www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

কাপুরুষ

শিক্ষা-দীক্ষা তেমন নাই লালু মিয়ার।
তবুও দাতরা গ্রামের সকলেই তাঁকে ওস্তাদ ডাকে। দলের সবাইতো ডাকেই। তের জনের দল লালু মিয়ার। সেই নেতৃত্ব দেয়। অন্যান্য জায়গায় লিডার নামে পরিচিত নেতারা। শুধুমাত্র লালুর দলেই সে ওস্তাদ, লিডার না। সবাই মানে ওকে। প্রচন্ড ভক্তি করে। ওস্তাদ শব্দা লালুর খারাপ লাগে না। লিডার বা ক্যাপ্টেন, মেজর এসব লালু ঠিক বুঝে না। লেখাপড়া করেনি তো, বুঝবে কী করে? তবে স্কুলে সে গিয়েছিল। ফাসিয়াতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ঠিক কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে তা লালু মিয়ার মনে নেই। তিন/চার ক্লাস হবে বোধ করি।
তবুও সে সকলের ওস্তাদ। দলের সকলে প্রচন্ড সমীহ করে। বাচ্চা যে ছেলেটা, কত বয়স হবে, বিশ-একুশ - সেও ভক্তিভরে ওস্তাদ ডাকে তাকে। এই ছেলেটা ঢাকায় থাকে, বাসাবোর দিকে। ঢাকা মেডিকেলে ডাক্তারী পড়া শুরু করেছিল। বছর দু’য়েক পড়েছেও। এরপরই এখানে এসে লালুর দলে যোগ দিয়েছে। এরকম শিক্ষিত ছেলে লালুকে ওস্তাদ ডাকে, লালুর ধন্য মনে হয় নিজেকে। এ জীবন সত্যিই সার্থক। সাব্বির নাম ছেলেটার। শুধু সাব্বির না, লালুর দলে আরও ক’জন লেখাপড়া জানে। আজমত আর বাতেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। জালাল ভাই হাই স্কুলের শিক্ষক। কুদ্দুস আর আকবর স্কুলের গন্ডি শেষ করে দোকানদারি করত। বাকী কয়জন লালুর মতোই, নামে মাত্র স্কুলে গিয়েছে।
দাতরা গ্রামটা লালু মিয়ার নিজের না। গোসাইরহাটের কোথাও তার বসতি নাই। সে কালকিনির চর ঝাউতলা এলাকায় বড় হয়েছে। ওখানেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। বছর কয়েক পর আর স্কুলে যায় নি সে। লেখাপড়াটা তখনকার দিনে ততটা প্রয়োজনীয়তার পাখা মেলেনি। এ নিয়ে কেউ প্রশ্নও করেনি। মা-বাপ, কেউ না। এরপর একসময় ক্ষেতের কাজে লেগে গেছে। জোয়ান-মর্দ যখন সে, মানে বিশ-একুশ বছর হবে, প্রচন্ড খাটতে পারত। হোসেন মিয়ার জমি থেকে দু’তিন আঁটি ধান একাই কাঁধে করে নিয়ে আসত। অথচ বাকীদের এক আঁটি তুলতেই জান যায়। লালু মিয়ার যে অসুরের শক্তি!
দলের মধ্যে রতনকেই সে আগের থেকে চিনত। চর ঝাউতলা গ্রামে একসাথেই বড় হয়েছে ওরা। বাকীরা এদিক-ওদিক থেকে এসেছে। কেউ কেউ সীমান্তের কাছে বনগাঁ থেকে একসাথে ট্রেনিং করে এসেছে। আব্বাস ভাই আর পরিমল কাকা ওর সাথে শরণার্থী কাম্পে ছিল। ওখান থেকে ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়েছিল তাঁরা। এরপর লালুর সাথেই এখানে এসেছে। আব্বাস ভাই যুবক - পয়ত্রিশের মত হবে। পরিমল কাকার পঞ্চান্নতো হবেই। দুর্দান্ত সাহস কাকার। ছোটখাট লিকলিকে মানুষটা, দলের গ্রেনেড ছুড়ে মারার লিডার। এই কাজটা সাহসী ছাড়া সম্ভব না। শত্রুর অতি নিকটে গিয়ে গ্রেনেড ছুড়তে হয়। যত নিকটে তত অব্যর্থ লক্ষ্য, তত সফলতা। একাজে লালুর দলে পরিমল কাকাই সেরা। মাঝেমধ্যে অবশ্য এমদাদ আর কালাম সাহায্য করে। এদেরও বেজায় সাহস।
একাত্তরের প্রথম দিককার কথা। লালু মিয়া যুদ্ধটুদ্ধ কী, ঠিক বোঝে না তখন। ঘরে সুন্দর একটা বউ আছে। আর দু’টো ছেলে - দশ এবং সাত বছর বয়সী। এরপর আর কোন বাচ্চা হয়নি ওদের। একটা মেয়ের বড় শখ ছিল। হোসেন মিয়ার ক্ষেতে কামলা খাটে। মজদুরের শরীর, বেশ দু’পয়সা হয়। পরিবার নিয়ে আনন্দফূর্তি করে। অলস বসে থাকে সময় সময়। বউ ঠেলা দিলেও কাজে যায় না তখন। যুদ্ধের ব্যাপারটা সে শুনেছে। শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। এখন যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হবে। লালু মিয়া চঞ্চল হয় না একটুও। স্বাধীনতা ব্যাপারটাই সে বুঝে না। সে কাজ করে, খায় - স্ফুর্তিতে আছে।
যুদ্ধ শুরু হয়েছে তখন। পাক আর্মি মাদারীপুর চলে এসেছে। চারিদিকে জ্বালাও-পোড়াও। লালু শুনেছে - গুরুত্ব দেয় না, ‘ধুরও! আমাগো কী হইব?’ অনেকেই কালকিনি ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে। ফাসিয়াতলা স্কুলের হেডমাস্টার কয়েকবার তাড়া দিয়েছে, ‘পলাও লালু মিয়া। পাঞ্জাবীরা বড়ই বদ। জোয়ান দেখলেই মুক্তি ভাবে। পয়লাবারই তোমারে মাইরা ফালাইব।’
‘কী কন ছার? আমারে মারব ক্যা? আমিতো কিছু করি নাই।’
আসলেই লালু কিছু করে নাই। তবুও কিছু একটা হয়। কালকিনি বাজারে পাক বাহিনী চলে এসেছে। হেডমাস্টার তার আগেই তাড়া লাগায়, ‘ভাগো সবাই। দুই ঘন্টাও লাগবে না অগো চর ঝাউতলা আসতে।’
লালু মিয়া তাও যায় না। কেন যাবে সে? সে মাটি মুঝে, নিড়ানী বুঝে, ধানের চারা বুঝে। আর বুঝে গরম ভাত, বউয়ের আদর-সোহাগ। সেদিনও সকালে জমিতে গেছে সে। হোসেন মিয়ারে কেমন জানি লাগে সেদিন। অযথাই আনন্দ, খুশীতে ভরপুর। ‘বুঝলা লালু, আল্লাহপাক ফেরেশতা পাঠাই দিছে। সব মাইরা কাইট্টা ছাফ কইরা দিব। দেশ রক্ষা হইবই। মুজিবররেও মাইরা ফালাইব।’
লালু মিয়ার ভাল লাগে না। দেশ রক্ষা-টক্ষা সে বুঝে না। তবে শেখরে সে চিনে। বাপের চেয়েও বেশী সম্মান করে সে। কোথাও শেখ সাহেবের ছবি দেখলেও ছালাম দিয়ে ফেলে সে। মনে মনে বলে, ‘এই মানুষটারে মাইরা ফালাইব ক্যান? হোসেন মিয়াই বা খুশী হইব ক্যান?’ লালু গোয়ার কিছিমের। ঝাঁঝের সাথে বলে, ‘এইডা কী কন মাহাজন সাব? শেখরে মারব ক্যা? হে কী করছে?’
‘কী করছে বোঝ না? হে দ্যাশ স্বাধীন চায়। হারামীর পুত আমাগো ফরিদপুরডারেই বিপদে ফালাইছে।’
‘মুখ সামলাইয়া কথা কন মাহাজন। শেখরে গালি দিবেন না। রাহেন আপনের কাম। আমি আর আপনের লগে নাই।’ লাঙ্গল-কোদাল ফেলে লালু হনহন করে হাঁটা শুরু করে। সোজা বাড়িতে না গিয়া বাজারের দিকে যায় সে। বাজার কেমন খালি খালি লাগছে। দু’একজনের সাথে দেখা হয়। ‘আর্মি আয়া পড়তাছে। এই আইল বইল্লা। পলাও লালু।’ এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে কিছুক্ষণ। ভয় ভয় লাগা শুরু করে। ‘তয়, পলাইতে হইব কী?’
বাড়ির দিকে রওনা দেয় সে। পাক আর্মি চর ঝাউতলা বাজারে নামে তখনই। হোসেন মিয়া ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী গায়ে বাজারে আসে। উর্দু না জানলেও ভাঙা ভাঙা শব্দে কথাবার্তা চালিয়ে যায় সে। তার মুখ থমথমে। লালু মিয়ার আজকের অপমান সে ভুলতে পারছে না। পাক অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ছার, বিরাট মুক্তি আছে এইখানে। বাড়িতেই আছে এহন। চলেন ঐডারে ক্ষতম কইরা আসি।’
ক্যাপ্টেন কায়ানী অফিসারের নাম। খুন-খারাবী কায়ানীর নেশার মত। হাত নিশপিশ করে সবসময়। শুরুতে ভেবেছিল, এই বুড়োটার বুকেই গুলি ঢুকিয়ে দিবে। পরে দেখে, এতো আমাদেরই লোক। তৎক্ষনাৎ রওনা দেয় সে হোসেন আলীকে সাথে নিয়ে। আর্মির সাজোয়া গাড়ি, মুহুর্তেই লালুর বাড়িতে। লালু তখনও এসে পৌঁছেনি। পুরো বাড়ি সার্চ করে ওরা। লালু বউকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। বেশী কান্নাকটি করছে দেখে ছেলে দু’টিকে গুলি করে থামিয়ে দিয়ে যায় উঠোনের মধ্যে। আর যাবার সময় ঘরে আগুন দেয়া এদের উল্লাসের অংশ। পশুর মতে হাসে কায়ানী।
বাশ-ছোনের ঘর, দাউ দাউ করে পুড়তে সময় লাগে না। আগুন তখন নিভু নিভু, বাড়িতে ঢোকে লালু। ছাই দেখে, ছেলে দু’টোর লাশ দেখে। বউকে খুঁজে চারিদিক। সাগরের মত জল ঝরিয়ে কাঁদে সে। এক সময় থামে। উঠোনে বসে থাকে নিশ্চুপ। পাক আর্মি ইতিমধ্যে আরও বাড়িঘর জ্বালিয়ে হোসেন মিয়ার বাড়িতে গেছে। তরুন অফিসারটা হোসেন মিযার খাস কামড়ায় লালুর বউকে নিয়ে ঢুকেছে। ফাসিয়াতলা স্কুলের হেডমাস্টার পরিস্থিতি দেখতে দেখতে লালুর বাড়িতে আসে এসময়। সব দেখে লালুকে বলে, ‘হোসেন মিয়া আর্মিগো নিয়া তোমার বাড়িতে আইছিল। হেরাই সব কাম করছে। এহনও সময় আছে পালাও। ইন্ডিয়া চইলা যাও। আরেকখান কাজ করতে পার, ট্রেনিং নিয়া আইসা যুদ্ধ কর।’
লালু ঝট করে তাকায় মাস্টার সাহেবের দিকে। ভেজা চোখেও কাঠিন্য ফুটে উঠে। মাস্টার সাহেব আবার বলে, ‘হুন লালু, আমার এক ভাইস্থা আছে মাদারীপুরে। সে মুক্তি বাহিনীর মেজর। তুমি সোজা খলিলের কাছে চইলা যাও। হেই সব ব্যবস্থা কইরা দিব।’
মাস্টার সাহেব হনহন করে অন্য বাড়ির দিকে রওনা দেন। লালু ঠায় বসে থাকে কিছুক্ষণ। জানাজা দেওনের কেউ নাই। নিজেই কবর খুড়ে ছেলে দু’টোকে কবর দেয়। এরপর সোজা উত্তরে হাঁটা দেয়। রাত পার করে ভোর সকালে সে মাদারীপুর পৌঁছে। পথে কিছুই খায় নি। কোথাও থামেও নি। হঠাৎ করে একজন মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে বের করা কঠিন ব্যাপার। লালু মিয়া এই কঠিন কাজটা করে ফেলে। কীভাবে কীভাবে সে মেজর খলিলের কাছে পোঁছে যায়।
‘ছার, আমি যুদ্ধ করুম।’
‘তা করবি, সমস্যা কী?’ মেজরের মেজাজ সব সময় তিরিক্ষি। তুই-তোকারি ছাড়া থাকতে পারেন না।
‘ছার, কিছুই জানিনা। কেমনে যুদ্ধ করুম?’
মেজর খলিল একটা চিরকুট লিখে দেয়। বলে, ‘সোজা বনগাঁ রিফিউজি ক্যাম্পে যাবি। এই চিরকুটটা দিলে ওরা তোরে ট্রেনিং ক্যাম্পে নিয়া যাইব।’
এই প্রথম লালু মিয়া কিছু মুখে দেয়। শুকনা রুটি আর পানি। চোখের পানি শুকায়ে গেছে আগেই। কোন কথা বলে না। চুপচাপ থাকে। আর ফোঁস ফোঁস করে কিছুক্ষণ পর পর। হোসেন মিয়ার চেহারা ভাসে। বিরাট পাঞ্জা দিয়ে একটা থাবা মারে সামনের দেয়ালে। হাতে ব্যথা পায় না একটুও। সিমেন্টের দেয়াল, অথচ আঙ্গুলের দাগ বসে গেছে।
পশ্চিম দিকে হাঁটা শুরু করে সে। রাস্তা চেনে না সে, বনগাঁও চিনে না। ‘তয় মেজর সাব কইছে পশ্চিমে যাইতে।’ পশ্চিমেই হাঁটছে সে। গোপালগঞ্জ পার হবে। মধুমতি সাঁতরে চলে যাবে। এরপর যশোহর ধরে আরও পশ্চিমে। সীমান্ত পার হলেই বনগাঁ। চলতি পথে দেখে সে, অগুনিত মানুষ ছুটছে। সবার লক্ষ্য সীমান্ত পার। সীমান্ত কী জিনিস সে বোঝে না। তবে একসময় মনে হয় পশ্চিমগামী মানুষের ¯্রােত নাই। চারিদিকে অস্থিরতাও নাই। মানুষের মধ্যে ভয়ের ছাপ নেই। তারমানে সে সীমান্ত পার হয়ে গেছে। পুরো দু’দিন লেগেছে তার। চারটা খেয়েছে, কী খায়নি। তবে মনের জোর ছিল প্রচন্ড। বনগাঁ রিফউজি ক্যাম্পে চলে আসে খুঁজতে খুঁজতে।
ক্যাম্পের ছোট ছোট কুঠুরীর মত ঘরে ঠায় বসে থাকে সে। কোন কথা বলে না। অপেক্ষায় থাকে। কখন ডাক আসবে ট্রেনিংয়ের। দু’চোখ এক করতে পারে না লালু। বাচ্চা দু’টির চেহারা ভেসে উঠে। বউয়ের মুখ ভেসে উঠে। ধড়ফড় করে জেগে উঠে সে। বসে থাকে ঠায়। ডাক আসে একদিন, ট্রেনিংয়ের।
প্রথম কিছুদিন শারীরিক প্রশিক্ষণ। দৈত্যের মত শক্তি লালুর। প্রশিক্ষক অবাক হয় লালু শারীরিক গঠনে। দশ-বারটা ইট অবলীলায় হাত দিয়ে উঠিয়ে ফেলে। কাঁধে করে সঙ্গীদের অনেকদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে সে। গাছে চড়া, দেয়াল বেয়ে উপরে উঠা, পানিতে সাঁতার কাটা - লালু মিয়ার ধারেকাছেও কেউ নেই। ক’দিনের ট্রেনিংয়ে মাংসপেশীগুলো আরও ফুলে ফুলে উঠে তাঁর। উনারা যা বলে, তার চেয়ে বেশী করে সে। লক্ষ্য যত তাড়াতাড়ি অস্ত্র হাতে পাওয়া।
একসময় হাতে রাইফেল ধরিয়ে দেয়া হয়। ঐ যে সামনে বোর্ডে মানুষ আঁকা আছে, ওখানে গুলি করতে হবে। উত্তেজনায় কাঁপে সে। জীবনে বন্দুক দিয়ে গুলি করেনি সে। তারপরও প্রথম গুলিটা সে করে। বোর্ডে হোসেন মিয়ার চেহারা ভেসে উঠে। জীবনের প্রথম গুলি মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়। কত রকম অস্ত্র দিয়ে গুলি করে এরপর। লালুর টিপ ভারী নিখুঁত। প্রশিক্ষকরা দারুণ খুশী। ট্রেনিং শেষ হয়ে আসে প্রায়।
এরপর চলে যুদ্ধকৌশল শিখানো। কখন শত্রুকে আক্রমন করতে হবে? কীভাবে করতে হবে? পরিকল্পনার নিয়ম-কানুন। শত্রুর দূর্বল দিক খুঁজে বের করা। সেভাবে আঘাত হানা। নিজেদের ক্ষতি যথাসম্ভব কম করা। এরকম হাজারো সব কথা। লালু এসব কম বোঝে। তাই সময় লাগে। অনেক সময় লাগে তার। সব বুঝে নিয়ে সে ট্রেনিং শেষ করে। তখন মে মাস শেষ হয়ে গিয়েছে।
ট্রেনিং থেকে লালুকে মাদারীপুর পাঠিয়ে দেয়া হয়। মেজর খলিলের কাছে রিপোর্ট করে শরীয়তপুরের গোসাইরহাটে সে যুদ্ধ করবে। পাক বাহিনীর ক্যাম্প আছে সেখানে। ওখানে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন প্রতিরোধ নেই। লালুর দায়িত্ব ওদেরকে ক্ষতম করার। মোট তের জনের দল দিয়েছে ওরা। তিনজন লালুর সাথেই আছে। আর বাকীরা মেজর খলিলের ওখান থেকে আসবে।
নির্বিঘেœই মাদারীপুর আসে সে। সবকিছু বুঝে নিয়ে গোসাইরহাট রওনা দেয়। সাথে আব্বাস ভাই আর পরিমল কাকা। বাকীরা দু’একদিনের মধ্যেই আসবে। কালকিনি হয়ে গোসাইরহাট যাবে। লালু মিয়া থামে কালকিনিতে। দুই মাস যাবৎ পরিকল্পনাটা মাথায় নিয়ে ঘুরছে। আজ সময় এসেছে। বাকীদের বলে, ‘আব্বাস ভাই আর পরিমল কাকা, আপনেরা যাইতে থাহেন। আমার এহানে কিছু কাম আছে। রাতে শেষ কইরা কাইল সহালে যামু।’
‘আপনের কী কাম, ওস্তাদ?’ লালু এরিমধ্যে ওস্তাদ হয়ে গেছে।
‘আমার নিজের কাম। আপনেরা আগাই যান।’
‘আমরা কামডা হুনতে চাই?’ পরিমল কাকার মুখ শক্ত।
লালু মিয়া বিস্তারিত বলে। ‘হোসেন মিয়ার ধর-মাথা আলাদা না কইরা কোন কাম শুরু করুম না।’ হিস হিস করে লালু মিয়া।
‘আমরাও আছি আপনের লগে, ওস্তাদ। আইজ রাইতেই ওপারেশন কইরা ফালামু।’ যুদ্ধের যে কোন কাজকেই ওরা ওপারেশন বলতে শিখে গেছে ততদিনে।
সন্ধ্যা পর্যন্ত চর ঝাউতলা গ্রামের কিনারায় থাকে ওরা। অন্ধকার হলেই গ্রামে ঢোকে। নিঃশব্দে পুরো গ্রামটা চক্কর দিয়ে পরিস্থিতি বুঝে নেয়। পাক বাহিনীর কোন ক্যাম্প এখন নেই। কালকিনি সদরে ওরা আছে। হোসেন মিয়া এই দুই মাসে আরো একটা ঘর তুলেছে তার ভিটায়। পাকা ঘর, উপরে টিনের চাল। বেশ বড় ঘরটা। বোধ হয় আর্মি বা তার নিজের লোকজন থাকে মাঝেমধ্যে। আল-বদর বাহিনীর এই এলাকার গণ্যমান্য একজন সে। পুরো কালকিনি তার নিয়ন্ত্রণে।
ঝোপের আড়ালে বসে অনেক্ষণ ধরে হোসেন মিয়ার বাড়ি লক্ষ্য করে ওরা। কতজন বাড়িতে আছে, হোসেন মিয়া কী করছে সব নখদর্পণে নিয়েছে। হোসনে মিয়া কোন ঘরে ঘুমাল তাও দেখে নিয়েছে। বাড়ির শেষ বাতিটা নিভে যাওয়ার পর ওরা বের হয়। পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলেছে। পরিমল কাকা আড়ালে থাকবে। অবস্থা বেগতিক দেখলে সে এলাপাথাড়ি গুলি ছুড়বে। যাতে ওরা বুঝতে পারে অনেক লোক আছে এখানে। চারিদিকে কোন পাহারা নাই। তাই লালু আগে যাবে। হোসেন মিয়ার ঘরে ঢুকবে। পিছন পিছন আব্বাস থাকবে। হোসেন মিয়ার দরজার কাছে দাড়িয়ে তাকবে সে। কেউ ঢুকতে চাইলে ওখানেই খতম।
লালু কাধের রাইফেলটা পরিমলের কাছে দেয়, ‘কাকা এইডা রাহেন। আমি দা দিয়াই কাম সারুম। আওয়াজ হইব না।’
দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। কাঠের দরজা, বেশ মজবুত। আব্বাস আর লালু মিয়া কাধ ঠেকিয়ে সজোরে ধাক্কা দেয়। মট মট করে কাঠের খিল খসে পড়ে। লালু ভিতরে ঢোকে। ইতোমধ্যে শব্দে হোসেন মিয়া জেগে উঠেছে। হারিকেনের আলো বাড়িয়ে বলে, ‘কে কে?’
লালু বিছানার সামনে গিয়ে দাাঁড়ায়, ‘আমার বউডা কই, মাহাজন?’
‘কে? লালু? ওহ তুই। আর কইস না। পাকিস্তানি আর্মির ক্যাপ্টেন ওরে লইয়া গেছে। আমি জানি না। এত কান্নাকাটি করলাম, স্যার আমাগো বউমারে দিয়া যান। দিল না।’
‘ক্যাপ্টেনের নামডা জানেন?’ লালু চিবিয়ে চিবিয়ে বলে।
‘হ জানি। ক্যাপ্টেন কায়ানী। তয় মানুষটা ভালা। সবকিছু দিয়ে-থুয়ে খায়। খালি একা একা খায় না।’
লালুর হাতে দা বেড়িয়ে এসেছে। কোপ দেবার আগে বলে, ‘জয় বাংলা কন, মাহাজন।’
হঠাৎ ভীত হয়ে উঠে হোসেন মিয়া, ‘জয় বাংলা।’ চিৎকার দিতে চেষ্টা কওে, ‘মাইরা ফালাইল। তোরা কে কোথায়?’
লালু মুখ চেপে ধরে। ‘জয় বঙ্গবন্ধু কন।’
‘জয় বঙ্গবন্ধু।’
‘এইবার আল্লাহর নাম লন।’ বলেই সজোড়ে কোপ দেয় সে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে। এতদিন শুধু ট্রেনিং করেছে। এই প্রথম কোন জলজ্যান্ত মানুষকে আঘাত করল সে। সমস্ত ঘৃণা আর রাগ এক করে মারা কোপটা মাথা থেকে শরীর আলাদা করে দেয়। রক্তে বিছানা ভাসতে থাকে। বাড়ির অন্য লোকজন বুঝে ওঠার আগেই বেড়িয়ে আসে ওরা। সারা শরীরে একটা পৈশাচিক আনন্দ খেলা করে লালুর। ছেলে দু’টোর কথা মনে হয়। বউয়ের কথা মনে হয়। আনন্দ বোধ করে সে। প্রভূত আনন্দ হয় তার।
‘কালকিনির ক্যাম্পে ওপারেশন চালাইতে হইব। ক্যাপ্টেন কায়ানীরে খাইতে হইব। আগে গোসাইরহাট যাই। সব গুছাই লই।’ গম্ভীর স্বরে কথাগুলো বলে সে। লিডারের মত কথার স্বর, ওস্তাদের মত। বাকী দু’জন কিছু বলে না। শুধু অনুসরণ কওে তা৭কে।
শরীরের জোর, মনের জোর আগেই ছিল। ট্রেনিং থেকে নিয়ে আসে, কৌশল আর অস্ত্র চালনা। গোসাইরহাটের পূর্বের দিকে ভোগকাঠি স্কুলের পরিত্যক্ত ভবনে গোপনে যেয়ে উঠে তিনজন। সাথে অস্ত্রপাতি কিছু আছে। রান্নার যোগারযন্ত্র শুরু করে প্রথমে। দ্বিতীয়দিন বাকী আটজন চলে আসে। সেই ডাক্তার ছেলেটাসহ। দিনের বেলা পারতপক্ষে বের হয় না ওরা। রাতেই সব কাজকর্ম সারে। দিনে প্রস্তুতি। অস্ত্র যা আছে খুবই কম। অস্ত্র লাগবে। তাই প্রথম ওপারেশন গোসাইরহাট থানা।
‘আমরা আটজন যামু। বাকী তিনজন এইহানে থাকবেন। ক্যাম্প পাহারা দিবেন। আমি, আব্বাস ভাই, রতন, আর কালাম থানার মইধ্যে ঢুকব। পরিমল কাকা, সাব্বির, বাতেন আর জালাল ভাই বাইরে থেকে আমাগো শেল্টার দেবেন।’
‘ঠিক আছে, ওস্তাদ।’
‘পিছনের দেয়াল বাইয়া থানায় ঢুকব। আগে আপনেরা চাইরজন চাইর কোণায় পজিশন লইবেন।’
রাতের প্রথম শেয়াল ডাকা শুরু হতেই রওনা দেয় ওরা। ঘুরপথে, ঝেপঝারের আড়ালে থেকে থানার কাছে আসতে ঘন্টাখানেক লেগে যায়। সবাই ঘুমন্ত, কোন আলো নেই। সামনের গেটের কাছে দু’জন সেন্ট্রি বসে আছে টুলে। ওরাও ঘুমুচ্ছে। দেয়াল টপকে ঢুকে পরে চারজন। লালু মিয়ার কঠিন মুখ। ওর চেহারা দেখে শত্রু কি, নিজেরাই ভয় পেয়ে যায়। ঘরের দরজা খোলাই থাকে থানার। কারণ চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি থাকার কথা। ডিউটির লোকটিও চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে।
নির্বিঘেœই ভিতরে ঢুকে ওরা। ঘুমিয়ে পড়া মানুষটিকে বেঁধে ফেলে নিঃশব্দে। গেটের পাহারাদার দু’জন আগেই বন্দি। এরা সবাই বাঙালি। তাই কাউকে আঘাত করে না লালুর দল। ওস্তাদের নিষেধ আছে তাই। সর্বমোট পাঁচজন কনস্টেবল আর একজন সাব ইন্সপেক্টর ছিল ওখানে। কেউ প্রস্তুত ছিল না। সবাইকে বেঁধে যা কিছু অস্ত্র আর গোলা আছে নিয়ে ক্যাম্পে চলে আসে ওরা।
‘ওস্তাদ, সব ঠিক আছে?’ উদ্বিগ্ন কুদ্দুস আর আজমত প্রশ্ন করে।
‘হ, আমরা ভালা আছি। দ্যাখ, কত কিছু নিয়া আইছি। তয় বন্দুকগুলান পুরানা। দুই একদিনের মধ্যেই আর্মি ক্যাম্পে যামু। সবগুলানরে খাইতে হইব।’
‘হঠাৎ করেই সকলে বলে উঠে, জয় বাংলা।’
লালু চোয়াল শক্ত করে বলে, ‘জয় বাংলা। আহেন, সবাই মিলা অস্ত্রগুলারে ঘষা-মাজা কইরা মানুষ করি।’
ডাক্তার ছেলেটির দিকে তাঁকিয়ে বলে, ‘তুমি এইহানে ক্যান, সাব্বির মিয়া। ডাক্তারী পড়বা, বড় হবা। যুদ্ধ-ফুদ্ধ তোমার কাম না।’
সাব্বির পঁচিশ মার্চ রাত্রের কথা বলে। পাক আর্মির নির্বিচারে নিরীহ মানুষ মারা ঘৃণ্য কাজের কথা বলে। সেই মায়ের কথা বলে। মায়ের কথা বলতে গিয়ে প্রায় কেঁদে ফেলে সাব্বির। সকলেই শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। অথচ, মহিলাটি উল্টো দিকে যাচ্ছে। ‘ওস্তাদ, আমি ভদ্রমহিলাকে জিগ্যেস করি আপনি ওদিকে যাচ্ছেন কেন? মহিলা চিৎকার করে কাঁদে। তার কোলের বাচ্চাটা কোথায় পড়ে গেছে। সে খুঁজতে বেড়িয়েছে। ওস্তাদ, এখনো গায়ে কাটা দেয়। সকল ভয় দূর করে সন্তানের জন্য সে আর্মিও দিকে ছুটছে। তখনই ঠিক করি যুদ্ধ করতে হবে। শয়তানগুলোকে মারতে হবে।’ সবাই মন দিয়ে শোনে, চোখ-মুখ শক্ত করে শোনে। কোন কথা বলে না।
থানা থেকে ভালই সংগ্রহ হয়েছে এদের। এরপর এক সপ্তাহ জুড়ে শুধুই পরিকল্পনা। কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে পাক ক্যাম্পের চারিদিক ঘুরে এসেছে কয়েকবার। গোসাইরহাট আর ডামুড্যার মাঝামাছি ডুবখোলা স্কুলে পাক বাহিনীর ছোট্ট ক্যাম্প আছে একটা। সব মিলিয়ে পঁচিশজন, গুনে দেখেছে ওরা। এতদিন ভালই ছিল ওরা। কোন কাজ নেই শুধু, খাওয়া আর নারী মাংস। গোসাইরহাট থানা লুট হবার পর ওরা একটু সতর্ক।
তবুও ভয় পায় না লালুর দল। অন্ধকার রাত দেখে বের হয়। ঘন্টা দেড়েক লাগে ক্যাম্পের কাছে পৌঁছুতে। ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে সকলে। ক্লান্ত একটু। আধা ঘন্টার মত জিরিয়ে নেয় লালু। ‘কাকা, কালাম আর বাসেত গ্রেনেডগুলান নিয়া কাছাকাছি যাইবেন। যত কাছে পারেন। তিনজন তিনদিক দিয়া। কয়েকটা ছুইড়া মারার পর যহন ওরা বাইরে আইব তহন গুলী করমু আমরা। বাংকারের পিছনে যারা ওগোরে আগে শ্যাষ করতে হইব।’
মোট একঘন্টা ওপারেশন চলে। এটা থানা না, আর্মি ক্যাম্প। প্রবল প্রতিরোধ আসে। কালামের বুকে গুলি লাগে। কিছু আসে যায় না, থামে না ওরা। পুরো পঁচিশজনকে খতম করে গোলাগুলি থামে। পুরো সময়টা বারে বারে বউ-ছেলেদু’টোর চেহারা ভাসে লালুর চোখে। আরও ক্রুদ্ধ হয় সে। আরও গুলি, আরও পাক সেনা হত্যা।
প্রচুর রসদ ক্যাম্পে। ওরা ক্যাম্প পরিবর্তত করে এখানেই থেকে যায়। কারণ, প্রতিক্রিয়া আসবেই জানাকথা। আরও পাক আর্মি আসবে প্রতিশোধের নেশায়। তখনই আবার আক্রমন হবে। খুনের নেশায় পেয়েছে ওদের। চোখের জলে কালামের দাফন করে ওরা। লালুর খালি মনে হয় ক্যাপ্টেন কায়ানীর কথা। আমার বউরে নিয়া গেছে হারামজাদা। এবার তোমার পালা।
মুক্তিবাহিনীর নিয়ম ভঙ্গ করে লালু। গোসাইরহাট পার হয়ে কালকিনির পাক ক্যাম্পে হামলা করবে সে। ঐটা তার এলাকা না। তবুও সে যাবে। দলের সবাই রাজী। বেশ বড় ক্যাম্প। তা হোক, ক্যাপ্টেন কায়ানীরে খাইতে হইবেই। দলের সবাই এক পায়ে খাড়া। কালকিনির দিকে রওনা দেয় ওরা। সাথে সদ্য পাওয়া ভারী অস্ত্র।
যুদ্ধ অনেকক্ষণ চলে। তবুও ক্যাম্প দখল করতে পারে না ওরা। গুলি শেষ হয়ে আসছে। লালু অন্ধকারেই চিতার মত ক্যাম্পের ভিতরে ঢুকে পড়ে। গোলাগুলি সমানে চলছে। চলুক। তার ক্যাপ্টেন কায়ানীরে চাই। কোণার দিকের ঐ রূমে সে আছে, লালু জানে। ছায়ায় ছায়ায় লালু দরজার কাছে এসে পরে। একজনই আছে শুধু এই দরজা পাহারায়। অতর্কিতে চাকু দিয়ে ওর গলা কেটে ফেলে সে। এরপর রূমে ঢোকে। সুদর্শন একজন যুবক। কিন্তু চোখ দু’টো সাপের মত।
লালু বলে, ‘আমার বউ কই?’
কায়ানী রাওয়ালপিন্ডির কাছের অ্যাবোটাবাদের মানুষ। পশতু বলে। বাংলা কীভাবে বুঝবে সে? টেবিলে রাখা রিভালবারের দিকে হাত বাড়ায়। গুলি করে লালু। একটা না, পরপর চারটা। এক দলা থু থু ফেলে বেড়িয়ে আসে। গোলাগুলি তখনো চলছে। ছায়ায় ছায়ায় ফিরতি পথে দলের কাছে চলে আসে। ইশারা করে ফেরত চলে আসার। কাজ শেষ।
গোসাইরহাটে ফিরে উৎসবের জন্য রেখে দেয় রাতটা। চারিদিকে ত্রাসের খবর রটে যায়। এতদিন মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা কায়দায় ফুটুশ-ফাটুশ গুলি আর ব্রিজ-কালভার্ট উড়িয়ে দেবার মধ্যেই ছিল। সরাসরি ক্যাম্পে গিয়ে আক্রমন লালুর দলই করেছে শুধু। ঢাকায় পাক আর্মির হেডকোয়ার্টার লালুকে শায়েস্তা করতে আরও সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বড় দল আসবে লঞ্চযোগে। সরাসরি গোসাইরহাট।
লালু সব খবরই পেয়েছে সে দূত মারফত খবর পায়, খবর দেয়। সে কৌশলী যোদ্ধা এখন। কিন্তু ইদানিং কারো কারো চলাফেরা দেখছে সে এলাকায়। কেউ কেউ এখানকার, আবার কেউ নতুন। এরা মুক্তিযোদ্ধা না। তবে কি হোসেন মিয়ার গ্রুপের? রাজাকার আল-বদর। এরিমধ্যে লালু খবর পায়, পাকসেনার লঞ্চ আসছে। পদ্মার মধ্যে এখন। আজ রাতেই গোসাইরহাট পৌঁছুবে। লালু পরিকল্পনা ঠিক করে রেখেছে, শুরুতেই রুখে দিব। লঞ্চ থেকে নামার আগে পুরো লঞ্চই ডুবিয়ে দিবে।
‘কাকা, আপনে বাসেত আর এমদাদ লঞ্চ দেখা মাত্রই পানিতে নাইমা যাবেন। সাঁতরাইয়া যত কাছে যাইতে পারেন। রাইতের বেলা ওরা দেখবার পারব না।’
‘ঠিক আছে, ওস্তাদ।’
‘আমার হাতের দিকে তাকাই থাকবেন। আমি ইশারা দিলেই গ্রেনেড মারা শুরু করবেন। আর আমরা এইখান থিকা গুলি করমু। দেহি শালারা কই যায়।’
সব প্রস্তুতি নিয়ে নদীর পারে পজিশন নিয়ে আছে ওরা। হঠাৎ শুনে পিছনে জয় বাংলা শ্লোগান। ‘বিষয়ডা কী, ওস্তাদ?’
‘বুঝতাছি না। কেডায় অরা।’ লালু স্পষ্ট চিন্তিত। লালুরা নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। আর পিছন দিক দিয়ে জয় বাংলা বলে পনের বিশ জনের দল এদিকেই আসছে। রাতে চেহারা দেখা যাচ্ছে না ভাল করে। তবে ওদের হাতে অস্ত্র আছে। তবে কি আরও মুক্তিযোদ্ধা যোগ হয়েছে ওদের সাথে। লালু হেসে উঠে খুশীতে।
তখনই গুলির শব্দ। আচমকাই গুলি করে ওরা। কাপুরুষের মত পিছন দিকে থেকে সোজা লালুর দলের দিকে। চকিতে একজনের চেহারা দেখতে পারে লালু - শামচু। কালকিনির আল-বদর নেতা। কিন্তু ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে। কাপুরুষের গুলিতে ঝাঝড়া হয়ে গেছে অনেকেই। লালুর পায়ে গুলি লেগেছে। তবুও লালু হুঙ্কার দেয়, ‘সবাই হুইয়া পরেন।’
পিছন দিকের আক্রমনের প্রস্তুতি ওদের ছিলনা। বৃষ্টির মত গুলি সবাইকে গ্রাস করে। ঢলে পড়ে লালু।
কতকগুলো নপুংসক বাঙালি কাপুরুষের কাছে প্রাণ হারায় অসম সাহসী লালু ও তার দল।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৬৬ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৫/০৫/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • মোঃ আরিফুল মিয়া ২৩/০৫/২০১৮
    ভালো লাগলো
  • ভাল লাগল।
 
Quantcast