একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে এক কৌতূহলোদ্দীপক পরিস্থিতি সৃষ্টির নানামুখী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের হঠাৎ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে ‘ছদ্মবেশি শত্রুদের’ ব্যাপারে সতর্ক করতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়লের মতো দৃশ্যপটে হাজির হয়েছেন ড. কামাল হোসেন এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রমুখ। অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতিও কিন্তু এরই মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে চলে যেতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে অন্য কিছু বিষযের মধ্যে প্রাধান্যে এসেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রশিল্পী শহিদুল আলমের গ্রেফতার এবং তার ওপর চালানো প্রচন্ড নির্যাতন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে গত ৫ আগস্ট রাতে ডিবির পরিচয় দিয়ে আলোকচিত্রশিল্পী তার ধানমন্ডির বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়। ‘উস্কানিমূলক মিথ্যা’ প্রচারণার অভিযোগে ৬ আগস্ট পুলিশ তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয়। পুলিশের প্রচন্ড নির্যাতনে গুরুতর আহত অবস্থায় ১২ আগস্ট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেই থেকে শহিদুল আলম বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি যথাযথ চিকিৎসাও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনেরা।
শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন বিশ্বের বিশিষ্টজনেরা। তাদের মধ্যে নোবেল বিজয়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো বিভিন্ন সংগঠন তো রয়েছেই, বিবৃতি দিয়েছেন এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকীও। ব্রিটেনের লেবার পার্টির এমপি হিসেবে ২৭ আগস্ট দেয়া বিবৃতিতে টিউলিপ সিদ্দিকী বলেছেন, বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের আমলে শহিদুল আলমের আটক থাকা ‘খুবই উদ্বেগজনক এবং অবিলম্বে এই পরিস্থিতির ইতি ঘটা উচিত।’ টিউলিপ সিদ্দিকী আরো বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে তার নিজের নাগরিকদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক মানদন্ড মেনে চলতে হবে। আমি আশা করি, ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দফতর বন্ধু প্রতীম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কাছে এ ব্যাপারে দৃঢ় বার্তা পাঠাবে।’
ওদিকে টিউলিপ সিদ্দিকীর দু’দিন আগে, গত ২৫ আগস্ট শহিদুল আলমের মুক্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। এই বিবৃতিতে অমর্ত্য সেন বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য ফটোসাংবাদিকতাসহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বছর ধরেই শহিদুল আলম অসাধারণ দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে যে কাজ করে চলেছেন তা প্রশংসার যোগ্য। তাই রূঢ় আচরণের বদলে তার কাজের প্রশংসা করা উচিত।
উল্লেখ্য, অমর্ত্য সেনেরও আগে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২৬ জন অধ্যাপক ও কর্মকর্তা শহিদুল আলমের মুক্তির দাবি জানিয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে এক যুক্ত বিবৃতি পাঠিয়েছেন। এরও আগে গত ১০ আগস্ট শহিদুল আলমের মুক্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন মার্কিন লেখক ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কি এবং ভারতের লেখক ও মানবাধিকার কর্মী অরুন্ধতি রায়সহ কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কয়েকজন লেখক ও বুদ্ধিজীবী। প্রতিটি বিবৃতিতেই এক সুরে ও ভাষায় বলা হয়েছে, তথ্য উপস্থাপন ও সমালোচনা মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো রাষ্ট্র যদি তার নাগরিককে যা ঘটছে তা বলতে না দেয় এবং বলার কারণে নাগরিকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় তাহলে সে পদক্ষেপ মানুষের মৌলিক অধিকারকে লংঘন করে।
এভাবেই শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে বিশ্বের দেশে দেশে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন বিশিষ্টজনেরা। বিবৃতি দিয়েছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও। সংস্থাটি বলেছে, ভিন্নমত দমন করতে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। নির্বিচার গ্রেফতার বন্ধ করার, ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে আটককৃতদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হলো, ঘটনাপ্রবাহে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নিন্দিত হচ্ছে সরকার। এমন এক অবস্থায় ড. কামাল হোসেন ও বি. চৌধুরীরা অহেতুকভাবেই জামায়াতের বিরুদ্ধে সরকারের তোষণমূলক কথা বলেছেন। উল্লেখ্য সরকার বিএনপি-জামায়াত জোট ভাঙ্গার জন্য হেন কাজ নেই যা করেননি। ফল হয়নি কিছুই। ও ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, জোটের ঐক্য অটুট থাকবে এবং জামায়াতকেও জোটে রাখা হবে সসম্মানে। অবশ্য জামায়াত বিরোধিতার আড়াল নিয়ে অন্য কোনো ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্য থেকে থাকলে সে প্রসঙ্গে এখনই কিছু বলা বাহুল্য হতে পারে।
মন্তব্য (1)