পুলিশ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর জনাব মকবুল আহমাদ ও সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানসহ নয়জন নেতাকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মিয়া গোলাম পারওয়ার, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার আমীর মোহাম্মদ শাহজাহান, সেক্রেটারি নজরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ শাখার আমীর জাফর সাদিকও রয়েছেন। গোয়েন্দা পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, ওই নেতারা গোপন বৈঠকে ‘নাশকতার পরিকল্পনা’ করছিলেন মর্মে খবর পাওয়ার পর সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ উত্তরার ছয় নম্বর সেক্টরের একটি বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং সেখান থেকেই জামায়াত নেতাদের গ্রেফতার করে। জামায়াতের সঙ্গে জড়িত না হলেও বাড়ির মালিক এবং জাতীয় পার্টির কাজী জাফর গ্রুপের নেতা নওশের আলীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত সকলকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে গোয়েন্দা সদর দফতরে নিয়ে যাওয়ার খবর জানা গেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদের কথিত ‘নাশকতার পরিকল্পনা’ করার অভিযোগে গ্রেফতারের খবরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সারাদেশে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াত। বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের শরীক দলগুলো গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে অনতিবিলম্বে নেতাদের মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছে। পুলিশ ও সরকারের পক্ষ থেকে নাশকতার অভিযোগ আনা হলেও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, বিষয়টি মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়। বরং সরকারের জামায়াতবিরোধী সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে পর্যবেক্ষকরা কয়েক দিন আগে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা জামায়াতের সভাপতি নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ ১০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করার তথ্য উল্লেখ করেছেন। এসব নেতাকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কদমতলী থানাধীন একটি বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধেও নাশকতার পরিকল্পনা করার একই অভিযোগ আনা হয়েছে- যদিও ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির করার সময় পুলিশ তাদের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আদালত ১০ জন নেতা-কর্মীকেই ছয় দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে।
প্রথমে ঢাকা মহানগরী শাখার এবং তারপর ১০ দিনেরও কম সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় আমীর, নায়েবে আমীর এবং সেক্রেটারি জেনারেলসহ নয়জন নেতাকে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে সঙ্গত বিভিন্ন কারণেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে চলেছে। বলা হচ্ছে, বর্তমান সরকারের আমলে কোনো পর্যায়েই জামায়াতে ইসলামীকে বাধাহীনভাবে কার্যক্রম চালাতে দেয়া হয়নি। সাবেক আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লাসহ দলের অনেক নেতাকেই একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসীতে ঝুলিয়েছে সরকার। আরেক সাবেক আমীর ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যাপক গোলাম আযমকে বন্দী দশাতেই হাসপাতালে ইন্তিকাল করতে হয়েছে। একযোগে তালা লাগিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দলের সকল অফিস। দেশের কোনো একটি স্থানেই জামায়াতের নেতা-কর্মীরা এমনকি কোনো বৈঠক করার পর্যন্ত সুযোগ পাননি। এখনো পাচ্ছেন না। বিয়ে-শাদীর মতো সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও তাদের মিলিত হতে দেয়া হচ্ছে না।
শুধু তা-ই নয়, জামায়াত এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী, সদস্য এবং সমর্থকরা দেশের কোনো পর্যায়ের নির্বাচনেও অংশ নিতে পারছেন না। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় তাদের প্রচন্ড ধাওয়ার মুখে রাখা হচ্ছে। কাউকে দেখামাত্র গ্রেফতার করছে পুলিশ, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কয়েকটি পর্যন্ত মামলা দায়ের করা হচ্ছে। অনেক নেতা-কর্মীকে বিভিন্ন সময়ে গুমও করা হয়েছে। কারো কারো লাশ পাওয়া গেলেও অনেকেরই এখনো কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এভাবে সব মিলিয়েই জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দেশের শান্তি ও স্বস্তির স্বার্থেই এই রাজনৈতিক জুলুম-নিপীড়নের অবসান ঘটা দরকার। এতে দেশ, সরকার, জনগণ সকলেরই কল্যাণ। আমরা আশা করি, অতীতের ভুল-ভ্রান্তি, বাড়াবাড়ি সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে সরকার, রাজনৈতিক দল, সকলেই গণতন্ত্রের পথে হাঁটবেন।
মন্তব্য (6)