মিঃবেন, বয়েস উনআশি। ব্যেসের ভাড়ে নুয়ে পড়েছে। তার স্ত্রী অনেক আগেই গত হয়েছে। বেন থাকেন স্থানীয় একটি নাসিং হোমে।এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেমেয়ে দুজনেই বিয়ে করার পর থেকেই আলাদা অন্য ষ্টেটে থাকে। বেনের সাথে আমার প্রথম দেখা আমার ষ্টোরে। সাথে ছিল একজন নার্স। আমাকে দেখে হেসে জিজ্ঞাসা করল আমার দেশ কোথায়? বললাম বাংলাদেশ। খুব খুশি হয়ে বলল। সে আমাদের দেশে গিয়েছে সরকারী সফরে।অতিথী পরায়ন দেশ। তার কথা শুনে খুব ভাল লাগল। আমার কাজ শেষ করে ঘরে ফিরছিলাম। সেও আমার সাথে ষ্টোর থেকে বের হল। সে জানালো সে এখন লেখা-লেখি করে সময় পার করছে। আমার হাতে তার একটি বই ধরিয়ে দিয়ে বলল, এতে আমার জীবন কাহিনী লেখা। হাতে নিলাম বইটি।

বইটি দেখে তার সম্পর্কে জানতে চাইলাম। সে জানালো, তার স্ত্রী মারা গেছে অনেক আগে। ছেলেমেয়ে বিয়ে-স্বাদী করে আলাদা থাকে। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার কারণে, তার ছেলে এসে বাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছে এব্ং তাকে একটি নাসিং হোমে রেখে গেছে।
-আপনার ছেলেমেয়ে দেখতে আসে?
-আগে প্রায়ই দেখতে আসত। তারপর কমতে কমতে একমাস, ক্রিসমাস বা ইষ্টার। এখন আর আসে না।আগে ফোন করত এখন আর ফোন করে। লক্ষ্য করলাম বেনের চোখে পানি। এখন তার সময় কাটে ছেলেমেয়েদের ছোট্বেলার এলবাম দেখে। কাউকে কাছে পেলেই ডাক দিয়ে দেখাই এটা অতো সালের ছবি, এটা আমার ছেলে বয়েস ছয়। জানো কেউ কাছে আসতে চায় না। কথা শোনতে চায় না। এখন আমার একমাত্র সঙ্গী এলবাম। বেনকে জিজ্ঞাস করলাম আপনিও কি আপনার বাবা মায়ের সাথে ছিলেন? সে জানায় সেও বিয়ে করার পর আলাদা হয়ে সংসার করে। আর তার বাবা মাও ছিলেন নাসিং হোমে। আমি বললাম তাহলে আর কি আপনি বাবা মার সাথে যেমন করেছেন, আপনার ছেলেমেয়েও তাই করল। বেন চুপ।

ইদানীং আমেরিকান বুড়ো-বুড়িরা চালাক হয়ে গেছে। তাদের ছেলেমেয়েরা আলাদা হয়ে যাবার পর যখন কোন খোঁজ খবর নেয় না, তখন তারা ব্যাংক এর সাথে চুক্তি করে, ব্যাংক এর কাছে বাড়ী বিক্রি করে দেয়।শর্ত  থাকে তারা যখন মারা যাবে কেবল ব্যাংক তখন বাড়ী দখল নিতে পারবে তার আগে নয়। এজন্য ব্যাংক থেকে প্রতিমাসে সে তিন থেকে চার হাজার ডলার পাবে।

মনে মনে ভাবি এই তুলনায় আমাদের দেশের বাবা মায়েরা অন্তত খুব ভালো আছে। বেনকে মনে মনে বলি,'মিঃ বেন, তোমার দেশ ধন-সম্পদে, অর্থনীতিতে, শিল্প-কারখানায়, শিক্ষা-দীক্ষায়,প্রযুক্তিতে আমাদের থেকে একশ বছর এগিয়ে। কিন্তু মানবতায়!!! হুম, আমাদের চেয়ে তোমরা দুইশ বছর পিছিয়ে!!!

০৯/৩০/২০১৩