www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

সংকল্প (উপন্যাস - এক)

এক
সাজ্জাদ বিস্মিত, এত সুন্দর!
বেশ বড় পুকুরটা; দিঘী সম্বোধনেই যুতসই লাগে। সাজ্জাদের দেশের বাড়িতে এরকম একটা দিঘী আছে। লেক, লেকের পাড় - এই শব্দগুলিই প্রচলিত ওখানে। পুকুর-টুকুর কেউ বলে না। সাজ্জাদ স্বপ্রশংসে দেখে - পুকুরটির পাড় উঁচু করে বাঁধানো। সেখানে সারি বেঁধে বিভিন্ন জাতের গাছ লাগানো। গাছগুলো দাবার বোর্ডের রাজা-মন্ত্রী-সৈন্যদের মত দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চল। অনেক গাছেরই নাম জানে না সে। বিদেশী হবে বোধ হয়। বোটানি সাজ্জাদের বিষয় না, পড়েছে ভূ-তত্ত্ব। ভিন দেশের তো দূরের কথা, নিজের দেশের গাছ চিনতেই হিমশিম। তবে পরিচিত নারিকেল আর খেজুর গাছই অধিক। বেশ কয়েকটি দেবদারুও মাথা তুলে আছে। আম-জাম-কাঠাল জাতীয় ফলের কোন গাছ অবশ্য নেই। সাজ্জাদ ভাবে, ফলমূলের গাছ না থাকলে পাখি আসবে কীভাবে? এত সুন্দর জায়গাটায় পাখির কিচিরমিচির না থাকলে কি চলে? দিঘীর পরিস্কার জলে গাছেরা নিজেদের দেখবে মুগ্ধ হয়ে। চারিদিকে পাখির কলকাকলীর আবহ সঙ্গীত। ভাবতেই কেমন গা শির শির উঠে!
প্রতিটা গাছের নীচের অংশে সাদা চুনকাম করা হয়েছে। চুনকামের ঠিক উপরে লাল রঙের একটা বলয় আঁকা। ভ্রম হয়, আরব দেশের কোন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন কী না। শুধু মাথার উপরের আগালটা কালোর বদলে লাল রঙের। গাছের নিম্নদেশে এরকম রঙ করা সাজ্জাদ অনেক জায়গায় দেখেছে। সরকারী ভবন এলাকায়তো অবধারিত। সাদা-লালের এই জড়াজড়ি গাছের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে - এ বিষয়ে সাজ্জাদের বিশেষ প্রশ্ন আছে। অবশ্য সাজ্জাদের প্রশ্নে কারো কিছু যায় আসে না। কোথাকার কোন সাজ্জাদ কী প্রশ্ন করল, তা দিয়ে তো আর দেশ চলে না। দেশজুড়ে তাই সুদৃশ্য গাছগুলো ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইডের ক্ষারে পুড়ছে।
পুকুরটার একপাশে শান-বাঁধানো মানানসই ঘাট। দু’পাশে বসার বেঞ্চি, মাঝখানটা ফাঁকা সমতল - সিমেন্টের গাঁথুনি। এরপর সিঁড়ির ধাপগুলো নেমে গেছে জল অব্ধি। শীত পার হয়ে বসন্ত ডানা মেলেছে। পুকুরের জল তাই বেশ খানিকটা নীচের দিকে। অনেকগুলো সিঁড়ি পার হয়ে শেষে পরিস্কার ঠান্ডা জলের ছোঁয়া। ঘন গাছপালার ছায়া পড়ে জল আরো বেশী ঠান্ডা লাগছে। অধিকাংশ মানুষ এই পাকা ঘাটটিই ব্যবহার করে। তাই বলে পুকুরের বাদবাকী পাড়গুলো কিন্তু অক্ষত কুমারী না। কিছু মানুষ ওসব জায়গা ব্যবহার করেও পুকুরে নামে। পাড় ঘুরে ঘাট পর্যন্ত আসার ধৈর্য তাঁদের নেই।
পুকুরঘাট ছাড়িয়ে কোয়ার্টারগুলোর দিকে তাকায় সাজ্জাদ। ভাই-বোনের মত হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ভবনগুলো। মোট ছয়টা - শেষের ভবনটা সামনের দিকে একটু বাড়ানো। বেশী পুরনো না ভবনগুলো। বার/তের বছর আগে বানানো। তাই এখনো চুনকাম উঠে যায় নি। কিংবা হতে পারে নিয়মিত পরিচর্যায় শ্রী ধরে রেখেছে। পুকুর-লাগোয়া প্রথম ভবনটা লাল রঙের, আকারে বড় একটু। সবুজের পটভূমিতে দারুণ লাগছে দেখতে, ‘কদম্ব তমাল রঙ্গে লালে লাল/ লাল হলো কৃষ্ণ ভ্রমর ভ্রমরী’। ভবনটিকে গেজেটেড কোয়ার্টার বলে। সরকারের প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তাদের আবাসস্থল। এই ভবনের নীচতলার ডানপাশের ফ্লাটটি সাজ্জাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে।
পুকুর ছাড়াও গোয়ালন্দ উপজেলা কমপ্লেক্সের আরও একটি সৌন্দর্য আছে। কোয়ার্টার-সংলগ্ন বেশ বড় মাঠ। মাঠের চারিদিকেও বড় বড় সব গাছ, পুরো চত্বর জুড়ে। বসন্তের আগমনে গাছগুলোতে সবুজ পাতা উপচে পড়ছে। সবুজের সমারোহ মাঠ জুড়েও। এত সবুজ কে না ভালবাসে! তাছাড়া সবুজ রঙ চোখেরও বিশ্রাম দেয়। লাল রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ সবচেয়ে বেশী। আর নীলের সবচেয়ে কম। এদের দেখতে চোখের উপর কিছুটা চাপ পড়ে। তুলনায় সবুজ রঙের আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ মাঝামাঝি - চোখ আরাম করে দেখতে পায়। এখানে নিশ্চয় চোখের রেটিনা সবুজের কারণে বেশী দিন ভাল থাকবে। অফিস বারান্দায় দাঁড়িয়ে সাজ্জাদ অবাক হয়ে দেখছে আর আনমনেই ভাবছে এসব। হঠাৎ সম্বিত পায় পিয়নের সবিনয় কণ্ঠে।
‘স্যার, মালগুলান বাসায় নিয়া যাই?’
‘ও হ্যা, বাসা।’ ক্ষীণশব্দে বলে পিছনের দিকে তাকায় সাজ্জাদ। অফিসের সকলেই দাঁড়িয়ে আছে। দু’জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার, একজন উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক আর একজন সহকারী কেরানী। কিছুক্ষণ আগে গোয়ালন্দ উপজেলা কমপ্লেক্সে নেমেছে সাজ্জাদ। প্রথমে রাজবাড়ী গিয়েছিল, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। ওখানে চাকরিতে যোগদান করে সোজা গোয়ালন্দ এসে নেমেছে।
‘ঠিক আছে, চলেন যাই।’ পিয়নের দিকে তাকিয়ে বলে সাজ্জাদ। অন্যদের দিকে ফিরে মৃদু স্বরে বলে ‘আপনারা সবাই অফিসে যান। যার যার কাজ করেন। আমার সাথে আসতে হবে না।’
পিয়নের সাথে লাল বিল্ডিংটার দিকে রওনা দেয় সাজ্জাদ। শরীরে ভালালাগার একটা শির শির অনুভূতি। মন জুরে খুশীর পুলকের বাড়বাড়ন্ত। অবশ্য, সাজ্জাদকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। আজকেই উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগদান করেছে। প্রথম শ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তা, তার চেয়েও বড় কথা শিক্ষার মত ব্যাপার। দেশের কল্যাণে কাজ করার প্রচুর সুযোগ আছে। শিক্ষায় দেশটা অনেক পিছিয়ে, বিশেষ করে মানসম্মত শিক্ষার ক্ষেত্রে। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থাতো আরও খারাপ। একমাত্র মানসম্মত শিক্ষাই পারে দেশের মানুষের মূল্যবোধ উন্নত করতে। বারট্রান্ড রাসেলের কথাটা সাজ্জাদ সারাজীবন মনে রেখেছে, ‘প্রকৃত শিক্ষাটা এমন হবে না, যেন মনে হয় একটা পাত্র পানি দিয়ে পূর্ণ করা হচ্ছে। বরঞ্চ ধরনটা এমন হবে, যেন একটি ফুলকে তাঁর মতে করে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’ নিজের মনেই বলে সে, ‘দেখি চেষ্টা করে। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজটি করা যায় কী না।’
বাসায় ঢুকে একই সাথে দুঃখিত এবং খুশী হয় সাজ্জাদ। বিরাট বাসা - বড় বড় দুটি শয়নকক্ষ, একটি লিভিং রুম এবং বেশ বড় ডাইনিং স্পেস। দু’টো বাথরুম আর একটা রান্নাঘর। রান্নাঘরটি অবশ্য তেমন বড় নয়। চট করেই স্ত্রীর কথা মনে হয়। ছোট্ট রান্নাঘরটি দেখে মেয়েটি নিশ্চয় খুশী হবে না। সাজ্জাদের মনটা ভারী হয় একটু। তার চেয়েও বড় মন খারাপ হয় - বাসায় কোন আসবাব নেই। নেই বলতে কিছুই নেই আসলে। শুধু একটা চৌকির মত তক্তাপোশ। সাজ্জাদ ভেবে পায় না, কোত্থেকে চৌকিটি এখানে আসল? মন খারাপ সত্তেও একটু কৌতুক বোধ করে সে। নিঃশব্দে মুচকি হাসেও সহসা, ‘বাহ! ভালইতো শুরু হোল। কয়জন পারে এভাবে জীবন শুরু করতে। একেবারে শূন্য থেকে।’ শূন্য থেকেই শুরু করে সে নিজেকে বিলিয়ে দেবে সকলের তরে। কবিগুরুর কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলাবে, ‘শূন্য ঝুলি নিয়ে হায় ভিক্ষু মিছে ফিরে, আপনারে দেয় যদি পায় সকলেরে।’
সাজ্জাদের স্ত্রী হাসি। বিয়ে করেছে ওরা ছয় বছর হয়ে গেল। একটি ছেলে হয়েছে বছরখানেক আগে। স্ত্রী-পুত্র এখন ঢাকাতে। সবকিছু গোছগাছ করে পরিবার নিয়ে আসবে, এটাই পরিকল্পনা। গোছগাছের জন্য টাকা-পয়সা কিছু হাতে আছে সাজ্জাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ করেই কম্পিউটার প্রোগ্রামারের চাকরি পেয়েছিল মোটা বেতনে। এক বছর চাকরি করেছে, সুবাদে কিছু অর্থ জমেছে। তাই বিছানাপত্র আর বাসার টুকটাক আসবাব নিয়ে তেমন ভাবনা নেই। কিন্তু সাজ্জাদ চিন্তিত অন্য কারণে। দামি আসবাব যেমন সোফাসেট, ফ্রিজ, টিভি এসব কীভাবে হবে? কোন সমস্যা নেই। এগুলো ছাড়াও চলবে, বলে মুষ্টি দৃঢ় করে বাসা থেকে বেড় হয় সাজ্জাদ।
সোজাসুজি বাজারে চলে যায় ওখান থেকে। একটা ডাবল খাট অর্ডার দেয়। ঠিক করেছে নিজে নিজেই রেঁধে খাবে, যে ক’দিন পরিবার থাকবে না। যতসামান্য রান্নার আসবাবপত্র কিনে ফেলে। কিছু তরিতরকারি মুদি সদাই নিয়ে বাসায় আসে। ‘শূন্যে পেতেছি মোর শয্যা’ টাইপের ভাবনা চলে আসে মাথায়। একলা বাসায় গলা ছেড়ে গেয়ে উঠে -
‘আজি এই শূন্যতায় পেতেছি আমার সুখ
জগতের নগ্ন মোহ থেকে মুক্ত সে মুখ।
লোভে পাপ পাপে মৃত্যু - স্থান বিবেকে
কলুষিত ভোগবিলাসে বাঁধব না নিজেকে।’
রান্নার কোন পূর্ব-অভিজ্ঞতাই সাজ্জাদের নেই। তবে বিষয়টি যে এত জটিল, শুরুতে ভাবা যায় নি। অথচ বাঙালি ললনারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রন্ধনের মত দুরুহ কাজটি নির্বিঘ্নে করে যাচ্ছেন। কেরোসিনের চুলা জ্বালাতে গিয়ে রীতিমত নাকাল সাজ্জাদ। চুলার ছিদ্র দিয়ে ফিতা ভরার চেয়ে কম্পিউটারে প্রোগ্রাম লেখা বিস্তর সহজ কাজ। এরপর ভাত কখন সিদ্ধ হল, কখন গড় দিতে হবে - সে এক মহাহিসেবী কাজ। হিসাবরক্ষকের ব্যালান্স শিট মেলানোর মত অতি নির্ভুল হতে হবে। এদিক-ওদিক হলো তো ভাত গ’লে গেল বা শক্ত থেকে গেল। সব বিবেচনায় ডিম ভাজাই সবচেয়ে সহজ মনে হল। কাঁচামরিচ পেঁয়াজ দিয়ে ডিম গুলিয়ে তেলে ঢেলে দেও, ব্যস্। পাতলা ডাল রান্না করার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এত ঝামেলান্তে ওতে ক্ষান্ত, অন্তত আজ রাতের মত।
‘স্ল্যামালাইকুম, স্যার। আমি সাজ্জাদ, শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগদান করেছি।’
ইউএনও সাহেব চেয়ার থেকে উঠে হাত বাড়িয়ে দেন, ‘বসেন, বসেন শিক্ষা অফিসার সাহেব। আপনিতো দেখি একেবারেই তরতাজা যুবক!’
‘বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেছি বেশী দিন হয় নি।’ সাজ্জাদ হাসতে হাসতে বলে।
‘খুব ভাল হয়েছে। আমাদের এখানে ইয়াং অফিসার খুবই দরকার। বুড়ো সহকারীরা আপনার অফিস অনেকদিন চালিয়েছে। দায়সারা গোছের চালানো যাকে বলে। আপনাকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে, সবকিছু সিস্টেমে আনতে হবে।’ ইউএনও সাহেবকে বেশ খুশী মনে হয়।
ইউএনও সাহেবের পুরো নাম জামালউদ্দিন আহমেদ। ছোটখাট গড়ন ভদ্রলোকের, মাথার চুল কম। তাও আবার ছোট করে আর্মি-ছাঁটা। দাড়ি-গোঁফ নিখুঁত কামানো। গোলগাল মুখমন্ডলে প্রচ্ছন্ন সৌম্য সৌম্য অভিব্যক্তি। চোখ দু’টো অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত। ডান গালে দৃষ্টিগোচর কাটা দাগ আছে একটা। বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি করতেন কী না কে জানে? সারা মুখে শিশুসূলভ সরল হাসিটা আঁঠার মত লেগে আছে। বেশ ফরসা গায়ের রঙ। গাঢ় নীল রঙের ফুলহাতা শার্টটি শরীরের সাদা জমীনে দারুণ মানিয়েছে। ভদ্রলোকের রুচির প্রশংসা করতে হয়। বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে অবশ্য ছোট্ট মতন লাগছে ইউএনও সাহেবকে। ভ্যান গগের আঁকা সীন নদীর তীর ধরে হেঁটে যাওয়া মানুষটার মত। বিশাল ক্যানভাসে মানুষটিকে ক্ষুদ্রই লাগে।
বিসিএস (প্রশাসন) চুরাশি ব্যাচের কর্মকর্তা তিনি। মেধা তালিকায় উপরের দিকেই ছিলেন। কথাবার্তায় জ্ঞানগরীমা দৃশ্যমান। গতকালই শুনেছে সাজ্জাদ, ভদ্রলোক সততায় একনিষ্ঠ। বেশ কঠিন-রুঢ় সততার ব্যাপারে। কোন রকম ছাড় দেয়া নেই। জর্জ বার্নার্ড শ’র কথা তিনি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন, ‘আমরা আমাদের সন্তানদের কাছে বলব সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। তার আগে পৃথিবীটাকে সততার আধার বানিয়ে নেব।’ অধিকাংশ সৎ কর্মচারীদের অলিখিত নিয়ম এরকম - আপনি অসৎ হন তাতে কোন সমস্যা নাই। আমি সৎ থাকলেই হল। কিন্তু জামালউদ্দিন সাহেব এ লাইনের না। তিনি নিজে আগা-পাশ-তলা সৎ, অন্য কাউকে অসৎ কাজ করতে দিবেন না বলেও পণ করেছেন। এরকম অফিসারের সংখ্যা খুব বেশী নেই এদেশে।
ভদ্রলোকের আরেকটি গুণের কথা শুনেছে সাজ্জাদ - সর্ববিষয়ে পারদর্শী। অ্যারিস্টোটলরা জগতের সব জ্ঞান ধারণ করে ছিলেন। জ্ঞান ততটা বিকশিত হয়নি বিধায় ওনারা সর্ববিষয়ে জ্ঞানী হতে পেরেছিলেন। এ’যুগে সব বিষয়ে চ্যাম্পিয়ন কিন্তু বিরাট ব্যাপার! ইউএনও সাহেব ধার্মিক মানুষ। শুক্রবারে মসজিদে মসজিদে গিয়ে ওয়াজ করেন নিয়মিত। মুসল্লীদের অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেন, ‘যদি পরিপূর্ণ ঈমানওয়ালা হতে চাও, তবে উত্তম চরিত্র অর্জন করো।’ ভদ্রলোকের কোনরকম ধর্মীয় গোড়ামী নেই। হিন্দু মন্দিরেও ছুটে যান সময়মত। শ্রীমদ্ভগবদগীতা থেকে চট করে উদ্ধৃতি দেন, ‘যিনি নিজেকে সকলের পদদলিত তৃণের থেকেও ক্ষুদ্র বলে মনে করেন, যিনি বৃক্ষের মতো সহিষ্ণু, যিনি মান শূন্য এবং অন্য সকলকে সম্মান প্রদর্শন করেন, তিনি সর্বক্ষণ ভগবানের দিব্যনাম কীর্তনের অধিকারী।’
খেলাধুলায়ও সমান পারদর্শী। যে কোন ক্রীড়ার একেবারে সামনের সারির খেলোয়ার - হারাতে পারে এমন ক্রীড়াবিদ গোয়ালন্দে নেই। অফিস শেষে নিয়মিত খেলেন সকলের সাথে - ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি ইত্যাদি। হারমোনিয়াম বাজিয়ে আসরে গান করেন, ‘জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজো আমি ....।’ একুশের প্রথম প্রহরে তার গলায় সবচেয়ে জোরে উচ্চারিত হয়, ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।’ কবিতা আবৃত্তি করেন চমৎকার। স্বাধীনতা দিবসের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে আবৃত্তি করেন, ‘স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো....।’ পিন-পতন নিস্তব্ধতায় সকলে তন্ময় হয়ে থাকে। প্রতি শুক্রবার বিকালে সাহিত্য আসর বসে ইউএনও সাহেবের বাসায়। এলাকার বিদগ্ধজনের আসেন, আলোচনা করেন সাহিত্যের মূল্যবান রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে।
‘সাজ্জাদ, একটু পরে আমরা একটা স্কুলে যাব। স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির একটা অনুষ্ঠান আছে। এঞ্জিনিয়ার সাহেবও যাবেন। আপনি এসেছেন, ভালই হল। একসাথে যাওয়া যাবে।’ ইউএনও সাহেব উৎসাহে বলেন।
সাজ্জাদের ভাবনায় ছেদ পড়ে। চমকায় একটু, সরাসরি নাম ধরে সম্বোধন। সাধারণত লোকে পদবী ধরে সম্বোধন করে এখানে। নিদেনপক্ষে নামের পরে সাহেব বলে। ভাল লাগে সাজ্জাদের। ভদ্রলোক ওকে আপন করে নিয়েছেন। আগ্রহে বলে, ‘কখন যাবেন, স্যার?’
‘এইতো আধাঘন্টা পরে। আপনি বরঞ্চ এঞ্জিনিয়ার সাহেবের রুমে যেতে পারেন। পরিচয়ও হয়ে গেল। শরীফ মানুষ হিসেবে চমৎকার। আপনার মতই তরুন। মাত্রই বুয়েট থেকে সিভিল এঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখানে এসেছে।’
‘আইডিয়াটা মন্দ না, স্যার। আমি নীচে গেলাম।’
ইউএনও সাহেবের রুমটা দোতলায়। এঞ্জিনিয়ার একতলায় সিঁড়ির কাছেই। উপজেলা কমপ্লেক্সটা বেশ পরিস্কার। সরকার নামক এক অদৃশ্য বস্তু সবকিছু করে দিবে, অফিসের বাথরূমও পরিস্কার করে দিবে - দেশের জনগণ মনেপ্রাণেই এটা বিশ্বাস করে। তাই সরকারি অফিসে কেউ কোথাও হাত দেয় না, বারান্দায় পড়ে থাকা কলার খোসাটাও কেউ ফেলে দেয় না। সরকারি অফিস-আদালত নোংরা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক - সাজ্জাদের এই ধারণাটা আসলে ঠিক না। গোয়ালন্দে এসে তাই সাজ্জাদের অনেক অনেক চমক! এঞ্জিনিয়ার শরীফও আরেক চমক হয়ে আসে।
রুমের সামনে নেমপ্লেটটা ভাল করে দেখে সাজ্জাদ। কালোর উপরে সোনালী হরফে লেখা - শরীফ মুজিবুর রহমান, উপজেলা এঞ্জিনিয়ার, গোয়ালন্দ। ভারী পর্দা টানানো দরজায়, বাইরে থেকে দেখা যায় না। ভিতরে কোন সাড়াশব্দ নেই। আছে নাকি রুমে? সাজ্জাদ মৃদু শব্দ করে দরজায়।
ভিতর থেকে জলদগম্ভীর আওয়াজ, ‘কে?’
‘আমি সাজ্জাদ। এখানকার শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগদান করেছি।’ সাজ্জাদ স্বর না কাঁপিয়ে বলে।
পর্দা নড়ে উঠে। ভদ্রলোক নিজেই চেয়ার ছেড়ে উঠে এসেছেন। ‘আসেন, আসেন সাজ্জাদ সাহেব। বাহ! আপনিওতো আমার মতই বাচ্চা বাচ্চা!’ হেসে উঠেন তিনি।
সাজ্জাদও হাসে। ‘কী যে বলেন। আপনাকেতো ইউনিভার্সিটি ফার্স্ট ইয়ার লাগছে।’
‘তাইলে আপনি এখনো কলেজেই আছেন।’ শরীফের হাসি উচ্চ আওয়াজে।
‘এ’কথা বইলেন না। আমার কিন্তু বউ আছে, একটা ছেলেও আছে।’ সাজ্জাদ কপট গাম্ভীর্যে বলে।
‘বলেন কী? আমিতো বিয়েই করিনি এখনো।’ এঞ্জিনিয়ার অবাক।
চট করেই দু’জনের চমৎকার একটা সম্পর্ক হয়ে যায়। সাজ্জাদ ভাল করে লক্ষ্য করে মানুষটিকে। অফিসারসূলভ কোন গাম্ভীর্য নেই। শুরুতেই মনে হয় কতদিনের বন্ধু। বৃটিশ-ঐতিহ্য ধরে রেখে অফিসিয়াল পোশাকের যে চলন আছে, এর ধারে-কাছেও নাই তিনি। হালকা আকাশী টি-শার্ট আর গাঢ় নীল জিন্স। শ্যামলা গায়ে দারুন মানিয়েছে। রীতিমত রূপবান যুবক। ছিপছিপে শরীর, বাড়তি মেদ নেই কোথায়ও। বিয়ের বাজারে প্রথম গ্রেডের পাত্র সন্দেহ নেই। চশমার পিছনে চঞ্চল কালো চোখ। বুয়েটে পাঁচ/ছয় বছর কঠোর পড়াশুনায় চোখের নীচটা একটু কালো হয়েছে। এঞ্জিনিয়ার-মেডিকেলের ছাত্র দেখলেই এ বিষয়টা সাজ্জাদের চোখে পড়ে। চোখের ঠিক নীচে কালো ছোপ থাকবেই। আহারে! বেচারাদের পড়তে হয় অনেক বেশী।
‘বাড়ি কোথায় আপনার?’ সাজ্জাদ সৌজন্যতা রক্ষা করে।
‘বাগেরহাট, মোড়েলগঞ্জ। আপনার?’ শরীফ সাথে সাথেই বলে।
‘মাদারীপুর।’
‘বাহ! আপনিতো গ্রেটার ফরিদপুরেই আছেন। পোস্টিং তাহলে ভালই হয়েছে।’ শরীফ কৌতুক করে।
‘পোস্টিং খারাপ হয় নি। অবশ্য এসব নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি। তবে একটা কথা, আমার বেইজ এখন ঢাকা, মাদারীপুর না।’
হালকা চালে কথাবার্তা চলতে চলতেই ইউএনও সাহেবের মুখ দেখা যায়। ‘কী, গল্প জমছে বেশ? চলেন বের হতে হবে, স্কুলে যেতে হবে।’
‘ঠিক আছে, স্যার। চলেন যাই।’ দু’জনেই উঠে পড়ে।
উপজেলা চেয়ারম্যানের রেখে যাওয়া সবুজ রঙের জিপ র‌্যাংলারে চেপে বসে তিনজনেই। গাড়ির সামনে তিনজন অফিসার আর পিছনে পিয়ন দু’জন। পিয়ন-চৌকিদার নিয়ে চলাচলের ব্রিটিশ রীতি রয়ে গেছে এখনো। সাজ্জাদ মৃদু হাসে মনে মনেই। গোয়ালন্দ বাজার পার হয়ে উত্তর দিকে মাইল পাঁচেকের মত হবে। রাস্তা সরু তবে পুরোটাই পাঁকা। যোগাযোগ ব্যবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে দেশে। উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও পাকা রাস্তায় ছেয়ে গেছে। সরকারের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এরা যেখানেই কাঁচা রাস্তা পায়, চট করে প্রকল্প বানিয়ে পাকা করে দেয়।
স্কুলের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ ছুটে এসেছেন গাড়ির কাছে। ইউএনও সাহেব সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, আমাদের নতুন শিক্ষা অফিসার। সালাম আর করমর্দনে সিক্ত সাজ্জাদ। জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা ওর, চোখ ভিজে যাচ্ছে অন্য রকম আনন্দে। একটু গর্ব গর্ব লাগছে কী? এত বয়স্ক সব মানুষ, স্যার স্যার বলছে। যা! কী সব ভাবছে সে!
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবও আছেন। তিনজন অফিসারকে সাথে নিয়ে মঞ্চে বসিয়ে দিলেন। সাজ্জাদ সামনের দিকে তাকায় - তিন/চার’শ মানুষ হবে। সাথে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও আছে। মহিলাও আছেন বেশ অনেকজন। এ দেশের মহিলারা বেশ এগিয়েছেন বিগত বছরগুলোতে। ঘরের অন্ধকার কোণ ছেড়ে বের হয়েছেন কর্ম-পরিবেশে, পুরোদমে। বিভিন্ন কাজে-কর্মে নিজেদের যুক্ত করছেন সমান তালে। এটা অসম্ভভ এক অগ্রগতি বাংলাদেশের মত একটা অনুন্নত মুসলিম দেশে। কোন সন্দেহ নেই, এনজিওদের জনসেবামূলক কার্যক্রমের বিরাট অবদান আছে এক্ষেত্রে।
ইতিমধ্যে বক্তৃতাপর্ব শুরু হয়েছে। চেয়ারম্যানের পরে এঞ্জিনিয়ার সাহেব কীসব বলে এসেছেন। মাইকে এখন বলা হচ্ছে, ‘গোয়ালন্দ উপজেলায় সদ্য যোগদানকৃত শিক্ষা অফিসার জনাব সাজ্জাদ কবির এখন বক্তৃতা করবেন।’ সাজ্জাদ ধীর কম্পিত পায়ে মাইক্রোফেনের সামনে যায়। অসহায় দৃষ্টিতে সামনের জনতার দিকে তাকায়। বক্তৃতা কখনো করেনি জীবনে, জানে না কী বলতে হবে। কীভাবে বলতে হবে। জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। কোন শব্দ বের হচ্ছে না যেন। মনে হচ্ছে সামনের জনতা কৌতুক করছে ওকে নিয়ে, ‘এই ব্যাডা কথা কয় না ক্যা?’
সাজ্জাদ হঠাৎই শুরু করে, ‘আমার সালাম নিবেন। আমি কালই যোগদান করেছি আপনাদের উপজেলায়। আমার একটা স্বপ্ন আছে, এই উপজেলার সব শিশু বিদ্যালয়ে যাবে। সকল শিক্ষক যথাসময়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করবেন। প্রতিটা শিশু মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করবে। আমার অফিসে কোন রকম অনিয়ম হবে না। দূর্ণীতি কোনক্রমেই আমার অফিসের ধারে কাছে আসতে পারবে না। দেশের ঋণ শোধের এবং দেশের সেবা করার এই সূবর্ণ সুযোগ আমি হারাতে চাই না। এটা আমার দৃঢ় সংকল্প। আমার সংকল্প বাস্তবায়নে আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন, এটাই আমার অনুরোধ। আল্লাহ হাফেজ।’ কম্পিত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে চেয়ারে গিয়ে বসে সাজ্জাদ। হাত-পা টলছে মৃগী রোগীর মত। স্ত্রী হাসি আর ছেলে রাজিনের চেহারাটা ভেসে উঠে। মায়ের মুখটাও ভেসে উঠে সহসা।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ২০০ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ০৭/০১/২০১৮

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • শিবশঙ্কর ১০/০১/২০১৮
    ভাল হছ্ছে ।
 
Quantcast