"মা, চিপস কিনে দেবে না?”
পাঁচ বছরের অবুঝ ইসরাতের এই ছোট্ট বায়নাটিই হয়তো সেদিন ছিল ওই দুই কচি প্রাণের সবচেয়ে বড় চাওয়া। কিন্তু সে জানতো না, এই চিপস কিনে দেওয়ার মিষ্টি প্রলোভনটিই তার জীবনের সবচেয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুর এক প্রতারণা। যে মা বুকে আগলে রেখে বড় করার কথা, সেই মায়ের কারণে ছোট্ট শিশুরা এসে দাঁড়ায় এক মহাশূন্যতার মুখে। এবং তার পাশে দেড় বছরের আরেক অবুঝ বোন রোজা মনি। যার চোখে নেই পৃথিবীর কোনো হিসাব নিকাশ, আছে কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত আকুতি।
“ মা কোথায়? বাবা কোথায়?”শত অদেখা অচেনা মানুষের ভিড়ে তারা একা। কিন্তু, কেনো? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই। অথচ আমরা মানুষ। আমরাই মা-বাবা।
স্কুল সংলগ্ন সড়কের পাশ থেকে যখন এই দুই বোনকে উদ্ধার করা হয়, তখন চারপাশের বাতাসে কেবল তাদের কান্নার রোল। স্থানীয় বাসিন্দারা যখন এগিয়ে আসেন, তখন পাঁচ বছরের ইসরাত কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটাই কথা বলে, মা তাদের চিপস কিনে দেওয়ার কথা বলে এখানে বসিয়ে রেখে কোথায় চলে গেছেন। ঘণ্টা ফুরিয়ে বিকেল নামে, বিকেলের আলো নিভে নামে সন্ধ্যা। কিন্তু যে মায়ের আঁচল ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ দুর্গ, সেই মা আর ফিরে আসেননি।
এই দুই শিশুর জীবন থেকে সুখের দিনগুলো হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। চার মাস আগে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ নামের এক অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দেয় এই পরিবারটিকে। আদালতের রায় বা আইনি কাগজের ম্যারপ্যাঁচ হয়তো বড়দের কাছে কেবলই কিছু দলিল, কিন্তু পাঁচ বছরের ইসরাত আর দেড় বছরের রোজা মনির কাছে এটি তাদের পুরো পৃথিবীটাই উল্টে যাওয়ার নাম। বিচ্ছেদের পর মা চলে গেছেন অন্য ঠিকানায়, করেছেন নতুন সংসার। আর যান্ত্রিক এই পৃথিবীর নিষ্ঠুর খেলায় বলি হলো এই দুই নিষ্পাপ ফুল।
দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তাদের এক চাচি। তাঁর কোলে যখন শিশু দুটিকে তুলে দেওয়া হয়, তখন একটুখানি চেনা মানুষের ছোঁয়া পায় তারা। কিন্তু তবুও কী ঘুচিয়েছে তাদের মনের আতঙ্ক? লোকজন যখন মুঠোফোনে তাদের মার সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন সেই মহিলার নিষ্ঠুর ঘোষণায় পাথর হয়ে যায় উপস্থিত সবাই। তিনি নাকি ইচ্ছা করেই ফেলে গেছেন মেয়েদের, এমনকি আর কোনোদিন ফিরিয়ে নেবেন না! অন্যদিকে, পেটের দায় কুমিল্লা শহরে অটোরিকশা চালানো বাবা নাছিরের মোবাইল ফোনটিও তখন বন্ধ। যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় মেতেছেন দুই অভিভাবক। নিজেদের বুক থেকে কে কত দ্রুত মুছে ফেলতে পারেন এই দুই অবুঝ শিশুর অস্তিত্ব।
এই বয়সে ইসরাত ও রোজা মনির যেখানে মায়ের কোমল হাতের ছোঁয়ায় ঘুমিয়ে পড়ার কথা, বাবার কাঁধে চড়ে দিগদিগন্তে ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেখানে তাদের সঙ্গী হয়েছে সমাজের কৌতূহলী দৃষ্টি আর এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তারা কী কখনো জানতে পারবে, কেনো তাদের এভাবে ফেলে দেওয়া হলো। কী তাদের অপরাধ। এইভাবে ছুড়ে ফেললে জন্ম দেওয়াই হলো কেনো ? আমরা মা-বাবা হতে চাই।অথচ দায়িত্ব, কর্তব্য ও মানবতা ছুড়ে ফেলে অনৈতিক সমাজ তৈরি করছি ।
আমাদের সমাজ, আমাদের বিবেক কী এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবে? মা-বাবার ভুলের খেসারতে আজ এক মুঠো ভাতের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এক ফোঁটা স্নেহ । কচি কচি মুখগুলোর দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে। কে দেবে এদের নিরাপদ জীবন ? কে ফিরিয়ে দেবে তাদের আনন্দময় শৈশব?
হয়তো এই নিরাপদ শৈশব না পেয়েই তাজমিন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেড়ে উঠে ছিল। কী করে এত ছোট মেয়ে এত সাহস পেলো এবং এত বেপরোয়া চলে জীবন দিতে হলো তাহা তার মা- বাবাই ভালো বলতে পারবেন। তবে রাষ্ট্র নিরাপদ জীবন দিতে ব্যর্থ হয়েছে সম্পূর্ণভাবেই। আমার ছোট মেয়ের বয়সী তাজমিন আমার মেয়ের মত। আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি নাই। অথচ তাকে নিয়ে অনধিকার চর্চা করেছি বহু। যে মানুষ সন্তান হারিয়েছে শুধু উনি বুঝে এবং জানে বুকে কী কষ্ট। আমরা থাকি মরার পরও একজনকে বিভিন্ন অপবাদে জর্জরিত করার তালে। যা সভ্য দেশে কখনো হয় না।

মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।