ডার্ক টোনের মেয়েরাও যে নজরকাড়তে পারে তা আমি জেনেছিলাম মুন্নীকে দেখে। নজর কাড়ার জন্য মুন্নীর দুটি চোখই ছিল যথেষ্ট। ওর দুচোখে আল্লাহ নিজ হাতে কাজল মেখে দিয়েছেন। টানা টানা দুই চোখ যার উপরে পড়েছে, সে ই খেই হারিয়েছে, ক্রাশ খেয়েছে। ও আমার আপার সূত্রের আত্মীয়। ওর উপর ক্রাশ খেয়ে একদিন আপাকে বললাম, আপা তোর অই ননদটা না যা সুইট! আপা বিরক্তিভরে বলছিল, বয়সটাতো প্রেমে পড়ার, তাই যা চোখে দ্যাখস তাই ভাল লাগে। আমি আর আপাকে বুঝাতে গেলাম না যে, আমিই শুধু চোখের মাথা খাই নি, খেলে আমার বন্ধুও খেয়েছে। নইলে এক দেখাতেই তারেক কেন বলবে, দোস্ত আমিতো মুন্নীর উপর ক্রাশ খাইছি, লাইন ঘাট ধরাই দাও।

আমার চেয়ে ও তিন চার বছরের জুনিয়ার হবে বোধহয়। না ভুল বললাম, ও আমার সমবয়সী। তবে ও আমার দুই বছরের জুনিয়র হয়ে আছে। আমি যখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়ে ওকে প্রথম দেখি তখন ও ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়েছে মাত্র। ক্লাস এইটে বৃত্তি পেল না বলে তার মায়ের কী দু:খ। তা আমার সাথে দেখা হলেই বলতেন। আর ওর সাথে আমার ইন্টার অ্যাকশনের কথা বলছেন! জাস্ট ফর্মালিটির হাই, হ্যালো- ওসবই। কেন যেন তার উপর আমার এক ধরনের সমীহ কাজ করত। একদিন কথায় কথায় তার পড়ার টেবিলে বসেছিলাম। মুদ্রাদোষে তার খাতা উল্টিয়ে লেখাগুলো দেখতে লাগলাম। তার ঝকঝকে হাতের লেখাগুলো আমাকে আরেকটু দুর্বল করে দিল। যার যেটা নাই সে ই বুঝে তার দরদ। আমার হাতের লেখা নিয়ে আমি সব সময় লজ্জায় পড়তাম। আপা তো অহংকার নিয়ে প্রায়ই বলত, তোর হাতের লেখার চেয়ে আমার হাতের লেখা ঢের ভালো। তন্ময় হয়ে যখন মুক্তোর মত লেখাগুলো পড়তে লাগলাম, ওমনি ছো মেরে খাতাটা হাত থেকে নিতে নিতে বলল, আমার লেখা আপনাদের মত এত সুন্দর না। দেন আমার খাতা দেন। সেদিনই তার সাথে রীতিসিদ্ধ কথার বাইরে আলাপ।

তারপর অনেকদিন হল, তার আর আমার দেখা নেই। কথা প্রসঙ্গে আপার কাছ থেকে জেনেছিলাম, মুন্নী এখন ময়মনসিংহ পলিটেকনিকে পড়ে। ছিপছিপে, লম্বা দেহের শ্যাম বর্ণের এই মেয়েটি কখন কবে মন থেকে একেবারেই মুছে গিয়েছিল তা টের পাই নি। ওর বাবার চাকরি সূত্রে কবেই ওরা নরসিংদীতে ট্রান্সফার হয়েছিল সপরিবারে। স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ার আরেকটা কারণও বোধহয় অই চোখের অন্তরালে চলে যাওয়াটা।

গতকাল হঠাৎ করে স্টেশনে তার সাথে দেখা। আমি তো চিনতেই পারি নি প্রথমে। ও এগিয়ে এসে যখন জিজ্ঞেস করল, কেমন আছেন রাসেল ভাই? প্রশ্নের উত্তর দিতে দিয়ে সেলফোন হতে মুখ উপরে উঠিয়ে দেখি, আরে এ যে মুন্নী! তার কাজলে আঁকা চোখ গুলো কালো চশমার আড়ালেই ঢাকা পড়ে আছে। আমি তার ও চোখজোড়া দেখার কোন চেষ্টা না করেই বললাম, আরে এতদিন পর দেখা। বসুন বসুন। আমি ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে বসে আছি। ও যাবে ময়মনসিংহ। লোকাল ট্রেন ধরবে সে। আর আমি এগারো সিন্দুর। কিছুক্ষণ পরেই ওর বয়ফ্রেন্ড আসল। আমি হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরিচয় দিলাম, আমি রাসেল। মুন্নীর ছেলেবন্ধুটি হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, আমি রায়ান। আমি অনুভব করতে পারছিলা, রায়ানের হাতের ঝাঁকুনি আমার বাহুকেই নয় হৃদয়টাকেও ঝাঁকিয়ে দিল।