www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

দন্ত সমাচার

চিৎ হয়ে শুয়ে আছি।
চিতপাত ছাড়া উপায়ও নাই। শুনেছি, খাস পাঠানরা নাকি চিৎ হয়ে শোয় না। ওদের কৌশল হচ্ছে উপুর হয়ে শোয়া। সৈয়দ সাহেব তাই জিগ্যেস করেছিলন, কেন? পাঠানের উত্তর, চিৎ হয়ে শুলে শুধু আকাশই দেখবে আর কিছু না। আফগান মূলুকে যে পরিমান গোলাগুলি হয়, যখন-তখন চিৎ না উপুর হয়ে শুয়ে পড়তে হয়। উপুর হলে মাথা সামান্য এদিক ওদিক করে কারো সাহায্য চাইতে সুবিধা। কিন্তু চিৎ হলে তো শুধু আকাশ দেখা ছাড়া কারো সাহায্য চাওয়ার সুযোগ নেই। মনে আছে ছোটবেলায় কচ্ছপ নিয়ে খেলতে ওদেরকে চিৎ করে দিতাম। বেচারা চার পা ছোড়াছুড়ি করতই শুধু। কিন্তু নড়তে পারত না মোটেও। আমার এখন কচ্ছপ-দশা।
ডেন্টাল হাইজেনিস্ট বয়স্ক মহিলা। তবে গলার স্বর কর্কশ না একেবারেই। ছেলেদের মত ছোট করে ছাঁটা চুল। গোলগাল মুখ, দেখতে ভারি মিষ্টি। নার্সের ইউনিফরম পরনে। হাসপাতালের মত সাদা না, গাঢ় নীল রঙের ইউনিফর্ম। সুন্দর করে একটা হাসি দিয়ে মোহনীয় সুরে বলে, ‘শুয়ে থাক চুপচাপ। ডক্টর এখনই আসছেন।’ হাতে একটা রিমোর্ট ধরিয়ে দেন, ‘ইচ্ছে করলে শুয়ে শুয়ে টিভিও দেখতে পার।’
সেই থেকে চিৎ হয়ে শুয়ে উপরে তাকিয়ে আছি। চোখের দৃষ্টি অবারিত নীলাকাশে না। আটকে আছে ঘিয়ে রঙের ফলস সিলিংয়ের দিকে। নির্দিষ্ট করে বললে, সিলিংয়ের সাথে লাগানো টিভিটার দিকে। তবে ঠিক আরাম বোধ হচ্ছে না তেমন। সোফা-চেয়ারে বসে টিভি দেখার অভ্যেস। নিদেনপক্ষে খাটে শুয়ে মাথা কাত করে দেখি মাঝেমধ্যে। তাই বলে একেবারে চিৎপটাং হয়ে টিভি দেখা? তাও আবার নির্বাক যুগের শব্দহীন ছবির মত। সেই যুগে চার্লি চ্যাপলিন কত রকম ক্যারিক্যাচার করেছেন। কোনরকম শব্দ ছাড়াই। অবশ্য টিভিতে এখন চার্লির কোন ক্লাসিক কসরৎ দেখানো হচ্ছে না।
বয়স্ক মিষ্টি মহিলা মাথার কাছে একটা হেডফোন রেখে দিয়েছেন, ‘ইচ্ছে হলে শব্দও শুনতে পার।’ কিন্তু আমার ইচ্ছে করছে না। হাত নাড়িয়ে, মাথা ঘুরিয়ে হেডফোনটা কানে লাগানোর কোন তাড়া অনুভব করছি না। শব্দ দিয়ে আমি কী করব? একটা রান্নার অনুষ্ঠান হচ্ছে টিভিতে। খাদ্যদ্রব্য দেখা আর খাওয়ার জিনিস। শোনাশুনির কোন ব্যাপার নাই এতে। আমি মনোযোগ দিয়ে রান্নার অনুষ্ঠান দেখছি। তিনজন শেফ রান্না করছে। এপেটাইজার, মেইন কোর্স আর ডেজার্ট। কে কত দ্রুত এবং সুস্বাদু রান্না করতে পারে তার একটা প্রতিযোগিতাও চলছে। দু’টো এপেটাইজার করছে ওরা - বিফ ওয়েলিংটন আর ওয়াইল্ড মাশরুম টার্টলেট। দু’টোই সিংগাড়া-সামুসারই ভিন্ন কোন সংস্করণ।
মেইন কোর্সে বিফ টেন্ডারলইন। সাথে ম্যাশ পটেটো আর গ্রেভি। প্লেটে রঙের বাহারের জন্য গাজর আর ব্রকলির কয়েক টুকরো আছে। দু’ফালি করে কাঁটা গ্রিন হালাপিনো আর অ্যাসপারাগাছের ডাঁটাও আছে কয়েকটা। দেখতে ভীষণ লোভনীয়। কিন্তু খেতে কুৎসিত কিছু একটা হবে নিশ্চয়। কারণ, গরুর মাংশ পুরোপুরি রান্না হয়নি। মাংসের মাঝখানে তাজা লাল রক্ত দেখা যাচ্ছে। মিডিয়াম ডান বলে এরা। গরুর মাংস খেতে কোন আপত্তি নেই আমার। তাই বলে রক্ত খাব কেন? ওয়াক থু!
ডেজার্ট দেখতে আরো চমকপ্রদ। পিরামিড চকলেট কেক, সাথে কয়েকটা স্ট্রবেরি আর ব্লুবেরি। বেলজিয়াম ডার্ক চকলেট আর ক্যারামেল হ্যাজেলনাট ক্রিমে মাখানো - ভারি চমৎকার দেখতে। কিন্তু মুখে দিলে ঐ জলবৎ তরলং। উহু, কথাটা মোক্ষম হল না। থোর বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোর বললে মানানসই লাগে বোধ করি। এরাতো আর কাচা রস জ্বাল দিয়ে খেজুড় গুড়ের পায়েস খায়নি কখনো। ডেজার্টের স্বাদ কেমনে বুঝবে?
টিভিতে দেখা যাচ্ছে, তিনজন শেফ মিলে কিচেনে হুলুস্থল করে ফেলেছে। কত রকমের যে স্পাইস আছে! একসময় দেখি মাংসের মধ্যে একটু ব্রান্ডিও ঢেলে দিল। মদও যে রান্নার উপকরণ, ভিরমী লাগে আচানক! তবে প্লেটে এদের খাবার পরিবেশনা ফরাসি চিত্রকরদের বিখ্যাত শিল্পকেও ছাড়িয়ে যায়। একেকটা ডিশ এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছে যে, গলা পর্যন্ত ভরা থাকলেও এখনই ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। পেটের না হলেও চোখের ক্ষুধার একটা দাম আছে না! চোখের ক্ষুধাই এদেশের বৃহৎ কাম্য। পশ্চিমের তাই দৃষ্টিসীমার সবকিছু পরিপাটি করার দিকেই অসীম ঝোক। ভিতরে যতই গোলমাল থাকুক না কেন।
শুয়ে শুয়েই আবোল-তাবোল সব ভাবছি। কী আর করব। নাই কাজ তো মটরশুটি ভাজ। খই আমার মোটেও পছন্দের না। তবে মটরশুটি ভেজে মুড়ি দিয়ে মাখিয়ে দিলে, ওয়াও! রুমের দেয়ালে প্লাইউডের দু’টো বড় বোর্ড লাগানো। বোর্ডে পুশপিন দিয়ে অনেকগুলো শিশুর হাস্যোজ্বল মুখের ছবি সাঁটানো আছে। কেমন ফুলের মত লাগছে ওদের। নিম্পাপ শিশুগুলো দাঁত বের করে আছে, পুরোটা।
বোর্ড দু’টির উপরে ক্যাপশন লেখা - ক্যাভিটি ফ্রি হল অব ফেইম। যে সকর শিশুর দাঁতে কোন ছিদ্র নেই ওদেরই ছবি আছে এখানে। হল অব ফেইমে সেসকল শিশুই স্থান পেয়েছে। হলিউডের বিখ্যাত ওয়াক অব ফেইমের কথা মনে পড়ল কি? রাস্তার ফুটপাত জুড়ে শ’য়ে শ’য়ে স্টার, সাথে তারকাদের নামও লেখা। কত কত বিখ্যাত তারকা আছে! সিনেমার অভিনেতা, টিভি ব্যক্তিত্ব - শো বিজের কে নেই সেখানে। গ্রেট ব্রুস লি আছেন, বব মারলে আছেন, চাঁদে যাওয়া নীল আর্মস্ট্রংও আছেন। এখনও পর্যন্ত ছাব্বিশ শ’রও বেশী তারকা হয়ে গেছে। অবশ্য আমার অতিপ্রিয় ক্লিন্ট ইস্টউড আর জুলিয়া রবার্টস ওয়াক অব ফেইমে নাই। উনারা এই তারকা হতে বেশ কয়েকবারই না করে দিয়েছেন। এদিকে, কীভাবে কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই তারকাদের মধ্যে চলে এসেছে। ফেমাসদের মর্যাদাই ছোট করে ফেলল এই নামটি।
হল অব ফেইমে মুসলিম নাম বোধ হয় একটিই - মহান মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। আলীর তারকাটি আবার একটু ভিন্নধর্মী। আলীকে বলা হয় তার নামে একটি তারা হবে ওয়াক অব ফেইমে। আলী তাতে শর্ত জুড়ে দেয় একটা। তাঁর নাম ইসলামের মহান নবীর নামে। তাই তিনি চান না কেউ তার নামের উপর দিয়ে হেঁটে যাক। সেজন্যে একমাত্র আলীর তারকাটি রাস্তার পরিবর্তে দেয়ালে সাঁটানো। ধন্যবাদ মহান বীর। সে যাহোক, ক্যাভিটি ফ্রি বোর্ডের ছোট ছোট শিশুর মুখগুলিকে একেকজন যোদ্ধার মতই লাগছে। আলীর দীপ্ত অবয়ব ওদের চেহারায়। নিয়মিত দাঁতের পরিচর্যা করে এরা। ব্যাকটেরিয়াদের সাথে প্রাণপন যুদ্ধ করে কোন ক্ষতি করতে দেয়নি দাঁতের। একেবারেই ক্যাভিটি ফ্রি।
শুয়ে আছিতো আছিই। ডেন্টিস্টের কোন খবর নেই। টিভিতে রান্নার প্রোগ্রামটা শেষ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। নতুন একটা শেফ এসেছে। ভিন্ন রান্না হবে নিশ্চয়। হঠাৎ মিষ্টি গলার বয়স্ক ডেন্টাল হাইজেনিস্ট আসে। একটা এক্স-রে করাতে হবে। মুখের মধ্যে কী একটা রেখে বোতামে চাপ দিল। সাথে সাথেই পাশের কম্পিউটারে ভেসে উঠল আমার দাঁতের চিত্র। কৌতুহলী হয়ে তাকাই। কী বীভৎস রে বাবা! এজন্যেই কঙ্কাল দেখতে এত ভয়ংকর লাগে। ধুর! নিজের দাঁত দেখার খেতায় আগুন।
চোখ ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখি। ডেন্টিস্টদের ক্লিনিকগুলি এমনই হয়। নানা রকম যন্ত্রপাতি। একটা দিয়ে পানি ঢালে মুখের ভিতর। আবার অন্যটা দিয়ে টেনে বের করে। ছুড়ি-কাঁচির সমাহারতো আছেই। ডেন্টিস্টদের কাছে একবার গেলে কিন্তু আর রক্ষে নেই। দর্শন দেয়া এরপর পৌনঃপুনিক হয়ে যায়। প্রথমে ক্লিনিং, এরপর স্কেলিং। রুট ক্যানাল করাবে, ক্রাউন পরাবে, শেষে দন্ত উৎপাটন। আবার পাশের দাঁতের ক্লিনিং থেকে শুরু। এভাবে বত্রিশটা উঠিয়ে ক্ষান্ত দেন তারা। বলেন, ‘ছেলেকে নিয়ে আসবেন। ক্লিনিং করে দিব।’
আমার সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। উপরের মাড়ির একটা দাঁত তুলে ফেলতে হবে। বাকীগুলি কবে তুলে ফেলবে তার একটা শিডিউল দিয়ে দিলে ভাল হতো। চট করে আর বিপদে পরতে হবে না। ডেন্টিস্টের সোজন বাদিয়ার ঘাটে পা দিয়েই ফেলেছি। মাড়ি ফুতুর না করে ছাড়বে না ওরা। হাইজেনিস্ট মহিলা এসে গোটা দুয়েক ইজেকশন দিয়ে গেছেন ইতোমধ্যে। উপরের মাড়ি কেমন অসাড় হয়ে যাচ্ছে। কোন বোধ-বালাই টের পাচ্ছি না। মুখ নাড়াতে পারছি কী না খোদাই জানেন। কাশি দিয়ে একটু কথা বলার চেষ্টা করলাম। গীটারের সবচেয়ে মোটা তারের বাজনার মত কেমন একটা শব্দ বেরুল। তাড়াতাড়ি মুখ চাপা দিয়ে দেই। কোন সময় আবার গলার স্বর জি-সার্পে চলে যায়।
এতক্ষণ তাও মাথা ঘুড়িয়ে এদিক-ওদিক কিছু দেখছিলাম। এখন পাঁচ-মনি মুখটা নড়ছে না, নাড়াতেও পারছি না। চিন্তাশক্তিও ভোতা হয়ে যাচ্ছে। প্যারালাইসিস রোগীদের কথা ভাবছি। সামান্য মুখের অসাড়তা নিয়ে আমি কাহিল। ওদিকে হাত-পা, শরীরের অর্ধাংশ আবার কারো কারো পুরো শরীর অবশ হয়ে যায়। কী কষ্ট তাঁদের! কথা নেই বার্তা নেই একটা হাত বা একটা পা নাড়াতে পারছে না। এরা মনোপ্লেগিক। আর হেমিপ্লেগিকদের শরীরের একপাশের হাত এবং পা দু’টোই অবশ হয়ে যায়। যাদের দুই পা অবশ তারা প্যারাপ্লেগিক। কিন্তু সবচেয়ে কষ্ট কোয়াড্রিপ্লেগিয়াতে - শরীরের চার হাত-পা সব অবশ হয়ে যায়। আহারে! কী কষ্ট!
আমারটা মনোপ্লেগিয়া হবে কী? যাই হোক না কেন, অবশ মুখে শুয়ে আছি ডেন্টাল চেয়ারে। চেয়ার বলা কি ঠিক হচ্ছে? ভাল করে বললে একে ডেন্টাল এঞ্জিন বলা যায়। যন্ত্রপাতিতে ঠাসা আছে এই চেয়ার। আমার মুখে থু থু জমে যাচ্ছে। পিক করে থু থু ফেলার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া মুখওতো অসাড়। পিক শব্দ হবে কিনা সন্দেহ। হাত বাড়িয়ে সাকশন টিউবটা নিয়ে মুখের ভিতরটা পরিস্কার করি। ইতোমধ্যে ডাঃ ইকবাল মাওজি চলে এসেছেন। ভদ্রলোক পাকিস্তানি হবেন বোধ হয়। আফগান বা ইরানিও হতে পারেন। লম্বা দীর্ঘ দেহ। খাস পাঠান সন্দেহ নেই। সারাক্ষণই মুখে মাস্ক আর চোখে ম্যাগনিফাইং চশমা লাগানো বিধায় ভদ্রলোকের চেহারা দেখিনি কোনদিন।
‘কী খবর? ভাল আছেন?’ মাওজি সাহেব হাসতে হাসতে বলেন। ডাক্তারদের হাসতে হয়। ক্যালগেরির ডাক্তারদের মেডিক্যালের প্রশিক্ষণের আগেই হাসার প্রাকটিস করে নিতে হয় শুরুতে। অতি সংকটাময় মুহুর্তেও হাসি মুখ ধরে রাখতে হয় এদের। এতে নাকি রোগীর মনোজগতে প্রভাব পরে। যার হাসি যত সুন্দর তার রোগী তত খুশী। তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়। আমার এখন সারামুখ অবশ। গলায় আওয়াজ গীটারের মোটা তারে। তাই মনোজাগতিক কোন চাঞ্চল্য আসল কিনা ঠিক ধরতে পারছি না। তবে ঘড় ঘড় স্বর তুলে কোনমতে বলি, ‘ভাল আছি, ডক্টর।’
‘গুড। দেখি, হা করেন তো। একটু বড়, হ্যা এরকম। ভেরি গুড।’
উনাকে দেখি গুডএ পেয়েছে। আমি মুখ বন্ধ করলেও গুড, খোলা রাখলেও গুড।
‘এই দাঁতটায় সমস্যা হয়েছে। হ্যা, এটাতে। দাঁতের গাম নষ্ট হয়ে গেছে। বোন বেশ দূর্বল, ফাউন্ডেশন নড়বড়ে। সমস্যা নেই এখনই তুলে ফেলব। গুড।’
আবার গুড! আমি মুখ হা করে তাকিয়ে আছি। উনি দাঁতটা ধরে নাড়াচাড়া করছেন।
হঠাৎ বলেন, ‘আপনি ঠিক আছেনতো। কোন সমস্যা?’
আমি প্রায় নির্জীব স্বরে বলি, ‘জ্বী। সমস্যা নাই।’
‘গুড।’ বলে লাল রঙের কী একটা বস্তু দাঁতের গোড়ায় লাগাতে থাকলেন। ‘এইতো, আরেকটু। একটু ধৈর্য ধরেন। ভেরি গুড।’
বেটা তোর গুডের গুষ্ঠি মারি। ঘন্টা খানেক ধরে সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন ট্রাকসম মুখটা নিয়ে শুয়ে আছি। কতক্ষণ আর পারা যায়!
পাশের নার্সের ট্রে থেকে সাড়াশির মত একটা যন্ত্র তুলে নিলেন। বাম হাত দিয়ে মুখটা যথাসম্ভব হা করে সাড়াশি ঢুকিয়ে দিলেন মুখের ভিতর। আমি চরম ভীতু ধরনের মানুষ। অন্ধকারে একা ঘুমুতে পারি না কখনও। দোতলার ছাদে উঠেও নীচে তাকাতে পারি না ভয়ে। যদি পড়ে যাই। ভাগ্যিস আমাদের সময় মুক্তিযুদ্ধ হয় নি। থাকলে যুদ্ধ না করে চৌকির তলায় লুকিয়ে থাকতাম নিশ্চিত। ভয়ে পলায়নের একটা স্বভাব আমার চরিত্রে বরাবরই আছে। স্কুলের ক্লাস পরীক্ষায় বরাবরই ডাব্বা থাকত। আর প্রতিবারই ফল বের হবার পরপরই বাসা থেকে ছুট। অনেক খোজাখুঁজি করে যখন পেত ততক্ষণে সকলের রাগ পানি হয়ে গেছে।
সাড়াশি যন্ত্রটা দেখেই আত্মারাম খাঁচা। এখন যন্ত্রটা মুখের ভিতর। তাই আত্মা না পুরো দেহরাম খাঁচা হয়ে গেছে। ভয়ংকর ব্যাপার না? মুখের মধ্যে সাড়াশি। সিনেমার নাম হতে পারে একটা। ‘বাবা কেন আসামী’, ‘স্বামী কেন চাকর’ তেমনি ‘মুখের মধ্যে সাড়াশি’। অভিসার হলের বাইরে বিরাট বিরাট পোস্টার থাকবে। সেখানে ভয় পেয়ে কুঁকড়ে যাওয়া একটা মুখ। আর তার ভিতর ডক্টর হাসিমুখে সাড়াশি ভরে দিয়েছেন। এ ছবি দেখেই সাইকোপ্যাথ টাইপের লোকজন হুমরী খেয়ে পড়বে হলে। হলময় সিটি খেতে খেতে মহাআনন্দে পরিচালকের চোখ ভিজে উঠবে।
সাইকোপ্যাথ ছাড়া আর কে এসব ছবি দেখবে? সাইকোপ্যাথি আসলে এক ধরণের মেন্টাল ডিজঅর্ডার। আরো ভাল করে বললে, অ্যান্টিসোশাল চরিত্রের এরা। অপরের সুখ-দুঃখ নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই। কোন অনুতাপ নেই, কোন বিকার নেই। শুধু নিজেকে নিয়েই আছেন। এদের সংখ্যা সমাজে অনেক। এদের সবচেয়ে উপরের দিকের আত্মকেন্দ্রিক চরিত্রকে বলে ম্যাকিয়াভেলিনিজম। এরা এতটাই আত্মকেন্দ্রিক যে অপরকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। যেকোন উপায়ে নিজের আখের গোছানোই এদের চরিত্র। এই ঘরানার আরো একটা গ্রুপ আছে - নারসিসিজম। তাই সাইকোপ্যাথ, ম্যাকিয়াভেলিনিজম এবং নারসিসিজমকে একত্রে বলে - ডার্ক ট্রায়াড, অন্ধকার তিন।
তা হোক। সাইকোপ্যাথরা নিবিষ্ট মনে ‘মুখে কেন সাড়াশি’ দেখতে থাকুক। আমি ডাক্তারের চেহারা দেখছি। ভদ্রলোক কাঙ্খিত দাঁতটা ধরে হালকা একটু নাড়াতে লাগলেন। এরপর আস্তে আস্তে টানতে থাকলেন তুলে ফেলবার জন্য। দাঁত বাবাজী বের হতে চাচ্ছেন না। উনি টানছেন আর দাঁত রয়ে যাচ্ছে। দু’য়ের ধস্তাধস্তি, মাঝখানে আমি মরিচের জান যায়। মুখের মধ্যে সাড়াশি ভরে জোরসে টানাটানি চলছে। ডাক্তার বাঙালি হলে নির্ঘাত বলে ফেলত, আরো জোরে হেইও। জোরসে টানো, হেইও। এই শ্লোগানের ইংরেজি বা উর্দু ভার্সন আছে কিনা কে জানে।
তবে উনি হেইও-জোরসে না বলে বললেন, ‘রুটটা বেশ গভীর মনে হচ্ছে। তুলে ফেলতে কষ্ট হচ্ছে।’ বলেই আবার টাটাটানি চলছে। আহারে! আমার গভীর দাঁতখানার কেমন অপমৃত্যু হচ্ছে।
হঠাৎ মড়াৎ করে শব্দ। কী হলো? দাঁত ভেঙ্গে গেছে। আহা, দাঁত! ওর কী দোষ। ওতো থাকতেই চাচ্ছে। পণ করেছে, ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না যে। নিজের ভাঙ্গা টুকরো রেখেও জানান দিচ্ছে, ‘ডক্টর, আমাকে তুলো না। প্লিজ।’
ডাক্তারের সে খেয়াল নেই। উনি যুদ্ধে নেমেছেনে। দন্ত উৎপাটনের লেলিহান ক্ষুধায় চকচক করছেন। সাড়াশি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শেষ বিন্দু দাঁতের টুকরো তুলে ফেলে তৃপ্তি ঢেকুর তুলেন তিনি, ‘যাক, বাঁচা গেল। কী যে ঝামেলায় পড়েছিলাম। এত গভীরে রুট থাকায় বেরই হচ্ছিল না।’ আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আপনি ঠিক আছেন তো?’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলেন, ‘গুড।’ আমি কথা বলব কী? মুখের মধ্যে সাড়াশি!
ডাক্তারকে দেখে মনে হচ্ছে, ঘেমে-নেয়ে গেছেন ভদ্রলোক। বেশ একটা ধস্তাধস্তি হয়ে গেল। ক্যালগেরির এই প্রচন্ড শীতে ঘেমে যায় কেউ? ভদ্রলোক পাশের নার্সের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘গর্তটা বেশ বড় মনে হচ্ছে। সেলাই করে দেই। তাহলে, তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে।’
নার্স সুই-সুতা এগিয়ে দিলেন। আমি শুয়েই আছি। ভয়-টয়ের উর্ধ্বে উঠে গেছি অনেক আগেই। এখন প্রায় অবচেতন মনে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। ডাক্তার সাড়াশির বদলে সুই-সুতা নিয়ে মুখের মধ্যে ঢুকে গেলেন। একটা সেলাই দিলেন। দ্বিতীয় আরেকটিও। শার্টের ছিড়ে যাওয়া পকেটটা সযতেœ সুই-সুতোয় মুড়ে দিচ্ছেন যেন। ঘ্যাচ ঘ্যাচ শব্দ হচ্ছে। আমার শরীরে তখন অনুভূতি বলতে তেমন কিছু নেই। তবুও বুঝতে পারছি পুরো শরীর কাঁপছে। বিশেষ করে হাত দু’টো। চাপ দিয়ে ফেইট জিন্সের পকেটে ভরে ফেলেছি। পাছে উনারা আবার না দেখে ফেলেন কম্পমান হস্তযুগল।
সেলাই শেষ করে উনি উঠে দাড়ালেন, ‘অল গুড। আপনি এখন যেতে পারেন।’
আমি সদ্যই দাঁত হারানো। মাড়িতে দু’টো শেলাই নিয়ে কম্পমান শরীরে উঠে দাড়াই। কোনমতে টলতে টলতে রিসেপশনের কাছে। ড্রাইভার হিসেবে ছেলেকে নিয়ে এসেছি। গাড়ির আয়নায় নিজের চেহারা দেখি। মুখের বাম পাশ ফুলে আছে একটু। এছাড়া, তেমন কোন সমস্যা দেখছি না। সাহসী হয়ে গেছি নাকি! ভয় কি পাইনি ততটা? এক দাঁত-তোলা এতটা সাহসী করে তুলল?
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ২০৮ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৪/০৩/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • তরিকুল ইসলাম ২৯/০৩/২০১৮
    বাহ
  • এক দাঁত তোলা আপনাকে যে পরিমাণ সাহসী করেছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্ঘাত অস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়তেন।একেবারে সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধা।
 
Quantcast