কী রূপ! আমি হতবিহ্বল হয়ে জানতে চাই। উনি গাড়ির দরজার একটা লোহার পাইপ ধরে নড়াচড়া করে ঢোঁক নিলেন। আমি অধীর হয়ে তাকিয়ে থাকি উনার মুখপানে ।
উনি ধীরূজ হয়ে বলতে থাকেন- গ্রামে বিয়ে দিয়েছি উপকার হবে মনে করে কিন্তু এখন ছেলের বউটা যেনো কালনাগিনীর রূপ ধারণ করেছে। বিয়ের পর ভালোই চল ছিলো কিন্তু পরে ধীরে ধীরে বউমার বড় বোন ও মায়ের আসকারায় আর কুটিলতায় আমার সংসার জটিল হতে শুরু করে।
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলাম। তাই উনার কথা শুনতে অমনোযোগী হতে বাধ্য হলাম। এতে মা’টা মনোক্ষুন্ন হয় একটু। আসলে একজন সহযাত্রীর পারিবারিক কথা শুনতে মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু মনে হয় উনি দুঃখের কথা বলেই যেনো শান্তি পাচ্ছে।

লালপোল এসে বাস পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে। হাতে মোবাইলে আমার নিজের অজান্তে চাপ লেগে যায়। মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠে হোম(মা) লিখা নাম্বারটা। বহু আগে ওয়ারিদ নাম্বারটা আব্বা নিয়ে ছিলো। চার বছর আগে আব্বা মারা যাওয়ার পর আম্মার কাছে ছিলো। গত পাঁচ মাস মাও নাই। কিন্তু এখনও ফোন হাতে নিলে মনে হয়, যদি আরেকবার 'মা' লেখা নামটা ভেসে উঠত! যদি আরেকবার সেই পরিচিত কণ্ঠে শুনতে পেতাম, "কেমন আছিস ?"
কিন্তু সত্য হলো জীবনের কিছু শূন্যতা আর কখনোই পূরণ হয় না। মৃত্যুই মহাসত্য। আমার মা নাই,ধ্রুব সত্য। মহাকালের মহাকবিতা “মা ”, যেনো মহাপ্লাবন সৃষ্টি করেছে আমার জীবনে।

লালপোলের অন্ধ ভিক্ষুকটা সুর করে মহান রব’কে ডাকে। আমি বিচলিত হই, দরদী হয়ে সেই মায়ের মাথায় হাত দিয়ে মা নামক শব্দের ঘ্রাণ নিতে চেষ্টা করি। ভিক্ষুক সুরে সুরে আর্তি করে মা সাহায্য করেন আমরও মা আছে , তাঁর মুখে ভাত দিতে হয়। বেশ কিছু মানুষ তাকে সাহায্য করেন, সেই মাও দশ টাকা হাতে ধরিয়ে দেন। আমি উদাসী মনে পিচ ঢালা কালো রাস্তায় রোদের ঝলকানিতে দৃষ্টিপাত করি। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে লালপোলেই সংযোগস্থল সোনাগাজী সড়কের। বাস ট্রাক টেম্পু আর হকারে জমজমাট এই সংযোগস্থলে একটা ওভার ব্রিজ খবুই জরুরী। পেট্রল স্টেশনের পিছনে “কাবাব ঘর”। একবার আসবো আসবো বলে আর আসা হয়নি অদ্যাবধি।

বৃদ্ধ মা বলতে শুরু করেন-আপনার আংকেল একটা তেলবাহী জাহাজে চাকরী করতো। এক একবার দুই/চার/পাঁচ মাস কোনো খোঁজ খবর থাকতো না। এই তিনটা ছেলে-মেয়েকে আমি কোলেপিঠে করে বড় করেছি। ছেলেদের লেখাপড়া শিখিয়ে বিদেশ পাঠিয়েছি আমার স্বাধ-আহ্লাদ পূরণ করেছেও আর এখন ভাগ্যহত এক মা।
শুনেছি, মানুষ বৃদ্ধ হলে ক্লান্ত হয়,ক্লান্ত হলে ঘরে যায়। কিন্তু যে ঘরই ক্লান্ত হয়ে যায়, সে কোথায় যাবে?
শুনেছি,মানুষ ঠকে হেরে গেলে আপনজনের কাছে যায়,কিন্তু যে মানুষ আপজনের কাছেই ঠকে হেরে যায়, সে কোথায় যাবে?
মানুষ ভেঙে পড়লে ঘরে যায়,কিন্তু যার ঘরই ভাঙ্গা সে কোথায় যাবে.....?
(বাকি)