(পরবর্তী অংশ)
গগন হরকরার পর তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে গোঁসাই গোপাল,গোঁসাই রামলাল ও সর্বক্ষেপী বৈষ্ণবীর।সর্বক্ষেপী রবীন্দ্রনাথকে সহজিয়া সাধন,বৈষ্ণবী সাধন,কীর্তন,ভাঙা কীর্তন,ঢপকীর্তন এইসব শোনাতেন।ছিন্নপত্র-র চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-"কালকে পুণ্যাহ ছিল।সারা রাত ধরে আমি শিবু সা-র কীর্তন শুনলাম"।কিন্তু যাঁর গান তাঁকে এই মানবপথের পথিক করে তুলেছিল সেই লালনের সঙ্গে তাঁর কোনোদিন সম্মুখ সাক্ষাৎ ঘটেনি।যদিও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালনের সাক্ষাৎকার নিয়ে বেশ আবেগময় একটি গল্প প্রচলিত আছে যা সত্যি হলে হয়তো আমরা মানসিক তৃপ্তি পেতাম।কিন্তু সত্য বড় নিষ্ঠুর,সে বলে লালনের মৃত্যু হয় 1890 সালে আর রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার ভার পেয়েছিলেন 1891 সালে অতএব রবীন্দ্রনাথ ও লালনের দেখা হওয়া অসম্ভব।কিন্তু গল্পটি একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয় কারণ এই গল্পটি 'পল্লীর মানুষ রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থে যিনি লিখেছিলেন সেই শচীন্দ্রনাথ অধিকারী ছিলেন শিলাইদহ জমিদারি কাছারির সদর খাজাঞ্জির সহকারী,তাহলে? আসলে শচীন্দ্রনাথ এই গল্পটি লিখেছিলেন বরকন্দাজ হায়দর মিঞার কাছ থেকে শুনে,সেও কিন্তু একবারও কারো নাম বলেনি সে বলেছিল 'বাবুমশাই'।এই 'বাবুমশাই' যদি রবীন্দ্রনাথ না হন তবে তিনি কে? তিনি রবীন্দ্রনাথের পূর্বে শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনার কাজে রত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথকে এই অনন্য পথে হাঁটতে বহু পরিশ্রম করতে হয়েছে কারণ লোকায়ত দর্শনের আপ্ত-সাবধান হল 'আপন সাধন কথা,না কহিও যথা তথা,আপনারে আপনি তুমি হইও সাবধান', অতএব এই পথের পাথেয় রবীন্দ্রনাথকে স্বয়ং সংগ্রহ করতে হয়েছে।তবে এই পাথেয় সংগ্রহে তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন তাঁর ভাগনি সরলাদেবী চৌধুরাণী।চূঁচূড়াতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বজরায় গিয়ে থাকার সময় সরলাদেবীকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন,সেখানেই সরলাদেবী মাঝিমাল্লাদের কাছে গান শুনতেন ও সেইসব গানগুলির স্বরলিপি করে রাখতেন যা তিনি পরবর্তীকালে তাঁর রবিমামাকে উপহার দিয়েছিলেন।1905 সালে বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ যে সব স্বদেশী গান লিখেছিলেন তার সুরগুলি মূলতঃ এইসব লোকগানের সুর থেকেই অনুপ্রাণিত।(ক্রমশ)
মন্তব্য (2)