নীল মাছ
সে অনেক দিন আগের কথা। চম্পক নগরীতে এক বিধবা তার এক মাত্র ছেলে নওশাদকে নিয়ে থাকতেন। বিধবার স্বামী ছিলেন সওদাগর। সে বিভিন্ন দেশ বিদেশ ঘুরে জিনিসপত্র কিনে বিভিন্ন দেশে বিক্রি করত। এতে তার প্রচুর লাভ হতো, কিন্তু তার জুয়া খেলার নেশা ছিল খুব প্রবল। এক সময় জুয়া খেলতে খেলতে সর্বস্ব হারিয়ে ভিক্ষুক হয়ে মারা যায়। ফলে বৃদ্ধা তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোন রকম দিন কাটাতো। ছেলে কিছুটা বড় হতেই কাজে লাগিয়ে দেয়। কিন্তু সবার চাটুলতা আর হিংসার কারণে কাজ করেত পারে না। কথায় বলে সৎ লোকের ভাত নাই। তাই বিধবা কোন পথ না পেয়ে এক জেলের কাছে তার ছেলেকে দেয়, যদি মাছ ধরা শিখে মাছ ধরে বিক্রি করতে পারে তবে তাদের সংসার কোন মত চলে যাবে। কিন্তু তাকে দিয়ে মাছ ধরার কাজ তেমন একটা হয় না বা কাজটা তার ভাল লাগে না। তবুও নওশাদ লেগে থাকে। একদিন মাছ ধরতে ধরেতে একটা নীল মাছ জালে উঠল। মাছটা এতো সুন্দর যে, তাকে ছিড়ে কুটে খাওয়ার কথা ভাবাই যায়না। তাই সে সোলায়মান গাজির কাছে মাছটা চেয়ে নিয়ে আবার সাগরে ছেড়ে দেয়। মাছ ধরার চেয়ে তার সমুদ্রের মাঝে ভাসতে খুব ভাল লাগে। চার দিকে শুধু পানি আর পানি তার মাঝে নৌকা ভেসে চলে, নিজেকে তখন সওদাগরের মত লাগে। নওশাদ ঠিক করে তার যদি বেশ টাকা পয়সা হয় তবে সে একটা বড় নৌকা কিনবে, আর সেই নৌকায় করে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যাবে। এই নৌকার মালিক সোলায়মান গাজি। এই নৌকায় নওশাদসহ মোট চার জন লোক থাকে। সোলেমান গাজি খুবই ভাল মানুষ। সে নওশাকে খুব পছন্দ করে। এই কারণে নৌকায় যে আরো দুজন থাকে তারা তাঁকে খুব হিংসা করে, খুত পেলেই ভুল ধরার চেষ্টা করে। সে কারণে নওশাদ খুব সাবধানে কাজ করে যেন ভুল না হয়। আজ সোলেমান গাজির শরীর খারাপ তাই সে যাবে না। হাশেম আর কাশেমকে বলল সাবধানে নৌকা চালাতে আর নওশাদের খেয়াল রাখতে। সবাই নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে গেল। আজ হাশেম কাশেম মনে মনে ঠিক করেছে নওশাদকে একটা শিক্ষা দেবে। নৌকা চলতে চলতে হঠাৎ হাশেম বলল
হাশেম-ঐ দেখুন কাশেম ভাই কার যেন একটা নৌকা ভাসছে?
কাশেম- মনে হচ্ছে নৌকার মানুষ মরে গেছে চলেন যেয়ে দেখি।
তারা তাদের নৌকাটিকে ঐ নৌকাটার কাছে চাপালো। কাশেম এই নৌকা থেকে ঐ নৌকায় যেয়ে দেখে দুটা লাশ পড়ে আছে আর নৌকায় গহনা আর কিছু মাল সামানা। তাই দেখে ওরা খুশিতে আত্মহারা।
নওশাদ বলল এগুলো নিয়ে চলেন আজ আর মাছ ধরার দরকার নাই। এই লাশ দুটোকে দাফনের ব্যবস্থা করে গাজি চাচার কাছে যাই।
কাশেম- তোমার মাথা খারাপ হয়েছে? এই সম্পদ আমরা দুজন পেয়েছি সেটা আবার গাজি চাচাকে বলবো কেন?
নওশাদ- এটা তার নৌকা আর কোন ঘটনা ঘটলে অবশ্যই তাকে বলতে হবে।
নওশাদের কথায় তারা কোন উত্তর দিল না। নৌকাকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে হাশেম নওশাদের মাথায় বৈঠা দিয়ে মেরে পানিতে ফেলে দিয়ে তারা নৌকাটাকে তীরের দিকে ঘোরালো। ওরা দুজন ফিড়ে এসে বল নওশাদকে হাঙরে খেয়ে ফেলেছে। এই কথা বিধবার কানে যখন গেল তখন সে পুত্রের শোকে বার বার মুর্ছা যেতে লাগল। সে খোদার কাছে ফরিয়াদ করতে লাগল এই বিধবার কোল তুমি শুন্য করো না খোদা। এই বলছে আর অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল। নাওয়া নাই, খাওয়া নাই সারাদিন বিধবা তার ছেলের জন্য সমুদ্রের পাড়ে বসে কাঁদতে থাকে। আর ওদিকে নওশাদ বৈঠার আঘাতে পানিতে পড়ে যায়। যখন তার জ্ঞান ফেরে তখন সে নিজেকে খুব সুন্দর একটা বিছানায় আবিস্কার করে। চার দিকে কত স্বচ্ছ। নওশাদ মনে করার চেষ্টা করছে সে কোথায়। তার এতোটুকু মনে আছে হাশেম তার মাথায় বৈঠা দিয়ে আঘাত করার পর সে আর কিছু বলতে পারেনা। তার মানে তাকে পানিতে ফেলে দিয়েছে। তাহলে সে কি মরে গেছে? এটাকি মরনের পড়ের দুনিয়া! আহ বিধবা মাটাকে ছেড়ে সে আগে মরে গেল। এখন তার মা কি করে বাঁচবে? এরকম ভাবছে এমন সময় চার পাশে কিছু নড়ে চড়ে উঠল। কিছু মাছ সাতার কেটে তার পাশ দিয়ে চলে গেল। কি বিচিত্র ধরনের সে সব মাছ। কি ব্যাপার সে কি বেঁচে আছে না মরে গেছে। আর যদি মরে গিয়ে থাকে তবে এখানে মাছ কেন? নাহ! কিছুই মাথায় ঢুকছে না। একটু পড়ে চার পাশের সচ্ছতা কাঁিপয়ে একটি বড় নীল মাছ এসে সামনে দাঁড়াল। আরে না এতো মাছ না! এতো মৎস্য কন্যা! নওশাদ অবাক হয়ে মৎস্য কন্যার দিকে তাঁকিয়ে থাকে। মৎস্য কন্যা হেসে বলে কি বাছা অমন করে কি দেখছ?
মাছের কথায় যেন সে চমকে ওঠে। আমতা আমতা করে বলে তুমি কে? আর আমি কোথায়?
মৎস্য কন্যা বলল-এটা পাতালপুরী।
পাতালপুরী!
হ্যাঁ। এই পর্যন্ত পৃথিবীর কোন মানুষ এই পাতালপুরীতে জীবিত আসতে পারেনি শুধু তুমি ছাড়া।
-আমি এখন পাতাল পুরীতে! জীবিত!
-হ্যা তুমিই প্রথম এবং জীবিত। আর এটা সম্ভব হয়েছে আমার মেয়ে নীশমা এর জন্য।
-নীশমা!
-হ্যা আমার মেয়ে। তোমার মনে আছে একদিন তুমি একটা নীল মাছ জাল থেকে মুক্ত করে আবার পানিতে ছেড়ে দিয়ে ছিলে?
নওশাদ মাথা কাঁত করে, হ্যা তার মনে আছে। মৎস্য কন্যা নীশমা বলে ডাকতেই সেই সুন্দর মাছটা তার সামনে এলো। কিন্তু সেও অর্ধেক মাছ অর্ধেক মানুষ।
-কি ভাবছ? সেদিন তাঁকে পূর্ণাঙ্গ মাছ হিসাবে দেখেছ আজ এরকম কেন?
নওশাদ মাথা কাঁত করে। আমরা ইচ্ছে করে মাছ হয়ে থাকি। আমাদেরকে সবাই দেখতে বা বুঝতে পারেনা। আর যারা দেখতে পায় তাদের ভাগ্য খুব ভাল হয় বলে। যাই হোক, তুমি আমার মেয়ের উপকার করেছ তাই আমিও তোমার উপকার করলাম। তোমার ডান দিকে একটা দরজা আছে সেখান দিয়ে গেলে তুমি প্রচুর সম্পদ দেখতে পাবে। যেটা তোমার ইচ্ছে সেটাই তুমি নিতে পারো। তারপর সীল তোমাকে কীনারায় পৌছে দেবে। আর হ্যা তুমি এবার মাছ ধরা ছেড়ে দাও। নওশাদ মৎস্য কন্যার কথা শুনছিল আর অবাক হচ্ছিল। মৎস্য কন্যা নীশমাকে নিয়ে চলে গেল। নওশাদ ডানের দরজা নিয়ে ভেতরে গিয়ে অবাক হলো এতো মনি মানিক,হীরা জহরত। সে তার ঝুলিতে ভরে নিয়ে সামনে যেতেই সীল তার জন্য অপেক্ষা করছিল। সে যেতেই তাকে বলল তুমি চোখ বন্ধ কর, যতক্ষণ না তোমার পায়ে মাটির স্পর্শ পাবে ততক্ষণ চোখ খুলবে না। নওশাদ চোখ বন্ধ করল। কিছুক্ষণের মধ্যে সে পায়ের নিচে মাটির স্পর্শ পেল। তখন সে চোখ মেলে দেখে প্রায় সমুদ্রের পারে। আশে পাশে তাঁকালো কাউকে দেখা গেল না এমনকি সেই মাছটিকেও না। চার দিক অন্ধকার হয়েগেছে। নওশাদ তার ঝুলিটি সাবধানে ধরে দরজায় এসে টোকা দিতেই তার বিধবা মা দরজা খুলে দিয়ে চিৎকার করল বাবা তুই এসেছিস। নওশাদ তার মাকে বলল চিৎকার না করার জন্য। তারপর সে তার থলি থেকে হিরা মানিক বের করতেই ওর মা জ্ঞান হারাল। পরের দিন সবাই নওশাদকে দেখে তো অবাক! নওশাদ বেঁচে আছে। শুধু তাই না, সে আর এখন মাছ ধরতে যায়না। সে এখন বাণিজ্য করতে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। বড় ধুম ধাম করে নওশাদ এক জমিদার কন্যাকে বিয়ে করে। রোজ নওশাদ বুভুক্ষ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে খাবার খায়। সাবাই নওশাদকে এখন একজন দাতা হিসাবে জানে। এভাবেই তারা সুখে শান্তিতে বাস করতে লাগল।
মন্তব্য (9)