের মতো গলতে থাকে।

আর তার স্মৃতি অন্য মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে।

নূরজাহান বুঝতে পারেন, তিনি জীবন সৃষ্টি করেননি।

তিনি সৃষ্টি করেছেন এমন এক অভিশাপ, যা ভালোবাসাকে ব্যবহার করে মানুষের অস্তিত্ব গ্রাস করে।

দ্বিতীয় মেহরিন বলল,

— মা যখন বুঝতে পারলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

মেহরিন জিজ্ঞেস করল,

— তাহলে আহমাদ কোথা থেকে এলো?

দ্বিতীয় মেহরিন উত্তর দিল,

— আহমাদ ছিল মায়ের শেষ পরীক্ষা।

৩. আহমাদ নামের শিশুটি

১৯৯৮ সালের ১৭ অক্টোবর।

একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে জন্ম নেয় একটি শিশু।

তার নাম রাখা হয় আহমাদ।

কিন্তু জন্মের মাত্র তিন মিনিট পর শিশুটি মারা যায়।

তার বাবা-মা শোকে পাগলপ্রায় হয়ে পড়েন।

ঠিক তখনই নূরজাহান তাদের সামনে হাজির হন।

তিনি বলেন,

— আমি আপনাদের সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারি।

শিশুটির বাবা-মা রাজি হয়ে যান।

কিন্তু নূরজাহান একটি শর্ত দেন।

শিশুটির জীবনের বিনিময়ে কাউকে তার সমস্ত ভালোবাসা উৎসর্গ করতে হবে।

সেদিন ছোট্ট মেহরিন এগিয়ে এসেছিল।

সে বলেছিল,

— আমি আহমাদকে আমার সব ভালোবাসা দিয়ে দেব।

নূরজাহান হাসলেন।

তারপর শিশুটিকে সাদা মমের মধ্যে শুইয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণ পর শিশুটি চোখ খুলল।

সে আবার শ্বাস নিতে শুরু করল।

কিন্তু কেউ বুঝতে পারেনি, শিশুটির শরীরে শুধু প্রাণ ফিরে আসেনি।

তার সঙ্গে প্রবেশ করেছে মমের অভিশাপ।

আর মেহরিনের ভালোবাসা হয়ে উঠেছে সেই অভিশাপের খাদ্য।

৪. প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা

মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— তাহলে আমি আহমাদকে বাঁচিয়েছিলাম!

দ্বিতীয় মেহরিন বলল,

— হ্যাঁ। কিন্তু তুই তাকে বাঁচিয়ে নিজের করে রাখতে চেয়েছিলি।

— আমি তাকে ভালোবাসতাম!

— আর সেই ভালোবাসার কারণেই সে ধীরে ধীরে গলতে শুরু করে।

মেহরিন মাথা নাড়ল।

— আমি তো তাকে কখনো আঘাত করিনি।

দ্বিতীয় মেহরিন এবার কঠিন গলায় বলল,

— তুই যখন প্রথমবার বুঝতে পারলি, আহমাদ তোকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না, তখন তুই তাকে মুক্তি দিতে পারতিস। কিন্তু তুই তা করিসনি।

— আমি কী করেছিলাম?

— তুই তার স্মৃতি থেকে নিজের অস্তিত্ব মুছে দিয়েছিলি। যাতে সে তোকে ভুলে গিয়ে অভিশাপ থেকে বাঁচতে পারে।

মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল।

দ্বিতীয় মেহরিন আবার বলল,

— কিন্তু তুই একটা ভুল করেছিলি। তার স্মৃতি মুছে গেলেও তার হৃদয় থেকে তোর প্রতি ভালোবাসা মুছে যায়নি।

সেই ভালোবাসাই আবার মমকে জাগিয়ে তুলেছে।

৫. আসল আহমাদের আবির্ভাব

হঠাৎ ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠল।

মেঝের নিচ থেকে সাদা ধোঁয়া বের হতে লাগল।

দূরে কোথাও একটা শিশুর কান্না শোনা গেল।

মেহরিন পেছনে তাকিয়ে দেখল, অষ্টম ঘরের দরজায় একজন দাঁড়িয়ে আছে।

আহমাদ!

কিন্তু এবার তার চেহারা অন্যরকম।

তার শরীর অক্ষত।

চোখে পরিচিত সেই দৃষ্টি।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

— মেহরিন!

মেহরিন ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

— আহমাদ! তুমি ফিরে এসেছ!

আহমাদ তার মাথায় হাত রেখে বলল,

— আমি তোমাকে অনেক খুঁজেছি।

মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— আর কখনো তোমাকে হারাতে চাই না।

আহমাদ মৃদু হাসল।

— তাহলে আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।

— কী প্রশ্ন?

— তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, নাকি আমার অস্তিত্বকে নিজের কাছে বন্দি করে রাখতে চাও?

মেহরিন কোনো উত্তর দিতে পারল না।

ঠিক তখনই দ্বিতীয় মেহরিন চিৎকার করে উঠল,

— ওর কাছ থেকে দূরে সরে যা!

আহমাদ ঘুরে তাকাল।

দ্বিতীয় মেহরিন বলল,

— মেহরিন, তুই যাকে জড়িয়ে ধরেছিস, সে আহমাদ নয়!

মেহরিনের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে আহমাদের মুখের দিকে তাকাল।

আহমাদ তখনো হাসছে।

কিন্তু তার চোখের মণি নেই।

শুধু সাদা মমের মতো দুটি ফাঁকা গর্ত।

৬. যে ভালোবাসা মানুষকে খেয়ে ফেলে

Waxen Muse — Melting Human Sculpture (HD Artistic Wallpaper) | 2560x1382 | Wallpaper Abyss

মেহরিন আহমাদের হাত ছেড়ে পিছিয়ে গেল।

আহমাদের মুখের চামড়া ধীরে ধীরে গলতে শুরু করল।

সে বলল,

— তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?

মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— তুমি কে?

আহমাদ উত্তর দিল,

— আমি তোমার ভালোবাসা।

— না!

— তুমি আমাকে নিজের করে রাখতে চেয়েছিলে। তাই আমি এখন তোমার ভেতরে থাকব।

হঠাৎ আহমাদের শরীর থেকে শত শত সাদা সুতো বেরিয়ে মেহরিনকে ঘিরে ধরল।

মেহরিন চিৎকার করে উঠল।

দ্বিতীয় মেহরিন তাকে টেনে সরিয়ে নিল।

কিন্তু ততক্ষণে তার বাঁ হাতের কিছু অংশ সাদা হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় মেহরিন বলল,

— এবার বুঝলি? মম ভালোবাসার রূপ নিয়ে আসে। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ভালোবাসাকে ধ্বংস করা।

মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— তাহলে আহমাদ কোথায়?

দ্বিতীয় মেহরিন বলল,

— যে আহমাদকে তুই খুঁজছিস, সে এখনো মৃত্যুর দরজার ওপাশে বন্দি।

৭. তিনটি চাবির রহস্য

হঠাৎ মেঝেতে একটা কালো বাক্স দেখা গেল।

বাক্সের ওপর তিনটি চিহ্ন।

একটি আগুনের।

একটি আয়নার।

আরেকটি হৃদয়ের।

দ্বিতীয় মেহরিন বলল,

— অভিশাপ ধ্বংস করতে হলে এই তিনটি চাবি খুঁজে বের করতে হবে।

মেহরিন জিজ্ঞেস করল,

— কোথায় পাব?

— প্রথম চাবি আছে সেই আগুনে, যেখানে মম তৈরি হয়েছিল।

— দ্বিতীয়টি?

— সেই আয়নায়, যেখানে প্রথম মানুষ নিজের অস্তিত্ব হারিয়েছিল।

— আর তৃতীয়টি?

দ্বিতীয় মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— তৃতীয় চাবি তোর নিজের হৃদয়ে।

মেহরিন অবাক হয়ে বলল,

— আমার হৃদয়ে?

— হ্যাঁ। কিন্তু সেটা বের করতে হলে তোকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটা বিসর্জন দিতে হবে।

— কোন স্মৃতি?

দ্বিতীয় মেহরিন উত্তর দিল,

— আহমাদের সঙ্গে কাটানো শেষ রাত।

মেহরিনের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।

৮. পর্বের শেষ রহস্য

ঠিক তখনই অষ্টম ঘরের দেয়ালে একটি বিশাল ফাটল দেখা দিল।

ফাটলের ভেতর থেকে একটা কালো হাত বেরিয়ে এলো।

তারপর শোনা গেল একজন বৃদ্ধের কণ্ঠ।

— মেহরিন, আর সময় নেই!

মেহরিন তাকিয়ে দেখল, দেয়ালের ওপাশে আহমাদের বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।

তিনি চিৎকার করে বললেন,

— তোর হাতে মাত্র সাত দিন সময় আছে। এর মধ্যে তিনটি চাবি খুঁজে না পেলে আহমাদ চিরদিনের জন্য মমের অংশ হয়ে যাবে!

মেহরিন বলল,

— আমি তাকে ফিরিয়ে আনব!

বৃদ্ধ বললেন,

— কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস। তৃতীয় চাবি বের করার পর তুই আর আগের মেহরিন থাকবি না।

মেহরিন জিজ্ঞেস করল,

— কেন?

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,

— কারণ তৃতীয় চাবিটা আসলে তোর হৃদয় নয়, তোর আত্মা।

হঠাৎ দেয়াল ভেঙে গেল।

সবকিছু অন্ধকার।

মেহরিন যখন চোখ খুলল, তখন সে একা।

তার সামনে পড়ে আছে একটা পুরোনো ছবি।

ছবিতে আহমাদ, মেহরিন এবং নূরজাহান।

কিন্তু এবার ছবিতে আরও একজন মানুষ দেখা যাচ্ছে।

সেই মানুষটি আহমাদের বাবা নন।

তিনি মেহরিনের মা নন।

তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আহমাদের ঠিক পেছনে।

ছবির পেছনে লেখা—

'মমের স্রষ্টা নূরজাহান নন। তিনি শুধু অভিশাপের প্রথম শিকার। আসল স্রষ্টা এখনো জীবিত।'

মেহরিনের হাত কেঁপে উঠল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি বার্তা এলো।

প্রেরক: আহমাদ মূসা।

বার্তায় লেখা—

'মেহরিন, যাকে তুমি মা বলে ডাকো, সে তোমার মা নয়। আর যাকে তুমি আহমাদ বলে খুঁজছ, সে তোমার নিজের সন্তান!'

মেহরিনের চোখের সামনে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল।

পর্ব ৫-এর শেষ রহস্য

এবার সবকিছু আরও জটিল হয়ে গেল।

  • আহমাদ কি সত্যিই মেহরিনের সন্তান?

  • নূরজাহান কি মমের স্রষ্টা, নাকি তিনিও কারও শিকার?

  • মেহরিনের দ্বিতীয় অস্তিত্ব কে সৃষ্টি করেছে?

  • আহমাদের বাবা কেন সাত দিনের সময়সীমা দিলেন?

  • আর ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মানুষটি কে?

চলবে...

পর্ব ৬: আয়নার ওপাশে আহমাদ

পরের পর্বে এমন একটি সত্য প্রকাশ পাবে, যা আহমাদ ও মেহরিনের সম্পর্কের পুরো ইতিহাস বদলে দেবে।