আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, কথাটা বলতেই গর্বে বুক ফুলে ওঠে। নিজের জীবনের থেকে দেশকে বেশী ভালোবাসতে পারার যে বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব আমার আব্বা দেখিয়েছেন, এতে আমি সত্যিই গর্বিত। সমস্ত প্রশংসা মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি, যিনি আমাকে একজন দেশপ্রেমিক, বীরের সন্তান হিসেবে বাংলাদেশে জন্মাবার সুযোগ দিয়েছেন।

ছেলেবেলায় কিশোরসাহিত্য আর দৈনিক পত্রিকা পড়তাম, বড়ভাইয়া ছিলো পত্রিকা আর বইয়েরপোকা। তার নিয়ে আসা বইগুলোই বারবার পড়তাম। পত্রিকার সাহিত্য পাতায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প, কবিতাগুলি ছিলো আমার জন্যেই! সেই সময়কার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা, নাটক দেখতাম বিটিভি'তে। আবার বিভিন্নরকম ঘটনাদির গল্প শুনতাম মুরুব্বিদের মুখেমুখে। আব্বা ও তার সহযোদ্ধাদের মুখেও লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ শুনেছি অনেকবার। দেশমাতার অতটা দুঃসময়ে আব্বা কতটা দুঃসাহসিকতা দেখিয়েছেন!?
তখন ঠিকঠাক যুদ্ধের ভয়াবহতা বুঝি নি। এখন বুঝি যে ওটা ছিলো যুদ্ধের ময়দান!! শত্রুর একটা বুলেট!! ব্যস, গল্প শেষ!! তখন অতকিছু না বুঝলেও এটা বুঝতাম যে, আমার আব্বা সুপার হিরো! রবিনহুড, সিন্দাবাদ, শক্তিমান, স্পাইডার ম্যান বা তার চাইতেও বেশী শক্তিশালী একজন সুপার হিরো!!!

দিনেরবেলায় যুদ্ধের গল্প শুনতাম আর রাতে ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখতাম-- "মিলিটারিরা আমাকে মারার জন্য পিছু নিয়েছে! পালানোর জন্য প্রাণপণ দৌড়ানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু আমার পা এগুচ্ছে না! যেন আমাকে ধরেই ফেলছে! চিৎকার করছি, কিন্তু কেউই বাঁচাতে আসছে না!" এরকম স্বপ্ন দেখে ভীষণ ভয় পেতাম, বেশিরভাগ সময়ই চিৎকার দিয়ে ঘুম ভেঙ্গে যেতো। একবারতো খাটের সাথে আঘাত পেয়ে মাথাফেটে গিয়েছিলো।

আমার কিশোরমনে মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশপ্রেমের চেতনা এভাবেই প্রবেশ করেছিলো। সেই থেকে পাকিস্তান, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, আলবদর, আল শামস, পিস কমিটি, খানসেনা- এই শব্দগুলির প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মেছে। তখন ভাবতাম ওরা সবাই জঘন্য ভিলেন, আর আমি হিরো! ঠিক আমার আব্বার মতন, সুপার হিরো!! এখনো সেটাই ভাবছি- "যেহেতু আমি হিরো, সেহেতু ঐ ভিলেনদের বিরুদ্ধে আমার যুদ্ধ চলতেই থাকবে।"

প্রিয় বাংলাদেশ____
আজকে যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত পক্ষ-বিপক্ষের দলগুলি রাজাকার বা তাদের পরিবারের লোকজনকে এমপি পদে দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেয়, তখন খুব লজ্জিত হই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ বিলীয়মান!!
আমাদের নেতারা শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্যে নিজের দেশকে কার হাতে তুলে দিচ্ছে? এই দেশের ভবিষ্যৎ আবার তাদের হাতে তুলে দেয়াটা নিজের পায়ে কুড়াল মারবার মতনই অদূরদর্শী ও ভয়ানক সিদ্ধান্ত!!
স্বাধীনতাবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনামূলে আঘাতকারী কুঠারধারীদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার এটাই সময়। মনে রাখতে হবে, যে একবার রাজাকার - সে আজীবন রাজাকার! আর একজন রাজাকারের হাতে এ দেশ, দেশের মানুষ কখনওই নিরাপদ থাকতে পারে না।
আইন প্রণীত হোক এরকম -
" কোন যুদ্ধাপরাধী বা তার পরিবারের কোন সদস্য রাষ্ট্রীয় কোনপ্রকার নেতৃত্বদান করার সুযোগ প্রাপ্ত হইবে না।"
সুনাগরিক, আওয়াজ তুলুন- রাজাকারমুক্ত রাজনৈতিক দল চাই।

প্রিয় নেতৃবৃন্দ ____
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাঁচিয়ে রাখুন, তাহলে মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে থাকবে হাজার বছর। আজকের বাংলাদেশ কারো দান নয়, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছি। বিজয়ের এই মহান মাসে শপথ নিন-

" শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলি নাই, ভুলবো না।।"

।।জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।।
******************************
ইবনে মিজান
০৭ ডিসেম্বর ২০১৮