রাতে ঘুম না আসার কারণ ভাবছিলাম । ইদানিং এ সমস্যাটা হচ্ছে । রাতের অনেকটা সময় কেটে যায় অথচ ঘুমের দেখা পাই না । কিছু নিয়ে যে দুশ্চিন্তায় আছি তা নয় । তবে এখন ঘুম না হওয়ার কারণ নিয়ে টেনশন করছি। একারণেই হয়ত ঘুম আসছে না। টেনশনমুক্ত হওয়ার জন্য মোবাইলে এফএম রেডিওতে গান শুনি ।

এখন একটা গান চলছে খুব ভালো লাগছে শুনতে
যাচ্ছ দূরে যাও তুমি, বাধা দেব না।
ফিরে আসবে এটাও জানি, ভুলে যাবে না
কাটলো না হয় কটা দিন,শুন্যতায় তুমি হীন,
জমবে ভালবাসা,ফিরে আসো না !!
এসব গান শুনলে মন খারাপ হয়ে যায়। তারপরও শুনতে ভাল লাগে । হঠাৎ দেখি গান বন্ধ হয়ে গেছে। ইনকামিং কলের রিংটোন বাজছে । বিরক্ত হয়ে মোবাইলের ডিসপ্লেতে তাকাই । সেখানে পূর্নার নাম ভেসে উঠে । মেয়েটা অনার্স এ পড়ছে। এর মধ্যে দেখি  সে ভবিষ্যত সংসার জীবনের ছক একে রেখেছে । বোঝার চেষ্টা করছে না যে ও একটা ঘোরের মধ্যে আছে ।
কল রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে পূর্না বলে ওঠে_
:  ঘুমিয়ে পড়ছিলেন ? বিরক্ত হচ্ছেন নাতো আবার ।
:  না আমি এখনো ঘুমাইনি । তোমার খবর কি ?
:  অনেক বেশি ভাল ।আপনি কেমন আছেন ?
এমন ভাবে ভাল আছে বলল যে আমি একটু অস্বস্তিতে পড়লাম । প্রশ্নটা না করাই হয়ত ঠিক হবে তাই আর এ বিষয় নিয়ে আর কথা বাড়ালাম না ।

চুপ করে আছি দেখে বলল,
কেমন  আছেন  সেটা কি আমাকে বলা যাবে না ? ঠিক আছে বলা না গেলে বলতে হবে না ।
আমি বললাম, আমিও ভাল আছি ।

:  আচ্ছা একটা কথা বলবো ?আপনি কিছু মনে করবেন নাতো ।
: কিছু মনে করবো কেন ?তুমি বলো ।
: আপনাকে আগে কখনো তুমি করে বলি নাই। আজ বলবো । প্লিজ কিছু মনে করবেন না।

বলার মধ্যে আকুতি। আমি বুঝি না ফোনে কথা বলে একজনের জন্য এভাবে ঘোর কিভাবে তৈরি হয়। এটাও কি সম্ভব !নাকি ঘোরেরটা পুরা অভিনয়। অভিনয় ভাবতে খারাপ লাগে। এ মেয়ের সাথে কথা বলে কখনো মনে হয়নি কিছু অভিনয় করেছে। এত আবেগ দিয়ে যে কথা বলে। অনেক বেশি আপন মনে হয়। কিন্তু এ অল্প বয়সের আবেগ একটা সময় পর চলে যাবে ।
অনিচ্ছাস্বত্বেও বললাম, আচ্ছা বলো,

আজকের কতো তারিখ বলো তো ?

তারিখের ব্যাপারটা আমি কখনো সঠিক ভাবে বলতে পারি না ।কেউ তারিখ জিজ্ঞেস করলে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখে নিই ।মনে করার চেষ্টা করি আজকে কতো তারিখ ।
পূর্না  বলে উঠে,
তোমাকে নিয়ে আর হলো না ।সামান্য তারিখের ব্যাপারটাও মনে রাখতে পারো না ।
আমি এ প্রান্ত থেকে মাথা নাড়ি ।মাথা নাড়ার ব্যাপারটা ও প্রান্তে বুঝতে পাওয়ার কথা না ।তারপরও পূর্না কিভাবে যেন বুঝে গেল ।
বলল, তোমার মাথা নাড়া বন্ধ করো ।এই যে আমি তোমাকে তুমি করে বলছি খুব বিরক্ত হচ্ছেন তাই না ? আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজকের পর থেকে আর কখনো তোমাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করবো না । আজকের ১৮ তারিখ আমার জীবনের অনেক দু:খের একটা দিন হয়ে থাকবে ।তোমাকে অনেক বার বোঝানোর চেষ্টা করছি ।আসলে কাউকে জোর ভালোবাসা যায় না । আর কিছু করার ও নাই ,তোমাকে আর কখনো বলতে যাব না ভালোবাসি ।তোমাকে আর কক্ষনো বিরক্ত করবো না ।

ওর গলাটা কেমন যেন কাপছিল মনে হচ্ছে কাঁদছে ।আমার জন্য একটা মেয়ে চোখের পানি ফেলবে এটা ভাবতে ভালো লাগছে না ।
আমি কথা খুঁজে পাচ্ছি না ।বললাম, আসলে বাস্তবতা অনেক কঠিন পরে কষ্ট পাবে তার থেকে এখন একটু না হয় কষ্ট পাইলে ।
তাই না ?
পূর্না অনেক সময় হয়ে গেল কিছু বলছে না, কি করছে বুঝতেও পারছি না ।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর উত্তেজিত গলায় বলে, তুমি কষ্টের কি বুঝ ? আমার কষ্ট নিয়ে তুমি কক্ষনো কথা বলবা না ।
কক্ষনো না ।
যে কষ্ট সারা জীবন ধরে বয়ে নিতে হবে সে কষ্ট আগে না পরে তা বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই ।আসলে তোমার সাথে পরিচয় না হলেই অনেক ভাল হতো ।
অনেক ভাল ।

হা সেটাই ভালো হতো ।তবে তুমি একটা ঘোরের মধ্যে আছো ।দেখো তোমার অনার্স পড়া যখন শেষ হয়ে যাবে আর অনেক ভালো ছেলে তোমাকে বিয়ে করার জন্য আসবে ,তখন আজকের এ ব্যাপার মনে পড়লে হাসবে । বলবে, আরে কি ছেলে মানুষি করছিলাম ।
দেখো তখন আমার কথা সত্যি হবে ।

কক্ষনো তোমার কথা সত্যি হবে না । আমি ঘোরের মধ্যে কিছু করি নাই তাই বাস্তবতা আমি ভালোই  বুঝি। তোমার আমাকে ভালো লাগে না তাই এসব কথা বলছো ।
আমি আসলে অনেক খারাপ একটা মেয়ে ।
অনেক খারাপ।
তোমাকে অনেক বিরক্ত করছি ।
তবে দু:খিত বলবো না ।
আর কখনোই তোমাকে বিরক্ত করবো না ।তবে তোমাকে বিরক্ত করার সময়গুলোই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুন্দর সময় হয়ে থাকবে ।
এজন্যই দু:খিত বলবো না ।

তুমি  খুব  ভাল মেয়ে এটা আমি জানি ।তবে বাস্তবতা অনেক কঠিন । অনেক ভালোবাসা ও দু’জন মানুসকে  মিলতে দেয় না । তাই দূরে থাকাই ভাল ।

হুম আমি জানি তুমি অনেক বাস্তববাদী ।তবে তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে ১০০% শিওর না হয়ে কোন কাজ কর না ।

আমি বলি, নাহ সেটা নাহ । দেখ তুমি এভাবে আমার কথা ভেব না ।আমার থেকে অনেক ভালো একজনকে তুমি পাবে ।দেখ তুমি অনেক সুখী হবে ।

খবরদার তুমি আমার সুখের কথা বলবা না ।তোমার মুখে আমার সুখের কথা মানাচ্ছে না ।পূর্নার  উত্তেজিত গলাটা অনেক বেশি কঠিন  শোনাচ্ছে ।
আমি পূর্নার কথা ভেবে চুপ করে থাকি । পূর্না বলতেই থাকে তোমার কাছে এসব সুখের কথা  শুনতে আমি চাই না । আর আমার কারো ভালোবাসার  দরকার নেই । আমি এখন থেকে ভাল করে পড়াশোনা করবো । আর পড়ালেখায় কোন ফাকি দিবো না । আমি তোমাকে আর কখনো মনে করবো না ।
আমি বলি, খুব ভাল সিদ্ধান্ত । মন দিয়ে পড়ালেখা করো ।তোমার অনেক ভাল হবে ।
কেন ভালো করে পড়বো তা তো জিজ্ঞাসা কর নাই । তুমি আসলে আমার কোন ব্যাপারেই কখনো আগ্রহ দেখাও না ।কিন্তু কেন ?
নাহ নাহ ,
এটা ঠিক না । তুমি বলো ।
আমার আসলে অনেক বেশি পড়ার ইচ্ছা ছিল না ।আমি চাইতাম আমার একটা সুন্দর সংসার হবে । আমি খুব ভালো একজন মা হবো । এক একদিন এক এক রকম রান্না করে তোমাকে খাওয়াবো । অথচ যাকে নিয়ে এতো স্বপ্ন দেখলাম  এখন সে আমার হবে না ।তাই সে যখন আর আমার হবেই না তাই এখন এ ধরণের স্বপ্ন দেখা বাদ । আমার  আর সংসার হবে না । তাইতো ব্যস্ত থাকতে হবে । ভাল ভাবে পড়া লেখা করে বড় একটা চাকুরি করে  নিজেকে অনেক বেশি ব্যস্ত রাখবো ।
অনেক বেশি ভালো থাকবো ।
আমি চুপ করে আছি,বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছি না ।
পূর্না নিজেই আবার কথা বলে উঠে ,
আমি  শুধু বলবো  তোমার মতো ছেলের সাথে কোন  মেয়ে যেন  কোন দিন কথা বলতে না যায় ।



একটু আশ্চর্য হই । জিজ্ঞেস করি, তুমি কি আমাকে  অভিশাপ দিচ্ছো ?
নাহ নাহ অভিশাপ কেন দিব । আমি সব সময় চাই তুমি অনেক ভালো থাক ।
কিছুক্ষণ থেমে বলে, আচ্ছা অনেক রাত হয়ে গেছে এখন রাখি ।আর  শুনে রাখেন এই ১৮ তারিখ  হয়ত  অন্যান্য  দিনের  মতই তোমার  কাছে একটা সাধারণ দিন হয়ে আসবে । কিন্তু এ দিনটা  আমার কাছে সত্যিই  অনেক  কষ্টের  একটা  দিন হয়ে প্রতি বছর আমার জীবনে ফিরে ফিরে আসবে । তুমি অনেক বেশি ভাল থেকো ।
অনেক অনেক বেশি ভালো ।

আর কিছু না বলার সুযোগ দিয়ে মোবাইল কেটে দেয় পূর্না । এরপর আর কখনো পূর্নার মোবাইলটা অন পাওয়া যায়নি ।

আজ এতো দিন পর খুব জানতে ইচ্ছা করে মেয়েটা এখন কেমন আছে ?কোথায় আছে,খুব জানতে ইচ্ছা করছে আগের কথাগুলো ভেবে কি এখন তার ছেলে মানুষি  মনে হয় ? কিন্তু জানার কোন উপায় নেই ।যে নম্বর থেকে পূর্না আমার সাথে  কথা  বলতো  সেটা বন্ধ । এক বছর ধরে একদিন কথা না বললে যে থাকতে পারতো না  সে  আর কখনো আমাকে কল করেনি আর আমি ও ওর কথা চিন্তা করে কথা বলার চেষ্টা করি নাই । আর এখন পূর্নার  কথা মনে  পড়লে  কেন জানি  অনেক খারাপ লাগে ।
জানতে ইচ্ছা করে  ও  কেমন আছে ?