হলঘরে প্রতিধ্বনিত সেই ভয়ঙ্কর কণ্ঠস্বর থেমে যাওয়ার পর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নিশি আতঙ্কে রুদ্রের হাত শক্ত করে ধরলো। চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে। মুখোশটার চোখ থেকে নিরন্তর ধোঁয়া বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, আর সেই ধোঁয়া স্পর্শ করলেই পাথরের দেয়ালে খোদাই করা অক্ষরগুলো অদ্ভুতভাবে জ্বলে উঠতে লাগলো।

রুদ্র ধীরে ধীরে বেদির কাছে এগিয়ে গেলো। নিশি কেঁপে কেঁপে বলল-
“না রুদ্র! ওটা ছোঁওয়া যাবে না। তুমি শুনোনি কণ্ঠস্বরটা কী বললো?”

রুদ্র থেমে গেলেও কৌতূহল তাকে গ্রাস করছিল। সে লক্ষ্য করলো, মুখোশটার চারপাশে তিনটি খোদাই করা প্রতীক। প্রতীকগুলো দেখতে চোখের মতো, ঠিক দরজার ওপরে যেমন খোদাই ছিল। এবার নিশি খেয়াল করে চমকে উঠলো-
“রুদ্র… আমি বুঝতে পারছি! এই প্রতীকগুলো একটা প্রাচীন উপজাতির চিহ্ন। তারা বিশ্বাস করতো-অন্ধকারের দেবতার চোখ তিনটি আলাদা রূপে প্রকাশিত হয়। আর এই মুখোশই সেই দেবতার প্রতীক।”

ঠিক তখনই হলঘরের ভেতরে বাতাস তীব্রভাবে ঘুরতে লাগলো। ধোঁয়া যেন রূপ নিতে শুরু করলো-মুহূর্তের মধ্যেই সেটা দাঁড়িয়ে গেলো এক মানবাকৃতির ছায়ায়। অন্ধকার কণ্ঠ আবার ভেসে এলো-
“তোমরা নিষিদ্ধ ভূমিতে প্রবেশ করেছো। এই মুখোশ যাকে বেছে নেবে, সে তার আত্মা হারাবে… আর পাবে এক অনন্ত শক্তি।”

নিশি ভয়ে পিছু হটলো। কিন্তু রুদ্র অদ্ভুতভাবে টান অনুভব করছিলো মুখোশটার দিকে। তার মনে হচ্ছিলো কেউ যেন তাকে ডাকছে, গভীর থেকে… অচেনা অথচ পরিচিত এক কণ্ঠ।

হঠাৎ মুখোশটা নিজে থেকেই কাঁপতে লাগলো। বেদির চারপাশের পাথর ফেটে উঠে আগুনের মতো আলো বের হলো। নিশি চিৎকার করে উঠলো-
“রুদ্র, পেছনে যাও! এটা তোমাকে টেনে নেবে!”

কিন্তু রুদ্রের শরীর তখন আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। অদৃশ্য এক শক্তি তাকে টেনে নিচ্ছিলো মুখোশের দিকে। তার চোখে ভেসে উঠলো শত শত বছরের পুরোনো দৃশ্য-যুদ্ধে লিপ্ত উপজাতি, রক্তে ভেজা অরণ্য, আর কালো মুখোশ পরিহিত এক ভয়ঙ্কর শাসক, যার চাহনিতে পুরো বন থরথর করে কাঁপছিল।

রুদ্র হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করলো—
“নিশি… আমি সব দেখছি… এই মুখোশ এক অভিশপ্ত উত্তরাধিকার।”

আর মুহূর্তের মধ্যেই মুখোশটা লাফিয়ে উঠলো বেদি থেকে-সরাসরি রুদ্রের দিকে ছুটে এলো!

অন্ধকারে প্রতিধ্বনি হলো এক শীতল হাহাকার-
“নতুন বাহক নির্বাচিত হয়েছে…”

----- চলবে