www.tarunyo.com

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

গোপলার কথা - ৪৫

হীনমন্যতা
---------

আমি বরাবর হীনমন্যতায় ভুগি। আমি এটা পারার উপযুক্ত নই। আমার চেয়ে আরো ভাল পারে এ রকম অনেকেই আছে। আমি হাত লাগালে তারা আমাকে ডিঙিয়ে চলে যাবে। তাই আমি সেই কাজে হাত লাগালেও একটু একটু ভয়ে ভয়ে কাজটা করি। কিছুটা আড়াল করে করি। না জানিয়ে নিজের মত ভেবে করি।
তাতে ভালো হল কি মন্দ হল, দোষ হল নাকি গুণ, পাপ নাকি পুণ্য, আসল নাকি নকল এসব মনের মধ্যে নিরন্তর ঘুরপাক খেতে থাকে। তারপর নিজেকে নিজে যাচাই করি। তারপর আবার সেই কাজে ব্রতী হই অথবা আর কাজটা করি না অথবা আরো বেশি মনোযোগে কাজটা করি। আর এগিয়ে যাই অথবা স্থিতবস্থা অবলম্বন করি কিংবা এগোই না।
আর যদি করেও ফেলি তাতে একটু আধটু প্রশংসা পেলে ভালই লাগে। আর প্রশংসা না পেলেও কিছু ভাবি না।
তবে প্রশংসা পাওয়া উচিত ছিল তাও পেলাম না। নিন্দা করার মত ছিল না তাও নিন্দা হল। তাহলে যে খারাপ লাগা জড়িয়ে ধরে তাকে আর কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আমি তাই কিছুটা হলেও হীনমন্যতায় ভুগি। সবার মত আমার এচিভ সহজে হয় না। অনেক পরে পেতে পেতে হারিয়ে যায়। অথবা পাওয়া আর এনজয়ফুল হয় না।
এই এখন যেমন নিজস্ব জীবিকার মাঝে সময় সুযোগে ভাষা ভালোবেসে একটু আধটু সাহিত্য চর্চা করি। গল্প লিখি, কবিতা লেখার চেষ্টা করি, প্রবন্ধ লিখি, নিজের কথা লিখি, যা মনে আসে তাই লিখি তাতে দেখেছি আমার চেয়ে অনেকেই ভাল লেখে, আরও অনেক ভাল ভাল লেখা আছে।
তাও আমি লিখি। নিজেকে নিজে যাচাই করি। হ্যাঁ, ভালই তো পারি?
কিন্তু ভাল লেখায় তেমন প্রশংসা পেলাম না। আর খুব খারাপ ছিল না তাও নিন্দা আসছে। তাই সেই হীনমন্যতার কথা ভেবে মনের মধ্যে আলাদা কোন ছাপ পড়ে না। এবং কখনই আমি আপনার লেখা যোগ্যতার সাথে কম্পিটিশন করি না, করব না। আমি শুধু আমার মত লিখি, লিখব।
প্রথম যৌবনে কোন সুন্দরী মেয়ের সামনে (সে আমার সহপাঠী বা পড়শী বা অন্য কেউ) আমার এই হীনমন্যতা আমাকে পিছিয়ে রাখত। ভাবতাম আমার চেয়ে আরো হ্যাণ্ডসাম বুদ্ধিমান প্রয়োগশীল আছে তাদের কাছে আমি কিছুই না। আবার আমার মনে সেই সুন্দরী সম্পর্কে আমার মনের মধ্যে কুচকুচ হলেও দেখেছি আমাকে তারাও কেমন পাশ কাটিয়ে যাওয়া নজরে দেখত (অবশ্য এ সবই আমার মনের কথা)। ফলে প্রেমে পড়তে পারি নি বা তাদেরকে প্রেমে ফেলতে পারে নি আমার এই হীনমন্যতা।
আমার পাশের জন কি সুন্দর মন ভোলানো গুজগুজ ফুসফুস করে যাচ্ছে যাচ্ছে। মেয়েটি শুনছে অথবা ছেলেটি আত্মহারা হয়ে যাচ্ছে। তারা যে আমার চেয়ে দারুণ কিছু (রূপে বা গুণে) তা কিন্তু নয়। তবু তাদের মধ্যে বেশ একটা যৌবনের ঝাঁপিয়ে পড়া দেখেছি। যৌবনের প্রাণবন্ত হতে দেখেছি। আর আমি? এই হীনমন্যতায় লুকিয়ে স্বপ্নে দেখেছি, নিজের মনে পাশে পাওয়ার চেষ্টা করেছি। দু এক জায়গায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। তাতে দেখেছি অন্য এক ওভারস্মার্ট জাঁকিয়ে বসে আছে।
ফলে অধরা প্রেম প্রথম যৌবন গড়িয়ে দিয়েছে এই হীনমন্যতা। তবে মন খারাপ হত না। কেন পারি নি এমন উদ্ভট ভাবনাও আসে নি। কেন না আমার হীনমন্যতা। আমি তো অতটা যোগ্য নই। এ ভাবনা তো ছিল।
কিন্তু তারপরের সময় পেরিয়ে কর্মক্ষেত্র এবং বিয়ে ও প্রেম। সব তো আমার মনের মত। এখনও। প্রেমও বেশ গতিশীল। সেদিনের সেই সব রোমিও এখনও পাল্টে পাল্টে প্রেমের বিচিত্র খুঁজছে। সেদিনের সেই সুন্দরীর পেছন যাত্রা আবার সুন্দরী খুঁজছে। সন্তুষ্টির পরিধি বাড়তে বাড়তে বিড়ম্বনার আকার নিচ্ছে। অনেকেই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে ফেলেছে নিজস্ব প্রেম সংস্কার।
আমার হীনমন্যতায় যা মিলেছে তাতেই আমি পূর্ণ সন্তুষ্ট। পরিপূর্ণ প্রেমের দিশায় এককেই নিবিষ্ট। তাহলে ওভার স্মার্টনেশ, দেখানোর ভাবনা, ভুজুংভাজুং, ফিসফাস কেন দরকার? কিছু হীনমন্যতা নিজেকেই বাঁচিয়ে রাখার কিছু মন্ত্র তো বটে।
যৌবনের প্রারম্ভে বিপরীত লিঙ্গের হাতছানির সাথে সাথে গুরুত্বপূর্ণ অন্য এক অধ্যায় থাকে তা হল অধ্যয়ন। এই টিন এজ সময়ে যৌবনের
মধুর হাতছানি পেরিয়ে পড়াশুনায় মনোনিবেশ বেশ কঠিন। আবার গুরুত্বপূর্ণ পাঠ এই সময়। আমার এই প্রথম যৌবন হাতছানিতে আমার হীনমন্যতা আমাকে পড়ার দিকে টেনে নিয়ে গেছে। বড় হতে হবে এত বড় ভাবনা হয়তো ভাবি নি, ঠিক কথা।
কিন্তু আমার ওই অপরূপার যোগ্য নই, স্কুলের সেরা সুন্দরী আমার সঙ্গে কথা বললে আমার মনে হত ' আমার লগে কথা কইছে' এই আমার বড় পাওয়া। ওর জন্য কোন না কোন উত্তমকুমার তো আছে।
অথবা আমার হীনমন্য স্বভাবের জন্য হয়তো সুন্দরী তো দূরের কথা কেউই আমাকে প্রথম যৌবন কদম ফুল দেয় নি। ফলে যে একটু আধটু যৌবন বিচ্যুতি আমার অধ্যয়নে বিঘ্ন ঘটিয়েছে তাতে আমার নিজের পায়ে দাঁড়াতে অসুবিধা হয় নি। যদিও এ দাঁড়ানো একেবারেই সাধারণ। বলা না বলার মত।
তাই হীনমন্যতা কিছুটা হলেও জীবনপথ। হয়তো হ্যাঁ আমার ক্ষেত্রে। হয়তো না তোমার ক্ষেত্রে।
আজকাল গ্রামের বেশিরভাগ গরীব ছেলে মেয়েরা এই কারণে হয়তো পড়াশুনায় ভালো রেজাল্ট করছে। কেন না তারা বাবা মা পাড়া প্রতিবেশীর কষ্টের সাথে নিজেকে মেলায়। এই কষ্ট থেকে নিজেকে রেহাই করার চেষ্টা করে। রাস্তা দেখতে পায় একটাই। পড়াশুনা।
ফলে যেটুকু প্রেম ফষ্টি নষ্টির সুযোগ পায় তা তাদের পড়ায় খু একটা বিঘ্ন ঘটায় না। এখানেও সেই হীনমন্যতা তাদেরকে পথ দেখায়। আমার মত। এরা পরবর্তীতেও খুব একটা প্রেমে সফল হয় না। দেখাশুনা করে বিয়ে করে।
আবার প্রথম যৌবনের স্রোতে (টিন এজে) সমর্পিত আবার অধ্যয়নেও আদর্শ। এমন হয়তো অনেকেই আছে। তাদের দৃঢ় প্রত্যয়কে হাজার সেলাম। তারা এককদর্শী। আমার মত হীনমন্য নয়।
কলেজ লাইফে দু এক চুমুক মুখে দিয়ে দেখেছি তারপর আর ও পথ মাড়াই নি। কেন না আমার মত এই তো সাধারণ ছেলে মদ খাওয়ার মত বিশাল কেউকেটা হতে কি পারব? কিংবা হওয়া কি উচিত? বউকে লুকিয়ে ছেলের চোখের আড়ালে কিংবা ঘরের দরজা বন্ধ করে পার্টি মুডে থাকার মত থাকতে আমার ধৃষ্টতা আমাকে সায় দেয় না। এই রকম হীনমন্য ভাবনায় আমি আর মদ স্পর্শ করতে পারি নি। তাছাড়া আমার দেখাদেখি আমার প্রজন্ম যাতে না মদ খাওয়া শেখে সেদিকে খেয়াল রেখে আমি এভাবেই বড় হয়েছি। প্রজন্মের ভাবনায় তা হয়তো সফল নাও হতে পারে। কিন্তু আমি আমার নিজের কাছে হীনমন্য সংস্কারে দৃঢ়চেতা হয়ে থাকব এও বা কম কিসে?
মদ খাওয়া ছাড়াও সেলিব্রেশন করা যায়। এ রকম ভাবনা আমার ক্ষেত্রে, আপনার ক্ষেত্রে অন্য হতেই পারে। কেন না আপনি তো আর আমার মত হীনমন্য নন। তবে যাই হোক, মদ নিশ্চয় জীবনের অপরিহার্য নয়।
ঠিক একই রকমভাবে অন্যান্য নেশা। যেমন সিগারেট পান বিড়ি গুটখা
খৈনি ইত্যাদি কোন কিছুর ধারেকাছে আমি নেই। কেন না রাস্তা দিয়ে লম্বা এক খানা সিগারেট টানতে টানতে তোমার/আপনার সামনে দিয়ে চলে যাওয়ার মত লাট সাহেব আমি নই। হতেও পারব না। গুটখা মুখের মধ্যে কচর কচর করে চিবোতে চিবোতে তোমার/আপনার সাথে কথা বলার মত আমার অতটা বুকের পাটা নেই। ফলে এসব থেকে দূরে থেকে গেছি।
কিংবা আমার প্রজন্ম এমন করলে আমার মোটেই ভাল লাগবে না। আমি যেমন লাট সাহেবের মত সিগারেট ফুকতে ফুকতে চলে যেতে পারব না তেমনি আমার প্রজন্ম আমার/আমাদের সামনে দিয়ে গেলে আমারও ভাল লাগবে না। এই ভাবনাতে আমি আমার জীবন এই হীনমন্য করে তুলেছি।
অনেকদিন আগে আমার তখন টিন এজ শেষের পথে। আমি বাস ধরার জন্য বড় রাস্তায় (বাসস্ট্যাণ্ড বলা যেতে পারে) দাঁড়িয়ে আছি। একটা দূরপাল্লার বাস এল। তাতে অতীব সুন্দরী এক জানলার ধারে বসে। আমি নির্বাক দৃষ্টি প্রথম ঝলকে মুগ্ধ হয়ে যাই। তাই দেখতেই থাকি, দেখতেই থাকি। কিন্তু মেয়েটি আমার এ দেখা বুঝতে পেরে হাল্কা মুখ বেঁকিয়ে তাচ্ছিল্য দিয়েছিল। বাস দাঁড়িয়েছিল প্রায় দু মিনিট। সেই অবজ্ঞা আমি হৃদয়ে রেখেছি।
আমি তো আর আমার চেহারা আর সুন্দর করতে পারব না, টাক মাথায় চুল গজাতে পারব না, বেঁটে হয়ে লম্বা হতে পারব না, দেহ পেশি বহুল করতে পারব না, হিরোদের মত লুকও গড়ে তুলতে পারব না। তাই তাচ্ছিল্য সাথে করেই বয়ে বেড়াতে হবে। কিছুজনের না ভালো লাগাকে মেনে নিতে হবে। এইটুকু মেনে নেওয়া আমার কাছে অনেক সহজ। আমার কোন অসুবিধাই নেই। কেন না আমি যে হীনমন্যতায় ভুগি।
আমিও চাইব নিজস্ব বোধ ভাবনায় প্রত্যেকে উজ্জীবিত হোক। নিজেকে নিজে নির্মাণ করুক।
বিষয়শ্রেণী: অভিজ্ঞতা
ব্লগটি ৬৭ বার পঠিত হয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ১১/১০/২০১৭

মন্তব্য যোগ করুন

এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।

Use the following form to leave your comment on this post.

মন্তব্যসমূহ

  • রায়হান আজিজ ১৫/১০/২০১৭
    একদিন সুদিন আসবে। একদিন সবার ভাললাগাকে সবার ভাল লাগবে।
  • ভালো লাগ ল
  • আজাদ আলী ১১/১০/২০১৭
    Valo
 
Quantcast