পর্ব ৪: মৃত মানুষের চিঠি

১. যে চিঠি মৃত্যুর পর আসে

রাত প্রায় তিনটা।

পুরোনো বাড়ির সব আয়নায় তখনো সেই অচেনা নারীর মুখ ভেসে আছে।

মেহরিন একদৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে।

তার মা আয়নার ভেতর থেকে হাসতে হাসতে বললেন,

— কী হলো, মেহরিন? নিজের সত্যটা শুনে ভয় পাচ্ছিস?

মেহরিন কাঁপা গলায় বলল,

— আমি আহমাদকে অভিশাপ দিইনি!

— দিয়েছিলি। শুধু তুই মনে রাখতে পারছিস না।

— আমি তাকে ভালোবাসি!

নারীটি এবার অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন।

— ভালোবাসা? তুই জানিস ভালোবাসার নামে কত মানুষকে মমের মধ্যে বন্দি করেছিস?

মেহরিনের চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল।

— আমার ভুলটা কী ছিল?

নারীটি বললেন,

— তুই মৃত্যুকে হারাতে চেয়েছিলি। আর সেই চেষ্টায় পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর অভিশাপ সৃষ্টি করেছিলি।

হঠাৎ আয়নার ভেতরের মুখটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

চারদিকে নীরবতা।

ঠিক তখনই দরজার নিচ দিয়ে একটা খাম ভেতরে ঢুকে এলো।

খামের ওপর লেখা—

প্রাপক: মেহরিন রহমান।

প্রেরক—

আহমাদ মূসা।

মেহরিনের বুক কেঁপে উঠল।

কারণ আহমাদ তো পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে!

২. মৃত আহমাদের চিঠি

মেহরিন কাঁপা হাতে খামটি খুলল।

ভেতরে একটা চিঠি।

লেখাগুলো আহমাদের হাতের লেখা।

'প্রিয় মেহরিন,

আমি জানি না, তুমি এই চিঠি কখন পড়বে।

হয়তো তখন আমি থাকব না।

তুমি আমাকে অনেক কিছু থেকে বাঁচিয়েছ। আবার অনেক কিছু থেকে দূরেও সরিয়ে দিয়েছ।

আমি জানি না, তুমি আমার জীবনের অভিশাপ, নাকি একমাত্র মুক্তি।

তবে একটা কথা বলতে চাই।

আমি তোমাকে ভয় পাই।

তোমার ভালোবাসাকে ভয় পাই।

কারণ তোমার চোখের দিকে তাকালেই মনে হয়, আমার জীবনের শেষ মুহূর্তটা আমি আগেও একবার দেখে ফেলেছি।

তবুও যদি কোনোদিন আমার অস্তিত্ব ফিরে আসে, তাহলে আমাকে আর মিথ্যা বলো না।

আমি সত্য জানতে চাই।

আর যদি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকো, তাহলে আমাকে বাঁচানোর আগে নিজেকে ক্ষমা করো।

— আহমাদ।'

চিঠির শেষ অংশে আরও একটি বাক্য লেখা।

'আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী মানুষটি তোমার খুব কাছেই আছে।'

মেহরিন চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।

তারপর ফিসফিস করে বলল,

— আহমাদ, তুমি কোথায়?

ঠিক তখনই ঘরের কোণে রাখা পুরোনো টেলিফোনটি বেজে উঠল।

ট্রিং! ট্রিং!

মেহরিন রিসিভার তুলল।

ওপাশ থেকে আহমাদের কণ্ঠ।

— মেহরিন!

মেহরিন চিৎকার করে উঠল,

— আহমাদ! তুমি কোথায়?

— আমি এমন একটা জায়গায় আছি, যেখানে সময় থেমে গেছে।

— তোমাকে ফিরিয়ে আনব আমি!

আহমাদ বলল,

— তাহলে আমার বাবাকে খুঁজে বের করো।

— তোমার বাবা তো...

— না, মেহরিন। আমার বাবা মারা যাননি। তিনি এখনো আমার অপেক্ষায় আছেন।

হঠাৎ ফোনের ওপাশ থেকে অন্য একজনের কণ্ঠ শোনা গেল।

— মেহরিন, ওকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করো না!

মেহরিন চমকে উঠল।

এ কণ্ঠ তার নিজের!

ফোনের লাইন কেটে গেল।

৩. যে বাড়িতে কেউ জন্মায় না

Le Pensionnat Saint-Antoine

পরদিন সকালে মেহরিন সালমার কাছে গেল।

আহমাদের বাবার খোঁজ জানতে চাইল।

সালমা প্রথমে কিছু বলতে চাইলেন না।

কিন্তু মেহরিন যখন আহমাদের চিঠিটা দেখাল, তখন বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— তোমাকে একটা জায়গায় যেতে হবে।

— কোথায়?

— সেই বাড়িতে, যেখানে আহমাদের জন্ম হয়েছিল।

মেহরিন অবাক হয়ে বলল,

— আহমাদের জন্ম তো হাসপাতালে হয়েছিল!

সালমা মাথা নাড়লেন।

— ওটাই সবাইকে বলা হয়েছিল। আসলে আহমাদের জন্ম হয়েছিল একটা পরিত্যক্ত এতিমখানায়।

— সেখানে কী হয়েছিল?

— ১৯৯৮ সালের ১৭ অক্টোবর সেই বাড়িতে একসঙ্গে সাতটি শিশু জন্মেছিল। কিন্তু সকাল হওয়ার আগেই সাতজনই নিখোঁজ হয়ে যায়।

— আহমাদ কি তাদের একজন?

সালমা উত্তর দিলেন,

— না। আহমাদ ছিল অষ্টম শিশু।

মেহরিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— অষ্টম শিশু কোথা থেকে এলো?

সালমা বললেন,

— মমের ভেতর থেকে।

৪. আট নম্বর ঘর

সন্ধ্যার আগে মেহরিন সেই এতিমখানায় পৌঁছাল।

বাড়ির সামনে একটা মরচে ধরা সাইনবোর্ড।

লেখা—

'শিশু আশ্রয়কেন্দ্র, প্রতিষ্ঠা ১৮৯৮।'

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ পেল।

পুরোনো মোম পোড়ার গন্ধ।

দেয়ালের পাশে আটটি দরজা।

প্রথম সাতটি দরজায় তালা ঝুলছে।

অষ্টম দরজাটি খোলা।

মেহরিন ভেতরে ঢুকল।

ঘরের মাঝখানে একটা ছোট্ট শিশুর বিছানা।

বিছানার পাশে কাঠের দোলনা।

আর দেয়ালে ঝুলছে একটা ছবি।

ছবিতে একজন নারী নবজাতক শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

মেহরিন ছবির নারীকে চিনতে পারল।

সে তার মা।

কিন্তু শিশুটির মুখ দেখে মেহরিনের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

শিশুটি আহমাদের মতো দেখতে।

ছবির নিচে লেখা—

'আহমাদ মূসা। জন্ম: ১৭ অক্টোবর ১৯৯৮। মৃত্যু: জন্মের তিন মিনিট পর।'

মেহরিনের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।

তাহলে যে আহমাদকে সে ভালোবেসেছে, সে কি জন্মের তিন মিনিট পরই মারা গিয়েছিল?

ঠিক তখনই দোলনাটি নিজে থেকেই দুলতে শুরু করল।

একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।

মেহরিন পিছনে তাকাল।

কেউ নেই।

শুধু দোলনার ভেতর একটা চিঠি পড়ে আছে।

চিঠিতে লেখা—

'মা, তুমি আমাকে কেন পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলে?'

৫. মায়ের গোপন পাপ

হঠাৎ ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

মেহরিনের সামনে তার মায়ের অবয়ব দেখা দিল।

এবার তিনি আয়নার ভেতরে নন।

সরাসরি ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন।

মেহরিন চিৎকার করে বলল,

— তুমি আমাকে সব সত্য বলোনি!

মা শান্তভাবে বললেন,

— সব সত্য জানার জন্য তুই এখনো প্রস্তুত নোস।

— আহমাদ কে?

— সে আমার সৃষ্টি নয়। সে আমার ভুলের ফল।

— তুমি তাকে কেন অভিশাপ দিয়েছ?

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— বহু বছর আগে আমি মৃত্যুকে হারাতে চেয়েছিলাম। আমার স্বামী মারা যাচ্ছিলেন। আমি তাকে বাঁচানোর জন্য এক অন্ধকার শক্তির কাছে সাহায্য চাই।

— তারপর?

— সেই শক্তি আমাকে একটা শর্ত দেয়। আমার ভালোবাসার বিনিময়ে আমাকে এমন এক শক্তি দেওয়া হবে, যা মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে।

মেহরিন বলল,

— সেই শক্তির নাম মম?

— হ্যাঁ। কিন্তু আমি বুঝিনি, মম কাউকে জীবন দেয় না। সে মানুষের ভালোবাসাকে বন্দি করে রাখে।

— তাহলে আহমাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?

মা এবার মেয়ের চোখে চোখ রেখে বললেন,

— আহমাদ ছিল সেই প্রথম মানুষ, যে মমের অভিশাপ ভাঙতে পারত। কিন্তু তুই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলি।

মেহরিন কেঁদে বলল,

— ভালোবাসা কি অপরাধ?

মা উত্তর দিলেন,

— অভিশপ্ত ভালোবাসা যখন কাউকে নিজের করে রাখতে চায়, তখন সেটাই অপরাধ হয়ে ওঠে।

৬. মৃত বাবার সন্ধান

মেহরিন জানতে পারল, আহমাদের বাবা এখনো সেই এতিমখানার নিচে কোথাও বন্দি।

সে ঘরের পেছনের দেয়ালে একটা ছোট দরজা দেখতে পেল।

দরজার গায়ে লেখা—

৮/৮ — শেষ অভিভাবক।

দরজা খুলতেই নিচের দিকে নামা একটি সিঁড়ি দেখা গেল।

মেহরিন নিচে নামল।

সিঁড়ির শেষ প্রান্তে একটা বিশাল কক্ষ।

কক্ষের মাঝখানে কাচের বাক্স।

বাক্সের ভেতরে একজন পুরুষ শুয়ে আছেন।

আহমাদের বাবা।

মেহরিন কাচে হাত রাখতেই লোকটি চোখ খুললেন।

— মেহরিন?

— চাচা! আপনি এখানে?

আহমাদের বাবা বললেন,

— আমাকে বের করো না। আমি বের হলে মম আবার জেগে উঠবে।

— আহমাদ কোথায়?

বৃদ্ধের চোখে পানি চলে এলো।

— সে এখন মৃত্যুর দরজার ওপাশে।

— তাকে কীভাবে ফিরিয়ে আনব?

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— তিনটি জিনিস খুঁজে বের করতে হবে।

— কী কী?

— প্রথমটি, যে আগুনে মম তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয়টি, যে আয়নায় প্রথম অভিশাপ বন্দি হয়েছিল। তৃতীয়টি, যে মানুষ নিজের অস্তিত্ব দিয়ে অভিশাপকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

মেহরিন জিজ্ঞেস করল,

— তৃতীয় মানুষটি কে?

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

— সময় হলে তুই নিজেই বুঝতে পারবি।

৭. শেষ চিঠির শেষ লাইন

মেহরিন আবার ওপরে ফিরে এলো।

তার হাতে আহমাদের সেই চিঠি।

হঠাৎ চিঠির কাগজে নতুন লেখা ফুটে উঠল।

সে অবাক হয়ে পড়তে শুরু করল।

'মেহরিন,

তুমি হয়তো ভাবছ, আমি তোমাকে চিঠিটা লিখেছি।

কিন্তু এই চিঠি আমি লিখিনি।

এটা লিখেছে সেই মানুষ, যে আমার ভেতরে বন্দি।

সে তোমাকে একটা কথা জানাতে চায়।

যেদিন তুমি মমের অভিশাপ ভাঙতে যাবে, সেদিন তোমাকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হত্যা করতে হবে।

আর সেই মানুষটি...

তুমি নিজেই।'

মেহরিনের হাত থেকে চিঠি পড়ে গেল।

ঠিক তখনই এতিমখানার সব ঘড়ি একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

দেয়ালে ঝুলন্ত ছবিগুলো থেকে মানুষের মুখ হারিয়ে যেতে শুরু করল।

আর অষ্টম ঘরের দরজায় একজন দাঁড়িয়ে আছে।

আহমাদ!

কিন্তু তার শরীর স্বাভাবিক নয়।

মুখের অর্ধেক গলে গেছে।

চোখ দুটো ফাঁকা।

সে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

— তুমি আমাকে খুঁজতে এসেছ?

মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে গেল।

— হ্যাঁ, আহমাদ!

আহমাদ হেসে বলল,

— তাহলে এবার আমাকে মেরে ফেলো।

মেহরিন থমকে গেল।

— কী বলছ?

আহমাদ নিজের বুকের দিকে আঙুল তুলে বলল,

— কারণ আমি আর আহমাদ নই। আমি মমের প্রথম সন্তান।

হঠাৎ তার পেছনে অন্ধকার থেকে আরেকটি অবয়ব বেরিয়ে এলো।

সেই অবয়বটি দেখতে হুবহু মেহরিনের মতো।

কিন্তু তার চোখে কোনো মায়া নেই।

সে মৃদু হেসে বলল,

— অবশেষে আমাদের দেখা হলো, মেহরিন।

মেহরিন অবাক হয়ে বলল,

— তুমি কে?

অবয়বটি উত্তর দিল,

— আমি সেই মেহরিন, যে আহমাদকে প্রথমবার হত্যা করেছিল।

পর্ব ৪-এর শেষ রহস্য

এখন প্রশ্ন চারটি—

1. আহমাদ কি সত্যিই মমের প্রথম সন্তান?

2. মেহরিনের আরেকটি অস্তিত্ব কোথা থেকে এলো?

3. আহমাদকে প্রথমবার কে হত্যা করেছিল?

4. অভিশাপ ভাঙতে গিয়ে মেহরিনকে কেন নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে হবে?

চলবে...

পর্ব ৫: ভালোবাসার অভিশাপ

পরবর্তী পর্বে প্রকাশ পাবে মমের জন্মের আসল ইতিহাস, আহমাদের অস্তিত্বের ভয়ংকর রহস্য এবং মেহরিনের জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা।