"বড় হলো।" শাস্ত্রী বললেন। "বাজিরাও তাঁকে সর্বোত্তম শিক্ষা দিলেন। সংস্কৃত শেখালেন, ফার্সি শেখালেন, ঘোড়া চালাতে শেখালেন। রাজনীতির পাঠ দিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে পাঠ দিলেন — সেটা হলো পরিচয়ের পাঠ।"
"মানে?"
"প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাজিরাও তাঁর দত্তকপুত্রকে কাছে ডাকতেন। বলতেন — তুমি কে? শিশু উত্তর দিত — আমি পেশোয়ার পুত্র। বাজিরাও বলতেন — আরো বলো। শিশু বলত — আমি মারাঠা সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী। আমি সেই পরিচয় ফিরিয়ে আনব।"
ফোর্বস চুপ করে শুনলেন।
"এই কথোপকথন প্রতিদিন হতো।" শাস্ত্রী বললেন। "বাজিরাও জানতেন তিনি বৃদ্ধ, বেশিদিন নেই। তাই এই শিশুর মধ্যে তিনি একটা স্বপ্ন রোপণ করে যাচ্ছিলেন। পেশোয়া স্বীকৃতি হয়তো তিনি পাননি। কিন্তু তাঁর পুত্র পাবে।"
"এবং সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের বীজ।"
"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "কারণ একটি শিশুকে যদি প্রতিদিন বলা হয় — তুমি রাজার পুত্র, তুমি সম্মানের অধিকারী — এবং তারপর একদিন রাষ্ট্র এসে বলে — না, তুমি কেউ নও। তখন সেই মানুষের মনে কী হয়?"
ফোর্বস উত্তর দিলেন না।
কিন্তু উত্তরটা তিনি জানতেন।
শাস্ত্রী সেই পুরনো খাতাটা আবার ফোর্বসের দিকে এগিয়ে দিলেন।
"এই দলিলটা রাখুন। এটা প্রমাণ — যে কোম্পানি সেদিন সেই অনুষ্ঠান দেখেছিল। এবং পরে অস্বীকার করেছিল। হয়তো কোনোদিন কাজে লাগবে।"
"কার কাজে?"
শাস্ত্রী উঠলেন।
"ইতিহাসের।"



ক্যালকাটা, জানুয়ারি ১৮৫৯।

ফোর্বস তাঁর ডায়েরি খুললেন।

বৈরাগীর বলা সেই গল্পটা এখনো মাথায় ঘুরছে। বিঠুরের রাজপথ। দুটো ঘোড়া। একটি সাদা, একটি কালো। একটি সাত বছরের মেয়ে, একটি আঠারো বছরের ছেলে।

একজন হয়েছিলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই। আরেকজন হয়েছিলেন ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম নেতা।

কিন্তু কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ফোর্বস বুঝেছিলেন — শুধু তাদের গল্প পড়লে হবে না। পুরো মানচিত্রটা দেখতে হবে।

সেই মানচিত্রে তিনটি বিন্দু।

সাতারা। নাগপুর। পুনা।

তিনটি মারাঠা রাজ্য। তিনটি নক্ষত্র — যারা একে একে নিভে গিয়েছিল।



সেই বিকেলে ফোর্বস শাস্ত্রীর কাছে গেলেন।

বললেন, "পণ্ডিতজি, আমাকে সেতারার গল্প বলুন। বিস্তারিত।"

শাস্ত্রী একটু অবাক হলেন।

"সেতারা? কেন?"

"কারণ বিঠুরের সেই ঘোড়দৌড়ের গল্প শুনে একটা কথা মাথায় এসেছে।" ফোর্বস বললেন। "দুজনেই বিঠুরে বড় হয়েছেন। দুজনেই পেশোয়ার দরবারে। এবং দুজনেই ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহ করেছেন।"

"হ্যাঁ।"

"কিন্তু আরো অনেকে বিদ্রোহ করেছেন। যাদের আমরা ততটা মনে রাখিনি।" ফোর্বস বললেন। "সাতারার মানুষেরা। নাগপুরের মানুষেরা। এরাও বিদ্রোহে ছিল। এদের গল্পটা কী?"

শাস্ত্রী চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন।

"এটা একটা ভালো প্রশ্ন।" তিনি বললেন। "এবং এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে ডালহৌসির আগে থেকে শুরু করতে হবে।"

"শুরু করুন।"

"ভারতের ইতিহাসের আকাশে তিনটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।" শাস্ত্রী বলতে শুরু করলেন। "সেতারা, নাগপুর এবং পুনা। তিনটি মারাঠা বংশ। তিনটি গৌরবময় ইতিহাস।"

"পুনা তো পেশোয়াদের।"

"হ্যাঁ। পেশোয়া মানে প্রধানমন্ত্রী। ছত্রপতি শিবাজীর বংশ ছিল সাতারায়। পেশোয়ারা ছিলেন তাদের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ধীরে ধীরে পেশোয়ারাই হয়ে উঠলেন আসল শাসক।"

"এবং নাগপুর?"

"নাগপুর ছিল ভোঁসলে বংশের। শিবাজীর বংশেরই একটি শাখা।" শাস্ত্রী বললেন। "তিনটি বংশ মিলেই মারাঠা সাম্রাজ্য। একসময় এই সাম্রাজ্য দিল্লি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।"

"কিন্তু তারপর ব্রিটিশরা এলো।"

"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "১৮১৮ সালের পরে মারাঠা শক্তি ভেঙে পড়ল। পেশোয়া বাজিরাও বিঠুরে নির্বাসিত হলেন। সাতারা এবং নাগপুর ব্রিটিশদের আশ্রিত রাজ্য হয়ে গেল।"

"আশ্রিত মানে?"

"আশ্রিত মানে — নামে স্বাধীন, কিন্তু আসলে পরাধীন।" শাস্ত্রী বললেন। "প্রত্যেক রাজ্যে একজন করে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট থাকতেন। রাজার সব সিদ্ধান্তে তার সম্মতি দরকার হতো।"

"এবং তারপর ডালহৌসি এলেন।"



"ডালহৌসি ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমান মানুষ।" শাস্ত্রী বললেন। "মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন। এবং তিনি জানতেন ভারতকে সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে কী করতে হবে।"

"ডকট্রিন অব ল্যাপস।"

"হ্যাঁ। কিন্তু এটা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি।" শাস্ত্রী বললেন। "এর আগে ডালহৌসি অস্ত্রের জোরে পাঞ্জাব নিয়েছেন। ব্রহ্মদেশের পেগু নিয়েছেন। কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধে সময় লাগে, অর্থ লাগে, মানুষ মরে।"

"তাই অন্য পথ খুঁজলেন।"

"অন্য পথ খুঁজলেন।" শাস্ত্রী বললেন। "আইনের পথ। এমন একটা আইন তৈরি করলেন যা দিয়ে বিনা যুদ্ধে রাজ্য পাওয়া যায়।"

ফোর্বস বললেন, "হিন্দু সমাজে দত্তকগ্রহণের নিয়মটা ব্যাখ্যা করুন।"

শাস্ত্রী বললেন, "আমাদের শাস্ত্রে আছে — পুত্রহীন মানুষ মৃত্যুর পরে মুক্তি পান না। কারণ তাঁকে পিণ্ড দেওয়ার কেউ থাকে না। তাই পুত্রহীন মানুষ অন্যের সন্তানকে দত্তক নিতে পারেন। সেই দত্তকপুত্র নিজের ঔরসজাত পুত্রের মতোই মর্যাদা পায়।"

"এবং রাজ্যের ক্ষেত্রে?"

"রাজ্যের ক্ষেত্রে দত্তকপুত্রই রাজা হন। এটা শতাব্দীর নিয়ম।" শাস্ত্রী বললেন। "কিন্তু ডালহৌসি বললেন — না। কোম্পানির আশ্রিত রাজ্যে দত্তকপুত্র রাজ্য পাবে না। কোম্পানির অনুমোদন ছাড়া দত্তক বৈধ নয়।"

"এবং কোম্পানি কখনো অনুমোদন দেবে না।"

"দেবে না।" শাস্ত্রী বললেন। "কারণ দিলে রাজ্য পাওয়া যাবে না।"

ফোর্বস উঠে পায়চারি করলেন।

"এটা অসাধারণ চালাকি।" তিনি বললেন। "ধর্মীয় নিয়মকে অস্ত্র বানিয়েছেন। হিন্দু রাজারা দত্তক নেবেনই — কারণ পুত্র না থাকলে মুক্তি নেই। এবং সেই দত্তক নেওয়াটাই হবে তাদের রাজ্য হারানোর কারণ।"

"এটাই ডালহৌসির কৌশল।" শাস্ত্রী বললেন। "এবং এই কৌশলের প্রথম শিকার হলো সেতারা।"

"সাতারার রাজা ছিলেন অ্যাপ্পা সাহেব।" শাস্ত্রী বলতে লাগলেন। "শিবাজীর বংশ। ছত্রপতির উত্তরাধিকারী।"

"তাঁর সন্তান ছিল না?"

"ছিল না।" শাস্ত্রী বললেন। "তাই মৃত্যুর আগে তিনি দত্তকপুত্র নিলেন। কিন্তু ডালহৌসি সেই দত্তক অস্বীকার করলেন।"

"কবে?"

"১৮৪৮ সাল। ডালহৌসির ডকট্রিন অব ল্যাপসের প্রথম প্রয়োগ।" শাস্ত্রী বললেন। "সেতারা ব্রিটিশ অধীনে চলে গেল।"

ফোর্বস বললেন, "সেতারার মানুষেরা কী করল?"

"প্রথমে হতভম্ব হলো।" শাস্ত্রী বললেন। "তারপর ক্ষুব্ধ হলো। কিন্তু কী করবে? ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই সম্ভব ছিল না।"

"ক্ষোভ জমতে লাগল।"

"ক্ষোভ জমতে লাগল।" শাস্ত্রী বললেন। "এবং সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সাতারা থেকে নাগপুর। নাগপুর থেকে পুনা। পুনা থেকে বিঠুর।"

"বিঠুরে সেই ক্ষোভের খবর পৌঁছেছিল?"

"অবশ্যই।" শাস্ত্রী বললেন। "এবং বিঠুরে সেই ক্ষোভ গ্রহণ করেছিলেন এক তরুণ এবং এক তরুণী ।"

ফোর্বস বললেন, "তারা তখন কত বড়?"

"১৮৪৮ সালে নানা ছেলেটার ছিল চব্বিশ-পঁচিশ। এবং মনু — তখন তার বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই।"

"ঝাঁসিতে চলে গেছেন।"

"হ্যাঁ। কিন্তু বিঠুরের স্মৃতি তাঁর সঙ্গে আছে। সেই ঘোড়দৌড়ের স্মৃতি। সেই শিক্ষার স্মৃতি।"

"নাগপুর।" ফোর্বস বললেন। "এরপর নাগপুর।"

"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "১৮৫৩ সাল। নাগপুরের রাজা রঘুজি তৃতীয় মারা গেলেন। বিশাল রাজ্য। প্রচুর সম্পদ।"

"দত্তকপুত্র ছিল?"

"নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ডালহৌসি অনুমোদন দিলেন না।" শাস্ত্রী বললেন। "নাগপুর ব্রিটিশ অধীনে গেল।"

"এবং নাগপুরের সেনাবাহিনী?"

"ভেঙে দেওয়া হলো।" শাস্ত্রী বললেন। "হাজার হাজার সৈনিক হঠাৎ বেকার। তাদের কোথায় যাওয়ার ছিল?"

"ব্রিটিশ বাহিনীতে গেল।"

"অনেকেই।" শাস্ত্রী বললেন। "কিন্তু মনে রইল ক্ষোভ। এবং সেই ক্ষোভ নিয়ে তারা ঢুকল ব্রিটিশ বাহিনীতে। সিপাহী হলো।"

ফোর্বস বুঝলেন।

"এবং সেই সিপাহীরাই ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহ করল।"

"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "নাগপুরের ভেঙে যাওয়া সেনাবাহিনীর ক্ষোভ — সেটাই বিদ্রোহের জ্বালানি হলো।"

"এবং বিঠুর।" ফোর্বস বললেন। "পুনার পেশোয়ার বংশ।"

"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "পুনার পেশোয়া ১৮১৮ সালেই পরাজিত। বিঠুরে নির্বাসিত। কিন্তু সেই নির্বাসনেও পেশোয়ার দরবার ছিল। সংস্কৃতি ছিল। শিক্ষা ছিল।"

"এবং সেই শিক্ষা পেয়েছিল দুজন।"

শাস্ত্রী বললেন। "দুজনেই দেখেছিলেন — সেতারা গেছে, নাগপুর গেছে। তারা জানত পরের পালা কার।"

"পরের পালা ঝাঁসির।"

"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "১৮৫৩ সালে ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাও মারা গেলেন। লক্ষ্মীবাই দামোদর রাওকে দত্তক নিয়েছিলেন। ডালহৌসি সেই দত্তক অস্বীকার করলেন।"

"এবং লক্ষ্মীবাই তখন কী করলেন?"

"প্রথমে আইনি পথে গেলেন।" শাস্ত্রী বললেন। "লন্ডনে আপিল করলেন। ব্যর্থ হলেন। তারপর ১৮৫৭ সালে যখন বিদ্রোহ এলো — তিনি তলোয়ার তুললেন।"

ফোর্বস বললেন, "এবং নানা সাহেব?"

"নানা সাহেবও একই পথে গিয়েছিলেন।" শাস্ত্রী বললেন। "আইনি পথ। লন্ডনে আপিল। ব্যর্থতা। তারপর বিদ্রোহ।"

"দুজনেই বিঠুরে একসঙ্গে বড় হয়েছিলেন। দুজনেই একই পথে হেঁটেছিলেন।"

"হ্যাঁ।" শাস্ত্রী বললেন। "এবং দুজনেই শেষ হয়েছিলেন। একজন যুদ্ধের মাঠে। আরেকজন জঙ্গলে।"



ফোর্বস তাঁর ডায়েরিতে লিখলেন।

"সেতারা, নাগপুর, পুনা। তিনটি নক্ষত্র। একে একে নিভে গেছে।"