আগরতলা শহরের উমাকান্ত রোডের অপর পাশে, দেবনাথ পরিবারের তিনতলা বাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল বছরের পর বছর ধরে। ১৮৯২ সালে এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন বৃন্দাবন দেবনাথ — ত্রিপুরার মহারাজার দরবারে যিনি ছিলেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। সেই পুরনো গৌরব এখন ম্লান হলেও বংশের অহংকার এখনো অটুট।শহরে এই পরিবারের নামডাক এখনো অনেকটাই বেঁচে আছে ।
ষষ্ঠীর সন্ধ্যা। উঠোনে ঢাকের বাদ্যি বাজছে। ধূপের ধোঁয়া বাতাসে মিশে যাচ্ছে শিউলির গন্ধের সাথে। দেবনাথ বাড়ির দুর্গাপুজো এই এলাকায় বিখ্যাত — একসময় মহারাজার পরিবারও এখানে আসতেন। কিন্তু এই বছরের পুজোয় আনন্দের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে ছিল একটা ভয়াবহ অন্ধকার,যা এই শহরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
নবমীর রাত দশটায় বাড়ির বড় কর্তা, ৬৮ বছর বয়সী রামপ্রসাদ দেবনাথকে পাওয়া গেল দেবীর পুজোঘরে — মৃত। পায়ের কাছে উল্টানো তাম্রকলস, হাতে আধপোড়া ধূপকাঠি। প্রথমে মনে হল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু। কিন্তু ঠোঁটের কোণে একটু নীলচে আভা দেখে বাড়ির ছোট ছেলে রথীন্দ্র সন্দেহ করল — এ স্বাভাবিক মৃত্যু নয়।
"বাবাকে বিষ দেওয়া হয়েছে। আমি জানি। আর আমি জানি কে করেছে।" — ফোনে রথীন্দ্র দেবনাথ কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল।
কমলেশ ভট্টাচার্য। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। আগরতলার প্রাইভেট ডিটেকটিভ, যিনি একসময় ত্রিপুরা পুলিশের সি.আই.ডি বিভাগে কাজ করতেন। রোগা চেহারা, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা লোকটাকে দেখে কেউ বুঝবে না যে এই শহরের সবচেয়ে জটিল রহস্যগুলো তাঁর হাতেই সমাধান হয়েছে। উদ্যপুরে পিটিয়ে খুনের মামলায় নিরপরাধ এক বাবাকে ফাঁসি থেকে বাঁচানোর পর থেকে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে।
পরদিন সকালে কমলেশবাবু এসে পৌঁছলেন দেবনাথ বাড়িতে। সাথে তাঁর সহকারী — তরুণী রিয়া চাকমা, যে ত্রিপুরার উপজাতি সমাজ থেকে উঠে এসে ফরেনসিক সায়েন্সে ডিগ্রি নিয়েছে। সারাবাড়িতে তখন শোকের আবহ। পুজো বন্ধ। ঢাকগুলো একপাশে পড়ে আছে অযতনে।
পুজোঘরে ঢুকে কমলেশ প্রথমেই ঘরের চারদিক দেখলেন। কাঁচের জানলার বাইরে একটি মাঝারি কলেবরের নিমগাছের ডাল। মেঝেতে ধূপের ছাই বিক্ষিপ্ত। কিন্তু সিঁদুরের কৌটার পাশে পড়ে আছে একটা জিনিস — একটা ছোট্ট তামার পয়সা, যার গায়ে কিছু একটা খোদাই করা।
তামার পয়সায় খোদাই করা আছে — একটি ত্রিভুজের মধ্যে তিনটি বিন্দু। প্রাচীন ত্রিপুরার গুপ্ত সমিতির চিহ্ন?
দেবনাথ পরিবারের সদস্যরা হলেন — বড় ছেলে অম্বরীশ দেবনাথ (৪৫), যিনি বাবার ব্যবসা দেখেন; বড় বউ মাধুরীলতা (৪২); ছোট ছেলে রথীন্দ্র (৩৮), যিনি কলকাতায় থাকেন — পুজোর জন্য এসেছেন; মেয়ে প্রিয়লতা (৪০), যিনি বিবাহিতা এবং পুজোয় বাপের বাড়ি এসেছেন; এবং রামপ্রসাদের বৃদ্ধা দিদি, যোগমায়া দেবী (৭৮), যিনি এই বাড়িতেই থাকেন।
কমলেশ একে একে সবার সাথে কথা বললেন। অম্বরীশ বলল বাবার সাথে তার সম্পর্ক ভালো ছিল — ব্যবসায় কোনো ঝামেলা নেই। মাধুরীলতা বললেন শ্বশুরমশাই পুজোয় খুব আনন্দিত ছিলেন। রথীন্দ্র বলল সে আসার পর থেকেই তার বাবাকে একটু মনমরা দেখছিল। প্রিয়লতা কিছু বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল।
রিয়া ইতিমধ্যে রান্নাঘর ঘুরে এসে কমলেশের কানে কানে বলল — রাতের প্রসাদে ব্যবহৃত গাওয়া ঘিয়ের পাত্রে অস্বাভাবিক গন্ধ পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের ফল আসতে দেরি আছে, কিন্তু রিয়ার সন্দেহ — অ্যাকোনিটাইন বা তার কাছাকাছি কোনো উদ্ভিদজাত বিষ ব্যবহার হয়েছে। এই বিষ স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় না সহজে। আনতে হয় বিশেষ পাহাড়ি জঙ্গল থেকে।
"কমলেশদা, এই বিষটা চিনি আমি। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে একটা গাছ থেকে তৈরি হয়। কিন্তু এটা সহজলভ্য নয়। যে এনেছে — সে জেনেশুনে বহু দূর থেকে এনেছে।" — রিয়া চাকমা।
কমলেশবাবু এবার বৃদ্ধা যোগমায়া দেবীর ঘরে গেলেন। ৭৮ বছরের বৃদ্ধা তাঁর ঘরে চুপ করে বসে আছেন। কমলেশ বললেন — "মাসিমা, আপনি কি জানেন রামপ্রসাদবাবুর কোনো শত্রু ছিল কিনা?"
বৃদ্ধা চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে বললেন —
"নাগো জানা নেই। 20 -22 বছরের ভেতর এমন কোন শত্রুতা কারো সাথে আছে বলে আমার জানা নেই। তার আগে কোনো শত্রু থাকলে, এখন সে শত্রুতা মেটাবে এটাও ভাবতে পারছিনা। এত বড় একটা সব্বনাশ কে যে করল জানিনা!
কমলেশবাবু আগরতলয় তাদের পুরনো জমির দলিল ঘেঁটে বের করলেন একটা তথ্য। ১৯৯৮ সালে রামপ্রসাদ দেবনাথ একটা জমি কিনেছিলেন — উমাকান্ত রোডের পাশেই। বিক্রেতা ছিলেন কীর্তিভূষণ চক্রবর্তীর স্ত্রী বেনুবালা চক্রবর্তী । সেই জমি বিক্রির পর কীর্তিভূষণের পরিবার পথে বসে গিয়েছিল — অভিযোগ ছিল, রামপ্রসাদ বেনুবালা চক্রবর্তীকে ভুলিয়ে ফুসলিয়ে এক তৃতীয়াংশ দামে জমি নিয়েছিলেন। মহিলার স্বামী কীর্তিভূষণ মামলা করেছিলেন কিন্তু তিনি সেই মামলাতে হেরেছিলেন। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরে তিনি দুই বছর পরেই মারা যান।
কীর্তিভূষণের ছেলে — সৌমেন চক্রবর্তী। বয়স এখন ৪৫। পেশায় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। তিনি এই বিষয়টিকে আজও যেন মেনে নিতে পারছেন না মন থেকে।
গোয়েন্দা কমলেশ ভট্টাচার্য দেবনাথ বাড়ির দরজার বাইরে পাওয়া গেল একটি ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো — নকশাওয়ালা গামছার অংশ, স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয় এধরনে গামছা।
কিন্তু কমলেশবাবু শুধু বাইরের শত্রু খুঁজছিলেন না। তাঁর মন বলছিল — ঘরের মধ্যেও কিছু একটা আছে। তিনি লক্ষ্য করলেন, অম্বরীশ এবং রথীন্দ্রর মধ্যে একটা অস্বস্তি। দুই ভাই কথা বলছে না সেভাবে। প্রিয়লতা একাকী বাড়ি বাহিরে বসে থাকছে।
রিয়া আরেকটা তথ্য নিয়ে এল — অম্বরীশের ব্যবসায় গত দুই বছরে বড় ক্ষতি হয়েছে। বাবার কাছে সে টাকা চেয়েছিল। কিন্তু রামপ্রসাদ তাঁর উইলে সম্পত্তি সমান তিন ভাগে ভাগ করেননি। সম্পত্তির বড় অংশ যাবে ছোট ছেলে রথীন্দ্রকে — কারণ অম্বরীশ নাকি বাবার অজান্তে অনেক টাকা তছরুপ করেছিল।
কমলেশবাবু পরের দিন সৌমেন চক্রবর্তীর আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকানে গেলেন। সৌমেন মধ্যবয়সী, শান্ত চেহারার মানুষ। কমলেশ সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন — "আপনি কি জানতেন রামপ্রসাদ বাবু পুজোয় এই বাড়িতেই থাকেন? তাদের তো কোলকাতা আরো একটা বাড়ি আছে!"
সৌমেন একটু থামল। তারপর বলল — "হ্যাঁ, জানতাম। তিনি আমাদের পরিবারের সাথে, আমার বাবার সাথে যা করেছিল সে জন্য আমি ঘৃণা করতাম লোকটাকে, তবু এই খুনের ঘটনা শুনে খুব খারাপ লেগেছে।"
কমলেশবাবু লক্ষ্য করলেন সৌমেনের দোকানে হার্বাল ওষুধের পাশে কিছু পাহাড়ি গাছের শিকড়-ছাল আছে। তবে অ্যাকোনিটাইন জাতীয় কিছু নেই প্রকাশ্যে। রিয়াকে পাঠালেন পিছনের ঘর দেখতে। রিয়া ফিরে এসে বলল — "কিছু নেই।"
ফেরার পথে কমলেশবাবুর মনে একটা কথা ঘুরছিল — তামার পয়সাটা। সেই চিহ্ন। তিনি আগরতলার পুরনো ইতিহাস জানেন। ত্রিপুরার হিন্দু পরিবারগুলোয় একটা গোষ্ঠী ছিল যারা বংশপরম্পরায় একটা গুপ্ত সমিতির সাথে যুক্ত থাকতেন — "ত্রিবিন্দু সমিতি"। এরা বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার দায়িত্ব ঈশ্বর নয়, বরং মানুষেরই।তাই এখানেই একটা খটকা ছিল।
প্রায় এক সপ্তাহ পর যোগমায়া দেবীর কাঠের পুরনো বাক্সে খোঁজতে গিয়ে পাওয়া গেল একটি মলিন চিঠি —প্রায় ৩০ বছর আগের। লেখা: "রাম, তুমি যা করেছ তার ফল ভোগ করবে তুমি। ত্রিবিন্দু সাক্ষী, আজ নয় তো কাল।"
কমলেশবাবু রাতে পরিবারের সব সদস্যকে একত্রে ডাকলেন। বললেন — "আমি জানি কে খুন করেছে। কিন্তু বলার আগে একটা কথা জানতে চাই — পুজোর রাতে কে প্রসাদের ঘিয়ের পাত্র শেষবার ধরেছিলেন? কে রামপ্রসাদ বাবুকে মায়ের ভোগ দিয়ে ছিলেন? "
সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর আস্তে আস্তে যোগমায়া দেবী বললেন — "আমি।আমি ত্রিবিন্দু সমিতির কথা জানতাম। ছোটবেলায় বাবার মুখে শুনেছি। " — যোগমায়া দেবী, অশ্রুসিক্ত চোখে। যোগমায়া দেবীকে গ্রেফতার করা হল। বয়স ও শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে আদালত পরে জামিন দিল। মামলা চলছে দীর্ঘদিন ধরে "এই মামলায় দোষী কে? বৃদ্ধা? নাকি অন্য কেউ?
Comments (2)