আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস (International Day of Older Persons) প্রতি বছর ১ লা অক্টোবর তারিখে সারা বিশ্বে পালিত হয়। যা ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে ১ লা অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৯১ সাল থেকে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন শুরু হয়।
যদিও, তারও আগে ১৯৮২ সালের ভিয়েনা আন্তর্জাতিক প্রবীণ কর্মপরিকল্পনা (Vienna International Plan of Action on Ageing)-এর মাধ্যমে জাতিসংঘের বিশ্ব বার্ধক্য পরিষদে (World Assembly on Ageing) এই পরিকল্পনাটি গ্রহণ করা হয়েছিলো। এটি বার্ধক্যজনিত সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিলো। যা "বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবস" (World Senior Citizens' Day) নামে পরিচিত। পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেণ্ট রোনাল্ড রিগ্যান ১৯৮৮ সালের ১৯ আগস্ট একটি ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ২১ আগস্টকে 'বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবস' ( World Senior Citizens' Day) হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তবে, এটি আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৯০ সালের জাতিসংঘের প্রস্তাবনায় স্বীকৃতি পায়নি।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস (International Day of Older Persons)-এর ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- "Older Persons Driving Local and Global Action: Our Aspirations, Our Well-Being and Our Rights" অর্থাৎ, "স্থানীয় ও বৈশ্বিক উদ্যোগে প্রবীণ ব্যক্তিগণঃ আমাদের আকাঙ্ক্ষা, আমাদের কল্যাণ এবং আমাদের অধিকার"। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়ের শ্লোগান হলো- "একদিন তুমি পৃথিবী গড়েছো, আজ আমি স্বপ্ন গড়বো, সযত্নে তোমায় রাখবো আগলে"।
এ বছরের প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টি খুবই সুন্দর এবং গভীর অর্থ বহন করে। প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্যের ব্যাখ্যায় বলা যায়- এই বাক্যটির মাধ্যমে মূলতঃ প্রবীণ এবং নবীন প্রজন্মের মধ্যে এক গভীর কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার সম্পর্ককে তুলে ধরা হয়েছে।
"একদিন তুমি পৃথিবী গড়েছো"- এই অংশটি আমাদের প্রবীণদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। "পৃথিবী গড়েছো" বলতে কেবল একটি বাড়ি বা দেশ নয়; বরং বর্তমান সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং আমরা যে সকল সুযোগ-সুবিধাগুলো ভোগ করছি, তার সবকিছুর ভিত্তি স্থাপনের কথা বোঝায়। প্রবীণ প্রজন্ম তাদের পরিশ্রম, ত্যাগ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এমন একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করে গেছেন।
"আজ আমি স্বপ্ন গড়বো"- এই কথাটির মাধম্যে নবীন প্রজন্মের দায়িত্ববোধ ও আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ পায়। প্রবীণদের তৈরি করে যাওয়া ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্ম এখন একটি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত; যা নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করবে এবং সমাজের উন্নয়নকে আরও উচ্চ শিখরে নিয়ে যাবে। এটি একটি উত্তরাধিকারের ভাবনা, যেখানে আগের প্রজন্মের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প রয়েছে।
"সযত্নে তোমায় রাখবো আগলে"- এ বক্তব্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি। যে প্রবীণেরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এতো কিছু করেছেন, তাঁদের শেষ জীবনে যত্ন, নিরাপত্তা ও সম্মান দেওয়ার অঙ্গীকার এটি। "আগলে রাখা" বলতে কেবল শারীরিক যত্ন নয়; বরং মানসিক ও আবেগিক সমর্থন দিয়ে তাঁদের নিঃসঙ্গতা দূর করা। এবং প্রবীণদের প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি বোঝায়।
সংক্ষেপে, এই প্রতিপাদ্যটি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়- আমরা অর্থাৎ, প্রবীণেরা সমাজ ও রাষ্ট্রের অতীত ও বর্তমানের স্থপতি; আর নবীণেরা তাঁদের দেখানো পথে হেঁটে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়বে এবং সেই সঙ্গে প্রবীণদেরকে প্রতিপালন ও যত্ন করা নবীণদের নৈতিক দায়িত্ব। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দায়িত্বের হাতবদল এবং ভালোবাসার চিরন্তন বন্ধনকে তুলে ধরে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে এর মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য কি? এ প্রসঙ্গে বলা যায়- প্রবীণদের সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বার্ধক্যের সমস্যা ও প্রতিকার সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতা তৈরি করা। প্রবীণদের অবদান, জ্ঞান ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি করা। তাছাড়া, দ্রুত ক্রমবর্ধনশীল প্রবীণ জনসংখ্যা এবং তাদের প্রতি বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা।
এ লক্ষ্যে প্রবীণদের জন্য নবীণদের করণীয় যা হতে পারে; তা হলো-
প্রবীণদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর রেখে তাঁদের যত্ন ও সমর্থন দেয়া। বয়সজনিত বৈষম্য ও মন্দ আচরণ করার থেকে রহিত থাকতে সচেতন হওয়া। প্রবীণদেরকে সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখা এবং একাকিত্ব দূর করতে সহায়তা করা। সর্বোপরি, প্রবীণদের মানবিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। যে জাতি প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ রাখে না; সে জাতি কখনোই সম্মৃদ্ধির শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হয় না।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালন ও বাস্তবতা প্রসঙ্গে বলতে পারি, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণ জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা সাড়ে ৪ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। জনসংখ্যার এই পরিবর্তন প্রবীণদের জন্য বিশেষ যত্ন ও পরিচর্যার কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রবীণদের সুরক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩-এর মাধ্যমে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি শক্তিশালী যত্ন ও পরিচর্যা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে, এ সকল নীতিমালা বাস্তবায়ন লক্ষ্যে রাষ্টের ভূমিকা জোরালো হওয়া দরকার।
বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য কিছু প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বার্ধক্যজনিত রোগ মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বা প্রবীণ চিকিৎসা বিভাগ এবং প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে। যৌথ পরিবার ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় প্রবীণদের ঐতিহ্যবাহী পরিচর্যার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। মানসম্মত হোম কেয়ার সার্ভিস এবং ডে-কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে সামাজিক মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। অনেক প্রবীণ একাকীত্ব ও বিষণ্ণতায় ভোগেন। তাঁদের সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রম নেওয়া উচিৎ। সর্বোপরি, আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করা জন্য কার্যকরভাবে রাষ্ট্রীয় ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।