শোনা যাক আরও একটি বিকৃত ও সর্বজনবিদিত ইতিহাসের কথা। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে ইরেজরা ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ বলে অভিহিত করেছেন, যা তাদের রচিত এক ‘সরাসরি মিথ্যাভাষণ’। ১৮৫৭ খৃস্টাব্দের বিদ্রোহ ছিল ‘জনগণের মহাবিপ্লব’, কেননা এই আন্দোলনে শুধু সিপাহিরা নন, লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষও প্রত্যক্ষভাবে অস্ত্র ধ’রে লড়াই করেছিলেন। কোটি কোটি মানুষ তাঁদের সমর্থন করেছিলেন এবং কেউ কেউ সাধ্যমতো, আবার অনেকেই সাধ্যাতীতভাবে অর্থ,খাদ্য ও অস্ত্র জোগান দিয়েছিলেন এই যুদ্ধে। ১৮৫৭ সালের এই ‘জনগণের বিপ্লব’কে সিপাহি বিদ্রোহ বলার প্রতিবাদে কার্ল্ মার্কস্ বলেন “...ব্রিটিশ শাসকশ্রেণী এই অভ্যুত্থানকে কেবল সশস্ত্র ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ রূপে দেখতে চায়, তার সঙ্গে যে ভারতীয় জনগণের ব্যাপক অংশ জড়িত,তা লুকাতে চায় তারা...” (তথ্যসূত্র:- প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ: কার্ল মার্কস্—ফ্রেডারিক এঙ্গেলস্, পৃ.১০)।
বিদ্রোহের ইতিহাস যাঁরা প্রথমে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাঁদের সবাই ছিলেন ইংরেজ-সেবক, তাই ‘ইতিহাস-রচনার নিরপেক্ষতা’’ ভুলে তাঁরা নিজের কোলের দিকে ঝোল টানবেন—এতে আর সন্দেহ কী?
‘সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠায় শ্রী মণি বাগচী বলেছেন ‘ইংরেজ ঐতিহাসিকরা একে (১৮৫৭’র বিদ্রোহ) বলেছেন ‘সিপাহী বিদ্রোহ’, ভারতীয়রা একে বলতে চান ‘ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম’...।”
এই প্রবন্ধে একটিমাত্র ভাব-ব্যঞ্জণার আভাস দেওয়া হ’ল মাত্র এই প্রত্যাশায় যে তা’ উদ্বুদ্ধ করুক প্রতিটি বঙ্গীয় তথা ভারতীয় প্রাণকে! আর বাহুল্য হলেও বলা দরকার, সেই ভাবব্যঞ্জনাটি হ’ল—আমাদের জাতীয় সংহতি,ঐক্য ও সম্প্রীতি যেন অক্ষুন্ন থাকে। ভারতবর্ষ হোক জাতি-ধর্ম-ভাষা-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছিলাম, ইতি টানা যাক তাঁরই কথা দিয়ে। ‘...ওরে এ ভারতবর্ষ তোদের মন্দিরের ভারতবর্ষ নয়, মুসলমানের মসজিদের ভারতবর্ষ নয়; এ আমার মানুষের, মহামানুষের মহাভারত।’
Comments (3)