দুপুরের রোদ তখন হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল হরি নগরের সরু গলির উপর। গলির দুপাশে পুরনো দোতলা বাড়ি, দেওয়ালে খসে পড়া পলেস্তারা, কারও বারান্দায় ভেজা কাপড়, কারও দরজায় সামনে তুলসীর গাছের নিচে জ্বলন্ত আগরবাতি।
ইন্সপেক্টর রাকেশ শর্মা তখন থানার ভেতরে বসে ঠান্ডা চায়ে শেষ চুমুক দিতে যাচ্ছিলেন। বাইরে কোথাও থানার কুকুর ডাকছিল। ভেতরে সিলিং ফ্যান ঘুরছিল ক্লান্তভাবে।
হঠাৎ বেতার যন্ত্র চিৎকার করে উঠল।
"স্যার, পিসিআর কল। হরি নগর সেক্টর সেভেন। ফোনকারী বলছে... একটা মেয়েকে খুন করা হয়েছে। পরিবার লাশ দাহ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।"
রাকেশ চায়ের কাপ রেখে দিলেন। চা ঠান্ডা হয়ে গেল। তিনি উঠলেন।
গাড়ি যখন গলির মুখে থামল, রাকেশ বাইরে থেকেই অনুভব করলেন — কিছু একটা গোপন ব্যাপার আছে। বাড়ির সামনে ছয়-সাতজন লোক দাঁড়িয়ে। কারও মুখে শোকের ভান, কারও চোখে আতঙ্ক। দরজার কাছে একজন বৃদ্ধা মাথায় আঁচল টেনে নিচু হয়ে বসে আছেন।
রাকেশ গাড়ি থেকে নামতেই লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকাল।
ভেতরে ঢুকতেই যেন তাঁর পা থেমে গেল।
ঘরের মেঝেতে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি শরীর। চারপাশে ফুল ছড়ানো। কেউ কাঁদছে, কেউ মন্ত্র পড়ছে, কেউ শেষকৃত্যের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আর ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে একজন মাঝবয়সী পুরুষ — বছর পঞ্চাশের, মাথায় টাক, চোয়াল শক্ত, চোখে এক ফোঁটা জলও নেই।
রাকেশ গলা উঁচু করলেন।
"সকলে থামুন। কেউ এই মরদেহ স্পর্শ করবেন না।"
ঘরে একটা থমথমে নীরবতা নামল।
লাশ ময়না তদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

থানার বাইরে একটি চায়ের দোকানের আড়ালে তখনো দাঁড়িয়ে ছিল বিশ বছরের ছেলেটি। নাম সুমন। হাত কাঁপছিল তার, ঠোঁট শুকনো।
রাকেশ তার সামনে গিয়ে বললেন, "তুমি ফোন করেছিলে?"
সুমন মাথা নাড়ল।
"বলো। সব বলো।"
সুমন ঢোক গিলল। "মেয়েটার নাম নন্দিনী। বয়স বাইশ। আমার বন্ধু অর্জুনের... মানে, ওরা ভালোবাসত একে অপরকে। ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু নন্দিনীর পরিবার কখনো মেনে নেয়নি তাদের।"
"কেন?"
"অর্জুন ওদের জাতের ছেলে না। আলাদা জাত। নন্দিনীর কাকা বিশ্বনাথ বললেন এ বিয়ে হবে না। কিন্তু ওরা থামেনি।" সুমনের চোখ ভিজে উঠল। "গতকাল বিকেলে অর্জুন আমাকে ফোন করল। বলল, নন্দিনী সাথে দেখা হয়েছিল বাজারে। কিন্তু পরিবারের লোক তাদের দেখে ফেলেছে। রাতে অর্জুন আবার ফোন করল। বলল নন্দিনীর ফোন বন্ধ। সারারাত চেষ্টা করল। সকালে... সকালে কেউ একজন ওকে বলেছে নন্দিনী আর নেই।"
রাকেশ মাথা তুললেন। "অর্জুন এখন কোথায়?"
সুমন আঙুল দিয়ে দেখাল পাশের গলির দিকে।

বিশ্বনাথকে থানায় আনা হল বিকেলে।
লোকটির নাম বিশ্বনাথ মেহতা। নন্দিনীর বাবার ছোট ভাই। পরিবারের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ। এলাকায় তার কথাই শেষ কথা।
জিজ্ঞাসাবাদের ঘরে তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন, যেন থানায় আসাটা তাঁর কাছে অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার।
রাকেশ টেবিলের ওপাশে বসলেন। দুজনের মাঝে একটি ফাইল।
"নন্দিনী কীভাবে মারা গেল?"
"হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বুকে ব্যথা।"
"বাইশ বছরের মেয়ে হঠাৎ বুকে ব্যথায় মরে যায়?" রাকেশ হাসলেন না। "ডাক্তার বলছেন অন্য কথা।"
"ডাক্তার ভুল বলছেন।"
রাকেশ ফাইল খুললেন। ভেতর থেকে একটি ছবি বের করে টেবিলে রাখলেন।
"এটা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। গলায় চাপের দাগ। ভেতরে রক্তক্ষরণ। এটা হার্ট অ্যাটাক নয়, বিশ্বনাথজি। এটা শ্বাসরোধ করে খুনের ঘটনা।"
বিশ্বনাথের চোয়াল সামান্য নড়ল। কিন্তু চোখ অটল।
"আর এটা দেখুন।" রাকেশ আরেকটি ছবি রাখলেন। "নন্দিনীর বাঁ হাতের নখের নিচ থেকে পাওয়া চামড়ার কণা। ফরেনসিক বলছে এটা কোনো পুরুষের। আর এদিকে আপনার ডান হাতে এই তিনটি আঁচড়ের দাগ — গতকাল রাতের।"
ঘরে পড়ে যাওয়া একটি পিনের শব্দও শোনা যেত তখন, নিস্তব্ধতা ।
বিশ্বনাথ তাঁর হাত লুকানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে।
"নন্দিনী মরার আগেও লড়াই করেছিল। আপনার গায়ে সেই প্রমাণ রেখে গেছে।" রাকেশের কণ্ঠ শান্ত কিন্তু ভেতরে ইস্পাত।
"সে ঠিক করেছে।"

পাশের গলির একটি পুরনো বাড়ির ছাদে অর্জুন বসেছিল একা।
ছেলেটির বয়স চব্বিশ। গড়পড়তা চেহারা, কিন্তু চোখ দুটো গভীর। এখনো সেই চোখ দুটি ফোলা, লাল। সে ঠিকমতো কাঁদতেও পারছে না, কারণ কান্নার জন্যও বুকে শক্তি চাই।
রাকেশ ছাদে উঠে তার পাশে বসলেন। কিছু বললেন না প্রথমে। শুধু বসে রইলেন।
অর্জুন ধীরে বলল, "আমরা শুধু বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, স্যার। এটুকুই।"
"কতদিনের পরিচয়?"
"ছোটবেলা থেকে। একই মহল্লায় বড় হয়েছি। স্কুলে একসাথে পড়েছি। কখন থেকে ভালো লাগতে শুরু হয়েছে বলতে পারব না। মনে হয় সেই ছোটবেলা থেকেই।"
"পরিবার কখন জানল?"
"তিন মাস আগে। নন্দিনীর মা টের পেয়েছিল কারও কাছ থেকে। তারপর থেকে নন্দিনীকে ঘর থেকে প্রায় বের হতে দিত না। আমাদের দেখা হত না। শুধু ফোনে কথা হত গোপনে।" অর্জুনের গলা ভেঙে পড়ল। "গতকাল বাজারে দেখা হয়ে গেল হঠাৎ করেই। ওর চোখ দেখেই বুঝলাম ভয় পাচ্ছে। বলল, '’ওরা দেখে ফেলেছে। আমি ভয় পাচ্ছি।' আমি বললাম পালিয়ে যাই। ও রাজি হল না।"
"কেন?"
অর্জুন পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটি মেসেজ দেখাল।
নন্দিনীর লেখা। শেষবার লেখা।
"অর্জুন,
ওরা জেনে গেছে। কাকাবাবু ভীষণ রেগে আছেন। মা কাঁদছেন। আমি জানি না আজ রাতে কী হবে।
তুমি বলেছিলে পালিয়ে যাই। কিন্তু পালানো মানে স্বীকার করে নেওয়া যে আমরা ভুল করেছি। আমরা ভুল করিনি। ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়।
যদি কিছু হয়, মনে রেখো — আমি ভালোবেসেছিলাম। ভয়ে না, সাহসে। এই পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি তুমি।
Good Night
রাকেশ মোবাইলটা ফেরত দিলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল সামান্য। তিনি বহু বছর পুলিশে আছেন। অনেক মৃত্যু দেখেছেন। কিন্তু এই মেসেজ তাঁকে ভেতর থেকে একটু নাড়িয়ে গেল।


ক্রাইম ব্রাঞ্চ সেদিন রাতেই বাড়ির সবাইকে আলাদা আলাদা জিজ্ঞাসাবাদ করল।
নন্দিনীর মা সবিতা প্রথমে কিছুই বলতে চাননি। শুধু কাঁদছিলেন। কিন্তু যখন তাঁকে বলা হল মেয়ের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, যখন বলা হল নন্দিনী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছিল বাঁচার জন্য, তখন সবিতার মুখ খুল্ল।
"রাত এগারোটার দিকে... বিশ্বনাথ নন্দিনীর ঘরে ঢুকলেন।" সবিতার কণ্ঠ কান্নায় ভেঙে পড়ল। "আমি বাইরে ছিলাম। দরজা বন্ধ ছিল। ভেতর থেকে শব্দ হচ্ছিল... আমি... আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"
"আপনি দরজা খুলতে চেষ্টা করেননি?"
সবিতা মাথা নামিয়ে ফেললেন। "বিশ্বনাথদার কথার বিরুদ্ধে আমি কখনো যেতে পারিনি। কখনো সাহস হয়নি।" তাঁর কণ্ঠ ভেঙে গেল। "আমার মেয়ে... আমার মেয়ে ভেতরে চিৎকার করছিল। আর আমি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।"
রাকেশ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
তারপর বললেন, "আপনি সাক্ষী দেবেন?"
সবিতা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। বাইরে রাতের হরি নগর শান্ত, নিস্তব্ধ।
সবিতা দেবী মাথা তুলে বললেন, "হ্যাঁ।"

বিশ্বনাথ মেহতাকে গ্রেফতার করা হল জবানবন্দির ভিত্তিতে।
লোকটি গ্রেফতারের সময়ও মাথা উঁচু রেখেছিলেন। পাড়ার লোকজন দেখছিল। কেউ কেউ মাথা নামিয়ে কেটে পড়ল।
হাতে হাতকড়া পরার সময় বিশ্বনাথ রাকেশের দিকে তাকালেন।
"পরিবারের সম্মান রক্ষা করেছি।"
রাকেশ তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন।
"একটা বাইশ বছরের মেয়ে শুধু ভালোবাসতে চেয়েছিল। সেটুকুর জন্য আপনি তার শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেললেন একটি মেয়েকে। এটা সম্মান নয়, বিশ্বনাথজি। এটা কাপুরুষতা।"
গলিতে একটা নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল।

তিন মাস পরে আদালতে মামলার শুনানি শুরু হল।
সাক্ষীর কাঠগড়ায় রাকেশ দাঁড়ালেন। বিপরীতে বিশ্বনাথের উকিল।
"ইন্সপেক্টর সাহেব, এটা একটি পারিবারিক বিষয়।"
"না।" রাকেশের কণ্ঠ শান্ত কিন্তু দৃঢ়। "যখন একটি মানুষের শ্বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়, সেটা আর পারিবারিক বিষয় থাকে না। সেটা খুন।"
আদালত কক্ষে পিনপতন নীরবতা।
রাকেশ বললেন, "নন্দিনী মেহতা বাইশ বছর বয়সে ভালোবাসতে চেয়েছিল। সেটুকুই তার অপরাধ ছিল। সেই অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তার নিজের ঘরে, তার নিজের পরিবারের হাতে।"
বাইরে করিডোরে অর্জুন একা বসে আছে। তার মোবাইলে এখনো সেই মেসেজটা আছে।
"ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়।"
নন্দিনী হেরে যায়নি।
যারা তাকে থামাতে চেয়েছিল, তারাই আজ কাঠগড়ায়।
কোন প্রেম নিষিদ্ধ হয় না। নিষিদ্ধ হয় শুধু সেই মানুষগুলোর সংকীর্ণ মন, যারা ভালোবাসাকে ভয় পায়।