ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত যে আমরা বাঙ্গালী হওয়ার গর্ব করি যে কারনে সেটা অবাঙ্গালীদের করা বাঙ্গালী জাতির প্রতি গর্বের থেকে অনেক আলাদা।
বিষয়টা বলা যাক ।নতুন প্রজন্মের একটা ধারনা আছে যে বাঙ্গালী মানেই সঙ্গীত, নাচ, কলা, নাটক । এর বাইরে বাকি ইতিহাস তাদের জানা তো আছে, কিন্তু সেটা প্রখর রোদের আকাশে একটুকরো মেঘের মত । বাঙলার সঙ্গীত মানে রবিন্দ্রনাথ, মান্না দে প্রমুখ, বাঙলার নাচ হল মমতাশঙ্কর, মিঠুন, কলাতে আছে যোগেন চৌধুরী ও গণেশ পাইন, আর নাটক বললে সত্যজিৎ থেকে ইত্যাদি ইত্যাদি ।এটা আমি শুধু প্রবাসী বাঙ্গালীদের কথা বলছি না, বাঙলায় বসবাসরত আমার প্রজন্মের সিংহভাগের অভিব্যাক্তি। তাছাড়া এর বাইরে বাকি যে ইতিহাস আছে সেটা পাঠ্য পুস্তকের জন্যই সীমাবদ্ধ, এর বাইরে আমাদের লাগেও না। তাই সেই পুরানো কাশন্দি ঘেঁটে কি হবে ?
সময়ের সাথে সাথে দক্ষিণ ভারত, পশ্চিম ভারত, আর মধ্য ভারতের কিছু তর্কালঙ্কার অবাঙ্গালী ব্যাক্তিদের সাথে আমার আলাপ হয়েছিলো । আমি ভাবলাম বাঙ্গালী যখন রাজনীতি সংক্রান্ত কথা বলাই ভালো , তাই শুধু কংগ্রেস ও মমতা নিয়েই কথা শুরু করলাম। আমি কি তখন জানতাম যে আমিও কি কি জানতাম না। জাতীয় কংগ্রেস সুরেন্দ্রনাথ ভারতে প্রথম প্রতিষ্ঠা করে, এক বাঙ্গালী, সেই কংগ্রেস স্বাধিনতা উত্তর বেশিরভাগ সময়টাই দেশ পরিচলনা করে গেছে । কিন্তু সেই গর্বের সামান্য রেখাপাতও আমরা ধরে রাখতে পারিনি। শুধু সুভাস চন্দ্র বোস একটু রেখেছিলেন, কিন্তু তার সাথে পরে কংগ্রেসের কি ব্যাবহার সেটা কারও অজানা নয়। শুধু প্রনব মুখোপাধ্যায় প্রথম বাঙ্গালী রাষ্ট্রপতি ।কিন্তু এই গর্বে রাজনীতির গন্ধ থাকার জন্য কতজন নাক ঢাকে বা নাক উচু করে আমার অনিচয়তা আছে।
সারা দেশ যখন মধ্যযুগের পর সুলতান বা বাদশাদের রাজত্বকালে নকল ব্রাম্ভন্যবাদ ও ভাঁড়ামির নিয়মে আবদ্ধ ছিল সেইসময় নারীর শিক্ষা সংস্কার ও অধিকারের সংস্কার প্রথমে যারা করেন তারা হল, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র। তারপর সেটা সারা ভারতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৩০০ বছর আগে প্রথম বাঙ্গালিরাই মুল্যবান কিছু সন্সকারের প্রতিফলন করেছিলেন যেটা গর্বের তো বটেই কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন বর্তমান বাঙ্গালিরা কি এই গর্ব অনুভব করেন ? বাঙলার বাঙ্গালীদের ৩৫ বছরের গর্ব আর ৫ বছরের গর্বের তুলনাতেই দিন কেটে যায় । এই অবাঙ্গালিদের মুখে সেই গর্বের কথা শুনে স্মৃতি কেচোগন্ডুষ করতে হল, দুঃখ এটাই ।
যদি কেউ প্রশ্ন করে আপনার চোখে সেরা নায়ক কে ? বাঙ্গালিয়ানা রাখতে কেউ কেউ হয়ত উত্তমকুমারের কথা ভাববেন কিন্তু কেউ চট করে বলবেন না সর্বকালের সেরা নায়ক বোধহয় স্বামী বিবেকানন্দ ।নায়ক যাকে অনুকরন করা যায়। নায়ক যার আদর্শে সারা জীবন উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকা যায়। দক্ষিণ ভারতে থাকাকালীন দেখেছি স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ অনুকরনের মাত্রা এতটাই বেশি যে পর্দার যেকোনো নায়কের আদর্শ মেকআপহীন রুপ ।
রবিন্দ্রনাথের গর্ব আমরা সবাই করি কিন্তু ভাষার তারতম্যের জন্য বাঙ্গালী ছাড়া সবাই তার গান,গল্প, কবিতা পড়ে উঠতে পারে না।কিন্তু কি এমন আছে বাঙ্গালীর সাহিত্যে যে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় এনথাম দুই বাঙ্গালিরাই রচনা করেছন? এ প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল যখন বন্দেমাতরম আর জন গন মন দুই আলাদা ব্যাক্তির লেখা জেনেছিল এক মারাঠি ব্যাক্তি। কি এমন জাদু আছে দেবদাস গল্পকারের মধ্যে যে তাকে নিয়ে ৩৭টি ভাষাতে চলচিত্র হয়েছে ? সর্বোপরি কি এমন মুগ্ধতা আছে লালন ফকিরের মধ্যে যে পাকিস্থান আর আরবের পল্লীগীতিতে তার নাম উল্লেখ আছে? সাধারন বাঙ্গালীর কয়জন এই নিয়ে গর্ব রাখে বলতে পারেন ?
তাছাড়া বাঙ্গালী হয়ে সুভাস চন্দ্রের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য । ক্ষুদিরাম বসু, আরও কত শহীদ যারা বাঙ্গালীর গর্ব। কিন্তু প্রথম ভারতীয় যিনি ইন্দিয়ান সিভিল সার্ভিস উত্তীর্ণ হন ১৮৬৮ সালে, এক বাঙ্গালী সতেন্দ্রনাথ ঠাকুর । আমি নিজেও কোনদিন এই নিয়ে কাউকে বলিনি বা বলতে শুনিনি এটা আমাদের গর্ব যখন প্রথম এক রাজস্থানি ছাত্রবন্ধু আমাকে গর্ব করে এটা মনে করাল ।
আমি অনুভব করি আমাদের বাঙ্গালী হয়ে যে গর্ববোধ হয় সেটা অনেকগুন বেশি হয় যখন অন্যরা বাঙ্গালীদের নিয়ে গর্ব করে বলে। বর্তমান বাঙলায় দিদি, দাদার গর্ব যেখানে শেষ কথা সেখানে বাঙ্গালী জাতিটাকে যারা টিকিয়ে রেখেছে বৃহৎ কর্মকাণ্ড দিয়ে স্বার্থহীন ভাবে সেই অস্তিত্ব যাতে এই প্রজন্ম ভুলে না যায় তার উদ্দেশে এই নিবেদন। জাতির গর্ব করা ভালো তবে যেন সেটা জাতের উরধে গিয়ে, অলসতা ও কূটনীতিকে ছাপিয়ে, মিথ্যা গর্বের অহঙ্কারকে ভুলে প্রকৃত গর্বকে গর্ব করে বলাটাই বোধহয় আসল গর্ব ।
মন্তব্য (9)