পর্ব ২: যে মেয়েটি ছায়াহীন
১. যে ঘরে কেউ ছিল না
রাত তখন ১২টা ১৭ মিনিট।
আহমাদ মূসা মেঝেতে পড়ে আছে। তার শরীরের ডান পাশ প্রায় মমের মতো গলে গেছে। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে।
শেষবারের মতো সে মেহরিনের মুখটা দেখতে চাইল।
কিন্তু মেহরিন নেই।
ঘরের দেয়ালে লেখা সেই বাক্যটাও নেই।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে আহমাদ ও মেহরিন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
আহমাদ কাঁপা হাতে ছবিটা তুলল।
হঠাৎ ছবির পেছন থেকে একটা কাগজ বেরিয়ে এলো।
সেখানে লেখা—
'তুমি যদি জানতে, মেহরিনকে বাঁচাতে গিয়ে তুমি নিজেই কতবার মরেছ, তাহলে কখনো তার চোখের দিকে তাকাতে না।'
আহমাদ আর কিছু ভাবতে পারল না।
তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
একজন বৃদ্ধা ঘরে প্রবেশ করলেন।
আহমাদের শরীর দেখে তিনি একটুও অবাক হলেন না।
বরং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আবার শুরু হলো!
তিনি আহমাদের কপালে হাত রাখলেন।
অবিশ্বাস্যভাবে গলে যাওয়া শরীর আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
বৃদ্ধা ফিসফিস করে বললেন,
— এবার মেয়েটাকে সত্যিটা জানাতেই হবে।
কিন্তু ঘরে তো কোনো মেয়ে ছিল না!
২. ছায়াহীন মেহরিন
পরদিন সকালে আহমাদ চোখ খুলল।
নিজেকে হাসপাতালের একটি বিছানায় আবিষ্কার করল।
তার পাশে বসে আছেন সেই বৃদ্ধা।
আহমাদ জিজ্ঞেস করল,
— আপনি কে?
বৃদ্ধা বললেন,
— আমার নাম সালমা। তোমার দাদার শেষ ইচ্ছা পূরণ করার দায়িত্ব আমার।
— আমার দাদা আপনাকে চিনতেন?
— শুধু চিনতেন না। তোমার জন্মের আগেই তিনি আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন।
আহমাদ উঠে বসতে চাইল।
— মেহরিন কোথায়?
বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— যে মেয়েটাকে তুমি খুঁজছ, সে এই পৃথিবীর মানুষ নয়।
আহমাদ বলল,
— তাহলে সে আমার সামনে আসে কীভাবে?
— কারণ তার আত্মা এখনো মুক্তি পায়নি।
— কেন?
বৃদ্ধা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তোমার জন্য।
কথাটা শুনে আহমাদ স্তব্ধ হয়ে গেল।
বৃদ্ধা আবার বললেন,
— মেহরিনের সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় জানো?
— কী?
— তার কোনো ছায়া নেই। কারণ সে পৃথিবীর আলোতে বেঁচে নেই। সে বেঁচে আছে কারও স্মৃতির মধ্যে।
আহমাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— তাহলে সে আমার স্মৃতিতে আছে?
বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।
— না। বরং তোমার স্মৃতিগুলো তার মধ্যে বন্দি।
৩. পুরোনো বাড়ির রহস্য
সেদিন বিকেলে সালমা আহমাদকে নিয়ে গেলেন শহরের বাইরে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে।
বাড়িটা দেখে আহমাদের বুক কেঁপে উঠল।
কারণ ছবিতে সে যে বাড়িটা দেখেছিল, এটি ঠিক সেই বাড়ি।
দরজার সামনে পৌঁছাতেই সালমা বললেন,
— এই বাড়িতে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে।
আহমাদ দরজা খুলল।
ভেতরে ঢুকতেই দেয়ালে ঝুলন্ত একটি বিশাল আয়না চোখে পড়ল।
আয়নাটার ওপর কালো কাপড় ঢাকা।
সালমা কাপড়টা সরাতে নিষেধ করলেন।
— এই আয়নায় কখনো নিজের মুখ দেখবে না।
— কেন?
— কারণ এই আয়নায় মানুষ নিজের বর্তমান চেহারা দেখে না। দেখে তার শেষ পরিণতি।
আহমাদ কথাটা শুনে থেমে গেল।
ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে মেয়েলি হাসির শব্দ ভেসে এলো।
আহমাদ চমকে উঠল।
— মেহরিন!
সে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।
একটি ঘরের দরজা আধখোলা।
ভেতরে মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা পোশাক, খোলা চুল, সেই পরিচিত চোখ।
আহমাদ বলল,
— তুমি আমার সঙ্গে এসব কেন করছ?
মেহরিন উত্তর দিল না।
শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
আহমাদ এবার লক্ষ করল, জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে প্রবেশ করছে।
কিন্তু মেহরিনের পায়ের নিচে কোনো ছায়া নেই।
সে ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে গেল।
— তুমি কি সত্যিই মৃত?
মেহরিন বলল,
— মৃতরা অন্তত জানে তারা কোথায় আছে। কিন্তু আমি জানি না, আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি।
আহমাদ জিজ্ঞেস করল,
— তুমি আমাকে স্বামী বললে কেন?
মেহরিনের চোখে পানি চলে এলো।
— কারণ তুমি একবার আমাকে বিয়ে করেছিলে।
— কিন্তু আমার জন্মই তো ১৯৯৮ সালের পরে!
মেহরিন এবার তার দিকে তাকাল।
— তুমি কি নিশ্চিত, তোমার জন্মের তারিখ সত্যি?
আহমাদ কিছু বলতে পারল না।
৪. যে শিশুর জন্মের রেকর্ড নেই
রাতের দিকে সালমা আহমাদকে একটি কাঠের বাক্স দিলেন।
বাক্সের ভেতরে ছিল কিছু পুরোনো কাগজ, জন্মনিবন্ধনের নথি এবং একটি কালো ডায়েরি।
আহমাদ নিজের জন্মনিবন্ধন বের করল।
জন্মতারিখ লেখা আছে।
কিন্তু নিচের অংশে একটি অদ্ভুত মন্তব্য—
'শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।'
আহমাদ চমকে উঠল।
— এর মানে কী?
সালমা বললেন,
— তোমার জন্মের পর তুমি বেঁচে ছিলে না।
আহমাদের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
— তাহলে আমি এখন কীভাবে বেঁচে আছি?
সালমা ধীরে ধীরে বললেন,
— তোমার মা তোমাকে বাঁচানোর জন্য মমের অভিশাপ নিজের শরীরে নিয়েছিলেন।
— কী!
— তোমার মা জানতেন, তোমার জীবনে একদিন এমন একজন আসবে, যার ভালোবাসা তোমাকে শেষ করে দিতে পারে। তিনি নিজের জীবন দিয়ে তোমার অস্তিত্বকে আটকে রেখেছিলেন।
আহমাদ কাঁপা গলায় বলল,
— তাহলে আমার মা...
সালমা চোখ নামিয়ে বললেন,
— তোমার মা শুধু মারা যাননি। তিনি মমের মধ্যে বিলীন হয়ে গেছেন।
হঠাৎ ঘরের বাতিটা নিভে গেল।
কালো ডায়েরির পাতা নিজে থেকেই উল্টাতে শুরু করল।
একটি পাতায় এসে থামল।
সেখানে লেখা—
'যে শিশুকে মৃত্যুর পর ফিরিয়ে আনা হয়েছে, সে কখনো নিজের ভালোবাসাকে বাঁচাতে পারবে না।'
৫. মেহরিনের আসল পরিচয়
আহমাদ ডায়েরিটা হাতে নিয়ে পরের পাতায় গেল।
সেখানে একটি ছবি।
ছবিতে মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে।
তার পাশে একজন পুরুষ।
আহমাদ ছবিটা ভালো করে দেখল।
পুরুষটির মুখ অবিকল তার নিজের মতো।
কিন্তু ছবির নিচে লেখা—
'আহমাদ মূসা ও মেহরিন রহমান, ১৭ অক্টোবর ১৯৯৮।'
এবার সালমা বললেন,
— এবার তোমাকে এমন একটা সত্য বলব, যেটা শোনার পর তুমি হয়তো নিজের অস্তিত্বকেই বিশ্বাস করতে পারবে না।
আহমাদ তাকাল।
— বলুন।
— তুমি যে আহমাদ মূসা, সে একমাত্র আহমাদ নয়।
— মানে?
— তোমার আগেও একজন আহমাদ ছিল। সে মেহরিনকে ভালোবেসেছিল। আর সেই ভালোবাসার কারণে মেহরিন মমের অভিশাপে গলে গিয়েছিল।
আহমাদ হতবাক।
— তাহলে আমি কে?
সালমা বললেন,
— তুমি সেই আহমাদের পুনর্জন্ম নও। তুমি তার অসমাপ্ত জীবনের দ্বিতীয় সংস্করণ।
আহমাদ পিছিয়ে গেল।
— এসব অসম্ভব!
ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে মেহরিনের চিৎকার শোনা গেল।
সবাই দৌড়ে গেল।
ঘরে মেহরিন নেই।
শুধু দেয়ালে রক্তের মতো লাল রঙে লেখা—
'আসল আহমাদ এখনো আয়নার ভেতরে বন্দি।'
৬. আয়নার ভেতরের মানুষ
আহমাদ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে দৌড়ে নিচতলায় সেই ঢাকা আয়নার সামনে গেল।
সালমা চিৎকার করলেন,
— না! কাপড় সরাবে না!
কিন্তু ততক্ষণে আহমাদ কাপড়টা সরিয়ে ফেলেছে।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল সে।
কিন্তু প্রতিবিম্বটা তার মতো দাঁড়িয়ে নেই।
প্রতিবিম্বটি মেঝেতে বসে আছে।
তার শরীর অর্ধেক গলে গেছে।
আর চোখে ভয়ংকর এক দৃষ্টি।
আয়নার ভেতরের মানুষটি হঠাৎ হাত বাড়িয়ে দিল।
কাচের ওপাশ থেকে একটা শব্দ এলো—
— মূসা! আমাকে বের করো!
আহমাদ ভয়ে পিছিয়ে গেল।
প্রতিবিম্বটি এবার বলল,
— মেহরিনকে বিশ্বাস কোরো না। সে তোমাকে বাঁচাতে আসেনি।
আহমাদ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
— তাহলে সে কী চায়?
আয়নার ভেতরের মানুষটি হেসে উঠল।
— সে চায় তুমি আমার জায়গায় বন্দি হও।
হঠাৎ আয়নার কাচে ফাটল ধরল।
সেই ফাটলের ভেতর থেকে একটি হাত বেরিয়ে এসে আহমাদের কবজি ধরে ফেলল।
আহমাদ চিৎকার করে উঠল।
সালমা তাকে টেনে সরিয়ে আনলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে আয়নার ভেতরের মানুষটি শেষ কথাটা বলল—
'মেহরিনকে বাঁচাতে হলে আগে আমাকে হত্যা করতে হবে!'
সবকিছু আবার নিস্তব্ধ।
৭. শেষ চিঠি
সেই রাতে আহমাদ বাড়ি ফিরে এল।
তার মাথায় শুধু একটি প্রশ্ন ঘুরছে।
আসল আহমাদ কে?
আর সে নিজেই বা কে?
ঘুমানোর আগে বালিশের নিচে একটি খাম পেল।
খামের ওপর লেখা—
'আমার প্রিয় আহমাদ, যখন তুমি এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি আর থাকব না।'
চিঠিটা মেহরিনের।
আহমাদ পড়তে শুরু করল।
'তুমি আমাকে ভুলে গেছ, এটা তোমার অপরাধ নয়। তোমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তুমি জানো না, তোমার জন্য আমি কতগুলো জীবন হারিয়েছি।
আমি জানি, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না।
কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—
তোমার শরীর মমের মতো গলছে না। তোমার ভেতরে বন্দি অন্য একজনের শরীর গলে যাচ্ছে।
আর সেই মানুষটি তোমার সবচেয়ে কাছের কেউ।'
চিঠির শেষ লাইনে লেখা—
'আহমাদ, তোমার শরীরের ভেতরে তোমার বাবা বেঁচে আছেন!'
আহমাদের হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল।
সে চিৎকার করে উঠল,
— বাবা!
ঠিক তখনই ঘরের দরজায় শব্দ হলো।
টক! টক! টক!
দরজার বাইরে একজন পুরুষের কণ্ঠ।
— মূসা, দরজা খোল। আমি তোর বাবা।
আহমাদ স্থির হয়ে গেল।
কারণ তার বাবা তো মারা গেছেন বহু বছর আগে!
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার নিচ দিয়ে একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু সেই ছায়াটা মানুষের নয়।
সেটা দেখতে গলে যাওয়া মোমের মতো।
দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এলো—
— বাবা, দরজা খোল। তোর শরীরটা আমার খুব প্রয়োজন।
আহমাদ পিছিয়ে গেল।
তারপর হঠাৎ ফোনে মেহরিনের বার্তা এলো।
'দরজা খুলবে না। কারণ ওটা তোমার বাবা নয়। ওটাই মমের আসল রূপ।'
আহমাদ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু এবার দরজার ওপাশ থেকে তার নিজের কণ্ঠ ভেসে এলো—
'আহমাদ, দরজা খোল। আমি তোর ভবিষ্যৎ!'
পর্ব ২-এর শেষ রহস্য
একই রাতে আহমাদের সামনে তিনজনের অস্তিত্ব প্রকাশ পেল—তার মৃত বাবা, আয়নার ভেতরে বন্দি আরেক আহমাদ এবং ভবিষ্যতের আহমাদ। কিন্তু তাদের মধ্যে আসল আহমাদ কে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
মেহরিন কি সত্যিই আহমাদকে বাঁচাতে চায়, নাকি সে নিজেই এই অভিশাপের স্রষ্টা?
চলবে...
পর্ব ৩: গলে যাওয়া অস্তিত্ব

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।