আমি প্রতিদিন সকাল ৫.৩০ ঘুম থেকে উঠি। নামায পড়ি, আবীরকে (বড় ছেলে) ঘুম থেকে  উঠাই সকাল ৬ টায়, ওর জন্য নাশ্তা বানায়, ওকে সবকিছু  গুছিয়ে দেই,৬.৩০ এ স্কুলে চলে যায়। তারপর শুরু হয় আমার কাজ। রান্না করা, ঘর মুছা, কাপড় ধোয়া, কত কাজ সংসারে। ০৮.০০ আরীক কে (ছোট ছেলে)  ঘুম থেকে ডেকে তুলি, ওকে গোসল করাই,নাস্তা খাওয়াই, স্কুলে দিয়ে আসি। আমার অফিস ০৯.০০ টা থেকে, সারাদিন অফিসে থাকি,ওরা আসে  ০৪.৩০। তাড়াতাড়ি বাসায় আসি,ওদের খাবার দিই, আবার অফিসে চলে যায়। সন্ধায় অফিস থেকে বের হয়ে ওদের জন্য, দুধ, ফল, আরো যা যা লাগবে তা কিনে বাসায় আসি। বাসায় এসেই বাইরের কাপড় খুলেই আবার কাজে নেমে পড়ি। ওদের হোম ওয়ার্ক দেখা, রাতের খাবার বানানো, কাপড় গুছানো, করতে করতে রাত নয়টা, তারপর রাতের খাবার খেয়ে রাত ১০ টায় ওদেরকে বিছানায় দিয়ে নিজে একটু বিছানায় পিঠ মেলে দেওয়া।
সারাদিন একজন মা, বাবা কত কস্ট করে তার সন্তানের জন্য। নিজে না খেয়ে, নিজে ভাল কাপড় না পড়ে, নিজের জন্য খরচ না করে সব বাচ্চার জন্য করে। অসুখ হলে মা বাবার চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায়।সন্তানের সুখের জন্য বাবা মা কত কষ্টই না করে। আমি জানি বাবা মা হিসাবে এটা আমাদের দায়িত্ত, আমরাই তো ওদের এই পৃথিবীতে এনেছি, তাই ওদের রক্ষনা বেক্ষনের দায়িত্ত আমাদের। এই জন্যই আমার বাবা মা আমাদের জন্য করেছেন,আমরা  আমাদের সন্তানদের জন্য করছি, কস্ট করছি ওদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য।
আর এই সন্তানই যদি বৃদ্ধ বয়সে বাবা মাকে কস্ট দেয়, না খেতে দেয়, বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায় তাহলে কেমন লাগে। আমি এরকম অনেককেই চিনি যারা বাবা মায়ের খোজ খবর নেন না। অনেকে বউ এর কথা শোনেন। খারাপ লাগে আমার সেই সব পুরুষের জন্য ,যারা বউ এর ভয়ে নিজেদের বাবা মায়ের খোজ নেন না। আবার খুব মায়া  হয় ও ওইসব পুরুষের জন্য, হয়তবা সংসার নামক জিনিসটা টিকিয়ে রাখবার জন্য তারা বউ এর কথা শোনে । খারাপ লাগে সেই সব মেয়েদের জন্য, যারা তাদের স্বামীকে এই সব দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখে। মনে হয় এরা কি কোন নৈতিক আর পারিবারিক শিক্ষা পেয়ে আসেনি। এদের বাবা মা এদেরকে কি শিখিয়েছে। আবার এটা ও ঠিক মেয়েদের দোষ দিয়ে লাভ কি, কোন পুরুষ যদি করতে চায় তার বাবা মার জন্য তাহলে কোন বউ এর  কি সাধ্য আছে কিছু  করার।
আবার আমরা যারা মেয়ে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোন মেয়ে যদি চাকরী  করে তাও বাবা মাকে কাছে এনে রাখতে পারেনা। পারেনা ভাই বোনদের  জন্য কিছু কিনতে, চাকরী সে করে কিন্তু সেই টাকা তার হাতে আসেনা। আমি বাংলাদেশে এমন একজনের সঙ্গে কাজ করেছি, সে শুধু আমাদের সঙ্গে কাজ করত, স্বামী ব্যাংক থেকে টাকা তুলত, বেচারী সবগুলো টাকা একটু ছুঁয়ে ও দেখতে পারত না। বাবা মা ভাই বোনের জন্য ও কিছু কিনতে পারতনা। মনের কস্ট মনেই রেখে দিত। কারন কথা বললেই সংসার ভাঙ্গার ভয়।
আমি এত কিছু লিখছি কারন কয়েক  দিন আগেই পাশ হল বাবা মায়ের ভরন পোষণের আইন। এই আইনে বলা হয়েছে,  সন্তান যদি বাবা মার ভরন পোষণে ব্যর্থ হয় তাহলে  ১ লাখ টাকা দিতে হবে, আর না দিতে পারলে ৩ মাস কারাভোগ করতে হবে।
আসলে আমরা বাবা মায়ের প্রতি আমরা আমাদের দায়িত্ত , কর্তব্য ভুলতে বসেছি তাই এই আইন। কথা হচ্ছে  কয়জন বাবা মা চাইবেন সন্তানের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে। আমরা কেন ভুলে যাই একদিন আমরা সবাই বৃদ্ধ হব, আমরা আজ যদি আমাদের বাবা মাকে সম্মান না দেখাই বৃদ্ধ বয়সে তাদের যদি না দেখে রাখি, তাদের যদি ভরন পোষণের ব্যবস্থা না করি তাহলে আমার সন্তান যে একদিন আমার সাথে এটা করবে না তার কি কোন গ্যারান্টি আছে।
আমার তো মনে হয় শুধু  আইন করেই হবেনা, দরকার পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষা। সন্তান যদি সত্যিকার অর্থে সু সন্তান না হয় তবে কোন আইন দিয়ে কি কিছু করা সম্ভব।
তারপরে ও এই আইনকে আমি স্বাগত জানায়। অন্তত কারো না কারো জন্য তো একদিন এই আইন কাজে লাগবে। আসুন আমরা সবাই আমাদের বাবা মাকে সম্মান করি, কাছে গিয়ে থাকতে না পারি ,দিনে একবার ফোনে খোজ নেই, বাবা মাকে নিজের কাছে এনে রাখি,একদিনের জন্য হলে ও  বাইরে খেতে নিয়ে যাই। এতে আপনার একটু ও কমবে  না বরং আজ যে সন্তান আপনার ঘরে সে আপনার থেকে শিখবে, আর এর প্রতিদান একদিন ওই সন্তান আপনাকে ফেরত দেবে।