www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

সূর্যোদয়ের সময়ে

তখনও আধার আছে।
সেহরি শেষ করে ফজর পড়ে ফেলেছি। প্রতিদিন শুয়ে পরি এসময়। আরেকটু ঘুমিয়ে নেবার চেষ্টা আর কি। আজ আর বিছানায় যাবার সময় নেই। বেরিয়ে পরতে হবে এখনই। দূরে যেতে হবে, চার ঘন্টার ড্রাইভ - সেজউইক। ছোট্ট একটি শহর। আচানক কারবার হচ্ছে, দিনে দিনে আরও ছোট হচ্ছে শহরটি। জনসংখ্যা বাড়ার বদলে কমছে। আশ্চর্য! ২০০৬ সালের আদমশুমারি মতে ৮৯১ জন অধিবাসী ছিল এই শহরে। ২০১১ বলে, কমে হয়েছে ৮৫৭। আর ২০১৬ তে আরও কমে ৮১১ এখন। তবুও কী নেই শহরটিতে? একটা যাদুঘরও আছে।
রমজান মাস শুরু হয়েছে সপ্তাহ দু’য়েক আগে। মাসের মাঝামাঝি চলে এসেছি আমরা। স্বল্পদৈর্ঘ রাত আর লম্বা দিনের সুবাদে ক্ষুধা-তৃষ্ণা যতটা তার চেয়ে বেশি করে পীড়া দেয় ঘুমের স্বল্পতা। প্রতিদিনই ঘুম বকেয়া হয়ে যাচ্ছে। অনাদায়ী ঘুম হিসাবের খাতায় শণৈ শণৈ বাড়ছে। আজকে ঐ অ্যাকাউন্টে বাড়তি কিছু বকেয়া ঘুম জমল। ভাবছি, রোজার পরে লম্বা লম্বা ঘুম দিয়ে বকেয়া উসুল করতে হবে। অবশ্য কাজটাতে আমি খুব একটা দক্ষ না। আমার স্ত্রী আবার এ’কাজে ওস্তাদ রকমের পারদর্শী। বন্ধের দিনগুলোতে রাতের ঘুম টানতে টানতে সকাল পেরিয়ে দুপুরে নিয়ে ফেলে। পারেও, বাব্বা!
চোখ ডলতে ডলতে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এসবই ভাবছি। রাস্তাঘাট সুনসান, ফাঁকা। কোন পাগলে এত সকালে বের হবে? তবে প্রকৃতিতে শরীর জুড়ানো আবহ। এবারের লম্বা শীতের পর চট করেই দুঃসহ গ্রীস্ম চলে এসেছে। রোদের তেজ গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। রাতটা সে তুলনায় অনেক ভাল। শীতল আমেজ চারিদিকে। শরীরের গভীরে ভাল লাগা খুনসুটি করে তখন।
ক্যালগেরি থেকে সোজা পূব দিকে গাড়ি চলছে। ফুল ভলিউমে গানও বাজছে, ‘চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে।’ এই মানুষটার সব গান আমার মোবাইলে ভরা আছে। গাড়িতে উঠলেই বাজতে শুরু করে, ‘ও আমার উড়ালপঙ্খী রে যা যা তুই উড়াল দিয়া যা।’ বড় ভাল লাগে। একটার পর একটা। ‘যমুনার জল দেখতে কালো’। মোবাইল ভর্তি আছে উনার গান। শুনতেই থাকি।
গানতো এখন মোবাইলেই থাকে, তাই না? মনে পড়ছে সেই গানের যন্ত্রটার কথা। প্রথম নিজের টাকায় কেনা সবচেয়ে দামী বস্তু। আহা! কী আনন্দ! ক্যাসেটের ফিতা পরিস্কার করে কত যতœ করে সাধের প্লেয়ারে ভরে গান শুনতাম। সেই টেপ রেকর্ডার গেল, কানে হেডফোন লাগিয়ে শোনা ওয়াকম্যানও গেল - মোবাইল সব দখলে নিল। মোবাইল কত কিছু গ্রাস করছে! অ্যানালগ-ডিজিটাল সব ক্যামেরাই হারিয়ে যাবার পথে। শুনছি নিকট ভবিষ্যতে টিভিও নাকি অতলে ডুবে যাবে। মানবজীবনের এই সামান্য সময়েই কত কিছু দেখে ফেললাম। আরও কত চমক অপেক্ষা করছে কে জানে?
গাড়ি শহর ছেড়ে ফাঁকা জায়গায় চলেছে এসেছে। প্রেইরি বুক চিড়ে চলে যাওয়া সুতোর মতন রাস্তা। দু’ধারে মহাশূন্যসম বিস্তীর্ণ ধরণী। ভুপেনের গঙ্গার বিস্তীর্ণ দু’পাড়। মাইলের পর মাইল দৃষ্টি চলে যায়। কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই। থেকে থেকে দু’চারটা বাড়িঘর অবশ্য চোখে পরে। তবে এই ’থেকে থেকে’র হিসাবের ব্যবধানটা স্বাভাবিকের চাইতে যোজন যোজন বেশি। স্বাভাবিক মানে আমার দেশের কথা বলছি। রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে পাশ দিয়ে দু’একটা লরি চলে যাচ্ছে বিকট শব্দ করে। বেশ বড় লরিগুলো - রেলগাড়ির মত বগি লাগানো আছে দু’টো করে। সড়কপথের রেলগাড়ি, হা হা হা।
মামুজানের উঁকি-ঝুকি ঠিক তখনই। আচ্ছা, ভদ্রলোক আমার মামা কেমনে হলেন? ভেবে কোন কূল-কিনারা করতে পারছি না। বাপ-মা-ভাইবোন-চাচা-চাচী কিছুই না। অথচ সব্বের মামা তিনি। স্বয়ং কাজীদা রগ ফুলিয়ে বলে গেছেন, ‘সূয্যি মামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে।’ অগত্যা মেনেই নিয়েছি, না মেনে উপায় আছে? চাঁদকেতো মামা ডেকেছি নাক দিয়ে সর্দি পড়ার বয়স থেকেই, ‘আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা।’ তবে নজরুলের মতন আজকে কিন্তু মামুজানের আগেই আমার পৃথিবী লোকন। অথচ পৃথিবীর এতে কিছুই আসে যায় না। আমি উঠলাম, বের হলাম, পৃথিবী কিছুই বলল না। কোন আড়ম্বরই ছিল না তখন। এদিকে যেই না গোলাকার-মামা চোখ মেলল, ধরিত্রী কেমন যেন করে উঠল। শরীর ঝাঁকিয়ে উন্মুখ হয়ে গেয়ে উঠে বসুন্ধরা,
‘এখানে সূর্য ছড়ায় অকৃপণ
দুহাতে তীব্র সোনার মতন মদ,
যে সোনার মদ পান ক’রে ধান ক্ষেত
দিকে দিকে তার গড়ে তোলে জনপদ।’
এই মোক্ষম সময়টাকেইতো ঊষা বলে, তাই না? গোধূলী নিয়ে বিস্তর লেখালেখি আছে, এন্তার সাহিত্য। তুলনায় ঊষা বোধ হয় ততটা স্থান পায়নি। পাবেইবা কীভাবে? কার খেয়েদেয়ে কাজ আছে মামার আগে ঘুম থেকে উঠে। বিখ্যাত লেখকবৃন্দেরতো আরও সময় নেই। লিখতে লিখতে যখন শেষ রাত তখনই উনারা ঘুমাতে যান। আবার কারও কারও যদি রঙপানি পানের দোহদ থাকে তাহলেতো কথাই নেই। আমার স্ত্রীর মত একঘুমে দুপুর ছুঁই ছুঁই করে উঠেন নিশ্চয়। কেউবা আরও পরে। সুরাপানে আসক্ত থাকুক বা না থাকুক নজরুল সাহেব সূয্যি মামা উঠার আগেই উঠে দেখেছেন, ‘ঊষার ললাট-সিন্দুর-টিপ সিঁথিতে উড়াল পবনে।’
এই যে সিন্দুর টিপ, মাথার মধ্যে গেথে গেল সহসাই। ঠিক নাক বরাবর মামার ছড়িয়ে দেয়া সিন্দুরের আবীর। পূবাকাশ ঝলমল করে মাখিয়ে দিয়েছে ততক্ষণে। আমি বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছি। কীভাবে এর বর্ণনা দিব? প্রেইরির বাঁধাহীন দৃষ্টি লালের শেষবিন্দু পর্যন্ত চেখে নিচ্ছে। এ লালের উৎস না হয় বড় তরঙ্গদৈর্ঘ। ধুলোবালির সাথে মিশে তা কমলার আভা দিচ্ছে। তারপরও কোথায় কী যেন আছে? লাল-কমলার সাদামাটা বর্ণনার বাইরে বহুকিছু ঘটে যাচ্ছে এখন। কেমন যেন রঙের নাচন প্রকৃতিতে। রঙের প্রলয়ংকরী নাচন, তার সাথে নিস্তব্ধতার গভীর মিতালি। মাগো! পাগল-করা অনুভূতি। জানি না শেষ কবে এভাবে সূর্যোদয় দেখেছি।
না, পারব না। এ মায়া থেকে চোখ ফেরাতে পারব না আমি। রোডসাইড টার্নআউটে গাড়ি থামিয়ে দেই আচমকা। চোখে জগতের ক্ষুধা নিয়ে তাকিয়ে থাকি একটু একটু করে জেগে উঠা ঐ লোহিত গোলকের দিকে। প্রথমে সামান্য একটু - বক্ররেখাসম। এরপর সে রেখা বড় হতে থাকে, বৃত্ত হয়ে যায় একসময়। আর সেই বৃত্ত ভর্তি আগুনের লেলিহান শিখার উপরের অংশ। সেই শিখা এসে লাগছে আমার কপোলেও। নিশ্চয় সেই বনলতা সেন দেখার আলো এটাই। সেই সোনালী রূপ, ‘চেয়ে দ্যাখে; সোনার বলের মত সূর্য/রূপার ডিবের মত চাঁদের বিখ্যাত মুখ দেখা।’ অবশ্য সে ছিল গোধুলীর সময়। ঊষা, তারই যে সতীন!
বড় অভাগা মনে হয় নিজেকে, ভীষণ কষ্ট লাগছে। উপরওয়ালা কতকিছু করেছেন! মূষিক থেকে শুরু করে পর্বত বানিয়ে দিয়েছেন। অথচ এই অভাজনের অন্তরে দু’ছত্র বাংলা দিয়ে দেননি। প্রকৃতি নববধুর মত অবগুণ্ঠনে সেজে রয়েছে। রঙের আবীর মেখে সূর্য ততক্ষণে হোলি খেলা শুরু করে দিয়েছে। বিস্তীর্ণ প্রেইরি ব্যাকগ্রাউন্ডের মত সঙ্গিহীন-সাথিহীন নিশ্চুপ। একবিন্দু কালো তিলের মত টয়োটা ফোর-রানারের সিটে বসে আছি আমি। স্টিয়ারিংয়ে নিথর দু’হাত। প্লট তৈরী হয়ে আছে। দু’লাইন লিখে ফেলার এখনই যে শ্রেষ্ঠ্য সময়। হায়! এ’যে হবার নয়।
চারিদিক ভাসিয়ে ঊষা আসবে। তাতো জানাই ছিল। ‘তিমির রাতের তোরণে তোরণে ঊষার পূর্বাভাস’ ছিল। আমি কেন চুপ ছিলাম? আমি কেন জসীমউদ্দীনের মত গাইতে পারলাম না, ‘সোনালী ঊষার সোনামুখে তার আমার নয়ন ভরি।’ আমি নাদান ভ্যাবলার মত বসে আছি। হাতরে-পাতরে খুঁজছি কোন কবির কল্পনা। রঙের শিল্পের দিকে তাকিয়ে ভাবছি কোন গানের কলি। চিত্ত মোর দুলছে, ফররুখ আহমেদের মত,
‘নামলো খোদার রহমত-ই-গাস ধূলির ধরার কলে,
নতুন ঊষায়, ভোরের হাওয়ায় ইনসানিয়াৎ দোলে।।’
ততক্ষণে সূর্যমামা সম্পূর্ণ চোখ মেলে দিয়েছে। পূর্ণ দৃষ্টিতে সে জগৎ ছুঁয়েছে। প্রণামে তখন কত না মানবসন্তান ত্রস্ত-ব্যস্ত। হবেই তো, সূর্য দেবতা যে! আধার কেটে যে চারিদিক আলোকিত করতে পারে তাকে পুজো না করে উপায় আছে? চারিদিকে আলো ছড়িয়ে প্রাণীকূলকে বাচিয়ে রাখে যে, দেবতাসদৃশ মান্য তাকেই মানায়। কত না পুজো, কত না আরাধনা তাই তাঁকে ঘিরে।
সূর্য অনেকেরই প্রধানতম দেবতা। মিশরীয়রা তাই জানত প্রাচীনকালে। তখনকান সূর্য-দেবতার নাম ছিল ‘রা’। অদ্ভুদ ছিল তার শারীরিক গঠন। বাজপাখির মত মুখ। মাথার উপরে চাকতির মতন সূর্য। তারা বিশ্বাস করত আকাশের দেবী ‘নাট’ প্রতিরাতে ‘রা’কে গিলে খায়। আবার সকালে তাঁর পূনর্জন্ম হয়। বিশ্বাসতো বিশ্বাসই, তাই না? কারও কারও ধারনা ছিল, ‘রা’ রাতের বেলা পৃথিবীর নীচ দিয়ে হেঁটে যেত। আবার সকালে উপরে উঠে আসত। এদের ‘রা’ কিন্তু ছিল ভেড়ার মুখের মত!
প্রাচীন মেক্সিকানদের আবার বেশ কয়েকটি সূর্য-দেবতা ছিল। কিম্ভুৎকিমাকার সব নাম তাদের। গ্রিকদের ছিল বিখ্যাত অ্যাপোলো - সেই সূর্যের দেবতা। সাথে আলো, সংগীত আর ভবিষ্যদ্বানীর দেবতাও সে। সূর্য নিয়মমাফিক উঠে, আবার নামে। তাই এর সাথে নিখুঁত ভবিষ্যদ্বানী জড়িয়ে আছে। সূর্য আবার ধ্রুব সত্যও। তাই গ্রিকদের কাছে অ্যাপোলো সত্যেরও দেবতা। রোমানদেরও সূর্য-দেবতা ছিল - নাম, সল। ল্যাটিন ভাষায় সল শব্দের অর্থই সূর্য। তবে রোমানদের ঊষার দেবতা ছিল একজন - অরোরা। কী সুন্দর নামটা!
মহাগ্রন্থ রামায়ণ আর মহাভারতে উল্লেখ আছে, সূর্যের বাবা কশ্যপ, আর মা অদিতি। অদিতির সতীনের সন্তানেরা ছিল সব দৈত্য-দানব। এরা দেবতাদের নানাভাবে নিপীড়ন করতে থাকে। তখন অদিতি সূর্যের কাছে প্রার্থণা করে তাঁর সন্তান হয়ে জন্মাতে। যাতে সূর্য ভাই হয়ে জন্মে অন্য দেবতা-ভাইদের দানবদের কাছ থেকে রক্ষা করতে পারে। সূর্য সে প্রার্থণা মঞ্জুর করে সৌষুন্ন কীরণ প্রেরণ করলে অদিতি গর্ভবতী হয়। মাতা মেরিওতো এরকমই অলৌকিক গর্ভধারণ করেছিলেন?
অদিতি-কশ্যপের পুত্র সূর্য যৌবনাবতি হলে বিশ্বকর্মার কন্যা সংজ্ঞার সাথে তার বিয়ে হয়। সংজ্ঞার গর্ভে সূর্যের তিন সন্তার আছে - বৈবস্বত মনু, যম ও যমুনা। সূর্যের তেজ বড় বেশী। তাঁর স্ত্রী সংজ্ঞা এই তেজ বেশীদিন সহ্য করতে পারে না। একদা সে নিজের অনুরূপ ছায়া সৃষ্টি করে সূর্যের কাছে রাখে। আর নিজে অশ্বীর রূপ ধারণ করে উত্তর কুরুতে পালিয়ে যায়। আশ্চর্য! সেই ছায়ার গর্ভেই সূর্যের আরও তিনটি সন্তান হয় - সাবর্ণি মনু ও শনি নামে দুই পুত্র এবং তপতী নামে এক কন্যা। একসময় সূর্য সংজ্ঞার চুতুরতা বুঝতে পারে। তখন সে অশ্বরূপ ধারণ করে সেই উত্তর কুরুতে গিয়ে সংজ্ঞার সাথে মিলিত হয়।
সূর্যের যে স্ত্রী-পুত্রকন্যা আছে, পরিবার-পরিজনও আছে তা আমার জানা ছিল না। আমি ভাবতাম সূর্য বুঝি একাই। জ্ঞানতাপষ প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের মতনই একা। তবে একটা প্রশ্ন সবসময়ই মনে বাজে, সূর্যকে কেন পুজো করা হতো? পুরাকালে এত এত মানুষ সূর্য-প্রণামে নিবেদিত ছিল, কারণ কী? পুরাতন শাসকগণের চারিধারে শহুরে নাগরিকের সন্নিবেশ ছিল। তাদের দর্শনে রাজা, রাজ্যশাসন ছিল পবিত্র কাজ। সূর্য হলো মর্ত আর পাতালের কর্তা। তাই সূর্যের প্রতিকৃতি তাদের কাছে পবিত্র শাসকের প্রতিরূপে ধরা পরে।
সাদা চোখে মহাকাশে সূর্যই হচ্ছে আলো আর জীবনের উৎস। ন্যায় বিচারের উৎপাদিকা। সমস্ত জ্ঞানের উৎস। সূর্য স্বাধীন, ন্যায়ায়ক, জ্ঞানী। আবার এসব গুণ শহুরে এলিট ধার্মিক শ্রেণীর কেন্দ্রিয় চরিত্রও। ফলে যুগে যুগে বিভিন্ন সভ্যতার অভ্যন্তরে উন্নত সূর্য-দর্শন গড়ে উঠে। স¤্রাট-রাজারা সূর্যের শক্তি অনুসরণে শাসন করতে থাকে। তারা দাবী করে নিজেদের সূর্যের উত্তরসূরী হিসেবে। সূর্য-দেবতাকে পুজো, বিধাতাকে সূর্যরূপে দেখা, সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পরে কালক্রমে। তাই প্রধানতম দেবতা হিসেবে সূর্যের অবস্থান অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। চাওয়া-পাওয়ার আধার হয়ে উঠে সে। তাইতো সুকান্ত শীতার্ত মানুষের জন্য এই সূর্য-দেবতার করুনাপ্রার্থী, ‘আজ কিন্তু আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী।’
ধুর! সাত সকালে কীসব দেবতা-টেবতা নিয়ে ভাবছি। তারচেয়ে বরং রোডসাইড টার্নআউটে গাড়ি থেকে বের হয়ে সোনালী গোলকের প্রথম কীরণ গায়ে মাখি। শরীরে নরম-কোমল পশমের মৃদু পরশ বুলিয়ে সূর্য-কীরণ ভাললাগায় ভরিয়ে দিচ্ছে। আবেশিত হয়ে যাই দিনের প্রথম সূর্য-¯œানে। কোত্থেকে এক ঝাক বালিহাস বাতাসে রাগিনী তুলে পার হয়ে যায় মাথার উপর দিয়ে। আরে! এসময় এটিই যে হবার ছিল। এই দৃশ্যপটের আবহ সংগীতরূপে বালিহাসের আগমন প্রকৃতিরই তৈরী। দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে পাখির শব্দ। তবুও কানে বাজছে ওদের রেখে যাওয়া শব্দতরঙ্গ। ‘জগতের মুখে আজি এ কী হাস্য হেরি! আনন্দতরঙ্গ নাচে চন্দ্রসূর্য ঘেরি।’
ততক্ষণে মামুজান গনগনে রূপে আগ বাড়াচ্ছেন। সূর্যের তেজে শুধু সংজ্ঞা কেন সকলেই দিশেহারা। বিশেষ করে, ক্রান্তীয় থেকে বিষুবরেখার দেশে। অবশ্য যেখানেই থাকুক, সরাসরি সূর্যের দিকে তাকাতে পারে না কেউ। তাই ছোটবেলায় গ্রহণ দেখতাম কাসার থালায় পানি রেখে তার মধ্যে। মহাকাশে ছায়াগ্রহ রাহু ঘুরতে ঘুরতে একসময় সূর্যকে গিলে খেত। আবার সূর্য রাহুর কাটা মুন্ডু থেকে বেরিয়েও আসত। বড় আগ্রহ নিয়ে দেখতাম তখন। এখনও মাঝেমধ্যে জলের তলে সূর্যের অবয়ব প্রত্যক্ষ করি রবীন্দ্রনাথের মত,
‘ঝরনা, তোমার স্ফটিক জলের
স্বচ্চ ধারা-
তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে
সূর্য তারা।’
তখনও পুরো গনগনে হয়ে উঠেনি সূর্য। আমি তাকিয়ে আছি স্থির দৃষ্টিতে। কোত্থেকে এক বিদঘুটে প্রেইরি ডগ এসে এদিক-ওদিক করতে থাকে। উফ! মহান শিল্পমাঝে বিদঘুটে ছুঁচো যেন। যেন শৈল্পিক ভাষার মধ্যে বিদঘুটে ব্যাকরণের বা-হাত ঢোকানো। আদতেই ব্যকরণ সবসময় বিদঘুটে। সে বাংলা বা ইংরেজি যেই হোক। অবশ্য এ দু’টির বাইরে অন্যকোন ব্যকরণ দেখা হয়নি। ইংরেজি ব্যকরণে নিত্যসত্য হলো প্রেজেন্ট ইনডিফিনিট টেন্স। সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়, পশ্চিমে অস্ত যায়। এসব নিত্যসত্য বলে ধরে নেয়া হতো। সূর্য কী আসলেই উদিত হয় বা অস্ত যায়? গুণদাতো তা বলেন না,
‘সূর্য তো অস্ত যায় না,
পৃথিবী ফিরিয়ে নেয় মুখ।’
সূর্য উদয়-অস্ত না হলেও সবসময় থাকেনা কিন্তু। হঠাৎ হাঠাৎ গায়েব হয়ে যায়। সেবার যেমন হয়েছিল। পুরো আড়াই মাস। আমি একলা একলা থাকি, সূর্য আমার কাছে নেই। তাকে ছাড়া এতদিন কেমনে থাকি? শূন্য শূন্য লাগে সব। যেন কোথাও কেউ নেই। তারপর কোন এক প্রত্যোষে চারিদিক আলো করে তিনি চোখ মেললেন মেলবোর্ণ টুলাম্যারিন এয়ারপোর্টের ইন্টারন্যাশনাল অ্যারাইভেলে। সকলেই গেয়ে উঠল তখন,
‘আজ সকালে সূর্য ওঠা সফল হলো মম
ঘরে এলে ফিরে পরবাসী প্রিয়তম।।’
সূূর্য এরিমধ্যে কোমলতা-¯িœগ্ধতা ঝেড়ে কর্কশ-উষ্ণ হতে শুরু করেছে। নরমের আবহ শেষ করে গরমের ফুৎকার ছাড়ছে। ছোটবেলায় দেখা একটা বাংলা মুভির কথা মনে পরছে, ‘আমিওতো নারী। আমারওতো মন আছে। আমিওতো হতে পারি নরম থেকে গরম।’ গরমের আগমনে আবার গাড়িতে যেয়ে উঠি। ছেড়ে দেই টয়োটা ফোর-রানার, ঠিক নাক বরাবর পূব দিকে। গন্তব্য এখনও অনেক দূর। সূর্য দেখার আর সময় নেই।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৪৩ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৫/০৬/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • দারুণ লেগেছে।
  • অনিরুদ্ধ বুলবুল ২৭/০৬/২০১৮
    মনোরম লেখনী শৈলীতে মুগ্ধতা নিয়ে গেলাম।
    আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানবেন প্রিয়।
  • কম্পোজ আরও ভালো হলে গল্পটি পড়ে আনন্দ পেতাম।
 
Quantcast