জাতীয় সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে আসন শূন্য হবে-সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের এমন বিষয়ে ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে আপিল ভিাগের দেয়া পর্যবেক্ষণ মানা বাধ্যতামূলক বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।
গতকাল মঙ্গলবার সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ রিটের শুনানিতে এ মন্তব্য করেছেন বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি জে বি এম হাসান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটির এক সপ্তাহ পর এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারি আইনজীবী ড.ইউনুছ আলী আকন্দ। আর সরকার পক্ষে ছিলেন ডেপুটি এটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।
শুনানিতে আদালত বলেন ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপিল বিভাগের দেয়া ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুসরণ করতে বাধ্য হাইকোর্ট। তবে রাষ্ট্রপক্ষ (সরকার) বলেছে এ নিয়ে বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের মতবিরোধ বাড়বে, এমনকি ঝুঁকিতে পড়বে যাবে জাতীয় সংসদ।
সরকার পক্ষ রিটের বিরোধীতা করে। এসময় আদালত রিট আবেদনে ভুল থাকায় আবেদন ঠিক করে দাখিল করার নির্দেশ দেন।
গত ১৭ এপ্রিল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ল এই রিট আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোটের আইনজীবী ড.ইউনুছ আলী আকন্দ। রিট আবেদনে জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সচিব ও আইন সচিবকে বিবাদী করা হয়। এছাড়া ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারির আবেদন করা হয়। 
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের আপিলের রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেছেন, ‘এই অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের বেদনাহত এবং অসংগতভাবে তাদের অধিকারকে শৃঙ্খলিত করেছে। তাই সংসদের কোনো ইস্যুতেই তারা দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে পারেন না। সংবিধানের ৯৫(২) গ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো আইন না করা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে নির্বাহী বিভাগকে একটি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। আর ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব পড়বে। তিনি লিখেছেন, কোনো সন্দেহ নেই, ৭০ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য হলো সরকারের স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। দলের সদস্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা।’
প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন রাখেন, ‘সংসদ সদস্যদের যদি সন্দেহের চোখেই দেখা হয়, তাহলে তাদের কী করে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের মতো দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজে ন্যস্ত করা যায়। তাই এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যের চেতনা হলো সংসদের নির্বাচিত সদস্যরা তাদের মনোনীত করা দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখবেন। আসলে তারা তাদের দলের উচ্চপর্যায়ের হাতে জিম্মি। তাই ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছেন, তার মধ্যে আমরা কোনো বৈকল্য দেখি না। সংসদের হাতে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হলে বিচারকেরা দলের হাইকমান্ডের অনুকম্পানির্ভর হয়ে পড়বেন।’
রিট করার পর আইনজীবী ড.ইউনুছ আলী আকন্দ বলেছিলেন, একজন সংসদ সদস্য জনগণের প্রতিনিধি। কিন্তু সংসদে তিনি তার দলের বাইরে নিজস্ব মত দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে এই ৭০ অনুচ্ছেদ। কারণ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে তার সংসদ সদস্য পদ থাকছে না। ফলে এটি অগণতান্ত্রিক এবং সংবিধানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’