পাড়াগাঁর দু'প্রহরে নগ্ন নির্জন হাত (উপন্যাস)
মোঃ সরব বাবু




           পৌষ মাসের মাঝামাঝি কোনএক সময়। বাদশা মিয়ার দ্বিতীয় ছেলে ফুল মিয়ার জন্য পাত্রী দেখতে এসেছে ডেকের চর গ্রামে। পাত্রীপিতা আনিস মিয়ার উঠোনে বসে কথা বলছে ফুল মিয়ার বড় ভাই লাল মিয়া, চাচতো চাচাতো ভাই মিরজাহান, লাল মিয়ার শমুন্দি হারুন মিয়া আর প্রতিবেশী চাচা হানিফা মিয়া। লাল মিয়া-ফুল মিয়াদের বাবা বেঁচে নেই, শুধু মা বেঁচে আছে। তারও এক পা' কবরে গিয়ে রয়েছে। যেটি উপরে রয়েছে সেটিও যেকোনো মুহূর্তে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। বাবা নেই। তাই বাবার কথা লাল মিয়াকেই বলতে হয়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি মিরজাহান। তার চার ছেলে এক মেয়ে। মিরজাহান গলা খাঁকারি দিয়ে বলে - তাইলে তালই সাব, সব কথাবার্তা পাক্কা করুন যাক। কি কও লাল মিয়া?
লাল মিয়া বলে- জ্বী ভাইসাব, শুভ কাম যত তাড়াতাড়ি করুন যায় ততই ভালা। কি কও হানিফা ভাই?
কেউ আর সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। শুধু ঠেলাঠেলি। 
          হারুন মিয়া ফুল মিয়ার কানেকানে ফিসফিসিয়ে বলে- কিও ফুল মিয়া বেয়াই, তুমি চুপ কইরা আছ ক্যান?  মাইয়া কি তোমার পছন অয়নাই?
         ফুল মিয়া একটু নড়েচড়ে বসে বলে - হু, পছন অইবো না ক্যান, খুব পছন অইছে। 
সে মিরজাহানের দিকে ইঙ্গিত করে বলে - ইয়ে...ভাইসাব, আপনেরা যা ভালা মনে করেন তাই করেন। আমারে আর কিচ্ছু জিগান লাগবনা। আপনেরার মর্জিই আমার মর্জি। 
       হানিফা - মাইয়ার বাপ, তাইলে আর দেরি কিসের!  খুশির কাম দেরিতে করলে খুশি কইমা যায়। 
     মিরজাহান- ঠিক কইছ তুমি হানিফা। শুভ কাম দেরিতে করলে লক্ষ্মী চৌকাঠ ছাইড়া পলাইবার চায়। 
          মাঝখান থেকে হারুন মিয়া বলে উঠে- না ভাইসাব তা অইব না। আমরার দুলাভাইদের চৌকাঠ একহাত উঁচা। পরশুদিন উষ্টা খাইয়া আমার বুড়া আঙ্গুলের নোখডা ফাডায়া লাইছি। 
       তার এ কথায় মজলিশে একটা হাসির ধুম পড়ে যায়। তারমাঝে আবার লাল মিয়া বলে উঠে - হু..... দেখতে অইবনা ঘরডা কার?  এযে লাল মিয়া তালুকদারের ঘর! 
      এই কথায় মজলিশে হাসির বাতাস দ্বিগুণ হয়ে যায়। হাসির চোটে সবাই ঢেউ খেতে শুরু করে। কেউ হাসে হু হু - কেউ হাসে হি হি। 
       ক্ষণকাল পরে সবাই নিজেকে সামলে নিয়ে একদম মহা সম্মানিত অতিথির মত করে বসে। কন্যাপক্ষের কাছে বরপক্ষের মত সম্মানিত অতিথি আর হয়না। কারণ এই সম্মানের উপরেই অনেকাংশে নির্ভরকরে তাদের মেয়ের সুখশান্তি। বরপক্ষের লোকের সম্মানে সামান্য একটু ঘাটতি হলে মেয়েকে সহ্য করতে হয় অনেক জ্বালা-যন্ত্রণা আর অপমান। তাই আর যাই হোক বা নাহোক, সবাই আপাতত জামাই বাড়ির মেহমানকে আপ্রাণ আপ্যায়ণ করতে ভুলেনা। 
         মজলিশ যখন নিরব হয়ে যায় তখন মিরজাহান বলে- সেলামির বিষয়ডা নিয়া একটু কথা কওন যায়না?
      পরক্ষণে কন্যাপক্ষের ফালু মিয়া বলে উঠে- সেলামি কিন্তুক আমরা পাঁচাজারের দিতে পারুম না।  
         হারুন মিয়া বলে- না বেয়াই সাব, এইডা এক্কেবারে কম অইয়া যায়। আরেকটু বেশি দিওন লাগব। 
       মিরজাহান ফুল মিয়ার দিকে তাকায়। ফুল মিয়া মজলিশের এক কোণে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। যেন মস্ত কোনো অপরাধ করে ফেলেছে সে - এই ভাব। 
      মিরজাহান বলে - তুমি কি কও লাল মিয়া? 
    - আমি কিচ্ছু কইতে পারুম না ভাইসাব। এইসব বিষয়ে আমার মাথা কম। আপনেই কন। 
      মিরজাহান হালকা কাশি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলে - তাইলে তালই সাব আমার একখান ছাপকালা কথা হুনেন। ভেজাভেজির মাইঝে যাইতে আমি রাজি না। সেলামি দিতে অইব গিয়া আপনের আটাজার ট্যাকা। আর মেমান লওন লাগব তিরিশ জন।
       ফালু - এইডা আবার কেমুন কথা?  একটা মিলের ভিত্তে থাইক্কা কথা কইবেন ত আপনেরা। আটাজার ট্যাকা সেলামি আর তিরিশজন মেমান, এইডা কোনো কথা অইল? বেয়াই সাব আপনেই কন। 
      লাল মিয়ার দিকে ফিরে সে বলে - আনিস কাকা কি এত্তবড় বোঝা লইতে পারব?  আপনে ত কাকার সম্বন্ধে অনেককিছুই জানেন। একটা মাইয়া না। চার চারটা মাইয়া। একটারে বিয়া দিতে গিয়া যদি সবকিছু খোয়ান লাগে, তাইলে বাকি তিনডারে কি করব? 
      পানের শেষ পিকটা ফেলে নিয়ে হানিফা বলে - হুন ফালু মিয়া, এইহানে আমরা পোলা বিয়া করাইতে আইছি। কাউরে দয়া করতে আসিনাই। আপনেরার অসুবিধার লাগি ত আর আমরা সেলামী কমাইতে পারিনা। আপনেরার অসুবিধার লাগি আপনেরা দায়ী। বাকি তিনডারে বিয়া দেন বা ঘরে পাল্লা লাগান তা আমাগো দেহার বিষয় না। 
       বেশ তিরিক্ষিভাবেই সে কথাগুলো বলে। 
       আনিস মিয়া যেন চারদিক অন্ধকার দেখতে শুরু করে। কি বলবে এখন ভেবে পাচ্ছেনা। আনিস মিয়ার স্ত্রী দরজার ওপাশে পর্দার আড়ালে থেকে শাড়ির আঁচল কামড়াচ্ছে। ওর ইচ্ছেহচ্ছে যেন ও নিজেই এসে মজলিশে কথা বলুক। কিন্তু সামাজিকতার শিকল তার পায়ে আটকানো থাকার কারণে শুধু সে আসতে পারছেনা। ফুল মিয়া ও যেন কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু পারছেনা। গুরুজনদের মুখের উপরে কি করে কথা বলবে সে?  লাল মিয়া তারদিকে তাকিয়ে বলে- কিরে, তুই কি কস্? 
- আমি আর কি কমু। আপনেই কইয়া দেন।
হারুন - হ ভাইসাব, আপনেই কইয়া দেন।
- হু। তালই সাব যহন আর পারতেনই না তাইলে আর শুধুশুধু উনার উপ্রে জুলুম কইরা লাভ নাই। তালই সাব, আপনের কথাই মানলাম। তহন আপনের বাইলে গেলাম। এইবার কিন্তুক আমাগো বাইলে যাইতে অইব। শীত কিন্তুক চইলা যাইতাছে। তাই আর দেরি করুমনা। আগামী জুমার পরের জুমা বারেই ইনশাআল্লাহ শুভ কামডা শেষ কইরা ফালাইতে চাই। কি কও লাল মিয়া? কি কও হারুন মিয়া?
হারুন - ঠিক কইছেন ভাইসাব, এক্কেবারে ঠিক কইছেন। যেমনে তেমনে মিলছে, হুটকি আর বাগুনে মিলছে।
মজলিশে আমার কিছুক্ষণের জন্য হাসির ঢেউ বয়ে যায়। কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন তাদেরকে সোজা থাকতে দিচ্ছেনা।
হাসি সামলে আনিস মিয়া বলে - হু, কি করুন যাইব। আপনেরার মর্জিই আমার মর্জি।
মিরজাহান - তাইলে এই কথাই থাইকল তালই সাব।