www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

নৃশংস

রশিদ খুন হয়েছে।
খুনটা হয়েছে সালথায়। ফরিদপুর জেলার এই জনপদে খুনখারাবি খুব একটা নতুন কিছু না। সারা দেশে কত কত বিখ্যাত জায়গা আছে! অথচ সালথা খুনের জন্যই বিখ্যাত। আসলে কুখ্যাতই বলা উচিত। কতটুকুই বা হবে এলাকাটা গায়-গতরে। ছোট্ট একটা উপজেলা মাত্র। অথচ মাস গেলেই খুন নিয়মিত। বছর গেলে গণনা দু’অঙ্কে যাবেই যাবে। রাজনীতি বড়ই সংঘাতপূর্ণ এখানে। দু’পক্ষই বেশ শক্তিশালী। ফলে বছরজুড়ে সংঘাত লেগেই থাকে। ক্ষমতার মোহ ভয়ংকর সর্বনাশী। সবকালেই ছিল। একবার যিনি এই মোহতে আকৃষ্ট হয়েছেন তার আর নিস্তার নেই। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে সবাকিছুই করতে হয় তাকে। তবুও শেষ রক্ষা হয় না কখনো। ক্ষমতা হাতবদল হতেই থাকে। জগতের এইই নিয়ম।
এই সবকিছু করার মধ্যে খুনখারাবিও আছে। সালথা থানার বর্তমান ওসি নুরুল হাসান বিচলিত হন না। এত খুনের তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচার করার সামর্থ, লোকবল তার থানার নাই। তাই অনেক খুনই বিচারের বাইরে রয়ে গেছে। কবে বিচার হয়ে দোষী শাস্তি পাবে তার হদিস কেউ জানে না। ওসি নুরুল হাসান নিজেই জানেন না। তবে রশিদের খুনটাতে নুরুল হাসান বিচলিত। বাচ্চা ছেলে, বার-তের বছর হবে। এই ছেলেটাকে কে খুন করল? খুনের ধরণও নৃশংস। পুরো দেহ থেকে মাথা আলাদা করা।
‘নুরুজ্জামান, ঘটনাটা খুলে বলোতো?’ ওসি সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে ফোনটা কানে ধরেন। নুরুল হাসানের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এখনো মাথাভর্তি চুল। দু’একটা পাক ধরেছে তবে বেশীর ভাগই কুচকুচে কালো। নিখুঁত করে দাড়ি-গোফ কামানো। গায়ের রঙ ফরসা। শরীর স্বাস্থ্য বেশ ভাল। দেখতে সুপুরুষই লাগে। নি¤œপদ থেকে প্রোমোশন পেয়ে ওসি হয়েছেন বছর পাঁচেক হলো। অভিজ্ঞতায় ভরপুর ভদ্রলোকের। পুলিশের চাকরিটা তিনি ভালই বুঝেন। কাকে ধরতে হবে, কাকে ছাড়তে হবে - নিখুঁত বলতে পারেন তিনি। পরিস্থিতির চাপ সামলে চাকরিটাকে ভালভাবে টিকিয়ে রাখতে তার জুড়ি মেলা ভার।
লোকটিকে সৎ বলা যাবে না কোনভাবেই। তবে নিন্দুকেরাও যে তাকে অন্যান্য পুলিশের মত কসাই বলবেন তা কিন্তু না। কী যেন একটা আছে ভদ্রলোকের মধ্যে। যার ফলে তিনি ঘুষখোরদের থেকে আলাদা। আবার ঠিক পরিপিূর্ণ সৎও না। মেজাজটা সবসময় তিরিক্ষি তার। তাই বলে সকলেই তাকে অপছন্দ করে, ঠিক তা না। বরঞ্চ মানুষ তাকে পছন্দই করে, আন্তরিকভাবেই করে। পুলিশের প্রতি সাধারণের যে ঘৃণা তা নুরুল হাসানের উপর খুব একটা বর্ষিত হয় না। কীভাবে তিনি সকলকে ম্যানেজ করেন? উত্তরটা রহস্যই আসলে।
‘স্যার, ঘটনা বিস্তারিত।’ সাব-ইনসপেক্টর নুরুজ্জামান শুরু করেন প্রথম থেকে।
‘সমস্যা নাই, নুরুজ্জামান। তুমি বিস্তারিতই বল। আমি শুনছি।’ নুরুজ্জামান সংক্ষেপে কথা বলতে পারে না। অবশ্য ওসি সাহেব পুরোটাই শুনতে চাচ্ছেন।
‘স্যার, রশিদকে দুই দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছিল না। ওর বাবা-মা এখানে-ওখানে খুঁজে, কিন্তু রশিদ কোথাও নেই।’
‘তারপর?’
‘আজকে জঙ্গলের দিক থেকে পঁচা লাশের গন্ধ আসায় সকলে ওখানে গিয়ে লাশটা পেয়েছে। কে বা কারা রশিদকে খুন করে জঙ্গলে পুতে রেখেছিল। শেয়াল গর্ত করে লাশ বের করেছে। তারই গন্ধে গ্রামের লোকজন লাশ খুঁজে পায়।’ এতটুকু বলেই নুরুজ্জামান হাঁপিয়ে যায়। দম নেবার জন্য থামে একটু।
‘লাশের অবস্থা বলো?’ নুরুল হাসান তাড়া দেয়।
‘স্যার, গর্ত থেকে লাশ বের করা হয়েছে। শরীর থেকে মাথা আলাদা করা। শরীরে আর কোন আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।’
‘কেন খুন হলো তার কোন হদিস পেয়েছো?’
‘জ্বী না স্যার। কেউ কিছু জানে না। মনে হচ্ছে ভুত এসে খুন করে জঙ্গলে পুতে রেখেছে। এলাকার লোকজন তাই বলাবলি করছে।’
ভুত-প্রেতে নুরুল হাসানের বিশ্বাস নেই। আর তাদের খেয়ে-দেয়ে কাজও নেই যে রশীদের মত একটা ছেলেকে শুধু শুধু খুন করবে। খুন করে আবার জঙ্গলেও পুতে রাখবে। তদন্ত করে দেখতে হবে।
‘লাশটা যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও। কেউ যেন কিছু না ধরে। আমি এখনই আসছি।’ নুরুল হাসান এক ধরনের তাড়া অনুভব করে। বাচ্চা একটি ছেলেকে মেরে ফেলল অথচ কেউ কিছু জানে না? এ খুনের হদিস করতেই হবে। খুনী কে? তা বের করতেই হবে।
নুরুল হাসান দ্রুতই সেখানে যায়। ক্রাইম সিন দেখে নোট নেয়ার অভিজ্ঞতা তার ঢের আছে। তবে অনেকদিন কাজটি করা হয় না। তাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুরু করে সে। বাঙালির একটা স্বভাব হচ্ছে কিছু হলেই কৌতুহলী হওয়া। এখানেও যথারীতি ভীর করে আছে শত শত মানুষ। নুরুল হাসান শুরুতেই হাক দেয়, ‘সবাই যার যার কাজে যান। পুলিশকে তার কাজ করতে দেন।’
ঘন ঘন বাঁশিতে এলাকা খালি করে ফেলে পুলিশ। ওসি সাহেব নোট বুক আর কলম হাতে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। প্রথমেই বিভিন্ন কোণ থেকে ছবি তুলেন অগনিত। ছেলেটা স্কুল ড্রেস পড়ে আছে। তার মানে খুনটা দিনের বেলা হয়েছে।
স্কুলে যাবার আগে হয়েছে, নাকি স্কুল থেকে আসার পরে?
স্কুলে খবর নিলেই এর উত্তর পাওয়া যাবে। ছেলেটি কখন স্কুলে গিয়েছিল কখন ফিরেছে টিচাররা বলতে পারবেন। তবে দেখে মনে হচ্ছে স্কুল থেকে ফেরত আসার পরে খুনটা হয়েছে। কারণ, জামার বুকের কাছে খাবারের দাগ লেগে আছে। স্কুলে বসে টিফিন খেয়েছিল রশীদ।
খুনটা কী দিয়ে করেছে?
ধারালো কিছু দিয়ে দেহ থেকে মাথা আলাদা করা হয়েছে। কিন্তু কাজটা করা হয়েছে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। কোনরকম ধস্তাধস্তি বা কাটা দাগ নেই কোথাও। সুস্থ্য একটা ছেলেকে এভাবে দু’টুকরো করা কঠিন কাজ। নিশ্চয় কোনভাবে ওকে অচেতন করা হয়েছে আগে। অথবা একজন চেপে ধরেছে আরেকজন কোপ দিয়েছে। তারমানে খুনী একের অধিক হতে পারে।
কোথায় খুন করা হয়েছে?
স্কুলের আশে পাশে হতে পারে। স্কুল থেকে বাড়িতে আসার পরে হতে পারে। কিংবা বাড়িতে ফেরত আসার পরও হতে পারে। অবশ্য ছেলেটি স্কুল থেকে অন্য কোন জায়গায় গিয়েছিল কীনা সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। লাশ পুতে রাখার গর্তটা করা হয়েছে কোদাল দিয়ে। খুব বেশী গভীর করতে পারেনি। তাড়া ছিল বোধ হয়। দিনের বেলা এদিকটাতে খুব বেশী মানুষ আসে না। তবুও কেউ এসেছিল আশে পাশে। তাই তাড়াতাড়ি গর্ত করে মাটি চাপা দিয়েই চলে গেছে খুনী।
কোন সূত্র রেখে গেল কী?
আশে পাশে তন্ন তন্ন করে খুঁজে নুরুল হাসান। তেমন কিছুই পায়না। হতাশ হয় সে। অভিজ্ঞতা বলে খুনী কিছু না কিছু রেখে যাবেই, যেকোন সূত্র। সে নিয়ম এখানে খাটছে না। শুকনো খটখটে মাটি। পায়ের ছাপ থাকারও কোন সুযোগ নেই।
এলাকায় রাজনৈতিক দলাদলি আর ক্ষমতার পালাবদলে খুনখারাবি হয়। এই বাচ্চাটিও সেকারণে খুন হলো কীনা খুঁজে দেখতে হবে।
রশিদের বাবা-মার সাথে কথা হয় সেখানেই। দু’জনেই কাঁদছে। বেশ জোরে জোরেই কাঁদছে। সন্তানহারা পরিবারটির দুঃখ নুরুল ইসলামকে ছুঁয়ে যায়। ‘আপনাদের কাউকে সন্দেহ হয়?’
‘জে না স্যার। কারও লগে আমাগো শত্রুতা নাই। কেমনে সন্দেহ করুম?’
‘তাও তো ঠিক।’ আর কোন প্রশ্ন করে না সে।
লাশ নিয়ে সোজা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে চলে যায় ওসি নরুল হাসান। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা দেখতে হবে। যা ভেবেছিল তাই। ভারী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়েছে প্রথমে। এরপর অচেতন দেহকে কুপিয়ে দু’টুকরো করা হয়েছে। কিন্তু কে করল? কেন করল? অসহায় বোধ করে নুরুল হাসান। বহু খুনের তদন্ত করেছে সে। অভিজ্ঞতা থেকে শুরুতেই কিছু একটা আন্দাজ করতে পারে সে। সেই আন্দাজেই তদন্ত চালিয়ে যায়। কিন্তু এই খুনের ব্যাপারে কোন আন্দাজই করতে পারে না।
পরের দিন সকালেই স্কুলে চলে যায় সে। ‘ঘটনার দিন রশিদ স্কুলে এসেছিল?’
ক্লাস টিচার ভয়ে কাঁপছে। ‘জ্বী স্যার, স্কুলে এসেছিল।’
‘কখন বের হয়েছে?’
‘স্যার, স্কুল ছুটি হয় চার টায়। তবে ঐ দিন সে আগেই চলে গিয়েছিল। একটার দিকে হবে বোধ হয়।’
‘কেন?’
‘রশিদ বলছিল, ওর শরীর ভাল লাগছে না। তাই আগেই চলে গিয়েছিল।’
‘শরীরে কী হয়েছিল বলতে পারেন?’
‘ঠিক জানি না, স্যার। যতদূর মনে পড়ে, জ্বর-টরের কথা বলছিল।’
ক্লাসের বাচ্চাদের পাশে গিয়ে বসে সে। ‘রশিদকে চেনো?’
‘চিনি স্যার।’
‘খারাপ লাগছে?’
‘জ্বি স্যার। খারাপ লাগতাছে।’ বেঞ্চে বসা বাচ্চাটি কেঁদেই ফেলে।
‘ঐদিন রশিদ আগে চলে গিয়েছিল, তাই না?’
‘জ্বী স্যার। গায় জ্বর আছিল রশীদের। ব্যাথাও আছিল। তাই স্কুল ছুটির আগেই চইলা গেল।’
‘বাসার দিকে গিয়েছিল, না অন্য কোথাও?’
‘সোজা বাড়ির দিকে গেছিল, স্যার।’
নুরুল হাসান গাড়িতে বসে গোড়া থেকে শুরু করে। রশিদ স্কুলে এসেছিল। শরীর খারাপ লাগছিল তাই আগে বাসায় চলে গেছে। বাসায় যাবার পথে ও খুন হয়। বাসায় কে ছিল? রশীদের মা আর তাঁর কোলের বাচ্চা। রশীদের বাপের কাপড়ের দোকান আছে বাজারে। তিনি সকালে বাজারে আসেন আর সন্ধ্যার পর বাড়িতে ফেরেন। এখনও পর্যন্ত কাউকে সন্দেহ করতে পারেন না তিনি।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সাখে কথা বলেন তিনি। মেম্বারের সাথেও। কেউ কোন তথ্য দিতে পারে না। এ কেমন কথা?
এরপর সোজা বাজারে চলে যায় নুরুল হাসান। রশীদের বাপের দোকানে। ‘এইটাই আপনার দোকান?’
‘জ্বী স্যার।’ লোকটা বিমর্ষ মুখে কাপড় কাটছিল।
‘এই ছেলেটা কে?’
‘আমার কর্মচারী।’
‘কী নাম তোমার?’ পচিশ-ছাব্বিশ বয়স হবে ছেলেটার।
‘স্যার, আব্দুল মোত্তালিব।’
‘মোত্তালিব, তোমার কাজটা কী?’
‘কাপড় সেলাই করি, স্যার। মহাজন কাপড় কাটে আর আমি সেলাই করি।’
‘কেমন আয় হয়?’
‘স্যার, দিন চলে যায় আর কি।’
‘আপনি কয়টার সময় বাড়ি যান?’ রশীদের বাপের দিকে তাকিয়ে বলে নুরুল হাসান।
‘সকালে আসি স্যার। আন্ধার হইলে পর রওনা দেই।’
‘খাওয়া দাওযা কোথায় করেন?’
‘সকালে ভাত খাইয়া আসি। আর দুপুরেরডা মোত্তালিব বাড়ি থিকা নিয়া আসে।’
‘মোত্তালিবও আপনার সাথে খায়?’
‘এইহানে খায় না। দুহারে আমার বাড়িতে খায়। খাওয়া শ্যাষে আমারডা লগে কইরা নিয়া আসে।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’ বলে রাস্তায় নামে সে। সারাদিন একজন সেন্ট্রি রশীদের বাড়ির আশে-পাশে লাগিয়ে দিয়েছে নুরুল হাসান। সন্ধ্যায় সে খবর দেয়, সারাদিনে দোকানের কর্মচারি ছাড়া আর কেউ আসেনি।
অত্যধিক বিচলিত নুরুল হাসান। কোন সূত্র পাচ্ছে না সে। সবগুলো বিকল্প চিন্তা করে সে - রাজনৈতিক দলাদলি না। রশীদের বাপ কোন দল করে না। ব্যবসায়িক কোন্দল? তাইলে বাপরে না মেরে ছেলেকে মারবে কেন? জমি জিরাত নিয়ে শরীকের কোন্দল? তাও না, রশীদের কোন আত্মীয় এখানে নেই। স্কুলের বন্ধুরা খেলার ছলে মেরে ফেলেছে? শরীর দু’টুকরো করা, গর্ত খুড়ে মাটি চাপা দেয়া বাচ্চাদের কাজ না। শক্ত সমর্থ মানুষের কাজ।
রশীদের চারপাশে শক্ত সমর্থ মানুষ কে কে ছিল? স্কুলের মাস্টাররা, রশীদের বাপ, কর্মচারী, আর? আর কারো কথা মাথায় আসছে না।
স্কুলের মাস্টার মোটে তিনজন। তার দুইজনই বুড়ো। একজন যুবক, তবে সে অন্য গ্রামে থাকে। সে কেন খুন করবে? রশীদের বাপ খুন করতে পারে। নিজের ছেলেকে খুন করার কী কারন থাকতে পারে? মোত্তালিব কাজটা করতে পারে। কিন্তু কেন? দোকান দখল করার চিন্তা থাকলে বাপরে খুন করবে, ছেলেকে কেন?
আরেকটা তথ্য ভেবে দেখা যায়। মোত্তালিব প্রতিদিন দুপুরবেলা রশিদের বাড়িতে যায়। ওখানে খায়, কিছু সময় কাটায়। এরপর টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে দোকানে ফেরত আসে। অনেকদিন ধরেই এই রুটিন চলে আসছে। রশীদও ঘটনার দিন দুপুরেই বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিল।
মোত্তালিবের কাজকর্ম লক্ষ্য রাখা দরকার। রশীদের মায়ের সাথে কথা বলে নুরুল হাসান। মহিলা কাঁদছে তখন থেকে। ‘মোত্তালিবকে চেনেন?’
‘জ্বী চিনি। রশীদের বাপের দোকানের কর্মচারি।’
‘সে প্রতিদিন এ বাড়িতে আসে।’
‘জ্বি স্যার। দুহারে খাইতে আসে। আর যাওয়ার সুম রশীদের বাপের লাইগা খাওন নিয়া যায়।’
‘কতক্ষণ থাকে সে?’
‘খাইতে যতক্ষণ লাগে।’
‘আপনি টিফিন ক্যারিয়ার আগেই রেডি করে রাখেন। নাকি মোত্তালিব আসার পর?’
মহিলা একটু থতমত খায়। ‘আগেই রেডি কইরা রাহি।’
‘এমন কখনও হয়েছে যে, খাবার রেডি কিন্তু মোত্তালিব আসে নাই। ধরেন, ঝড়-বৃষ্টি হলো।’
‘না স্যার। মোত্তালিব প্রেত্যেক দিনই আসে। ঝড়-বৃষ্টি হইলেও আসে।’
‘মোত্তালিবের বাড়িতে কে কে আছে জানেন?’
‘মোত্তালিবের বাড়ি পাশের গ্রামে। ওইহানে বাবা-মা আছে। হে বিয়া করে নাই এহোনো।’
‘এই দোকানে কাজ করার আগে কী করতে সে?’
‘রাজমিস্ত্রির কাম করত।’
‘মোত্তালিবের সাথে আপনার ভালই কথা-বার্তা হয় তাহলে?’
মহিলা থামেন একটু। ‘ওই খাওনের সময় যা কথাবার্তা হয়। মানুষটা কথা কইতে পারে।’
‘আচ্ছা, আমি যাই। আপনাকে ধন্যবাদ।’
নুরুল হাসান কোন কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। মোত্তালিবকে সন্দেহ করলে, খুনটা ও কেন করবে?
খুনটা যদি এ বাড়িতে হয় তবে দা-কোদাল সব এ বাড়িতেই আছে। গলা কাটার পর রক্ত বের হয়েছে তা আশে পাশেই আছে। রাতের অন্ধকারে তন্ন তন্ন করে খুঁজে নুরুল হাসান। পেয়েও যায় সহসা। বাড়ির পিছনের বাঁশঝাড়ের কাছে আলগা মাটি দেখে খুড়ে সে। অতি নিঃশব্দে, কেউ যাতে জানতে না পারে। দা আর কোদাল ওখানেই পায়। সাথে জমাট বাঁধা রক্ত। রশীদকে এখানেই খুন করা হয়েছে। এরপর লাশ জঙ্গলে পুতে ফেলা হয়েছে।
পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলে নুরুল হাসান। কাল দুপুরে যখন মোত্তালিব খেতে আসবে সাবধানে ওদের কথা শুনতে হবে। বাঁশের বেড়ার ঘর। এত শক্ত না । ভিতরের কথা সব শোনা যায়। তবে আসল সমস্যা হচ্ছে লুকিয়ে থাকা। নুরুল হাসান বেড়ার আড়ালে ঘাপটি মেরে আছে। কান খাড়া করে আছে সে।
‘ও ভাবী, খাবার দাও না?’
‘মনটা ভাল নাইরে মোত্তালিব।’
‘কেন কী হইছে?’
‘পোলাডার লাইগা পরান পুড়ে। এদিকে ওসি সাব আইছিল। কী সব জিগাইল। আমার ডর লাগতাছে।’
‘আরে! কীসের ডর? কেউ বুঝবার পারব না আমরা কামডা সারছি। এহন তোমার জামাইরে বাদ দিয়া আমার কাছে চইলা আসবা।’
‘পরানডা তাই চায়। কবের থিকা বইসা আছি। তুমি ঘরে লইবা। শান্তিতে থাকুম।’
‘আহারে! আইস একটু আদর কইরা দেই।’
ওসি সাহেব নিঃশব্দে চলে আসে। খুনের মোটিভ সে পেয়ে গেছে। মোত্তালিব প্রতিদিন দুপুরবেলা খাবার নিতে আসে এখানে। অনেকদিন ধরেই কাজটা করছে সে। ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ রশীদের মার সাথে সম্পর্ক হয়ে যায়। এসময় বাড়িতে কেউ থাকে না। সম্পর্কটা শরীরের দিকে গড়ায়। রশীদ চারটার আগে বাড়িতে আসে না কখনও। ঘটনার দিন শরীর খারাপ থাকায় হঠাৎ করেই আগে স্কুল থেকে চলে আসে। এরপর তার মা আর মোত্তালিবকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলে। চিৎকার দেয় সে। লোক জানাজানির ভয়ে হিতাহিতশূন্য হয়ে রশীদকে খুন করে ওরা দু’জনে। মহিলার মানসিক শক্তি দেখে অবাক হয় নুরুল হাসান। এরকম নৃশংস একটি ঘটনা ঘটিয়ে কীভাবে শান্ত আছেন তিনি?
ফোর্স পাঠিয়ে দু’জনকেই গ্রেফতার করে সে। জবানবন্দী নিয়ে চার্জশিট তৈরী করে আদালতে চালান করে দেয়। মনটা শান্ত হয়। বাচ্চা ছেলেটির জন্য কষ্ট হয় মনের গহিনে। পুলিশ হলেও সে একজন মানুষ। মুচকি হাসে সে - পত্রিকাওয়ালারা মুখরোচক নিউজ পেয়ে গেল একটা। এ নিয়েই ব্যস্ত থাকবে ক’দিন।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৬৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২২/০৪/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • মোঃ আরিফুল মিয়া ২৩/০৫/২০১৮
    খুব ভালো লাগলো কবি পাতায় আসবেন
  • গোয়েন্দা কাহিনী।।

    অসাধারণ;;;;
  • দীপঙ্কর বেরা ২৪/০৪/২০১৮
    দারুণ গল্প
  • অসাধারণ
  • একটা পরকীয়া কেড়ে নিতে পারে একটা প্রান।ভাল লাগল লেখাটি।
  • ভালো হয়েছে
 
Quantcast