www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

মাইটি মারে

‘লেডিজ এন্ড জেন্টেলমেন, উই আর গনা ক্রস দ্য মাইটি মারে নাউ।’
উচ্চস্বরে ঘোষণা রেডিওতে। দ্য মাইটি মারে! কৌতুহূলী হই। আমাদের কম্পার্টমেন্টে যাত্রী বেশী না, ফাঁকাই বলা চলে প্রায়। ধুর! এখানে বসে কী দেখব? কে কী বলে তাওতো শুনা যাবে না। সাত-পাঁচ ভেবে ডাইনিং কারের দিকে রওনা দেই। ওখানে বেশী মানুষ থাকবে আর দেখাও যাবে ভাল। যাহোক, আমেরিকানরা সংগত কারণে ব্রিটিশদের থেকে ভিন্নতা নিতে চায়। ইংরেজি ভাষার ব্যবহারেও এর ব্যতিক্রম হয় না। তাই ব্রিটিশদের ব্যবহ্রত ‘রেস্টুরেন্ট কার’ আমেরিকায় হয়ে যায় ‘ডাইনিং কার’। অন্যান্য ইংরেজি ভাষাভাষির দেশেও ব্রিটিশদের বাদ দিয়ে আমেরিকান ইংরেজির প্রভাব সুস্পষ্ট এখন। অস্ট্রেলিয়াও এর বাইরে না। রেস্টুরেন্ট কার আর ডাইনিং কার যে যাই বলুক, আমি আসলে ট্রেনের খাবার কামরার কথা বলছি।
মেলবোর্ণ থেকে এই ট্রেনে উঠেছি; স্ত্রী-ছেলে-মেয়েসহ চারজন আমরা। গন্তব্য সাউথ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী অ্যাডিলেইড - লম্বা জার্নি, প্রায় এগার ঘন্টা। মেলবোর্ণের সাউদার্ন ক্রস স্টেশনে চেকইন করে ট্রেন দেখে তেমন একটা আহ্লাদিত হই না। ‘দ্য ওভারল্যান্ড’ নামের এই ট্রেন আকারে বেশী বড় না, দশ বা বারটা কামরা হবে। বিলাসবহুলও বলা যাবে না। উন্নত দেশের সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেন। তবে সাউদার্ন ক্রস স্টেশনটা বেশ বড় আর চাকচিক্যময়। পুরনো নাম স্পেন্সার স্ট্রিট বাদ দিয়ে অধুনা দেয়া সাউদার্ন ক্রস নামটাও চমকপ্রদ। আশ্চর্য বলতে ঐ ট্রেনের সিট - তিনশ ষাট ডিগ্রী ঘুরানো যায়। তবে একটাই দুঃখ - বাংলাদেশের ট্রেনের চিরাচরিৎ ছন্দময় ঝিকঝিক ঝিকঝিক শব্দ কানে আসে না তেমন একটা।
বাই ডিফল্ট খাবারের কামরা আছে একটা - ডাইনিং কার। ওখানেই বসে আছি এই মুহূর্তে, পরিবার নিয়ে। মারে নদীটা দেখতে হবে, সাথে এর উপরের ব্রিজটাও - মাইটি মারে বলে কথা! মাইটি আমাজন বা নাইল বললেও চলে। মারে কি আসলেই মাইটি? দৈর্ঘে অবশ্য খারাপ না - আড়াই হাজার কিলোমটিারেরও বেশী। নদীটা মানব দেহের পরিপাকতন্ত্রের নাড়িভুড়ির মত প্যাঁচ খেতে খেতে ছড়িয়ে আছে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দক্ষিণ দিকে। সেই সাথে আরো একটা কাজ করেছে এ নদী - বেশীরভাগ জায়গায় ভিক্টোরিয়া আর নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের বর্ডার এটি।
এই দুই রাজ্যের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সর্বজনবিদিত। বিতন্ডা তুমুলে উঠে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী কোন শহর হবে এ নিয়ে। ভিক্টোরিয়া বলে ‘মেলবোর্ণ’ আর নিউ সাউথ ওয়েলস বলে ‘সিডনি’। যদিও সিদ্ধান্ত হয় আপাততঃ মেলবোর্ণে রাজধানী হবে তবে কিছুদিন পর এটি সরাতে হবে। ফলে ‘ক্যানবেরা’ রাজধানীর খাতায় নাম লেখায়। ক্যানবেরা আবার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মধ্যে। তাই ভিক্টোরিয়াবাসীর দাবীর মুখে একে আলাদা টেরিটরির মর্যাদা দেয়া হয় - অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটেল টেরিটরি।
আমার বর্তমান আবাস অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন রাজধানী মেলবোর্ণে। ডাউনটাউনের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট খাল সদৃশ ইয়ারা নদী চোখের মায়োপিয়ার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। ট্রেনের ডাইনিং কারে বসে ভাবছি বিশাল মারে নদী নিশ্চয় দৃষ্টি খাঁচাবদ্ধ অবস্থা থেকে দূরে নিয়ে যাবে, যতদূর চোখ যায়।
‘তুমি নিশ্চয় খুবই এক্সাইটেড, মাইট?’ পাশের টেবিলে মাঝবয়সী একজন বসে আছেন। সোনালী চুল, চোখে চশমা। ভদ্রলোক এক দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে। একটু পর পর কফিতে চমুক দিচ্ছে। ফ্রেন্ড শব্দের পরিভাষা ‘মেইট’কে অস্ট্রেলিয়ানরা অজানা কারনে উচ্চারণে ‘মাইট’ বলে।
‘নিশ্চয়, নিশ্চয়! এক্সাইটেড হব না! মারে রিভার বলে কথা।’ উৎসাহিত জবাব ভদ্রলোকের।
‘বেশ বড় নাকি নদীটা? তুমি কি আগে দেখেছ?’ আমার আবার জিজ্ঞাসা।
‘ঠিক তাই, বেশ বড়। অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় নদী। আমি কয়েকবার এ পথে গিয়েছি। প্রতিবারই আগ্রহে থাকি এ সময়। কখন নদীটি পার হব, ব্রিজের উপর দিয়ে।’
মানুষজন এত আগ্রহ নিয়ে আছে, কৌতুহূল না হয়ে পারা যায়! মেলবোর্ণ ছেড়েছি অনেক আগে, আট-নয় ঘন্টাতো হবেই! অ্যাডিলেইড চলে এসেছি প্রায়। প্রতিমধ্যে কোন কিছুই নজরকাড়া ছিল না। কোন নদী, নিদেনপক্ষে কোন ব্রিজও চোখে পরেনি। তাই নদীর দেশের মানুষ হয়েও মারে নদী, এর উপর ব্রিজটা দেখতে খানিক আগ্রহ পাচ্ছি এখন।
সাথের ডিজিটাল ক্যামেরাটা চোখে নিয়ে প্রস্তুত। ক্যামেরার বিচিত্রতায় সবসময়ই বিস্মিত আমি। বিশেষ করে ক্যামেরাম্যানদের লেন্স দেখলেতো রীতিমত ভিমরী খাই। কত সাইজের লেন্স! বাচ্চা লেন্স, মা লেন্স, দাদী লেন্স - শেষ নেই যেন। যার লেন্স যত বড়, তাঁর গর্বিত কলারও তত উঁচু। আমরা মাইকেলসে যাই ক্যামেরা কিনতে। প্রথমেই পই পই করে বলে নেই, ‘সবচেয়ে ছোট লেন্স, কিন্তু পাওয়ারফুল - এরকম ক্যামেরা দেন।’
নাইকন ক্যামেরাটা তাক করে আছি, ক্লিক ক্লিক করব। মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত যেন, টুপ করে পার হয়ে গেল ব্রিজটা। সেই সাথে নদীটাও, ক্যামেরা ঠিকমত ক্লিক করার আগেই। পুত্র-কন্যাও অবাক।
‘বাবা, ছবি তুললে না! নদী পার হয়ে গেল তো।’
স্ত্রী বরাবরের মত দুই কাঠি এগিয়ে, ‘তুমি হচ্ছ আজীবনের অকম্মার ধারি। সামান্য ছবি তুলবা, তাও পারলা না। ঘোড়ার ডিমের নদী দেখতে এসেছি।’
রাগে গজরাতে গজরাতে ওরা ডাইনিং কার ছেড়ে প্যাসেঞ্জার কামরায় চলে যায়। আমি স্থির হয়ে বসে থাকি। ভেবেছিলাম নদীর মাঝখানে যাবার পর ধীরেসুস্থে আয়েশ করে পরিবারের সকলের সাথে বিভিন্ন পোজে ক্লিক ক্লিক হবে। হায় খোদা! ছবি তুলার আগেই নদী-ব্রিজ পিছনে ফেলে দিলাম আমরা।
নদী বলতে আমার চোখে তো আর খাল ভাসে না। পদ্মা-মেঘনা বাদ দিলাম, জন্মাবধি যে আড়িয়াল খাঁ দেখে আসছি তার পাড়ে দাড়ালেও দৃষ্টি আটকে যায় না। এপার-ওপার দেখা যায় তবে ঝাপসা হয়ে আসে। আর পদ্মা-যমুনার দুই পাড়ের মানুষতো চিরকালই দুই ভুবনের বাসিন্দা। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পার হতে কতক্ষণ লাগে! যমুনা ব্রিজতো শেষই হয় না! সেরকমটাই তো ভাবছিলাম। আহারে!
অ্যাডিলেইডে আমাদের জন্য অন্য বিস্ময় দাঁড়িয়ে ছিল। রক্তের সম্পর্কের কেউ নেই ওখানে। চাকরির সুবাধে কয়েকজন বন্ধু আছে। রবিউল ভাই, আরেফিন আপা, আরো কেউ কেউ। আমাদের নিয়ে রীতিমত কাড়াকাড়ি তাঁদের মধ্যে। কয়বেলা থাকব, কোথায় খাব, কী খাওয়াবে, কোথায় নিয়ে যাবে - মহা হুলস্থুল! বাঙ্গালীর আতিত্থেয়ত্বা যে পর্বত প্রমাণ।
এদিকে আমার মন পরে আছে অ্যাডিলেইড ওভালে। অ্যাসেজ চলছে, শেষ দুইদিন পাওয়া যাবে টেস্টের। পড়িমড়ি করে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। নিস্প্রাণ ড্র হচ্ছে টেস্ট ম্যাচটি। সাড়ে পাঁচশ করে ডিক্লেয়ার করেছে ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে। খেলাতো এখানেই শেষ, তাই না? উহু শেষ না, শেইন ওয়ার্ন আছে না! শেষমেষ ছয় উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়্।া বেঙ্গল টাইগাররাও কিছুদিন আগে তাই করেছে। প্রথম ইনিংসে প্রায় ছয়শ রান করেও টেস্ট ম্যাচ হেরেছে নিউজিল্যান্ডের সাথে। আজিব!
অ্যাডিলেইডে বাঙ্গালী কম থাকলেও সিডনি একেবারে ভিন্ন। এয়ারপোর্ট থেকে তাই সরাসরি লাকেম্বা পৌঁছাই। খাঁটি বাংলায় লেখা, ‘আল-আমিন স্টোর’ দেখে আবেগী হয়ে যায় মনটা। স্ত্রীর কাজিন হৃদয় ভাই গর্ব করেন, ‘এভাবে বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড দেখেছেন মেলবোর্ণ?’
আমি না-সূচক মাথা নাড়ি।
‘সিডনি এরকমই। লাকেম্বাকে লিটল বাংলাদেশ বলতে পারেন, অনেকটা চায়না টাউনের মত। গুনে দেখেন ছয়-ছয়টা দোকান আছে সারিবদ্ধ, বাংলাদেশী গ্রোসারি। নিউইয়র্ক, লন্ডনের পর কিন্তু আমরাই এগিয়ে, সংখ্যায়।’ হৃদয় ভাইএর গলার স্বরে মুগ্ধতা।
আমি মুচকি হাসি, ‘ভাইরে মিডল ইস্ট বাদ দিলেন কেন? অন্যসব দেশ একসঙ্গে মিলিয়েও তো ওদের সমান হতে পারবেন না।’
হৃদয় ভাই দুঃখিত ও গম্ভীর হয়, ‘স্যরি, ওদের কথা মনে ছিল না।’
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাই, ‘মানুষ সিডনি এসে প্রথমেই যায় ওপেরা হাউজ, হারবার ব্রিজ আর আপনি আমাদের এনেছেন লাকেম্বা - বাঙ্গালী পাড়ায়। ধন্যবাদ আপনাকে, চিন্তার প্রশংসা করতেই হয়।’
বরফ গলে এবার। আনন্দের সূর্য্য উকি দেয় আবার। আমি তাড়া দেই, ‘চলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিস দেখে আসি। ক্যানবেরাতো বেশী দূরে না।’
‘অবশ্যই। কালই চলেন।‘
বরফ সাদা টয়েটা সিয়েনা মিনিভ্যান সিডনি ছাড়ে ভোর সকালে। ঘন্টা তিনেকের মত লাগবে ক্যানবেরা যেতে। আসল গন্তব্য ও’মালে এরিয়া, এখানেই বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিস। পরিচিত এক ভাই আছেন ওখানে, সাঈদ ভাই। বড় ভাইয়ের সাবেক সহকর্মী। বলা ছিল আগে থেকেই, আমরা আসব।
হাকিম চাচা গাড়ী চালাচ্ছেন। ভদ্রলোক সকলেরই চাচা। বাপেও ডাকে চাচা, ছেলেও তাই। জাতীয় চাচা হয়ে গেছেন এখানে। চাচা-জাতীয় সমস্ত গুণাবলী ভালই বিদ্যমান ভদ্রলোকের মধ্যে। পাঞ্জাবী-পাজামা পড়নে। পীর সাহেবদের মত লম্বা দাড়ি, দশাসই একখান ভুড়ি। চেহারায় সৌম্য সৌম্য ভাব আছে, অজান্তেই শ্রদ্ধা-ভক্তি চলে আসে। কথাও বলেন চমৎকার করে।
আচরণও কিছুটা বিচিত্র। এসব দেশে ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করে - সহজে চোখে পরে না। হাকিম চাচা ব্যতিক্রম। লালবাতি মেরে দেন আর বলেন, ‘ভাইস্তা অস্থির হইও না, এখানে ক্যামেরা-ট্যামেরা নেই।’
আমি অবাক হই। এই বয়সেও চাচার অফুরন্ত প্রাণশক্তি। তবে ইতিহাস কিন্তু করুণ উনার। উনিশ বছর ধরে সিডনিতে আছেন। এটা কোন ব্যাপার না। ঊনিশ দু’গুণে আটত্রিশ বছর ধরেও অনেকে আছেন। কিন্তু করুণ ব্যাপারটা হচ্ছে উনিশ বছর আগে অবৈধভাবে এখানে এসেছিলেন। ধীরে ধীরে পেপারস হয়ে যাবে, বৈধ হয়ে যাবেন এই ছিল ভাবনা। চাচার পরে এসেও অনেকে বৈধ হয়ে গেছেন। কিস্তু দুর্ভাগ্য চাচা এখনও বৈধ হতে পারেননি।
সেই যে এসেছেন ঊনিশ বছর আগে, আর দেশে যেতে পারেননি। সুন্দরী স্ত্রী আর দু’টো ছেলে রেখে দেশ ছেড়েছিলেন। স্ত্রী গর্ভবতী তখন।
চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘ভাইস্তা, এখানে বসেই শুনলাম আমার মেয়ে হয়েছে। পরানটা কাইন্দা উঠে, মেয়েটারে দেখবার চায়। কিন্তু পারিনি, যেতে পারিনি। গেলে যে আর ফিরতে পারব না।’
‘মেয়েটা নিশ্চয় অনেক বড় হয়ে গেছে, চাচা?’ আমার জিজ্ঞেস।
‘বড়তো কবেই হয়েছে। কদিন আগে বিয়ে হয়ে গেল। আমার মেয়ে জন্ম নিল, বড় হল, বিয়ে হয়ে গেল। আমি কিছুই দেখলাম না।’ হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেন উনি। ‘অনেক দিন পর ছেলে দু’টোকে এনেছি। ভর্তি হয়েছে এখানে, পড়াশুনা করছে। দুঃখের কথা কি চাচা, ওরা কেমন পর পর হয়ে গেছে। দু’হাতে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকব, তা আর হয় না। সময় অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে। বড় কষ্ট, বড় কষ্ট!’
আমি মহাশূন্যের নিস্তব্ধতার মত নির্বাক হয়ে যাই। মনে মনে ভাবি, বিদেশী রেমিটেন্স দিয়ে ব্যাংক ভরছে আমাদের দেশের। কতকিছু করছি ঐ টাকা দিয়ে - বৈধ-অবৈধ! দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি সেই ডলারের উপর হাকিম চাচার চোখের নোনা জল ।
‘আপনারা কতদূর? খাবার গরম দিব?’ ক্যানবেরা থেকে সাঈদ ভাইয়ের উদ্ধিগ্ন স্বর।
‘এইতো ভাই, আর মাত্র ঘন্টাখানিক লাগবে পৌছুতে। পার্লামেন্ট ভবন, বাংলাদেশ হাই কমিশন ঘুরে সরাসরি আপনার বাসায় চলে আসব।’
পত পত করে উড়তে থাকা লাল-সবুজ পতাকাটার সম্মোহনী ক্ষমতা ঠিক আগের মতই আছে। মন্ত্র মুগ্ধের মত এগিয়ে যাই আমরা। ছুঁয়ে দেখি পতাকা দন্ডটা। ছবির পর ছবি, ক্লিক ক্লিক। বিদেশ বিভুঁইয়ে বাংলাদেশের পতাকা, আবেগী করবে না!। ঘুরে ঘুরে পুরো বিল্ডিংটা দেখি আমরা, বাংলাদেশ হাই কমিশন অফিস। কামরায় কামরায় আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ছোট্ট পরিসরে হলেও দৃশ্যমান। আমরা আগ্রহভরে ঠিক মিউজিয়ামের মত ঘুরতে থাকি।
‘আর কতক্ষণ লাগবে?’ আবার সাঈদ ভাইয়ের তাড়া।
‘ভাইরে সবকিছু দেখতে দেখতে দেরী হয়ে গেল। যদি কিছু মনে না করেন, আজকে বাদ দেন। আপনার ওখানে না গেলেই নয়।’
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ মৌনতা। এরপর অনুযোগের কন্ঠে, ‘এসব কী বলছেন? আমরা রান্নাবান্না করে রেডি হয়ে বসে আছি। প্লিজ আসেন।’
‘ঠিক আছে ভাই, আসছি।’
দুপুরে খাবার কথা, কিন্তু পৌছুলাম যখন বিকাল যায় যায়। মাফটাফ চেয়ে নিলাম প্রথমে। বিস্ময়ের বিস্ময় দেখলাম এরপর। রীতিমত হকচকিয়ে গেছি আমরা খাবার দেখে। শুরুতেই মুড়িমেখে আপ্যায়ন। কাঁচামরিচ-পেয়াজ-আচারের তেল দিয়ে ভিন্ন গ্রহের খাবার যেন। স্বর্গে যে কেন মুড়ি থাকবে না, এ আফসোস রয়েই গেল। সাথে আমের ভর্তা আর তেতুলের সরবত।
চিরায়ত বাঙ্গালী প্রতিভায় ভাবী খাবার টেবিল ভরে দিল। একটু বেশীই দিল যে! টেবিলটা কিন্তু যেনতেন চায়ের ট্রাইপড না। পুরোদুস্তর প্রমাণ সাইজের ডাইনিং টেবিল। ডিসের বর্ণনা বেশ লম্বা, এরকম: সাদা বাসমতি চালের ভাত এবং চিনিগুড়া চালের পোলাও, ছয় রকমের ভর্তা - আলু, ডাল, মাশরুম, শুটকি, বেগুন ও টাকিমাছ। মাছের মধ্যে কাচকি ভুনা আর রুইএর কারি। উচ্ছে ভাজি, জুকিনি দিয়ে চিংড়ি, ফুলকপি-আলু দিয়ে কই মাছ, আধসেদ্ধ ব্রকলির সব্জি। আস্ত তেলাপিয়া এবং মুরগির গ্রিল। গরুর মাংশের আর হাসের কারি, মুরগির কোরমা। দেশী মুরগি না থাকায় উনাদের কী আফসোস! অবধারিত পাতলা ডাল ছিল। এরপর ডেজার্ট হিসেবে পায়েস আর হাতে বানানো রসগোল্লা।
প্রসঙ্গটা আমিই তুললাম, ‘স্যরি ভাই, আমরা বুঝতে পারি নি যে আপনি এরকম আয়োজন করে রেখেছেন।’
‘স্যরির কিছু নেই, আপনারা কষ্ট করে এসেছেন। আমরা এতেই খুশি।’
‘আমরা ভেবেছিলাম আপনাকে ঝামেলায় ফেলব। তাই চলে যাবার কথা বলেছিলাম। কিন্তু আপনার আয়োজনের বিশালত্ত্ব আমাদের অবাক করেছে। না আসলে খুবই খারাপ হত ব্যাপারটা।’
‘কী যে বলেন? আপনাদের কি মনে হয়েছে আমরা ঝামেলায় পড়েছি? আপনারা আসবেন বলে আজকে ছুটি নিয়েছি আমরা দু’জন। যৌথ-প্রযোজনায় রান্না হয়েছে। এটাকে যদি ঝামেলা বলেন, তাহলে ঝামেলার ডেফিনেশন কিন্তু পাল্টাতে হবে, কী বলেন?’ সাঈদ ভাই হাসতে থাকেন।
আমরাও হাসি। আর হাসি, সকলে মিলেই।
নিজেকে অপরাধী মনে হয়। বাঙ্গালীর আতিথেয়তা সর্বজনবিদিত, আমার কাছেতো অবশ্যই। সেই আমি কীভাবে এবং কেন যে না করেছিলাম তার হিসাব-নিকাশ খুঁজে পাই না। আবহমান কাল থেকেই তো আমরা এরকম। ধার করে হলেও অতিথিদের ঘি খাওয়াই, সেই জাতি আমরা। এখানে তথাকথিত সামাজিকতা দেখানো বালখিল্যতা আসলে নেই। আমরা ভীষণ দুঃখিত সাঈদ ভাই, মনে মনে বলি। মাইটি মারে ছোট হতে পারে। কিন্তু বাঙ্গালীর হৃদয় পদ্মা-যমুনার মত বিশাল! ঠাঁই পাবার কোন সুযোগ নেই।
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ৩৬৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১২/১১/২০১৭

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • ফয়জুল মহী ১৪/১১/২০১৭
    মনোমুগ্ধকর
  • সোলাইমান ১৩/১১/২০১৭
    ভালো লাগলো। শুভেচ্ছা জানবেন কবি বন্ধু।
  • মধু মঙ্গল সিনহা ১৩/১১/২০১৭
    ভালো লাগলো লেখক বন্ধু।
  • বরাবরের মতোই ভাল লেগেছে
 
Quantcast