www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

লাল মেঘের দৌড়

-
-
-
সমস্ত পৃথিবীতে ঘোর আশংকা বিরাজ করে। এক দল কুকুর মুখে রক্তাক্ত মাংসের টুকরো নিয়ে ছুটছে। বেশ লাল রংয়ের মাংসের টুকরো গুলো যে মানুষের, এ কথা বিশ্বাস করার প্রয়োজন বোধ নেই পাশ্ববর্তী অবস্থিত মানুষের। আসলে মানুষ শব্দটা রক্তের মাংসের সাথে লেগে থাকলেও, এই নির্বোধ নতজানু ধ্বজভঙ্গ কথিত রক্ত মাংসের মানুষগুলোর সাথে আর লেগে নেই!


বেশ নিজের সাথে ভাবনায় আর ভাবনায়, এবং মৃত্যুমুখো এই শহরে চেনা সোডিয়াম লাইট ভেদ করে হেটে চলে, জলজ্যান্ত ব্যাস্ত বাজারের কোনো এক সাধারণ হোটেলে কিছু খেতে এসেছে অবির। নিজের শরীরটা ইদানিং খুব ভালো মনে হয়ে ছিলো তার, তাই খারাপ থাকার একটা প্রত্যয় করলো খাদ্যের বিচারে! হোটেলে ভাজা পোঁড়া পিয়াজু, পুরি, সিঙ্গারা, চপ, এমনকি পরাটার মতো মোটামুটি রুচিবোধক খাদ্যের উপস্থিত থাকলেও, ভীষণ মাখনীয় ডাল আর কথিত অস্বাস্থ্যকর উপাদানে মিশ্রিত হালিমের একটা অর্ডার দিয়ে বসলো সে। চেয়ার টেবিলে কেউ জানা সঙ্গী না থাকলেও, সামনে তার চেয়ে একটু বেশী বয়স্ক একটা যুবক আছে, যার প্লেটে দুয়েকটা পুরি কাঁটাছেরা করা! হাত দিয়ে স্মার্ট ফোনে কি যেন করছে, তার পিছনের টেবিলের রাজনৈতিক দুই নেতার ভিন্ন হিসাবে কথায়, রুচি অরুচির খাদ্য মুখে গিলছে। যুবকটা পুরি খাচ্ছে, এবং ফোনে কি হিসাব যেন কষছে! হোটেলটা খুব সাধারণ মানের হলেও এনার্জি বাল্বের আলোটা স্পর্শ করেছে টেবিল নিচ থেকে, সারাটা কোণায়-কাণায়। ইতিমধ্যে হরেক রকমের মিশ্রণের হালিম খাদ্যে পূর্ণ একটা বাটি অবিরের সামনে এসে পরেছে। অবির ভালো করে চামচ দিয়ে ধঁনিয়া পাতা, কাঁচা মরিচ, হরেক মসলা মিষিয়ে নিচ্ছে পুরোটায়। সঙ্গে সামনে রাখা বোতলের ভিতরের বিট লবনটা ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে মিশালে, সামনের লোকটা একটু তার দিকে তাকিয়েছে। হোটেলের শেষের দিকে কালো পর্দায় ঢাকা প্লেসে একটা কাপল খুনসুটি বেলায় কি খাচ্ছে না খাওয়াচ্ছে, তা আধো আলোয় কেউ খেয়াল রাখছেনা। ৫-৬ টার মতো বড় টেবিলে অল্পস্বল্প মানুষের উপস্থিতি আছে। ওয়েটাররা ব্যস্ত খাবার পরিবেশনে, কাছানে, এবং কি চাই তা জিগ্যাসায়। ইতোমধ্যে অবির চামচ দিয়ে খেতে লক্ষ্য করলো, হালিমে দেওয়া মাংসের সাথে লাগা হাড় গুলো কোনো গরু মহিষের নয় এটা সে নিশ্চিত। তবে স্বাদে বেশ খারাপ নয় কিন্তু সন্দেহটা বাড়ছে যেহেতু এটা হাস মুরগীরও নয়। কিন্তু কেন যেন হাড়ের চিকন সাইজ দেখে তার মনে হলো মাংস গুলো নিশ্চিত বিড়ালের হবে! একটু ভাবতে শুরু করলো গরুর মাংসের পরিবর্তে বিড়ালের মাংস চালিয়ে ফায়দাটা বেশ সুবিধাজনক। কারণ স্বর্ণের দামের মাংসের পরিবর্তে ফ্রিতে ম্যাও ম্যাও বিরুক্তির এবং চোর স্বভাবের প্রাণীটি চালিয়ে দেওয়া উপরির উপর উপরি লাভজনক। এমনিতে এখানকার জানাশোনা হোটেলে মরা মুরগীর গ্রিল অথবা মাংস, কুকুর কে খাসি বলে সম্বধন ইত্যাদিতো হরহামেশাই চলছে। তার উপর নতুনে যোগ হলো হালিমে গরুর পরিবর্তে বিড়াল দেওয়া!
অবির কেন যেন পা চুলকাতে গিয়ে টেবিলের নিচে চোখ পরছে, অপর পাশের লোকটার পায়ের দিকে। প্যান্টের ফাঁকরে মিনি পিস্তলটা অবিরের চোখে পড়তে সময় নেয়নি। যেহেতু অজস্র মার্ডার চোখের সামনে দেখছে, জানে এখানে খুনাখুনি একটা জনপ্রিয় খেলা! কিন্তু অবিরের মনে হলো লোকটা খুনি সন্দেহ নেই, কিন্তু খুন হতে যাওয়া মানুষটা হোটেলেই আছে তাতে তার কোনো চিন্তা ভাবনা এরকম আছে কি, তা জানা নেই! অবির দেখছে পিছনে দুজন রাজনৈতিক পাতি নেতা আছে, তাদের মধ্যে কেউ হবে ধরা যায়। অবিরের একটা খারাপ অভ্যেস আছে, আগুন জ্বলা এই আগুনের ফুলকিগুলো সে সদা দেখতে বিমুখ। যেমন ধরা যায় তার মধ্যে এখন একটা উত্তেজনা কাজ করে, কি হবে এখন এই খুনের গল্পটায়। ওপাশের রাজনৈতিক দুই নেতা পোস্টারে খুব পরিচিত মুখ, একজন আরেকজনের সহকর্মী । কিন্তু তার মধ্যে লোকটার সাথে চোখের একটা ইশারা এই অবিরের সামনের লোকটার, কী যেন ঘোর রহস্যে ভাগ্য মন্দ আছে পাশের জনের।
কথা বলতে বলতেই খাবার শেষে তারা দুজন উঠলো, তাদের পিছনে অবিরের সামনের লোকটাও খাবার শেষ করলো। অবির তার হালিম খাওয়া অর্ধেক বাটি ফুরোতেই ইতি করে দিলো, সে পিছু নিলো তার সামনের লোকটার। তার নাম রাজিব। দূরবর্তী এলাকার কোনো এক পেশাদার খুনি। চোখের দিকে তাকাতে একটা মায়া আছে, এবং কথা বলার সাধ্যে, ড্রেসআপে, পেশাটা ঢেকে যায়। কেউ পৃথিবী উল্টে ফেলালেও বুঝাতে কষ্ট হবে, সে যে খুনি। পাতি নেতা যথারীতি অসীম এবং প্রবীর। কন্টাক্টা যে অসীমের সাথে রাজিবের হয়েছে, এবং সাংগঠনিক স্বার্থের ব্যাপার এ কথা কিঞ্চিৎ বুঝতে পেরেছে অবির।

কারো পিছু নিলে তার চোখে পড়বে এটা স্বাভাবিক। আর সেটা যদি হয় কোনো এক খুনির, তবেতো নিজেরও বিপদ, এ কথা পাগলেরও বুঝতে কষ্ট হয়না! তাই ছোট খাট একটা সাবধানতা নিতে নিজেকে ভালোই জানে অবির। তার উপরে এই শহরে খুন চাপা পড়ে খুনে, ধর্ষণ চাপা পড়ে ধর্ষণে, কথা চাপা পড়ে কথায় এবং ইস্যু চাপা পড়ে ইস্যুতে। সে মোতাবেক দীর্ঘ এক সময়, অবিচার রক্তমাখা খেলায় পরিবার থেকেও রাজনৈতিক স্বার্থ বিচার, বলী কিংবা গুম চলছে হরদম। অবির কোনো এত স্পাই সেজে বসলো কোনো কাহিনী দেখার স্বাক্ষী হতে। কিন্তু জানে সে, চোখের সামনে হত্যা দেখলেও তার যে কিছু করার নেই। এমনকি এর একটা আনুষ্ঠানিক বিচারেও তার নিজেকে মেরে স্বাক্ষী দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই!
নিজের ছদ্মবেশী একটা দারুণ ব্যাক্তিত্ব ক্ষমতায় পিছু নিয়ে সফলই হয়েছে অবির। অসীমের সাথে প্রবীর কি যেন হিসাব মিলাতে মিলাতে যাচ্ছে। তারই কক্ষপথে রাজিবও চলছে। এবং তাদের দৃষ্টির আড়ালে তাদের ফলো করছে অবির।
বয়ে আসা সন্ধে রাতে দুটো বিল্ডিং এর পিছনের ফাঁকরে, মানুষের আনাগোনা হীন এমন এক স্থানে নিয়ে এসেছে প্রবীরকে অসীম কথার বাজে। যেন হিসেব মিলছেনা, অজস্র কথার ভিড়ে কথায় কিন্তু উত্তেজনা কাজ করছেনা। মৃত্যুর কোনো কিঞ্চিৎ ফোটা অনুভবও পাচ্ছেনা প্রবীর, যে জানেওনা তার সাথে কি হতে চলেছে। হয়তোবা কাছের শহরে চেনা ছবি একই রকম, কিন্তু প্রবীরের কিছু মানুষেরা জানেনা তাদের খুব আপন ছবির কেউ চিরতরে ঝাপসা হয়ে যাবে।
প্রবীরের কথার ভিড়েই অসীম তাকে বিল্ডিং এর শক্ত দেয়ালে মাথাটা ঝোরছে টাক দিয়ে, নিজে সরে গেলো এর মাঝে রাজিব তার পিস্তলটা কাজে না খাটালেও ধারালো একটা চাকু প্রবীরের গলার ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছে অতীতের অজস্র অবিজ্ঞতায়। এরপর চাকু দিয়ে গলাটার অর্ধেক প্রায় কেটেছে নির্ধিদায়, শব্দের বেগটা জোরালো হয়নি কিন্তু প্রাণটা বুঝি চিৎকার করতে চেয়েছিলো অনেক। খুব দেখতে চাইলেও দূর থেকে অবির পুরোটা দেখতে পেলোনা, কিন্তু সেই মনে হয় একমাত্র যে ঝাপসা দেখতে পেয়েছে এরকম একটা খুন। কিন্তু যা কিছু দেখা মনে হয় অযোথাই। এর সারটা যে সেই একই রং!
প্রবীরের লাশটা বিল্ডিং ঘেরা এই পরিবেশে, যদিও এটা ছিলো এক নির্জন পিছনে, তাই এরও পিছনে ময়লার আস্তানায় দুজনে নিয়ে ফেলে গেছে । যদিও এই ৫তলা বিল্ডিং টা সবে মাত্র তৈরি হয়েছে, প্রত্যেক বাসায় সবাই এখনো উঠেনি। তাদের এই খুনের সময়ে চারিপাশের বন্দী প্রকৃতি ছাড়া আর কেউ জানতে পারবেনা এটে স্বাভাবিক ছিলো। তার উপরে এই শহরের কার খবর কে রাখে!


বলা হয়ে থাকে সূর্যের রং যখন লাল তখন তার দহনটা অনেক বেশী। সময়টা যখন আপদমস্তক ধূসর, তখন প্রকৃতির আচরণও আরো কঠিন। নীল আকাশে কোনো সাদা মেঘ নেই, সব মেঘ লাল - কালো- ধূসর! অবির সেই দিন ভালো নেশা করে ছিলো, তাতেই তার দেখা সবকিছু চাপা পড়ে গিয়ে ছিলো তার থেকে। কিন্তু নিরন্তর তার নিজের সাখে নিজের ভাবনার জগৎ আছে সেখান থেকে সে আকাশ দেখলে, কোনো এক লাল মেঘ যদি দৌড়েয় তাবে তার প্রশ্ন জাগে কেন এমন? এবং তার সদাই প্রশ্ন জাগে নিজে খুনি হয়ে কিভাবে সেই খুনের নিজে চিৎকার করে বিচার চায় রাজপথে মিছিলের স্লোগানে? এবং কিভাবে সে কাঁদে তার পরিবারের কাছে, যেন কাছের কেউকে কে কেড়ে নিয়েছে?

কোনো এক হিংস্র কুকুরের দল মুখে রক্ত মাখা মাংস নিয়ে ছুটছে, অবির দেখছে তাকিয়ে রক্তে লেগে আছে মানুষের ছাপ। অবিরের মনে হয় কোনো ময়লার আস্তরণ থেকে কোনো এক লাশকে ছিঁড়েখুঁড়ে এই মাংস উপর্জন করেছো কুকুর গুলো। কিন্তু মানুষের মাংস কুকুর খায়, কুকুরের মাংস খায়, কী এক অদ্ভুত ঘুরন্ত সার্কেল যেন, সমুদ্রের জলে বাস্প হয়ে মেঘে জমছে আবার বৃষ্টি হয়ে সেই জল সমুদ্রে পড়ছে। বাহ! চমৎকার এই সমীকরণ, সমান সমান দুইও পাস। গানিতিক ভাবে এটা সুন্দর প্রমানিত।



বেশ নিজের সাথে ভাবনায় আর ভাবনায়, এবং মৃত্যুমুখো এই শহরে চেনা সোডিয়াম লাইট ভেদ করে হেটে চলে, জলজ্যান্ত ব্যাস্ত বাজারে রোজ কতো আসছে যাচ্ছে অবির। রোজ হিংস্র কুকুরকে গুলো দেখতে পাচ্ছে সে। সদা কখনো কখনো শকুনের চিৎকার শুনতে পাচ্ছে সে কানে। আকাশের বৃহত্তম ভূমিতে লাল মেঘ দৌড়চ্ছে তো দৌড়চ্ছে....
বিষয়শ্রেণী: গল্প
ব্লগটি ১৫৪ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১৭/০৩/২০১৭

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

 
Quantcast