পর্ব ১: মমের প্রথম স্পর্শ
রাত তখন প্রায় বারোটা।
শহরের রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। বৃষ্টির পানিতে ভিজে আছে রাস্তার প্রতিটি কোণ। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল।
আহমাদ মূসা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
তার হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লাল কালিতে লেখা—
'কখনো কাউকে ভালোবেসো না। কারণ তোমার ভালোবাসা যার জীবনে প্রবেশ করবে, সে একদিন মমের মতো গলে হারিয়ে যাবে।'
আহমাদ প্রতিদিন এই কথাটা পড়ে।
কারণ এটা কোনো সাধারণ সতর্কবার্তা নয়। এটা তার পরিবারের ওপর নেমে আসা কয়েক শতাব্দীর পুরোনো অভিশাপ।
তার দাদা মারা যাওয়ার আগে তাকে বলেছিলেন,
— মূসা, পৃথিবীতে অনেক ভয়ংকর জিনিস আছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর হলো এমন এক ভালোবাসা, যেটা মানুষকে বাঁচতে দেয় না, আবার মরতেও দেয় না।
আহমাদ তখন কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।
কিন্তু এখন বোঝে।
তার মা মারা যাওয়ার আগে শেষবার বলেছিলেন,
— বাবা, কখনো কাউকে নিজের পৃথিবী বানিয়ে ফেলিস না। তোর পৃথিবী একদিন তার চোখের সামনে গলে যাবে।
সেদিনের পর থেকে আহমাদ নিজের হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
বন্ধু আছে, পরিচিত মানুষ আছে, কিন্তু ভালোবাসা নেই।
সে নিজেকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছে, জীবনে কখনো প্রেমে পড়বে না।
কিন্তু সে জানত না, অভিশাপ থেকে পালানোর চেষ্টা করলেও অভিশাপ কখনো কখনো নিজেই মানুষকে খুঁজে নেয়।
১. অচেনা মেয়েটি
পরদিন বিকেলে আহমাদ পুরোনো শহরের একটা লাইব্রেরিতে গেল।
লাইব্রেরিটা অনেক পুরোনো। দেয়ালে শ্যাওলা, কাঠের তাকগুলো ধুলোয় ঢাকা। সেখানে খুব কম মানুষ আসে।
আহমাদ একটা পুরোনো বই খুঁজছিল।
বইটার নাম—'মম: হারিয়ে যাওয়া আত্মার ইতিহাস'।
হঠাৎ পাশ থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো।
— আপনি কি মমকে খুঁজছেন?
আহমাদ চমকে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির চোখ অদ্ভুত সুন্দর। কিন্তু সেই চোখে এমন এক শূন্যতা, যেন সে বহু বছর ধরে ঘুমায়নি।
আহমাদ বলল,
— আপনি কীভাবে জানলেন?
মেয়েটি মৃদু হাসল।
— কারণ এই বইটা যারা খোঁজে, তাদের কেউ আর আগের মানুষ থাকে না।
— আপনার নাম কী?
— মেহরিন।
— আপনি এই অভিশাপ সম্পর্কে জানেন?
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— অভিশাপ সম্পর্কে শুধু জানি না। আমি এর ভেতরেই বাস করি।
আহমাদ বইটা হাতে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে চাইল।
কিন্তু মেয়েটি পেছন থেকে বলল,
— আহমাদ!
সে থেমে গেল।
নিজের নাম শুনে পেছনে তাকাল।
— আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?
মেহরিনের চোখে এবার হাসি ছিল না।
সে ধীরে ধীরে বলল,
— কারণ তোমাকে আমি অনেক আগেই হারিয়েছি।
২. প্রথম অস্বাভাবিক ঘটনা
সেদিন রাতে আহমাদ বাসায় ফিরে ডায়েরিটা খুলল।
কিন্তু ডায়েরির ভেতরে নতুন একটা পাতা পাওয়া গেল।
পাতাটায় লেখা—
'মেহরিনের সঙ্গে দেখা করেছিস। এবার সাবধান।'
আহমাদের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
সে নিশ্চিত, সকালে এই পাতাটা সেখানে ছিল না।
হঠাৎ ঘরের বাতিটা নিভে গেল।
চারদিকে অন্ধকার।
তারপর আয়নার সামনে একটা নারীর ছায়া দেখা গেল।
আহমাদ দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
আবার আয়নার দিকে তাকাতেই দেখল, তার নিজের প্রতিবিম্ব হাসছে।
কিন্তু আহমাদ হাসছে না।
প্রতিবিম্বটা ধীরে ধীরে মুখ খুলল।
— তুমি আবার ভালোবাসতে যাচ্ছ?
আহমাদ পিছিয়ে গেল।
— কে তুমি?
প্রতিবিম্ব উত্তর দিল,
— আমি সেই মানুষ, যে তোমার ভালোবাসায় একদিন গলে গিয়েছিল।
হঠাৎ আয়নার ভেতরের মুখটা বিকৃত হয়ে গেল।
তারপর প্রতিবিম্বের শরীর থেকে মোমের মতো সাদা তরল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
আহমাদ চিৎকার করে উঠল।
ঠিক তখনই ঘরের বাতি জ্বলে উঠল।
সবকিছু স্বাভাবিক।
শুধু আয়নার নিচে পড়ে আছে কয়েক ফোঁটা সাদা তরল।
আহমাদ কাঁপা হাতে সেটা স্পর্শ করল।
তরলটা বরফের মতো ঠান্ডা।
আর তার মধ্যে ভেসে উঠল একটা শব্দ—
'মূসা...'
৩. যে মানুষটি কখনো জন্মায়নি
পরদিন সকালে আহমাদ লাইব্রেরিতে ফিরে গেল।
মেহরিনকে খুঁজে বের করা দরকার।
লাইব্রেরির বৃদ্ধ কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করল,
— কাল যে মেয়েটি এখানে ছিল, মেহরিন, সে কোথায়?
বৃদ্ধ লোকটি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কোন মেহরিন?
— কাল আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। লম্বা চুল, সাদা পোশাক।
বৃদ্ধ লোকটি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— বাবা, এই লাইব্রেরিতে গত বিশ বছর ধরে কোনো মেহরিন নামে মেয়ে কাজ করে না, আসে না।
আহমাদ বলল,
— কিন্তু আমি তো কাল তার সঙ্গে কথা বলেছি!
বৃদ্ধ লোকটি এবার ধীরে ধীরে একটা পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিটা প্রায় পঁচিশ বছরের পুরোনো।
ছবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে।
আহমাদ ছবিটা দেখে জমে গেল।
এ তো সেই মেহরিন!
কিন্তু ছবির নিচে লেখা—
মেহরিন রহমান। মৃত্যু: ১৯৯৮।
আহমাদের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এলো।
'ভয় পেয়ো না, আহমাদ। আমি মৃত নই।'
আরেকটা বার্তা এলো।
'কিন্তু তুমি খুব শিগগিরই মৃতদের চেয়েও ভয়ংকর একটা জায়গায় চলে যাবে।'
আহমাদ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ তৃতীয় বার্তা এলো।
'আজ রাত বারোটায় তোমার শরীরের প্রথম অংশ গলে যাবে।'
৪. শেষ দৃশ্য
রাত বারোটা।
আহমাদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তার ডান হাতের আঙুলগুলো অদ্ভুতভাবে সাদা হয়ে যাচ্ছে।
সে চিৎকার করে উঠল।
আঙুলের চামড়া মোমের মতো নরম হয়ে গলে পড়তে শুরু করল।
সে হাতটা বাঁচানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু যতই পানি ঢালছে, ততই হাতটা গলে যাচ্ছে।
হঠাৎ দরজায় তিনবার শব্দ হলো।
টক! টক! টক!
দরজা খুলতেই মেহরিন দাঁড়িয়ে।
তার চোখে পানি।
সে আহমাদের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আমি তোমাকে বাঁচাতে এসেছি।
আহমাদ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে বলল,
— তুমি কে? কেন আমার সঙ্গে এসব হচ্ছে?
মেহরিন তার কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
— কারণ তুমি আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছ।
আহমাদ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
— অসম্ভব! আমি তোমাকে ভালোবাসি না!
মেহরিন কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিল,
— তাহলে তোমার শরীর গলছে কেন?
ঠিক তখনই আহমাদের ডায়েরির ভেতর থেকে একটা পুরোনো ছবি মেঝেতে পড়ে গেল।
ছবিতে আহমাদ আর মেহরিন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
কিন্তু ছবিটা দেখে আহমাদের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
ছবির পেছনে লেখা—
'আহমাদ ও মেহরিন। বিয়ের তারিখ: ১৭ অক্টোবর ১৯৯৮।'
অথচ আহমাদের জন্মই হয়েছে তার অনেক পরে!
সে অবিশ্বাসের চোখে মেহরিনের দিকে তাকাল।
মেহরিন এবার এমন একটা কথা বলল, যা শুনে আহমাদের সমস্ত পৃথিবী থেমে গেল।
— তুমি আমাকে ভুলে গেছ, আহমাদ। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।
তারপর হঠাৎ মেহরিনের শরীর থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল।
সে মিলিয়ে যেতে যেতে শেষবার বলল—
'পরেরবার যখন দেখা হবে, তখন হয়তো তুমি আর মানুষ থাকবে না।'
ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।
আহমাদ মেঝেতে পড়ে রইল।
তার শরীর ধীরে ধীরে মমের মতো গলে যাচ্ছে।
আর ঘরের দেয়ালে নিজের অজান্তেই ফুটে উঠল একটি বাক্য—
পর্ব ১-এর শেষ রহস্য
'যাকে বাঁচাতে আহমাদ জন্মেছিল, সেই মেয়েকেই সে একদিন নিজের হাতে মেরে ফেলেছিল।'
চলবে...
পর্ব ২: যে মেয়েটি ছায়াহীন
পরের পর্বে প্রকাশ পাবে—মেহরিন কি সত্যিই ১৯৯৮ সালে মারা গিয়েছিল? আহমাদ কীভাবে নিজের জন্মের আগেই তাকে বিয়ে করেছিল? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আহমাদ কি সত্যিই গলে শেষ হয়ে গেল?

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।