www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

শুধু আমরা চারজন

শুধু আমরা চারজন

আব্দুল মান্নান মল্লিক

আমাদের গ্রামের নাম মরাদিঘি। ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের পশ্চিম দিকে পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা পেরিয়ে বিশাল গঙ্গার বাঁধ। বাঁধের ওপারের ঢালে কাশবনে ভরা। কাশবন ভেঙে বালুচর, তারপর ছাড় গঙ্গা। এই ছাড় গঙ্গা আমাদের এখানে বাঁওড় নামে পরিচিত। এই বাঁওড় ও গঙ্গার মাঝখানে একটি দীপ। এই দীপটির নাম শাঁখদহ। শাল, সেগুন, শিশু, মেহগানি আরও বিভিন্ন প্রকার বড়বড় গাছে ভর্তি এই দীপটি। গাছগুলো পাকা রাস্তার ধার থেকে ভালভাবে দেখা যায়। সন্ধ্যার সময় বড়বড় গাছগুলো ঢেকে যায় বিভিন্ন রকম বড়বড় পাখিদের ছাউনিতে। দূর থেকে দেখে মনে হয়, ঈশ্বরের কি অপূর্ব বৈচিত্রপূর্ণ দান। ঈশ্বরের কাছে পাখিরা হয়তো চেয়ে নিয়েছে তাদের নিজের অধিকার। তাই ওরা স্বাধীন ভাবে নিজের এলাকা ভাগ করে নিয়েছে।
দূর থেকে দেখতাম আর ভাবতাম, এতো সুন্দর জায়গা, কোনোদিন যদি কাছ থেকে দেখতে পেতাম কতো না ভালো হতো!
ইং - ১৯৭৮ সাল, মার্চ মাসের শেষের দিকে
মাধ্যমিক পরিক্ষার পর সামনে লম্বা অবসর সময়। কাগজ কলমে না হলেও গরমকাল বলা যায়।
অনেকদিনের অপেক্ষায় থাকা এই লম্বা সময়টা। নাই কোনো পড়াশুনার চাপ, নাই কোনো বাবা মায়ের বকুনি। নিজেকে মনে হল, আমি যেন এক মেঘবিহীন মুক্ত আকাশের মুক্ত পাখি।
একদিন আমরা চার বন্ধু মিলে মনস্থির করলাম, তিনদিনের মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো শাঁখদহ দীপ দেখতে। একদিন একদিন দুদিন যাওয়া আসা, আর মাঝে একদিন থেকে যাবো, এই নিয়ে তিনদিনের কর্মসূচি। তাহলে ঘুরেঘুরে ভালভাবে সবটা দেখতে পাবো।
বাড়িতে বলতেই প্রথমে অমত করলেও পরে রাজি হয়ে যায়।
ইমাম , দীপু ও জুব্বার, এই তিন জন ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
আমাদের চার বন্ধুর মধ্যে, ইমাম ছিল অত্যন্ত সাহসী। গায়ে শক্তিও ছিল প্রচন্ড। বেশ সাফাই-এর সাথে বিষধর সাপও ধরতে দেখছি এই ইমামকে।
ইমামের মতো সাহসী বন্ধুকে সঙ্গী পেয়ে মনের জোর অনেক বেড়ে গেল।
দিনটা ছিল বুধবার। দুপুরের পরে চার বন্ধু মিলে চারটে ব্যাগ ভর্তি তিনদিনের মতো থাকা খাওয়ার সরঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে, ভাড়ার গাড়ি এম্বাসেডর-এ উঠে বসলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি ছেড়ে দিলো। গ্রাম সোজাসুজি বাঁধ পেরিয়ে কাশবন ভেঙে যাওয়া বেশ কষ্টকর, কিছুটা দূর হলেও ড্রাইভার ঘুরপাক রাস্তা ধরে আমাদেরকে দাদপুর ঘাটে নামিয়ে দিলো।
এখানে পারাপারের কোনো নৌকো থাকে না। জেলেরা ছোটোখাটো নৌকো নিয়ে ফাঁসি জাল পেতে মাছ ধরে। ওদেরকে বলে কেউ কেউ দু-চার টাকা দিয়ে সময়ে যাওয়া আসা করে।
আমাদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক জেলে, ছোটো নৌকো নিয়ে এগিয়ে এসে জানতে চাইলো আমরা ওপারে যাব কি না। আমাদের বলার আগেই জেলে বললো, চারজনে পাঁচ টাকা লাগবে। আমরা এক কথাই রাজি হয়ে গেলাম। অবশ্য তখনকার দিনে পাঁচ টাকার মূল্য নিহাত কম ছিলনা।
চারজন চারটে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নৌকোতে চেপে বসলাম। নৌকো ছেড়ে চলতে শুরু করেছে। জুব্বার মুখে খুব বড়বড় কথা বললে কি হবে, আসলে ছিল প্রচন্ড ভীতু। স্রোত বিহীন বাঁওড়ের গম্ভীর জল, ছোটো নৌকোটিও করছে টলমল। এইভাবে কিছুটা যেতে না যেতেই জুব্বার ভয়ে লাফালাফি আরম্ভ করে দিয়েছে। এই বুঝি জলে ঝাঁপ দিবে। আমরা সবাই ওর ব্যাপারস্যাপার দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। ভাগ্য ভালো, সঙ্গে ইমাম ছিল। ইমাম জুব্বারকে জোর করে ধরে নিয়ে নৌকোর মাঝে বসলো। যাক এবার অনেকটা সস্তি! তবুও জুব্বার মাঝেমাঝে ঝুঁকি মারে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। তখনো জুব্বার ভয়ে কাঁপছে। নিরুপায় হয়ে বেচারা আল্লাহ আল্লাহ করে চিৎকার করতে লাগলো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেল দীপুও। এ-ও ভগবান ভগবান শুরু করে দিল। তবে জুব্বারের মতো দীপু লাফালাফি করেনি। যায় হোক এই সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে এক সময় দীপের কিনারায় নৌকো ভীড়ে গেল। যে যার মতো দীপে নেমে পড়লাম। এই সেই শাঁখদহ দীপ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, চারটে বেজে গেছে।
সামনে একটা প্রকাণ্ড শিশু গাছ। গাছে নতুন সবুজ পাতা, শিকড় গুলো সব মাটি ছাড়া উঁচু-উঁচু হয়ে জেগে আছে। মাটিতে পা রেখে শিকড়ের উপর বেশ আরামের সাথে বসা যায়। গাছের ছায়ায় শিকড়ের উপর বসে বিশ্রাম নিতেই দীপু মনের আনন্দে গান ধরেছে। হঠাৎ করে দীপু গানের সুর ছেড়ে দিয়ে, ব্যা-ব্যা করতে করতে দূরে পালিয়ে যায়। ওখান থেকে গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে সা-সা-সা, প-প-প করে আমাদেরকে কি বোঝাতে চাচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা। গাছের উপর তাকিয়ে দেখি, দীপুর বসে থাকা মাথার উপরে কাছাকাছি একটি সরু ডালে সবুজ রঙের একটি লম্বা সাপ লেজটা পেঁচিয়ে ধরে ঝুলছে। পাতার রঙে রঙ, তাই ভালো বোঝা যাচ্ছেনা।
জুব্বার বললো, ও" ওর মতো থাক, চল আমরা ওদিকে এগিয়ে যায়।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম, আঃ, চারিদিকে তাকাতেই চক্ষু জুড়িয়ে গেলো। বিশাল বড় বড় গাছ গুলো আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে যেন আমাদের শুভাগমন জানাচ্ছে। বাঁওড়ের জলাধারের কিছুটা দূরে, তাঁবু খাটিয়ে ভিতরে বড় চাদর বিছিয়ে বেশ বসবাসের উপযোগী জায়গা করে নিয়েছি। সূর্য মামা ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে। ক্রমে ক্রমে অন্ধকার নেমে আসে।
আমরা চলে গেলাম বাঁওড়ের জলে হাত মুখ ধুতে ও বোতলে জল ভরে আনতে।  ফিরে এসে দীপুকে চটপট চা বানাতে বললাম, দীপু কাঠখড়ি পুড়িয়ে তাড়াতাড়ি চা বানিয়ে হাতে দিতেই, ইমাম মশলা মুড়ি মাখিয়ে হাজির। আমরা চা-মুড়ি খেতে শুরু  করেছি। ঠিক এমন সময় গাছে গাছে পাখিদের হৈ-চৈ শুরু হয়ে গেল। গাছ ছেড়ে যে যার মতো উড়ে কোথায় চলে যাচ্ছে। সকাল হতে আর অল্প কিছু সময় বাকী আছে, আকাশ একটু পরিষ্কার হতেই সূর্য ওঠার আগে গাছগুলো পরিষ্কার হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে দেখতে পেলাম গাছের মাথায় মাথায় ঝিকিমিকি রোদ। অপূর্ব দৃশ্য, দু-একটা এড়ানো পাখি তখনো উড়ে যাচ্ছে গাছ ছেড়ে।
আমরা তাঁবু গুটিয়ে নিয়ে ঠিক হাঘরে বেশে চলে গেলাম বাঁওড়ের ধার, সকালের দৃশ্য দেখতে।
কি মনোরম দৃশ্য। বুনোহাঁসের ঝাঁক জলের উপর দিয়ে সাঁতার কাটছে। কখনো একে অপরকে ডানার ঝপটায় তাড়া করছে। ধারে ধারে চরে বেড়াচ্ছে শামুকখোল আর বড় আকৃতির সারস পাখি। মাথার উপর দিয়ে কত পাখির আনাগোনা। তীক্ষ্ণ থেকে শুরু করে কর্কশ কণ্ঠস্বর বিভিন্ন পাখির বিভিন্ন ডাক। দেখে মনে হচ্ছে আজ হয়ত পাখিদের কোনো বড় ধরণের সমাবেশ আছে।
বাঁওড়ের ধার বরাবর গল্প করতে করতে হাটতে থাকি। চরের উপরে বুনোহাঁসের টাটকা ডিম ও পড়ে আছে। হয়ত ডিম পাড়ার উপযুক্ত সময়ে বাসা  বাঁধতে না পারা বুনো হাঁস ওখানেই ডিম পেড়ে আবার জলে নেমেছে। দীপু ও জুব্বার মনের আনন্দে অনেকগুলো ডিম কুড়িয়ে ব্যাগে পুরে নিয়েছে।
উপরে গহন কাশবন। কাশবনের গা ঘেঁষে কোথাও কোথাও বুনো হাঁস বাসায় বসে ডিমে তা দিচ্ছে। আবার কেউ সাথে করে সদ্যজাত বাচ্চা নিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতির সাজানো এই মনোহর দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে!
তাইতো ভাবি!
সর্বত্রই তুমি মহান প্রভু,
সচরাচর বিদ্যমান।
যতকিছু আছে যেথায়,
তাদের ও দিয়েছ প্রাণ।
শুকনো ছোলার ছাতু আর আঁখের গুড় ভর্তি একটা টিফিন বাক্স, ইমাম তার ব্যাগ থেকে বার করে বাঁওড়ের জলে ভালো করে ভিজিয়ে নিল। বেশ খিদে পেয়েছিল আমাদের। চারজনে বেশ তৃপ্তি করে খেলাম।
তারপর আমরা কাশবন ভেঙে আবার দীপের উপর উঠে আসি।
গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার চলতে শুরু করি।
দীপের ভিতর দিকে যেতেই দেখি, আরও অনেক চেনা ওচেনা বড়বড় গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় পাখিগুলো গাছ ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ ভিজা পালকে উড়ে এসে ডানা ছড়িয়ে গাছে বসে, রোদে শুকিয়ে নিচ্ছে।
এই সব দৃশ্য দেখতে দেখতে আর গল্প করতে করতে আমরা এগিয়ে চলেছি। কথায় কথায় ইমাম বললো, সত্যিই বেড়াবার মতো একটা জায়গা বটে। তবে বিষধর সাপ-টাপ থেকে আমাদেরকে একটু সাবধানে থাকতে হবে। মাঝে মাঝে ধেড়ে ইঁদুর দেখা যাচ্ছে। আরও আছে বনবিড়াল আর শিয়াল। তবে আমরা নিশ্চিত এখানে কোনো হিংস্র বাঘ ভাল্লুক নাই। ইমামের কথা শেষ হতে না হতেই বাঘ ভাল্লুকের কথা শুনে জুব্বার আবার ভয় পেয়ে চিৎকার চেঁচামিচি করতে লাগলো। ইমামকে জড়িয়ে ধরে আর কিছুতেই ছাড়তে চায় না।
যা হয় করে আমরা ওকে অনেক বঝিয়ে সুঝিয়ে স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনি। সূর্য তখন বেশ কিছুটা উপরে উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও ফাঁকা জায়গায় সবুজ কচি ঘাসের উপর রোদ পড়েছে। আমরা গাছের ছায়া ধরে চলতে থাকি। আগাছার অনাদরে ফুলগুলো সুন্দর হয়ে ফুটে আছে। প্রজাপতিরা আঁকাবাঁকা পথ ধরে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। কি মনোহর দৃশ্য! বাঁওড়ের উপর দিয়ে বয়ে আসা শীতেল মৃদু বাতাস আমাদের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায়। আঃ! প্রাণটা একেবারে জুড়িয়ে যায়!
প্রভু হে সদয় মহান,
লালনে পালনে করেছ শোভিত
জনবহুল বা নির্জন স্থান।
এইভাবে যতই এগিয়ে যায় ততই অত্যাশ্চর্য বাড়তেই থাকে। এক সময় আমরা শাঁখদহ দীপের সব চেয়ে উঁচু জায়গাটিতে উপস্থিত হলাম।
গাছে গাছে প্রচুর পাখির বাসা। কেউ বাসায় বসে ডিমে তা দিচ্ছে, আবার কেউ উড়ে এসে বাচ্চাদের খাবার খাইয়ে আবার উড়ে যাচ্ছে। নিচ থেকে বেশ ভালোভাবে শুনা যাচ্ছে কেঁ-কেঁ, চিঁ-চিঁ বাচ্চা পাখির ডাক। গাছতলার ঘাস ও আগাছা-গুলো পাখির বিষ্ঠার উপর বিষ্ঠা পড়ে এমনভাবে ঢাকা পড়েছে চেনার কোনো উপায় নাই। পাখি-পাখি একরকম ভস্কা বিষ্ঠার গন্ধ নাকে প্রবেশ করছে। আমরা ভাল করে নাকে গামছা জড়িয়ে নিলাম। জায়গাটা খুব একটা সুবিধা বলে মনে হয় না। কেমন যেন একটা গা শিহরণী ভয়-ভয় মনে হয়। মাঝেমাঝে শিয়াল ও বনবিড়াল আমাদের সাড়া পেয়ে ছুটে পালাচ্ছে। জুব্বার সব সময় সারিতে মাঝে থাকতে চায়।
অনেক ক্লান্তির পর একটু বিশ্রাম নিতে দাড়িয়েছি।
ইমাম গাছের একটি ডাল ভেঙে লাঠির মতো হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চমকে উঠে পিছিয়ে আসে। জিজ্ঞেস করি, কিরে ইমাম অমন করে চমকে উঠলি কেন? ইমাম মুখে কোনো কথা না বলে, হাতের ইশারা দিয়ে কাছে যেতে বলছে।
আমরা ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই ইমাম আঙুল দেখিয়ে বললো ওই দেখ! তাকাতেই ভয়ঙ্কর কাণ্ড। বিষধর গোখরো সাপ, আর বেজির লড়াই। কেউ হার মানতে চাইনা। উভয়ের রাগ বেড়েই চলেছে। সাপ ফোঁস করে ছোবল মারছে আর বেজি দ্রুত সরে যাচ্ছে। সাপের ছোবল সব বিফলে যাচ্ছে।
সাপ বেজির লড়াই আজ জীবনের প্রথম দেখা। তাই বেশ মজাই লাগছে। জুব্বার তো ভয়ে দীপুর গায়ে একেবারে সেঁটে লেগেছে।
ইমাম বললো মান্নান, একবার হুকুম দে-না, সাপটাকে ধরে--- ইমামের কথা শেষ হতে না হতে আমি একটা জোরসে ধমক দিয়ে বললাম, তুই একটা পাগল। বেশী বেশী ওস্তাদগিরি ভালো নয়। শুনে ইমাম চুপ করে গেল।
কোথা হতে এক ওত পেতে থাকা ঈগল ঝপাং করে সাপটির উপর পড়ে সাপটিকে তুলে নিয়ে চলে গেল। বেজিটা তখন আগাছা ঝড়ের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নির্বাকে থাকার পর জুব্বার বললো আর বেশিদূর যেতে হবে না। আবার আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই বাঁওড়ের ধার। দীপু বললো ফিরতে এমন কিছু বেশি সময় লাগবেনা। আমরা চারিদিক দেখতে দেখতে এসেছি তাই সময় অনেক বেশি লেগেছে। আর কিছুটা এগোলেই গঙ্গাটাও একবার দেখে আসতে পারবো।  
আমি বললাম ফিরে যাওয়াটায় ভালো, আবার পরে কোনো সময় আর একবার এসে সবটা ভালো করে দেখবো। ইমাম আমার কথায় সাঁই দিয়ে বললো, সেই ভালো।
ওখান থেকে আমরা ঘুরে হাঁটতে শুরু করি। একটানা হেঁটে আসায় তাড়াতাড়ি পৌছে গেলাম একেবারে বাঁওড়ের ধার। বাঁওড়ের জলে চারজনে ভালোমতো স্নান করে, চারটে বড় বোতলে খাওয়ার জলও ভরে নিয়েছি।
ক্লান্ত শরীর শীতেল জলে স্নান করে উঠতেই শরীর ও মন আবার নতুন সতেজ হয়ে উঠলো।  এবার আমরা দীপের আরও একটু ভিতর দিকে কিছুটা ফাঁকা জায়গা বুঝে সবুজ ঘাসের উপর তাঁবু খাটিয়ে ফেলেছি, যাতে আগের দিনের মতো তাঁবুর উপরে পাখির বিষ্ঠা না পড়ে। তাড়াতাড়ি করে রান্নার কাজটাও সেরে ফেললাম।
দীপু আর জুব্বার চারটে আসন নিয়ে তাঁবুর বাইরে পেতে দিয়ে বললো, আর থাকা যায়না।
কখন ছোলার ছাতু খেয়ে বেরিয়েছি, বেলা দুটো গড়িয়ে গেল।
চারজনে একসঙ্গে খেতে বসে গেলাম। কুড়িয়ে পাওয়া বুনোহাঁসের ডিম দিয়ে আলুর ঝল, ওঃ, দারুণ লাগলো! বাড়িতে রকমারি খাবার হলেও এখানকার খাবারের স্বাদই আলাদা।
খাওয়ার পরে তাঁবুর মধ্যে সবাই একটু সময় গা গড়া দিয়ে আবার উঠে বসি। সাড়ে তিনটে বেজে গেল, চরতে যাওয়া পাখিদের ফিরে আসার অপেক্ষায় আমরা সবাই ব্যাকুলিত হয়ে বসে পড়ি। কারণ আগের দিন ঠিক সময়মত পৌছাতে পারিনি।
সময় বয়ে যায়। অল্প কিছুক্ষণ পরেই চরতে যাওয়া পাখিগুলো যে যার মতো ফিরে আসতে শুরু করেছে নিজের এলাকায়। ছোটো থেকে বড়, রংবেরঙের বিভিন্ন প্রকার পাখিদের ভীড় জমে গেল গাছের মাথায় মাথায়। কে কার উপরে বসছে তার ঠিকঠিকানা নাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার সাইজ হয়ে ঠিক জায়গা মত বসে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির বড়বড় পাখিদের বিভিন্ন রকম ডাক। দেখে মনে হচ্ছে পাখিদের মেলা বসেছে। বিরামহীন একটানা কলরব। পাখিদের সাথে মজা উপভোগ করতে করতে অনেক রাত্রি হয়ে গেল। সময় বুঝে দীপু ও জুব্বার রান্নার কাজটা সেরে ফেলেছে। আমি সবাইকে বললাম চল অনেক হয়ে গেছে, খেয়েদেয়ে এবার শুয়ে পড়ি।
সারাদিনের ঘুরাঘুরিতে সবাই ক্লান্ত, তাই কেউ আর দ্বিধাবোধ করল না। সবাই খেয়েদেয়ে তাঁবুর ভিতরে শুয়ে পড়লাম।
পরেরদিন ঘুম ভাঙতেই দেখি সূর্য বেশ উপরে উঠে এসেছে। তাড়াতাড়ি চা-মুড়ি খেয়ে এবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। হাটতে হাঁটতে আমরা পৌছে গেলাম বাঁওড়ের ধার। আসার সময় যেখানে নেমেছিলাম ঠিক সেখানেই পৌছে গেছি। এক জেলে নোকো নিয়ে ফাঁস জাল পাততে পাততে এদিকেই এগিয়ে আসছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম এই যে জেলে ভাই, আমাদেরকে পার করে দিবে? জেলে বললো হাঁ ভাই, আর একটা জাল আছে এটা পাতা হলেই তোমাদের পার করে দিব। ডাঙার কাছাকাছি আসতেই জেলে হঠাৎ চিৎকার কার করে উঠলো। আমরা দেখতে পাচ্ছি জলের তলায় কেউ যেন জেলেকে ধরে টানাটানি করেছে, জেলেও প্রাণপণ ডাঙায় উঠতে চেষ্টা করছে, শক্তিতে পেরে উঠছে না। ধীরেধীরে কে যেন জলের মাঝে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় ইমাম আর চুপ থাকতে পারলনা। ব্যাগ হতে একটা ধারালো ছুরি বার করে ইমাম জলে ঝাঁপ দিলো। আমরা অনেক চেষ্টা করেও ইমামকে আটকাতে পারলাম না। জলের তলা হতে কে যেন দুজনের সঙ্গে চরম ধ্বস্তাধস্তি করছে। কিছুক্ষণ পর ইমাম জলে ডুবে গেল। আমরা ডাঙাতে চিৎকার চেঁচামেচি করি। নির্জন এই দীপে আমাদের চিকারের আওয়াজ কারও কানে পৌছাল না। আমাদের চোখের সামনে কিসে যেন ইমামকে তলিয়ে নিয়ে চলে গেল। ইমাম আর হয়তো বেঁচে নাই। ভাবতে ভাবতে ইমাম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জলের উপর ভেসে উঠে সাঁতার কাটতে থাকে। ক্লান্ত হয়ে দুজনেই কাছে আসলে আমরা হাত ধরে ডাঙায় তুলে নিলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর সবাই নৌকোতে উঠে বসলাম। জেলে ঝোঁক সামলিয়ে নৌকো ছেড়ে দিল। জুব্বার ভয় পেয়ে নৌকোর মাঝখানে চুপচাপ বসে রইলো। নৌকো চলতে চলতে যখন ইমামকে জিজ্ঞেস করি, ইমাম বললো রবারের দড়ির মতো কি যেন জেলের একটা পা পেঁচিয়ে ধরে টানাটানি করছিল। আমার ধারালো ছুরি দিয়ে ওটাকে কেটে দিতেই জেলেকে ছেড়ে দিয়েছে। জেলে বললো এইতো মাত্র তিনদিন আগে, একজনকে জলের তলে কিসে টেনে নিয়ে গেছে। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
প্রতি বছরই এমন দু-চারটে ঘটতেই থাকে। ভাগ্যক্রমে তোমরা এসেছিলে তাই আমি বেঁচে গেছি। কথা বলতে বলতে নৌকো দাদপুর ঘাটে ভিড়ে গেল। নৌকো থেকে নেমে জেলেকে ভাড়া দিতে চাইলে কিছুতেই নিল না।
এম্বাসেডরের ড্রাইভার কথামতো আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। এম্বাসেডরে চেপে আমরা বাড়িতে পৌছে গেলাম।
পরের দিন সকালবেলায় মানুষের মুখেমুখে শুনতে পাই, বাঁওড়ের ঘাটে, এক কুইন্টাল ওজনের একটি মরা শামুক ভেসে উঠেছে। শামুকটির দুটো শুঁড়ের একটি শুঁড় কাটা।
সমাপ্ত
বিষয়শ্রেণী: প্রবন্ধ
ব্লগটি ৬৩৫ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৪/০৩/২০১৬

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • জয় ৩০/০৫/২০১৬
    সত্যি সুন্দর
  • এই সুন্দর পরিবেশটি আজও জীবিত। তবে আজকের দিনে কিছুকিছু বসতি গড়ে উঠেছে। বসতিবাসিরা সবাই আদিম। সভ্য সমাজের সংস্পর্শে এসে এরা দিনের পর দিন এগিয়ে চলেছে সভ্য সমাজের পথ ধরে।
  • নির্ঝর ২০/০৩/২০১৬
    অনেক সুন্দর
 
Quantcast