শৈশবের বন্ধুর মত বন্ধু আর মেলে না কোনো কালে, কোনো জন্মে। শৈশবের স্মৃতির মত হয় না আর কোনো স্মৃতি। শৈশবের মত মন খুলে ঘুরে বেড়ানো হয় না আর কোনো দেশে। শৈশব কল্পনায় আঁকা সুখের ছবির চেয়েও বহু গুনে দামি। তাই যেন সবাই বার বার শৈশব ফিরে পেতে চায়। কিন্তু তা আর কোনো দিনও সম্ভব হয়ে উঠে না। শৈশব স্মৃতি গুলো পড়ে রয় মনের গভীর থেকে গভীরে। যা কখনও ভুলবার নয় বা মানুষ সেই স্মৃতি গুলো ভুলতেও চায় না। সবাই কে সেই শৈশব পুনরায় স্মরণ করে দেয়ার জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা "বরই তলায়" উপন্যাস। যদি কারো কিঞ্চিৎ পরিমান ভাল লেগে থাকে তাহলে আমার এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে বলে মনে করি।
- শাহিন আলম সরকার
"বরই তলায়"
প্রথম পরিচ্ছেদ
তুহিনদের গ্রাম থেকে হাট অনেক দূরে। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে, বনের ধার দিয়ে সেই হাটে যেতে হয়। সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। রবিবার এবং বৃহস্পতিবার। হাট বসে নদীর কিনারে বিশাল এক বট গাছের নিচে। অনেক লোকের সমাগমে এই হাট মুখরিত হয়ে উঠে।
তুহিন অনেক ছোট। লোক মুখে শুনতে পায় হাটে নাকি সব কিছুই পাওয়া যায়। বাতাসা, জেলাপি আরও পাওয়া যায় নানা ধরনের খেলনা। ইয়াছিন তার বড় ভাইয়ের সাথে হাট থেকে কাঠের ঘোড়া কিনে এনেছে। সে মনে মনে ভাবে সামনে হাটে সে বাবার সাথে হাটে গিয়ে ইয়াছিনের থেকে ভাল ঘোড়া কিনে আনবে।
আজ কি বার সে জানতে দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, মা আজ কি বার? মা বলল, আজ হাট বার। দেখলে না তোমার আব্বু হাটে গেল। তুহিন মন খারাব করে বলল, বাবা কখন হাটে গেল? আমি তো দেখলাম না। মা বলল, দেখতে হবে না খোকা । তোমার জন্য জেলাপি আনতে বলেছি। যাও এখন খেলাও গিয়ে। সন্ধ্যার আগেই ফিরে এসো। বুঝলে? তুহিন ঘাড় নেড়ে বুঝালো ঠিক আছে, সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসবো।
আজ বৃহস্পতিবার। সে হাতের আঙুল গুনে গুনে হিসাব করল, রবিবার আসতে কয় দিন বাকি? জুঁই তার বাবার সাথে হাটে গিয়ে অনেক কিছু দেখে এসেছে। তার কাছে হাটের বিবরণ শুনে তুহিন অনেক আনন্দিত হল। আগামী রবিবার সে বাবার সাথে হাটে যাবে তাকে বলল।
তুহিনদের বাড়ি থেকে স্কুল পাঁচ মিনিটের পথ। রবিবারে সে স্কুলে পড়তে গেল। শিক্ষক মহাশয় পড়ানো শেষ করে বললেন, আগামী কাল তোমাদের পরীক্ষা নেওয়া হবে। সবাই ভাল করে পড়ে আসবে। পরীক্ষায় ফেল করলে তাকে উপর ক্লাসে উঠানো হবে না। সবাই বলল, জ্বি স্যার ভাল করে পড়ে আসবো।
তুহিন পাঠশালা থেকে বাড়ি ফিরতে লাগল। সে পড়াশোনার কথা বাদ দিয়ে, মনে মনে ভাবতে লাগল, আজ বিকালে বাবা হাটে যাবে। বাবার সাথে আজকে হাটে যেতে হবে । অনেক কিছু কিনে আনবো। বড় বড় মিষ্টি কুমড়া দেখবো, বড় বড় মাছ দেখবো। আহা! আরও কত কি?
তুহিন দুপুরে বাবা মার সাথে খেতে বসল। সে বাবা কে বলল, বাবা আজ আমাকে হাটে নিয়ে যেতে হবে। বাবা বলল, অন্য দিন নিয়ে যাবো। কাল তো তোমাদের বিদ্যালয়ে পরীক্ষা। ভাল করে পড়াশোনা করো। ভাল ফল করলে তুমি যা চাইবে তাই কিনে দিবো। তুহিন বলল, ঠিক আছে বাবা। পরীক্ষা শেষ হলে কিন্তু আমায় হাটে নিয়ে যেতে হবে। বাবা বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। তুহিন অনেক খুশি হল। রাতে শুয়ে শুয়ে সে হাটের স্বপ্ন দেখতে লাগল। সে ইয়াছিনের মত পুতুল কিনবে। আঁখির মত কাগজের ফুল কিনবে। আরও অনেক কিছু কেনার স্বপ্ন দেখতে লাগল।
আজ রবিবার। কান্দাপাড়া হাট। তুহিন অনেক দিন চেস্টার পর আজ বাবার সাথে হাটে যাচ্ছে। মনে তার অনেক সুখ। সে বার বার বলতে লাগল- বাবা হাটে কি কি আছে? বাবা বললেন, আগে হাটে চলো। তুমি সব নিজের চোখেই দেখতে পাবে। তুহিন মনে মনে ভাবল - কত কিছু আছে সেখানে, সব আজ দেখা হবে।
আম গাছ তলা ছেড়ে তারা বনের ধার দিয়ে যেতে লাগল। বাবা বললেন, এই বনের ভেতরে বাঘ থাকে, ভাল্লুক থাকে, আরও নানা ধরনের জীব জন্তু থাকে। শুনে তুহিন অনেক ভয় পেল। বাবা বলল, আমাদের কিছু করবে না। তখন তুহিন বলল, বাবা আমি আজ হাটে যাবো না, বাঘ দেখবো। চলো বনের ভেতরে চলো। বাবা বললেন, বাঘ হল ভয়ানক প্রাণী। তারা মানুষ খায়। এভাবে বনে গেলে আমাদের খেয়ে ফেলবে। তুহিন বলল, বাবা -তাহলে আমাদের বাঘ দেখা হবে না। বাবা বললেন হবে না কেনো? চলো আমরা আগে হাটে যাই। সেখানে অনেক বাঘ আছে, শিয়াল আছে সব তোমায় দেখাবো। তুহিন অনেক খুশি হয়ে বাবার সাথে সাথে চলল।
পথে মিন্টু মিস্ত্রীর সাথে দেখা হল। তুহিনের বাবা রমিজ তার সাথে কথা বলতে লাগল। মিন্টু বলল, কেমন আছো রমিজ ভাই। রমিজ বলল, অনেক ভাল আছি। তুমি কেমন আছো। মিন্টু বলল, আলহামদুলিল্লাহ ভাল আছি। সাথে পিচ্চিটা কে? রমিজ বলল , আমার ছেলে। ভারি দুষ্টু। মিন্টু বলল, খোকা তোমার নাম কি? তুহিন এদিক সেদিক তাকাল। মিন্টু আবার বলল, কি হল পিচ্চি তোমার নাম কি? তুহিন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রমিজ বলল, ওর নাম তুহিন। বাড়িতে ওর সাথে কথা বলে কেউ পেরে ওঠে না। কিন্তু কোথাও নিয়ে গেলে কারও সাথে কথা বলতে চায় না। মিন্টু বলল, তাহলে তো খুব শমরিতা। আমি এবার আসি ভাই। রমিজ বলল, আচ্ছা ঠিক আছে।
তারপর তারা আবার পথ চলল। হাটের ব্যাগটি তুহিনের হাতে। মাঝে মাঝে সে ব্যাগটি ডান হাত থেকে বাম হাতে আবার বাম হাত থেকে ডান হাতে নিতে লাগল। তারপর বলল, বাবা বাঘ কত বড়? একটি লোক হাট থেকে ফিরছিল। তার সাথে কথা বলায় রমিজ ছেলের কথার উত্তর দিতে পারল না। তার সাথে কথা বলে যেতেই লাগল। তুহিন বাবার হাত ধরে টেনে টেনে বলল, চলো বাবা হাটে চলো। রমিজ কিছু বলল না , তার সাথে কথা বলে যেতেই লাগল। আবার বলল, বাবা কখন হাটে যাবে। চলো তাড়াতাড়ি। রমিজ কথা শেষ করে বলল, চলো।
হাট থেকে দলে দলে লোক বাড়ি ফিরতে লাগল। আবার দলে দলে লোক হাটের ভেতরে যেতে লাগল। তুহিন বলল, বাবা ওখানে এত লোক কেনো? রমিজ বলল, ওটাই তো হাট। তুহিন অনেক খুশি হল। হাটে এত লোক থাকে। বাবা কে বলল, বাবা আমি এখন থেকে তোমার সাথে প্রতি হাটেই আসবো। রমিজ বলল, চুপ করে থাকো। বেশি কথা বললে কিন্তু আর কখনও নিয়ে আসবো না। তুহিন চুপ করে রইল।
তুহিন চুপচাপ হাটের সব জিনিসপত্র দেখতে লাগল। নানা ধরনের সবজি সারি সারি করে দোকানদার বসে আছে। এত সবজি এক সাথে সে এই প্রথম দেখল। সে বলল, বাবা পুতুলের দোকান কোথায়? রমিজ হাত দিয়ে ইশারা করে দেখাল, ওই পাশে। তুহিন বলল, চলো বাবা ও খানে যাই। রমিজ বলল, চলো।
সেখানে নানা ধরনের পুতুল দেখল। নানান রঙে নানান ঢঙে পুতুলের রুপ। দুইটি পুতুল কিনে নিল। তারপর আরও অন্যান্য পুতুল চেয়ে দেখে রমিজকে কে বলল, বাবা ওই পুতুল নিবো। রমিজ বলল ও দুইটা কি হল? তুহিন বলল, বাবা ওটা নিবো না। ওইটা দাও। রমিজ বিরুক্ত হয়ে বলল, নাও। তুহিন নিল। রমিজ বলল, চলো। যেতে যেতে তুহিন বার বার পুতুলের দোকানের দিকে ফিরে ফিরে তাকাতে লাগল। আরও কয়েকটা নিতে পারলে হয়তো ভাল হত।
রমিজ জেলাপির দোকানে নিয়ে গেল। সেখানে সবাই গরম গরম জেলাপি খাচ্ছে। তুহিন অনেক জেলাপি খেয়েছে কিন্তু এত গরম কখনো খায় নি। তাই সে বলল, বাবা খেতে পারছি না। খুব গরম। রমিজ বলল, ধীরে ধীরে খাও। তুহিন পেট ভরে জেলাপি খেল। রমিজ বলল, চলো বাড়িতে যাই। আবার অন্যদিন নিয়ে আসবো। তুহিন বলল, সত্যি বাবা আবার নিয়ে আসবে? রমিজ বলল সত্যি সত্যি সত্যি তিন সত্যি। তুহিন অনেক খুশি হল।
তুহিন তার বাবার সাথে হাট থেকে বাড়ি ফিরে এলো। মা দৌড়ে গিয়ে তুহিন কে কোলে তুলে নিল। তার তুলতুলে গাল চুমায় চুমায় ভরে দিল। বলল, খোকা তুমি হাটে কি কি দেখলে? শুধু হাট হাট করো। হাট কেমন দেখলে? তুহিন বলল, মা এই তিনটি পুতুল কিনেছি। হাটে বাবা গরম গরম জেলাপি খাইয়েছে। আরও কত কিছু দেখলাম। তুমি জানো মা, মানুষ আর মানুষ। মানুষের ভিড়ে হাটতে পারি না। বাবা কোলে নিয়ে সারা হাট ঘুরে ঘুরে দেখালো। মা বলল, অনেক শুনেছি বাবা এবার থামো। সন্ধ্যা হয়ে এলো, চলো হাত মুখ দুবে। তুহিন বলল, মা পরে হাত মুখ দুবো। এই বলে পুতুল নিয়ে দৌড়ে ইয়াছিনদের বাড়ির দিকে রওনা দিল।
ইয়াছিন মায়ের সাথে বিকেলে তার খালার বাড়িতে বেড়াতে গেছে। অনেক দিন হল তার খালা ফোন দিয়ে যেতে বলে। সময় হয় না বলে তার মা যেতে পারে না। ইয়াছিন খুব আনন্দে নেচে নেচে তার খালার বাড়িতে গেল। সেখানে তার খালাতো ভাই বোনদের সাথে খেলে খেলে তার সময় কাটবে বলে সে খুব খুশি। মায়ের আগে আগে সে কাপড়-চুপোড়ের ব্যাগ নিয়ে রওনা হল। তার মা ছোট বোনটিকে কোলে নিয়ে তার পিছন পিছন হেঁটে যেতে গেল। রাস্তা ভাল না বিধায় এই রাস্তায় গাড়ি আসে না। গাড়ি উঠতে হবে প্রায় এক মাইল পথ হেটে যাওয়ার পর। কিছু দূর যাওয়ার পর ইয়াছিন বলল, মা আমি আর ব্যাগ নিতে পারবো না। অনেক ভার। হাবি জাবি তুলে ব্যাগ ভরতি করছো, এখন তুমি নিয়ে যাও। তার মা বলল, বাবা, আমি ব্যাগ নিলে তোমার বোনটাকে কে নিবে? ইয়াছিন বলল, দাও ওকে আমি নিয়ে যাই। কিছু দূর নিয়ে যাওয়ার পর বলল, মা ওকে তুমি নাও, আমি আর নিতে পারছি না। আমাকে ব্যাগ দাও। এমন করে তারা গাড়ি অবধি হেঁটে গেল।
তুহিন খুব আনন্দে ইয়াছিনদের বাড়িতে যেতে লাগল। ডান হাতে দুটো পুতুল বাম হাতে একটা। লিচু গাছ তলা দিয়ে যাবার সময় আঁখি তাকে ডাক দিল। আঁখি তাদের টিউবওয়েলে হাত মুখ ধুচ্ছিল। তুহিন বলল, এখন সময় নাই। কাল সকালে বরই তলায় আসিস। আঁখি বলল, কোথায় যাচ্ছিস? তুহিন বলল, ইয়াছিনের কাছে। আঁখি বলল, ইয়াছিন তো বাড়িতে নাই। বিকেলে খালার বাড়িতে বেড়াতে গেছে। দুই তিন দিন থাকবে বলল। তুহিনের মনটা খারাব হয়ে গেল। চুপ করে সেথায় দাঁড়িয়ে রইল। আঁখি বলল, তোর হাতে কি? তুহিন কিছু বলল না, সোজা বাড়ির দিকে দৌড় দিল।
তুহিন বাড়িতে ফিরে এলো। মা বলল, হাটে যাওয়ার বায়না ধরলে নিয়ে গেল। পুতুল কিনবে কিনে দিল। এখন তো পড়তে হবে নাকি? তা না হাট থেকে এসেই পাড়ায় পাড়ায় টো টো করে বেড়ানো হচ্ছে। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসো, যাও। তুহিন ভয়ে ভয়ে টিউবওয়েলে হাত মুখ ধুয়ে নিল।
তুহিনের কিছুতেই বই পড়তে মন চাচ্ছে না। মায়ের কড়া শাসনে বইয়ের পাতা শুধু উল্টে উল্টে দেখতে লাগল। মা রান্না ঘরে রান্না করছিল। মাঝে মাঝে ঘরে এসে রান্নার এটা সেটা নিয়ে যেতে লাগল। মা যখন ঘরে আসে তখন জোড়ে জোড়ে ছড়া পড়ে-
বিড়াল ছানার বিয়ে
ছোট্ট ডিঙি নায়ে
পুটি মাছ শাড়ি নিয়ে
যাবে তার বিয়ে।
বোয়াল মাছের আঁড়ি
যাবে বিয়ে বাড়ি
লাল নীল দিবে হাঁড়ি
দেখাবে সে দাঁড়ি।
ছেলের পড়া দেখে মা অনেক খুশি হল। বলল, লক্ষী বাবা আমার আর একটু পড়। এখনই ভাত হয়ে যাবে। এই বলে মা আবার রান্না ঘরে চলে গেল। তুহিন আবার বই উল্টে উল্টে দেখল আর মনে মনে ভাবতে লাগল, ইয়াছিন কে পুতুল দেখানো হল না। এত সুন্দর সুন্দর পুতুল ও কি কোনো দিন দেখেছে? পরক্ষণে আবার ভাবতে লাগল আঁখি কেউ তো দেখানো হল না। ও দেখতে চাইল। তখন দেখালেই তো হত।
রাতের রান্না হয়ে গেলে মা তুহিন কে খেতে দিল। তুহিন চুপচাপ খেয়ে নিল। অন্য দিনের মত দুষ্টমি করল না। তার পর শুয়ে পরল। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল, সকাল হলেই পুতুল গুলো আঁখি কে দেখাবে। ও অনেক খুশি হবে। এ রকম পুতুল ও কখনও দেখে নি। দেখলে আমায় বলতো।
গভীর রাতে তুহিনের ঘুম ভেঙে গেল। সে উঠে সুইচ অন করল। সাথে সাথে কারেন্টের বাতি জ্বলে উঠল। সে দেখল চৌকির তলায় তিনটি পুতুল ঘুমিয়ে আছে। সে তাদের কে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করল। অনেক আদর করল। বলল, তোদের জন্য ঘুম আসছে না। তোদের সাথে শুধু খেলতে ইচ্ছে করছে। তোরা কি রাগ করেছিস? এত রাতে তোদের ঘুম ভাঙালাম বলে। তোরা রাগ করিস না। সকালটা হোক তোদের নিয়ে আঁখিদের বাড়িতে বেড়াতে যাবো। দেখবি আঁখি তোদের কত আদর করবে। সন্ধ্যা বেলা তোদের কে ইয়াছিনের সাথে দেখা করতে যেতে চেয়ে ছিলাম। কিন্তু কি হল জানিস ; সে খালা বাড়িতে বেড়াতে গেছে। তোদের কে দেখলে সে কত খুশি হত। যাক সে কথা। তোরা আবার ঘুমিয়ে পড়। আমিও ঘুমাই গিয়ে। খুব ভোরে উঠতে হবে। সূর্য উঠার সাথে সাথে।
ভোরে তুহিনের ঘুম ভেঙে গেল। সূর্য তখন পুব আকাশে লাল কাপড়ে ঘুমটা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। গাছে গাছে নানা পাখি ডাকছে। মোরগ খোপের ভেতরে গলা ছেড়ে হাক পাড়ছে। তুহিন ঘুম থেকে উঠে পুতুল নিয়ে বের হল। মা সবে রান্নার জন্য রান্না ঘরে গেছে। মা বাদে বাড়ির সবই ঘুমিয়ে আছে। মা যাতে টের না পায়, তাই সে ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে বাড়ির বাইরে বের হল। তার পর দিল এক দৌড়।
সে এসে দাঁড়াল আঁখিদের বাড়ির বড় আম গাছটার নিচে । উঁকি মেরে বাড়ির অবস্তা দেখে নিল। আঁখির মা আর দাদি ছাড়া সবাই ঘুমিয়ে আছে। আঁখির মা রান্নার জন্য দাদির কাছ থেকে সোলায় আগুন ধরিয়ে নিয়ে গেল। সে তখন মনে মনে ভাবল এত সকাল সকাল আসা ঠিক হয় নি। এখন বাড়িতে যাওয়া যাক। পরে দেখা যাবে।
বাড়িতে ফিরে এলে মা দেখে ফেলল। মা বলল, আজ এত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছো। খুব ভাল হয়েছে। যাও, হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসো। তুহিন জানে মা এই সকালে পুতুল হাতে দেখলে খুব বকা দিবে। তাই সে পুতুল পিছনে লুকিয়ে রেখেছে। মা বলল, হাত পিছনে কেনো? কি হয়েছে দেখি? তুহিন বলল, কিছু হয় নি মা। মা বলল, দেখাও। তুহিন দেখাল। মা রেগে বলল, এত সকালে পুতুল নিয়ে বের হয়েছো। যাও পড়তে বসো। ঠাস করে গালে একটা চড় মেরে দিল। পুতুল কেড়ে নিয়ে ঘাড় ধরে ঘরের দিকে ধাক্কা দিয়ে বলল, যাও বই নিয়ে বসো। ছেলের সাহস কত বড়। ঘুম থেকে উঠেই পুতুল নিয়ে বেরিয়েছে। উনার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, ছেলে কে তিনটে পুতুল এক সাথে কিনে দেয়। যেমন বাব তেমন ছেলে কে বানাচ্ছে। দাঁড়াও পুতুল গুলো এখনই পুকুরে ফেলে দিচ্ছি। তুহিন কাঁদতে কাঁদতে ঘরে চলে গেল।
সে শুধু কেঁদে যাচ্ছে। কেঁদে কেঁদে দুটি চোখ ফুলিয়ে ফেলল। তুলতুলে দুটো গাল জলে ভিজে গেল। তবু তার কান্না থামে না। মায়ের হাতের চড় অনেক খেয়েছে। কিন্তু এমন করে কোনো দিন কাঁদে নি। তার কান্নার মূল কারণ মা যদি সত্যি সত্যি পুতুল গুলি পুকুরে ফেলে দেয়। এই এক রাতে পুতুল গুলি যেন তার আত্মার আত্নীয় হয়ে গেছে। কিছুতেই তাদের ছাড়া সে আর এক মুহূর্তও থাকতে পারবে না। বার বার সে পুতুল গুলির কথা ভাবতে লাগল। অনেক কাঁদার পর সে বিছানায় ঘুমিয়ে পরল।
রান্না করতে করতে মা মনে মনে বলল, এত জোড়ে চড় দেয়া ঠিক হয় নি। সকাল সকাল পুতুল বের করেছে, ভাল ভাবে বুঝিয়ে নিলেই হত। মনে তার অনেক কষ্ট হল। সে রান্না রেখে ছেলের কাছে গেল। দেখল ছেলে বিছানায় উপুর হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। পিঠে পাঁচটা আঙুল ফুটে উঠেছে। সে আলতো করে পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। চাদরটা টেনে পিঠের উপর দিয়ে দিল। অনেক ক্ষণ পাশে বসে রইল। ছেলে কে নিয়ে তার মনে নানান ভাবনা জেগে উঠল। তারপর মন খারাব করে রান্না ঘরে চলে গেল।
পরের দিন। বিকাল চারটা কি পাঁচটা। আঁখি তুহিনদের বাড়িতে এলো। তুহিন বারান্দায় বসে ছিল। সে এসে তুহিনের কাছ ঘেসে বসে পড়ল। বলল, তোর কি হয়েছে রে, সকালে এত করে ডাকলাম, শুনলি না কেনো? তুহিন চুপ করে বসে আছে। কোনো কথা বলল না। আঁখি বলল, যাবি নাকি বরই তলায়? সবাই এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খেলা শুরু হবে, চল। তুহিন বলল, ইয়াছিন এসেছে? আঁখি বলল, না। ওর চাচি রুমি বিটি কে বলছিল, কাল আসবে। তুহিন বলল, তুই যা খেলা কর গে। আমি আজ খেলবো না। আঁখি মন ভার করে চলে গেল।
বরই তলায় সবাই এসেছে। এক্ষণই খেলা শুরু হবে। জুঁই বলল, তুহিন আর আঁখি না আসা পর্যন্ত খেলা শুরু করা যাবে না। ওই দেখ আঁখি আসছে। কিন্তু তুহিন কই? আঁখি বরই তলায় না এসে পাশের রাস্তা দিয়ে চলে যেতে লাগল। জুঁই বুঝতে পারল। কোনো কিছু হয়েছে। তুহিন এলোনা। ও চলে যাচ্ছে। জুঁই দৌড় দিয়ে আঁখির নাগাল ধরল।বলল, কি রে আঁখি এভাবে চলে যাচ্ছিস কেনো? খেলবি না? আঁখি বলল, না খেলবো না। বাড়িতে কাজ আছে। তোরা খেল। জুঁই হাত ধরে টানাটানি করল। আয় এক পাট্টি খেলে যা। আঁখি বলল, না এক পাট্টিও খেলবো না। তুই যা। আমি চলে গেলাম। আঁখি চলে গেল। জুঁই মন খারাব করে সে দিকে চেয়ে রইল।
জুঁই বরই তলায় ফিরে এলো। শাকিল বলল, তাড়াতাড়ি খেলা শুরু কর। প্রতিদিন তুহিনের কথা মত খেলা শুরু হয়। আজ আর সেটা হবে না। জুঁই বলল, আজ খেলা বাদ থাকবে। শাকিল বলল, বাদ থাকবে কেনো? তারপর জুঁইকে বলল, তোকে তো আমরা মানি তুই খেলা শুরু কর।
তুহিন এই দলের প্রধান। তার কথার বাইরে কেউ কথা বলে না। আজ সে নেই বলে এই দ্বায়িত্ব টা জুঁই এর কাঁধে পড়ল। জুঁই সবার উদ্দেশ্যে বলল, তোরা আজ খেল। আমি চললাম। জাবেদ বলল, যা তুইও বাড়িতে যা। আজ খেলা বন্ধ। আমিও চলে গেলাম।এই বলে সে বাড়ির দিকে রওনা দিল। দলের অন্যান্য সদস্যও চলে গেল। কারণ, যারা থাকলে বেশি মজা হয় তারা সবাই চলে গেল। আর কে খেলবে?
এই ভাবে সে দিনের খেলা বন্ধ হয়ে গেল। সারাটা বিকাল ছেলে মেয়েদের হৈ চৈ এ মুখরিত থাকে। সেই বরই তলা এখন শূন্য পড়ে রইল। ও পাড়ে থেকে নিলু বরই তলায় খেলতে এসে ফিরে গেল । সে কিছু বুঝতে পারল না।
জুঁই তুহিনদের বাড়িতে গেল। যে কোনো একটা কিছু তো হয়েছেই। তা না হলে এমন তো কোনো দিন হয় না। তুহিন বাড়িতে বসে রঙ দিয়ে ছবি আঁকছে। ছবিটা মানুষের মত দেখতে হয়েছে। কিন্তু সে বুঝতে পারছে না এটা ছেলে না মেয়ে। তাই সে ছবিটা ভাল করে লক্ষ করে দেখতে লাগল। মাঝে মাঝে একটু একটু রঙ দিতে লাগল। এমন সময় জুঁই এসে তুহিনের চোখ ধরল। তুহিন বলল, আঁখি ছাড়া আর কে হবে? ছাড় চোখ ছাড়। ব্যাথা লাগছে তো। জুঁই গলা একটু মোটা করে বলল, তাহলে বল আমি কে? তুহিন ভাল করে হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে বলল, ইয়াছিন। জুঁই আবার গলা মোটা করতে গিয়ে তার নিজের কন্ঠটাই বেরিয়ে এল। তুহিন বলল, ছাড় এখন। হুম ঢঙ কত আমি কে?
জুঁই বলল, আরে এটা কার ছবি এঁকেছিস? মাথায় চুল কই? তুহিন বলল, কেনো ন্যাড়া মানুষ নাই। আর এটা তোর ছবি নয়? ( কয়েক দিন আগে জুঁই ন্যাড়া হয়েছে) তোর মাথায়ও তো চুল নাই। জুঁই হাত তুলে বলল, আর এক বার বললে এক থাপ্পড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিবো। তুহিন বলল, আয় দে থাপ্পড়। পরে দাঁত ভেঙচি কেঁটে বলল, ন্যাড়া.. ন্যাড়া..। জুঁই মারতে গেলে, তুহিন দৌড় দিয়ে বাড়ির বাইরে গেল। জুঁই পিছে পিছে দৌড়াল। অনেক ক্ষণ চলল তাদের দৌড়াদৌড়ি।তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে দু'জন পুকুর ঘাটের সিঁড়ির উপর বসে পড়ল।
জুঁই বলল, আজ খেলতে গেলি না কেনো? তুহিন বলল, এমনি। আজ খেলতে মন চাইল না তাই।তুই খেলা বাদ দিয়ে এসেছিস কেন? জুঁই বলল, আমি খেলবো কি করে? তুই নাই আঁখিও নাই। তুহিন বলল, আঁখি নাই মানে? ও তো আমায় ডাক দিয়ে গেল। জুঁই বলল, কি জানি, জানি না। বলল সে খেলবে না। পরে আর খেলা হল না। যে যার মত বাড়ি চলে গেল। তুহিন বলল, বুঝতে পারছি আমার জন্যই আজ তোদের খেলা নষ্ট হয়ে গেছে। চল বাড়ি যাই। একটু পরেই রাত হবে। দেখেছিস না পশ্চিম আকাশটা কেমন লাল হয়েছে। জুঁই বলল, চল। তার পর দু'জন দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি চলে গেল।
রাত্রী বেলা। তুহিন আর শারমিন দুই ভাই বোন একই মাদুরের উপর খেতে বসল। মা ভাত বেড়ে দিচ্ছেন। পাশেই বিড়ালের ছানা মিউ মিউ করে ডাকতে লাগল। মাছের মাথাটা মা শারমিন কে দিল। তুহিন বলল, মা গত হাটের দিন কিন্তু শারমিন মাথা খেয়েছে। আজ আমাকে না দিয়ে ওকে দিলে কেনো? মা বলল, ও ছোট মানুষ। আবার অন্য দিন আনলে তোমাকে দিবো। তুহিন বলল, তা হবে না। গত হাটেও খেয়েছে আবার আজকেউ খাবে? এই বলে তুহিন ভাত রেখে উঠে পড়ল। বলল, আজ ভাতই খাবো না। মা তখন শারমিন কে বলল, তুমি সামনে হাটে খেও। এখন মাছের মাথাটা তোমার ভাইয়া কে দাও। শারমিন তখন বলল, নে ভাইয়া ধর। মাছের মাথাটা তুহিনের প্লেটে রেখে দিল। তুহিন শারমিনের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মাদুরের উপর বসে পড়ল। মা শারমিনের পাতে একটা মাছের পেটের টুকরো দিল। শারমিন কিছুটা এর মধ্যেই খেয়ে ফেলেছে। তুহিন শারমিনের প্লেটে হাত দিয়ে মাছের বাকি অংশটুকু নিয়ে মাথাটা দিয়ে দিল। শারমিন মাথাটা হাতে নিয়ে বলল, আমি তো অন্য হাটে খেয়ে ছিলাম, আবার সামনে হাটে খাবো। আজ তুই খা। তুহিন বলল, পন্ডিতের মত কথা না বলে খেয়ে নি। আমি সামনে হাটে খাবো।
আপন মনে দুই ভাই বোন খেতে লাগল। বিড়াল ছানা তুহিনের গা ঘেষে ঘেষে বলল, মিউ মিউ মিউ...। তুহিন বুঝল সে ভাত চাচ্ছে। সে তখন তরকারি দিয়ে সুন্দর করে ভাত মাখিয়ে ভাঙা বাটিতে চৌকির এক কোনায় রেখে দিল। তাদের বাড়ির বিড়াল ছানা তরকারি ছাড়া ভাত খায় না।
কিছুক্ষণ পরে শারমিন, মা কে বলল, মা- ভাইয়া কিন্তু আমার পুতুল দিচ্ছে না। তিন দিন হল বলছি। শুধু বলে এখন না পরে। আবার বলে আজ না কাল। ও বাবার সাথে হাটে গেছে বলে ও তিনটি পুতুলই নিবে। বাবা সে দিন বলছিল ভাইয়ার একটা আর আমার দুইটা। আজ বাবা আসলে বলে দিবো- আমাকে ভাইয়া একটা পুতুল ও দেয় নাই। তুহিন তখন ভাত মুখের ভেতর দিয়ে চিবুতে চিবুতে চৌকির তলায় গিয়ে পুতুল তিনটি বের করে আনল। বলল, কোনটা নিবি নে। শারমিন নাড়াচাড়া করে দেখল কোন দুইটা ভাল। মা ধমক দিয়ে বলল, তোরা কি শুরু করলি? খাওয়ার সময়। আবার দু'জন ভাত খেতে লাগল। পুতুল গুলো পড়ে রইল শারমিনের বাম পাশে।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে পুতুল ভাগ করা শুরু হল। একটা পুতুল এক জায়গায় একটু ভাঙা। কেনার সময় কেউ খেয়াল করে নাই। শারমিন ভাল করে দেখে দেখে ভাঙা পুতুলটা তুহিন কে দিল। তুহিন বলল, তুই দুইটা নিবি আর আমাকে একটা তাও আবার ভাঙা। তাই সে তিনটা পুতুল হাতে নিয়ে বলল, যা তোকে একটাও দিবো না। তুই বাবা কে বলে দিস। দেখি আমার কি হয়? আমি বাবাকে অনেক বার বলে বলে পুতুল গুলো কিনেছি। তোকে দিতে চাইলাম তাই কত না? আবার দেখি আমাকেই দেয় ভাঙাটা। মা বাইরে থেকে এসে পুতুল গুলো নিয়ে বলল, যাও আবার কালকে খেলো। এখন শুয়ে ঘুমাও।
দু'জন বিছানায় শুয়ে পড়ল। তুহিন কাঁথা টেনে টেনে পিঠের নিচে জড়ো করতে লাগল। ও দিকে শারমিন কাঁথা টেনে টেনে যখন তুহিনের সাথে পারে না তখন মা মা করে ডাক দেয়। তুহিন তখন কাঁথা ছেড়ে দেয়। একজনের গায়ের সাথে আরেক জনের গা লাগলে ঘুষি দেয়। কারো চেয়ে কেউ কম নয়। এভাবে অনেকক্ষণ চলল। তারপর শারমিন বিছানা থেকে উঠে একটা ছেঁড়া কাঁথা এনে দু'জনের মাঝ খানে রাখল। বলল, তুই এর ডান দিকে আসতে পারিব না। তুহিন বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। তারপর সে ঘুমের ভ্যান ধরে হাত উঁচু করে কাঁথার উপর দিয়ে শারমিন কে চিমটি দিল। শারমিন জোরে জোরে কেঁদে উঠল। মা বাইরে থেকে এসে বলল, তোমাদের দু'জনেরই ভাব দেখছি সেই সন্ধ্যা বেলা থেকে। সারা বেলা কিছুই বললাম না। পাওয়ার বেড়ে গেছে তাই না। দুজনকে টেনে বসাল, তারপর দুই গালে দুইটা করে চড় বসিয়ে দিল। দু'জনেই কাঁদতে শুরু করল। মা ধমক দিয়ে বলল, থামো বললাম। কিছুক্ষণ পর দু'জন থেমে গেল।
মা আবার দু'জন কে টেনে টেনে শুয়ে দিল। তারপর পর দু'জনেই ঘুমিয়ে পড়ল।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
তুহিন, জুঁই, আঁখি, শাকিল বরই তলায় বসে আছে। এমন সময় নিলু এলো। বলল, কাল তোরা সব কই গিয়েছিলি? খেলতে এসে দেখি সব ফাঁকা। কেউ নেই বরই তলায়। তার কথায় কেউ কান দিল না। রানার দাদি বলল, ইয়াছিনের মা আমাদের ফোনে ফোন দিয়ে ছিল, বলল এখনই রওনা দিবে। তুহিন বলল, কতক্ষণ আগে ফোন দিয়ে ছিল, দাদি। রানার দাদি বলল, তাও তো বিশ মিনিট হবে। তুহিন বলল, তাহলে ওরা এতক্ষণ বাজারে এসে গাড়ি থেকে নেমেছে মনে হয়। তারপর সবাই কে বলল, চল আমরা এগিয়ে যাই।
সবাই তার কথা মত ইয়াছিন কে এগিয়ে আনতে গেল। তুহিন আর জুঁই আগে আগে আর সবাই পিছে পিছে। যেতে যেতে তুহিনের কালকের সন্ধ্যার কথা মনে হল। সে জুঁই এর মাথায় টোকা দিয়ে বলল, ন্যাড়া.. ন্যাড়া...। জুঁই মারতে গেলে তুহিন দৌড়াল। তাকে ধরতে না পেরে জুঁই বাড়ির দিকে পথ ধরল। সবাই এক সাথে বলল, ন্যাড়া... ন্যাড়া...। অনেকটা পথ যাওয়ার পর সবাই জুঁই কে ডাক দিল। আয় যাবি না। সে বলল, না আমি যাবো না, বাড়িতে গেলাম। তুহিন জোড় গলায় বলল, যাবি না। সেও চেঁচিয়ে বলল, না যাবো না। সে আবার বাড়ির দিকে হাটতে লাগল। সবাই যতই ডাকুক না কেনো? সে আর পিছন ফিরে তাকাচ্ছে না। নিলু বলল, ঢঙ কত? আয় সব। ওকে রেখে গেলে আমাদের কি হবে? তুহিন আবার চেঁচিয়ে বলল, তাহলে যাবি না। কোনো কথার উত্তর এলো না। সবাই বলল, চল আমরা এগিয়ে যাই। তুহিন বলল, তোরা সামনে হাটতে থাক। আমি এখনই আসছি।
তুহিন জুঁই কে ধরার জন্য দৌড়াল । পিছে পিছে আঁখি ও দৌড়াল। জুঁইয়ের নাগাল পাওয়া পাওয়া ভাব। এমন সময় জুঁই বুঝতে পেরে আবার দৌড়াল। তুহিন হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, দাঁড়া জুঁই আর কোনো দিন ন্যাড়া বলবো না। জুঁই দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, সত্যি আর কোনো দিন বলবি না। তুহিন বলল, না সত্যি বলব না। কথা বলতে বলতে জুঁই কে ধরে ফেলল। বলল, ন্যাড়া...তোরে ধরার জন্য অনেক কষ্ট করেছি। চল যাই। জুঁই বলল, তুই আবার বলছিস। যেতে চেয়ে ছিলাম কিন্তু আর যাওয়া হল না। জুঁই বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য ধাই করতে লাগল। এবার আঁখি ও ধরল। দু'জনে ধরে নিয়ে গেল।
দলের নাগাল ধরলে নিলু বলল, ন্যাড়ার আবার ঢঙ দেখো, দু'জনে ধরে আনতে হয়। কত আদর। আমরা এমন আদর করতেও জানি না। তুহিন বলল, এখন চুপচাপ চল। জুঁই বলল, না ভাই আমি যাবো না, তোরা যা। আঁখি ঘুষি পাকাল। বলল, চল তাড়াতাড়ি চল। নইলে এক ঘুষি দিয়ে তোর দাঁত ফালাই দিবো। শাকিল বলল, দে ওর চাপা পাতাইলা একটা ঘুষি।
যাহোক শেষ মেশ সবাই আম গাছ তলায় গিয়ে দাঁড়াল। আঁখি বলল, আর যাবো না। ওরা মনে হয় আজকে আসবে না। জুঁই বলল, নে এখানে আমরা একপাট্টি বউ ছি খেলি। এর মধ্যে না এলে আমরা চলে যাবো। নিলু বলল, ন্যাড়া ঠিক কথা বলেছে। চল আমরা বউ ছি খেলি। জুঁই এবার তার কথায় রাগ করল না। সে বুঝে গেল ওদের সাথে যত রাগ করা যাবে, ততই ওরা ন্যাড়া বলে খেপাবে। তাই সে বলল, ন্যাড়া হয়েছি। ন্যাড়া বললে দোষ কি? যত খুশি বল। তোদের মুখেই থাকবে। আমার কিছুই হবে না। তখন দলের সবাই এক সাথে মিলে বলল, ন্যাড়া... ন্যাড়া...ন্যাড়া...।
তুহিন রাগান্বিত হয়ে বলল, সবাই চুপ কর। এটা কি হাট নাকি? সবাই চুপ করল। তুহিন বলল, আর কেউ ওকে ন্যাড়া বললে তার খবর আছে। তোরা কোনো দিন ন্যাড়া হস না। নিলু আস্তে আস্তে বলল, নিজেই জো ধরিয়ে দিয়ে নিজেই আবার শাসন করছে। আঁখি শুনতে পেয়ে বলল, একদম চুপ থাকবি। অন্য পাড়া থেকে এসেছে, আবার বড় বড় কথা। নিলু বলল, এটা কি তোদের পাড়া। বরই তলা পাইছো? যা খুশি তাই বলবে। আর সব মুখ বুঝে সয়ে নিবো। আঁখি বলল, তুই আর কোনো দিন বরই তলায় যাবি না? নিলু বলল, না। ওখানে যাই এটা তোদের ভাগ্য। না গেলে কি হবে? জুঁই তাদের কথা কাটাকাটি শুনতে পেয়ে বলল, বরই তলা না গেলে তোর পেটের ভাত হজম হবে? আমরা সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই তুই বরই তলায় এসে হাজির। নিলু কিছু না বলে তখন বাড়ির দিকে রও না দিল। কিছু দূর যাবার পর বলল, ন্যাড়া... ন্যাড়া... ন্যাড়া... তোরা সব ন্যাড়ার দল, বলে দিল এক দৌড়।
অনেকক্ষণ বসে থাকার পর আঁখি বলল, চল বাড়ি যাই। এতক্ষণ দূরে থাকলে মা বকা দিবে। জুঁই বলল, আর দেরি করা যাবে না। চল এখন বাড়ি যাই। তুহিন বলল, ইয়াছিনরা মনে হয় আজ আসবে না। দাদি মনে হয় আমাদের মিথ্যে বলেছে। আমাদের বকা বানিয়েছে। সবাই বলল, চল চল বাড়ি যাই। সবাই বাড়ির দিকে রওনা দিল। কিছুদূর থেকে ইয়াছিন ডাক দিল, তুহিন...। দলের সবাই পিছনে তাকাল। দেখল ইয়াছিন এসেছে। সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল। তুহিন বলল, এত দেরি করে আসলি কেন? তোদের জন্য কতক্ষণ হল ওখানে বসে ছিলাম। এই বলে ইয়াছিনের কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিজের কাঁধে ঝুলাল। বলল, খালা বাড়ি কেমন খাওয়া হল। সাথে ওটা কে? ইয়াছিন বলল, আমার খালাতো বোন। তুহিন বলল, কি কি খেলি খালা বাড়ি? ইয়াছিন বলল, তা তোকে বলবো কেন? তুহিন বলল, আচ্ছা, না বললি। চল বাড়ির দিকে চল।
তারা সবাই হৈ চৈ করে বাড়ির দিকে রওনা দিল। সবারই হাসি মুখ। আঁখি বলল, আমাদের এখানে আসাটা তাও সার্থক হল। ইয়াছিনের মা বলল, তোমরা হেঁটে হেঁটে এত পথ এলে কেনো? তুহিন কে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমার মা তো অনেক রাগি। এতদূর এসেছো, তোমায় গালি দিবে না? জুঁই বলল, ওর মা জানলে তো গালি দিবে। ইয়াছিনের মা হেসে বলল, আমি যদি বলে দেই। তাহলে কি হবে বলতো। সবাই চুপ করে রইল। ইয়াছিন বলল, মা তুমি কি সত্যি বলে দিবে। মা বলল, আরে পাগল কোথাকার। এত পথ এসেছে, এইতো অনেক কিছু। আবার ওর মা কে বলতে যাবো কেনো? ইয়াছিন বলল, তাহলে কেবলই বললি যে মা। মা বলল, এমনি বলেছি। দেখি তোমরা কেমন করো।
নিলুদের বাড়ির সামনে দিয়ে আসার সময় নিলু বাড়ি থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে এলো। বলল, ইয়াছিন তোর জন্য কতক্ষণ ওদের সাথে বসে ছিলাম। তোর খালা বাড়ি কত দূর? এত দেরি হল কেন? জুঁই ইয়াছিন কে বলল, ওর সাথে কথা বলবি না। ইয়াছিন বলল, কেন? কি হয়েছে। জুঁই বলল, ও আমাকে ন্যাড়া ন্যাড়া বলে খেপিয়েছ। নিলু বলল, আমি একা বলি নাই। সবাই বলল। অথচ দেখ সব দোষ আমার হল। আঁখির মাথায় টোকা দিয়ে বলল, তোরা ওকে ন্যাড়া বলিস নাই। শুধু শুধু আমি বলছি। না? আঁখি বলল, হ্যাঁ শুধু তো তুই একাই বলছিস। নিলু বলল, দেখ আঁখি এত বড় মিথ্যা কথা বলবি না। ভাল হবে না বলে দিলাম। আঁখি বলল, ভাল মন্দের তুই কি? কি করবি আমায়? নিলু একটা ঘুষি দিয়ে দৌড়ে বাড়ির ভেতর চলে গেল। আঁখি আর জুঁই পিছু নিল কিন্তু ধরতে পারল না। জুঁই বলল, বরই তলায় গেলে তখন সুদে আসলে তুলে নিস। আঁখি কাঁদতে কাঁদতে বলল, না আমি ওকে এখনই মারবো। তুহিন বলল, চল নিলুদের বাড়িতে যাই। ওর মাকে বলে দিয়ে আসি, ছেলেকে শাসন করতে। সবাই বলল, চল যাই। ইয়াছিন বলল, আমি মার সাথে ব্যাগটা রেখে আসি। তুহিন বলল, যা তাড়াতাড়ি আসবি। ইয়াছিন বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। ইয়াছিনের মা বলল, তোমরা মারামারি করো না। সবাই বাড়িতে এসো।
সবাই নিলুদের বাড়িতে গেল। নিলু ভয়ে দৌড়ে ঘরের ভেতরে গেল। আঁখি দৌড়ে দরজার সামনে গেলে নিলু ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। আঁখি দরজার পরে ধাক্কার উপর ধাক্কা দিয়ে বলল, তোর সাহস থাকলে দরজা খোল। দেখ তোকে কি করি। নিলুর মা দূর থেকে সব দেখছিল। সে এসে বলল, কি করবি? আঁখি বলল, ও আমাকে মেরেছে আমি ওকে মারবো। নিলুর মা বলল, এমনি এমনি কেউ কাউকে মারে? তোরা কি করছিস সেটা আগে বল? বাড়ির উপর মারতে আসিস। তোদের সাহস তো কম নয়? জুঁই বলল, সাহসের কি দেখছেন? ওকে বের হতে বলেন, দেখেন কি করি? নিলুর মা রেগে গিয়ে বলল, এ নিলু দরজা খোল। দেখি ওরা কি করে? নিলু ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দিল। নিলুর মা ছেলে কে ধরে ধাক্কা দিয়ে ওদের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, নে কি করবি কর? সবাই চুপ মেরে গেল। তুহিন বলল, চল বাড়ি যাই। নিলুর মা বলল, এখন বাড়ি যাবে কেন? নিলুকে তো এগিয়েই দিলাম। কি করবে বলছিলে, করো এখন। আঁখি বাড়ি থেকে বের হতে হতে বলল, বরই তলায় গেলে তার পর বুঝাবো কত ধানে কত চাল?
বরই তলায় আম গাছের গুড়ির উপর সবাই বসে আছে। আঁখি জাবেদ কে বলল, তুই যা এখান থেকে। তোদের পাড়ায় আমরা কবে যাই। প্রতিদিন আমাদের পাড়ায় আসিস তোদের শরম করে না। জুঁই বলল, কাকে কি বলছিস ওদের শরম আছে? জাবেদ মুখ ভেঙচি কেটে বলল, শরম ওয়ালা হয়ে পড়ছে। তুহিন বলল, এখন তুই বাড়িতে যা আবার পরে আসিস। আমাদের কিছু কথা আছে। তোর শোনা যাবে না। জাবেদ মুখে বিড়বিড় করে চলে গেল।
জুঁই বলল, আজ থেকে বরই তলায় শুধু আমরা খেলবো। অন্য পাড়ার কাউকে খেলায় তুলবো না। আঁখি বলল, ঠিক বলেছিস আমরা অন্য পাড়ার কাউকে তুলবো না। আমরা ওই পাড়া গিয়ে কয় দিন খেলি? ইয়াছিন বলল, নিলু কে খেলায় তোলা তো দূরে থাক, ওকে খেলা দেখতেও দেওয়া হবে না। ও শুধু পায়ে পা রা দিয়ে দিয়ে ঝগড়া লাগায়। আঁখি বলল, ও বরই তলায় আসুক, ওদের বাড়িতে কিছু করতে পারি নাই। তাই বলে এখানেও করতে পারবো না। তুহিন বলল, এখন এসব কথা রাখ। নে বৌ ছি খেলি।
আঁখি তুহিন কে বলল, তুই হাটে গিয়েছিলি, তা কি কি দেখলি, কি কি খেলি, কি কি কিনলি কিছুই তো বললি না? ইয়াছিন বলল, হাটে গিয়ে ছিলি? অত মানুষের মধ্যে হাটতে পারলি? তুহিন বলল, যাদু সব যাদু। যাদু না জানলে কি অত মানুষের মাঝে হাটা যায়। রানার দাদি বেশির ভাগ সময় বরই তলায় এসে কাঁথা সেলাই করে। সে বলে উঠল, যাদু। সারা পথ বাপের কোলে গিয়ে, বাপের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছো। এখন বলছো যাদু। জুঁই ফিক করে এসে দিয়ে বলল, এত বড় হয়েছিস এখনও বাপের কোলে উঠিস। ফিটার এনে দিবো খাবি? তুহিন বলল, তুই হাটতে পারবি অত মানুষের মধ্যে। শুধু শুধু কথা বলিস যেন। জুঁই বলল, আমি কি তোর মত হাটে যাওয়ার বায়না ধরছি না গেছি, অত মানুষের মধ্যে হাটতে যাবো? তুহিন বলল, তাইলে চুপ থাক। যা পারবি না তা বলিস কেন? ইয়াছিন বলল, ঝগড়া বাদ দে, কি কি কিনে আনছিস সেটা বল? তুহিন বলল, তোরা থাক আমি বাড়ি থেকে ঘুরি আসি। ইয়াছিন বলল, যা তাড়াতাড়ি আসবি।
তুহিন বাড়িতে চলে গেল। চৌকির তলায় তার যত্নে রাখা পুতুলের জন্য। পুতুল তিনটি নিয়ে সে আবার বরই তলায় ফিরে এলো। জুঁই বলল, ছি ছি তোর পুতুল ল্যাংটা কেন? কাপড় পরাবি না? আঁখি বলল, পুতুল তিনটা খুবই সুন্দর। কাপড় পরালে আরো সুন্দর লাগবে। এই বলে সে বাড়ির দিকে ছুটে গেল। কেউ কিছু বুঝতে পারল না। কেন সে বাড়িতে গেল? তুহিন বলল, এখনই বাড়ি যাচ্ছিস? আঁখি চেঁচিয়ে বলল, তোরা যাস নে, আমি এখনই আসছি। জুঁই বড় পুতুলটি নিয়ে নড়াচড়া করতে লাগল আর ছোট দুইটা ইয়াছিনের হাতে। রানা বলল, আমার কাছে একটা দে। সব চেয়ে ছোট পুতুলটা ইয়াছিন তার কাছে দিল। সে উঠে দাঁড়াল। জুঁই বলল, কোথায় যাস? কিছু না বলে সে পুতুল নিয়ে সাথে সাথে তার দাদির কাছে গিয়ে লুকাল। তুহিন সেখানে গেল। বলল, দে আমার পুতুল দে। রানা বলল, দিবো না। পুতুলটা কেড়ে নিতে সে কান্না শুরু করল। দাদি বলল, দে ওকে পুতুলটা দে...। ছোট মানুষ। পরে ওকে ভাল করে বুঝিয়ে ফেরত দিয়ে দিবো। তুহিন কোন কথা শুনল না পুতুল নিয়ে আগের জায়গায় ফিরে এলো।
আঁখি বাড়িতে গিয়ে তার পুতুলের সব কাপড় চোপড় এলোমেলো করে ফেলল। সে খুঁজে খুঁজে দেখল, কোন কাপড়টা বড়। একটা বড় কাপড় পাওয়া গেল কিন্তু সেটা এক জায়গায় একটু ছেঁড়া। সে একটু বড় সাইজের দুই তিনটা কাপড় নিয়ে যথা স্থানে ফিরে এলো। সে এসে দেখল, সেখানে হৈ চৈ পড়ে গেছে। রানা কাঁদছে আর ওর দাদি বলছে দে না ভাই। একটু ওর হাতে দে। এটা তো খাবার জিনিস নয় যে খেয়ে ফেলবে। আঁখি বলল, দে ওর হাতে দে। কি হবে দিলে। জুঁই বলল, হাতে দেয়া হয়ে ছিল। কিন্তু সে একবারে নিবে। আঁখি তখন বলল, তাহলে তো দেয়া যাবে না। তুহিন বলল, আজকে আর পুতুল দিয়ে খেলা হবে না। এই বলে সে পুতুল নিয়ে বাড়ি চলে গেল। রানা কাঁদতে কাঁদতে তার পিছে পিছে কিছুদূর গেল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
বর্ষা কাল চলছে। বিকেল বেলা সবাই বরই তলায় বসে আছে। শাকিল বলল, দেখিস আজ রাতের মধ্যে বরই তলায় পানি উঠবে। জুঁই বলল, তুই কি বিজ্ঞানী? যা বলবি তাই হবে? আঁখি বলল, দুপুরে আব্বা খেতে বসে বলল; যে ভাবে পানি বাড়ছে আজ রাতের মধ্যে আমাদের আম তলায় পানি উঠবে। তুহিন বলল, তোদের আম তলা থেকে বরই তলা অনেক উঁচু। কাল দাদি বলল শুনিস নাই? আটাআশির বন্যায় তোদের আম তলায় গলা পানি আর বরই তলায় হাটু পানি।
তুহিনদের গ্রামের সব বাড়ি ঘর উঁচুতে। কারণ এখানে প্রতি বছরই বন্যা হয়ে থেকে। প্রায় প্রতি বাড়িতেই নৌকা আছে। বর্ষা কালে পুরো গ্রামটা পানিতে ভরে যায়। রাস্তা ঘাট সব তলিয়ে যায়। তখন নৌকা ছাড়া চলচলের কোনো মাধ্যম থাকে না। ঘাট আর ঘাট থাকে না। যেথায় সেথায় সবাই গোসল করে। বাড়ি বা জায়গা ভেঙে যাবে বলে বাড়ির বড়োরা ছেলে মেয়েদের সব জায়গায় গোসল করতে মানা করে । কে শুনে কার কথা? লাফিয়ে লাফিয়ে যে যার মত জলে নেমে পড়ে। বাড়ির বড়োরা তখন সেথায় বরই কাঁটা দিয়ে ঘিরে দেয়।
ইয়াছিন দলের উদ্দেশ্যে বলল, চল আমরা মাছকাটা খেলি। আগে থেকেই মাছকাটা খেলার দাগ টানা ছিল, কিন্তু মানুষের পায়ে পায়ে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে সে আবার সেই দাগের উপর একটা চোকা খাপড়া দিয়ে হাত বুলাতে লাগল। তুহিন বলল, এই এখন রাখ। খেলা যাবে না। বাড়িতে বড় কাকা আছে। হৈ চৈ পছন্দ করে না। তোরা তো সব জানিস। এসে ঠিক গালি দিবে। আঁখি বলল, আচ্ছা এখন থাক।
কিছুক্ষণ তারা চুপচাপ বসে রইল। নৌকায় চড়ে একজন দুইটা কদম ফুল নিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় জুঁই বলল, চল আমরা কদম ফুল পেরে আনি। তুহিন বলল, কদম তলায় কেমনে যাবি? আমাদের নৌকা নিয়ে চাচি ওই পাড়ায় গেছে। আঁখি বলল, চল আমাদের নৌকা নিয়ে যাই। তুহিন বলল, চল যাই।
তারা সবাই আঁখিদের ঘাটে গেল। তারা দেখল সেখানে ছোট নৌকাটা নাই। বড় নৌকা আছে সেটা তালা দেয়া। আঁখি তার মাকে ডাক দিয়ে বলল, মা নৌকা কে নিয়ে গেছে? মা বলল, তোর দাদা কোথায় যেন গেছে। সেই অনেকক্ষণ হল। তুহিন বলল, তাহলে কেমন হল। জুঁই বলল, চল বরই তলায় যাই। ফুল পারতে হবে না, চল খেলি। ইয়াছিন জুঁই কে বলল, তোদের না নোকা আছে। চল সেই নৌকায় যাই। জুঁই বলল, দাদি এত মানুষ নৌকায় তুলতে দিবে না, আমি জানি। তুহিন বলল, তুই একা গিয়ে নৌকা এই ঘাটে নিয়ে আয়। তা হলেই তো হল। জুঁই আঁখি কে বলল, আয় যাই। তুই আর আমি নিয়ে আসি। তার পর দু'জন চলে গেল।
নৌকার উপর বসে জুঁই এর দাদি কাপড় ধুচ্ছে। ওরা অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। দাদির সরার কোন লক্ষণ না দেখে জুঁই দাদিকে বলল, নৌকা থেকে নামো। আমরা ঘুরতে যাবো। দাদি বলল, ঢঙ কত মেয়ে মানুষ আবার ঘুরতে যাবে। তা কোথায় যাবি? জুঁই রাগল না। সে জানে এই সময় দাদির সাথে রাগলে নৌকা পাওয়া যাবে না। দাদি বলল, দাঁড়া একটু দেরি কর। এখনই ধোয়া হয়ে যাবে। জুঁই তখন দৌড়ে বাড়ির ভেতর গেল। ভাল দেখে দুইটা বৈঠা নিয়ে এল।
ইয়াছিন বলল, দেখ দুই শালি সেই তিন ঘন্টা হল গেছে। এখনও আসার নাম নাই। শাকিল বলল, ওরা মনে হয় সেখানে খেতে বসেছে। আমি যাই গিয়ে দেখে আসি ওরা কি করছে। ইয়াছিন বলল, ঠিক। তোর মাথায় বুদ্ধি আছে। যা দেখে আয়। শাকিল চলে গেল। তুহিন বলল, ওই যে দুই জন আসছে। ইয়াছিন বলল, আয় তাড়াতাড়ি আয়। ওরা ধীরে ধীরে নৌকা ঘাটে বেড়াল। পরে তারা সবাই নৌকায় উঠে বসে পড়ল। তুহিন বলল, শাকিল আসুক তার পর নৌকা ছাড়া হবে। কিছুক্ষণ পরে শাকিল দৌড়ে নৌকার ধারে এলো।
তুহিন আঁখির কাছ থেকে বৈঠা নিয়ে হাল ধরল। জুঁই নৌকার সামনে থেকে বৈঠা বাইছে। নৌকা চলল কদম তলায়।
হাজার হাজার কদমফুল ফুটে আছে গাছের ডালে। চোখ মেলে দেখলে মনটা জুড়িয়ে যায়। কিছু কিছু ফুল বর্ষার জলে ঝরে পড়ে। কিছু ফুল জলে ভেসে ভেসে যায় দূর বহু দূরে। আবার কিছু ফুল ছেলে মেয়েরা শখ করে বেঁধে রাখে ঘরের দুয়ারে। কদমফুলের সুগন্ধে ভোমরেরা ছুটে আসে দূর বহু দূর হতে। কদম ফুলের ছোঁয়ায় পানির ঢেউ গুলো যেন মনোমুগ্ধকর রুপ প্রদর্শন করে। ছেলে মেয়েরা ভীর করে কদম তলায়।
আঁখি বলল, জোড়ে বৈঠা চালা। জুঁই নৌকার সামনে থেকে বলল, কথা না বলে ধর আমার বৈঠা। সেই শুরু থেকে বেয়ে যাচ্ছি। আঁখি তুহিনের পাশে বসে ছিল। উঠে গিয়ে জুঁই এর বৈঠা নিল। বলল, যা মাঝ খানে গিয়ে বয়। জুঁই মাঝ খানে না বসে তুহিনের পাশে গিয়ে বসল। তখন ইয়াছিন তুহিন কে বলল, দে বৈঠা দে, আমি হাল ধরি। তুই অনেকক্ষণ ধরে বাইছিস। তুহিন বলল, নে ধর। ইয়াছিন বৈঠা নিল। তুহিন নৌকার মাঝ খানে গিয়ে বসল।
নৌকা আবার চলল, কদম তলায়। আর কিছুদূর পথ বাকি। ফুলে ফুলে ভরে আছে কদম গাছ। মনে হচ্ছে একদল দস্য যেন সোনার ঘর আক্রমণ করতে আসছে। ইয়াছিন বলল, দেখ কত ফুল ফুটে আছে, সে আনন্দে বৈঠা নিয়ে দাঁড়াল। বৈঠা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলল, আজ সব ফুল পেরে নিয়ে যাবো। দেখি আমাদের কে ঠেকায়?
নৌকা ভিড়ালে সবাই তাড়াতাড়ি নেমে গেল। জুঁই বলল, দেখ কত পিঁপড়া। আমি আর থাকতে পারলাম না। দেখ দেখ পায়ে কামড় দিয়ে ধরে আছে। আঁখি বলল, একেবারে দাঁত ওয়ালা পিঁপড়া। সবাই তাড়াহুড়া করে আবার নৌকায় গিয়ে উঠল। সেখান থেকে সবাই এক দৃষ্টিতে কদম ফুলের দিকে চেয়ে রইল। তার পর তুহিন বলল, তোরা নৌকায় বসে থাক। আমি গাছে উঠে ফুল পেরে আনি। জুঁই বলল, আজকে থাক। গাছে অনেক পিঁপড়া। আঁখি বলল, এত পথ কষ্ট করে এসে আবার ফিরে যাবো? ইয়াছিন বলল, না ফিরে গেলে ফুল নিয়েই যাবো। তুহিন গাছে গিয়ে উঠল। পিছে পিছে ইয়াছিন। পিঁপড়া কামড়ের পর কামড় দিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু দু'জন হাল ছাড়ল না। তারা ফুল পেরে যেতে লাগল। পিঁপড়ার উপর রাগ করে তারা ফুলসহ বড় বড় ডাল ভেঙে নৌকার উপর ফেলে দিতে লাগল । বাড়ির ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, কে রে গাছে। মটমট করে ডাল ভেঙে ফালায়। আঁখি ইশারা করে বলল, তাড়াতাড়ি নেমে আয়। তারা দু'জন ঘোষ দিয়ে তাড়াতাড়ি নেমে এলো। নৌকা ছাড়ার সাথে সাথে বাড়ির ভেতর থেকে এক বুড়ি লাঠি হাতে বেড়িয়ে এলো। বলল, আয় তোদের কদমফুল খাওয়াচ্ছি। জুঁই বলল, নে তাড়াতাড়ি বৈঠা ফালা। তুহিন আর ইয়াছিন দু'জনে বৈঠা ফেলে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে এলো। ইয়াছিন বলল, নে তোরা এখন বৈঠা ফালা। আমরা আর বাইতে পারছি না। আঁখি আর জুঁই বৈঠা নিল। তারা ধীরে ধীরে নৌকা বাইতে লাগল। নৌকা আবার চলল, বড়ই তলার উদ্দেশ্যে।
বরই তলায় ফুল নিয়ে সবাই নেমে গেল। জুঁই বলল, আমার সাথে একজন চল। নৌকা আমাদের ঘাটে রেখে আসি। আঁখি বলল, যাওয়ার সময় আমি গিয়েছিলাম। এখন আরেক জন কে নিয়ে যা। ইয়াছিন যেতে চাইলে জুঁই বলল, আমি একাই যেতে পারবো। আঁখি বলল, চল যাই। জুঁই বলল, না থাক আমি একাই যেতে পারবো। জুঁই আর আঁখি দু'জনে নৌকার মধ্যেকার ফুল আর পাতা ঝেড়ে ফেলে দিল। তারপর নৌকা ঘাটে রেখে এলো।
তুহিন এক ছড়ি কদমফুল নিয়ে ঘরের দুয়ারে বেঁধে দিয়ে এলো। সেই দেখা দেখি শাকিল ও এক ছড়ি নিয়ে গেল। এর মধ্যে জুঁই আর আঁখি ফিরে এল। তারা ভাল দেখে দেখে কয়েকটা করে নিয়ে নিজেদের কাছে রেখে দিল। তারপর বলল, নে সবাই সাদা আর হলুদ পাপড়ি গুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে আলাদা করে রাখ। সবাই ফুলের পাপড়ি গুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে আলাদা করে রেখে দিল। ইয়াছিন আগে থেকেই ছিঁড়ে ছিঁড়ে দাগ টানা ঘরে সারি সারি করে রেখে দিতে লাগল। আঁখি সেথায় রেখে দিলে ইয়াছিন বলল, তোরা আরেক জায়গায় দাগ টেনে ঘর আঁকা। আমার জায়গায় করতে দিবো না। আঁখি আলাদা বানালো। তুহিন আলাদা বানাতে লাগল। জুঁই তার সাথে সাথে একই জায়গায় বানাতে গেলে আঁখি বলল, তুই অন্য জায়গায় বানা। জায়গার তো অভাব নাই। দেখি কার ঘর বেশি সুন্দর হয়? জুঁই কিছু বলল না। তুহিন জুঁই কে আস্তে আস্তে বলল, আমরা দু'জন মিলে সবার থেকে সুন্দর করে ঘর বানাবো। জুঁই মিষ্টি মিষ্টি হেসে বলল, তুই ওই দিক দেখ আর আমি এই দিক দেখি।
সবারই ঘর বানানো হয়ে গেল। কেবল তুহিন আর জুঁই এর বানানো হল না। সবাই বলল, বাবারে ওরা দু'জন মিলে বানাচ্ছে তাও এখনো হয় নি? দেখি কেমন করে বানাচ্ছে। সবাই দেখতে এলো।
সবাই বলল, ওমা এত সুন্দর হয়েছে। এ রকম ঘর আমরা কখনো দেখিনি। সবাই যার যার ঘর ভেঙে দিয়ে তুহিন আর জুঁই এর ঘর বানানো দেখতে এলো। সবাই তাদের ঘর বানানো দেখছে। সেখানে হৈ চৈ পড়ে গেল। পাড়ার বৌ ঝি - রা পর্যন্ত ছুটে এলো সেই ঘর দেখার জন্য।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
তুহিনদের গ্রামের মাঠ বা চরা অনেকটা ঢালু সাইজের। ফলে এক পাশে বর্ষা হলেও অন্য পাশে জাগো থাকে। সেখানে ঘাস এবং নানা ধরনের শাক লতা জন্মে থাকে। লোক জন সাঁতরে সাঁতরে গরু মহিষ ওপার দিয়ে আসে। অনেকে আবার নৌকায় তুলে ছাগল বা ভেড়া ওপার দিয়ে আসে। সারা দিন ঘাস খাওয়ার পর সন্ধ্যার সময় আবার যথা নিয়মে বাড়িতে নিয়ে আসে। ছোট ছোট ছেলে মেয়ে রা নৌকা নিয়ে বা পানি কম থাকলে জলে ভিজে ভিজে ওপার গিয়ে ওরনা বা গামছা দিয়ে মুছে। তার পর শাক তুলে বাড়ি ফিরে আসে।
সূর্য সবে পশ্চিমে হেলে পড়েছে। দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ। তুহিন একবার ঘরের ভেতর যাচ্ছে একবার বারান্দার রুমে যাচ্ছে। সে প্রহর গুনছে কখন মা ঘুমিয়ে পড়ে। মা থালি বাসন গুলো গুছিয়ে তারপর শুয়ে পড়ল। তুহিন ছোট দেখে একটা পাতিল নিয়ে ঘর থেকে বের হল। ঘাটে নৌকা নিয়ে সবাই অপেক্ষা করছে। আঁখি বলল তাড়াতাড়ি কর। তুহিন দৌড়ে এসে নৌকায় চড়ল।
আঁখি বিশাল একটা পাতিল নিয়ে এসেছে। তুহিন বলল, বাবারে এত বড় পাতিল। মনে হচ্ছে মাঠের সমস্ত শাক তুই তুলে আনবি। ইয়াছিন পাতিলটা নেড়েচেড়ে বলল, আমাদের মত মানুষ দুই চারটা এর মধ্যে রাখা যাবে। আঁখি বলল, তোদের মত ফকির না যে ঠোংগা নিয়ে যাবো। কথাটা তুহিনের গায়ে লাগল না কারণ সে পাতিল নিয়ে এসেছে। ইয়াছিন বলল, ফকির তুই না আমি। শরম করে না শাক তুলতে এত বড়... তুহিনের কথার কারণে তার কথা অর্ধেক পথেই আটকে গেল। তুহিন বলল, যে ঝগড়া করবে তাকে নামিয়ে দিয়ে যাবো। তারপর আর ঝগড়া হল না। কিন্তু ইয়াছিন অনেকটা পথ মন ভার করে রইল।
আর মাত্র দুই তিনটা ক্ষেত, তার পরেই শুকনো ক্ষেত। নৌকা আর যাচ্ছে না। ক্ষেতের আলে আটকে ধরেছে। তুহিন বলল, সবাই এবার নেমে পড়।
নৌকা আইলে ঠেকে ধরছে আর সামনে যাবে না। সবাই নেমে গেল। তুহিন একটা লাঠির সাথে নৌকাটি বেঁধে রাখল। না বাঁধলেও সমস্যা নেই কারণ তারা টেনে টেনে নৌকা আধ শুকনা আলে তুলছে।
সবাই হৈ চৈ করে শাক তুলছে। তারা সবাই ক্ষেতের যে জায়গায় শাক বেশি সে জায়গায় হাতের আঙুল দিয়ে দাগ কেটে বলল এটা আমার। কেউ এখানে আসবি না। কেউ যদি তার ভেতর থেকে তুলে তবে দু'জনার ঝগড়া বেঁধে যায়। তুহিন বলল, এই দেখ সবাই আঁখি খুব করে শাক তুলছে। সেই এক জায়গায় এসে বসেছে আর উঠছে না। সাথে সাথে জুঁই দৌড়ে আঁখির কাছে গেল। সবার উদ্দেশ্যে বলল, দেখ এই যে কত শাক। আয় সবাই দেখবি নাকি কত সুন্দর শাক। সবাই ছুটে এলো শাক দেখতে কিন্তু ইয়াছিন এলো না। সে আপন মনে শাক তুলেই যাচ্ছে। তুহিন বলল, ইয়াছিন ও মনে হয় ভাল শাক পেয়েছে। চল দেখে আসি। সবাই ইয়াছিনের দিকে ছুটল। আঁখি তুহিন কে পিছন থেকে টেনে ধরে আস্তে আস্তে বলল, দেখ ওই পাশে সুন্দর সুন্দর শাক। যা ওখান থেকে তোল। তুহিন দৌড় দিয়ে সেখান হতে শাক তোলা আরম্ভ করল।
তারা দৌড়াদৌড়ির সময় কোনো একজনের পাতিল হতে কিছু শাক ক্ষেতে পরে গিয়ে ছিল। পরে শাকিল সে টা নিতে গিলে জুঁই বলল, ও গুলো নিস না। ভূতে তুলে রেখেছে। ও গুলো নিয়ে খেলে পেটে অসুখ হবে। শাকিল ভয় পেয়ে গেল। সে আর নিল না।
গরু মহিষ ছাগল ভেড়া ঘাস খাচ্ছে। একেক জনের একেক ডাকে সারা মাঠ মুখরিত। যে সব গরু মহিষ অন্যকে তাড়া করে সে গুলোকে দড়ি দিয়ে খুটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। এই রকম একটা গরু দড়ি ছিঁড়ে এসে শাকিল কে তাড়া করল। শাকিল কোনো কিছু বুঝতে না পেরে দৌড়াচ্ছে আর জোড়ে জোড়ে কান্না করছে। সবাই বলল, দাঁড়া শাকিল। ভয় পাস না। গরু কিছু করবে না। শাকিল দৌড়াতে দৌড়াতে কান্না করতে লাগল। একটা বয়স্ক লোক এসে গরুটাকে ধরল। বলল, বাবা ভয় পেয়েছো? শাকিল মাথা নেড়ে জবাব দিল, হ্যাঁ। সবাই শাকিলের কাছে ছুটে এলো। বলল, ভয় পেয়েছিস? শাকিল আবার কান্না শুরু করল। তুহিন হাত ধরে বলল, কিছু হয় নি চল। আর কান্না করিস না। আঁখি গলা ধরে বলল, অমন করে দৌড়ালি কেন? না দৌড়ালে কিছুই হত না।
তার পর কেউ আর শাক তুলল না। সবাই বাড়ি ফিরে এলো।
পরের দিন সকাল বেলা। বরই তলায় সবাই উপস্থিত হল। জুঁই বলল, কাল কি কান্ডটাই না হল। আঁখি হাসতে হাসতে শাকিলের মাথায় টোকা দিয়ে বলল, সব এই বাঁদড়ের জন্য। গরু দেখে ও ভাবে দৌড়ালে তো গরু দৌড়াবেই। গরু মনে করে তার সাথে মজা করে গোল্লাছুট খেলা হচ্ছে। ইয়াছিন শাকিল কে বলল, তুই খুব ভয় পেয়েছিলি না? শাকিল বলল, গরু ও ভাবে তোর পিছে দৌড়ালে তুই ভয় পেতি না? ইয়াছিন বুক টান করে বলল, না। গরু আমায় ধাওয়া করতে সাহসই পেতো না। গরু কি সবাইকে ধাওয়া করে? লোক দেখে ধাওয়া করে। যারা ভয় পায় তোর মত তাদেরকে ধাওয়া করে। শাকিল বলল, ও ভাবে ধাওয়া করলে তুই বুঝতিস কেমন লাগে। জুঁই বলল, আমিও ভয় পেয়ে ছিলাম। বিশ্বাস নেই শাকিলকে রেখে যদি আবার আমায় ধাওয়া করে । লোকটা না এসে ধরলে কি যে হত? এবার তুহিন বলল, তোর মাথা হত। গরু তোকে খেয়ে ফেলতো? আঁখি বলল, তার থেকেও বেশি। সারা চরা গোড় পারাতো। তুহিন বলল, তাহলে কতই না মজা হত। ওই লোকটা এসেই তো সব শেষ করে দিল। জুঁই বলল, মজাতো হতই কিন্তু যাকে ধরতো তার বারোটা বেজে যেতো। আঁখি বলল, বাজলে বাজতো মজা তো হত। তখন সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পরে ইয়াছিন বলল, আজ গাছ টগা খেলবো। জুঁই বলল, না আজ ডাংগুলি খেলবো। তুহিন মুখ ভেঙিয়ে বলল, মেয়ে মানুষ হয়ে শখ কত? ডাংগুলি খেলবো। আজ জুতাচোর খেলা হবে। আঁখি সাথে সাথে খাপড়া দিয়ে একটা লম্বা দাগ দিল। তারপর নিজের জুতা খুলে সেই দাগে রেখে দিল। শাকিলও জুতা খুলে দাগে রেখে দিল। আঁখি জুঁইকে বলল, দে জুতা দাগে রেখে দে। খেলবি না? জুঁই জুতা দাগে রেখে দিতে দিতে তুহিনকে বলল, এবার তোর জুতা দে। তুহিন কিছু বলল না। আঁখি বলল, ও কবে জুতা দেয়। জুঁই বলল, জুতাচোর খেলার শখ আর নিজের জুতা দিবে না। তাই কোনদিন হয়? ইয়াছিন বলল, হবে না কেনো? এক জোড়া জুতা না হলে খেলা যাবে না? তুহিন বলল, ঝগড়া করতে হবে না। আজ খেলা বন্ধ। যা সবাই বাড়ি যা। এবার হেসে হেসে জুঁই বলল, এমনি বলছি। তোর জুতা লাগবে না। এবার খেলা শুরু কর।
তুহিন দলটাকে সমান দুই ভাগে ভাগ করল। আঁখি আজ তুহিনের দলে। ইয়াছিন তুহিন কে বলল, তোর দল মজবুত হয়েছে। জাবেদকে তোর দলে নিয়ে নিলুকে আমার দলে দে। তুহিন বলল, ভাগাভাগি করে যা হয়েছে তাই। যদি তোর ভাল না লাগে তাহলে তুই ভাগ কর। ইয়াছিন বলল, আবার ফিরে ভাগ করতে হবে কেন? শুধু জাবেদের পরিবর্তে নিলু কে দিলেই হবে। তুহিন বলল, তাহলে আমার পরিবর্তে তুই আয়। সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। ইয়াছিন চুপ করে রইল। জুঁই ইয়াছিনকে বলল, আমরা এ ভাবেই খেলবো। খেলায় হার জিত আছেই। ইয়াছিন বলল, নে এবার খেলা শুরু কর।
তুহিন টস দিতে গেলে ইয়াছিন বলল, তোরা সবাই মজবুত আবার টসও দেস। আমাদের আগগে দিলে হয় না। তুহিন বলল, সেই শুরু থেকেই মজবুত মজবুত করেই যাচ্ছিস। আমরা কোথায় মজবুত হলাম? প্রতিদিন এক দুইটা করে ফ্রি দিয়ে দেই আজ না হয় দেই নি। আঁখি তুহিন কে বলল, এ ভাবে ও কে বুঝানো যাবে না। দল পরিবর্তন কর। তাহলেই হয়ে যাবে। এবার তুহিন ইয়াছিনকে বলল, তুই আমার দল নি আর আমি তোর দল নেই। ইয়াছিন বলল, আচ্ছা। এবার টস দে।
টস দেয়া হলে ইয়াছিনের দল উঠল। নিলু দম দিল ছি...ছি...ছি...। ইয়াছিন চেঁচিয়ে বলল, প্রথম দমে কিন্তু জুতা আনা যাবে না। তুই তো শুধু ভুল করিস। তারপর দম দিল আঁখি- জাম ছি লতাপাতা আমার বাড়ি কলকাতা... জাম ছি লতাপাতা আমার বাড়ি কলকাতা... জাম ছি লতাপাতা আমার বাড়ি কলকাত্তা.....।
ইয়াছিন দম দিল - ছি কুত কুত ছিয়ালি.. লাইলি আমার মামানি.. মজনু আমার ভাই.. শখ করে বিয়ে দিয়ে মক্কায় যাই.. । তুহিন বলল, ধর ধর ও দম ফেলেছে। কেউ ধরতে পারল না। সে ঘরে ফিরে গেল।
এভাবে খেলতে খেলতে ইয়াছিনের দলের খেলা শেষ হল। শুরু হল তুহিনের দলের খেলা।
তুহিন জাবেদ কে বলল, নে প্রথম দম তুই দে। জাবেদ দম দিল - আলে তোর গালে কি টোব্বা টোব্বা সুপারি, মা কোনে গেছ উল্লাপাড়া আসবে কখন বিকেল বেলা, রানবে কে জোসনা খালা, খাবে কে দুলা ভাই শালা, শুইবে কোনে বাঁশতালা, বালিশ রাখবে কোনে কেততলা... বলতে বলতে দম ফুরিয়ে গেল। সে দৌড়ে ঘরে ফিরে এলো।
এবার তুহিন দম দিল- ঢাকার মাটি নড়েচড়ে বয়েম ফেটে পানি পড়ে... ঢাকার মাটি নড়েচড়ে বয়েম ফেটে পানি পড়ে... ঢাকার মাটি নড়েচড়ে বয়েম ফেটে পানি পড়ে... সে দুই হাতে দুইটা জুতা নিয়ে ঘরে ফিরে এলো। হৈ চৈ পড়ে গেল। ইয়াছিন বলল, হায় হায় রে দুইটা একবারে নিয়ে গেল।
এমনি এমনি করে সেদিনের খেলা চলতে লাগল।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
শৈশবের সেই কলাপাতার ঘর অনেক দামি। সেই কলাপাতার ঘরের শান্তি নেই যেন আর পৃথিবীর কোনো দালানে, নেই যেন কোনো টিনের চালার ঘরে। সেই শান্তি, সেই সুখ, সেই খেলা স্বর্গের চেয়েও দামি। শৈশবে যারা এই কলাপাতার ঘর বানিয়ে খেলেছে, একমাত্র তারাই পরবর্তীতে উপলব্ধি করতে পারে, সেই ঘরে কত খানি সুখ ছড়িয়ে ছিল। তারা আবার ফিরে পেতে চায় সেই ঘরের সুখ। হতে চায় সেই ছোট্ট ছেলেটি। কিন্তু তা আর কোনো দিনও সম্ভব হয়ে ওঠে না।
ভোরের সূর্য উঁকি দিল। তুহিনের দল কলাপাতার ঘর তোলার কাজে যার যার মত লেগে পড়ল।
তুহিন বাঁশ ঝাড়ে গিয়ে চিকন চিকন দেখে দুইটা বাঁশ কেটে আনল। সে জানে মোটা বাঁশ কাটলে মা বকা দিবে। মা কোথা জানি ছিল। এই মাত্র বাড়ি এল। সে বলল, দেখো ছেলের কান্ড- কাঁচা বাঁশ কেটে এনেছে। এ দিয়ে কিছু হবে? বাঁশ কি পাঁকতে দিবে না বাপু? পাঁকা বাঁশ কি নেই? সে গুলো কাটতে পারলে না? তুহিন বুঝতে পারল আর কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে মায়ের বকা আরো বেড়ে যাবে এবং তা চড় পর্যন্ত গড়াতে পারে? তাই সে বাঁশ দুটো কষ্ট করে কাঁধে নিয়ে বরই তলায় গেল। সেখানে দা দিয়ে ঠুক ঠুক করে বাঁশের গিট ছাড়াচ্ছে। আঁখি একবার এদিক ধরল আবার একবার ওদিকে ধরল। বাঁশটা ঘুরে ফিরে দু'জনে সব গুলো গিট ছাড়াল। তুহিন হয়রান হয়ে মাটিতে বসে পড়ল। আঁখি দৌড়ে গিয়ে কোথা হতে খড় এনে তুহিনকে বলল, নে পেরে বয়। তুহিন বলল, কোথা থেকে আনলি? এসে গালি দিবে না তো? আঁখি বলল, আমাদের খড় এনেছি। তার পর দু'জনে খড় পেরে বসে পড়ল।
ওদিকে ইয়াছিন, জুঁই ও শাকিল গেছে কলা পাতা কাটতে। যাওয়ার সময় জুঁই নৌকা একাই বয়ে নিয়ে গেল। কারণ কলা পাতা কাটা তার পক্ষে সাধ্য নয়। যা করতে হবে ইয়াছিন আর শাকিল কে। জুঁই অনেক গুলো কলা গাছের ধারে নৌকা ভিড়াল। যে পাতা গুলো নাগালে আসে সেই পাতা গুলো তারা কেটে নেয়। এক সময় জুঁই বলল, হাত ব্যথা হয়ে গেছে, আমি আর বাইতে পারবো না। এখন তোদের মধ্যে একজন আয়। ইয়াছিন বলল, পাতাও কাটতে পারবি না, নৌকাও বাইতে পারবি না তাহলে এলি কেন? জুঁই বলল, আর কতক্ষণ বাইতে হবে? সেই কখন এসেছি। ইয়াছিন বলল, আর কয়েকটা কেটেই যাবো। নে একটু জোড়ে বৈঠা চালা। ওই কলা গাছের ধারে নি তো? দেখ অনেক গুলো পাতা নিচে ঝুলে রয়েছে।
সেখান থেকে পাতা কাটতে আরম্ভ করল। বাড়ির ভেতর থেকে কে যেন বলল, কলাপাতা কাটে কে? জুঁই আস্তে আস্তে বলল, তাড়াতাড়ি চল। এখান থেকে ভাগি। কে যেন ডাক দিল। ইয়াছিন বলল, এই একটা খুব ভাল পাতা। ঘরের চালা ভাল হবে। এটা কেটেই এখান থেকে যাবো। এবার কলাগাছের খুব কাছে থেকে বলল, দাঁড়া তোদের চালা খিলাচ্ছি। ইয়াছিন জুঁইয়ের হাত থেকে বৈঠা নিয়ে খুব জোড়ে বাইতে লাগল। চলে গেল অন্য কলাবাগানে। সেখানে নৌকা ধরানোর আগেই বাড়ি থেকে এক লোক বলল, এখানে নৌকা ধরালে এই যে ( তারপর হাত দেখিয়ে বল ) একটা চড়। জুঁই বলল, এখানে নৌকা ভিড়াস না। ভাব তেমন ভাল না। নৌকা আবার চলল, অন্য বাগানের দিকে। শাকিল বলল, আর কোন বাগানে যাবি? ইয়াছিন বলল, আমার সাথে চল, গেলেই দেখবি। তারপর বাবুদের বাগানে গেল। সেখানে কেউ নাই। যত খুশি পাতা কেটে নৌকায় তুলল। শাকিল বলল, আগে এখানে এলে কত ভাল হত। এতক্ষণে কখন বরই তলায় যেতে পারতাম। পাতা গুলো নৌকায় ভাল করে সাজিয়ে তার পর ইয়াছিন বৈঠা ধরল। কিছুদূর যাওয়ার পর জুঁই বলল, নৌকা একটু হিজল গাছ তলায় ধরা। কত সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটে আছে। ইয়াছিন বলল, রাস্তা ঘাটে যা দেখিস তার জন্যই পাগল হয়ে যাস। সেই কারণেই তো আঁখি আর তোকে কোথাও নিয়ে যেতে চাই না। শাকিল বলল, নিয়ে চল। কত দেরি হল। এই টুকু সময় দেরি হলে কি হবে? না গেলে বাড়িতে গিয়ে বার বার শুধু হিজল ফুলের কথা বলে মুখে ফেঁনা তুলে ফেলবে। জুঁই বলল, কি এমন কাজ যে তার জন্য এত কথা।
আমার কাছে বৈঠা দে আমি বেয়ে নিয়ে যাই। ইয়াছিন বলল, থাক। আমি নিয়ে যাচ্ছি। জুঁই হিজল ফুল গুলো তুলল। সাথে শাকিলও তুলল। ইয়াছিন বলল, হিজল গাছের ঝোপের আড়ালে কিন্তু সাপ থাকে। খুব সাবধানে তোল। হঠাৎ করে একটা ঘুঘু ফুরুৎ করে উড়ে গেল। শাকিল বলল, দোস্ত দেখ ওই যে ঘুঘুর বাসা। ইয়াছিন বলল, কোথায়? শাকিল হাতের আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে দিল। ইয়াছিন গাছের গোড়ায় নৌকা ভিড়িয়ে লাফ দিয়ে গাছে উঠল। জুঁই বলল, খুব সাবধানে উঠিস। বাসা কিন্তু একেবারে পাতারি ডালে। ইয়াছিন বলল, যে খানেই হোক এখানে সমস্যা নাই। পড়ে গেলে সোজা পানিতে। কোনো ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা নাই। তারপর বাসা থেকে দুটি ডিম হাতে নিয়ে বলল, দেখ এই যে দুইটি ডিম। এ বাসার কথা কাউকে বলা যাবে না। যখন বাচ্চা হবে আমরা এসে নিয়ে যাবো। জুঁই বলল, এখন নাম। অনেক দেরি হয়ে গেল। ওরা মনে হয় টেনশন করছে। ইয়াছিন নেমে এসে শাকিলকে বলল, তুই একটু বৈঠা বেয়ে যা। আমি একটু পরে ধরি। জুঁই বলল, দে আমি বেয়ে যাই। কিন্তু একটা কথা শুনে রাখ- কচুরির পানার মধ্যে কিন্তু আমি নিতে পারবো না। আসার সময় খুব কষ্ট করে বেয়ে এসেছি। ইয়াছিন বলল, আচ্ছা এখন তুই বেয়ে যা। সেখানে আমি নিয়ে যাবো। তারপর শাকিল নিয়ে যাবে। এই রকম পালাক্রমে তারা বরই তলার ঘাটে আসতে লাগল।
নিলু আর জাবেদ নৌকা নিয়ে কোথা হতে যেন আসছে। নিলু বলল, দোস্ত বাড়িতে গিয়ে খেয়ে দেয়ে বরই তলায় যাবো। তুহিনদের সাথে ঝগড়া না করলে কিছুই ভাল লাগে না। আজ গিয়ে খুব করে ঝগড়া বাঁধাবো যেন সহজে না মেটে । জাবেদ বলল, ঠিক আছে। তারপর হেসে বলল, চল দোস্ত বাড়ি চল।
ইয়াছিনদের নৌকা ঘাটে ভিড়লে - তুহিন আর আঁখি এগিয়ে গেল। সবাই মিলে কলাপাতা গুলো নামাল। তুহিন ইয়াছিনকে উদ্দেশ্য করে বলল, যা তোদের ছোট শাবলটা নিয়ে আয়? ইয়াছিন বাড়িতে গেল শাবলের জন্য। আঁখি দড়ি আনার জন্য গেল। তুহিন বাঁশ দুইটা টুকরো করল, জুঁই নিয়ে নিয়ে এক জায়গায় জড়ো করে রেখে দিল। তুহিন জুঁই কে বলল, যা একটা ছোট দেখে শোলা নিয়ে আয়। ঘরের মাপ দিতে হবে। জুঁই চলে গেল শোলার জন্য। পরে তিন জন এক সাথে যার যার জিনিস নিয়ে ফিরে এলো। শাকিল বলল, তোরা ঘর বানা আমি ভাত খেয়ে আসি। খুব খেদে লেগেছে। আঁখি বলল, যা খেয়ে আয়। তুই কি কোনো কাজের? শাকিল বলল, ইয়াছিনের সাথে কলাপাতা কাটতে গিয়ে ছিল কে? আমি বুঝি সেখানে কিছু করি নাই। জুঁই বলল, যা তুই অনেক কিছুই করেছিস। যা তাড়াতাড়ি খেয়ে আয়। শাকিল যেতে যেতে বলল, আমি জানি এসে দেখি যে ঘর তোলা হয়ে গেছে। জুঁই বলল, যা তুই। এসে দেখবি ঘর তোলা হয়ে গেছে।
তুহিন জুঁই এর হাত থেকে শোলাটা নিয়ে এক হাত পরিমান রেখে বাকি টুকু ভেঙে ফেলে দিল। তারপর চারদিকে মাপ দিয়ে শোলা দিয়ে দাগ দিল। যে জায়গায় খুঁটি পোঁতা হবে সে জায়গায় গুন চিহ্ন দিয়ে দিল। ঘরের কাঠামো হল বাংলা ঘরের মত। কলাপাতা দিয়ে ছাউনি দেয়া হল। বেড়া দেয়াও শেষ হল। সবে খেলতে যাবে ঠিক তখনই কে যেন ঘাট হতে তুহিন বলে ডাক দিল। তুহিন সবার উদ্দেশ্যে বলল, ওই দেখ আমার মামা এসেছে। এই বলে ছুটে গেল ঘাটের কাছে। নৌকা ভিড়াল। তুহিন মামার হাত থেকে কি যেন নিয়ে মামার পিছু পিছু বাড়ির দিকে চলল। আঁখি, জুঁই, ইয়াছিন, শাকিল ওরাও পিছু পিছু চলল। বাড়িতে গিয়ে কিছুক্ষণ পরে আঁখি তুহিনকে বলল, চল এখন বরই তলায় চল। আর খেলবি না? তুহিন বলল, দেখছিস না আমার মামা এসেছে, আমি আজ খেলবো না। তোরা যা গিয়ে খেল। সবারই মন খারাব হয়ে গেল। তাকে ছাড়া কি খেলা জমবে। তার পর সবাই কিছুক্ষণ আনমরা হয়ে বরই তলায় বসে রইল। জুঁই বলল, আমার ভাল লাগছে না রে, আমি বাড়ি গেলাম। আঁখি বলল, আমারও ভাল লাগছে না।
তারপর ইয়াছিন কি ভেবে বলল, বাড়ি গিয়ে কি হবে? এর থেকে নে সবাই কুতকুত খেলি। আঁখি মন ভার করে কুতকুতের দাগ গুলোতে খাপড়া দিয়ে আবার একটু ছোঁয়া দিয়ে দিল। বলল, এখন শুরু কর? জুঁই প্রথমে প্রথম কোটে খাপড়া ফেলে এক পা উঁচু করে কুতকুত... কুতকুত... কুতকুত... করে দম দিয়ে খেলতে লাগল। চতুর্থ কোটে যাওয়ার পর ইয়াছিন বলল, জুঁই মরা। দাগ পারিয়েছে। তারপর খেলল আঁখি। সে মরা গেলে খেলল ইয়াছিন। এভাবে সে দিনের খেলা চলল।
কিন্তু খেলায় তেমন কোন মজা না পাওয়ায় প্রতিদিনের মত বেশিক্ষণ খেলা টিকলো না।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
বর্ষার জল অনেক কমে গেছে। ইয়াছিন তুহিনকে বলল, কাল শেষ রাতে বিলে মাছ ধরতে যাবো। শাকিল বলল, আমায় নিবি না? তুহিন বলল, অত সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারবি? শাকিল বলল, হ্যাঁ, তোরা যদি পারিস, আমি পারবো না কেনো? ইয়াছিন বলল, আচ্ছা দেখা যাবে। ও পাড়ার জাবেদ বলল, আর কে কে যাবে? নিলু কে বলবো? ইয়াছিন বলল, তোকেই নিয়ে যাই কিনা তাই দেখ, আবার নিলুর কথা বলছ। আঁখি বলল, আমিও যাবো তোদের সাথে। জুঁই বলল, আমিও। তুহিন বলল, তোদের নিয়ে গেলে মাছ সব শুকনায় এমনি এমনি লাফিয়ে লাফিয়ে উঠবে। ঘোড়ার ডিম কোথাকার। আঁখি বলল, আমরা জলে নামবো না তো নৌকার উপর থেকে শুধু পাতিল রাখবো। ভাগ দিবি না আমাদের? তুহিন বলল, আচ্ছা আগে আমাদের সাথে চল তো পরে দেখা যাবে। ইয়াছিন বলল, দেখি কাল সকালে কে কে আগে ঘুম থেকে উঠে।
রাত প্রায় শেষ। বহুদূরে ফজরের আযান দিচ্ছে। খুবই ধীরে ধীরে শোনা যাচ্ছে। শাকিলের ঘুম ভেঙে গেল। সে ধীরে ধীরে উঠে তুহিনদের বাড়িতে যাচ্ছে, এমন সময় দেখে কে যেন আলো হাতে আসছে। শাকিল ভয় পেয়ে গেল। ভূত নয় তো? ভয়ে টিনের বেড়ার সাথে লেপটে থাকল। জাবেদ আর নিলু এসে তুহিনকে জোড়ে জোড়ে ডাক দিতে লাগল। তখন শাকিল বুঝতে পারল ভূত নয় নিলুরা এসেছে। সে দ্রুত তুহিনদের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিলু বলল, তুইও যাবি নাকি মাছ ধরতে?
শাকিল আমতা আমতা করে বলল, হ্যাঁ। কারণ সে জানে নিলু আর জাবেদ গেলে তাকে নেবে না। তুহিন দরজা খুলে বলল, ইয়াছিন কই? নিলু বলল।, রাখ তোর ইয়াছিন। এই বলে জাল কাঁধে নিয়ে বলল, আয় তাড়াতাড়ি আয়, ধোয়া হয়ে গেল। তুহিন বলল, তুই আমার জাল রাখ। নিলু বলল, ভাল কথাতো বলতে নাই। তুহিন বলল, ভাল কথা বলতে হবে না? আমরা তোকে আমাদের সাথে নিবো না? তুই বাড়ি যা। নিলু বলল, তুই আমার মুখের উপর এত বড় কথা বলতে পারলি? তুহিন বলল, বেশ করছি। তুই আমার জাল রাখ। নিলু জাল ঢিল মেরে ফেলে দিয়ে বলল, জাল আর দেশে কারো নাই। হুম! জালের বড়াই কত? গেলাম দেখি আমার জিনিস তোর আর কোনো দিন লাগে নাকি? সে দিন দেখাবো মজা। এর মধ্যে ইয়াছিন এল। সে বলল, এই সকালে অন্য পাড়া থেকে এসে ঝগড়া করতে তোর শরম করে না? নিলু জাবেদ কে বলল, আয় যাই। তারা তুহিন আর ইয়াছিন কে ধীরে ধীরে গালি দিতে দিতে চলে গেল।
শাকিল বলল, আঁখি আর জুঁই কে ডাক দিবো? তুহিন বলল, ঝগড়া দিয়ে আজকের দিনটা শুরু হল। সারা দিন যে কি হবে তাতো বুঝতেই পারছি। আমরা নৌকায় গিয়ে বসি। তুই যা ডাক দে। শাকিল -আঁখি আর জুঁইকে ডাক দিতে গেল। তুহিন বলল, আজ এ বছরের প্রথম বিলে যাচ্ছি, মাছ তো মিলবে না জানি। তবু চল ঘুরে আসি। ইয়াছিন বলল, হ্যাঁ আজকে তো মাছ ধরতে যাওয়া না, শুধু ঘুরতে যাওয়া। শাকিল ঘুরে এসে বলল, ওরা এমনি বলেছে। এত সকালে বিলে যাবে না। ইয়াছিন বলল, চল এখন যাই। পরে এসে দেখাবো ওদের মিথ্যা বলার সাজা। শুধু শুধু এত সময় নষ্ট হল। এতক্ষণে বিল পাই কখন। শুধু ওদের জন্যই এত দেরি হল।
তুহিনরা বিলে যাচ্ছে। রাসেল বলল, এত সকালে তোরা কোথায় যাস। তুহিন আস্তে আস্তে বলল, এই তোরা চুপ করে বসে থাক। তার পর জোড়ে বলল, এই তো সামনেই। রাসেল বলল, নাম নাই, সামনে কোথায়। তুহিন বলল, নিলুদের বাড়িতে। রাসেল বলল, আচ্ছা যা।
বিলের পানি তখন ও কমে নাই। তাদের পক্ষে সেখানে মাছ ধরা সাধ্য না। তবুও বিলের ধার দিয়ে অনেকক্ষণ জাল ফেলে মাছ ধরতে চেষ্টা করল। কয়েকটা মাছ ধরল। তারপর তুহিন বলল, চল যাই। এভাবে মাছ ধরা যাবে না। আবার কয়েক দিন পরে আসবো। ইয়াছিন বলল, ঠিক আছে চল। সবাই বাড়ি ফিরে এলো।
আঁখি আর জুঁই তাদের ফেরার অপেক্ষায় ঘাটে বসে ছিল। আঁখি বলল, ওই দেখ আসছে। আমাদের জেলে রা আসছে। নৌকা ঘাটে ধরানোর সাথে সাথে আঁখি পাতিলটাতে চোখ মেলে দেখে বলল, ওরে বাবা, এত মাছ আমি কখনো এক সাথে দেখি নি। তুহিন বলল, আর মিতালি করতে হবে না। এখন সর, আমায় নামতে দে। তুহিনের মা এল। বলল, দেখি বাবারা কি রকম মাছ এনেছো। পাতিল দেখে বলল, এত সকালে গিয়ে এই মাছ। তুহিন বলল, মা -বিলে এখনো পানি অনেক। কয়েক দিন পরে গেলে মাছ ধরা যাবে। মা বলল, থাক বাবা আর যেতে হবে না। এখন সুন্দর করে গোসল করে এসো।
বিকেল বেলা বরই তলায় আঁখি বলল, পাড়ায় তো থাকা যাচ্ছে না। মাছ মারতে গিয়ে শুধু পাতিল ছাড়া আর কিছু নিয়ে আসি নি। তুহিন বলল, এই সময় আবার কে মাছ মারতে পারে? আঁখি বলল, নিলু বলে অনেক মাছ মেরেছে। তুহিন বলল, তাহলে চল দেখি আসি। তারপর বরই তলা ছেড়ে সবাই নিলুদের বাড়িতে গেল। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পেল সে একটা মাছও মারে নি। নিলুর মা বলল, এমন ছেলে কোথাও আছে? মাছ মারতে গিয়ে একটা মাছ নিয়ে আসতে পারে না। আঁখি বলল, আমার দাদি বলল- নিলু এক পাতিল মাছ মেরেছে। নিলুর মা বলল, ওই তো বললামই তো এক পাতিল নিয়ে এসেছে। পরে গালি দেওয়াতে বাড়ি থেকে চলে গেছে। সবাই খুঁজছে। তোমাদের পাড়াতেও গিয়েছিল। কোথাও নেই। তোমরা জানো না? ইয়াছিন বলল, না। নিলুর মা বলল, সেই যে ছেলেটা বাড়ি থেকে গেল, আর আসছেও না । জুঁই বলল, দুপুরে খেতেও আসে নি? নিলুর মা বলল, না। তুহিন বলল, ও তো আমাদের ওখানেও নেই। তাহলে কোথায় গেল? আঁখি বলল, চল জাবেদদের বাড়িতে যাই। ওখানে গেলে হয়তো ওকে পাওয়া যেতে পারে। কারণ ও তো জাবেদের সাথেই বেশি সময় কাটায়। তারপর সবাই জাবেদদের বাড়িতে গেল।
জাবেদ জাবেদ বলে তারা বাহির উঠান থেকে ডাক দিল। জাবেদের মা বাইরে এসে বলল, জাবেদ সেই সকালে বেড়িয়েছে, এখন অবধি খবর নেই। সবাই কত করে খুঁজছে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তোমাদের ওখানে যায়নি? তুহিন বলল, না চাচি। নিলু কেউ পাওয়া যাচ্ছে না সেই সকাল থেকে। মনে হচ্ছে ওরা যে খানেই থাকুক এক সাথেই আছে। আঁখি বলল, চল যাই। কুঠির পাড়ে যাই। মাঝে মাঝে ওরা ওখানে যায়। তুহিন জাবেদের মাকে বলল, আমরা কুঠির পাড়ে গেলাম। যদি ওখানে ওদের পাই। জাবেদের মা বলল, যাও। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। সবাই কুঠির পাড়ের দিকে রওনা দিল।
নিলু আর জাবেদ আম গাছের নিচে সবুজ গাছের উপর চার হাত পা মেলে শুয়ে আছে। জাবেদ বলল, সকাল থেকে বিকাল হয়ে গেল। কেউ তো আমাদের খুঁজতে এলো না। নিলু বলল, আমরা এত দূরে আছি, কেউ কি জানে? সবাই হয়তো আশে পাশে খুঁজছে। জাবেদ বলল, এত রাগ করা ঠিক হয় নি। বাড়ি ফিরে চল। নিলু বলল, তুই গেলে যা। আমি কখনও বাড়ি যাবো না। এত গালি শুনে আমি আর বাড়ি যাবো না। জাবেদ বলল, আমার খুব খিদে পেয়েছে। এভাবে আর ঘাসের উপর কতক্ষণ শুয়ে থাকবি? নিলু বলল, চুপ করে থাক। শালা তোর জন্যই সব হয়েছে। তুই মাছ মারার কথা বললি দেখেই না গেলাম। আর দুই একটা মাছ মেরে ছিলাম সেটাও তুই পাতিল ফেলে দিয়ে মাছ ভাসিয়ে দিলি। পাতিল রাখার মুরাদও হয় না। বড় বড় কথা মাছ মারতে যাবো। এখন হল তো মাছ মারা। মাছ মারার সাধ বের হল তো। জাবেদ বলল, এত কিছু হবে জানলে কি আর মাছ মারতে যেতাম। নিলু বলল, শালা তাহলে চুপ করবি না? জাবেদ মুখ বুঝে রইল।
কিছুক্ষণ পরে তুহিন, ইয়াছিন, জুঁই, আঁখি কুঠির পাড়ে এলো। তারা বলল, তোদেরকে সবাই এত করে খুঁজছে, আর তোরা এত দূরে এসে রয়েছিস। আঁখি বলল, আমি না বললেতো কেউ এখানে আসতো না। তোরা কি রাতে এখাই এভাবে শুয়ে থাকতি? নিলু বলল, এখানে শুয়ে থাকলে কি হবে? তুহিন বলল, এখন বাড়ি চল। সবাই খুঁজছে। দুপুরে কি খেয়েছিস? জাবেদ বলল, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু হাওয়া খেয়েছি। নিলু জাবেদ কে দমক দিয়ে বলল, চুপ কর। তারপর ধীরে ধীরে বলল, শালা পাগলের দল এসেছে আমায় নিতে। তুহিন বলল, কি বললি আমরা পাগলের দল? থাক তুই এই খানে। আমরা গেলাম। তোর আব্বাকে পাঠিয়ে দেই। পিঠের চামড়া আর পিঠে রাখবে না। আঁখি বলল, ভাল বুঝে এলাম তো, আর গালি দেয়া হচ্ছে। নিলু বলল, তোদের চেনা আছে। যা তোরা।
সবাই বাড়ির দিকে রওনা দিল। আগে জাবেদদের বাড়িতে উঠল। জাবেদের মাকে বলল, ওরা কুঠির পাড়ে শুয়ে রয়েছে। আমাদের সাথে এলো না। জোড় করাতে গালি দিতে আরম্ভ করল। তাই রেখে এলাম। তারপর নিলুদের বাড়িতে এলো। নিলুর মা কান্না করছে। নিলুর আব্বা চিৎকার করে বলছে, শালি আমার ছেলে সেই সকালে তোর ভয়ে বাড়ি থেকে গেছে। তাড়াতাড়ি খুঁজে নিয়ে আয়। লাঠি দিয়ে আবার আঘাতের পর আঘাত করল। নিলুর মা খুব জোড়ে জোড়ে কান্না করতে লাগল।
নিলুর আব্বাকে সবাই ভয় পায়। খুব গরম মানুষ। আঁখি ধীরে ধীরে বলল, কাকা নিলু আর জাবেদ কুঠির পাড়ে গেছে। নিলুর আব্বা দমকের স্বরে বলল, কোথায় গেছে? আঁখি ভয়ে আর কোনো কথা বলল না। এবার তুহিন বলল, ওরা রাগ করে কুঠির পাড়ে গেছে। আমরা অনেক ডাকলাম কিন্তু এলো না। নিলুর আব্বা এবার স্বাভাবিক হয়ে বলল, এইতো দেখো পাগল ছেলের কান্ড। পাশেই ফুফুর বাড়ি। রাগ উঠেছে ফুফুর বাড়ি যা। তারপর বলল, মায়ের যে রকম বুদ্ধি ছেলের আবার কি হবে?
ঝগড়া শেষ হওয়ার আগেই তুহিন, ইয়াছিন, জুঁই , আঁখি বাড়ি ফিরে এলো।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
রমজান মাস। সকাল বেলা তুহিন, ইয়াছিন, জুঁই, আঁখি, শাকিল, নিলু, জাবেদ, শারমিন, রানা, মারুফা, সবাই বরই তলায় বসে আছে। তুহিন বলল, আজ কে কে রোজা আছো? হাত তোল? সবাই হাত তুলল। কিন্তু নিলু হাত তুলে তাড়াতাড়ি নামিয়ে ফেলল। আঁখি বলল, নিলু মনে হয় রোজা নাই। সবার দেখা দেখি হাত তুলেছে। ওকে দেখেই বোঝা যায়। শাকিল বলল, এখনই কি বোঝা যাবে? সবে তো সকাল। আর দুই ঘন্টা পরে হাত তুলতে বললে দেখা যাবে অর্ধেকটি নাই। নিলু বলল, আমার সকালে পানি খাওয়ার অভ্যাস। শেষ রাতে ভাত খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ছি। ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধোয়ার সময় পানি খেয়েছি। মা বলল, মনের ভুলে খেলে কিছু হয় না। তুহিন বলল, হ্যাঁ ঠিকই তো বলেছে, মনের ভুলে কিছু খেলে কিছু হয় না।থাক রোজা হবে।
সবাই রোজা। সবাই ঘনঘন থুতু ফেলছে। কারণ তাদের ধারনা লালা গিলে ফেললে রোজা ভেঙে যাবে। বরই তলা আর বরই তলা নাই। যেন থুতুর বসবাস। এ পরিমান থুতু ফেলেছে যে দেখলে সুষ্ঠু মানুষ সেখান দিয়ে ঠিক ভাবে যেতে পারবে না।
মসজিদ থেকে ইয়াছিনের দাদা বরই তলায় দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় দেখল এই সব কান্ড। তিনি বললেন এখনকার ছেলেপেলে এত পঁচা থুতু ফেলে কি করেছে। ইয়াছিন বলল, কি বললে দাদা? আমরা পচা নয়। আমরা সবাই রোজা। তুমি পচা। থুতু এলে ফালাচ্ছ না গিলে ফেলছো। দাদা বলল, ও এই কথা। তোমরা সবাই রোজা। খুব ভাল, খুব ভাল। তিনি চলে গেলেন।
শাকিল এর মধ্যে বাড়ি গিয়ে ছিল। সে এসে বলল, আমার রোজা হালকা হয়ে গেছে। জুঁই বলল, কেন? কিছু খেয়েছিস? শাকিল বলল, না। কিছু খাইনি। উঠানের মাঝ খানে মা বাঁশের কুঞ্চি শুকাতে দিয়েছে। সেখান দিয়ে যাবার সময় কুঞ্চির সাথে হোঁচট লেগে পা কেটে গিয়ে রক্ত বের হয়েছে। তুহিন বলল, সমস্যা নাই। তুই তো আর ইচ্ছে করে করিস নি। নিলু বলল, আমিও তো ইচ্ছে করে পানি খাইনি। তখন শারমিন বলল, আমি আজ রোজা থাকবো না। কাল থেকে থাকবো। খুব গলা শুকিয়ে গেছে। সবাই হেসে উঠল। জাবেদ বলল, এই সকালেই গলা শুকিয়ে গেছে। চল গাঙে চল। পানি খাইয়ে নিয়ে আসি। শারমিন কিছু বলল না। চুপচাপ বাড়ি চলে গেলো। জাবেদ নিলুকে বলল, চল বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। আঁখি বলল, বাড়িতে কি কাজ আছে? এখনই কেনো যাবি? জাবেদ বলল, অনেকক্ষণ হল এসেছি মা বকা দিবে। জুঁই বলল, যা। আবার বিকেলে আসিস। নিলু বলল, আচ্ছা।
দুজনে বাড়ির দিকে যেতে লাগল। নিলু বলল, তুই কি রোজা থাকবি না ভেঙে ফেলবি। জাবেদ জোর গলায় বলল, অবশ্যই থাকবো। আজ প্রথম রোজা। না থাকলে কেমন হয়। নিলু বলল, আমার প্রথম রোজাটাই হালকা হয়ে গেল। কি কারণে যে পানি খেতে গেলাম। সবাই রোজা আছে। শাকিলও বাদ যায় নি। জাবেদ বলল, ওর আর রোজা থাকা। পা কেটে রক্ত বের হলে কি আর রোযা হয়? হালকা রোজার কি আর দাম আছে? নিলু কিছু বলল না, কারণ তারও রোজা হালকা হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে নিলু বলল, হালকা রোজার যদি দামই না থাকে তাহলে আর শুধু শুধু না খেয়ে থাকবো না। জাবেদ বলল, একেবারেই যে দাম নেই তা তো না। দাম আছে কিন্তু একটু কম। নিলু বলল, একটু কম না হয়। আজ ভাঙা যাবে না। প্রথম রোজা না হলে ভেঙে ফেলতাম। হাসু পথ আটকে বলল, কি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা হচ্ছে। নিলু বলল, তুই কি রোজা রেখেছিস? হাসু মন খারাব করে বলল, না রে দোস্ত। মা শেষ রাতে ডাক দেয় নি। শেষ রাতে না খেয়ে কি ভাবে রোজা থাকবো। নিলু বলল, একটা না থাকলে কি হবে? কাল থেকে থাকিস। হাসু বলল, মা কে খুব করে বলেছি, কাল যেন ডাক দিতে ভুল না করে। নিলু বলল, কোথায় যাচ্ছিলি যা। হাসু চলে গেল। নিলুরা আবার বাড়ির দিকে পথ ধরল।
এ দিকে বরই তলার আসর ভেঙে গেল। সবাই যে যার বাড়ি চলে গেল। যাবার সময় আঁখি বলল, কেউ যেন রোজা না ভাঙে। আজ যে প্রথম রোজা।
বিকেল বেলা বরই তলায় আবার আসর বসল। আঁখি সকালের ন্যায় আবার বলল, কে কে রোজা আছো? হাত তুলে দেখাও। তুহিন, ইয়াছিন, আঁখি আর শাকিল ছাড়া আর কেউ হাত তুলল না। আঁখি রেগে গিয়ে জুঁই কে বলল, তোর কি হয়েছে রোজা ভাঙলে কেন? জুঁই বলল, আমার কি দোষ। মা তক্তার উপর বিস্কুটের পেকেট রেখে দিয়ে ছিল। আমার রোজার কথা খেয়াল ছিলা না, বিস্কুটের পেকেট নিয়ে খেতে খেতে বাইরে এসেছি তখন মা বলল, রোজা কখন ভাঙলে। রোজার কথা শুনে চুমকে উঠলাম। মুখের ভেতর যে বিস্কুট ছিল ফেলে দিলাম। ভাল করে কুলি করলাম। কিন্তু দাদি হেসে হেসে বলল, খেয়ে দেয়ে রোজা। এ যেন খাওয়ানি রোজা। রোজা থাকতে পারে না, রোজা থাকবো বলে চেঁচিয়ে কাল সারা দিন বাড়ি মাথায় করে ছিল। আজ কি হল? সব গোল্লায় গেল তো? দেখলাম এভাবে রোজা হবে না। তাই পরে ভাত খেয়ে নিলাম। রোজা না হলে শুধু না খেয়ে থাকার কোনো মানে নাই।
নিলু বলল, আমি সবার কথায় আর থাকতে পারলাম না। কেউ বলে রোজা হবে কিন্তু হালকা। আবার কেউ হেসে বলে, খেয়ে রোজা। তাই দেখলাম, মনের ভুলে যখন খেয়েই ফেলেছি কি আর করা, রোজা যেহেতু হবে না, না খেয়ে থেকে কি লাভ? তাই পরে রিতিমত খাওয়া শুরু করলাম। আঁখি বলল, রোজার দিনে খেলে কি হয় জানিস? শাকিল বলল, আমি জানি। টয়লেটের ঘু খাওয়া হয়। নিলু অক পারতে পারতে একটু দূরে গেল।
আঁখি জাবেদ কে বলল, তুই কখন ভেঙেছিস? জাবেদ বলল, আমি তো সেই সকালে ভেঙেছি। দেখলাম এত বড় দিন, আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না। তাই খিদায় কষ্ট না করে সকাল সকালই খেয়ে ফেলেছি। শাকিল বলল, তুই তো ভাল কাজ করেছিস। তুই তো খুব চালাক। আঁখি বলল, অতিচালাকের গলায় ধরি। ওর একটু ও নেকি হয়নি। সবারই তাও কম বেশি নেকি হয়েছে। কারণ কেউ তোর আর ইচ্ছে করে খায় নি। জাবেদ বলল, আমি সত্য কথা বললাম আর আমার নেকি হল না। আর ওরা সব বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলল, ওদের নেকি হল। আঁখি বলল, ওরা কি মিথ্যে বলেছে? জাবেদ বলল, খিদায় কুলাতে পারে নাই তাই খেয়েছে, তা বলা বাদ দিয়ে সবাই বলল, মনের ভুলে খেয়ে ফেলেছি। এ আবার কেমন কথা হল? সবাই সাধু সেজে বসে রইল। আর আমি চোর হয়ে গেলাম। ইয়াছিন বলল, এই বলতে বলতে বেশি বলে ফেললি? তোকে আমরা কখন চোর বললাম? তখন, নিলু জাবেদ কে বলল, রোজা ভেঙেছিস ভাল কথা। এত কথা বলিস কেন? চুপ থাক। রোজা থাকার মুরাদ হয় না শুধু শুধু কথা। জাবেদ বলল, তাতে মনে হয় নিজে রোজা আছে। নিজে না রেখে আবার অন্যকে শাসন করে। তুহিন বলল, তোরা সব চুপ কর। রোজা থেকে বেশি কথা বলতে পারবো না। যারা রোজা নাই তোরা সবাই বাড়ি চলে যা। তোদের পেটে ভাত আছে। তোরা সারা দিন কথা বললেও কিছু হবে না। যা তোরা সবাই চলে যা। সবাই চলে যেতে লাগল। তুহিন জুঁইকে ডাক দিয়ে বলল, আয় শুনে যা। সে মুখ ভেঙিয়ে চলে গেল। আঁখি বলল, চলে যাচ্ছে যাক আবার ওকে ডাকতে গেলি কেনো? তুহিন বলল, ওর কাছে যে লুডুর গুটি আছে? সময় তো যাচ্ছে না। লুডু খেলতে খেলতে যদি সময়টা কেটে যায়। ইয়াছিন বলল, তোর খুব রোজা লেগেছে তাই না? তুহিন বলল, তাতো লেগেছেই। তা তুই জানলি কি করে? ইয়াছিন বলল, এই যার হাতে ঘড়ি দেখছিস তাকেই বলছিস কয়টা বাজে। তাই বললাম। আঁখি বলল, দাঁড়া আমার লুডু নিয়ে আসি। ওর কাছে চাওয়া আর ঠিক হবে না। যে ভাবে মুখ ভেঙিয়ে চলে গেল। তুহিন বলল, আমি কি ওকে গালি দিয়েছি। আর ওকে তো একা বলি নাই। সবাইকেই তো বললাম, যারা রোজা নাই তারা চলে যা। কেউ তো রাগ করল না। ও একা রাগ করল কেনো? আঁখি বলল, আমি অত বুঝি না। থাক লুডু নিয়ে আসি। তুহিন বলল, তোর লুডু তো ছেঁড়া। ইয়াছিন বলল, না হয় ছেঁড়া। আনতে চাচ্ছে আনুক। আঁখি বাড়ি চলে গেল।
তুহিন, ইয়াছিন, আঁখি আর শাকিল চার রোজাদার লুডু খেলতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে বাকিরা মাঝে মাঝে বরই তলায় উঁকি মেরে দেখতে লাগল ওরা কি করছে। জুঁই বলল, সবাই কে তাড়িয়ে দিল। (তাদের দলের নেতা এখন জুঁই।) জুঁই জাবেদ কে বলল, দেখে আয় তো ওরা ওখানে কি করে? জাবেদ বলল, আমি যেতে পারবো না? নিলু কে বল? কিছুক্ষণ পর নিলু তাদের পাশ দিয়ে অন্য জায়গায় যাওয়ার ঢঙ ধরে বলল, এভাবে খেলে খেলে যদি রোজা হত তাহলে সবাই লুডু কিনে কিনে খেলতো আর সময় চলে যেত। আঁখি বলল, তুই গেলি এখান থেকে। নিলু বলল, তোদের রোজা হালকা হয়ে গেছে। সে দিন মাদ্রাসায় হুজুর বলল, শুনিস নাই? রোজা রেখে টিভি দেখা, গান শোনা নিষেধ। তুহিন বলল, হ্যাঁ বলেছে। কিন্তু খেলার কথা তো আর বলে নাই। যা যা এখান থেকে যা আর জ্ঞান দিতে হবে না। নিলু বলল, যাই সবাই কে গিয়ে বলি ওরা লুডু খেলছে, ওদের রোজা হালকা হয়ে গেছে। তুহিন রেগে গিয়ে বলল, তুই এখান থেকে যাবি নাকি? এই বলে তেড়ে নিলুকে মারতে গেল। ইয়াছিন বলল, আয় রোজা থেকে মারামারি করতে নেই। তুহিন বলল, যা তুই। আজ ছেড়ে দিলাম। যে রাগ তুলছিলি রোজা না থাকলে তোর নাক ফাটিয়ে দিতাম। নিলু বলল, তুই কি করতে পারিস দেখা আছে? আঁখি বলল, যা তুই। পরে দেখা যাবে ও কি করতে পারে আর না পারে। নিলু চলে গেল।
জুঁই হাসি মুখে নিলু কে বলল, রোজাদারেরা ওখানে কি করছে? নিলু বলল, পন্ডিত আছে না ওখানে? কি আর করবে ওরা। কিভাবে দ্রুত সময় চলে যায় সেই কাজটাই করছে। জুঁই বলল, তুহিনের মত কথা পেচিয়ে পেচিয়ে বলছিস কেনো? কি করছে তাই বল? নিলু বলল, ওরা লুডু খেলছে। জুঁই বলল, লুডু খেলছে মানে? লুডু তো আমার কাছে। এই বলে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে গেল। মাচার উপর উঠে দেখল লুডু তো ঠিকই রয়েছে। তাহলে ওরা লুডু পেলো কোথায়?
ইফতারের আর কিছু সময় বাকি আছে। তুহিন, ইয়াছিন, আঁখি ও শাকিল যার যার বাড়িতে সবার সাথে ইফতার নিয়ে বসে আছে। জুঁই, শারমিন, মারুফা, রানা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে লাগল। দেখতে লাগল কাদের বাড়িতে কেমন ইফতার হয়েছে। হৈ চৈ করে করে এবার ও বাড়ি যেতে লাগল। ইয়াছিনের দাদা বলল, এদের জ্বালায় ঠিক ভাবে ইফরারও করা যাবে না।
ইফতারের সময় হল। সবাই ইফতার করল। তুহিন, ইয়াছিন, আঁখি, শাকিল ইফতার করে বরই তলায় এলো। সবার মুখেই হাসি। তারা বলল, আমাদের তাও একটা রোজা হল। আর সবাই ফাক্কা।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
তুহিন তার দল নিয়ে বরই তলায় গোল্লাছুট খেলছিল। বৈশাখের এই তীব্র গরম তাদের খেলা বন্ধ করতে পারে নি। সবাই গরমে এমন ভাবে ঘেমে গিয়েছে, দেখে যেন মনে হয় গাঙ থেকে সবে গোসল করে এসেছে। অনেকে চেয়ার পেতে সেই খেলা দেখছে। ইয়াছিনের দাদি বলল, এই তোরা এবার খেলা বন্ধ কর। এত গরমের মধ্যে খেলে তোরা কি মরবি নাকি? তারপর সে বলতে বলতে গেল, এত গরম পড়ছে আজ বুঝি ঝড় ওঠে ? ঝড় দেখে তো যে ভয় হয়। ঘর দুয়ারের যে অবস্থা।
খেলতে খেলতে সবারই কম বেশি পানি তৃষ্ণা পেল। আঁখি বলল, সবাই জিরিয়ে নেই। খুব গলা শুকিয়ে গেছে । তুহিন বলল, আর কিছুক্ষণ পরে বিরতি দেয়া হবে। আমাদের পালা যাক। জুঁই আজ তুহিনের দলে। জুঁই বলল, তোদের পালা দিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের পালা দিয়ে শেষ হবে। ইয়াছিন বলল, নে তাহলে তাড়াতাড়ি খেল। আমারও গলা শুকিয়ে গেছে। তারপর কিছুক্ষণ খেলা চলল। তুহিন বলল, এখন সবাই জিরিয়ে নেই। শরীর থেকে মনে হয় তিন কেজি পানি বের হয়ে গেছে। আঁখি দৌড়ে গিয়ে পানি খেয়ে এলো। তুহিন বলল, এই কেউ ঘামা গায়ে পানি খাস না। আব্বু বলছিল ঘামা গায়ে পানি খেলে স্বরদি জ্বর হয়। কিছুক্ষণ এখানে বসে থাক। তার পর যা খাওয়ার খেয়ে নি। জুঁই বলল, এখানে ডাক্তারি করিস না তো? চল চল চল সবাই পানি খেতে চল। গলা শুকিয়ে গেছে পানি খাবো না কি করবো? সবাই বলল, না আমরা জিরিয়ে তারপর পানি খাবো। তোর বেশি পানি তৃষ্ণা লাগলে যা আঁখির মত খেয়ে আয়। জুঁই বলল, ঠিক আছে। তোরা যখন খাবি না। তাহলে আমিও খাবো না। তোদের সাথে এক সাথেই খাই। তুহিন বলল, বেশি গলা শুকালে যা খেয়ে নি। কষ্ট করতে হবে না। একদিন খেলে কি হবে? জুঁই পানি খেতে গেল।
কিছুক্ষণ পরে জুঁই এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে ফিরে আসতে লাগল। কিছু দূর থাকা কালে তুহিন জুঁই এর পথের দিকে তাকালে, জুঁই গ্লাসটা দেখিয়ে মাথাটা নিচের দিকে ঝাকিয়ে বলল, আয়। তুহিন এগিয়ে যেতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে ইয়াছিন বুঝতে পেরে দৌড়ে গিয়ে জুঁই এর কাছ থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে নিল। তারপর ঢকঢক করে পুরো গ্লাস পানি খেয়ে ফেলল। ইয়াছিনের যাওয়া দেখে তুহিন আর এগুলো না। সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। জুঁই আবার গ্লাস নিয়ে বাড়ির ভেতর গেল। পানি নিয়ে ফিরে আসছে শাকিল দৌড়ে যেতে লাগল। জুঁই বলল, কাজ হবে না। বাড়ির ভেতর গিয়ে খাও। শাকিল বলল, ইয়াছিন কে দিলি আর আমাকে দিবি না? জুঁই বলল, ইয়াছিন কে দিয়েছি বলে তোকে দিতে হবে এমন তো কোনো কথা নাই। শাকিল ধীরে ধীরে কি যেন বলল, তারপর বাড়ির ভেতর চলে গেল। তুহিন পানি খেয়ে বলল, যা আর এক গ্লাস নিয়ে আয়। আমি আর বাড়ির ভেতর যাবো না। জুঁই আবার বাড়ির ভেতর গিয়ে পানি নিয়ে এল। তুহিন পানি খাচ্ছে - আঁখি বলল, একটু রাখিস; আবার পানি খেতে মন চাচ্ছে। তখন জুঁই বলল, যা আবার খেয়ে আয়। আমি নিয়ে এসেছি। এখানে আর কাউকে ভাগ নিতে দিবো না। আঁখি বলল, আচ্ছা না দিলি। আমার পানি খাওয়া লাগবে না। যা খেয়েছি, তাই পেটের ভেতর বুদ বুদ বুদ করছে। জুঁই বলল, তাহলে বললি যে খাবি? আঁখি বলল, ও এমনি বলেছি। তুহিন কিছুটা পানি রেখে আঁখিকে বলল, নে খাবি নাকি। জুঁই বলল, না ও আর খাবে না। দে আমায় দে। সে নিয়ে সাথে সাথে পুরোটা খেয়ে ফেলল। তুহিন বলল, এত গলা শুকিয়েছে - বাড়ির ভেতর কি করলি? পানি খাস নাই। জুঁই বলল, খেয়েছি কিন্তু আবার...। তুহিন বলল, পেট ভরেছে কিন্তু চোখ ভরা বাকি আছে। আঁখি হেসে বলল, তোর পেঁচানো কথা বুঝতে পারি না। বুঝি আম গাছ আবার পরে ভেবে ভেবে বুঝি জাম গাছ। তুহিন বলল, থাক। বেশি বোঝা ভাল না।
সবার পানি খাওয়া শেষে আবার খেলা শুরু হল। সবাই দৌড়াতে লাগল। শাকিল বলল, আমি আর দৌড়াতে পারছি না। পেটের ভেতর পানি ডব ডব করছে। জুঁই বসে পড়ল। সে বলল, আমি আর খেলবো না। আমার ভাল লাগছে না। তুহিন বলল, পানি খেয়ে সাথে সাথে খেলা শুরু করা ঠিক হয় নি। এখন খেলা বন্ধ। আবার পরে খেলা হবে। সাথে সাথে সবাই বরই তলায় বসে পড়ল।
সুন্দর ভাবে বসে সবাই নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছে। আসুলে আজ নতুন না। খেলা শেষে প্রতিদিনই এ রকম কথা হয়ে থাকে। আজ খেলায় কে কি রকম খেলল সবই এ সময় তুলে ধরা হয়। নিলু বলল, আঁখি আমায় একবার সত্যি টাস করে ছিল কিন্তু আমি মানা দেয় নাই। আঁখি বলল, তুই তো একটা চোর। এতবার বললাম টাস করেছি, টাস করেছি মানাই দিলি না। কিছুক্ষণ পরে জুঁই হেসে বলল, ইয়াছিন একবার আমায় টাস করে ছিল। আঁখি বলল, কখন? জুঁই বলল, ওই যে বললাম ইয়াছিন আমার জামা টাস করেছে। জামা কেটে রক্ত বের করতে পারল না। তাই মানা হল না। আঁখি বলল, ও সেই সময়, মনে পড়েছে। ইয়াছিন বলল, দেখ দেখ এখন তো সত্যি কথা বলে দিলি। আর তখন নাকে কান্না করলি। ( তারপর পর জুঁই যে রকম করেছিল সেই রকম ভাব করে) আমার গায়ে ছোঁয়া লাগে নাই। তোরা বিশ্বাস কর। বাতাসে আমার জামা উড়ে উঠে ছিল, তখন ও জামায় ছুঁয়েছে। মানবো কেন? ও কি জামা কেটে রক্ত বের করবে পারবে। এই টুকু বলে ইয়াছিন সবার উদ্দেশ্যে বলল, দেখ তোরা চুন্নি চিনে রাখ। আঁখি বলল, ওকে গালি দিচ্চিস কেন? ও কি শুধু একা চুরি করেছে? তোদের দলের জুঁই, আর আমাদের দলের নিলু। যা কাটা কাটি শোধে বোধে। তুহিন বলল, তোরা আরও কত চুরি করেছিস। তার কি হিসাব আছে? আঁখি বলল, না রে আমরা আর চুরি করি নাই। করলে তোরা চুরি করছিস। তুহিনকে একবার ছুঁয়ে ছিলাম আর চোখ বড় বড় করে তাকালো। তাই আর কিছু বললাম না। তুহিন বলল, কি যে বলিস। শার্টে ছুঁয়েই এত কথা। তুই সেই মানুষ আমাকে টাস করে তুই কিছু বলবি না। আর কেহ হলে তাও মানতাম। কিন্তু তোর বেলা...জুঁই বলল, তোরা কালকে বন্ধু পাতলি। আর আজকেই এত কথা কাটাকাটি। তুহিন বলল, কিসের বন্ধু পাতা। তারপর আঁখির দিকে চেয়ে বলল, এই কুটনির সাথে বন্ধু.. ছি। আঁখি বলল, তোর সাথে আমি দেখে বন্ধু পেতেছি। যা আমিও কাটাকাটি করে দিলাম। ইয়াছিন বলল, খুব ভাল হল বন্ধু পাতা ভাল না। তারপর হেসে হেসে জুঁই কে বলল, আয় আমরা বন্ধু পাতি। জুঁই বলল, বন্ধু যদি পাতি তাহলে ওদের মত না। যে আজকে বন্ধু পেতে আবার কালকেই কাটাকাটি। তুহিন বলল, বন্ধু কাটাকাটি কি মুখের কথা। বললাম আর বন্ধু কেটে গেল। আঁখি বলল, আমরা সারা জীবনই বন্ধু হয়ে থাকবো। তারপর দু'জন কিছুক্ষণ গলা ধরে ওদের সামনে দিয়ে হাটাহাটি করল। শাকিল বলল, এই গরমিল আবার এখনই মিল হয়ে গেলি। তুহিন বলল, এটাই তো বন্ধু।
আঁখি বলল, আমাদের ঘরের পিছের আম গাছে বল্লারচাক আছে। চল বন্ধু আমরা চাকটা পেরে আনি। তুহিন বলল, খুব ভাল। গাঙে বরশী দিয়ে মাছ মারতে যাওয়া যাবে। তারপর দু'জন বল্লারচাক ভাঙতে গেল। পিছে পিছে সবাই গেলে আঁখি বলল, তোরা সবাই যা। আমরা দুই বন্ধু মিলে মাছ ধরব। আর কাউকে সাথে নিবো না। জুঁই বলল, আমাকেউ নিবি না? আঁখি বলল, শুধু তুই আয়। তারপর ইয়াছিন বলল, আমাকে..। তুহিন বলল, আয়। শাকিল বলল, আমাকে নিবি না? এবার আঁখি, তুহিন, জুঁই, ইয়াছিন মিলে বলল, আয় তোরা সবাই আয়। আমরা সবাই মিলে মাছ ধরতে যাবো। সবাই দৌড়ে গিয়ে বরশী নিয়ে এলো। শাকিল বলল, তেঁতুল গাছে একটা বল্লারচাক আছে চল পেরে নিয়ে আসি। তারপর সবাই তেঁতুল তলায় গেল। তুহিন লাফ দিয়ে গাছে উঠল। লাঠি বল্লারচাকের ওখানে নাড়াচাড়া করতে লাগল। যাতে বল্লারচাক মাটিতে পড়ে। বল্লারচাক মাটিতে পড়ার সাথে সাথে সব বল্লা ছড়িয়ে গেল। বল্লা তুহিনকে ইচ্ছে মত কামড়াতে লাগল। তুহিন ওরে মারে.. ওরে বাবারে.. বলে চিৎকার করতে লাগল। আঁখি বলল, তাড়াতাড়ি নেমে আয়। গাছ তলা থেকে সবাই দূরে সরে গেল। তুহিন চিৎকার করতে করতে গাছ থেকে নেমে সোজা দৌড় দিয়ে বরই তলায় এসে ঠাস করে পড়ে গেল। সবাই ধরল। গায়ে মাথায় জায়গায় জায়গায় ফুলে উঠল। আঁখি দৌড়ে বাড়ি গিয়ে চুন নিয়ে এলো। যে জায়গায় বল্লা হূল দিয়েছে সেই জায়গায় জায়গায় চুন লাগিয়ে দিল। বলল, কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যথা কমে যাবে। চিৎকার শুনে পাড়ার অন্যান্য লোকজন এলো। কেউ কেউ বলতে লাগল আহারে এত ছোট মানুষ কে বল্লা এই ভাবে কামড়িয়েছে। আবার কেউ কেউ বলল, ভাল হয়েছে। বল্লারচাক ভাঙতে যেতে কে বলেছে?
নবম পরিচ্ছেদ
বৈশাখ মাস। এই মাসে প্রচন্ড ঝড় হাওয়া বইতে থাকে, যা বৈশাখী ঝড় নামে পরিচিত। এই সময় গাছে গাছে ঝুলে থাকে কচি আম এবং প্রকৃতিতে থাকে প্রচন্ড গরম। মাঠে কাজ করতে গেলে শরীর যেন নুয়ে পড়ে। তাই কাজ সেরে গাছ তলায় বসে কৃষক। তার পর কাঁচা আম পেরে লবন দিয়ে মাখিয়ে খায়। খেতে দারুন লাগে, মজাও পায়। অনেকে দুই একটা শখ করে গাছ থেকে পেরেও থাকে। কিন্তু বাড়ির ছেলে মেয়েদের পাড়ার অধিকার থাকে না। তারা পাড়তে গেলে নানা গুরু জনের গালি শুনতে হয়। তাই তারা অপেক্ষায় থাকে, কখন ঝড় উঠবে? মনের সুখে আম কুড়াতে পারবে।
বরই তলায় সবাই ম্যাচের খোল খেলছে। এখন নিলুর লাভ হয়েছে সবার বেশি। ইয়াছিনের সব খোল লজ গেলে সে আবার রাস্তায় ম্যাচের খোল কুড়াতে গেল। শাকিলের আর মাত্র পাঁচটি খোল আছে। তুহিনের বারো তেরোটার মত। আর নিলুর হাতে অনেক। সে সব গুলো হাতে না রাখতে পেরে জাবেদের কাছে রেখে দিল। জাবেদ খোল রাখতে লাগল আর আঁখি ও জুঁই এর মত খেলা দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে ইয়াছিন কিছু খোল নিয়ে ফিরে এলো। ইয়াছিন খেলতে গেলে নিলু খেলতে দিল না। সে বলল, তুই কুড়ু গেছা তোকে এখন আর খেলায় তোলা হবে না। তুহিন বলল, কুড়ু গেছে তাই কি? আবার তো সে গুটি নিয়ে ফিরে এসেছে। নিলু বলল, ও খেলা বাদ দিয়ে গেল কেন? বলতে পারলো না, আমি আবার গুটি নিয়ে আসি। তাহলেই তো হয়ে যেতো। কিন্তু সে তো তা বলে নাই। কিছু না বলেই চলে গেল। ইয়াছিন বলল, তাতে কি? গুটি নিয়ে এসেছি খেলবো। এক দুই কথায় তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগে গেল। তখন তুহিন বলল, ওর আজকে লাভ হয়েছে ওরকম তো করবেই। আঁখি ইয়াছিনকে বলল, তোর গুটি তুহিন কে দিয়ে দে। ওর কাছে তেমন গুটি নাই। লাভ হলে তো আমাদের পাড়াতেই থাকল। তখন ইয়াছিন তার কুড়ানো সব গুটি তুহিনকে দিয়ে দিল। নিলু বলল, তোদের সাথে কি এভাবে খেলা চলে? তোরা সবাই শেয়ারে খেলিস। জাবেদ বলল, না খেলে এখন খেল।
তুহিন কিছুক্ষণ থম ধরে থেকে বলল, আজ মনে হয় ঝড় উঠবে - দেখছিস না কত গরম পড়েছে। নিলু আকাশের চারদিকে চেয়ে দেখল, তার পর আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলল, ওই দেখ ছমিরের দাদি বসে আছে। কারও বুঝতে আর অসুবিধা হল না যে আকাশে কালো মেঘ জমেছে। কারণ এলাকার ভেতরে ছমিরের দাদির বেশ নাম আছে, শুধু এই কালোর জন্য। আঁখি বলল, ইয়া আল্লাহ! এত মেঘ ধরেছে। তুহিন বলল, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড় শুরু হবে।
কিছুক্ষণ পরে বাতাস শুরু হল। তৎক্ষণাৎ খেলা বন্ধ হল। সবাই ছোটা ছুটি করা শুরু করল। যে যার যার মত আম বাগানের দিকে ছুটল। তুহিন ক্লান্ত দেহ দু'হাত টান করে বাতাসে মেলে দিল। কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর এক দৌড়ে চলে গেল সেই আম বাগানে- যে আম বাগানে সে গত বৎসর এই বৈশাখী ঝড়ে অনেক আম কুড়িয়ে ছিল।
আম গাছটা অনেক বড়। সেই পুরনো কালের আম গাছ। এই গাছে উঠে কেউ আম পারতে সাহস পায় না। কারণ, সেই গাছের পাশে বিশাল গাব গাছ। সবাই জানে সেই গাছে ভূত প্রেত্নির বাসা। তারপর বাঁশঝাড় ও অন্যান্য গাছে ঘেরা এই আম গাছ। তাই কেউ সেখানে আম কুড়াতে যায় না।
তুহিনের বড় সাহস। সে সেখানে গিয়ে চার পাঁচটা আম কুড়াল। তারপর একবার পিছনে তাকাল। দেখল, অবাক কান্ড। জুঁই এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে। তুহিন বলল, তুই এখানে কেমন করে এলি। তুই সবার সাথে আঁখি বা ইয়াছিনদের আম বাগানে যাস নাই। জুঁই বলল, সবাই গেল। এত মানুষের মধ্যে আম কুড়ানো যায়? তোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তখন বরই গাছের আঁড়ালে লুকিয়ে ছিলাম। দেখি তুই কোথায় যাস? সবাই গেল আর তুই একা দাঁড়িয়ে রইল। অবশ্যই কোনো কারণ আছে। তুহিন বলল, এভাবে পিছে পিছে এলি ভয় পেলি না। জুঁই বলল, ভয় পাবো কেনো? তুই একা আসতে ভয় পাস না। আর আমি তোর সাথে আসতে ভয় পাবো? তুহিন বলল, নে এখন আম কুড়া। জুঁই বলল, এত আম নেবো কি সে? আমার ঠোংগায় তো আটবে না? তুহিন বলল, কি আর করবি? ঠোংগা নিয়ে মানুষ আম কুড়াতে আসে? জুঁই বলল, সবাই তো ঠোংগা করেই আম কুঁড়ায়। তুহিন বলল, সবার সাথে আমার তুলনা দিবি না। আমার সাথে এলে ঠোংগা নিয়ে আসা যাবে না। বড় দেখে ব্যাগ নিয়ে আসতে হবে।
এতক্ষণ হালকা বৃষ্টি ছিল। হঠাৎ করে খুব জোড়ে নামল। জুঁই বলল, এখন বাড়ি যাবি কেমনে? বৃষ্টি তো নেমে পড়ল। তুহিন বলল, কেনো আর আম কুড়াবি না? জুঁই বলল, না। চল তাড়াতাড়ি চল। তুহিন বলল, আমি তোকে নিয়ে এসেছি? না তুই একা এসেছিস? জুঁই বলল, একা। তুহিন বলল, তাহলে একা পথ ধর। আমার যাওয়া অনেক দেরি হবে।
বাতাস সাথে বৃষ্টি। দু'জনের গায়ে কোনো কাপড় নেই। শীতে দু'জনেই কাঁপছে। তুহিন বলল, আয় গাব গাছের তলে যাই। খুব ঝোপড়া। বৃষ্টি পড়বে না। জুঁই সাথে সাথে তুহিনের সাথে গাব গাছ তলে দাঁড়াল। একটা মরা কিন্তু অনেক বড় গাব গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। জুঁই এর তখন ভূত প্রেত্নীর কথা স্মরণ হল। তুহিন কে বলল, ওটা কিসের শব্দ হল? তুহিন বলল, ওই দেখ ভূত। জুঁই চোখ বন্ধ করে বলল, এখন কি করব? তুহিন বলল, আমরা আর কি করবো? যা করার তো ভূতেই করবে। জুঁই এবার কেঁদে ফেলল। তুহিন বলল, আমি এমনি বলছি। ভূত নেই। দেখি কোন ভূত আমাদের কি করে? জুঁই বলল, তুই ভূতের সাথে লড়াই করে পারবি? তুহিন বলল, পাগল নাকি? ভূত বলে কিছু আছে? তুই কখনও দেখেছিস? জুঁই বলল, দেখি নাই। কিন্তু সবাই যে বলে? তুহিন বলল, সব মিথ্যা কথা। জুঁইয়ের মন মানছে না। সে বার বার বলতে লাগল চল বাড়ি যাই। তুহিন বলল, কিভাবে যাবি? পথই তো দেখা যায় না? চারদিকে অন্ধকার। বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত যাওয়া যাবে না।
শীতে দু'জনার মাড়ি কাঁপছে। তাই ওরা গাব গাছের সাথে জড়িয়ে আছে। জুঁই তুহিন কে এক হাত দিয়ে ধরে আছে, আর এক হাত দিয়ে গাব গাছ। মাঝে মাঝে আকাশের গর্জন। মনে হয় সামনেই বাজ পড়ল। জুঁই এবার গাব গাছ ছেড়ে দিয়ে দু'হাতেই তুহিন কে জড়িয়ে ধরল। এভাবে অনেক সময় কেটে গেল। ঠিক কতক্ষণ তা তারা জানে না।
সবাই আম কুঁড়িয়ে ফিরে এলো। ইয়াছিন তুহিনদের বাড়িতে দেখতে গেল, সে কয় টা আম কুঁড়িয়ে পেয়েছে। সে পেয়েছে তেরোটা। দুই পঁচা। তবুও রেখে দিয়েছে যদি পঁচা অংশটুকু ফেলে দিয়ে খাওয়া যায়। তুহিনের মা- ইয়াছিনকে কে বলল, তুহিন তোমাদের সাথে যায় নাই? ইয়াছিন বলল, না। আমরা সবাই তো এসেছি। আঁখিদের সাথে গেছে নাকি? সে তাড়াতাড়ি আঁখিদের বাডিতে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল, আঁখি আম গুলো গুনছে সে কয়টা পেয়েছে। গুনতে গুনতে তার বাইশটা হল। ইয়াছিন বলল, তুহিন কে দেখছিস? আঁখি বলল, না। আমাদের সাথে তো যায় নি। জুঁই কোথায়? ওর মা এসেছিল। ইয়াছিন বলল, জুঁইও তো আমাদের সাথে যায় নাই। আঁখি বলল, তাহলে মনে হয় ওরা দু'জন চালাকি করে অন্য জায়গায় গেছে।
বৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে। তুহিন জুঁই কে বলল, চল এখন বাড়ি যাই। বৃষ্টি থেমে গেছে। জুঁই এর কোনো সাড়া শব্দ নাই। আবার বলল, চল যাই। সে বারও কোনো সাড়া পেল না। তারপর খুব জোড়াল কন্ঠে বলল, চল যাই। জুঁই তখন বলল, আজ এখানেই থাকবো। তখন গেলি না কেন? আজ আর বাড়ি যাবো না। তুহিন বলল, এখন আমায় ছাড়। তুই না গেলি থাক। আমি গেলাম। জুঁই তুহিন কে ছেড়ে দিল। তুহিন বাড়ির দিকে রওনা দিল। জুঁই চুপ করে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুদূর যাওয়ার পর তুহিন পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল জুঁই নেই। সে মনে করেছিল যে জুঁই পিছে পিছে আসবে। কিন্তু তা আর হল না। সে আবার ফিরে গেল গাব গাছ তলায়। সেখানে গিয়ে দেখল, সে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তুহিন দমক দিয়ে বলল, যাবি না বাড়িতে? তখন জুঁই বলল, আমি কি তোর সাথে এসেছি? আমি একা এসেছি। একাই যেতে পারবো। তুহিন বলল, এই গাছে কি আছে জানিস? জুঁই বলল, কি আছে? ভূত আমার কি করবে? আমায় মেরে ফেলবে এই তো। তুই আবার ফিরে এলি কেনো? যা বাড়িতে যা। তুহিন দেখল, জুঁই তো খুব রেগে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আরো কতক্ষণ থাকবে এর ঠিক নাই। তাই সে জুঁই এর গলা ধরে সুন্দর করে বলল, চল যাই। একটু পরেই কিন্তু রাত হবে। জুঁই বলল, সারা পথ কিন্তু এভাবে গলা ধরে নিয়ে যেতে হবে। তুহিন বলল, ঠিক আছে চল।
দশম পরিচ্ছেদ
রাত্রি গভীর। তুহিন ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ কোনো এক শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। জানালা খোলা ছিল। চাঁদের আলো জানালা দিয়ে এসে যেন হাসছে। তুহিন সেই আলোর দিকে মিটিমিটি চেয়ে রইল। তারপর আবার ঘুমানোর চেস্টা করল। কিন্তু ঘুম পরী হয় তো তাকে ছেড়ে অন্য একজন কে ধরেছে। তাই আর সে ঘুমাতে পারল।
তার মনে পড়ল, অনেক দিন হল একটা কাজ করা হয় না। তাই সকাল হলেই সবাইকে বলতে হবে সেই কাজের কথা। তারপর এ বিষয়ে ভেবে ভেবে সে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা আনন্দ উপভোগ করল। কারা কারা এতে যোগ দিতে পারে তাদের লিষ্ট এবং কয় টাকা খরচ হবে মনে মনে তার হিসাব করে নিল।
ভোর বেলা। এখনও বরই তলায় সূর্যের আলো পড়ে নি। তুহিন ঘুম থেকে উঠে বরই তলায় কিছুক্ষণ হাটাহাটি করল। তারপর চলে গেল ইয়াছিনদের বাড়িতে । জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বলল, তাড়াতাড়ি বরই তলায় আয়। ইয়াছিনের মা বলল, তোদের তাহলে রাত পোহাল? তুহিন বলল, হুম। রাত পোহাল বলেই তো ইয়াছিনকে ডাকতে এলাম। তারপর সেখান থেকে গেল আঁখিদের বাড়িতে। আঁখি সবে ঘুম থেকে উঠেছে। তাকে বলল, তাড়াতাড়ি বরই তলায় আয়। আঁখি বলল, কেনো? এত সকালে কি করবি? তুহিন বলল, বেশি কথা না বলে জুঁই কে ডাক দিয়ে নিয়ে আয়। আঁখি বলল, যা। আমি ওকে ডাক দিয়ে নিয়ে আসি। তুহিন চলে এলো বরই তলায়, আর আঁখি গেল জুঁইদের বাড়িতে।
একে একে সবাই বরই তলায় এসে হাজির হল। সবারই মনে উঁকিঝুঁকি মারছে। তুহিন এত সকালে কেনো আসতে বলল? অবশ্যই কোনো কারণ আছে। কিন্তু কি কারণ তা কেউ আন্দাজ করতে পারল না।
তুহিন সবার উদ্দেশ্যে বলল, একটা জিনিস আমাদের অনেক দিন হল করা হয় না। বলতো সেটা কি? কেউ কোন কিছু আন্দাজ করতে পারল না। আঁখি বলল, কথা না পেঁচিয়ে সোজা করে বল। এমন সময় ইয়াছিনের আব্বা ব্রাশ করতে করতে বরই তলায় এলো। সে বলল, তোদের আল্লাহর রাত পোহাল। এই সকালে কিসের হাট বসিয়েছো? তারপর ইয়াছিনকে দমক দিয়ে বলল, পড়াশোনা কিছু করা নেই। যা তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। ইয়াছিন ভয়ে ভয়ে বাড়ি চলে গেল। তুহিন বলল, তোরা সবাই বাড়ি যা। খাওয়া দাওয়া করে আসিস। সবাই চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে জুঁই তুহিনদের বাড়িতে এলো। তুহিনকে বলল, তখন সবাইকে কিসের জন্য ডেকে আনলি? তুহিন বলল, সবাই আসুক তারপর বলবো। জুঁই বলল, কেনো? এখন বলা যাবে না। তুহিন বলল, এখন বলা যাবে না। এখন বললে তো সব শেষ হয়ে যাবে। জুঁই বলল, সব শেষ হয়ে যাবে মানে? তুহিন বলল, হুম। সব শেষ হয়ে যাবে। জুঁই বলল, আচ্ছা না বললি। চলে গেলাম। তুহিন বলল, খাওয়া দাওয়া করে আসিস। জুঁই বলল, না.. আসবো না।
সকাল নয়টা। সবাই আবার বরই তলায় এসে হাজির হল। জুঁই বলল, নে কি বলবি তাড়াতাড়ি বল? আমার কিন্তু আর সয়ছে না। তুহিন বলল, তোরা আগে ভেবে দেখ। অনেক দিন হল আমাদের কি কাজ করা হয় না? আঁখি বলল, তোর মাথা করা হয় না। তখন তুহিন বলল, তোদের পঁচা মাথায় এসব আসবে না। আমি বলছি শোন। অনেক দিন হল আমাদের চড়াইভাতি করা হয় না। আঁখি বলল, ভাল কথা মনে করে দিলি। তা কবে করবি চড়াইভাতি? তুহিন বলল, আজ না হয় কাল। তারপর সে লোক গুনে দেখল দশ জন। আঁখি বলল, শুধু এই দশজনই তো না। আরও দুই একজন ধরে রাখ। তুহিন বলল, অবশ্যই। দুই একজন তো বেশি হবেই।
জুঁই বলল, আজ সব জোগাড় করে রাখি। কালকে চড়াইভাতি হবে। তুহিন বলল, কে কি নিয়ে আসবি বল? নিলু বলল, আমি তেল আনতে পারবো না। তাছাড়া যা আনতে বলবি সব আনবো। আঁখি বলল, আমি বাড়ি থেকে দেখে আসি কি কি আছে? তুহিন বলল, দেখতে হবে না। যা আছে অল্প অল্প করে নিয়ে আয়। তারপর সবাই কে বলল, যা তোরাও যা, নিয়ে আয়। তবে চাল কিন্তু সবাইকেই দুই মুঠো করে আনতে হবে। জুঁই বলল, যা তুইও নিয়ে আয়। তুহিন বলল, তাতো অবশ্যই।
সবাই বাড়িতে গিয়ে হাতের কাছে যা পেলো চুপে চুপে নিয়ে এলো। কেউ কাঁচামরিচ, কেউ লবন, কেউ তেল ইত্যাদি ইত্যাদি। সব কিছু এনে রাখা হল তুহিনদের ঘরে।
আঁখি বলল, এই যে পন্ডিত মশাই- খড়ি কে দিবে? কেউ তো খড়ি আনল না। নিলু বলল, ও কি কাউকে খড়ি আনতে বলছে। তুহিন বলল, খড়ি বাড়ি থেকে আনতে হবে? জুঁই বলল, আরেক বারের মত চুরি করে আনবি? তুহিন বলল, হ্যাঁ। তাছাড়া আর কি করবো? বাড়ি থেকে সব কিছু আনলে কি আর চড়াইভাতি হবে? তার পর সবাই বলল, চল খড়ির খোঁজে যাই।
সবাই খড়ির খোঁজে গেল। সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে খড়ি কুড়াল। কারো গাছে মরা খড়ি থাকলে চুপি চুপি উঠে পেরে নিল। নিলু বলল, জাবেদদের আম গাছে একটা মরা ডাল দেখেছিলাম চল পেরে আনি। পিছন থেকে জাবেদ বলল, এই শালা কি বললি? আর একবার বল দেখি। নিলু বলল, শালা মানসের গাছ থেকে পেরে নিতে তো কোনো বাঁধা দেস না।আর এখন নিজেদের গাছের কথা বলছি চেঁচিয়ে উঠছে। তুহিন বলল, হয়েছে। আর কারো গাছে পারতে হবে না। এ দিয়েই হয়ে যাবে। আঁখি বলল, হ্যাঁ চল। পরে অল্প কিছু লাগলে, বাড়ি থেকে আনা যাবে। সবাই তুহিনদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তার পর কাজ গুছিয়ে যে যার বাড়ি ফিরে গেল।
পরের দিন সকাল নয়টা কি দশটা। সবাই তুহিনদের বাড়িতে উপস্থিত হল। আঁখি তুহিন কে বলল, চল সব নিয়ে বরই তলায় যাই। জুঁই বলল, না এখনই নেয়া যাবে না। ওখানে গিয়ে মানুষের ভিড়ে সব কাজ ঠিক মত করতে কষ্ট হবে। তুহিনের মা বলল, সব আমার এখান থেকে নিয়ে যা। খাওয়ার সময় সবাই মিলে খাবে আর কোনো কিছু হলে সব দোষ আমার ছেলের ঘাড়ে পড়বে। এতো নতুন না। জুঁই বলল, চাচী পেঁয়াজ কাঁচামরিচ এগুলো এখানে শুধু কেটে নিয়ে যাবো। সব কিছু করবো বরই তলায়। তুহিন বলল, মা- ও ঠিক বলেছে, শুধু এগুলো কেটেই নিয়ে যাবো। তুহিনের মা চলে গেল। সবাই পেঁয়াজ, রসুন, আদার খোসা ছাড়াতে লাগল। জুঁই মরিচ কাটতে বসল। তুহিন সব জিনিস পাতি এগিয়ে দিল। কোথা হতে সম্পা উড়ে এসে জুড়ে বসল। সে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে লাগল। আঁখি উঠে গিয়ে তুহিন কে ইশারা করে ডাক দিল। তুহিন এগিয়ে গিয়ে বলল, কি? আঁখি বলল, এখন কি করবি? সম্পাকে কি ভাবে সরাবি? খাওয়ার সময় তো ঠিকই খাবে। ও তো কিছু দেয় নি। তুহিন বলল, তুই বলে দে, ওকে এখন কি করে যেতে বলি? কাজ করছে করুক। একজন খেলে কি আর সব ফুরিয়ে যাবে? আঁখি বলল, তুই যা ভাল বুঝিস। তাই কর।
সব কিছু হয়ে গেল। এখন শুধু রান্না বাকি। সম্পা বলল, কোন পাতিলে রান্না করবি? পাতিল কই? আঁখি একটি পাতিল নিয়ে এল। সম্পা বলল, এটা দিয়ে ভাল হবে না। আমাদের একটা ভাল পাতিল আছে, আমার মাকে গিয়ে বল, সম্পা পাতিল চেয়েছে। তাহলে দিবে। যা একজন শিগগির গিয়ে নিয়ে আয়। তুহিন- ইয়াছিন কে বলল, সম্পা আপাদের বাড়ি থেকে পাতিল নিয়ে বরই তলায় আয়। আমরা সবাই এখনই সব নিয়ে বরই তলায় যাচ্ছি।
ইয়াছিন দৌড় দিয়ে সম্পাদের বাড়ি গেল। সব কিছু বরই তলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে- তুহিন খড়ির আটিটা মাথায় করে নিয়ে গেল। জুঁই, আঁখি, শাকিল আর সবাই চাল ডাল কাঁচামরিচ পেঁয়াজ এবং অন্যান্য সব কিছু নিয়ে গেল। ইয়াছিন কিছুক্ষণের মধ্যে পাতিল নিয়ে ফিরে এল।
সম্পা বয়েসে তাদের থেকে অনেক বড়। তাই রান্না করার মূল দায়িত্ব তার উপর পড়ল। সে এগিয়ে এসে না কাজ করলে হয় তো তারা ডাকতো না।
রান্না শুরু হল। ধোয়া উড়ে গিয়ে বরই গাছের মাথায় ঘুরছে। সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল। পাড়ার অন্যান্য ছেলে মেয়ে বউ ঝি - রা ছুটে এলো রান্না দেখার জন্য। শাকিল কলা পাতা কেটে আগে থেকেই বসে আছে। সবার আগে সে নাকি লবন দেখবে। একটা কুকুর বোধ হয় চড়াইভাতি দেখতে এলো। কিন্তু ইয়াছিনের জ্বালায় দেখতে পারল না। সে লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে ধরল। কুকুরটি দৌড়ে গিয়ে পালাল। কিছুক্ষণ পরে আবার সেই বরই তলায় ফিরে এলো। বোধ হয় তার চড়াইভাতি দেখার খুব ইচ্ছে।
জুঁই বলল, সম্পা আপা এসেছে অনেক ভাল হয়েছে। তা না হলে আমাদের কত কষ্ট হত। গতবার কত কষ্ট হয়ে ছিল মনে আছে। আঁখি বলল, চোখে মুখে ধোয়া লেগে মুখটা বেগুন পোড়া হয়ে ছিল। আগুন বার বার নিভে যাচ্ছিল। চুলায় বার বার ফুঁ দিতে দিতে তো আমার মাথাটাই ধরে গিয়ে ছিল। ইয়াছিন বলল, আমার কি কম কষ্ট হয়ে ছিল। খড়ি ফুরিয়ে যায়, আনতে আনতে আবার ফুরিয়ে যায়। কি যে মুশকিলে পড়েছিলাম সে দিন। শাকিল বলল, গতবার লবন চেখে দেখতে পারি নাই। এবার সবার আগে দেখবো বলে আগে থেকেই কলা পাতা কেটে বসে আছি। তুহিন বলল, কলাপাতা আগে এনে বসে থাকলেই তাকে আগে লবন চেখে দেখতে দেবো? তারপর দমক দিয়ে বলল, কলাপাতা দে, তুই কি লবন দেখতে পারবি? কেড়ে নিতে গেলে সে কান্না করতে করতে বাড়ি চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে তার মাকে ডেকে নিয়ে এল। তার মা বলল, তোরা এক সাথে থাকিস। আবার এ রকম মারামারি করিস কেনো? তুহিন বলল , কই মারামারি করলাম। সবে মাত্র রান্না তুলে দিয়েছে। ও এখনই কলাপাতা কেটে বসে আছে, তাই বলা হয়েছে। তার মা বলল, আর যেন কিছু বলো না। এই বলে সে শাকিলকে রেখে গেল। তুহিন বলল, আচ্ছা যান। আর কিছু বলবো না।
রান্না হয়ে গেল। সম্পা তুহিন কে বলল, দেখতো লবন ঠিক মত হয়েছে কিনা? আর স্বাদ কেমন হল? তুহিন কলাপাতায় অল্প একটু নিয়ে বলল, শাকিল কে একটু দে। সেই কখন থেকে ঠাকুরের মত বসে আছে। তখন সম্পা তাকে একটু দিল। গরম দেখে তুহিন ফুঁড় উপর ফুঁ দিয়েই যেতেই লাগল। কিন্তু শাকিল নেয়ার সাথে সাথেই মুখে দিল। তারপর বলল, ওরে বাবা রে মরে গেলাম। সবাই তার দিকে দৃষ্টি ফেরাল । দেখল এক অবাক কান্ড। গরম তা খেয়ে মুখ পুড়িয়ে ফেলেছে। শাকিল কান্না করতে করতে বলল, মুখ না পোড়ে - সবার আগে খেয়েছি তো এই অনেক। সবাই হেসে উঠল।
একাদশ পরিচ্ছেদ
ইয়াছিনদের বাড়ির পিছনে খোকসা গাছে টোনাটুনি বাসা বেঁধেছে। তুহিন, ইয়াছিন, আঁখি, জুঁই প্রতিদিন সেই টোনাটুনির বাসা উঁকি মেরে দেখে। বাসায় নীল রঙের দুইটা ডিম আছে। প্রতিদিন দেখে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হল কি না বা কেউ সেই ডিম চুরি করে নিল কি না। যখন তারা বাসার কাছে যায় টোনাটুনি বুঝতে পেরে ডালে ডালে উড়ে গিয়ে টুন টুন করে। যেন সবাই কে জানিয়ে দেয় যে, একদল ডাকাত তাদের বাসা আক্রমণ করেছে। তোমরা সবাই ছুটে এসো।
সে দিন সবাই মিলে পোলানটুক খেলছিল। নিলু হল চোর। সে চোখ বন্ধ করল। সবাই লুকাল। পরে নিলু সবাইকে খুঁজতে লাগল। তুহিন, ইয়াছিন, আঁখি, জুঁই যে দিকে লুকাতে চেস্টা করে, বাকিরা সেই দিকেই পথ ধরে তাদের পিছে পিছে। তুহিন বলল, সবাই এক সাথে লুকানো যাবে না। যে যার যার মত লুকিয়ে পড়। সবাই যার যার মত লুকিয়ে পড়ল। কিন্তু তুহিন, ইয়াছিন, আঁখি, জুঁই ওরা সবার সাথে চালাকি করে আবার এক সাথে হল। তুহিন বলল, চল টুনটুনির বাসাটা একবার দেখে আসি। সেই কালকে দেখেছি। আঁখি বলল, সকালে একবার গিয়ে ছিলাম। ইয়াছিন বলল, ডিম দুটি আছে? আঁখি বলল, হ্যাঁ আছে তো। তুহিন বলল, কেউ ডিম চুরি করে নিলে, তাকে মারতে মারতে মেরেই ফেলবো। জুঁই বলল, চল এখন বাসাটা একবার দেখে আসি। আমাদের খেলাও হবে বাসা দেখাও হবে। সবাই বাসার কাছে গেল। তুহিন বলল, এই তোরা এখানে থাক। তারপর সে ধীরে ধীরে পা ফেলে টুনটুনির বাসা উঁকি মেরে দেখল। টুনটুনি উড়ে গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগল।
নিলু ইয়াছিনদের বাড়ির ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় টুনটুনির গলা শুনতে পেল। সে মনে মনে ভাবল, এমন করে টুনটুনি টুনটুন করছে কেনো? দেখে আসি বাসা আছে নাকি?
সে চারজন কে এক সাথে দেখে বলল, এক টিপ, দুই টিপ, তিন টিপ, চার টিপ। আঁখি আস্তে আস্তে তুহিন কে বলল, তাড়াতাড়ি আয় নিলু এসেছে। তুহিন সেখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে এলো। তারপর আঁখি নিলু কে বলল, কাকে এক টিপ বলেছিস।( এক টিপ মানে হল সে চোর। যাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে খেলা হবে।) নিলু বলল, তোকেই তো এক টিপ বলেছি। আঁখি বলল, কি বললি? আমাকে এক টিপ ? আমি ভেতরে ছিলাম না? তারপর নিলু হেসে বলল, এমনি বললাম। ইয়াছিন কে একটিপ বলেছি। ইয়াছিন তো রেগে আগুন। সে অনেক ডাকাডাকি শুরু করল। হ্যাঁ, আঁখি কে বলে, আবার এখন আমাকে চোর বানানো হচ্ছে। তারা সবাই এ নিয়ে ঝগড়া করতে লাগল। এমন সময় শাকিল চুপি চুপি পিছন থেকে এসে মাথায় হাত দিয়ে নিলুকে ভান্ডার দিল। ( ভান্ডার মানে হল, যে চোর ছিল আবার সেই চোর হবে। নতুন করে খেলা শুরু হবে।) সবাই হেসে উঠল। ইয়াছিন লাফালাফি শুরু করল। শাকিলকে বলল, ভাই তুই আমাকে বাঁচালি ভাই। ( কারণ ভান্ডার না দিলে পরবর্তীতে সে চোর হত) নিলু মন খারাব করে রইল। তারপর বলল, নে চোখ বন্ধ করলাম সবাই আবার লুকিয়ে পড়।
নিলু চোখ বন্ধ করলে সবাই আবার লুকিয়ে পড়ল। নিলু চারদিকে তাকিয়ে বাসা খুঁজতে লাগল। তারপর ভাবল, যখন এখানে এলাম তুহিন একা ওখান থেকে এলো কেন? যাই ওখানে গিয়ে দেখি। সেখানে গেলে টুনটুনি আবার চেঁচাতে শুরু করল। সে বাসাটাতে উঁকি মেরে দেখল দুইটি ডিম। ডিম দুটি হাতে নিয়ে, পরে কি ভেবে আবার বাসায় রেখে দিল। তারপর সে আস্তে আস্তে বলল, শালা পাগলের দল। সবাই লুকিয়ে থাকুক আমি বাড়ি গিয়ে ভাত খেয়ে আসি। আর জাবেদ কে তো খবরটা দিতে হবে। সে আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেল। বাড়ি যেতে যেতে বলল, টুক্কু না দিলে খেলবো না।( টুক্কু মানে হল, যে যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেনো একটু হলেও সাড়া দিতে হবে।) আঁখি টুক্কু দিতে গেলে তুহিন মুখ ছাপিয়ে ধরল। বলল, এখন টুক্কু দেয়ার দরকার নেই।
নিলু চলে গেলে সবাই আবার বাসার কাছে গেল।
তারা সবাই ভাল করে বাসাটা দেখল। ডিম ঠিক মত আছে কি না বা একটু ভেঙে গেছে কি না। আঁখি বলল, নিলু বাসা তো দেখে নাই? ইয়াছিন বলল, এত ভেতরে বাসা ও দেখবে কি করে? তুহিন বলল, ওকে চোখে চোখে রাখতে হবে। বাসা দেখতে আসে নাকি? জুঁই বলল, ও যদি খোঁজ পায় তাহলে বাসার বারোটা বেজে যাবে। ডিম তো নেবেই সাথে টুনটুনি কেউ ছাড়বে না। ইয়াছিন বলল, ওকে আর আমাদের বাড়ির কাছে আসতে দেয়া যাবে না। তুহিন বলল, নিলু এদিকে এলে ভুলবাল বুঝিয়ে দূরে নিয়ে যেতে হবে। আঁখি বলল, চল চল এখানে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। অন্য কেউ দেখে ফেলবে। তুহিন বলল, আমরা এই চারজন ছাড়া আর কেউ যেন না জানে। সবাই বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। এখন চল যাই।
নিলু বাড়ি গিয়ে ভাত খেল। কিভাবে টুনটুনি ধরা যায় তার পরিকল্পনা করল। পরক্ষণে ভাবল, জাবেদকে খেলার ছলে ওদের সাথে রেখে এলাম। ও পাশে থাকলে তাও একটা বুদ্ধি বের হত। এখন ওকে কিভাবে ডাক দেই। সবাই মনে হয় এতক্ষণ আমায় খুঁজছে। এখন তো ওখানে যাওয়া যাবে না। সবাই হয়তো এতক্ষণ রেগে গেছে। সেখানে গেলে, গালি ছাড়া আর কিছু মেলবে না। এখন বসে থাকি। আমায় না পেলে ও ঠিকই ফিরে আসবে।
এ দিকে সবাই নিলুকে খুঁজল। সারা পাড়া জুড়ে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। তুহিন বলল, ও মনে হয় আমাদের ফাঁকি দিয়ে বাড়ি চলে গেছে। আঁখি বলল, এতো নতুন কিছু না। ও চোর হলে তো প্রায়ই বাড়ি চলে যায়। জাবেদ বলল, এত মিথ্যা কথা বলবি না বলে দিলাম। ও কবে চোর হয়ে বাড়ি গেছে? জুঁই বলল, নিলু চোর হয়ে কোনো দিনও পুরো খেলা খেলে নি। সারা বেলা খেলবে যাওয়ার কথা নেই। কিন্তু চোর হলেই বাড়ি চলে যায়। এ তো ওর খুব পুরনো অভ্যাস। জাবেদ বলল, ও সামনে নেই আর তোরা সব ওর নামে বানিয়ে বানিয়ে বলছিস। বাড়ি যাই। ওকে গিয়ে সব বলতে হবে। আঁখি বলল, যা গিয়ে বল। ওকে আর কোনো দিনও খেলায় তোলা হবে না। জাবেদ বলল, আচ্ছা দেখা যাবে। আমি চললাম। তুহিন বলল, এখনই যাবি মানে? ও চোর হয়ে বাড়ি গেছে। ওর হয়ে তুই চোর হবি। না হলে তোকেও আমরা আর কোনো দিন খেলায় রাখবো না। জাবেদ বলল, এ তোদের কেমন বিচার? একজন এর পরিবর্তে আরেক জনকে সাজা দেস। লজ্জা করে না তোদের। আঁখি বলল, যা তুই। তোর চোর হওয়া লাগবে না। কাল থেকে আমরা অন্য পাড়ার কাউকে খেলায় রাগবো না। জাবেদ বলল, না রাখলে তো আর আমরা জোড় করে খেলতে পারবো না। তুহিন বলল, আর বড় বড় কথা বলতে হবে না। যা এখন।
জাবেদ চলে গেল।
নিলু রাস্তায় দাঁড়িয়ে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আর মনে মনে ভাবছিল, কি ব্যাপার জাবেদের তো এত দেরি করার কথা না। ওরা আবার জাবেদকে ধরে মারপিট করছে না তো? এমন সময় জাবেদ এলো। নিলু বলল, এত দেরি করলি কেন দোস্ত? জাবেদ বলল, তুই এভাবে আসবি আমাকে একটু ইশারা করে বললিও না? নিলু বলল, তোকে অনেক খুঁজছিলাম কিন্তু পেলাম না। খুব খিদে পেয়েছিল তাই বাড়ি চলে এলাম। মনে করলাম খেয়ে সাথে সাথে চলে যাবো। কিন্তু আব্বু একটা কাজে পাঠাল। অনেক দেরি হয়ে গেল বলে আর যাওয়া হয় নি। জাবেদ বলল, ওরা তোকে কত গালি দিচ্ছে। যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। নিলু বলল, থাক বলতে হবে না। একটা কথা শোন, ইয়াছিনদের ঘরের পিছে একটা টুনটুনির বাসা দেখে এসেছি। দুইটা ডিম আছে। জাবেদ বলল, ডিম বলিস না বলতে হয় ঘষি। নিলু বলল, ডিম আর ঘষি এক তাই তো হল। একবার সন্ধ্যার সময় টুনটুনি ধরেছিলাম মনে আছে। জাবেদ বলল, সে বার সবার কথাতে ছেড়ে দিয়েছিলাম। এবার কিন্তু আর ছেড়ে দিবো না। নিলু বলল, এবার আর ছেড়ে দিচ্ছি না। যে যা কেনা বলে।
সন্ধ্যা বেলা। সব পাখি আকাশে উড়ে উড়ে নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। নিলু জাবেদকে বলল, এভাবে পাখি উড়ে কোথায় যাচ্ছে? জাবেদ বলল, জানি না। নিলু বলল, সব পাখি এই সন্ধ্যা বেলা ঘরে যায়। আর একটু অন্ধকার হলেই আমরা চলে যাবো। জাবেদ বলল, খাঁচা তো ভাল না। আর টুনটুনি তো অনেক ছোট। এ খাঁচায় রাখা যাবে না। নিলু বলল, পাগল নাকি তুই? এই খাঁচায় টুনটুনি রাখার কথা কিভাবে বললি? আমার বড় বোতলের ভেতর রাখবো। এই বলে সে ঘর থেকে বড় বোতলটি নিয়ে এলো। তারপর হুক দিয়ে বোতলটিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র করল। নিলু হেসে হেসে বলল, কেমন হল? জাবেদ বলল, দারুন। তোর তো দেখি তুহিনের থেকে বুদ্ধি অনেক বেশি। নিলু বলল, আরে তুহিন টুহিন। ওকে গুনার সময় আছে নাকি? নে চল টুনটুনির বাসার সামনে যাই।
দু'জনে চলে গেল টুনটুনি ধরতে। আর কিছু দূর গেলেই টুনটুনির বাসা। নিলু জাবেদ কে বলল, খুব আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে চল। যেন টুনটুনি বুঝতে না পারে তাদের ঝম এসেছে। জাবেদ বলল, আমি এখানে থাকি। তুই এখন একাই গিয়ে ধরে নিয়ে আয়। নিলু আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে বাসার পিছনে গেল। তারপর দুই হাত প্রসারিত করে থাপা দিয়ে খোকসা গাছ থেকে বাসা ছিঁড়ে নিয়ে এলো। জাবেদ বলল, টুনটুনি কোথায়? নিলু বলল, আমার হাতের মধ্যে। বাসা সহ নিয়ে এসেছি। আমার দু'হাতের ভেতর হাত দিয়ে টুনটুনিটা বের কর। দেখিস ছুটে যেন যায় না। জাবেদ হাত দিয়ে বলল, দোস্ত কাম খাম হয়ে গেছে। ডিম ভেঙে গেছে। নিলু বলল, না ভাঙে। নে তাড়াতাড়ি কর। ওরা দেখে ফেললে কিন্তু কেড়ে নিবে। জাবেদ টুনটুনি বের করে নিয়ে এলো। টুনটুনিটা চিৎকার চেঁচামিচি করতে লাগল । নিলু হাত দিয়ে ঠোট চেপে ধরল। বলল, খুব তো চেঁচালি। এখন চেঁচা। তার পর বোতলের মুখ খুলে তার ভেতর ডুকিয়ে দিল। জাবেদ বলল, এখন আমার হাতে দে। আমি নিয়ে যাই। নিলু জাবেদের হাতে দিল। তারপর দু'জন দৌড় দিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।
তার পরের দিন সকাল বেলা ইয়াছিন ঘুম থেকে উঠে টুনটুনির বাসা দেখতে যেতে লাগল। পথের ধারে টুনটুনির বাসা পড়ে থাকতে দেখে দৌড়ে গিয়ে বাসাটি হাতে নিল। তারপর অনেকক্ষণ ভাল করে দেখে ভাবল অনেক দিন আগের। কে বুঝি কোথা হতে এনেছে। যাই টুনটুনির বাসার ওখানে যাই। সেখানে গিয়ে দেখল, টুনটুনির বাসা আর নাই। সে আরো দেখল কিছুদূরে ডিমের খোসা পড়ে আছে। তাই সে দৌড়ে গিয়ে বাসাটি আবার হাতে নিল। তারপর সে বাসাটি হাতে নিয়ে তুহিনদের বাড়িতে গেল। তুহিনকে বলল, দেখ কে জানি বাসাটা ভেঙে ফেলেছে। ডিম ও ভেঙে ফেলেছে। তুহিন বলল, বাসা ভেঙে রেখে গেল আবার ডিমও ভেঙে রেখে গেল। তাহলে তার কি লাভ হল? এমন পাগল তো কোথাও দেখি নাই? ইয়াছিন বলল, তবে যেই হোক তাকে ছাড় দেয়া হবে না। আমি তার হাত ভেঙে ফেলবো।
তারপর দু'জন অন্যান্য বন্ধুদেরকে জানাল। সবাই মন খারাব করে বরই তলায় বসে রইল।
কিছুক্ষণ পরে জাবেদ বরই তলায় এলো। সে হাসি মুখে বলল, আমরা ওই পাড়া থেকে একটা টুনটুনি ধরছি। তুহিন বলল, ওই পাড়া মানে? আমাদের এখান থেকে ধরে নিয়ে গেছ। দেখাচ্ছি মজা। জাবেদ বলল, আমি ধরি নাই। নিলু ধরেছে। সে বলল, হাসুদের ওখান থেকে ধরে এনেছি। আঁখি বলল, চল চল পাখি দেখে আসি। আমি শিয়র ও এখানকার টুনটুনি ধরেছে। জাবেদ বলল, তোদের এখানে আবার কোথায় বাসা? ইয়াছিন বলল, দেখাচ্ছি বাসা। আগে নিলুদের বাড়ি চল।
তারপর সবাই নিলুদের বাড়িতে গেল।
নিলু একা একা পাখির সাথে নানান কথা বলছে। তুহিনরা বোকা। ওদের পাড়ায় বাসা তাই তোকে ধরতে পারল না। আমি ঠিকই ধরে নিয়ে এলাম। এমন সময় তুহিনরা এলো। তারা সবাই কথাটি শুনতে পেল। আঁখি বলল, আমাদের পাখি দে।
এত ছেলেমেয়ের হৈ চৈ দেখে নিলুর মা এগিয়ে এলো। সে বলল, তোরা আবার এসেছিস আমার ছেলের সাথে ঝগড়া করতে। যা যা সবাই আমার বাড়ি থেকে যা। জুঁই বলল, আমাদের পাড়া থেকে ও পাখি ধরে এনেছে। নিলুর মা বলল, তোদের পাড়া থেকে পাখি ধরলেই তোদের দিতে হবে? পাখি তোরা পাবি না। নিলু বলল, আমাদের ছোট গাব গাছ থেকে একবার ঘুঘুর ছা ধরে নিয়ে গেছিলি মনে আছে? আমরা চেয়েছিলাম। ফিরিয়ে দিয়েছিলি? তুহিন বলল, চল যাই। ওদের সাথে পারা যাবে না? ইয়াছিন বলল, চল। একটা টুনটুনিই তো।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
ধান কাটা প্রায় শেষ। মাঠে আর তেমন ফসল নেই। তাই ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ইচ্ছে মত দৌড়াদৌড়ি করতে পারে। যেন দু'চোখ যে দিকে যায়। এ সময় দক্ষিণা বাতাস বয়। ছেলে মেয়েরা ঘুড়ি উড়িয়ে বসে থাকে ক্ষেতের আলে। হঠাৎ যদি ঘুড়ির সুতা কেটে যায়, ঘুড়ির সুতা ধরা ছেলেটা যেন কেঁদে বুক ভাসায়। আর পাশের ছেলে মেয়েরা যেন হাসির কারণ খুঁজে পায়। তারা হাসতে থাকে আর ঘুড়ি উড়ে যায় দূর বহু দূরে, যেন ওই দূরের চিল গুলোর সাথী হয়ে। খোকা অবাক চোখে ঘুড়ির প্রাণে চেয়ে থাকে। কেমন যেন একটা হালকা বাতাস ঢেউ খেলে যায় তার কোমল হৃদয়ে। সে ছুটে যায় আবার নতুন একটা ঘুড়ি বানানোর জন্য।
বরই তলায় বিকেল বেলা আড্ডা জমেছে বেশ। আঁখি বলল, এখন ঘুড়ি উড়ানো যাবে কেউ আর গালি দিবে না । ক্ষেতের ফসল কাটা প্রায় শেষ। দক্ষিণ পাড়ার হাসু দেখলাম ঘুড়ি উড়াচ্ছে। তুহিন বলল, বলিস কি রে? আমাদের আগে উড়াল। আর আমরা বসে বসে আঙুল চুষছি। ইয়াছিন বলল, আর দেরি করা যাবে না। কালকেই মাঠে ঘুড়ি উড়াতে হবে। জুঁই বলল, কাল কি রে- সম্ভব হলে আজই। যদিও সন্ধ্যা হয়। তুহিন বলল, ঠিক বলছিস। আয় কাগজ আর কুঞ্চি নিয়ে আসি। এখনই কাজ শুরু করে দেই। যদি সন্ধ্যার আগে উড়াতে পারি- তাহলে তো ভালোই হয়।
সবাই হরিণের মত দৌড়িয়ে সব কিছু যোগাড় করল। দলের মধ্যে তুহিন ঘুড়ি বানাতে পাকা। সে বানাতে শুরু করল। ইয়াছিন পাশেই চুপটি করে বসে আছে। কারণ সে তাড়াতাড়ি বাবলা গাছের ফল ( যা থেকে এক ধরনের আঠা পাওয়া যায়) পেরে নামতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছে। অনেকটা চামড়া ছড়িয়ে গেছে। সে মাঝে মাঝে হাত দিয়ে টিপে টিপে ধরছে। আঁখি দেখতে পেয়ে বলল, কি হয়েছে ওখানে? ইয়াছিন বলল, কিছু না। বাবলা গাছ থেকে নামতে গিয়ে একটু ব্যথা পেয়েছি। তুহিন বলল, দেখি কোথায়? ইয়াছিন বলল, দূর পাগল। দেখতে হবে না। তুই ঘুড়ি বানা। সুন্দর করে বানাবি। গাইয়া যেন দেয় না ( ঘুড়ি উড়ানোর সময় বাতাসে ঘুড়ি একবার উপরে উঠে আবার নিচে নামে, এমনি করে চরকের মত ঘুরতে থাকে এটিই হচ্ছে গাইয়া ) । আঁখি বলল, ওর ঘুড়ি কি নিলুর মত যে গাইয়া দিবে। ঠিকমত উড়বে না? তারপর বলল, আয় তোর পা টা কাপড় দিয়ে বেঁধে দেই। অনেক রক্ত ঝরছে। ইয়াছিন বলল, আরে না। কিছু করতে হবে না। এমনি ঠিক হয়ে যাবে। আঁখি দৌড়ে বাড়ি গিয়ে একটা ছেঁড়া কাপড় নিয়ে এসে বেঁধে দিল। বলল, কেমন লাগছে। ও ভাবে থাকলে কষ্ট হত না। তুহিন বলল, হয়েছে ওকে আর আদর করতে হবে না। কিভাবে কাজে ফাঁকি দেয়া যায়, ও থাকে সেই তালে। ইয়াছিন বলল, তাতে মনে হয় আমি কিছুই করি নাই। নিজে কাজ করছে আরো কত কিছু শুনতে হবে তার কি ঠিক আছে। জুঁই বলল, তোদের কথায় কানটা জ্বালাপোড়া করছে। এখন একটু চুপ করে থাক। আমার ভাল লাগছে না। তুহিন বলল, তাহলে এখানে আছিস কেনো? বাড়ি গেলেই হয়। জুঁই বলল, আমি চলে যাই আর তোরা ঘুড়ি উড়াস? তুহিন বলল, আজ আর উড়ানো হবে না। সব কিছু যোগাড় করতে দেরি হয়ে গেল। এত তাড়াহুড়া করলাম তাও কাজ হল না। জুঁই বলল, আচ্ছা তাহলে গেলাম। সে দু'হাতে মাথাটা ধরে বাড়ি চলে গেল। সে দিন ঘুড়িটা বানানো হল । কিন্তু দুটি কারণে উড়ানো হল না। এক জুঁই নেই আর দুই সন্ধ্যা হয়ে গেল।
পরেরদিন সকাল বেলা সবাই বরই তলায় এক সাথে হল। তুহিন ঘুড়িটা নিয়ে এলো। ইয়াছিন বলল, আজ এ বছরের প্রথম ঘুড়ি উড়ানো হবে। ঘুড়ি যত দূর উঠে ঠিক তত সুতা ছাড়া হবে। জুঁই বলল, এত সুতা তুই পাবি কোথায়? ইয়াছিন বলল, আমার আব্বু কে আনতে বলবো। তুহিন বলল, যখন আনে তখন বলিস আজ তো আর হচ্ছে না। আঁখি বলল, আমার এক ববিন ( সুতার বান্ডিল) আছে আনবো? তুহিন বলল, এ কথা আবার বলতে হয় নাকি? থাকলে নিয়ে আয়। জুঁই বলল, আমার এক ববিন আছে কিন্তু পুড়ান। ঘুড়ি ছিঁড়ে নিয়ে যাবে কি না? তুহিন বলল, আগে নিয়ে আয়। তারপর দেখা যাবে কি হয়। সবাই সুতার বান্ডিল নিয়ে এলো। এমন সময় তুহিনের মা বলল, এত রোদের মধ্যে ঘুড়ি নিয়ে কোথায় যাচ্ছো? এই বরই তলাতেই থাকো। আর কোথাও যেও না। অসুখ করবে কিন্তু। আঁখির পিছনে পিছনে তার মা এলো। সে এসে বলল, এই সুতার বান্ডিল নিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি। আঁখি বলল, মা ঘুড়ি উড়াবো। কিছু হবে না। আবার সুতা নিয়ে আসবো। মা কথা শুনল না। আঁখির হাত থেকে সুতার বান্ডিলটা নিয়ে গেল। আঁখি বার বার চাইতে গেলে মা হাত তুলে মারতে এলো। তখন আঁখি আর কিছু বলল না। তুহিন বলল, আয়। তোর সুতা লাগবে না। যা আছে এতেই হবে। কিন্তু এখন আর উড়ানো হবে না। এখন উড়ালে মা বকা দিবে। বিকালে উড়াবো। তখন সবাই এসো। এমন সময় আইস্ক্রীম ওয়ালার ঘুন্টি বাজানো শুনা গেল। ইতিমধ্যেই শাকিল আইস্ক্রীম খেতে খেতে বরই তলায় এলো। আইস্ক্রীম ওয়ালা বরই তলায় বসল। তখন সবাই বাড়ি গিয়ে কেউ কেন্দে কেন্দে, কেউ ভাল ভাবে টাকা নিয়ে এলো। আবার কেউ বা টাকা না থাকার কারণে চাউল নিয়ে এলো। আবার কেউ তার মা কে সাথে করে নিয়ে এলো, যদি বাকি নেয়া যায়। সবাই আইস্ক্রীম কিনে খেতে লাগল। ইয়াছিন বাড়ি থেকে মন খারাব করে চলে এলো। টাকা বা চাউল কোনোটাই সাথে নাই। তার মা ও সাথে নাই। তুহিন বলল, কি ব্যাপার আজকে আইস্ক্রীম খাবি না? ইয়াছিন বলল, মা বাড়িতে নাই। ওই পাড়া ডিম কিনতে গেছে। ঘরে তালা দেয়া। এখন কি করবো? তুহিন বলল, এখানে থাক। কোথাও যাস না, এখনই আসছি। সে বাড়ি গিয়ে চুপি চুপি চাল নিয়ে এলো। কারণ সে জানে একবার টাকা দিয়েছে আবার চাইলে খবর আছে। তারপর তারা এক সাথে আইস্ক্রীম খেল।
বিকেল বেলা। ঘুড়িটা নিয়ে সবাই হৈ চৈ করতে করতে ফাঁকা মাঠে গেল। তুহিন সুতা ছাড়ছে আর ইয়াছিন ঘুড়িটা নিয়ে অনেকটা দূরে গেল। তারপর তুহিনকে উদ্দেশ্য করে বলল, হয়েছে? এখন কি ঘুড়িটা ছেড়ে দিবো? তুহিন বলল, আর একটু দূরে গিয়ে তারপর ছেড়ে দে। ইয়াছিন একটু দূরে গিয়ে ছেঁড়ে দিল। এদিকে তুহিন দৌড়াল। কিন্তু ঘুড়ি উড়ল না। মাটিতে গড়াগড়ি খেল। সেখানে নিলু আর জাবেদও ঘুড়ি উড়াচ্ছে। নিলু বলল, হায় রে ঘুড়ি। সবার ঘুড়ি আকাশে আর ওদের ঘুড়ি মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সবাই এসো দেখে যাও। ইয়াছিন বলল, চুপ করে দেখ উড়ে কি না। তারপর আগের থেকে আর একটু দূরে গিয়ে ছেঁড়ে দিল। ওদিক থেকে তুহিন দৌড়াল। ঘুড়ি উড়ে গেল দূর আকাশে। সবাই ঘুড়ির দিকে চেয়ে রইল। ঘুড়ির সুতা তুহিন শক্ত করে ধরে রইল। ইয়াছিন কাছে এসে বলল, কি ব্যাপার সুতা ছাড়স না কেন? সুতা ছাড়। জুঁই বলল, আমার কাছে দে। আমি সুতা ছাড়ি। আঁখি বলল, না আমার কাছে দে। ইয়াছিন বলল, তুহিন ছাড়ুক। আর কারো কাছে দেয়া হবে না। সুতা ছাড়ছে তো ছাড়ছেই। তারপর ইয়াছিন নিলু কে বলল, দেখ এখন আমাদের ঘুড়ি সবার থেকে উপরে। নিলু এখন কিছু বলল না। কারণ তাদের ঘুড়িটা ঠিক ভাবে উড়ছে না। একটু জোড়ে বাতাস উঠলেই গাইয়া দেয়। তারপর সুতা টেনে মাটিতে নামিয়ে কোনো এক দিকে কিছু খড় বেঁধে দেয়। তারপর যথা নিয়মে আবার উড়িয়ে দেয়। কিন্তু বার বার একই অবস্থা। এইভাবে কিছুক্ষণ দেখার পর তুহিন এগিয়ে গিয়ে ঘুড়িটা সেরে দিল। তারপর সে ঘুড়িও উঠল অনেক উপরে। তারা অনেক বান্ডিল সুতা ছাড়ল। তুহিনকে উদ্দেশ্য করে বলল, আমার ঘুড়ি যেন দেখা না যায় এত সুতা ছাড়বো। তুহিন বলল, সেরে দিলাম এখন তো ছাড়বি। তাছাড়া আর কি করবি। সন্ধ্যার একটু আগে নিলুর ঘুড়ির সুতা ছিঁড়ে গেল। তুহিনের দলের সবাই হেসে উঠল। জাবেদ নিলু কে বলল, আমাদের ঘুড়ি তো উড়ে গেল। এখন কি করবি? নিলু বলল, কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর ওদের ঘুড়িও উড়ে যাবে কিন্তু আমাদের ঘুড়ির পিছে পিছে। কারণ আমরা ওদের থেকে উপরে। জাবেদ বলল, কিভাবে? নিলু বলল, আয় আমার পিছে পিছে আয়। তারপর তুহিনের কাছে গিয়ে বলল, দোস্ত তোদের কেমন সুতা? আমাদের তো ভাল সুতাই ছিল, কেনো যে ছিঁড়ে গেল বুঝলাম না। এই বলে সুতায় হাত বুলাতে বুলাতে সুতা ছিঁড়ে দিল দৌড়। তারপর জাবেদ কে বলল, কাজ ফাইনাল করছি। জলদি চল। দু'জন দৌড়াল। তাদের পিছে পিছে তুহিনের দলও দৌড়াল। তুহিন তার ঘুড়ির দিকে অপলকে তাকিয়ে রইল।
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গাঙ। ছেলে মেয়ে-রা প্রতিদিন সেই গাঙে গোসল করে। কেউ ফুটবল, কেউ কলস, কেউ বড় বোতল যার যা আছে তাই নিয়ে জলে নামে। আবার কেউ লুঙ্গির ভেতর হাওয়া দিয়ে ভেসে যায় দূর বহু দূর। যতক্ষণ না তাদের চোখ গুলো লাল হয় ততক্ষণ পর্যন্ত গোসল করে। তারপর দল ধরে উঠে আসে গাঙ থেকে।
এখন বেলা দুপুর। সবারই গোসল করার সময়। তুহিন তার ফুটবল নিয়ে আঁখিদের বাড়িতে গেল। আঁখি বারান্দায় বসে ভাত খেতে ছিল । আঁখি টুল এগিয়ে দিয়ে বলল, বয়। এখনই খাওয়া শেষ হবে। তুহিন বলল, তুই তাড়াতাড়ি ভাত খা। আমি জুঁই কে বলে আসি। ইয়াছিন আর কয়েকজন বরই তলায় দাঁড়িয়ে আছে। আঁখি বলল, তুই যা জুঁই কে ডাক দে, এর মধ্যে আবার আমার খাওয়া শেষ হয়ে যাবে।
তুহিন জুঁইদের বাড়িতে গেল। জুঁই চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়িটা মাথায় তুলছে। তুহিন বলল, কি হয়েছে এমন করছিস কেন? জুঁই তখন কিছু না বলে ঘরের ভেতর গেল। জুঁই এর মা বলল, ওর বড় বোতলটা রাজু নিয়ে গোসল করতে গেছে। তাই ও রকম করছে। তুহিন তখন, জুঁই কে ডাক দিল কিন্তু কোন সাড়া শব্দ পেল না। জুঁই রাগ সামলাতে না পেরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল । এমন সময় তুহিন ঘরের ভেতর গেল। বলল, এ কি কান্ড চল যাই। জুঁই চেঁচিয়ে বলল, ও আমার বোতল কেন নিল? আমি ওর কি নেই? তাড়াতাড়ি বোতল নিয়ে আসতে বল? জুঁই এর মা গাঙের ঘাটে গিয়ে রাজু কে ডাক দিল কিন্তু কোন সাড়া শব্দ পেল না। ভেসে ভেসে গেছে হয়তো অনেক দূরে। তুহিন বলল, চল। আমার বল আজকের মত তোকে দিয়ে দিলাম। আমি লুঙ্গির ভেতর হাওয়া দিয়ে ভেসে থাকবো। জুঁই অনেক খুশি হয়ে বলল, আঁখি, ইয়াছিন ওরা কই? তুহিন বলল, আঁখি ভাত খাচ্ছে দেখে এলাম। এতক্ষণ মনে হয় বরই তলায় এসেছে। জুঁই বলল, চল যাই।
দু'জনে বরই তলার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
হৈ চৈ করে সবাই ঘাটে এলো। গৌতমের আব্বা গোসল করছে। সে বলল, আস্তে আস্তে ঘাটে নামবি বলে দিলাম। পানি জানি ঘোলা হয় না। পানি ঘোলা করলে কিন্তু ধরে ধরে সেই পানি খাইয়ে দিবো। তুহিন বলল, কাকা আমরা আস্তে আস্তে নামবো। এই বলে তুহিন আগে আগে আর পরে জুঁই আর আঁখি আস্তে আস্তে নামল। কিন্তু শাকিল লাফ দিয়ে নামল। তার দেখা দেখি বাকি সবাই লাফ দিয়ে নামল। গৌতমের আব্বা একজন কে ধরে দুইটা চড় দিল। আর সবাই তাড়াতাড়ি ভেসে ভেসে দূরে চলে গেল। অনেকক্ষণ ধরে সে গালাগালি করে তার পর সে জল থেকে উঠে গেল।
একটা কচুরির ঝাঁক ভেসে যাচ্ছে। তুহিন বলল, চল আমরা কচুরির ঝাঁকের সাথে সাথে ভেসে যাই। আঁখি বলল, চল যাই। তারা সবাই কচুরির ঝাঁকের সাথে সাথে ভেসে যেতে লাগল। তারা সবাই হাসা-হাসি করতে লাগল। তাদের সাথে সাথে যেন কচুরির ফুল গুলো হাসতে লাগল। জুঁই একটা কচুরির ফুল ছিঁড়ে লতাটা একটু বাঁকা করে কানে লাগাল । তুহিন ফুলটা ছো মেরে নিল। জুঁই আরেক টা লাগাল। সে বার ও তুহিন ফুলটি নিয়ে দূরে ফেলে দিল। জুঁই তখন বলল, আর একবার যদি নিস তাহলে কিন্তু আমি বাড়ি চলে যাবো। তুহিন বলল, তুই বাড়ি গেলে তাই আমার কি? কানে কচুরির ফুল নেওয়া লাগে। শখ দেখে আর বাঁচি না। জুঁই রাগ করে বলল, নে তোর বল। আমি এমনি করে ভেসে থাকতে জানি। এই বলে ঢিল দিয়ে বলটা তুহিনের দিকে ছুঁড়ে মারল। তুহিন বলল, নি ফুল গুলো দুই কানেই নি। আর নেবো না। এই বলে বলটা জুঁই এর দিকে ছুঁড়ে দিল। জুঁই বল টা ধরতে যাবে অমনি শাকিল বল টা ধরে দিল ডুব। সে দশ হাত দূরে গিয়ে উঠল। তুহিন বলল, বল টা জুঁই কে দে। শাকিল বলল, একটু পরে। একটু জিরিয়ে নেই। সে কিছুক্ষণ রাখার পরে জুঁই কে বল ফিরিয়ে দেবার সময় আঁখি বল টা ধরে ফেলল। জুঁই কিছু বলছে না চুপচাপ সাঁতার কাটছে। তুহিন বলল, জুঁই কে বল টা দে। এতক্ষণ হল এমনি এমনি ভেসে আছে। তলিয়ে যাবে তো। আঁখি জুঁই কে বলল, আমার বোতল নিবি? জুঁই বলল, না। আমি তোর বোতল নেবো কেন? বল নিলি বল দে। তুহিন মুখটা রাগান্বিত করে বলল, দে ওকে বলটা দে। তখন আঁখি জুঁই কে বল টা দিয়ে দিল।
তারা ভেসে ভেসে অনেক দূরে গেল। তাদের চোখ গুলো লাল হয়ে গেল। জুঁই বলল, আমার চোখে কাটা কাটা কেমন যেন গজ গজ করছে। আঁখি বলল, এই এবার বাড়ি চল। আমরা অনেক দূরে এসেছি। তুহিন বলল, চল। আজ অনেক ডুব দেয়া হয়েছে। আমারও চোখ জ্বালা পোড়া করছে। সবাই বাড়ির দিকে ফিরে এলো। ঘাটে তুহিনের মা দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, এসো বাছা ধন। সেই খেয়ে দেয়ে নেমেছো আর উঠার কথা নাই। সবাই যে যার মত উঠে গেল। তুহিন সাহস করে উপরে উঠতে পারছে না। মা যেহতু ঘাটে এসেছে নিশচয় মারবে। জুঁই উপরে দাঁড়িয়ে আছে। আর সব বাড়িতে চলে গেছে । তুহিনের মা ঘাটে কার সাথে যেন কথা বলছিল। এই ফাঁকে জুঁই ইশারা করে বলল, আয় উঠে আয়। মা যাতে বুঝতে না পারে তাই তুহিন চুপি চুপি তাদের পাশ দিয়ে উঠে এল।
বিকেল বেলা। একটা লোক দুইটি বানর নিয়ে বরই তলার পথ ধরে যেতে লাগল। তুহিন লোকটাকে ডাক দিয়ে বরই তলায় বসাল। তুহিনের মা সেখানে ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে লোক জমে গেল। যেন সারা পাড়ার লোক সেখানে এসেছে। জুঁই আর আঁখি কুলা নিয়ে বের হল পাড়ায়। কারণ বানর খেলা দেখতে হলে তাকে চাউল বা টাকা দিতে হয়। যাওয়ার সময় আঁখি বলে গেল, আমরা ফিরে না আসা পর্যন্ত যেন সে খেলা শুরু না করে।
তারা এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে চাউল তুলতে লাগল। কেউ চাউল বা দুই চার টাকা দিতে লাগল। এ দিকে সবাই বলতে লাগল নেন ভাই আপনার বানর খেলা শুরু করেন। সে বলল, আর একটু দেরি করেন। এইতো এখনই শুরু করবো। সবাই বলল, এই কথা বলে বলে আমাদের কতক্ষণ এভাবে রাখবেন।
কিছুক্ষণ পরে জুঁই আর আঁখি ফিরে এলো। এবার বানর খেলা শুরু হল। সে বলল, আমার পরিচয়টা আগে দিয়ে নেই। আমার নাম চিংকু। সবাই আমাকে কাকু বলেই ডাকে। আর এই দুইটা দেখছেন ( বানর দুটি দেখিয়ে) এদের নাম রিংকু আর জাংকু। সবাই হেসে উঠল। বানর দুটি লাফালাফি শুরু করল।চিংকু বলল, এই আস্তে আস্তে কাউকে ভয় দেখাবি না। তারপর সে লাঠি দিয়ে গোল করে দাগ দিয়ে বলল, যে এই দাগের মধ্যে আসবে তার পা ন্যাংড়া হয়ে যাবে। সবাই দাগ হতে দূরে সরে গেল। এবার বলল, সাহস করে একজন এসো তো বাবারা। আঁখি তুহিনকে বলল, যা। তা না হলে খেলা জমবে কি করে? তখন চিংকু তুহিনকে বলল, এসো বাবা। ভয় নাই। বানর কিছু করবে না। তুহিন ভয় পেয়ে বলল, ন্যাংড়া হবো না তো? চিংকু বলল, তোমার কিছু হবে না। এসো তো এখন। তুহিন এগিয়ে গেল। এবার শুরু হল আসল খেলা।
পাড়ায় যারা বাড়িতে কাজে ব্যস্ত ছিল তারাও এবার দ্রুত বরই তলায় এসে উপস্থিত হল। খেলা দেখতে লাগল। বরই তলা সবার হাসিতে কাঁপতে লাগল।
চিংকু তুহিন কে বলল, বাবা বানরকে বউ সাজতে বলো? দেখো সে সাজতে পারে কি না? আঁখি জুঁই, ইয়াছিন, শাকিল- বানর বউ সাজবে বলে সবাই চেঁচাতে লাগল। চিংকু বলল, সবাই এ রকম কথা বললে খেলা এখই বন্ধ করে দিবো। চুপচাপ খেলা দেখো। এবার তুহিন বলল, এই বানর বউ সাজ। নতুন বউ যেমন করে বসে থাকে বানর ঠিক সেই রুপ করল। তুহিন এবার বলল, বউ তো সাজা হল। এখন বলতো এদের মধ্যে তোর বর কোনটা? বানর কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করল। দাগের চারদিকে ঘুরতে লাগল। তারপর ইয়াছিনের প্যান কামড়ে ধরল। একটা হাসির রোল পড়ে গেল। সবাই বলতে লাগল, ইয়াছিন তাহলে বানরের বর? ইয়াছিন বানরের এই রকম ব্যবহারে ভয় পেয়ে গেল। ভিড়ের মধ্য থেকে তার মা ইয়াছিনকে ধরে বলল, ভয় নেই বাবা। ও তোমার কিছুই করবে না। তারপর চিংকু কে বলল, এবার যৌতুকের টাকা দেন। এমনি এমনি তো আর ছেলের বিয়ে দিতে পারি না। তখন আবার হাসির ঢোল বেজে উঠল।
বানর খেলা শেষ হল। সবাই বাড়ি চলে গেল। কিন্তু এই বরই তলার দল ছাড়া । চিংকু আবার অন্য পাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। জুঁই বলল, এখন কোন পাড়ায় যাবেন? চিংকু বলল, যাই দেখি। সামনে যে পাড়া পরে সেই পাড়ায়। আঁখি বলল, তাহলে তো নিলুদের পাড়ায়। তুহিন বলল, যাবি তোরা? শাকিল বলল, চল যাই। আবার দেখে আসি।
তারপর তারা চিংকুর পিছে পিছে রওনা দিল নিলুদের পাড়ার দিকে।
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
সকাল বেলা। কুয়াশায় ভরা চারদিক। তুহিন তার চাদর গায়ে জড়িয়ে বরই তলায় এলো। ইয়াছিন এলো চার পাঁচটা গেঞ্জি গায়ে। আঁখি দুইটি জামার উপর দিয়ে চাদর জড়িয়ে এলো। জুঁই আর শাকিল এলো সুয়েটার গায় দিয়ে। আঁখি ইয়াছিনকে বলল, বাড়িতে কি আর গেঞ্জি নাই। ইয়াছিন বলল, টিটকারি করবি না বলে দিলাম। আমার শরীরটা আজ ভাল নাই। তার পর শীতও পড়েছে খুব। সাধে কি আর এতো গুলো গেঞ্জি গায় জড়াই। আঁখি বলল, হয়েছে আর ডায়লগ দিতে হবে না। এমনিতেই বুঝতে পারছি। ইয়াছিন বলল, এমনি যদি বুঝিস তাহলে জিজ্ঞাস করিস কেন? আর তুইও তো কম পড়ে আসিস নাই। দুই তিনটা জামা তার উপরে আবার চাদর। আঁখি এবার কিছু বলল না। তুহিন বলল, যার যা লাগবে সে তো তাই পরবে। এত গুলো পড়ে যদি তবুও শীত লাগে তাহলে সে আরও পড়তে পারে। আর যদি কারও গরম লাগে তাকে তো আর জোড় করেও এ রকম কাপড় জড়ানো যাবে না। জুঁই বলল, তা ঠিক। তুহিন বলল , তুই এই একটা হালকা সুয়েটার পড়ে এই কুয়াশার মধ্যে এলি, তোর শীত লাগছে না? জুঁই বলল, বাড়িতে গরম গরমই লাগল। এখন এই কুয়াশার মধ্যে শীত শীতই লাগছে। শাকিল তখন বাড়ি যেতে লাগল। তুহিন বলল, কি ব্যাপার কোথায় যাস? শাকিল বলল, বাড়িতে যাই। আর একটা গায় দিয়ে আসি। তাছাড়া এখানে বসে থাকা যাচ্ছে না। তুহিন জুঁই কে বলল, তুইও যা। গরম কাপড় পড়ে আয়। না হলে যে ঠান্ডা লেগে যাবে। ওরা দু'জন বাড়ি চলে গেল।
আঁখি বলল, তুহিন তুই একটা গান গেয়ে শুনা। শুনতে শুনতে শীত ছেড়ে যাবে। তুই তো ভাল ভাল গান জানিস। তুহিন বলল, ভাল ভাল গান জানি কিন্তু ভাল করে গাইতে পারি না। ইয়াছিন বলল, তোর এই গানটা বেশি ভাল লাগে। ও সাথী রে... তুমি ছাড়া ভাল লাগে না। তুহিন বলল, এ তো আমার প্রিয় গান। শুধু এটাই একটু ভাল করে গাইতে পারি। আঁখি বলল, আমারও প্রিয় গান। নে এই গানটাই গা। তুহিন গাইতে লাগল, ও সাথী রে...তুমি ছাড়া ভাল লাগে না। জুঁই আর শাকিল ফিরে এলো। জুঁই গানটা শুনে সেও গাইতে লাগল - ও সাথীরে... তুমি ছাড়া ভাল লাগে না। তারপর আঁখিও গাইতে লাগল। পর পর শাকিল, ইয়াছিনও গাইতে লাগল। এমন সময় নিলু আর জাবেদ চাদর মুড়ি দিয়ে কুয়াশায় ভিজে এলো। নিলু গলা ছেড়ে গাইতে লাগল, ও সাথী রে...তুমি ছাড়া ভাল লাগে না। জাবেদ বলল, দূর শালা। এভাবে মানুষ গান গায়। জাবেদ গাইতে লাগল, ও সাথীরে... তুমি ছাড়া ভাল লাগে না। গানে গানে এই সকাল বেলা আনন্দে ভরে গেল। ওরা যে দিন যে গানটা গায় সারা দিন সেই গানটাই গেয়ে যায়। তবে পুরোপুরি নয়। যে লাইনটা ভাল লাগে সেই লাইনটাই বার বার গেয়ে উঠে।
আপাতত গানের পর্ব শেষ হলে জাবেদ বলল, আমরা সবাই শিলপোহা হয়ে গেছি রে...আঁখি বলল, শিলপোহা কি রে, বলতে হয় শিল্পি। গানের শিল্পি বুঝলি? জাবেদ বলল, তুই বুঝালি আর আমি বুঝবো। তাহলে তো তুই আমার ম্যাডাম হয়ে গেলি। ম্যাডাম হওয়ার খুব শখ তাই না? আঁখি বলল, চুপ কর বাঁদড় কোথাকার। এত বেলা খুব ভাল ছিলাম। কোনো কথা ছিল না। ওই পাড়া থেকে এই বাদড় গুলা এলেই এই রকম হয়। নিলু বলল, এর মধ্যে আবার আমাকে জড়ালি কেন? আমি কি কিছু করছি? আঁখি বলল, তোদের দু'জনই এ রকম। কেউ কম নয়। নিলু বলল, তোদের এই পাড়ায় এসে জীবনে খুব গালি শুনলাম। জুঁই বলল, তাও তো আমাদের এ পাড়ায় আসা বাদ দেস না। নিলু বলল, আর আসবো না এই বলে দিলাম। দু'জন বাড়ি চলে গেল।
বরই তলায় আর আসবে না, শত শত বার বলা হয়ে গেছে নিলুর। তারপর ও আসে। ঝগড়া লাগায়। গালি শুনে রাগ করে চলে যায়। আবার পরের দিন এসেই সবার সাথে মিল হয়ে যায়। এভাবেই চলতে থাকে তাদের দিন গুলো।
আঁখি বলল, বলতো আমাদের মসজিদের সভা আর কয় দিন বাকি আছে? শাকিল হাতের কড় গুনে গুনে বলল, আর মাত্র চারদিন বাকি। তুহিন বলল, এবার সভায় তবারক নিবো তিন ঠোংগা। তুহিন বলল, খাওয়ার কথা তো মনে থাকে। সভা শুনার নামে নাই। সারা রাত ঘুম পাড়ে। আর মাঝ রাতে ঘুম থেকে উঠে তবারক নিয়ে আসা। কত পাপ হয় তোর জানিস? ইয়াছিন বলল, আমি কি অত রাত জাগতে পারি নাকি? যতক্ষণ ঘুম আসে না ততক্ষণ তো শুনি। তারপর ঘুম এলে আমি কি করবো? মা যখন অনেক রাতে ডাক দেয় তবারক আনার জন্য মাকে কত গালি দেই। আমার তবারক লাগবে না। কিন্তু যখন মনে পড়ে সবাই তবারক নিবে আর আমি বাকি থাকবো। তখন আমি আর ঘুমিয়ে থাকতে পারি না। আমার কি দোষ? তুহিন বলল, এবার কিন্তু আর ঘুমানো হবে না। আমরা সবাই পুরো সভা শুনবো। ইয়াছিন বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। জুঁই বলল, এই গান গাইলি আবার এখনই এত ধার্মিক হয়ে গেলি। তুহিন বলল, গানের সময় গান গেয়েছি। এখন সভার কথা হচ্ছে- গানের কথা বাদ। আঁখি জুঁইকে বলল, ঠিকইতো এখন সভার কথা হচ্ছে তুই গানের কথা মনে করে দিলি কেন? জুঁই বলল, ঠিক আছে আর গানের কথা বলবো না। শাকিল বলল, খুব শীত লাগছে। নে এখন ছাউছি খেলি। তাহলে শীত ছেড়ে যাবে। তুহিন বলল, তুই এই মাত্র আরো দুইটা জামা গায়ে দিয়ে এলি। তাও শীত লাগছে। আঁখি বলল, এ তো গায়ের শীত না, খেলার শীত লাগছে। সবাই হেসে উঠল।
ছাউছি খেলার জন্য সবাই প্রস্তুত হতে লাগল। ইয়াছিন বলল, আমার দলে আজকে কিন্তু জুঁইকে আর আঁখি কে চাই? তুহিন বলল, তাহলে আজ খেলা বাদ থাক। নিলু থাকলে তাও একটা ভাগ থাকত। শাকিল বলল, আমি আর তুহিন এক দলে। আর তোরা সবাই এক দলে। তুহিন বলল, একদম ঠিক। তারপর ইয়াছিনকে বলল, তোর যখন হেরে যেতে এতই ভয়। শুধু শাকিল বাদ দিয়ে সবাই কে নিয়ে নি। দেখি খেলা আজ কেমন চলে। আঁখি আর জুঁই বলল, না এভাবে খেলা যাবে না। হেরে গেলে মানসম্মান সব ধূলায় মিশে যাবে। সবাই বলবে ওরা দু'জন আর বরই তলার সবাই। তাও খেলায় জিততে পারে নাই। তুহিন বলল, তোরা এত ভীত আগে জানতাম না তো? আমরা দু'জন আর তোরা সবাই। তার পরও হেরে যাওয়ার ভয় পাস। আঁখি বলল, তোকে দিয়ে বিশ্বাস নেই, তুই পারতেও পারিস। তুহিন বলল, আচ্ছা তাহলে থাক। ইয়াছিন বলল, আমরা খেলবো দেখি তুহিন কিভাবে আমাদের সাথে পারে? ওর নাম্বার আজ শেষ করে দিবো। শাকিল বলল, নে দেখি আজ কারা পারে? আমরা দু'জন আর তোরা বরই তলার সবাই। নিলু আর জাবেদ আশে পাশে দিয়ে উঁকি মারতে লাগল কিন্তু বরই তলায় আসছে না। আঁখি দেখে ডাক দিল। তোরা তাড়াতাড়ি আয়। আমরা সবাই এক দলে তুহিন আর শাকিল এক দলে। ওরা দৌড়ে এসে দলে যোগ দিল। তুহিন বলল, এই এমন তো কথা ছিল না। বরই তলায় যারা ছিল তাদের সবাই কে দেয়া হয়েছে কিন্তু ওরা তো বাইরে ছিল। জুঁই বলল, তুহিন তাহলে এবার ভয় পেলো। শাকিল বলল, তুহিন ভয় পাওয়ার মানুষ না। খেলা শুরু কর।
খেলা শুরুর আগে ইয়াছিন বলল, এখন টস দে। শাকিল বলল, তোরা সব গাধা নাকি? সবাই কে দিয়েছি তারপর ও টস দিবি মানে? এখন আঁখি বলল, তোরা আগে খেল।
এবার ছাউছি খেলা শুরুর পথে। শাকিল হল ছাউ। তুহিন -শাকিলের কানে কানে বলল, আমাদের পাট্টি শেষ হওয়ার সাথে সাথে কিন্তু পালাতে হবে। শাকিল বলল, হ্যাঁ তাইতো। ওদের সাথে কি আর পারা যাবে। আঁখি বলল, এই তোরা কানে কানে কি বলিস? তুহিন বলল, কানে কানে কি বলছি যদি তোদের শুনানো যেন তাহলে কি আর কানে কানে বলতাম। সব গাধা কোথাকার। জুঁই বলল, তাড়াতাড়ি খেলা শুরু কর।
খেলা শুরু হল। তুহিন দম দিল- ছাউছি ছাউ নিবার আইছি... ছাউছি ছাউ নিবার আইছি... ছাউছি ছাউ নিবার আইছি... প্রথম দম শেষ হল। ইয়াছিন বলল, সবাই হুশিয়ার। এখন থেকে ছাউ ভাল করে দেখে রাখতে হবে। তুহিন ইয়াছিনকে বলল, কয় দমে খেলা? ইয়াছিন বলল, সাত দমে। আঁখি বলল, এত কম দমে ওরা ছাউ নিতে পারবে না। পনেরো দমে। শাকিল বলল, তোদের চিন্তা কর? আমাদের চিন্তা করতে হবে না। তুহিন বলল, বিশ দমে খেলা। ইয়াছিন বলল, হ্যাঁ ঠিক আছে । এবার পরের দম দে। তুহিন পরের দম দিল- কুত...কুত...কুত...এবার নিবো ছাউ... কুত...কুত...নিলু বলল, এই দম খাইছে। সবাই তুহিনের উপর ঝেপে পড়ল। আঁখি বলল, এই দম খায় নাই। সবাই দূরে যা। তুহিন ঘরে ফিরে দম শেষ করল। তারপর বলল, নিলু মরা, জাবেদ মরা, জুঁই মরা আরো কয়েক জনের নাম বলল। নিলু বলল, তুই দম খাস নাই? তুহিন বলল, কোথায় দম খেলাম? কুত কুত দিয়ে বলেছি- এবার নিবো ছাউ। তাই দম খাওয়া হল। আঁখি বলল, তোদের বললাম, ও দম খায় নাই। এটা ওর চালাকি। শাকিল বলল, কেমন হল। আমরা পারবো কি না? ইয়াছিন বলল, আগে খেলা শেষ করতো? পরের দমে তুহিন ছাউ নিল। সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
খেলা আবার পুনরায় শুরু হল। এবারও শাকিল ছাও। এবার রহিম দম দিল - কুত... কুত...কুত....।প্রথম দম বলে সবাই দূরে দূরে রইল। তুহিন পরের দম দিবে , এমন সময় আঁখি বলল, সবাই হুশিয়ার। গত বারের মত কিন্তু দম দিতে পারে। রহিম দম দিল- এই আঁখি জুঁই ইয়াছিন... সবাই দাঁড়িয়েই রইল, সবাই কে ছুঁয়ে এলো। শুধু আঁখিকে ছুঁতে পারল না। ঘরে ফিরে বলল, সবাই মরা। সবাই অবাক হয়ে গেল। তুহিনকে বলল, তুই কি দম দিছা। তুহিন বলল, দম দেয় নাই মানে? নিলু বলল, আমরা তো মনে করছি , তুই আঁখি, জুঁই, ইয়াছিনকে ডাক দিলি, কিছু বলবি মনে হল। এই ভাবে তোর দম ছিল তাতো জানতাম না? শাকিল বলল, সব টেকনিক। তোরা যদি এমন টেকনিক জানতি তাহলে তোরাও খেলায় পাকা হতি, বুঝলি? জাবেদ বলল, শালা তুহিনের দলে গিয়ে এখন বড় বড় কথা। শাকিল বলল, চুপ কর। দেখ খেলা কোথায় নিয়ে যাই? ইয়াছিন বলল, আমাদের পাট্টি আসুক। তখন দেখাবো মজা।
এভাবে অনেকক্ষণ চলল। এক সময় তুহিন দম দিলে, শাকিল ঘরে আসার ঝুঁকি নিয়ে মারা গেল। সবাই হৈ হৈ করে উঠল। আমাদের পাট্টি ফিরে পেলাম। নিলু খুশিতে এক লাফ দিয়ে বরই গাছে উঠল। খুশিতে সবাই এ দিক সে ঘুরতে লাগল। আঁখি বলল, এই তুহিন কোথায়? সবাই তো খুশিতে ঘুরাঘুরিতে আর লাফালাফিতে ব্যস্ত। নিলু গাছ থেকে উঁকি মেরে বরই তলার চারিদিক দেখে বলল, শাকিল কেউ তো দেখছি না। সবাই বলল, চারদিকে খুঁজে দেখো। জুঁই বলল, এমনিতে কি এত মানুষ দিল। মনে আছে চালাকি। আঁখি বলল, আমাদের পাট্টি না দিয়ে কোথায় যায় দেখে ছেড়ে দিবো। নিলু বলল, ওরা আর এ বেলা এলে তো? দেখ চালাকি করে আমাদের শুধু শুধু খাটালো। আর আমরা সবাই কিছুই বুঝতে পারলাম না। সবাই যেন গোল আলুর দল। ইয়াছিন বলল, সবাই পাড়ায় বেড়িয়ে যাও। দেখো কোথায় লুকিয়ে আছে? সবাই যার যার মতো বেড়িয়ে যাও।
বরই তলর এক পাশে দুটো ছোট সাইজের ঝোপড়া নিম গাছ। দু'জন তাড়াতাড়ি সেই নিম গাছে উঠে বসে আছে। কেউ খেয়াল করে নি।
শাকিল বলল, কেমন হল। সবাই তো সারা পাড়ায় খুঁজছে লাগল । কিন্তু আমাদের কোথাও পাবে না। ওদের পাট্টি দেয়া হল না। তারপর খিক করে হেসে উঠল। তুহিন বলল, কথা বলিস না। চুপ করে বসে থাক কেউ আসতে পারে। দেখছিস না সবাই ঘুরাঘুরি করছে।
সারা পাড়া খুঁজে খুঁজে দেখে সবাই বরই তলায় ফিরে এলো। আঁখি বলল, কত জন কে ওদের কথা জিজ্ঞাস করলাম। কেউ তো বলতে পারল না। তাহলে ওরা কোথায় গেল। নিলু বলল, ওরা থাক। আমরা আর ওদের খুঁজতে যাবো না। অনেক খুঁজেছি। জুঁই বলল, আমরা এখন অন্য কিছু খেলি। ইয়াছিন বলল, তোরা খেল আমি আবার খুঁজতে গেলাম। এমন সময় তুহিন নিম গাছের আড়াল থেকে কোকিলের মত করে বলল, কু...। সবাই চারদিক তাকাল। আঁখি বলল, এই আশে পাশেই আছে। ভাল করে খুঁজে দেখ। সবাই আবার খুঁজতে লাগল।
কিন্তু কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর আঁখি আর জুঁই বরই তলায় এলে শাকিল তুহিনের মত করে কু... বলতে গেলে আঁখি বলল, জুঁই রে ওদের পেয়ে গেছি। আয় ওই নিম গাছের ওখান থেকে শাকিলের কন্ঠ ভেসে এলো। জুঁই আর আঁখি নিম গাছের আশে পাশে ভাল করে দেখল। তারপর চলে যেতে লাগল, এমন সময় তুহিন গাছ থেকে আবার সেই কু...। আঁখি এবার বুঝে ফেলল। বলল, ও শালারা তোমরা নিম গাছের ঝোপে। তারপর নিম গাছের গোড়ায় গিয়ে বলল, নাম। জুঁই বলল, আপনারা অনেক জ্বালিয়েছন এবার নেমে পড়ুন। আমাদের পাট্টি দিবে কে? আঁখি কুঞ্চি নিয়ে এল। তুহিন বলল, দিবো। ভাল ভাবে নামতে দিলে দেবো? জুঁই বলল, এবার নাম। দু'জন গাছ থেকে নেমেই দিল দৌড়। পিছে পিছে আঁখি আর জুঁইও দিল দৌড়। আঁখি বলল, তোরা থাম। ভাল হবে না কিন্তু বলে দিলাম। জুঁই বলল, না থামলে তোদের আর কোনো দিনও খেলায় রাখা হবে না। এবার শাকিল বলল, আমাদের কি নিলু পাইছো? দৌড় দৌড় আবার দৌড়।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
জুঁই আজ সবার আগে বরই তলায় এলো। বরই তলা ফাঁকা। সে কি জানি ভেবে মাটিতে বসে একটা কুঞ্চি দিয়ে আঁকা আঁকি করছিল। কিছুক্ষণ পর তুহিন এলো। জুঁই তুহিনকে দেখে পা দিয়ে সব লেখা মুছে ফেলল। তুহিন বলল, কি লিখছিলি? জুঁই বলল, ও কিছু না। এমনি বসে ছিলাম তাই কুঞ্চি দিয়ে...। তুহিন বলল, থাক দেখতে দে আমায়। জুঁই দেখতে দিচ্ছে না। তাড়াতাড়ি মুছতে গিয়ে সব লেখা ভালভাবে মুছতে পারে নি। তাই জুঁই সে জায়গায় জায়গায় পা দিয়ে ডেকে রাখার চেস্টা করল। তুহিন বলল, পা সরা। সে পা না সরালে তুহিন ধাক্কা দিয়ে সরায়ে দিল। জুঁই তখন এক দৌড়ে বাড়িতে গেল। তুহিন বসে বসে সেই লেখা গুলো পড়ার চেস্টা করল। কিন্তু ভাল করে পড়তে পারল না। তারপর মনে মনে বলল পাগল কোথাকার।
এমন সময় আঁখি এলো। সে তুহিনকে বলল, এ ভাবে কি দেখিস এখানে? তুহিন বলল , কিছু না। তারপর সেও বসে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর বলল, বোঝা যাচ্ছে না, কি সব লেখা। উঠ এখান থেকে। চল আমাদের বাড়িতে যাই। তুহিন বলল, তোদের বাড়ি কেন? আমার কাজ আছে যেতে পারবো না। তবে দরকারি কাজ হলে যাবো, আগে বল। আঁখি বলল, আগে চল। সেখানে গিয়েই দেখবি। তুহিন আঁখির সাথে তাদের বাড়িতে গেল।
আঁখি খাতা আর কলম নিয়ে বলল, ওই গানটা লিখে দে। আমার প্রিয় গান, খুব ভাল লাগে। তুহিন বলল, কোন গান? আমি তো কত গানই গাই। দিনের ভেতর হাজারটা। একটার মাঝের লাইন আবার একটা শেষের লাইন। ঠিক ঠিকানা নাই গানের। যখন যে লাইন ভাল লাগে তখন সে লাইনটাই গাই। আঁখি বলল, ওই যে সে দিন গাইলি ( তারপর সে সুর করে গাইল) ও সাথী রে... তুমি ছাড়া ভাল লাগে না। তুহিন বলল, মনে পড়েছে। তারপর খাতায় লিখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আঁখি বলল, তোর মনে যা আসছে তাই লিখছিস। পুরো গান আমি খালার বাড়ি টিভিতে শুনেছি। তুহিন বলল, লিখতে বললি লিখে দিচ্ছি। ভুল কি ঠিক তাতো জানি না। সেই কবে শুনেছি। গানটা শুনে যে টুকু ভাল লেগেছিল শুধু সে টুকুই মনে রেখেছি। আঁখি বলল, থাক আর লিখতে হবে না। তুহিন বলল, এইতো বুঝে ফেলেছিস। আমি চললাম। আঁখি বলল, ঝুরি খাবি? খুব ভাল, মচমচা। তুহিন বলল, খাবো না। তারপর হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দৌড়। আঁখি বলল, সবটি নিয়ে যাস না। অর্ধেকটি দিয়ে যা। তুহিন ফিরে এসে বলল, নে তোর ঝুরি। আমার খাওয়া লাগবে না। আঁখি বলল, রাগ করিস না, যা সবটি নিয়ে যা। তুহিন এবার কয়েকটি নিয়ে সব আঁখিকে ফিরিয়ে দিল। তারপর বলল, বরই তলায় কখন যাবি? আঁখি বলল, সময় হলেই যাবো। তুহিন বুঝে ফেলল, সে কখন যাবে। তারপর ঝুরি খেতে খেতে বরই তলায় এসে দেখল, জুঁই আর মারুফা বসে আছে। জুঁইকে বলল, ঝুরি খাবি? নে হাত পাত। সে ঝুরি নিতে নিতে বলল, কোথা থেকে এলি এই ঝুরি নিয়ে। তুহিন বলল, আঁখিদের বাড়ি থেকে। খুব ভাল ঝুরি। জুঁই বলল, একাই গিয়েছিলি? তুহিন বলল, হ্যাঁ একাই তো। কেনো কি হয়ছে? জুঁই বলল, কিছু না। আজ খেলবি না ? তুহিন বলল, এখনই খেলা? দেরি আছে এখনও। সবাই আসুক। তুহিন বাড়ির দিকে রওনা দিল।
কিছুক্ষণ পরে সবাই বরই তলায় উপস্থিত হল। শাকিল বলল, আজ মার্বেল দিয়ে টোন খেলা হবে। ইয়াছিন বলল, তা তো অবশ্যই তারপর মাটির ঢিলা দিয়ে বরই গাছে ঢিল ছুড়ে মারল। সে ঢিল দিয়ে বরই পাড়তে পাকা। প্রায় প্রতিবারই অনেক গুলো করে বরই পড়ে। সে খেলতে খেলতে মাঝে মাঝে এ রকম করে বরই পাড়ে। এবারও অনেক গুলো পড়ল। সবাই যার যার মত বরই কুড়াতে লাগল। তুহিন বলল, এই তাড়াতাড়ি কুড়া। মা এলে কিন্তু বকা দিবে। তারপর সে একটা বরই দিয়ে বরই গাছে ঢিল ছুড়ে দুইটা বরই পারল।
এবার মার্বেল দিয়ে টোন খেলা শুরু হল। জুঁই হল চোর। সে গর্তে মার্বেল রাখল আর সবাই তাদের নিজ নিজ মার্বেল ছুড়ে দিয়ে জুঁই এর মার্বেলের গর্তে দেয়ার চেস্টা করল। ইয়াছিনের মার্বেল জুঁই এর মার্বেল থেকে অনেকটা দূরে গেল এবং সে হাতের আঙুল বাকিয়ে ছুড়ে দিল গর্তের দিকে। কিন্তু জুঁইএর মার্বেলে লাগাতে পারল না। ফলে সে মরা গেল ( খেলা থেকে বাদ পরে গেল) । এভাবে তুহিন ছাড়া সবাই মারা গেল। তুহিন গর্তের পর গর্ত পার করে তাদের পাড়া ছাড়িয়ে নিলুদের পাড়া ছাড়িয়ে নিয়ে গেল হাসুদের পাড়াতে। নিলু আর জাবেদ তাদের পাড়া থেকে তুহিনদের সাথে সাথে চলল। জাবেদ বলল, জুঁইয়ের আজ খবর আছে। সবাই তুহিনকে বলতে লাগল, এখন মরা দে। অনেক খেলা হয়েছে। এভাবে খেলা চলতে থাকলে জুঁই কিন্তু কেঁদে ফেলবে। জুঁই কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে লাগল, ইচ্ছে করে মরা দিতে হবে না। যতক্ষণ খেলতে পাড়ে খেলুক। হাসুদের বাড়ির কাছে নিয়ে গেল। হাসু বলল, কোথা থেকে এভাবে নিয়ে আসা হচ্ছে শুনি? আঁখি বলল, আমাদের বরই তলা থেকে। হাসু বলল, এখন খেলা বাদ দে। ওর চোখে পানি টলমল করছে। সবার কথাতে জুঁই এর খুব খারাব লাগছে। তুহিন বলল, ঠিক আছে মরা দিলাম। এই বলে মার্বেল অন্য দিকে ছুঁড়ে মারল।
জুঁই দম দিতে গেলে তুহিন বলল, এত পথ তুই দম দিয়ে যেতে পারবি? নিলু বলল, সবার কিল খেতে খেতে আজ জুঁইয়ের বারোটা বাজবে। তুহিন বলল, কিসের কিল। দম টম কিছুই হবে না। সবাই এমনিতেই বাড়ি ফিরে চল। তুহিনের বিরুদ্ধে নিলু বলল, জুঁই চোর হয়েছে বিধায় বাঁচা দিলি। আমি যদি হতাম তাহলে আর এমন হত না। সবাই আমায় কিল দিতে দিতে মেরেই ফেলতি। জুঁই কিছুই বলল না।
তারপর সবাই বরই তলার দিকে রওনা দিল।
বরই তলা এতক্ষণ নীরব ছিল। তারা সবাই ফিরে আসলে আবার বরই তলা কলাহলে ভরে গেল। পাখি গুলো যেমন বাঁশ ঝাড়ে সকাল সন্ধ্যা কিচিরমিচির করে বাঁশঝাড়কে মুখরিত রাখে ঠিক তেমনি এই পাড়ার ছেলে মেয়েরা এই বরই তলায় সারা বেলা হৈ চৈ করে বেড়ায়।
আঁখি বলল, আমি যদি চোর হতাম আর আমাকে এভাবে নিয়ে যেতো আমি মরেই যেতাম। জুঁই দেখে এখনও বেঁচে আছে। নিলু বলল, ওর কি কোনো কিছু হয়েছে। না দম দিয়েছে, না কিল খেয়েছে। আমরা হলে ঠিকই দম দিতে হত। দম ফুরালে সেখান থেকেই কিল শুরু হত। ইয়াছিন বলল, তাতে কি তোকে চোর বানিয়ে অতদূর নিয়ে যাওয়া হয়েছে? তুই কিভাবে এই কথা বার বার বলছিস? জুঁই ইয়াছিনকে বলল, ওর সাথে আর কথা বলতে যাস না। ঝগড়া লাগাবে কিন্তু। নিলু বলল, আমি ঝগড়া লাগাই আর তোরা সাধু? তোদের কে হারে হারে চেনা আছে। আঁখি বলল, কিসের হারে হারে চেনা আছে? তোরাও কি কম নাকি? সুযোগ পেলেই ঝগড়া করিস। জাবেদ বলল, তোরা কি সুযোগ পেলে ছেড়ে দিস? তুহিন বলল, তোরা কেউ কথা বাড়াস না। এবার নে আবার খেলা শুরু করি।
খেলা আবার শুরু হল। জুঁই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তুহিন বলল, তুই আর খেলবি না? জুঁই মাথা নেড়ে বলল, না। নিলু বলল, ও আর কোন শরমে খেলবে। জাবেদ বলল, ভয় পেয়েছে। যদি আবার কেউ অতদূর নিয়ে যায়। এবার জুঁই বলল, এ যাবত অতদূর কেউ কাউকে নিয়ে যেতে পারছে? শুধু আজকে তুহিন নিয়ে গেল। তাই বলে সে আবার নিয়ে যেতে পারবে তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে? তুহিন বলল, তাহলে এখন খেল। জুঁই বলল, আমার ভাল লাগছে না। খেলতেও মন চাচ্ছে না। তোরা সবাই খেল। আমি বাড়ি গেলাম। তুহিন বলল, না খেললি। খেলা তো দেখ। তাহলে দেখবি ভাল লাগবে। আঁখির মা আঁখিকে ডাকতে এলো। বলল, সারা দিন শুধু খেলা আর খেলা। কোনো কাম কাজে যদি থাকে। তাড়াতাড়ি যা , গরু গুলো কে খড় দিয়ে আয়। হাম্বা হাম্বা করে তোকে ডাকছে। তারপর বাড়ি যেতে যেতে বলল, তাড়াতাড়ি আয়। আমার অনেক কাম আছে। শাকিল বলল, তাড়াতাড়ি যা গরু তোকে ডাকছে। সাথে সাথে সবাই খিলখিল করে হাসতে লাগল। আঁখি শাকিলকে বলল, সকাল বেলা দাঁত মাজতে নেই। হাসতে পারে খুব করে। সবাই এবার আরও জোরে খিলখিল করে হেসে উঠল। শাকিল বলল, সব জোকাররা থাম। এটা কোনো হাসির কথা হল যে হাসতে হবে? জুঁই আঙুল ঠোটে নিয়ে বলল, এই তো চুপ করলাম। সবাই আবার হেসে উঠল। শাকিল বলল, না আর এখানে থাকা গেল না। তারপর সে বাড়ির দিকে পথ ধরল।
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
বরই তলা থেকে এক দুই মিনিট গেলেই মসজিদ। আজ সেই মসজিদে মাহফিল। বরই তলার ছেলেমেয়েদের আজ সব চেয়ে সুখের দিনের মধ্যে অন্যতম। এই দিনটাতে সবাই অন্যরকম একটা আনন্দে মেতে ওঠে। প্রতি দিন তারা দিনে খেলে কিন্তু আজকের এই দিনে তারা দিন এবং রাত উভয় সময়ই খেলা করবে। তাদেরকে আজ কেউ মানা করবে না বা দুই একজন মানা করলেও তারা থামবে না। তাদের খেলা ততক্ষণ চলতে থাকবে যতক্ষণ না তাদের চোখে ঘুম ভর করে। যখন তারা খেলতে থাকে তখন ঘুম তাদেরকে ভয় পায়। সহজে তাদের ধারে ঘেষতে পারে না। ফলে তারা অনেক রাত পর্যন্ত খেলতে পারে।
সকাল বেলা সবাই বরই তলায় বসে ছিল। তুহিন বলল, আজ তো আমাদের খুব আনন্দের দিন। আমাদের মসজিদে সভা। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাইক ভেজে উঠবে। সবাই কত গজল গাইবে। তারপর রাতে ওয়াজ হবে। নিলু বলল, এবার কিন্তু বড় বক্তা এনেছে। সবাই বলতেছে খুব সুন্দর কন্ঠ। খুব ভাল করে ওয়াজ করে। আঁখি বলল, এবার কিন্তু জুঁই সবার আগে গজল গাইবে। জুঁই বলল, একটা গাইবো তোদের গাওয়ার পর। তুহিন বলল, যখন গাওয়ার সময় হয় তখন দেখা যাবে। নিলু বলল, আজ আমাদের বাড়িতে অনেক কুটুম আসবে। জুঁই বলল, এ আবার নতুন কি? সভার ভেতর এখানকার সব বাড়িতেই তো কুটুম আসে। আঁখি বলল, আজ বিকেলে মনে হয় তোদের সাথে বেশিক্ষণ থাকা হবে না। কারণ আমার খালাতা, ফুফাতো, মামাতো ভাই বোন আসবে। ঠিক এক ডজন। জুঁই বলল, আমাদের বাড়িতেও কুটুম এসে ভরে যাবে। দুপুর থেকেই আসা শুরু হয়ে যাবে। শাকিল বলল, ঠিক বলছিস আজ কত মজা হবে। মানুষে মানুষে ভরে যাবে আমাদের গ্রাম। কত দোকানপাট আসবে। কত কিছু কেনা হবে।
তুহিন বলল, এখন সবাই এসব কথা রাখ। বিকেল বেলা ডাংগুলি খেলা যাবে না। অনেক লোকের ভীর থাকবে। তারপর ইয়াছিনকে বলল, আমাদের চৌকির তলা থেকে ডাংগুলিটা নিয়ে আয়। ইয়াছিন ডাংগুলি নিয়ে এলো।
প্রতিদিনের মত এখন ডাংগুলি খেলা শুরু হল। তুহিনের সাথে ডাংগুলি খেলায় জেতার মত এই গ্রামে আর কেউ নাই। মাঝে মাঝে ইয়াছিনের সাথে কনটেস্ট হলেও ইয়াছিন কখনো জিততে পারে না। তাই তুহিন একা আর বরই তলার দল তার বিরুদ্ধে খেলে। এভাবেই প্রতিদিনের খেলা চলতে থাকে। আজও ঠিক এমনই হল।
কিছুক্ষণ খেলা চলার পর তারা শুনতে পেল- মাইক টেস্টিং করছে। হ্যালো.. হ্যালো... মাইক স্টেশন হ্যালো। এক দুই তিন চার হ্যালো... বরই তলার সব ছেলেমেয়ে দৌড়ে দৌড়ে মাহফিল মাঠে গিয়ে উপস্থিত হল। ইয়াছিন বলল, জুঁই আগে একটা গজল গা। জুঁই বলল, না। আগে আঁখি। তখন শাকিল বলল, রাখ তোরা। আমি আগে গাই। তারপর সে গাইতে লাগল - মদিনার বুলবুল নবী রাসূল আল্লাহ পাঠালেন খুশি হয়ে নিজে মাবুত আল্লাহ। গাওয়া শেষ হলে জুঁই গাইতে গেলে এক মুরব্বি বলল, তোমরা দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে এসো। তখন যত খুশি সবাই গজল গেও। এখনো মাইক এর কাজ শেষ হয় নি। আরো সারতে হবে। তখন তুহিন সবার উদ্দেশ্যে বলল, চল এখন যাই। আবার দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে একবারে রাতের মনে আসবো। আঁখি বলল, কি রকম দোকানপাট এসেছে চল আর একবার দেখে আসি।
নানা ধরনের দোকানপাট এসেছে। আঁখি বলল, আমি এখন এই চুরিমালা কিনবো। তুহিন বলল, এখন কেনো? আরো দোকানপাট আসুক। সব কিছু ভাল করে দেখে সন্ধ্যার সময় কিনবি। সভার ভেতরে তো সবাই সন্ধ্যার সময়ই কেনে। জুঁই বলল, আমি সন্ধ্যার সময় কিনবো। এর মধ্যেই নিলু একটা বাঁশি কিনে ফেলল। তারপর সবার কানের কাছে গিয়ে প্যা.. পু... প্যা..পু করে বাজাতে লাগল। তুহিন বলল, এটা কেনার মত জিনিস হল? দেখিস আমি কি কিনি? নিলু বলল, এটাই কি শেষ মনে করছিস? আরও কিনবো সন্ধ্যার সময়। আঁখি বলল, এখন আর বেশি দেখবো না। চোখ ঘোলা হয়ে যাবে। চল বাড়ি ফিরে চল। জুঁই বলল, আর কিছু সময় দেখে যাই। হাসু তুহিনকে বলল, তোদের মসজিদে সভা, দাওয়াত দিলি না তো? আঁখি বলল, দাওয়াত না দিলে তুই কেমনে এলি? হাসু বলল, এমনি ঘুরতে এলাম। দেখে আসি ওদের সভার মাঠ কেমন সাজিয়েছে। দোকানপাট কেমন হল। তুহিন বলল, রাত্রে আমাদের এখানে সভা শুনতে আসিস। হাসু বলল, অতদূর থেকে রাত্রে আসা সম্ভব না। তারপরও আসার চেস্টা করবো। তুহিন বলল, তোর মা কে বলে সন্ধ্যার সময় আসিস। রাত্রে আমাদের এখানে থাকবি। আঁখি বলল, হ্যাঁ। আমাদের এখানে থাকলে অনেক ভাল হবে। নিলু লাফ দিয়ে হাসুর গলা ধরে বলল, দোস্ত তুই আমাদের বাড়িতে থাকবি। হাসু বলল, আচ্ছা। সন্ধ্যার আগে মা কে বলে আসবো।
দুপুর গড়াতেই সব আত্নীয় স্বজন আসতে শুরু করল। বরই তলার ছেলেমেয়েদের হৈ চৈ আরো বেড়ে গেল। এই ছেলেমেয়ে গুলো- ফুফাতো, খালাতো, মামাতো ভাই বোন নিয়ে যার যা এসেছে বরই তলায় নিয়ে উপস্থিত হল। বরই তলা আজ অন্য দিন থেকে ভিন্ন রুপে দেখা গেল। তারপর সবাই সন্ধ্যার আগে চলে গেল মাহফিল মাঠে। সেখানে খড় বিছানো হয়েছে। সে খড়ের উপর তারা সবাই বাঘা লাথি লেখা শুরু করল।
এই খেলার মজা সব খেলা থেকে আলাদা। এই খেলায় সবাই এক দল। অর্থাৎ এই খেলার কোনো দল নেই। এই খেলায় কোনো চোর নেই। অর্থাৎ একজন কে কেন্দ্র করেও এ খেলা নয়। এই খেলা হচ্ছে ব্যাক্তি ক্রেন্দিক। অর্থাৎ যার যার মত খেলা। এই খেলা খুবই হাস্যকর খেলা। যে দাঁড়িয়ে থাকবে তার মাছায় লাথি মারা হবে। বসে থাকলে তাকে লাথি মারা যাবে না। যদি কেউ এ রকম করে তাহলে তাকে সাতটা লাফি মারা হবে। কেউ যদি ভয় পায় তাহলে বসে থাকতে পারে তবে বেশিক্ষণ নয়। মাঝে মাঝে উঠে দাঁড়াতে হবে। যদি সে তাও লাথি খাওয়ার ভয়ে না পাড়ে, তাহলে তাকে খেলা থেকে বাদিল করা হবে। বসে থাকতে হয় একটু দূরে দূরে, দুই পা ফাক করে যতটুকু জায়গা হয় তার থেকে দূরে বসতে হয়। তা যদি না হয় তবে সেই দু'জনের মধ্যে গিয়ে দুই পা ফাঁক করে দু'জন কে এক সাথে লাথি মারতে পারে। যারা সাহসী একমাত্র তারাই এই খেলায় রাজত্ব করে থাকে।
শাকিল চুপ করে বসে আছে। ইয়াছিন শাকিলের সামনে গিয়ে বলল, সাহস থাকলে উঠ। নিলু ইয়াছিনের পিছনে বসে ছিল। সে একটা সুযোগ পেয়ে ইয়াছিনের পাছায় লাথি মেরে আবার বসে পড়ল। কিন্তু তাড়াতাড়ি বসতে গিয়ে জাবেদের কাছাকাছি বসে পড়ল। তাড়াতাড়ি সরতে না সরতেই তুহিন দু'জনার মধ্যে গিয়ে লাথি মারল। জাবেদের অনেকটা জোরে লাথি লেগেছে তাই সে কান্না শুরু করল। যেহতু মাহফিল তাই আশে পাশে অনেক বড় মানুষ ছিল, তারা জাবেদের কান্না শুনতে পেয়ে দমক দিয়ে বলল, এটা কোনো খেলা হল। যাও এখান থেকে যাও। খড় গুলো কেমন ছড়াছড়ি করে ফেলেছো। মানুষ এসে বসবে তো নাকি? সবাই তখন মাহফিল থেকে বেড়িয়ে এলো। ইয়াছিন জাবেদকে বলল, শুধু তোর জন্য খেলা বাদ হয়ে গেল। আঁখি বলল, ওকে খেলায় রাখাই ভুল হয়েছে। জাবেদ বলল, আমি কি ব্যথা পাইনি? ও অত জোরে লাথি মারল কেনো? তুহিন বলল, আমি কি ইচ্ছে করে মেরেছি নাকি? হঠাৎ করে লেগে গেছে। জুঁই বলল চল মেলায় যাই। তারপর তারা সবাই মেলায় গেল।
চানাচুর পেয়াজি এবং আরো অন্যান্য যে সব খাবারের জিনিস কিনল সবাই এক সাথেই খেল। তারপর তুহিন কিনল একটা পিস্তল। সুইচ অন করলে পিস্তলের চারদিকে জোনাকির মত আলো জ্বলে আর গান বাজে। জুঁই কিনল দুই তিনটা পুতুল। আঁখি কিনল লাল টকটকে একটা লিপিষ্টিক। ইয়াছিন কিনল একটা বড় লাল নীল বেলুন। নিলু কিছু কিনল না এবং জাবেদ কিনতে গেলে ফিসফিস করে বলল, পরে কিনবো। সবার কেনাকাটা শেষ। তুহিন নিলুকে বলল, তুই কিছু কিনবি না? সবাই কিনল, তুই আর জাবেদ শুধু বাদ। এবার নিলু বলল, আব্বা টাকা দেয় নাই। বলল, যা লাগবে রাতে এসে সব কিনে দিবে। তারপর সবাই বাড়ি চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে নিলু আর জাবেদ মেলায় এলো। জাবেদ বলল, আমি কিন্তু তখন সব টাকা ভাঙি নাই। তোর ইশারাতে বুঝেছিলাম। নিলু বলল, আমরা কি অতই পাগল সব টাকা ওদের সাথে মিলে খাবো? জাবেদ বলল, ওরা সবাই পাগল। কি ভাবে ওদের টাকা খেয়ে ফেললাম। কিন্তু আমাদের টাকা খেতে পারল না। নিলু বলল, সব বুদ্ধি, বুঝলি? তারপর তারা যা খাওয়ার খেয়ে নিল। অন্য কিছু কেনার মত টাকা ছিল না। নিলু বলল, আমরা কিছু কিনবো না। সব খেলাধুলা তো ওদের খেলনা দিয়েই খেলি। আমাদের আর কি দরকার? তাই যে টাকা ছিল সব খেয়ে ফেললাম।
তারপর প্যানে হাত মুছতে মুছতে বলল, চল এবার বাড়ি যাই। তারপর দু'জন খিক করে হেসে উঠল।
সন্ধ্যার পরে তুহিন আর ইয়াছিন বরই তলায় এলো। তুহিন বলল, শাকিল কে ডাক দিয়ে চল সভা শুনতে যাই। এমন সময়ে আঁখি আর জুঁই বরই তলায় এলো। তুহিন বলল, তোরা সভা শুনতে যাবি? জুঁই বলল, পরে। তুহিন হেসে আঁখি কে বলল, যা তোর লিপিষ্টিক নিয়ে আয়। আমি আর ইয়াছিন ঠোটে নিবো। দেখি আমাদের কেমন দেখায়। আঁখি বলল, তোরা থাক আমি আর জুঁই গিয়ে নিয়ে আসি। কিছুক্ষণ পরে তারা লিপিষ্টিক হাতে ফিরে এলো। আঁখি তুহিনকে বলল, এবার লিপিষ্টিক ঠোটে নি। তুহিন বলল, আমি কি কোনো দিন নিয়েছি? তুই দিয়ে দে। আঁখি তুহিনের ঠোটে লিপিষ্টিক দিচ্ছে - জুঁই বলল, আমার কাছে দে। আমি ভাল করে দিয়ে দেই। সে লিপিষ্টিক নিয়ে ঠোটে মুখে নাকে গালে দিয়ে দিল। তারপর আঁখি খিক করে হেসে বলল, দেখ এবার আয়নায় দেখ কেমন হয়েছে। আঁখি আয়না ধরল আর জুঁই লাইট ধরল, তুহিন মুখ দেখে দিল এক দৌড়। টিউবওয়েলে গিয়ে সাথে সাথে মুখ ধুয়ে এলো। তারপর বলল, তোরা এত চালাক। ঠোটে দিতে গিয়ে সারা মুখে দিয়ে দিলি। দাঁড়া দেখ তোদের কি করি? আঁখি বলল, লিপিষ্টিক নেয়ার সাধ মিটেছে? বলেই দিল বাড়ির দিকে দৌড়।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
বরই তলার ছেলেমেয়েরা আজ তেঁতুল তলায় গেল। বরই তলা থেকে কিছুটা দূরে এই তেঁতুল তলা। তেঁতুল গাছটা ঝোপড়া এবং নানা ডাল পালায় ভরা। এই গাছে উঠতে খুবই সহজ। তাই সবাই মাঝে মাঝে তেঁতুল গাছে গাছটকা খেলতে যায়। গাছটগা ছেলেমেয়েদের একটা মজার খেলা। গাছটগা খেলায় একটা মার্বেল বা আধা হাত পরিমাণ কুঞ্চি ঢিল দিয়ে গাছে উঠতে হয়। আর যে চোর সে মার্বেল বা কুঞ্চি কুঁড়ে এনে যদি তাকে ছুঁতে পারে তাহলে সে মারা যায়। আর যদি না পারে তাহলে আগের মত পরবর্তী জন ঢিল দিয়ে গাছে উঠবে। এভাবে যতজন থাকবে ততজন উঠলে খেলার প্রথম পর্ব শেষ হবে। তারপর শুরু ২য় পর্ব। এ পর্বে খেলার চোর মার্বেল বা কুঞ্চি গাছে ঢিল দিবে। সেই মার্বেল বা কুঞ্চি কোনো খেলুয়ারকে ছুঁয়ে নিচের দিকে যদি পড়ে আর সেই চোর যদি সেটি ধরতে পারে তাহলে সে মরা যাবে। আর যদি গাছে উঠা খেলুয়াররা ধরতে পারে, এভাবে পর পর সাত বার ধরলে খেলার ২য় পর্ব শেষ হবে। খেলার শেষ পর্বে রয়েছে চোরকে চোখ বাঁধার পরে তার দু'হাত এক করে বালি আর সেই মার্বেল বা কুঞ্চি দিয়ে সারা পাড়া ঘুরানো হয়। তারপর পাড়ার কোনো এক জায়গায় বালিসহ সেই গুটি রেখে দেয়া হয় । তারপর চোরকে যথা স্থানে এনে চোখ বাঁধা খুলে দিতে হয় । তারপর সেই চোর সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে সেই গুটি খুঁজতে লাগে। যদি পায় তাহলে সেই গুটির সাথে রাখা বালি নিয়ে সে সব খেলুয়ারের গায়ে দিতে পারলে তবে খেলা শেষ। তারপর খেলা পুনরায় শুরু করতে হলে যাকে আগে বালি দেয়া হবে সে হবে চোর। তাকে কেন্দ্র করে আবার খেলা শুরু করতে হবে।
আজকের খেলায় প্রথম চোর শাকিল। জাবেদ প্রথমে গুটি ঢিল দিয়ে গাছে উঠতে না উঠতে শাকিল গুটি দৌড়ে গিয়ে এনে জাবেদকে ছুঁয়ে ফেলল। এবার শাকিল গুটি ঢিল দিয়ে গাছে উঠে পড়ল কিন্তু ততক্ষণেও জাবেদ গুটি খুঁজে পেল না। সে বলল , কোথায় গেল। খুঁজে পাচ্ছি না তো? আঁখি বলল , দেখ ওখান দিয়ে খুঁজে দেখ পাবি। তারপর সে গুটি পেল। এবার ঢিল দিল আঁখি। সে কুঁড়িয়ে আনতে না আনতে আঁখি গাছে উঠে গেল। এভাবে সবাই একে একে গাছে উঠে গেল। এবার জাবেদ গাছে গুটি ঢিল দিল। নিলু ধরতে পারল না। গুটি তাকে ছুঁয়ে মাটিতে পড়ার সময় জাবেদ গুটিটি ধরার জন্য অনেক চেস্টা করল কিন্তু সেও ধরতে পারল না। সবাই হাসতে লাগল। জাবেদ আবার ঢিল দিল। এবার তুহিন গুটি ধরে ফেলল। এভাবে ছয়বার গুটি ধরা হল। আঁখি বলল, আরেক দিনের মত আজকে কিন্তু তুই পালাতে পারবি না। যদি পালাস তাহলে তোকে চিরদিনের জন্য খেলা থেকে বাদ দেয়া হবে। জাবেদ বলল, আজকে পালাবো না। সে দিন বাড়িতে কাজ ছিল তাই পালিয়ে ছিলাম। সে গুটি ঢিল দিল। নিলুর গায়ে ছুঁয়ে মাটিতে পড়ার সময় জাবেদ ধরে ফেলল। সবাই চেঁচাতে লাগল। আর একবার আছে। এই সময় নিলু চোর হল। নিলু বলল, তোরা চুপ কর। এখনও চোর হয়নি। জাবেদ ঢিল দিয়ে গাছে উঠুক। আমি যদি তাকে মারতে পারি। আঁখি ইশারা করে জাবেদকে বলল, যে দিকে ছোট ছোট গাছের ঝোপ আছে সে দিকে ঢিল দিতে। জাবেদ ঢিল দিল। নিলু খুঁজতে লাগল। এর মধ্যে জাবেদ গাছে উঠে গেল। জুঁই বলল, এত বড় বড় কথা। এখনও চোর হয়নি। কেমন হল? নিলু বলল, শালার জাবেদ তুই আমাকে চোর বানালি? তারপর গাছে গুটি ঢিল দিল। জুঁই ধরে ফেলল। আঁখি বলল, সবাই নেমে পড়। সাত বার হয়েছে। জুঁই গুটি কামড় দিয়ে নেমে পড়ল।
সবাই গাছ থেকে নেমে পড়ল। আঁখি নিলুর দু'চোখ ধরল আর তুহিন হাতে বালি আর গুটিটা দিয়ে দিল। তারপর বলল, আঁখি ভাল করে চোখ ধরে রাখিস। যেন দেখতে না পায়। আঁখি বলল, আচ্ছা। নিলু বলল, শালি চোখ ছাড়! চোখ গেল। আঁখি এবার ধীরে ধরল। তারপর সারা পাড়া এভাবে ঘুরাতে লাগল। ইয়াছিনদের বাড়িতে যাওয়ার পর জুঁই বলল, বলতো নিলু এটা কাদের বাড়ি? নিলু বলল, এটা আঁখিদের বাড়ি। সবাই খিক হেসে উঠল। নিলু বলল, আমায় বোকা পেয়েছো। সবাই হাসছো কেন? আমি বুঝি চিনতে পারি নাই। চোখ বাঁধলে কি হবে? আমার দিক শক্ত। তুহিন বলল, চল। সামনে চল। তারপর আঁখিদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। এবার তুহিন বলল, বলতো নিলু এটা কাদের বাড়ি? নিলু বলল, শালা এটা তোদের বাড়ি। ইয়াছিন বলল, এখন ছেড়ে দে? আর চিনতে পারবে না। আঁখি বলল, দাঁড়া আর এক দুই বাড়ি নিয়ে যাই। তারপর নিয়ে যাওয়া হল তুহিনদের বাড়ি। ইয়াছিন বলল, বলতো নিলু এটা কাদের রান্নাঘর। নিলু বলল, এটা জুঁইদের রান্না ঘর। জাবেদ বলল, শালা দাঁড়া রয়েছো মধ্যে উঠানে। নিলু বলল, তোরা অনেক ঘুরালি এবার ছেড়ে দে। তুহিনদের ঘরের পিছে গিয়ে আঁখি বলল, এবার বালি আর গুটি এখানে রাখ। নিলু রেখে দিল। সে তুহিনের মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। তাই সে আন্দাজ করে নিল এটা তুহিনদের বাড়ির আশেপাশে হবে। তারপর আবার কয়েক বাড়ি ঘুরানো হলে তারপর তেঁতুল তলায় নিয়ে আসা হল। এবার নিলুর চোখ খোলা হল। নিলু কিছুক্ষণ হাত দিয়ে চোখ ডোলতে লাগল। তারপর এ বাড়ি ও বাড়ি খুঁজতে লাগল। সে আগেই তুহিনদের বাড়িতে গেল না কারণ সবাই যদি তাকে সন্দেহ করে, যে সে আগেই বুঝেছে। তাই দুই এক বাড়ি ঘুরার পর তুহিনদের বাড়িতে গেল। ভাল ভাবে খুঁজতে লাগল। এবার সবাই একটু দূরে দূরে রইল। কারণ তুহিনদের বাড়িতে এসেছে যদি পেয়ে যায়, তাহলেতো বালি দিবে। জাবেদ বরাবর নিলুর সাথেই থাকে। বিপরীত দলে গেলেও তারা এক। সুযোগ পেলেই সাহায্য করে। জাবেদ নিলুকে ইশারা করে বুঝাতে চেস্টা করল যে বালি রাখা হয়েছে তুহিনদের ঘরের পিছনে। কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারল না। সে ইয়াছিনদের বাড়িতে চলে গেল। সবাই আবার তার কাছা কাছি এলো। জাবেদ আবার চেস্টা করল। এবার আঁখি বুঝতে পেরে জাবেদের মাথায় দিল এক ঘুষি । নিলু সারা পাড়া খুঁজে দেখল আর ভাবল- বালি আর গুটি তুহিনদের বাড়ির কোথাও লুকানো আছে। সব জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখতে হবে। তাই সে আবার তুহিনদের বাড়িতে এলো। বারান্দা, রান্না ঘর, টয়লেটের আশে পাশে সব জায়গায় দেখল। জাবেদ এবার কিছু বলতে পারছে না। কারণ আঁখি তার হাত ধরে আছে। একটা ঘুষি খেয়েছে আবার ধরা পড়লে খেলায় আর রাখতে চাইবে না। তাই সে চুপ করে আছে। নিলু তাকে চোখ টিপ মেরে মেরে বলছে কোথায় রাখা হয়েছে? জাবেদ শুধু ঘামছে কিছুই বলতে পাড়ছে না। কিছুক্ষণ পরে নিলু তুহিনদের ঘরের পিছনে গেল। সে বালি আর গুটি হাতে নেওয়ার সাথে সাথে সবাই যার যার মত দৌড়াল। কেউ দক্ষিণে, কেই উত্তরে আবার কেউ পশ্চিমে। নিলু আগে জাবেদের পিছনে লাগল। জাবেদ বলল, ভাই তুই আমাকে এভাবে ধাওয়া করছিস কেনো? অন্য কাউ কে ধর? নিলু বলল, শালা তুই আমাকে চোর বানালি আবার ঠিক মত বলতেও পারলি না। তাই তোকে আগে বালি দিয়ে চোর বানাবো। জাবেদ বুঝতে পারল সে তাকে ছাড়বে না, তাই সে দৌড়াল দৌড়াল- আর পিছে পিছে নিলু। এভাবে অনেকক্ষণ চলার পর নিলু ভালভাবে জাবেদের নাগাল পেলো। সে আগে থেকেই বালি ছিটিয়ে দিতে পারত কিন্তু রাগ মিটতো না। তাই সে ভাল ভাবে ধরে সব গুলো বালি জাবেদের মাথায় ঢেলে দিল। জাবেদ কাঁদতে লাগল। নিলু দৌড়ে লুকাল। সবাই ওর কান্না শুনে ছুটে এলো। জাবেদের মাথা ভর্তি বালি। জুঁই হাত দিয়ে যত টুকু পারা যায় ততটুকু বালি ছাড়িয়ে দিল। তুহিন বলল, ও শালা কোথায় গেল? তোরা সবাই যা তো ওকে ধরে নিয়ে আয়। তারপর জাবেদকে বলল, চল গাঙে যাই। তোর মাথা ভাল করে ধুয়ে নিয়ে আসি। সে যেতে না চাইলে সবাই মিলে কোলে তুলে নিয়ে গেল। ইয়াছিন নিলুকে অনেক বকা দিল। জাবেদ বলল, তোরা কথা দে, ওকে আর তোরা খেলায় তুলবি না। ইয়াছিন বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। তারপর সবাই জাবেদ কে নিয়ে বরই তলায় এলো।
শাকিল বলল, নিলুর একটা শাস্তি হওয়া দরকার। তুহিন বলল, যা তোরা ওকে খুঁজে নিয়ে আয়। নিলু লুকিয়ে লুকিয়ে গাছের আড়াল থেকে সব শুনছিল। সে মনে মনে বলল, তুহিনের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর কে যেন পিছন থেকে এসে তার মাথায় বালি ঢেলে দিল। পিছন ঘুরে নিলু দেখল সবার হাতেই বালি। সে ভয় পেয়ে বলল, আমি আর এ রকম করবো না। আমাকে ছেড়ে দে। শাকিল বলল, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। জুঁই বলল, সব গুলো বালি ওর মাথার উপর ছেড়ে দে। তুহিন দমক দিয়ে বলল, জাবেদের কাছে মাফ চা। এখনো চুপ করে... দেবো বালি দেবো? নিলু তখন মাফ চাইতে গেলে জাবেদ বলল, আর ঢঙ করতে হবে না। এবার বাড়ি চল।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
বরই তলায় সবাই ধরি নিয়ে উপস্থিত হল। আজ তারা ধরি লাফ খেলবে। জুঁই হচ্ছে বরই তলার সেরা দড়ি লাফ খেলুয়ার। বরাবরই সে জয় হয়ে থাকে। দড়ি লাফ খেলার জন্য স্কুলেও তার অনেক নাম আছে। আঁখি বরই তলায় প্রায়ই সেকেন্ড হয়ে থাকে। আর তারপরের খেলুয়ার হচ্ছে শাকিল। তারপর হচ্ছে - নিলু, শারমিন, ইয়াছিন, জাবেদ, মারুফা ইত্যাদি। তুহিন এ খেলায় রেফারির কাজ করে। সে ঘুরে ঘুরে দেখে কে মারা গেল। খেলতে খেলতে দু'জন একটু কাছাকাছি হলে সে সরিয়ে দেয়। কিন্তু আজ তার দড়ি লাফ খেলতে মন চাচ্ছে।
আর কিছুক্ষণের মধ্যেই খেলা শুরু হবে। এমন সময় তুহিন বলল, আমি আজ রেফারি করবো না। দেখি আমার সাথে তোরা পারিস কি না? আঁখি বলল, তার মানে আজ তুই খেলবি? তুহিন বলল, খেলবো কিন্তু আমার খেলার তো কোনো ভাল ধরি নাই। জুঁই বলল, দাঁড়া আমার ভাল ধরিটা নিয়ে আসি। জুঁই দৌড়ে গিয়ে ধরি নিয়ে এলো। জুঁইয়ের আগ্রহ সবার থেকে একটু বেশি। কারণ, সে সবাইকে হারিয়েছে, তুহিন খেলেনা বিধায় তাকে হারাতে পারে নাই। আজ যেহেতু খেলবে, তাকে হারাতে পারলে বরই তলার সবাই কে হারানো হবে।
তুহিন সবার ধরি ভাল করে দেখে নিল। তারপর আঁখির ধরিটা নিয়ে বলল, আমি এটা দিয়ে খেলবো। জুঁইয়ের আনা ধরিটা আঁখিকে দিয়ে দিল। আঁখি বলল, না না তা হবে না। আমার ধরি নিলে কেনো ? আমি এ ধরি ছাড়া খেলতে পারি না। তুহিন বলল, আচ্ছা তোরা খেল। আমি খেলবো না। এই বলে আঁখির ধরি ফিরিয়ে দিতে গেলে সবাই মানা করল। সে আজ প্রথম খেলতে চাচ্ছে খেলুক । আঁখি বলল, নে এবার খেল। তুহিন বলল, এখনই খেলা শুরু না। আমি আগে দেখে নেই পারি কি না? জুঁই বলল, দেখ। জাবেদ বলল, না পারলে খেলবি না? তুহিন বলল, না পারলে কিভাবে খেলবো? যদি খেলি হারাতে পারবি না। আমি হেরে যেতে খেলবো না। যদি খেলি তাহলে জেতার জন্যই খেলবো। তারপর সে একা একা কিছুক্ষণ খেলল। জুঁই বলল, চলবে। নে এবার সবার সাথে খেলা শুরু কর? তুহিন বলল, দাঁড়া আর একটু দেখে নেই। আঁখি বলল, আর কত দেখবি?
তুহিনের প্রেক্টিস শেষ হলে বলল, একটু জিরিয়ে নেই। অনেকটা হয়রান হয়ে গেছি। জুঁই কিছুটা রেগে আছে। কারণ তার ধরি দিয়ে তুহিন খেলছে না। তাই সে বলে উঠল, একদিন খেলবে তার আবার কত ঢঙ। প্রেক্টিস করা লাগে, ধরি পাল্টান লাগে। আঁখি বলল, এতক্ষণ খেলল জিরাতে হবে না? আর ধরি ভাল না হলে সে খেলবে কি করে? আমরা না হয় সব ধরি দিয়ে পারি। কিন্তু ও তো প্রথম। তুহিন বলল, তোদের ঝগড়া করতে হবে না। এবার খেলা শুরু কর। আমার হয়ে গেছে।
খেলা শুরু হল। সবাই ধরি ঘুরাচ্ছে। শাকিল বলল, সাবাস দোস্ত তুই পারবি। জাবেদ বলল, ও সব খেলায় পাকা। এ খেলায়ও জিতবে। তোরা সব দেখে নিস। বলতে বলতে পায়ের সাথে ধরি লেগে সে মারা গেল। এখন তুহিন, জুঁই আর আঁখি আছে। আর পরপর সবাই মারা গেছে। তিনজনে প্রাণপণে খেলতে লাগল। তুহিন খেলতে খেলতে বলল, এখন যদি মারা যাই তাহলে থার্টতো হবো। অনেকক্ষণ খেলার পর আঁখি মারা গেল। সবাই চেঁচিয়ে উঠল। আর একজন বাকি।
সবাই তুহিনের পক্ষে। একজনও জুঁইয়ের পক্ষে নাই। কারণ সে প্রতিবার সবার সাথে জেতে। দু'জন খেলছে তো খেলছে। দু'জন ঢলে ঢলে পড়ছে। মনে হচ্ছে এখনই মারা যাবে। আঁখি বলল, খেলা শেষে ওদের মাথায় পানি ঢালতে হবে। শাকিল দৌড়ে গিয়ে পানি নিয়ে এলো। দু'জনের খেলা এখনও শেষ হয় নি। দু'জনার চোখ মুখ লাল হয়ে গেল। কে হারে কে জেতে সবার মধ্যে উত্তেজনা। শাকিল বলল, দোস্ত পারতেই হবে তোকে। তুহিন আর জুঁই কোনো কথা বলছে না। শুধু খেলেই যাচ্ছে। এক সময় জুঁই ঠাস করে মাটিতে পড়ে গেল। সবাই পানি ঢালতে লাগল। তুহিন এখনও খেলেই যাচ্ছে। সে এখনও জানে না সে জিতে গেছে। আঁখি বলল, এই তোরা তুহিনকে থামা। ইয়াছিন তুহিনকে থামতে বলল, কিন্তু সে থামছে না। আঁখি বলল, ধরি কেড়ে নি। ধরি কেড়ে নিলে সেও ঠাস করে মাটিতে পড়ে গেল। শাকিল বলল, আঁখিরে তুহিনের জ্ঞান নাই। জুঁইয়ের ওখান থেকে পানি নিয়ে আঁখি তুহিনের কাছে দৌড়ে এল। তারপর পানি ঢালল। এর মধ্যে জুঁই অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেল। সে বলল, কে জিতছে আমি না তুহিন? সবাই এক সাথে বলে উঠল - তুহিন ছাড়া কে জিতবে? তুহিনের এখনও জ্ঞান ফেরে নাই। অনেকক্ষণ পানি ঢালার পর তার জ্ঞান ফিরে এলো।
বিকেল বেলা সবাই বরই তলায় বসল। গোল করে দাগ দেয়া হল। লাটিম খেলা শুরু হল। নিলুর লাটিম ঘুরতে ঘুরতে গোলের ভেতর থেমে গেল। ইয়াছিন তার লাটিম ধরি পেঁচিয়ে টোব দিল। নিলুর লাটিমের অনেকটা চলা উঠে গেল। তার লাটিম দিয়ে আর খেলা সম্ভব না। তার লাটিম আর ঘুরবে না। নিলু মন ভার করে বসে রইল। তুহিনরা তারপর কিছুক্ষণ খেলল। শাকিল একটা চাকতির সাথে ঠোংগা বেঁধে ইঁদুরের মত বানাল। তারপর মাটিতে ঘরিয়ে দিল। চাকতিটা বরই তলার একদিক থেকে আরেক দিকে চলে গেল। এমন সময় জাবেদ বলল, তুহিন একটা গল্প বল? আঁখি বলল, কয়েক দিন হল গল্প শোনা হয় না। একটা রাক্ষস বুড়ির গল্প বল?
তুহিন বানিয়ে বানিয়ে সব ধরনের গল্প সাজিয়ে বলতে পারে। কেউ বুঝতেই পারে না সে বানিয়ে বানিয়ে বলছে। নিলু বলল, শুরু কর? তুহিন বলল, আজ না কাল বলবো। জুঁই বলল, সবাই এত করে বলতেছে দেখে ওর দাম বেড়ে গেছে। শাকিল চাকতিটা ধরে বলল, নে ভাই একটা বল? তুহিন বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। তোরা মন দিয়ে শোন।
তুহিন একটা রাক্ষস বুড়ির গল্প শুরু করল।
তেঁয়াশিয়া গ্রাম থেকে একটু দূরে একটা বিশাল বন। সে বনে বাস করে এক রাক্ষস বুড়ি। বয়সে শরীরটা নুয়ে পড়েছে। মুখ তার কালো কুচকুচে। মুখে কিসের যেন দাগ লেগে আছে। দেখতে অনেক ভয়ংকর। বনের পশু পাখি জীব জন্তু তার প্রিয় খাবার। সে মানুষের মাংস খেতেও খুব পছন্দ করে। তাকে দেখে সবাই ভয় পায়। পাখি গুলো গাছে চেঁচামেচি করে। বাঘ সিংহ যে যার প্রাণ নিয়ে দৌড়ে পালায়। বুড়ি খলখল করে হাসে আর তাদের পিছনে পিছনে ছোটে। ধরতে পেলে চিবিয়ে খায়। এমনি করে তার দিন গুলো চলে।
জাবেদ বলল, বলিস কি রে? বুড়ি মানুষ খায়? আঁখি জাবেদকে বলল, চুপ করে শুনতে থাক। তুহিন আবার শুরু করল।
সে মাঝে মাঝে কালো বোরকা পড়ে তেঁয়াশিয়া গ্রামে আসে। ফলে কেউ তাকে চিনতে পারে না। ঘরে ঘরে উঁকি মেরে দেখে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের। সুযোগ পেলে মুখে তুলে নিয়ে যায়। এভাবে তেঁয়াশিয়ার অনেক শিশু সে খেয়ে ফেলেছে।
লোকজন নানা জায়গায় খোঁজা খুঁজি করে। পাড়ার কোনো বাড়ি বাদ রাখে না। সব বাড়ি খুঁজে দেখে। কিন্তু কোথাও শিশুদেরকে খুঁজে পায় না। সবাই হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরে। সবাই চিন্তিত। ছোট ছোট বাচ্চা কে চুরি করে নেয়?
একদিন রাশিদুল কান্দাপাড়া হাটে গেল। শাক সবজি লাউ মাছ কিনতে কিনতে অনেক দেরি হয়ে গেল।সূর্য ডুবু ডুবু ভাব। সে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওনা দিল। দ্রুত রাস্তায় হাটতে থাকল। এক সময় দিনের আলো নিভে গেল। চারদিক অন্ধকারে ঢেকে গেল। সে ভয়ে ভয়ে সামনের দিকে পা চালাল।
এদিকে রাক্ষস বুড়ি গ্রাম হতে এক শিশুকে মুখে নিয়ে বনে ফিরছিল। একই পথে রাশিদুল হাট হতে বাড়ি ফিরছিল। আম গাছের তলায় দু'জনার মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। মুখে কামড় দিয়ে ছোট বাচ্চাকে নিয়ে যেতে দেখে রাশিদুল ভয় পেয়ে গেল। সে থতমত হয়ে হয়ে বলল, কে? কে তুমি?
রাক্ষস বুড়ি কোনো কথা বলল না। তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। রাশিদুল আরও ভয় পেয়ে বলে উঠল কে -তুমি কে?
রাক্ষস বুড়ি এবার বলল, আমি রাক্ষস বুড়ি। তোকে এখন চিবিয়ে খাবো। এই বলে রাশিদুলের দিকে এগিয়ে গেল। রাশিদুল ভয়ে পেয়ে চোখ বন্ধ করে দিল এক দৌড় দিল । সে তাদের বাড়িতে গিয়ে ঠাস করে পড়ে গেল এবং মা মা করে চিৎকার করতে লাগল। সবাই এসে দেখল রাশিদুল জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
কিছুক্ষণ পরে রাশিদুলের জ্ঞান ফিরলে বাড়ির সবাই জিজ্ঞাস করল তোর কি হয়েছে? সে তখন বলল, হাট হতে বাড়ি ফেরার সময় আম গাছ তলায় এক রাক্ষস বুড়ির সাথে দেখা হয়েছে। তার মুখে একটা ছোট বাচ্চা। তখন রাশিদুলের ছোট ভাই বলল, আজকে ও পাড়ার ন্যাড়ার পাঁচ মাসের ছেলে হারিয়ে গেছে। খুঁজে পাচ্ছে না। তখন বাড়ির সবাই বলল, তাহলে রাক্ষস আজকে ন্যাড়ার ছেলে কে নিয়ে গেছে । চল আমরা সবাই ন্যাড়াদের খবরটা দিয়ে আসি। সাথে গ্রামবাসিকেউ।
ন্যাড়াদের বাড়িতে সবাই কান্নাকাটি করছিল। ন্যাড়ার বউ কাঁদছে আর উঠানে গড়াগড়ি খেতে লাগল। পাড়া প্রতিবেশি সবাই দেখতে এলো। বাড়িতে লোকজনের ভিড়। নানান জন নানান কথা বলতে লাগল। কেউ বলল বাচ্চাকে বাঘে নিয়ে গেছে। আবার কেউ বলল টাকার লোভে বাচ্চাটিকে কেউ চুরি করেছে।
এমন সময় রাশিদুলদের বাড়ির লোকজন ন্যাড়াদের বাড়িতে গেল। রাশিদুলের আব্বা বাড়ির সব লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বলল, ন্যাড়ার ছেলে রাক্ষস বুড়ি নিয়ে গেছে। শুধু তাই নয় এই গ্রামে যত শিশু হারিয়েছে সব এই রাক্ষস বুড়ি খেয়েছে। এখন আমাদের উচিৎ গ্রামবাসী মিলে বন ঘিরে রাক্ষসটাকে ধরা। তা না হলে আমাদের আরও অনেক শিশু হারাতে হবে।
শাকিল বলল, বাঘটাকে সে ধরতে পেরেছিল তো? তুহিন বলল, মন দিয়ে শোন বুঝতে পারবি।
রাশিদুলের আব্বার কথা মত গ্রামবাসী ছুটে গেল। ন্যাড়াদের বাড়িতে লোকজন ভরে গেল। সবার হাতে দা, কোড়াল, বটি যার যা আছে তাই নিয়ে বনের দিকে রওনা দিল। ন্যাড়া বলল, রাক্ষস বুড়িকে পেলে ওকে আমি আলু বর্তা করে ফেলবো। আমার ছেলেকে নেয়ার সাধ মিটে দিবো। রাশিদুলের আব্বা বলল, এখন চুপ থাক। চল আগে বনটাকে ঘিরে ফেলি। চুপে চুপে বনটাকে ঘিরে ফেলতে হবে। রাক্ষস বুড়ি টের পেলে কিন্তু সহজে ধরা যাবে না। সবাই অনেক সচেতনের সাথে বনটাকে ঘিরে ফেলল। কিন্তু কোনো রাক্ষস পাওয়া গেল না। সে হয়তো আগেই দূরে কোথাও চলে গেছে।
আঁখি বলল, যা শালা এটা কি হল? ভেবে ছিলাম রাক্ষস বুড়িকে ওরা ধরতে পারবে। তুহিন বলল, রাক্ষস বুড়ি এখন আমার পাশে বসে আছে। জুঁই বলল, আমি রাক্ষস। দাঁড়া দেখাচ্ছে তোকে মজা। জুঁই তুহিনকে মারতে গেলে তুহিন বাড়ি চলে গেল।
ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ
বরই তলায় আজ খুটি চাটি খেলার আয়োজন করা হয়েছে। বরই তলার উত্তর পাশে তুহিনের বাড়ি, দক্ষিণে ইয়াছিনের বাড়ি। তুহিনের বাড়ির সদস্য বৃন্দ মোট পাঁচজন - আঁখি, নিলু, জাবেদ ও শারমিন এবং ইয়াছিনের বাড়ির সদস্যও পাঁচজন - জুঁই, রানা, সজিব, মারুফা । তাদের খেলা শুরুর পথে।
প্রতিবারই খেলা শেষ করে সব গুলো খুটি এক জায়গায় রাখা হয়। খেলার সময় ভাগাভাগি করে নিয়ে আবার খেলা শুরু করা হয়। তারা প্রথমে খুটি ভাগ করার কাজে বসল।
আঁখি বলল, এই বড় পাতিলটা আমার। জুঁই বলল, এই বড় কড়াইটা আমার। এই চারটা গ্লাসও আমার। আঁখি বলল, এই বালতিটা আমার। এই ভাবে তাদের ভাগাভাগি শেষ হল। কিন্তু একটা ছোট টিনের পাতিল নিয়ে তাদের মধ্যে মত বিরোধ দেখা দিল। তখন তুহিন বলল, ওই পাতিলটা বাদ থাকুক। ওটা দিয়ে খেলা হবে না। সবাই যখন এক সাথে এক পরিবার হয়ে খেলি তখন এটা দিয়ে খেলা হবে। শাকিল বলল, ঠিক। এটা বাতিল। নে এবার খেলা শুরু কর।
এবার খেলা শুরু হল। তুহিন একটা ব্যাগ ( ঠোংগা) নিয়ে বাজারে গেল। আর অপর দিকে ইয়াছিন। তেলাকুচার পাকা ফল এবং কাঁচা ফল, কচুরির কান্দাল, তেঁতুল গাছের পাতা, ইঁদুরের মাটি, ছিপটি গাছের কালো ফল, জগা গাছের ফল, ঝুনটি বেগুন, বাতাবির ঝরা ফুল, বালি, পোড়া মাটি ইত্যাদি যার যা সাধ্য হল বাজার করে নিয়ে এলো। জুঁই ইয়াছিনকে বলল, তুহিন কি রকম বাজার করল? ইয়াছিন বলল, আমি দেখি নাই। ও একদিকে গেল আর আমি আরেক দিকে। জুঁই বাজার দেখে খুব খুশি হল। এ দিকে আঁখি বলল, অনেক সুন্দর বাজার হয়েছে। নিলু বলল, আমি চুপি চুপি ওদের বাজার দেখে আসি। আঁখি বলল, যা। তবে ধরা খাস না। নিলু বলল, আমি এমন ভাবে যাবো ওরা বুঝতেই পারবে না। নিলু একটু ফাঁক থেকে উঁকি মেরে দেখতে লাগল। জুঁই দেখে বলল, আমি আর খেলবো না। এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখবে কেনো? নিলু বলল, লুকিয়ে দেখবো কেনো? আমি তো কনে দেখতে এসেছি। শাকিল বলল, বসেন ভাই। অনেক দূর থেকে এলেন। একটু জিরান। নিলু পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ থাকার পর বলল, কনেকে আনেন। একটু আশির্বাদ করেই যাবো । জুঁই বলল, একটু বসেন এখনই আনছি। তারপর কনে পুতুলটি কোনো রকম সাজিয়ে নিয়ে এলো। নিলু বলল, ওয়াও দারুন দেখতে। আমাদের বরের সাথে খুব করে মানাবে। এবার নিলু বলল, আমি আসি। জুঁই বলল, কি বলছেন? সবে তো এলেন। একটু বসেন। আমাদের রান্না এখনই হয়ে যাবে। নিলু বলল, না। আজ আর বসা যাবে না। আরও বিভিন্ন জায়গায় যেতে হবে। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। শাকিল বলল, তাহলে আর কি করা। চলুন এগিয়ে দিয়ে আসি।
নিলু বাড়ি ফিরে এলে আঁখি বলল, কেমন দেখে এলি? নিলু বলল, কাম খাম হয়ে গেছে। দেখতে গিয়ে ধরা পড়েছি। তাই বললাম যে আবার কনে দেখতে এসেছি। তুহিন বলল, আবার না আমার যাওয়ার কথা। আঁখি বলল, এখন এ সব কথা থাক। যা হওয়ার হয়ে গেছে। তুহিন বলল, আমি খেলবো না। নিলু বলল, ভাই ভুল হয়ে গেছে। তুহিন বলল, আমি তোকে হারে হারে চিনি। তুই আমাদের এখানে এমন ছুতা ধরে কনে দেখতে গেলি। আঁখি বলল, আর এ সব কথা বাড়াস না। দেখ তরকারিতে লবন কেমন হয়েছে? তুহিন বলল, আর একটু লবল দে। দেখিস আবার যেনো তেঁতো হয় না। বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয়েছে সামনের রবিবার। তুহিন হাতের আঙুল গুনে বলল, আর মাত্র চারদিন বাকি। হুড়রে! তাই বিয়ে। এমন সময় নিলু আর জাবেদ খুশিতে লাফ দিয়ে অনেক উপরে উঠল।
রবিবারের দিন। তুহিনের পুতুল সুন্দর করে বর সাজানো হল। আঁখি আর শারমিন দু'জনে খুব সুন্দর করে সাজাল। ওদিকে জুঁইয়ের পুতুল কনে। জুঁই আর মারুফা মিলে কনে সাজাল।
তুহিন বলল, সবাই তৈরি হও। বিয়ে বাড়ি যেতে হবে। নিলু আর জাবেদ হাত এ দিক সে দিক ছড়িয়ে গোসল দিল। যে ভাবে আলনা থেকে পোশাক পড়া হয় , সে রকম ভাব করে পোশাক পড়ল। তারপর সবাই মিলে চলল, বিয়ে বাড়ি।
পথ মাঝে শারমিন বলল, পথতো ফুরায় না। আর কত দূর গেলে বিয়ে বাড়ি। নিলু বলল, ওই যে দেখ স্কুল। ওই স্কুলের পশ্চিমেই বিয়ে বাড়ি।
এ দিকে বিয়ে বাড়িতে সবাই কাজ নিয়ে ব্যস্ত। জুঁই বলল, এই সবাই ঠিক মত কাজ করবি। কোনো জায়গায় যেন ভুল না হয়। ইয়াছিন আর শাকিল সুন্দর করে বিয়ের গেট সাজাল। সবাই বলাবলি করতে লাগল আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বর চলে আসবে।
তুহিন বর হাতে কনে বাড়ি এলো। বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে গেল। সবাই দৌড়ে এলো বর দেখতে। আর বিয়ের বরযাত্রী সব কনেকে দেখতে লাগল। খাওয়া দাওয়ার পর সবাই জলপাই এর পাতা চিবুতে লাগল। অর্থাৎ এটা হচ্ছে পান। আর সুপারি হল তেঁতুলের এক একটা গিট। এবার বিদায়ের পালা। তুহিন এক হাতে বর আর এক হাতে কনে নিয়ে বের হচ্ছে। আর পিছে পিছে সবাই।
জুঁই পুতুল হারানোর ভয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে বলল, খেলা শেষ এবার আমার পুতুল দে। তুহিন বলল, কিসের পুতুল? বিয়ে দিলি না? এখন থেকে এ কনে আমার বাড়িতে আমার মেয়ের মত থাকবে। সবাই খুব করে হাসতে লাগল। জুঁই বলল, আমি বাড়ি যাবো। আমার পুতুল দে। আঁখি বলল, এখনই পুতুল চাস কেন? বিয়ের সব পর্ব কি শেষ হয়েছে? জুঁই বলল, আমি বিয়ে টিয়ে কিছু বুঝি না। আমার পুতুল ফিরিয়ে দে। তুহিন বলল, তোর পুতুল এখন আমার পুতুলের বউ। ও এখন ওর সাথে আমার চৌকির তলায় থাকবে। জুঁই বলল, তাহলে দিবি না। তুহিন বলল, তুই কি পাগল? তারপর দুটি পুতুল নিয়ে বাড়ি চলে গেল।
এ দিকে জুঁই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলে গেল। বাড়ি গিয়ে উঠানে গড়াগড়ি খেল। আর বলতে লাগল, তুহিন ছিটারি করে আমার পুতুল নিয়েছে। আমি ওকে পুতুল দেবো না। তারপর জুঁইয়ের মা তুহিনদের বাড়িতে এলো । তুহিনকে বলল, ওর পুতুল কোথায়? তাড়াতাড়ি বের করে দে। আঁখি সেখানে ছিল। সে বলল, ও তো পুতুল বিয়ে দিয়েছে। এখনও বিয়ের পর্ব শেষ হয় নি। আবার কালকে খেলবো। জুঁইয়ের মা বলল, বিয়ে টিয়ে বুঝি না বাপু। ওর পুতুল ফিরিয়ে দাও। এবার আঁখি বলল, ওর পুতুল ফিরিয়ে দে। তুহিন ঘর থেকে পুতুল নিয়ে এলো। তারপর বলল, তুই আমার পুতুলও নিয়ে যা। এক সাথে রাখিস সবে বিয়ে হয়েছে। তা না হলে কিন্তু ওরা খুব কষ্ট পাবে। আমাদের অভিশাপ করবে। এবার জুঁই খুব খুশি হল। বলল, ওদের দু'জন কে খুব যন্ত করে রাখব। তুহিনের মা বলল, আজ থেকে তাহলে আমার ছেলের পুতুল ঘর জামাই। সবাই হেসে উঠল।
আঁখি বলল, চল বরই তলায় যাই। তুহিন বলল, চল। এখন কানামাছি খেলবো। তোর ওই কালো ওড়টা নিয়ে আয়। ওটা দিয়ে চোখ বাঁধলে কিছু দেখা যায় না। এমন সময় জুঁই বলল, আমি পুতুল রেখে আসি আর আমার ভাল ওড়না নিয়ে আসি। তুহিন বলল, না। তোর কিছু আনতে হবে না। জুঁই মন ভার করে বাড়ি চলে গেল। আঁখি গেল তার কালো ওড়না আনতে।
শাকিল বলল, আমি হবো প্রথম চোর। কোন বাঁটাবাঁটি হবে না। আঁখি বলল, ঠিক। তোর যখন চোর হওয়ার শখ। নিলু বলল, আগে আমায় চোখ বেঁধে দে। তুহিন বলল, এভাবে খেলা চলবে না। আয়। বাঁটাবাঁটি করি। এতে যে চোর হয় সেই হবে। তারপর তারা হাত ধরে বাঁটাবাঁটি করল। এবার চোর হল ইয়াছিন। নিলু ইয়াছিনকে বলল, দোস্ত তুই চোর হলি আমায় দিয়ে দেনা। ইয়াছিন বলল, যা তোকে দিয়ে দিলাম। এবার চোখ বাঁধা হল নিলুর। কারণ যে চোর হয়েছে তার কাছে কেউ যদি আবদার করে তাহলে সে তাকে দিতে পারে।
খেলা চলছে। সবাই এক সাথে বলল, কানামাছি ভোঁ ভোঁ... যাকে পাবি তাকে ছোঁ...। অনেকে নিলুকে চিমটি কেটে দূরে চলে যেতে লাগল। আবার অনেকে পায়ে পাড়া দিয়ে যেতে লাগল। এমনি করতে করতে নিলু জাবেদকে ধরে ফেলল। নিলু বলল, দোস্ত তোরে চিনে ফেলেছি। জুঁই বলল, কাকে ধরেছিস নাম বল? নিলু বলল, এখনও তোরা বুঝিস নাই? এটা হচ্ছে ইয়াছিন। সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। জাবেদ বলল, শালা ছাড় আমায়। নিলুর চোখ খোলা হল। নিলু বলল, শালা তোরে আমি চিনতে পারলাম না। দাঁড়া আর একবার ধরে নেই। নিলুর চোখ আবার বাঁধা হল। সবাই আবার তার চারদিকে ঘুরছে আর এক সাথে বলছে - কানামাছি ভোঁ ভোঁ ভোঁ...যাকে পাবি তাকে ছোঁ। নিলু এবার তুহিনকে ধরে ফেলল। আঁখি নিলুকে বলল, এবার বল, কাকে ধরেছিস। নিলু ভাল করে হাত দিয়ে তুহিনের গা দেখল। তারপর বলল, তুহিন। নিলুর চোখ খোলা হল। বাঁধা হল তুহিনের চোখ। এভাবে খেলা চলতে থাকল।
বিকেল বেলা সবাই নিলুদের বাড়ির পাশে প্রজাপতি ধরছিল। শাকিল তুহিনকে বলল, জুঁইয়ের পুতুল এখনই ফিরিয়ে দিলি কেনো? তুহিন বলল, দেইনি দেখে তার মাকে ডেকে নিয়ে এসেছে। ওর মা যে ঝগড়া করতে জানে। তাই ভয়ে দিয়ে দিলাম। কাল থেকে আর ওকে কোন খেলায় তুলবো না। তখন জুঁই কিছু বলল না। কারণ সে জানে তাকে বাদ দিয়ে ওরা খেলবে না। আঁখি বলল, তুহিনরে দেখ এই যে কি? তুহিন বলল, কি হয়েছে চিল্লাস কেন? তুহিন একটা প্রজাপতি ধরতে হাত বাড়িয়েছে। এমন সময় আঁখি আবার বলল, দেখ এই যে কি? তুহিন প্রজাপতিটা ধরতে বিফল হলে বলল, কি? আঁখি দেখাল, দেখ এই যে কত বড় লাল কালো প্রজাপতি। তুহিন বলল, ইয়া আল্লাহ। এত বড় প্রজাপতি।
এই রকম আরেকটা প্রজাপতি আশে পাশে ঘুরছে। তুহিন দৌড়াল সেই প্রজাপতির পিছে। তুহিনের সাথে সাথে সবাই ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে সবাই হয়রান হয়ে গেল। তারপর বলল, এটা বাদ। ধরা যাবে না। চল ছোট গুলো ধরি।
হাজার হাজার ফড়িং আকাশে উড়ছে এই বিকেল বেলা। অনেক গুলো ফড়িং ক্ষেতের বেড়ার উপর বসে আছে । পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে ফড়িং এর লেজ ধরা যায়। সবাই এখন প্রজাপতি ছেড়ে ফড়িং ধরতে এলো।
সবাই ফড়িং ধরতে লাগল। নিলু একটা বড় ফড়িং ধরে লেজের সাথে সুতা বেঁধে দিল। সে ফড়িংটিও ছুটছে সব ফড়িংয়ের সাথে। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারছে না। মাঝে মাঝে সে টেনে এ দিক সে দিক নিয়ে যাচ্ছে আবার দাঁড়িয়ে থাকছে।
সন্ধ্যা হওয়ার আর বেশি দেরি নাই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে। এমন সবাই তুহিন বলে উঠল, হুড়রে! ধরেছি। সবাই দেখল সেই বড় প্রজাপতিটা সে ধরেছে।
তারপর কি ভেবে সেই প্রজাপতি সে ছেড়ে দিল। প্রজাপতি উড়ে গেল দূর বহু দূরে। সে তার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর সবার সাথে বাড়ি ফিরে গেল।
বিংশ পরিচ্ছেদ
বরই তলার ছেলেমেয়েদের কয়েক দিন যাবাৎ খেলাধুলার প্রতি মনোযোগ নেই। কারণ তাদের খেলার সাথী শাকিল খুবই অসুস্থ। তাই তারা আর ঠিকমত বরই তলায় খেলে না। সবাই বসে বসে শুধু চিন্তা ভাবনা করে। কখন শাকিল ভাল হবে। তাদের সাথে আবার কবে খেলা করবে? সেই হিজল গাছে সবাই ঘুঘু পাখির ডিম দেখে এসে ছিল, তা ফুটে যেন আজ বাচ্চা বের হয়েছে। কিন্তু তারা আর সে বাসা দেখতে যায় না । সেই ঘুঘুর বাচ্চার প্রতি তাদের প্রচন্ড লোভ থাকা সত্বেও তারা আর সেই বাসার খোঁজ নেয় না। বর্ষার জলে আজ মাঠ ঘাট ভরা। মাছ ধরার জন্য তারা জাল কিনে ছিল, বাঁশের কুঞ্চি কেটে ছিল, কিন্তু তা অনাদরে পড়ে রয়েছে কোনো এক জায়গায়। তাহলে কি হল তাদের মনে?
আঁখি বলল, শাকিলের কি আর রোগ ভাল হবে না? কি করে শাকিলের রোগ ভাল হবে? তুহিন বলল, শাকিলের খুব বড় অসুখ। সবাই বলছে- শাকিল আর ভাল হবে না। জুঁই বলল, ভাল হবে না মানে? দেখবি একদিন ঠিকই ভাল হয়ে যাবে। ইয়াছিন বলল, তাই যেন হয়। ওকে ছাড়া যে আর খেলতে ভাল লাগে না। নিলু বলল, সবাই শাকিলকে দেখতে যাই চল। আমার যে ভাল লাগছে না। জাবেদ বলল, ও যে এখন বাড়িতে নাই। কিছুক্ষণ আগে দেখতে গেছিলাম। সবাই বলল, এখন হাসপাতেলে আছে। আঁখি বলল, শাকিলকে আবার খুব ভোরে হাসপাতেলে নিয়ে গেছে। নিলু বলল, কখন বাড়ি আনবে। আবার ওকে কখন দেখবো। আঁখি বলল, জানি না। আজ না হয় কাল বাড়ি আনবে।
পরের দিন শাকিল হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে এলো। পাড়ার সবাই শাকিলকে দেখতে এলো । বরই তলার সেই ছেলেমেয়েরা শাকিলকে ঘিরে বসে পড়ল। শাকিল বলল, আমার কিছু হয়নি। আমি ভাল হয়ে যাবো। শাকিল এখন মোটামুটি সুস্থ। সবার সাথে ভাল ভাবে কথা বলছে। নানান জন তার সাথে নানা কথা বলতে শুরু করল। তুহিন বলল, তোর এখন কেমন লাগছে। আমরা সবাই কত টেনশনে ছিলাম। শাকিল বলল, তোরা সবাই মিছামিছি টেনশন করছিস। আমি ভাল হয়ে যাবো। তখন নিলু শাকিল কে বলল, চল এখন বরই তলায় যাই। শাকিল উঠতে চাইলে সবাই না করল। বলল, একটু পরে যেও। এত পথ এলে, একটু জিরিয়ে নাও। তুহিন বলল, ঠিক। একটু পরে। সবাই তোকে ধরে নিয়ে যাবো। শাকিল মাথা নেড়ে বলল, আচ্ছা।
পাড়ার সব লোকজন শাকিল কে দেখে দেখে বাড়ি ফিরে গেল। বাড়িতে আর তেমন লোকজন নেই। তুহিন বলল, চল। সবাই শাকিল কে ধরে বরই তলায় নিয়ে যাই। সে ভাল করে হাটতে পারে না। সবাই ধরে ধরে পুরো বরই তলা হাটাল। শাকিল বলল, তোরা এভাবে ধরে আমায় কষ্ট দিস না। আমায় নিয়ে বেড়াতে চাইলে, একটা নৌকা নিয়ে আয়। সাথে সাথে ইয়াছিন দৌড়ে গিয়ে ঘাটে নৌকা নিয়ে এলো। নৌকার উপর একটা বিছানা পাতা হল। এবার সবাই ধরাধরি করে তাকে নৌকায় উঠাল। বাড়ির সবাই বলল, ওকে তোমরা দেখে রেখ, যেন পানিতে না পড়ে। তুহিন বলল, আচ্ছা। আমরা ওকে সব সময় ধরে রাখব। নৌকা ছাড়া হল। কিছু দূর যাওয়ার পর শাকিল বলল, চল ঘুঘুর বাসা দেখতে যাই। কত দিন হল যাওয়া হয় না। এত দিন মনে হয় ঘুঘুর বাচ্চা হয়েছে। তুহিন বলল, আমাদের তো মনেই ছিল না ঘুঘুর কথা। নিলু নৌকা ঘুরিয়ে, ঘুঘুর বাসার দিকে নিয়ে গেল। আঁখি বলল, এখন ঘুঘুর বাসা দেখতে যাওয়া যাবে না। ঘুঘু যদি মুন্নি ( অভিশাপ) দেয়। এমনি অসুস্থ। তারপর সবাই বলল, সত্যিইতো যদি মুন্নি দেয়, না থাক ঘুঘুর বাসা দেখতে যাওয়া যাবে না। এমন সময় শাকিল বলল, শুধু দেখে আসবো। ঘুঘুর বাসায় উঠলে তো মুন্নি দিবে। তুহিন বলল, নিয়ে চল। শুধু দেখেই আসবো।
ঘুঘুর বাসা দেখতে নিয়ে যাওয়া হল। ঘুঘু গাছের ডালে বসে ঘুঘু-ঘুঘুক করে ডাকতে লাগল। আঁখি বলল, এখান থেকে চল যাই। ঘুঘু আমাদের দেখতে পেয়ে এভাবে ডাকছে। তুহিন বলল, নিলুরে নৌকা অন্য দিকে নিয়ে চল। নিলু বলল, এখন কোথায় নিয়ে যাবো? তুহিন বলার আগেই শাকিল বলল , কুঠির পাড়ে নিয়ে চল।
নৌকা কুঠির পাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জাবেদ বলল, ওই দেখ কত সুন্দর বাতাবি গাছে ঝুলছে। বাতাবির ভারে গাছ গাঙের কূলে হেলে পড়েছে। আর একটু পানি বাড়লে অনেক বাতাবি পানিতে তলিয়ে যাবে। জুঁই বলল, এখন আর ও দিকে চোখ দিস না। যাদের গাছ তারা দেখে ঠিকই পেরে নিবে। শাকিল বলল, তোরা পেরে খা। আমি না হয় নাই খেলাম। আঁখি বলল, এখন অন্যের জিনিস চুরি করে খাওয়া যাবে না।
কুঠির পাড়ের চারদিকে পানি। তুহিন শাকিলকে বলল, পাড়ে নামবি? না এখন আবার অন্য দিকে যাবি? শাকিল বলল, নামবো। কত দিন হল আসা হয় না। সবাই ধরে তাকে কুঠির পাড়ে নামাল। সেখানে শনশন করে বাতাস বইছে। শাকিল বলল, এখানে খুব ভাল লাগছে। এখানে বিছানাটা নিয়ে আয়। একটা ঘুম দিবো। তুহিন বলল, এটা ভাল জায়গা না। এখানে ঘুম দেয়া যাবে। নৌকায়ও খুব বাতাস লাগছে। নৌকায় গিয়ে ঘুমাবি চল। শাকিল বলল, আচ্ছা। নৌকায় নিয়ে চল। সবাই ধরাধরি করে আবার নৌকায় নামাল। সবাই সুন্দর করে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নৌকা এবার অন্য দিকে চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শাকিল ঘুমিয়ে পড়ল।
তিন চার দিন পর বরই তলায় সবাই বেগুন টোপ খেলতে লাগল। শাকিল এক পাশে চেয়ার পেরে বসে সেই খেলা দেখতে লাগল। শরীরটা তার উন্নতির দিকে না গিয়ে ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যাচ্ছে। সে চেয়ারে বসে জিমাতে জিমাতে তবু খেলা দেখতে লাগল। আঁখি বলল, তোর অনেক খেলা দেখা হয়েছে, চল এবার বাড়ি রেখে আসি। তুহিন বলল, আবার পরে দেখিস। চল যাই রেখে আসি। শাকিল বলল, তোরা খেলতে থাক। আমার যাওয়ার সময় হলে আমি তোদের বলবো। সবাই আবার খেলতে লাগল। নিলু মনে মনে ভাবল, শাকিলের মনে হয় খেলতে মন চাচ্ছে। ওকে ছাড়া এভাবে খেলা ঠিক হচ্ছে না। তাই সে বলল, তুই আমাদের সাথে বেগুন টোপ খেলবি? শাকিল বলল, হ্যাঁ। তুহিন বলল, আয় আমার কাছে বয়। আঁখি চোর হয়েছে আর সবাই গোল হয়ে বসে আছে। আঁখির হাতে মাথায় গিট দেয়া একটা গামছা। সে সেই গামছা নিয়ে সবার পিছনে ঘুরতে লাগল। তুহিন শাকিলের সাথে কথা বলছে এই সুযোগে আঁখি গিট দেয়া গামছটা তার পিছনে রেখে দিল। শুধু তুহিন আর শাকিল ছাড়া সবাই দেখতে পেল। তাই সবাই হাসতে লাগল। আঁখি গোলকের চারদিকে ঘুরে এসে তুহিনের পিছন থেকে গামছাটা নিয়ে তুহিনের পিঠে ঠাস ঠাস করে মারতে লাগল। তুহিন এবার বুঝতে পারল যে গামছা তার পিছে রাখা হয়েছিল। তাই সে দৌড়ে গোলক ঘুরে আগের জায়গায় বসে পড়ল। তারপর বলল, আঁখি তুই এত চালাক জানতাম না। শাকিলের সাথে কথা বলছি আর এই ফাঁকে আমায় ঠকালি। তাতে আমায় কয়টা মারতে পারলি? আঁখি আবার চারদিকে ঘুরতে লাগল। জুঁই এর পিছন দিয়ে যাওয়ার সময় গামছা তার পিছনে রেখে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর জুঁই পিছনে তাকাল। সে গামছাটি তুলে আঁখি কে ধাওয়া করে দুইটা মার দিল। এবার আঁখি গিয়ে বসে পড়ল জুঁই এর জায়গায়। এখন গামছা নিয়ে জুঁই ঘুরতে লাগল। জুঁই অনেক চালাক। সে গামছা রাখল ইয়াছিন আর নিলুর ঠিক মাঝখানে। ইয়াছিন পিছনে তাকিয়ে ভাবল, নিলুর পিছনে রেখেছে তাই সে কিছু করল না আবার নিলু পিছনে তাকিয়ে ভাবল ইয়াছিনের পিছনে রেখেছে তাই সেও কিছু করল না। দু'জনই নিশ্চিন্তায় আছে। জুঁই ঘুরে এসে নিলুকে ঠাস ঠাস করে মারতে লাগল। নিলু বলল, তুই আমাকে মারছিস কেন? ইয়াছিনের পিছনে রাখিস নাই? আমি দেখতে পেলাম তুই ইয়াছিনের পিছনে রেখে দিলি। জুই বলল, তোর পিছনেই তো রেখে দিয়েছি। নিলু বলল, না। তুই আমার পিছনে রাখিস নাই। এক দুই কথায় নিলু আর জুঁইয়ের মধ্যে চরম ঝগড়া লেগে গেল। তুহিন ওদের সামনে বসেছে। সে সব দেখতে পেয়েছে। তাই সে বলল, জুঁই এটা ঠিক করে নি। আমি দেখেছি ও মাঝ খানে রেখে দিয়েছিল। এবার ইয়াছিন বলল, ঠিক। ও মাঝ খানে রেখে ছিল। এখন নিলু বলল, জুঁই আমায় অবৈধ ভাবে যে কয়টি মার দিয়েছে আমি সে কটি দিয়ে, একটা ফাও দিবো। জাবেদ বলল, তাড়াতাডি দে। সে মার দিতে শুরু করল। জুঁই বলল, আমি কি তোকে এত জোরে জোরে মার দিয়েছি। আঁখি বলল, এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। এত জোরে জোরে মার দিচ্ছিস কেনো? নিলু কিছু বলছে না। সে মার দিয়েই যাচ্ছে। মার শেষ হওয়ার আগেই জুঁই কেঁদে ফেলল। তুহিন বলল, এবার হল তো। রাত হওয়ার এখনো কত সময় বাকি আছে। এই কান্নার জন্য এখনই খেলা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সে নিলুকে খুব করে বকা দিতে লাগল। কিছুক্ষণ পর জুঁই চোখ মুছে হেসে বলল, খেলা বন্ধ হবে কেনো। নে আবার খেলা শুরু কর।
সবাই আবার খেলা শুরু করল । জুঁই নিলুর ফাঁকা জায়গায় বসল। নিলু চারদিকে ঘুরতে লাগল। ঘুরতে ঘুরতে সে গামছা শাকিলের পিছনে রাখল। আঁখি দেখে বলল, এটা হবে না। ও অসুস্থ মানুষ। নিলু বলল, তাহলে খেলতে আসে কেনো? আর আমি ওকে আস্তে আস্তে মারবো। শাকিল বলল, আস্তে আস্তে মানে? তুই আমাকে মারার চান্স পেলে তো। তুই আমার পিছনে রেখে দিয়েছিস, আমি দেখি নাই মনে করছো। নিলু বলল, আঁখি ও কথা বলল দেখে তুই বুঝতে পারলি। তাছাড়া কি তুই বুঝতে পারতি। তুহিন বলল, তর্ক করিস না আবার ঘোরা শুরু কর। নিলু এবার ঘুরতে ঘুরতে ইয়াছিনের পিছনে রাখল। জাবেদ ইয়াছিনকে ইশারায় বুঝাতে চাইল তোর পিছনে রেখেছে, কিন্তু ইয়াছিন ভাল করে না বুঝে ওর দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। এর মধ্যে নিলু ঘুরে এসে ইয়াছিনকে ঠাস ঠাস করে মার দিতে লাগল। ইয়াছিন ঘুরে এসে আবার যথা জায়গায় বসে পড়ল। এভাবে সে দিনের খেলা শেষ হল।
পরের দিন সবাই বরই তলায় উপস্থিত হল। শাকিল কেউ আনা হল। সে চেয়ারে এসে বসল। সবাই বলল, কি খেলা যায়, যে খেলায় শাকিলও খেলতে পারবে। এবার শাকিল বলল, আমি এখন খেলবো না। তোরা সবাই রক্তজবা খেল। তুহিন বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। সবাই রক্তজবা খেলা আরম্ভ করতে লাগল। নিলু বলল, আজকে বাঁটাবাঁটি বাদ। আমি আগে চোর হবো। আঁখি বলল, তোর যখন চোর হওয়ার এতই শখ তাহলে অন্য খেলায় চোর হস না কেন? নিলু বলল, ওটাই তো বুঝবি না। শাকিল বলল, তোরা খেলা শুরু কর। আমার তেমন ভাল লাগছে না। তুহিন বলল, নিলু চোর। সবাই সাবধান হও। এখনই খেলা শুরু হবে।
খেলা শুরু হল। নিলু প্রথমে আঁখিকে ধাওয়া করল। আঁখির নাগাল পেল। নিলু আঁখিকে ছোঁয়ার সাথে সাথে আঁখি কারেন্টের মত থেমে গেল। জুঁই বলল, আঁখি মরা গেছে। ওকে রক্ত দিয়ে বাঁচাতে হবে। সবাই আঁখিকে ছোঁয়ার চেস্টা করতে লাগল। নিলু বাঁধা দিচ্ছে। সবাই সহজে কাছে ভিড়তে পারছে না। কারণ নিলু যাকে ছুঁবে তাকে কারেন্টের মত থেমে যেতে হবে এবং তারপর স্টিলের মত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। যদি তা না হয় তাহলে সে চোর হবে। অন্য কেউ তাকে ছুঁলে সে আবার আগের মত চলতে পারবে অর্থাৎ সে আবার প্রাণ ফিরে পাবে। আঁখির চারদিকে সবাই ঘিরে ফেলল। নিলু লাফালাফি শুরু করল। একবার এ দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, একবার ওদিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। নিলু ইয়াছিনকে ছুঁয়ে ফেলল। ইয়াছিন স্টিলের মত দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু এ দিকে জুঁই আঁখিকে ছোঁয়ার সাথে সেথে সে দৌঁড়াতে লাগল। এবার নিলু খুব সচেতন হল। জুঁই যখন ইয়াছিনকে রক্ত দিতে চেস্টা করছে সাথে সাথে ইয়াছিনকে ছেড়ে জুঁই কে ধরল। জুঁই স্টিলের মত দাঁড়িয়ে গেল। তুহিন জুঁইকে বাঁচাতে চেস্টা করছে এক সাথে তুহিন আর আঁখিকে ছুঁয়ে ফেলল কিন্তু আঁখি দৌড়ের ঝোক রাখতে না পেরে দূরে চলে গেল। নিলু বলল, আঁখি চোর। ও অনেক দূরে চলে গেছে। আঁখি বলল, আমি ঝোক রাখতে পারি নাই। নিলু বলল, তাই বলে অত দূর। আমি মানবো না। এখন শাকিল বলল, আঁখি মরা। ও ইচ্ছে করে দূরে গেছে। সবাই বলল, তাহলে তো আঁখি চোর। এভাবে অনেকক্ষণ খেলা চলতে লাগল। তারপর শাকিল বলল, এ খেলা আর ভাল লাগছে না। তোরা গোলাপফুল খেল। আঁখি বলল, অনেক ভাল হবে, নে গোলাপফুল খেলি। সবাই আবার গোলাপফুল খেলতে প্রস্তুতি নিল।
গোলাপফুল খেলবে আঁখির দল আর জুঁইয়ের দল। দু'জন লোক টানাটানি করল। তুহিন গেল আঁখির দলে। ইয়াছিন গেল জুঁই এর দলে। এ খেলায় শাকিলও যোগ দিল। শাকিল আঁখির দলে। নিলু জুঁই এর দলে। এভাবে দু'দল সাজানো হল। বরই তলার দক্ষিণে একটা দাগ দিল। আর অপর অর্থাৎ উত্তর পাশে জুঁই একটা দাগ দিল। দক্ষিণের দাগে দাঁড়াল আঁখির দল আর উত্তরের দাগে দাঁড়াল জুঁইয়ের দল। জুঁই আর আঁখি তাদের নিজ নিজ দলের সদস্যদের লাইন করে দাগ বরাবর বসিয়ে দিল।
এবার আঁখি জুঁই কে বলল, তোরা কিসের নাম নিবি? জুঁইয়ের বলার আগেই নিলু বলল, আমরা ফুলের নাম নিবো। জুঁই বলল, আচ্ছা ঠিক আছে আমরা ফুলের নাম নিলাম। আঁখি বলল, তাহলে আমরা পাখির নাম নিলাম। জুঁই বলল, আচ্ছা ঠিক আছে।
একদিকে আঁখি তার সদস্যদের কানে কানে নাম পড়াচ্ছে আর অপর দিকে জুঁই। আঁখি তুহিনের নাম রাখল দোয়েল, শাকিলের নাম রাখল টিয়া, জাবেদের নাম রাখল ময়না। অপর দিকে জুঁই ইয়াছিনের নাম রাখল গোলাপফুল। শারমিনের নাম রাখল, জবা। নিলুর নাম রাখতে গেলে নিলু বলল, আমার নাম জুঁই। জুঁই বলল, থাপড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিবো। তারপর বলল, তোর নাম শাপলা। নিলু বলল, আমি শাপলা নিবো না। আমার নাম গন্ধরাজ। জুঁই বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। মনে থাকে যেন।
জুঁই আঁখিকে বলল, তোর দল আগে ধরি। আঁখি বলল, আচ্ছা ধর। তবে আস্তে ধরিস। কেউ যেন চোখে ব্যথা না পায়। জুঁই বলল, এমন ভাবে চোখ ধরব কেউ ব্যথা পাবে না। এবার জুঁই, শাকিলের চোখ ধরল। তারপর তার পড়ানো নাম ধরে ডাক দিল - আয় রে...আমার গোলাপফুল... টোক্কা দিয়ে যা। ইয়াছিনের নাম রাখা হয়েছে গোলাপফুল। ইয়াছিন দৌড়ে এসে শাকিলের কপালে টোক্কা দিল। তারপর ফিরে গিয়ে বসে পড়ল তার যথা জায়গায়। এবার জুঁই চোখ ছেড়ে দিল। শাকিল জুঁইয়ের সদস্যদের ভাল করে দেখে বলল, নিলু। জুঁইয়ের সব সদস্য হেসে উঠল। ইয়াছিন এবার সেই দাগ থেকে লাভ দিয়ে সামনের দিকে এগুলো। জুঁই আবার নতুন করে ইয়াছিনের নাম রাখল হাসনাহেনা। জুঁইয়ের দল পাড়ার কারণে জুঁই আবার চোখ ধরার সুযোগ পেল। সে এবার তুহিনের চোখ ধরল। তুহিন বলল, আস্তে চোখ ধর। ব্যথা লাগে তো। জুঁই তার পরানো নাম ধরে ডাকতে যাবে সেই সময় নিলু ইশারা করে বলল, আমায় ডাক দে। জুঁই এবার বলল, আয় রে আমার গন্ধরাজ ; টোক্কা দিয়ে যা। নিলু টোক্কা দিতে আসছে। শাকিল বলল, একেবারে গন্ধরাজের মতই দেখতে। জুঁই বলল, এভাবে আর একবার বললে আমি আর খেলবো না। শাকিল বলল, নে আর বলবো না। গন্ধরাজ তুহিনের কপালে টোক্কা দিয়ে গেল। তুহিন বলে উঠল কোন শালারে এত জোরে টোক্কা দিল। জুঁই চোখ ছেড়ে দিলে তুহিন বলল, নিলু। এবার আঁখির দল হেসে উঠল। তুহিন তার দাগ থেকে লাফ দিয়ে সামনের দিকে এগুলো।
এবার আঁখির ধরার পালা। প্রথমে চোখ ধরল নিলুর। নিলু বলল, আস্তে ধর। আঁখি বলল, আয় রে আমার ময়না ; টোক্কা দিয়া যা। জাবেদ দৌড়ে গিয়ে নিলুর কপালে টোক্কা দিল, তারপর তার জায়গায় ফিরে গেল। নিলু ভাবল কে হতে পারে? শাকিলতো আসতে পারবে না। তার মানে শাকিল বাদ। ওদের মধ্যে কেউ হবে। আঁখি বলল, নে তাড়াতাড়ি বল, নিলু এবার বলল, তুহিন। জাবেদ সাথে সাথে এক লাফ দিয়ে সামনে এগুলো। এভাবে খেলা চলতে লাগল। এক সময় শাকিল বলল, আমায় রেখে আয়। আমি আর খেলবো না। সবাই ধরাধরি করে আবার বাড়ি রেখে এলো।
এক দুই ঘন্টা পর শাকিল আবার বলল, আমি বরই তলায় যাবো। ওদের খেলা দেখবো। কে একজন তুহিনদের খবর দিল শাকিল আবার আসবে। সবাই গিয়ে আবার নিয়ে এলো।
শাকিল বলল, তোরা বউছি খেল। আমি দেখি। আজকাল তার কথা খুব মানা হয়। সবাই বলল, এখন বউছি খেলা শুরু।
আঁখি বিশাল এরিয়া নিয়ে চারকানি একটা ঘর আঁকাল। পুবে একটা ছোট ঘর আঁকাল যেটাতে প্রথম পক্ষ দল থাকবে। আর পশ্চিমে খুব ছোট করে একটা ঘর আঁকাল। যাতে করে একটা বউ অর্থাৎ একটা ছোট পুতুল থাকবে। প্রথম পক্ষকে সে বউ আনতে হবে।
তারা বাঁটাবাঁটি করে দুটি দল বানাল। তারপর আসল খেলা শুরু হল। নিলু প্রথম দম দিল ; বউছি বউ নিতে আইছি... বউছি নিতে আইছি...বউছি বউ নিতে আইছি। কিন্তু সে দম দিয়ে দাগের বাইরে যেতে পারবে না। সবাই দাগের বাইরে এবং ভেতরে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে দম দিয়ে যেন কেউ ছুঁতে না পারে । প্রথম দম চলে গেল। এবার ২য় দম দিল আঁখি। সে দম দিয়ে বউ নেওয়ার জন্য ছোবল দিল কিন্তু বউ না নিয়ে ঘুরে দৌড় দিলে জুঁইকে ছুঁয়ে ফেলল। তুহিন বলল, ও কিন্তু চালাক। এভাবে মারে।
খেলতে খেলতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। সবাই শাকিলকে বাড়িতে রেখে, যার যার বাড়িতে চলে গেল।
তিন চার মাস চলে গেল। শাকিলের অবস্থা খুবই খারাব। মাথায় টিউমার এবং পরবর্তীতে ক্যানসারের রুপ নিয়েছে। বাংলাদেশের অনেক হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে অনেক টাকা ফুরাল। তার বাবা মা গরীব মানুষ। ছেলের রোগ যাতে সেরে যায় এই ভেবে জমিজমা সব বিক্রি করে তাকে চিকিৎসা করাল । কিন্তু নিয়তির ফেরে সে ভাল হল না। সব হাসপাতাল তাকে ফিরিয়ে দিল। এখন যখন তখন তার প্রাণ চলে যেতে পারে। পাড়া প্রতিবেশি, আত্নীয়-স্বজন সবাই দেখতে আসতে লাগল। সবাই বলাবলি করতে লাগল এ যাত্রায় আর শাকিল ফিরল না। বরই তলার দলের চোখে ঘুম নেই। তারা দিন রাত শাকিলদের বাড়িতে থাকে।
শাকিলদের বাড়ির এক পাশে তারা সবাই বসে আছে। আঁখি বলল, শাকিল আর বাঁচবে না। সব হাঁসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে। সে আর ভাল হবে না। নিলু বলল, এ রোগ হলে যে মানুষ আর বাঁচে না। সে আর আমাদের সাথে কোনো দিন খেলতে পারবে না। আঁখি বলল, যদি আবার সেরে উঠে - এমন সময় জাবেদ নিলুকে বলল, চল এখন বাড়ি যাই সেই সকালে এসেছি। নিলু বলল, চুপ করে বসে থাক। আর তুই যদি একা বাড়ি যাস তাহলে যা। আমার যাওয়া অনেক দেরি হবে। জাবেদ বলল, তুই যদি না যাস তাহলে আমিও যাবো না। তুহিন বলল, তোরা সেই সকালে এসেছিস, যা খাওয়া দাওয়া করে আবার আয়। খিদায় কষ্ট করলে তো আর শাকিল ভাল হবে না। আঁখি বলল, তোরা যা। আবার পরে আসিস। এবার জাবেদ বলল, পরে যাবো। আর কিছুক্ষণ থাকি। সব লোকজন আসছে। কি যে হয়। কিছুক্ষণ পরে নিলু বলল, চল রে জাবেদ ; আমার যে আর খিদায় সয়ছে না। চল খাওয়া দাওয়া করে আবার আসি। এই বলে ওরা দু'জন বাড়ি চলে গেল। তুহিন বাকি সবাইকে বলল, চল সবাই। খাওয়া দাওয়া করে আসি।
সবাই বাড়ি চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর সবাই আবার শাকিলদের বাড়িতে এলো। তারা এসে দেখল, লোকজন আরো বেড়ে গেছে। লোকজনের ভিড় ঠেলে তারা শাকিলকে দেখতে লাগল। তারপর আম গাছের নিচে সবাই বসে পড়ল।
শাকিলের প্রাণ পাখি উড়ে গেল অচিনপুরে। ঘরের ভেতর কান্নার ঝড় উঠল। বাড়ির সবাই চিৎকার করে কান্না করতে লাগল। আঁখি বলল, চল সবাই। শাকিলকে দেখে আসি। তারা এবার ভীর ঠেলে ভেতরে ঠুকতে পারল না। সবার মুখে তারা শুনতে পেল, শাকিল মারা গেছে। সাথে সাথে তাদের বুকটা যেন কেঁপে উঠল। তারা সবাই কাঁদতে লাগল। অনেকে উঠানে গড়াগড়ি করে কান্না করতে লাগল। কারও মাথায় পানি ঢালা হল।এ বাড়ি থেকে আজ শুধুই কান্নার আওয়াজ শুনা গেল। তুহিন বলল, এমন করে কাঁদতে নেই। কান্না করলে যে লাশ কষ্ট পায়। নিলু বলল, আজ কাঁদবো না? আজ কি হাসবো? আমাদের বন্ধু চলে গেল। সে আর আমাদের সাথে খেলবে না। সবাই আবার চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। কে একজন এসে বলল, তোমরা আর কেঁদো না। তাহলে যে তোমাদের বন্ধু কষ্ট পাবে। কেউ তার কথা শুনল না। সবাই কান্না করতে লাগল। তুহিন বলল, আর তো শাকিল কথা বলে না। সবাই ওকে ভীর করে এমন করে বসে আছে কেনো? সবাই কাঁদছে কেনো? সে কত দূরে যাবে? সে কি আর ফিরবে না? বরই তলায় আর আমাদের সাথে খেলবে না? নৌকায় আর কলাপাতা কাটতে যাবে না? তাহলে তার কি রকম কষ্ট যে সব কিছু ছেড়ে চলে যাবে। নিলু বলল, আমরা কি দোষ করলাম, ও আমাদের ছেড়ে চলে গেল। ওর রাগ কি কোনো দিন কমবে না? আঁখি বলল, ওর রাগ যে কমবে না। ও আর ফিরে আসবে না। এখন থেকে ওকে ছাড়া যে খেলতে হবে। তুহিন বলল, না। আমরা আর খেলবো না। আমরা আর কুঁড়েঘর তুলবো না। ছাউছি খেলবো না। বউছি খেলবো না। আজ থেকে সব খেলা বন্ধ। আঁখি বলল, এখন এ সব কথা বলে আর কোনো লাভ নাই। চল আর একবার ভীর ঠেলে শাকিলকে দেখে আসি। সবাই ভীর ঠেলে ঘরের ভেতর ডুকছে - তুহিন খুব জোরে চিক্কুর দিয়ে বলল, তোরা সব সরে যা। আমাদের আর একবার শাকিলকে দেখতে দে। আমাদের বন্ধুকে আর একবার দেখি। সবাই একটু সরে গেল। বরই তলার কাঙাল ছেলেমেয়েরা এবার ভাল ভাবে ঘরে ডুকল। শাকিলকে ধরে তারা কাঁদতে লাগল। সব মুরব্বিরা বলল, তোমরা এখন যাও। আর কেঁদো না। নিলু বলল, আমরা শাকিলকে রেখে যাবো না। আমরা এখানেই থাকবো। আঁখি বলল, আমরা আর কিছুক্ষণ দেখেই চলে যাবো। ইয়াছিন বলল, না। শাকিল আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবে? কোনো দিন তো আমাদের ছাড়া ও কোথাও একা যায় নি? ও পথ চিনবে না? আমরা ওর সাথে যাবো। তুহিন বলল, আমরা ওকে একা যেতে দিব না। আমরা কি দোষ করলাম। আমাদের ও নিয়ে যাবে না। সবাই এবার এক সাথে কাঁদতে লাগল। কে একজন এসে বলল, ওদের কে সরিয়ে নিয়ে যাও। লাশের পাশে ওদের থাকতে দিও না। ওরা যে আরো কষ্ট পাবে। তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেয়া হলে তারা আবার আম গাছের পাশে বসল।
রানার দাদি এসে বলল, তোদের বন্ধু আজ কোথায় গেল? সে যে আর আসবে না। জন্মের মত চলে গেল তোদের ছেড়ে। ও আর বরই তলায় খেলবে না। বলতে বলতে সে খুব জোরে কেঁদে ফেলল। আর তার সাথে সাথে বরই তলার সেই ছোট্ট ছেলেমেয়েরা বুক ফাটিয়ে কাঁদতে লাগল। সবাই গলাগলি ধরে কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে গেল। কে একজন পানি নিয়ে এসে তাদের খাইয়ে দিল। তাদের আত্তা আজ কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।
নিলুদের পাড়ার বাশার বলল, শাকিলের লাশ বেশিক্ষণ রাখা যাবে না। ক্যানসারের রুগীর লাশ বেশিক্ষণ রাখতে নাই। তাড়াতাড়ি মাটি চাপা দিতে হবে। কথাটা বরই তলার ছেলেমেয়েরা শুনে উঠানে গড়াগড়ি করে কাঁদতে লাগল। তাদের কান্না কেউ থামাতে পারছে না। তাদের সবার গায়ে ধূলা বালি ভরা। রানার দাদি এসে বলল, তোরা আর এমন করে কাঁদিস না। এখনই লাশ কবরস্থানে নিয়ে যাবে। তোরা সবাই গোসল করে আয়। তোদের বন্ধুর লাশ মাটি দিবি না? কোনো কথা না বলে সবাই ঘাটে গেল। আজ আর তারা ঘাটে ঝাপ দিয়ে নামল না। ধীরে ধীরে নামতে লাগল। একটা বড় নৌকা ঘাটে বাঁধা। জাবেদ বলল, এই নৌকায় শাকিলের লাশ কবরস্থানে নিয়ে যাবে। তুহিন বলল, ও তো কোনো দিন এই নৌকায় বেড়াতে যায়নি। আজ কেন যাবে? চল আমাদের সেই নৌকা নিয়ে আসি। যে নৌকায় আমরা এক সাথে সবাই বেড়াতাম। সে নৌকা ঘাটে বাঁধা আনা হল।
এবার শাকিলকে শেষবারের মত নৌকায় চড়ানো হল। বাড়ির ভেতর কান্নার ঝড় আবার উঠল। কিন্তু তুহিনরা আর কাঁদছে না। তারা যেন স্থির হয়ে গেছে। শাকিলের লাশ সবাই বড় নৌকায় তোলার সময় তুহিনের দল বাঁধা দিল। তারা বলল, আমাদের বন্ধু এই নৌকায় যাবে। আমরা ওকে নিয়ে সব সময় এই নৌকায় ঘুরেছি। তখন সবাই লাশ তুহিনের নৌকায় উঠাল। শাকিলের সব বন্ধু সে নৌকায় আছে। সবার মাথায় টুপি। কেউ তাদের নামিয়ে দিল না। দু'জন মুরব্বি সে নৌকায় বাড়তি উঠল। নোকা ছাড়া হল। পিছে পিছে লোক ভর্তি বড় নৌকাটি ছাড়া হল।
এবার কবরস্থানের পাশে লাশটি নামাল হল। জানাজা পড়ানো হল। লাশ মাটি চাপা দেয়া হল। মোনাজাত ধরা হল। গ্রামবাসীর সাথে বরই তলার সেই ছোট্ট ছেলেমেয়েরাও মোনাজাত ধরল। সবাই শাকিলের জান্নাত কামনা করল।
এবার বাড়ি ফেরার পালা। সবাই বড় নৌকায় চড়ে ফিরল। ছোট নৌকায় শুধু বরই তলার ছেলেমেয়েরা। তারা ধীরে ধীরে নৌকা বাইতে লাগল। আর কবরস্থানের যে পাশে শাকিলের লাশ রেখে এসেছে, সে দিকে ফিরে ফিরে তাকাতে লাগল। দুঃখ প্রকাশ করার মত তারা ভাষা খুঁজে পেলো না। তাই তারা সবাই নীরব হয়ে বসে রইল। মনে পড়তে লাগল তাকে নিয়ে হাজারো স্মৃতি ঘেরা সেই বরই তলা। যে বরই তলায় সে আর খেলবে না। এই নৌকায় সে আর চড়বে না। ঘুঘু পাখির ছা আর সে ধরবে না। ঝড়ের দিনে আর আম কুঁড়াতে যাবে না। আঁখি তুহিনকে বলল, ও দিকে আর তাকাস না। নৌকা জোরে চালা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
তুহিনের নৌকা ভেসে চলল, দূর হতে বহু দূরে। যাক ভেসে যাক।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।