আকাশ অনেকটা মুক্ত বৃষ্টি ভেজা প্রকৃতি। শিশির পথ ধরে হাটছে আর মনে মনে কি ভাবছে এমন সময় হঠাৎ করে একটা বাস দ্রুত গতিতে চলে গেল। শিশির তৎখনাত বুকে হাত দিয়ে যেন হায় ছেড়ে বাঁচে)
শিশির ঃ এবারের মত বেঁচে গেলাম (স্বগত)
(কিন্তু রাস্তায় জমে থাকা নোংরা পানি ছিটকে এসে তার পরিস্কার জামা কাপড় নষ্ট করে দিলো। কলেজে যাবে ভেবে পরিপাটি করে বাসা থেকে বেরিয়েছে কিন্ত এ কি হলো। মেজাজটা বিগড়ে গেল বাসটির দিকে চেয়ে রইলো। ইচ্ছে করছিলো বিচ্ছিরি ভাষায় গালি দেয় কিন্তু কে শোনে কার কথা । শিশির লাফ দিয়ে উঠে মাটির বুকে লাথি মেরে রাগটাকে নিয়ন্ত্রন করলো ।)
শিশির ঃ এই অবস্থায় যদি কনা এসে দেখে ফেলে তাহলে কি ভাববে । (স্বগত)
(শিশির সার্টে লেগে থাকা কাঁদা বাষ্ট্যান্ডের পাশে থাকা টিবওয়েল গেল ধুতে, এমন সময় দূর থেকেই দেখতে পেলো কণা আর শিলা আসছে। শিশির কণার দিকে অবাক নয়নে চেয়ে রয়)
শিশির ঃ কণা আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। (স্বগত)
(পরনে হালকা নেভি ব্লু কামিজ, খোপায় ফুল, হাতে এক গুচ্ছো চুড়ি, কানে একটা সাধারণ পান পাতা দুল, অধরে হালকা গোলাপী লিপিসটিক, চোখে কাজলের টান, ললাটে ছো- একটা কালো টিপ, )
(বাষ্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে উঠবে বলে কণা আর শিলা টান পায়ে হেটে আসতে লাগলো। বাস্ট্যান্ডে পৌছাতে না পৌছাতে বাসটি ততখনে ছেড়ে দিল। জোরে আসতে গিয়ে শিলা অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছে।)
শিলা ঃ এতো জোরে আসার কিই বা দরকার ছিল ।
কণা ঃ আমি আবার কি করলাম ।
শিলা ঃ কি করলাম মানে ? ঐ দেখ সেই ছেলেটি টিউবয়েলের পাশে দাঁড়িয়ে। যে প্রায় তোর
দিকে অপলক নয়নে চেয়ে রয়।
কণা ঃ তোর মায়া লাগছে বুঝি, ঝুলে পড়না ?
শিলা ঃ তা হলে তো বেশ ভাল হতো (স্বগত) তুই যায় বলিসনা কেনো। ছেলেটা দেখতে তো
বেশ হিরো হিরো ভাব।
কণা ঃ হিরো না ছ্যায়, দ্যাখ কেমন পাগলের মত চেয়ে আছে।
শিলা ঃ কণা দেখ, ছেলেটা এই দিকে আসছে মনে হয় আমাদের কিছু বলতে চায়।
কণা ঃ তোর আবার এই একটা বদ অভ্যাস। চেনা নাই জানা নাই তার সাথে গায়ে পড়ে কথা
বলা। তোর যা ইচ্ছা তাই কর, আমি চললাম ।
(বাসে প্রচন্ড ভিড় সীট তো পাওয়াই যাবেনা তার উপর পা রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। কণা আর শিলা ঠেলে গুজে উঠে পড়লো। সাথে শিশির ও উঠে পড়লো । কণা শিশিরকে দেখে কেমন যেন লজ্জ্বা বোধ করছে। শিশির কণার দিকে তাকাচ্ছে, কণা শিশিরের দিকে ওরকম ভাবে না তাকালেও একটু একটু তাকাচ্ছে। চোখে চোখ পড়লে কণা লজ্জ্বাই মুখ লুকাচ্ছে। ইতি মধ্যে বাসটি কলেজ গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো । বাস থেকে নেমে সবাই কলেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কলেজ গেটের কিছু দূর থাকতেয় )
শিশির ঃ এই ( কণা ও শিলা উদ্দেশ্যে ডাক দিলো।)
(শিশিরের ডাকে কণা সাড়া দিল না। শিলা লক্ষ্য করে থামল এবং কণাকে থামতে বললো।
কণা ঃ এই (রাগান্বিত স্বরে ) তুই যাবি নাকি আমি যাব ।
শিলা ঃ থামনা কি বলে শুনি ।
কণা ঃ আমার শোনার দরকার নাই। পারলে তুই শুনগে আমি চললাম ।
শিলা ঃ কিছু বলবেন ।
শিশির ঃ কিছু মনে করবে নাতো।
শিলা ঃ না নির্দিধায় বলতে পারেন।
শিশির ঃ যেদিন প্রথম আমি কণাকে দেখি, সেদিন থেকেই কণাকে আমার ভিষণ ভাবে ভাল
লাগে। ওকে এখন আমি ভিষণ ভাবে ভালবেসে ফেলেছি। কিন্তু সরাসরি যে ওকে বলবো।
সে রকম কোন সুযোগ আমি পাইনি ।
(শিশিরের মুখে কণার কথা শুনার পর শিলা মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল ভেবেছিল সে তাকে )
শিশির ঃ জানো শিলা, এখন আমি সারাক্ষণ কণাকে নিয়ে ভাবি।
(শিশির শিলার হাতটি খপ করে ধরে) তুমি একটু আমার হয়ে কণাকে বুঝিয়ে বলবে।
শিলা ঃ দেখেন শিশির ভাইয়া, কণা আবার একটু অন্য প্রকৃতির মেয়ে। সে এমন কথা শুনলে
আমার উপর রেগে যাবে। আমি ওকে এ সব কথা বলতে পারবো না।
শিশির ঃ দ্যাখো শিলা, আমার জীবনে কোন কিছুর অভাব নেই আমি শুধু কণার ভালোবাসা
পাবার জন্য তোমাকে অনুরোধ করছি। তুমি একটু আমার হয়ে কাজটা করে দাও আমি
তোমার কাছে সারা জীবন কৃতঞ্চ থাকবো।
শিলা ঃ ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করবো। এখন আমি আসি ( তাই বলে শিলা চলে গলে)
শিশির ঃ তুমি একটু বুঝিয়ে বলো।
শিলা ঃ আচ্ছা ।
দৃশ্য ঃ ২/দুই
(কণা কলেজ ক্যাম্পাস এর সামনে পুকুর পাড়ে বকুল গাছের নিচে বসে ফাল্গুনী মূখোপাধ্যায় এর শাপ মোচন গল্প টি পড়ছে)
শিলা ঃ আরে তুই এখানে! আর আমি তোকে সারা মুল্লুক খুঁজে হয়রান।
(কণা শিলার উপর রাগে ফুলছে)
কণা ঃ এতখনে বুঝি ওর সাথে তোর কথা বলা শেষ হল।
শিলা ঃ তুই জাই বলিস না ক্যানো, ছেলেটা কিন্তু খুব ভাল, দেখতে শুনতেও বেশ।
কণা ঃ তাই ! তবে তুই ওর প্রেমে ঝুলে পড়লেই পাড়িস।
শিলা ঃ সে ভাগ্য কি আমার আছে, শিশির ভাইয়া তো তোকে ভালবাসে।
কণা ঃ দ্যাখ শিলা আমার সামনে তুই ফাজলামী করবিনা ।
শিলা ঃ সত্যি কণা, শিশির ভাইয়া তোকে ভালবাসে। আর আমার কাছে তোর সম্পর্কে যত কথা
বলল, আমার মনে হয় না তোকে ছাড়া আর অন্য কোন মেয়েকে।
কণা ঃ শোন শিলা ওকে বলে দিস আমার দ্বারা ভালবাসা টালবাসা হবে না । ও যেন আমার
পিছে না ঘুরে। আর পিছে যদি ঘুর ঘুর করে তাহলে আমি কিন্তু ওকে অপমান করবো।
শিলা ঃ মন বলে কি তোর কিছু নাই ।
কণা ঃ দ্যাখ শিলা, ও সব কিছু জানি না। আমি শুধু জানি পড়াশুনা করে আমাকে ভালো
রেজাল্ট করতে হবে। বাবা-মা আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। আর আমি ওরকম
কোন ছেলেকে নিয়ে ভাবিনা।
শিলা ঃ আচ্ছা কণা আজ হোক কাল হোক তুই কোন না কোন একটা ছেলেকে জীবন সঙ্গী করে
জীবন যাপন করবি। তাই তুই আগে থেকে যদি শিশির ভাইকে ....।
কণা ঃ দ্যাখ শিলা তুই কিন্তু ওর হয়ে আমার কাছে উকালতি করছিস। আমি চাইনা তুই ওর
হয়ে আমার কাছে উকালতি কর।
শিলা ঃ আচ্ছা কণা, তোকে যদি শিশির ভাই রাস্তায় জ্বালাতন করে। তখন ?
কণা ঃ দ্যাখ, তোকে এই নিয়ে ভাবতে হবেনা । যা করার আমি করবো।
দৃশ্য ঃ ৩/তিন
(শিশির কলেজ গেটের সামনে কণা ও শিলার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে পায়চারি করছে। অনেক আগেই কলেজ ছুটি হয়েছে। এক এক করে সবাই চলে যাচ্ছে। সবার পিছনে কণা ও শিলা। চোখ পরলো শিশিরের দিকে। শিশিরকে দেখে তো কণার রাগ মাথায় চড়ে গেল। মাথা নিচু করে কলেজ থেকে বের হয়ে গেটের সামনেই এক পাসে বাসের অপেক্ষায় এসে দাঁড়ালো। বাসের অপেক্ষা আর ঘড়ির দিকে তাকানো কিছুক্ষন পর বাস এসে থামলো। সবাই যে যে ভবে পারে উঠে বসলো শিশির ও বাসে উঠে পড়লো। বাস সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাসের কন্টাকটর ভাড়া চাইতেই শিশির তিন জনের ভাড়া বের করে দিতে উৎদত হলে কণা কন্টাকটরকে নিতে বারণ করল। শিশির লজ্জ্বা বোধ করলো শুধু নিজের ভাড়াটা দিয়ে দিল। ততক্ষনে বাসটি তাদের গন্তব্যে এসে পৌছেচে। বাস থেকে নেমে কিছু দুর যেয়ে শিশির কণা আর শিলাকে উদ্দেশ্য করে ডাকলো। কিন্ত ওরা শুনে না শোনার ভান করে হাটতে লাগলো। শিশির পিছন পিছন)
শিশির ঃ কণা তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। আমি জানি না আমার কথার কতটুকু মূল্য
দেবে। কণা অনেক দিন আগে তোমাকে দেখেছিলাম কোন শিশির স্নাত সদ্য সকাল
বেলাই। সে দিন তোমার মায়াবী চোখের চাহনী আমাকে পাগল করে। মনে জাগে
ভালবাসা। তখন মন উদাসী হয়ে বাসরী বাজালো। তোমাকে দেখে মনে হলো কোন
রসিক নাগর তোমার প্রেম সাগরে ডুব দেয়নী। আর মনে হলো ভাটিয়ালী গেয়ে তোমার
ঘুমন্ত মনটাকে জাগিয়ে সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস নিই কিন্তু সেদিন আমার সেই সুযোগ হয়নি। কণা
আজ আমি তোমাকে বড় বেশি ভালবেসে ফেলেছি। জানিনা তুমি আমার ভালবাসাকে
গ্রহণ করবে কিনা । তবে আমি তোমাকে ভালবাসি।
কণা ঃ দেখেন আপনি আর আমাকে এভাবে রাস্তার মধ্যে জ্বালাতন করবেন না। এর পরও যদি
আসেন আমি কিন্তু আপনাকে অপমান করতে বাধ্য হব।
শিশির ঃ কণা তোমাকে আমার বড় ভাললাগে যেমন ভাললাগে নির্জন আকাশের পূর্ণিমার চাঁদ,
ফুলে গন্ধ পাওয়া দক্ষিণা বাতাস, শাপলা, শিমুল পলাশের লাল, শান্ত শুভ্র পবিত্র রজনী
গন্ধা, সন্ধ্যা তারা এবং শ্রাবণের ধারা। তার চেয়ে তোমাকে বেশি ভাললাগে। কণা
তোমাকে আমি ভিষণ ভালোবাসি যেমন ভালবাসি মেঘ মুক্ত নীল আকাশ, সুমদ্রের
উত্তাল তরঙ্গ, সবুজের সমাহারে বসা প্রজাপ্রতি এবং বাগানে ফোঁটা হাজারো গোলাপ তার
চেয়ে আমি তোমাকে বেশি ভালবাসি । কণা গোলাপ দেখলে পাগলে ও হাত বাড়ায়।
তাকে স্পর্শ করে আমি বাড়ালে দোষ কি? কণা গোলাপের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ভ্রমর যদি
তার কাছে আসে মধু সংগ্রহ করতে তাহলে দোষকি ভ্রমরের না ফুটন্ত গোলাপের। কণা
আমি তোমাকে বড় বেশি ভালবাসি। তোমাকে না পেলে হয়তো শেষ হয়ে যাব। আমার
ভালবাসা তুমি প্রতাখ্যান করো না।
কণা ঃ আপনি শেষ হয়ে যান, আর মরে যান, তাতে আমার কিছু যায় আসবে না।
শিশির ঃ কণা জোর করে সব পাওয়া যায় কিন্তু কারো ভালবাসা পাওয়া যায় না। ভালবাসা
বিধাতার অমূল্য দান। ভালবাসা স্বর্গ থেকে আসে। তাই তা জোর করে পাওয়া যায় না।
যদি পাওয়া যেত, তবে আমি তোমার মনটাকে অনেক আগেই জোর করে নিয়ে নিতাম ।
কণা আমি তোমাকে কতটুকু ভালবাসি তা আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না। আমি
জানি না, আমি তোমাকে যতটা ভালবাসি কেউ তোমাকে আমার চাইতে বেশি
ভালবাসতে পারবে কিনা।। কণা আজ তুমি আমাকে প্রতাখ্যান করছো। হয়তো এর ফল
তুমি একদিন বুঝবে, সেদিন আমাকে মনে করে খুজবে। সেদিন হয়তো আমি থাকবো না
তোমার কারণে এই সুন্দর ধরণরি বুক থেকে হারিয়ে যাব। সেদিন তুমি আমাকে মনে
করে চোখের জল বিসর্জন দেবে আর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলবে। আমি জানি কোন মেয়েকে
যদি সরাসরি ভালবাসার কথা বলা যায় তাহলে সে লজ্জ্বায় কোন কিছু বলতে পারে না।
তাই তুমি ভেবে দেখ প্রতীক্ষায় রইলাম ।
(এই বলে স্বপন পিছনে দিকে ব্যাক করলো)
শিলা ঃ দেখ কণা, শিশির ভাইয়া কিন্তু তোকে সত্যিই ভালবাসে। আর শিশির ভাইয়া দেখতে
শুনতে খারাপ না।
কণা ঃ ছেলেরা ভ্রমরের জাত। যার কাছে মধু পায় তার কাছে ছুটে যায়। মধু খাওয়া শেষ হলে
উড়ে যায় অন্যখানে নূতন ফুলের সন্ধানে। যখন ওরা কোন মেয়ের প্রেমে পড়ে তখন
তারা মেয়েদেরকে মন ভোলানো নানান কথা বার্তা শুনায় বুঝলি?
শিলা ঃ তুই যায় বলিস না কেন শিশির ভাইকে সেরকম বলে মনে হয় না। আসলে তোকে ভিষণ
ভাবে ভালবাসে।
কণা ঃ ওর প্রতি যে তোর দরদ উতলে পড়ছে। যদি তাই হয়, তুই ওকে ভালবাসলেই পারিস ।
শিলা ঃ যতি তাই হতো। তাহলে আমি শিশির ভাইকে ওরকম ফিরিয়ে দিতামনা। তার প্রেম
সাগরে ডুবে যেতাম ।
কণা ঃ তাই নাকি ?
শিলা ঃ হিয়ালি করিসনা কণা, একটু ভেবে দেখ তোর জন্য একটি ছেলে দিন দিন খারাপের
দিকে যাবে । আর তুই ।
কণা ঃ তাতে আমার কি ?
(এই বলে দু-জন দু-জনার বাড়ির দিকে চলে গেল। যাবার সময়)
শিলা ঃ কণা একটু ভাল করে ভেবে দেখ । শিশির ভাই তোকে কিন্তু খুব ভালবাসে ।
দৃশ্য ঃ ৪/চার
(শিশির ঘরে শুয়ে শুয়ে কণার কথা ভাবছে এমন সময় স্নেহময়ী মা রুমে প্রবেশ করলো ।)
শিশিরের মা ঃ এই অবেলা শুয়ে আছিস যে বাবা। শরীর খারাপ করেছে নাকি।
শিশির ঃ না মা আমার কিছু হয়নি, এমনিতেই শুয়ে আছি ।
শিশিরের মা ঃ না তোর যে কিছু একটা হয়েছে তা তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। কয়দিন যাবৎ
দেখছি তুই কি যেন একটা ভাবিস। আমাকে বল বাবা, তোর কি হয়েছে আমার কাছে
লুকোচ্ছিস কেন।
শিশির ঃ আমার কিছু হয়-নি মা তুমি অযথা চিন্তা করছো।
শিশিরের মা ঃ না হলে ভাল ।
শিশির ঃ তুমি এখন যাওতো ।
শিশিরের মা ঃ ঠিক আছে বাবা ঠিক আছে।
(মা রুম থেকে চলে গেল)
দৃশ্য ঃ ৫/পাঁচ
(গ্রামের মোড়ে পাকুড় গাছের নিচে অনুপ, রুপম, রহিত বসে আ-া দিচ্ছে। এমন সময় শিশিরে প্রবেশাগমন)
অনুপ ঃ কিরে শিশির আজ কদিন ধরে যে তোর কোন টিকিই মিলছেনা?
শিশির ঃ আরে, মন খুব একটা ভাল নেই ।
রুপম ঃ ক্যান মনের আবার কি হলো।
শিশির ঃ কণা কে প্রেমের অফার দিয়েছিলাম। কিন্তু কণা আমার ভালবাসাকে তুচ্ছমূলে নিয়ে তা
রিফিউজ করেছে।
অনুপ ঃ তাই নাকি ?
রুপম ঃ আরে ওটা কোন ব্যাপার না। মেয়েরা প্রথম প্রথম ওরকম করেই । দেখবি পরে সব ঠিক
হয়ে গেছে।
রহিত ঃ আরে আমার বন্ধুটা দেখতে শুনতেও তো খারাপ না । যে কণার ভালবাসা পাবেনা।
অনুপ ঃ তাইতো ভালবাসবেনা মানে ?
রুপম ঃ ভালবাসতেই হবে।
(এই বলে সবাই একসাথে হেঁসে উঠলো।)
দৃশ্য ঃ ৬/ছয় (রাত)
(শান্ত প্রকৃতি নিঝুম রাত্রি। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঝিঁঝিঁ পোকার কান ঝাঝানো ডাক। এমন সময় শিশির বাড়ি ফিরলো। দরজা নক করতেই কাজের বুয়া মালেকা খুলে দিল। দেয়ালে টানানো ঘড়ির আপন নিয়মে টিক টিক করে চলেছে। ব- খিদে পেয়েছে। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে উপর ঢাকা খাবার খেতে বসলো। ভেবেছে তৃপ্ত সহকারে খাবে কিন্তু মুখে খাবার দিলেও নিচে নামছে না। কষ্ট করে দু-একগাল মুখে দিয়ে উঠে পড়লো। ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিল বিছানায়। কণার কথা ভেবে এপাস ওপাস করে সময় যায় এক সময় নিদ্রা দেবির বুকে মাথা রেখে সুখের নিদ্রা যাপন করলো শিশির। ঘুমের মধ্যে কণা এসে হাজির। সে কণাকে নিয়ে স্বপ্নের ভুবনে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আর তার মনে কথা খুলে বলছে। স্বপ্নে শিশির কণাকে জড়িয়ে ধরলো।)
কণা ঃ এই ছাড়ও ছাড়ও লোকে দেখে ফেলবে তো।
শিশির ঃ দেখে দেখুক তাতে কি? তুমি নারী আর আমি নর, প্রেমিক প্রেমিকা প্রেম সাগরে মত্ত হলে
দোষের কি ?
কণা ঃ পাগলের মত কথা বল না শিশির ।
শিশির ঃ পাগল কাকে বলছো, পাগল আমি না, পাগল আমার মনটা।
কণা ঃ তুমি যে একটা কি।
শিশির ঃ আমি কি ?
কণা ঃ তুমি- তুমি - তুমি একটা ঘোড়ার আন্ডা ।
শিশির ঃ তুমি না (এই বলে দুজনে একসাথে হেসে ফেললো।)
শিশির ঃ তুমি খোপা বাঁধনি কেন? যেমন বাঁধে ওরা ডালুয়া খোপা । কণা আজ যদি তোমার দেহ
জুড়ে থাকতো হালকা গোলাপী রঙ্গের এক জরজেট শাড়ী, হাতে থাকতো কাঁচের চুড়ি
কানে থাকতো ছো-্র দুল, তোমার মায়াবী চোখে থাকতো কিঞ্চিত কাজলের টান, চোখের
পাতার স্যাডোর হালকা প্রলেপ, ঠোটে থাকতো ম্যাচিং করা লিপ লায়নার, কপালে
থাকতো একটা ছো- গোলাপী রঙ্গের টিপ, তাহলে আজ তোমাকে না-আরোও সুন্দর
লাগতো।
(কণা শিশিরের বুকে মাথা রেখে)
কণা ঃ তাই
শিশির ঃ হু
(শিশির কণাকে বুকের মাঝে চেপে ধরে)
শিশির ঃ কণা আমার কণা। আমার প্রান প্রেয়সী। আমাকে কেন এতটা কষ্ট দিয়ে ছিলে? তোমার
কারণে আমার জীবনটা বড়ই একা মনে হতো। আজ তোমাকে পেয়ে আমি যেন আমার
জান ফিরে পেয়েছি। কথা দাও কণা তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না ।
কণা ঃ না শিশির না ।
শিশির ঃ তুমি আমার আমি তোমার , এটাই হোক চির সত্য। কণা তুমি যদি আমার কাছে থাকো
তোমাকে সুন্দর একটা নীড় দেব। যেখানে থাকবে না কোন দুঃখ। তুমি আর আমি হাসি
খুশির মধ্যে জীবন যাপন করবো।
(ভোরের পাখী গুলো কিচির মিচির করে জাগিয়ে দিলো শিশিরকে। ঘুম থেকে জেগে উঠে খুব আনন্দ বোধ করলো। এমন সময় দরজার ওপার থেকে)
রিতা ঃ ভাইয়া
শিশির ঃ দরজা খোলা আছে ।
রিতা ঃ এই নাও তোমার চা ।
শিশির ঃ যা এখন আমি চা খাব না ।
(রিতা চা হতে ফিরে এলো)
শিশিরের মা ঃ কিরে শিশির ঘুম থেকে এখনও উঠেনি?
রিতা ঃ হ্যাঁ উঠেছে
শিশিরের মা ঃ তবে ।
রিতা ঃ বলল এখন চা খাবে না ।
(কিছু খন পর সবাই এক সাথে বসে নাস্তা করছে এর মধ্যে শিশির রাতে কণাকে নিয়ে দেখা স্বপ্নোটাকে ভাবছে কিছু মুখে দিচ্ছে না।)
শিশিরের মা ঃ কিরে কিছু মুখে দিচ্ছিস না যে, কি হয়েছে তোর ?
শিশির ঃ না মা কিছু হয়নি।
(বলে নাস্তা ছেড়ে শিশির উঠে পড়লো।
শিশিরের মা ঃ দেখেছো ।
শিশিরের বাবা ঃ না থাক। হয়তো ভাল লাগছেনা।
(শিশির কলেজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেড় হলো। পথিমধ্যে অনুপ, রুপম, রহিত এর সাথে দেখা হলো। পথ চলতে শিশির অনুপ এর সাথে রাতে দেখা স্বপ্নের কথা গুলো বলতে বলতে পথ চলতে লাগলো।)
অনুপ ঃ তুই একটা চিঠি লেখ কণার কাছে,তাহলে সব কিছুর সমাধান হয়ে যাবে।
শিশির ঃ চিঠি লিখবো ।
অনুপ ঃ হ্য
শিশির ঃ কার হাতে দেব ।
অনুপ ঃ সে দেখা যাবে । তুই কালকে চিঠি লিখে আনবি। পরে দেখা যাবে।
(শিশির রাত্রি জেগে মিতুর কাছে চিঠি লিখেছে। সকালে চিঠিটা পকেটে নিয়ে বেশ উদ্দিপনার সহিত কলেজে প্রবেশ করলো। মনে মনে অনুপকে খুঁজতে লাগলো একপর্যায়ে অনুপের সাথে দেখা)
অনুপ ঃ কিরে শিশির ?
শিশির ঃ তোকেই তো খুঁজছিলাম ।
অনুপ ঃ চিঠি লিখে এনেছিস ?
শিশির ঃ হ্য এনেছি।
অনুপ ঃ তবে আয় আমার সাথে ।
(শিলা আর কণা কলেজ চত্ত্বরের একটি কোনে দাঁড়িয়ে কি যে গল্প করছে অনুপ দূর থেকে-)
অনুপ ঃ এই শিলা ।
শিলা ঃ কি হলো ?
অনুপ ঃ এই দিকে আয়, শোন ।
(শিলা, কণার হাত ধরে ডাক দিলো)
শিলা ঃ চল
(কণা অনুপের সাথে শিশিরকে দেখে যেতে অ-স্বীকৃতি জানালো।)
কণা ঃ না আমি যাবো না। তুই যা ।
(শিলা, অনুপ শিশিরের কাছে গেল)
শিলা ঃ কিরে কি হলো?
(শিশির পকেট থেকে চিঠিটা বের করে।)
শিশির ঃ এই নাও কণাকে দিয়ো ।
( শিলা নিতে রাজি হচ্ছিল না, অনুপ শিশির দু-জনে মিলে তাকে কিছু ক্ষন বুঝানোর পর চিঠিটি শিলার হাতে নিলো। চিঠিটি হাতে পাওয়া মাত্রই বিলম্ব না করে চলে এলো। শিলা চিঠিটি ভয়ে ভয়ে কণার হাতে দিতে গেলা।)
কণা ঃ এটা কি ?
শিলা ঃ খুলে পড়ে দেখ বুঝবি ।
কণা ঃ না আগে তুই বল এটা কি ?
শিলা ঃ তোর চিঠি, শিশির ভাই দিয়েছে।
কণা ঃ কে দিয়েছে?
শিলা ঃ কেনো শিশির ভাইয়া
কণা ঃ আমি ওটা নেব না ।
শিলা ঃ আচ্ছা কণা, তুই কি? চিঠিতে কি লিখেছে দেখবি তো।
(বেশ কিছুক্ষন বোঝানোর পর কণা চিঠিটি হাতে নিলো, চিঠিটি খুলে কণা মনে মনে পড়তে লাগলো।)
শিলা ঃ কিরে চিঠিটি নিতেই চাইলিনে। আর এখন নিয়ে একা মনে মনে কি পড়তে লাগলি,
একটু জোরে পড়, যাতে শোনা যায়।
(কণা চিঠিটি জোরে জোরে পড়তে লাগলো)
প্রিয় কণা,
কেমন আছো সুখের ভুবনে। আর কত নিদ্রা যাপন করবে স্বপনের তরীতে ? নয়ন মেলে চেয়ে দেখ পৃথিবীর বাস্তব রুপকে। নিজেকে স্বপ্ন পুরীর রাজকন্যা ভেবে সুন্দর কে অমর্যদা করো না। স্বপ্নের তরীতে নয় সুন্দর মানুষ সকল প্রেরনার উৎস্য। তাই তোমাকে বলছি স্বপ্নের ভুবনে থেকে নিজের জীবনটাকে আর নষ্ট করো না। বাস্তবের মুখোমুখি হও। কণা আমি তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি তা হয় তো চিঠির ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। আমি জানিনা তোমার মনের কোন এক কোনে আমার জন্য স্থান হয়েছে কিনা, তবে মনে রেখো আমি যত দিন বাঁচবো ততো দিন তোমাকে ভালোবেসে যাবো। কণা আমি জানি তুমি আমাকে সহ্য করতে পারছো না । কিন্তু কেন যে আমাকে সহ্য করতে পারছো না, তা আমি জানি না । সাতটি বসন্তে লালিত প্রেমের সুরভী দিয়ে ও আমি বুঝতে পারলাম না। তোমার মনের রং বুকের তুষ্ণা। আমি চেষ্টা করি তোমাকে ভুলে থাকতে কিন্তু আহত হৃদয় আর ক্ষত বিক্ষত হয়ে অন্তর জ্বালাকে জ্বালিয়ে তোলে। আমি স্থীর থাকতে পারিনা। চিৎকার দিয়ে বলি, কণা আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার কাছে আমার প্রেমের মূল্য কত টুকু ? কিন্তু আমি জানি, আমার সেই বোবা চিৎকার তোমার কাছে পৌছায় না। কণা তুমি বুঝতে পারো না। আমার বুকের জ্বালা কি নির্মম। তুমি শুনতে পাওনা। আমার অন্তরের কান্নার করুন সুর। তাইতো তুমি সুখে আছো নিজের ভুবনে। তোমকে দেখে মনে হয় পৃথিবীর সকল সুখ বুঝি তোমার চারি ধারে। কোন দুঃখই তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না। তুমি শুধু নিজের ভুবনে মগ্ন একবার ভেবে দেখনি আমার কথা । আমার করুণ অবস্থা দেখে তোমার ঠোটে ফুটে উঠেছে কৌতুহলের হাসি। সত্যিই চমৎকার তোমার হৃদয়। কণা জানি পৃথীবীর প্রত্যেকটি জিনিসই পরিবর্তনশীল। নদীতে যেমন স্রোত বয়, ঠিক তেমনি মানুষের জীবনও। মানুষের জীবন থেকে ক্ষয়ে যায় সোনালী সময়, আর সময়ের সাথে সাথেই পরিবর্তন আসে পৃথিবীর। তবে এই পরিবর্তনের মাঝে থেকে দু-টি ধারা বয়ে যাবে একটি ধারায় সঞ্চিত তুমি। আর একটি ধারাই বঞ্চিত আমি। তার পর একদিন কোন এক গোধুলী বেলায় ফিরে দাঁড়াবে জীবন আয়নার সামনে। মনের মধ্যে প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠবে। অবাক হয়ে দেখবে নিজেকে। সেই তারুন্যে ভরা সুন্দর মূখটি কেমন যেন মলিন হয়ে গেছে। কপালে সেই রক্তে রাঙ্গা লাল টিপটি নেই, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। খুঁজতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে হৃদয়ের মাঝে। তখন ভেসে উঠবে কত-কিছু প্রথম জীবনের কত ঘটনা দুর ঘটনা। কিছু স্বপ্নের কথা, কিছু দুঃখের কথা। কিছু পরিচিত মুখ কিছু অপরিচিত মুখ। কণা সেই দিন আমার ভালোবাসার কথা মনে করে যদি তোমার বুক থেকে বেরিয়ে আসে কোন দীর্ঘ শ্বাস ! তবেই আমার ভালোবাসা সার্থক হবে। কণা দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েও যদি তুমি সুখের মোহনায় ছুটে যেতে চাও তবে আমি তোমাকে বাধা দেব না । যা কি সব আজে বাজে কথা লিখে অযথা তোমার সময় নষ্ট করছি। কণা আমার চিঠিটা পড়ে তোমার মনে যদি কিঞ্চিত পরিমানে আমার জন্য ভালোবাস জন্মে, তাহলে আমার ভালোবাসা সার্থক হবে। শেষ লগ্নে এসে তোমার সুন্দর জীবন কামনা করে আমার জীবনের সকল সুখ তোমার নামে উৎসর্গ করলাম।
ইতি
তোমার চেনা মুখ ।
শিলা ঃ দেখ কণা, তোকে কিন্তু শিশির ভাইয়া আসলেই ভালবাসে। না বাসলে এমন কথা লিখতে
পারতো না। তুই শিশির ভাইয়াকে ফিরিয়ে দিস না। বলা যায় না একটা মেয়ের জন্য
একটা ছেলের জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কণা ঃ তাতে আমার কিছু যায় আসে না ।
শিলা ঃ আচ্ছা কণা তোর মন বলে কি কিছু নেই ?
কণা ঃ ও সব জানি না ।
দৃশ্য ঃ ৭/(সাত)
(কণা বাড়ি ফিরে এসে দেখে তার মেজ খালা, খালাতো বোন দিপা ও এক ভাই দ্বিগন্ত এসেছে। দিপাকে দেখে কণা তাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলো।)
কণা ঃ কিরে কেমন আছিস ?
দিপা ঃ জ্যি আপা ভাল। কিন্তু তুমি যে আমাদের একবারে ভূলেই গেছ।
কণা ঃ নারে দিপা না। তোদের কি এত সহজে ভোলা যায় ।
দিপা ঃ তাইতো দেখছি। ভূল করে একবার খোঁজ খবরও নাও না ।
কণা ঃ পড়শুনার ভিষণ চাপ পড়েছে তো তাই ।
দিপা ঃ শুধু পড়া শুনা নাকি সাথে অন্য কিছুরও চাপ আছে।
কণা ঃ কি বলিস নারে তুই । যা হোক, তোর সেই প্রেম পাগল পুরুষটার খবর কি ।
দিপা ঃ জ্যি আপা ভাল ।
কণা ঃ এখনও কি সেই পাগলামী করে ।
দিপা ঃ হ্য করে বই কি । সেদিন ও ব্রিজের উপরে দাঁড়িয়ে বলে দিপা আমাকে তুই বল সত্যি
সত্যি ভালবাসিস কি না ? তা না হলে আমি এখন এই মূহুর্তে ব্রিজের উপর থেকে ঝাপ
দেব।
(কথা টি বলে দু-জনে হেসে উঠলো)
কণা ঃ দিগন্ত আসেনি ?
দিপা ঃ এসেছে । দেখ তোমার রুমে ।
কণা ঃ আমার রুমে !
(কণা তার রুমের দিকে গেল)
দিগন্ত ঃ আরে কণা তুমি কেমন আছো ।
কণা ঃ ভাল। তবে তুমি আমার রুমে কেনো ।
দিগন্ত ঃ তদন্তের স্বার্থে
কণা ঃ তার মানে ?
দিগন্ত ঃ তার আবার মানে কি ? তুমি যে আমাদের এক বারে ভুলে গেছ তার কারণটা কি ? তা
গোযেন্দা গিরি করে বের করা যায় কিনা দেখছি।
কণা ঃ দিগন্ত ভাইয়া তোমার সেই চোর পুলিশ, চোর পুলিশ খেলার স্বভাবটা এখনো গেলনা।
( মা খাবার দেবিলে খাবার দিয়ে ডাকছে )
কণার মা ঃ কইরে তোরা টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে।
কণা ঃ ভাইয়া ঐতো মা ডাকছে।
দিগন্ত ঃ তুমি যাবে না ?
কণা ঃ তুমি যাও আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
দৃশ্য ঃ ৮/আট
শিশিরের মা শিশিরের অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করলো। সে দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। কি যেন কিসের ভাবনায় মগ্ন থাকে সব সময়। তাই তো রিতাকে দিয়ে শিশিরকে ডেকে পাঠালো।)
শিশির ঃ মা তুমি ডেকেছো ।
শিশিরের মা ঃ বোস । শিশির তোর কি হয়েছে,বলতো বাবা ?
শিশির ঃ কই কিছু হয়-নি তো মা ।
শিশিরের মা ঃ না আমি বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি। তুই কেমন যেন একটা না পাওয়ার ব্যথায়
ভুগছিস ।
শিশির ঃ কি যে বল মা। আমার জীবনে কোন কিছু না পাওয়ার ব্যথা নাই। আমি যখন যা চেয়েছি
তোমরা তখন তাই দিয়েছো । আমার আবার না পাওয়ার ব্যথা কিসের ?
শিশেরের মা ঃ দেখ শিশির তোর যদি কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আমাকে সব খুলে বল। তোর যে, কিছু
একটা হয়েছে তা আমি বুঝতে পারছি। ছেলে মেয়ের কিছু হলে মা সবার আগে তা
জানতে পায়।
শিশির ঃ মা তুমি শুধু শুধু ভাবছো। আমার তো কিছু হয়-নি ।
শিশিরের মা ঃ ঠিক আছে এখন তুই যা । আর শোন আজে বাজে চিন্তা মাথার মধ্যে থেকে ঝেড়ে
ফেলে দে, দেখবি ভাল লাগবে।
শিশির ঃ মা তুমি জান না আমার মনে ও না পাওয়ার ব্যথা আছে। আমি সারাক্ষণ ছটফট করছি
শুধু না পাওয়ার ব্যথায়, তবে কোন টাকা পয়সা ধন দৌলত নয়। শুধু একটা
ভালোবাসার, শুধু একটা মানুষের ভালোবাসা। মা আমি কণাকে ভালোবাসি তবে
তোমাকে সে কথা কি করে বলি। মা আমি যে তুষের আগুনে নিজে নিজেই পুড়ে মরছি এ
আগুন তো কেউ দেখতে পাই না মা ? এ আগুন তো কখনো দেখানো যায় না । (স্বগত)
(শিশির ঘরে বসে একা একা ভাবছে, এমন সময় তার বন্ধু অনুপ রুমে প্রবেশ করলো। )
অনুপ ঃ শিশির ।
( অনুপের ডাকে শিশির কেমন যেনো চমকে উঠলো)
শিশির ঃ কিরে তুই ?
অনুপ ঃ না এমনিতেই, বাড়িতে ভালো লাগছিলো না তাই চলে এলাম।
শিশির ঃ বেশ ভালই করেছিস তোর সাথে গল্প করে কিছুটা সময় কাটানো যাবে।
অনুপ ঃ সে যাই হোক আমি যে তোর রুমে প্রবেশ করলাম তুই টেরই পেলিনা । কি এমন
ভাবনাই ছিলি ?
শিশির ঃ ভাবনা আবার কিসের ঐ কণা ।
অনুপ ঃ কণার আবার কি হলো ।
শিশির ঃ না তেমন কিছু না । আচ্ছা অনুপ বলতো আমি কি কণার ভালবাসা পাবো না । আমি কি
কণার ভালোবাসা পাবার যোগ্য নই ? নাকি ও অন্য কাউকে ভালোবাসে ।
অনুপ ঃ যা কি সব আজে-বাজে চিন্তা করছিস। দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে। একদিন কণা তোর
প্রেমে আটকা পড়বেই পড়বে।
শিশির ঃ হ্য পড়বে, হয়তো সেদিন আমার মরণ হবে।
অনুপ ঃ এ তুই কি ছাতা বলছিস । একটা মেয়ের জন্য তুই কেন মরতে যাবি । কণা কি এমন
রুপসী যে, ওর ভালোবাসা না পেলে তোকে মরে যেতে হবে!
শিশির ঃ তুই জানিস না, আমি কণাকে আমার জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসি। কণা আজ
আমার হৃদয়ের সাথে মিশে গেছে। আমি ওকে কোন সময় ভুলতে পারছি না। শুধু এর
ছবি আমার মনের দুয়ারে বার বার এসে হাজির হয়। আমি ওর দিকে হাত বাড়াতেই ও
আমার কাছ থেকে ছুটে পালায়। আমি ওকে ধরতে পারিনা। অনুপ এখন আমি কি
করবো বল ।
অনুপ ঃ তুই ও নিয়ে চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। শিশির এখন আমি যায়।
শিশির ঃ যাবি ঠিক আছে যা।
(অনুপ যেতে যেতে ভাবতে থাকে শিশিরের কথা।)
অনুপ ঃ শিশির কণাকে এতটা ভালোবেসে ফেলেছে। যে করে হোক কণাকে বোঝাতে হবে। তা
না হলে শিশির কণার জন্য শেষ হয়ে যাবে। (স্বগত)
দৃশ্য ঃ ৯/নয়
(শিশির আর অনুপ দু-জন কলেজ চত্ত্বরে দাঁড়িয়ে আছে । কিছু ক্ষন আগে রাজনৈতিক দু-পক্ষের গন্ড গোল হয়েছে তাই আজ আর ক্লাস হবে না ।)
শিশির ঃ চল অনুপ চলে যায় কিছু ভালো লাগছে না।
অনুপ ঃ তুই যা আমার একটু কাজ আছে। কাজটা করে আমি পরে আসছি।
(শিশির চলে গেল এদিকে অনুপ কণার জন্য কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। বেশ কিছুক্ষন পর কণা আর শিলার দেখা পেল।)
অনুপ ঃ কণা- শোন তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
কণা ঃ আচ্ছা বলো।
অনুপ ঃ আমি তোমাকে তোমার ব্যক্তিগত প্রশ্ন করবো আশা করি তা সঠিক উত্তর দেবে। তুমি কি
কোন ছেলেকে ভালোবাস ?
কণা ঃ কেন ?
অনুপ ঃ না মানে তোমাকে শিশির এতো ভালোবেসে ফেলেছে যা আমি তোমাকে আমার ভাষা
দিয়ে বোঝাতে পারবো না। আজ সে তোমাকে ছাড়া আর অন্য কিছুই ভাবতে পারে না।
কণা আজ শিশিরের ধ্যন ধারনায় চলা ফেরায় শুধু তুমি । তুমি জানো না কণা শিশির
তোমাকে কত ভালোবাসে । আজ শিশিরের জীবনে তোমাকে বড় প্রয়োজন। সে
তোমাকে না পেলে শেষ হয়ে যাবে। সে তোমার জন্য পাগল । জানো কণা শিশির তোমার
কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন রুগী হয়ে গেছে। তুমি শুধু ওকে একটু ভালোবাসা দিয়ে
আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসো। কণা তোমার হৃদয়ে যদি এর জন্য
কিঞ্চিত পরিমানে ভালোবাসা থাকে তবে তুমি তাকে ওটুকু দিয়েই শিশিরকে ভালোবাস।
ভালোবাসা পাপ নয় পবিত্র, প্রেম অভিশাপ নয় আর্শিবাদ । তাই আমি তোমাকে
অনুরোধ করছি তোমার ভালবাসা দিয়ে শিশিরকে আবার ভালো করে তোল। আমার আর
কিছু বলার নেই। এবার তুমি যেতে পারো ।
(কণা মুর্তিমান শুধু নিরবে দাঁড়িয়ে অনুপের কথা শুনছিল)
দৃশ্য ঃ ১০/দশ
(কণা কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে বিছানার পরে শুয়ে শুয়ে শুধু শিশিরের কথায় ভাবছে)
কণা ঃ আমি কি শিশিরকে ভালোবাসবো নাকি প্রতাখান করবো । আমি যদি শিশিরকে ভালো
না বাসি তাহলে সে দিন দিন খারাপ হয়ে যাবে । হোক তাতে আমার কি? ও আমার কে,
যে ওকে ভালোবাসতে হবে । ছিঃ ছিঃ ও সব আমি কি ভাবছি। আমি কি শিশিরের উপর
দুর্বল হয়ে পড়েছি। না না আমি এ সব কি ভাবছি। (স্বগত)
(এমন সময় কণার রুমে দিপার প্রবেশ।)
দিপা ঃ আসবো ।
(দিপার কন্ঠের আওয়াজে কণা কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসলো এবং হন্ত দন্ত হয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো)
দিপা ঃ কি ব্যাপার? কোন রাজাকে নিয়ে কল্পনার রাজ্যে ভাসছিলে? কে সে ?
কণা ঃ কই কে আবার ।
দিপা ঃ দেখ আপু আমার কাছে কোন কিছু লুকোনোর চেষ্টা করোনা । এ বাড়িতে এসেই
তোমাকে প্রথম দিন থেকে কেমন যেন অন্য রকম দেখছি। সব সময় কি যেন ভাবছো।
কি হয়েছে তোমার আমাকে বল দেখি, কিছুটা চিন্তার ভাগ নিতে পারি কিনা।
কণা ঃ না- আমার তো তেমন কিছু হয়নি ।
দিপা ঃ দেখ আপু তুমি কিন্তু আমার কাছে কিছু একটা লুকাচ্ছো ।
কণা ঃ কই নাতো !
( দিপা রেগে গেল)
দিপা ঃ আচ্ছা আমাকে জানালে তোমার কি কোন ক্ষতি হবে । যদি ক্ষতি হয় তাহলে আমাকে
বলার দরকার নেই।
কণা ঃ তুই আমার উপর রাগ করছিস কেন ?
দিপা ঃ আমাকে বলবে না। ঠিক আছে বলার দরকার নেই।
কণা ঃ ঠিক আছে ঠিক আছে বাবা তাহলে শোন ।
( দু-জন বিছানার মাঝখানে সামনা সামনি বসলো)
কণা ঃ আমি যখন কলেজে যায় তখন আমাকে শিশির নামে একটা ছেলে লক্ষ্য করে। আমার
সাথে গায়ে পড়ে কথা বলার চেষ্টা করে। আমি তাকে কোন পাত্তা দিইনা। সে মাঝে
মধ্যেই আমার সাথে এমন করে। সে আমার বান্ধবি শিলাকে অনেক কথা বলেছে। সে
নাকি আমাকে না পেলে বাঁচবে না। সে নাকি আমাকে না পেলে আর অন্য কোন মেয়েকে
বিয়ে করবে না । এমন সব নানান কথা বলে।
দিপা ঃ তুমি কি ওর প্রেমে--------।
কণা ঃ না - না আমি কখনো কোন রকম ও নিয়ে চিন্তাই করিনা । আর সেই ছেলেটার একটা
বন্ধু, আজ আমাকে ডেকে ছিলো।
দিপা ঃ কি বলল ?
কণা ঃ সে বলল শিশির আমাকে ছাড়া নাকি বাঁচবে না । আমাকে সে খুব ভালোবেসে ফেলেছে।
আমাকে না পেলে সে মরে যাবে। আর তাছাড়া তার চেহারাটা নাকি দিন দিন কেমন যেন
রুগি রুগি ভাব হয়ে গেছে।
দিপা ঃ দেখ আপু ভালোবাসা কোন পাপ না। তারপর ও সমাজের মানুষ এটাকে ভালো চোখে
দেখে না । কিন্তু তার পরেও আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি। ভালোবাসা মানুষকে
সুখের স্বপ্ন দেখায়। ভালবাসা পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে অমর। তা না হলে লাইলী মজনুর
ভালোবাসা মিথ্যা হয়ে যাবে। শাহাজানের তাজ মহল নির্মাণ ব্যর্থ। আর লিওনার্দো -দা
ভিঞ্চির ভালোবাসার সৃষ্টিই তো মোনালীসা। ভালোবাসা মানুষকে উন্নতির দিকে নিয়ে
যায়। শোন জীবনে শুধু পড়া শুনাই সব না ছেলে এবং মেয়ে উভয় কে একদিন না
একদিন সংসার নামক কাজটা করতে হবে, হয়। একদিন আগে আর দু-দিন পরে। তবে
কারোর সম্পর্কে জানা শুনা করলে দোষের কি ?
কণা ঃ তুই কি বলছিস। আমি শিশিরকে ভালোবাসবো।
দিপা ঃ না আমি তা বলছিনা । তোমার ভালো মন্দ বোঝার অনেক ঞ্চান আছে। তবে আমি
তোমাকে এইটুকু বলবো। তোমার জন্য একটা ছেলে দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যদি
পারো তাহলে তাকে খারাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা তোমার কর্তব্য । আর হ্যঁ যদি
তোমার মনে ভালোবাসা বলে কিছু থেকে, থাকে সেই ভালোবাসা দিয়ে শিশিরকে আনন্দ
হাসির মধ্যে দিন কাটাতে সাহায্য কর।
কণা ঃ বাদ দে তো ও সব কথা। নে এখন ঘুমা ।
(এই বলে কণা শুয়ে পড়লো। দিপা ও আর অপেক্ষা করলো না সেও শুয়ে পড়লো। )
দৃশ্য ঃ ১১/এগারো
(শিশিরের শরীর দিন দিন আরো খারাপ হয়ে যাছে। তার অন্যমনস্কতা ও আরো বেড়ে গেছে। শিশির এখন শুধু কণাকে নিয়েই ভাবছে । সকল কাজে সকল সময় শুয়ে বসে কিছুতেই যেন সে শ্বস্তি পাচ্ছেনা।)
ইন্টারকাট
(শিশিরের বাবা ও মা শিশিরের শাররিক মানষিক অবস্থার জন্য চিন্তিত তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ড্রইং রুমে বসে আলাপ করছে।)
শিশিরের বাবা ঃ আচ্ছা শিশির দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে ওর মনটা কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে
থাকে । ওর কি হয়েছে তুমি কি জান ?
শিশিরের মা ঃ আমাকে কিছু বললে তো জানবো ।
শিশিরর বাবা ঃ তুমি জিঞ্চেষ করেছো যে ও বলবে।
শিশিরের মা ঃ তা কেনো -কত বার তো ওকে জিঞ্চাষা করেছি। কিন্তু কিছু বলেনা,শুধু এড়িয়ে যায়।
শিশিরের বাবা ঃ আচ্ছা শিশিরকে কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি আবুরী ওর বড় কাকার কাছে পাঠিয়ে
দিলে কেমন হয়। ওখানে গেলে ওর মনের কিছুটা পরিবর্তন আসবে ।
শিশিরের মা ঃ হ্য সেটাই ভাল তা ছাড়া বর্ষা প্রায়ই ফোন দিয়ে ওকে যেতে বলে। বর্ষা মেয়েটা খুব ভাল
শিশির ভাইয়া বলে তো সে একদম পাগল ।
শিশিরের বাবা ঃ সেই ভাল বর্ষার সাথে ঘুরলে ফিরলে মনের একটা পরিবর্তন আসবে। যাও তুমি
শিশিরকে বলে রাজি কর। এদিকে আমি দাদাকে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করি ।
(শিশিরের মা ছোপা থেকে উঠে শিশিরর রুমের দিকে গেল)
শিশিরের মা ঃ শিশির
শিশির ঃ কি হলো মা ? ভিতরে এসো ।
শিশিরের মা ঃ বলি কি অনেক দিন তো হলো, গ্রামরে বাড়ি যাওনি। তাই বলছি কিছু দিনের জন্য
গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আয়। তাতে তোর মনটা ভালো হবে আর তোর বড় মা, বড়
চাচাকে দেখে আসবি।
শিশির ঃ না মা আমি কোথাও যাব না। এমনিতেই বেশ ভাল আছি।
শিশিরের মা ঃ না বাবা অমত করোনা। মায়ের কথা রাখতে হয়।
শিশির ঃ ঠিক আছে আমি যাব। তবে একটা কথা , গেলে কিন্তু আর ফিরে আসছিনা ।
শিশিরের মা ঃ পাগল ছেলে আমার ।
দৃশ্য ঃ ১২/বারো
বৃষ্টির বাবা ঃ বৃষ্টির মা বৃষ্টির মা ।
বৃষ্টির মা ঃ কি হলো
বৃষ্টির বাবা ঃ তাড়াতাড়ি এই দিকে আসো।
বৃষ্টির মা ঃ কি হলো ।
বৃষ্টির বাবা ঃ আমাদের শিশির বাড়ি আসছে ।
বৃষ্টি মা ঃ তাই নাকি ?
বৃষ্টির বাবা ঃ তবে বলছি কি? যাও যাও ছেলের জন্য জোগাড় জান্তি কর-গে। আর শোন নারিকেলের
নাড়ু বানাতে ভুলোনা যেন।
বৃষ্টির মা ঃ দেখ, ও কথা আমাকে বলতে হবেনা । আমি জানি আমার শিশির কি খায় না খায়, কি
পছন্দ করে না করে । ওর জন্মের ২মাস পর থেকেই তো ওর মা অসুস্থ্য ছিল সেই থেকে
তো আমি ওকে কোলে পিঠে করে নিজ হাতে মানুষ করেছি। এখন না হয় ও আমার কাছ
থেকে দূরে আছে।
বৃষ্টির বাবা ঃ যা তো মা ঘর থেকে একটা ব্যাগ এনে দে দেখি । ( বৃষ্টির উদ্দেশ্যে)
(বাবার মুখের শিশিরের আসার সংবাদ শুনে তো বৃষ্টির ভিষণ আনন্দ লাগছে। অনেক দিন পর শিশির আসছে। বৃষ্টি ভিতর থেকে একটা ব্যাগ এনে।)
বৃষ্টি ঃ এই নিন বাবা ।
বৃষ্টির বাবা ঃ যাই বাজারে গিয়ে দেখি ইলিশ মাছ পাওয়া যায় কিনা । শিশির তো ভুনা খিচুড়ী আর
ইলিশ ভাজা খুব পছন্দ করে।
দৃশ্য ঃ ১৩/তের
(শিশির গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে)
শিশির ঃ মা এখন আসি, বাবা আসি
শিশিরের বাবা ঃ দেখে শুনে থাকিস ।
শিশিরের মা ঃ ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করিশ। শরিরের দিকে যত্ন নিশ। বড় মার কথা শুনিশ আর
তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসিশ ।
শিশির ঃ ঠিক আছে মা তবে আমি আর বাড়ি ফিরে আসছিনা। (রিকসায় উঠে হাত নেড়ে)
শিশিরের মা ঃ দেখেছো ছেলের সে কি কথা । ও আর বাড়ি ফিরে আসবে না।
শিশিরের বাবা ঃ ওর যে মনের অবস্থা যদি গ্রামের যেয়ে ভাল থাকে থাকনা । ভাবিই তো ওকে বুকের দুধ
খাওয়িয়ে বড় করেছে। তোমার চেয়ে ওর বড় মা ওকে আদর যত্ন কম করেনা।
শিশিরের মা ঃ আমি যে ওকে ছাড়া থাকতে পারিনা ।
শিশিরের বাবা ঃ দেখ, শিশিরের মা সব সময় এতটা ইমশনাল হলে চলে না।
দৃশ্য ঃ ১৪/চৌদ্দ
(শিশির বাস থেকে নেমে ভ্যান খুঁজছে আবুরী যাবার জন্য এমন সময় পলান )
পলান ঃ শিশির ভাই নাকি ক্যামন আছেন ?
শিশির ঃ হ্য ভাল তোরা ক্যামন আছিশ ?
পলান ঃ হ্য ভালই আছি।
(ইতি মধ্যে পলান শিশিরের হাতের ব্যাগটা নিয়ে তার ভ্যানের উপর রাখলেন।)
পলান ঃ এখানে আর কি কোন কাজ আছে ।
শিশির ঃ না ।
পলান ঃ তো চলেন যাই।
(শিশির ভ্যানের উপর চেপে বসলেন। পলান ভ্যান টান দিয়ে চালানো শুরু করলেন।)
পলান ঃ সেই যে গেলেন । আর কোন খোঁজ খবর নাই। ঢাকা শহরে যাইয়ি মনে হয় আমাদের
কথা একেবারে ভুইলিই গিছেন।
শিশির ঃ নারে পলান তোদের ভুলিনী । সব সময় তোদের কথা মনে হতো। কিন্তু আসার সময়
কোথায় পড়া শুনা নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে হয়। তাই আসা হয়না। মতি, ভন্টু, স্বপন ওরা
ক্যামন আছে?
পলান ঃ হ্য ওরা ভালই আছে।
(এভাবেই নানা কথা বার্তার মধ্য দিয়ে এসে পৌছালো বাড়িতে।)
শিশির ঃ বড় মা, বড় মা ।
বৃষ্টির মা ঃ কই শুনছো, এই দিকে দেখ তোমার বাপ চলে এসেছে।
(শিশির বড় মাকে ছালাম করতেই )
বৃষ্টির মা ঃ তোর জাইগা পায়ে নয় বাপ। আয় আমার বুকে আয়।
(বৃষ্টির মা শিশিরকে বুকে জড়িয়ে নিলো। কিছুক্ষন পর)
শিশির ঃ ক্যামন আছেন বড় মা ।
বৃষ্টির মা ঃ বাপ কাছে না থাকলে কি ভাল থাকতে পারি । (কাঁদো কাঁদো কন্ঠে)
শিশির ঃ ক্যামন আছেন বড় চাচা (বড় চাচার উদ্ধেশ্যে)
বৃষ্টির বাবা ঃ হ্য ভাল ।
(শিশির বড় মার কাছ থেকে বড় চাচার কাছে গিয়ে কোলা কুলি করলো)
শিশিরের বড় মা ঃ দেখেছো বৃষ্টির আব্বা ছেলেটার মুখ যেনো সুটকি বেগুন হয়ে গেছে।
শিশিরের বড় চাচা ঃ যাও যাও সে আগে ছেলের খাবারের ব্যাবস্থা কর ।
শিশির ঃ বড় মা বৃষ্টিকে দেখছি না যে ?
শিশিরের বড় মা ঃ অভিমান করেছে। তাইতো কাছে আসছে না । দেখগে হয়তো ঘরে শুয়ে আছে।
(শিশির বৃষ্টির রুমে গেল । )
শিশির ঃ কিরে পাগলি আমার উপর বলে অভিমান করেছিস।
বৃষ্টি ঃ বলতো শিশির কি করে এতটা নিষ্টুর হতে পারলে । একটা বারের জন্য ও কি আমার
কথা তোমার মনে হয়নি। আমার কথা না হয় বাদই দিলাম। যে তোমাকে তার বুকের দুধ
খাওয়ে মানুষ করেছে তার কথা , আর যে তোমার কথা বলতে অঞ্চান সেই বড় চাচা।
(এই বলে বৃষ্টি অঝরে কেঁদে ফেললো ।)
শিশির ঃ আই পাগলী আই কাছে আই । কাঁদেনা এভাবে কাঁদেনা পাগলী।
(শিশির বৃষ্টিকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলো)
শিশিরের বড় মা ঃ মা বৃষ্টি। খালি মুখে ছেলেটাকে নিয়ে গল্প করলে চলবে। কত দূর পথ জার্নি করে এলো
খাওয়া দাওয়া লাগবে না ।
বৃষ্টি ঃ আসি মা । এই তুমি তোমার রুমে যাও ফ্রেশ হয়ে খেতে এসো।
শিশির ঃ যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি।
দৃশ্য ঃ ১৫/পনের
(বৃষ্টির বাবা বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে। বৃষ্টির মা হাতে ঘর গৃহস্থালীর কাজ করছে)
বৃষ্টির মা ঃ কই শুনছো,
বৃষ্টির বাবা ঃ হ্যা বল ?
বৃষ্টির মা ঃ ছেলেটার শরীরের দিকে খেয়াল করে দেখেছো। কি অবস্থা মুখটা শুকিয়ে যেন সুটকি
বেগুন হয়ে গেছে।
বৃষ্টির বাবা ঃ আরে ঐ বয়সে একটু আ-ু ঐরকম হয়। ছেলে এখন বড় হয়েছে বন্ধু বান্ধবিদের সাথে
হৈ হুল্লা করে ঘুরে বেড়িছেয়ে খাওয়া দাওয়ার ঠিক ঠিকানা ছিলনা। শরীরের দিকে খেয়াল
দেবে সে টুকু সময় ওর কৈয় । তোমার কাছে যেমন রুটিন মতো খাওয়া দাওয়া পড়া শুনা
করানো ঘুম পাড়ানো। ঢাকায় গিয়ে সে সব শিকেই উঠেছিল। তাই হয়তো এরকম
হয়েছে। এ নিয়ে চিন্তা করোনা তোমার ছেলে এখন তোমার কাছে এসেছে আদর যত্ন
করো দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
বৃষ্টির মা ঃ তাই যেন হয় ।
দৃশ্য ঃ ১৬/ষোল
(অনেক দিন পর শিশির গ্রামে এসেছে। তাই বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছে।)
শিশির ঃ বৃষ্টি তোকে না এই সাজে আজ খুব সুন্দর লাগছে ।
বৃুষ্টি ঃ সুন্দর না ছাই । তুমি আমাকে খুশি করার চেষ্টা করছো ।
শিশির ঃ নারে বৃষ্টি না । আমি সত্যি বলছি।
বৃষ্টি ঃ কাছে থাকলে দেখোতো তুমি কেমন । আর দূরে গেলে কে যেনো পর পর হয়ে যাও।
আমাদের কথা এক বারেই ভুলে যাও।
শিশির ঃ নারে পাগলি না। তোদের কথা ভোলা যায়। তোরাই আমার সব তোদের বাদ দিলে কি
আর আমি থাকি।
বৃষ্টি ঃ বাদ দাওতো তোমার পাকামি কথা। একটা কথা সত্যি করে বলোত দেখি ? শহরের
মেয়েরা কি দেখতে শুনতে খুব সুন্দর হয়।
শিশির ঃ তা বলতে পারি না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি তোর মনের মত এত সুন্দর মন কারো নেই।
যেমন তুই সুন্দর, তেমন তোর মন সুন্দর ।
দৃশ্য ঃ ১৭/সতের
(ঐদিকে বেশ কিছু দিন শিশিরের দেখা না পেয়ে অনুপ শিশিরের বাড়িতে খোঁজ নিতে এসেছে। দরজা নক করতেই, শিশিরের মা দরজাটা খুললো।)
শিশিরের মা ঃ আরে অনুপকেমন আছো ।
অনুপ ঃ জ্যি খালা আম্মা ভাল।
শিশিরের মা ঃ এসো ভিতরে এসো।
অনুপ ঃ না খালা আম্মা । এখন আর যাচ্ছিনা । এই দিক দিয়েই যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম
শিশিরের সাথে দেখা করে যায়। কদিন ধরে ওর দেখা পাচ্ছি নাতো তাই।
শিশিরের মা ঃ শিশির তো বাড়িতে নেই ।
অনুপ ঃ কোথায় গিয়েছে।
শিশিরের মা ঃ গ্রামের বাড়ি। ওর বড় মা বড় চাচার কাছে গেছে ।
অনুপ ঃ কবে আসবে ।
শিশিরের মা ঃ দুই একদিনে মধ্যেই চলে আসবে।
(অনুপ ফিরে যেতেই শিশিরের মা পিছন থেকে ডাক দিলো।)
শিশিরের মা ঃ অনুপ, শোন । আচ্ছা অনুপ শিশিরের কি হয়েছে বলতে পার।
অনুপ ঃ না। আমি তো ঠিক বলতে পারবো না ।
শিশিরের মা ঃ জান অনুপ শিশির সারাক্ষন কি যেন ভাবে। ও ফিরে আসলে তুমি ওর সাথে একটু কথা
বলে দেখতো ও সারাক্ষন কি ভাবে।
অনুপ ঃ ঠিক আছে খালাআম্মা। আমি তাহলে এখন আসি ।
দৃশ্য ঃ ১৮/আঠারো
(এদিকে কণা, শিশিরকে আজ কয়েক দিন মনে মনে খুঁজে বেড়াচ্ছে কিন্তু তার কোন খোঁজ পাচ্ছেনা ।)
কণা ঃ বলতো দেখি শিলা এখন কি করি। আজ কয় দিন ধরে মনে মনে শিশিরকে খুঁজছি কিন্তু
কোথাও ওর খোঁজ পাচ্ছি না।
শিলা ঃ শিশিরের খোঁজ পেতে হলে অনুপের দরকার। অনুপকে পেলে শিশিরের খোঁজ পাওয়া যাবে ।
(কণা আর শিলা বের হলো অনুপের খোঁজে। খুজতে খুজতে শেষে পেল। বকুল তলার মোড়ে ওরা দু-জন বসে আ-া দিচ্ছে । সেখানেও শিশির নেই। তাহলে শিশির গেল কোথায়। শিলা অনুপকে হাত ইশারা করে ডাক দিলো।)
অনুপ ঃ তোমরা এখানে কি ব্যাপার ।
শিলা ঃ না মানে । থাক, কণা তোর কথা তুই বল।
কণা ঃ আজ কয় দিন ধরে শিশিরকে খুঁচ্ছি, পাচ্ছি না।
অনুপ ঃ কি দরকার? শিশিরের সাথে তো তোমার কোন দরকার থাকতে পারেনা। তুমি তো বেশ
ভালই আছো। আবার কি ?
কণা ঃ না অনুপ ভাই, শিশিরকে আমার বেশ কিছু কথা বলার আছে।
অনুপ ঃ শিশির তো নাই ।
কণা ঃ কোথায় গিয়েছে ?
অনুপ ঃ গ্রামের বাড়ি ।
কণা ঃ কবে আসবে ?
অনুপ ঃ বলতে পারবো না । তবে আসলে তোমার কথা বলবো।
শিলা ঃ অনুপ ভাই, শিশির ভাই আসলে, দয়া করে একটু সংবাদটা দিয়েন কেমন ?
কণা ঃ এখন তাহলে আসি ।
অনুপ ঃ ঠিক আছে, যাও ।
(অনুপ মনে মনে ভাবতে লাগলো কণা কি তাহলে শিশিরের প্রেমে পড়ে গেছে। এমন সব নানা কথা ।)
দৃশ্য ঃ ১৯/ঊনিশ
(কণা ও এখন শিশিরকে নিয়ে খুব ভাবে। কণা তার মনের সাথে বোঝা পড়া করে হেরে গেছে)
ইন্টারকাট
কণা ঃ শিশির আমি তোমাকে আমার করে নেব আকাশ যেমন সূর্য্যকে বাতাস যেমন গন্ধকে,
সাগর যেমন ঝিনুককে , ঝিনুক রাখে মুক্তাকে আমিও তোমাকে আমার করে নেব।
শিশির ফুল কথা বলে ভ্রমরের সাথে নদী গল্প করে কূলের সাথে, সুর বাঁশিতে যেমন ভাব
হয় সুরে সুরে, মেঘেরা বৃষ্টির সাথে, কোকিল বসন্তের সাথে তেমনি আমিও তোমার
সাথে। শিশির চাতক পাখি যেমন পানির অপেক্ষায় থাকে আমি তোমার জন্য অপেক্ষায়
আছি। শুধু তোমার জন্য। তোমার সাথে দেখা করার জন্য। শিশির ভালোবাসা বিধাতার
একটি অমূল্য দান । আজ আমার মনের মধ্যে তোমার জন্য যে, ভালোবাসা জন্ম
নিয়েছে। এটা ও বিধাতার দান। শিশির আমি এখন তোমাকে সারাক্ষন উপলব্ধি করি তুমি
শুধু একবার আমার সাথে দেখা করো। শিশির আমি আমার সমস্ত ভালোবাসা তোমাকে
দিয়ে দেব। আমার মন প্রান তোমাকে উজাড় করে দেব।
ফ্লাশব্যাক
(ওদিক থেকে কণার মায়ের ডাক কণার কানে এলো। কণা কল্পনার পৃথিবী থেকে ফিরে এলো)
কণা ঃ আসি মা ।
দৃশ্য ঃ ২০/বিশ
(শিশির অনেক দিন হলো গ্রামের বাড়ি আছে। এখন তার মন ছুটেছে ঢাকাই ফিরে যাবে।)
শিশির ঃ বৃষ্টি, আমার ব্যাগটা গুছিয়ে রাখিস আমি কালকে ঢাকা যাব ।
বৃষ্টি ঃ কেন হঠাৎ করে আবার কি হলো। যে, ঢাকাই ফিরে যেতে হবে।
শিশির ঃ জানি না ।
(শিশির বড় মায়ের রুমের দিকে গেল)
শিশির ঃ বড় মা আসি ।
বড় মা ঃ আয় বাবা ।
বড় চাচা ঃ কিরে কি হলো বাপ ।
শিশির ঃ বড় মা আমি কালকে ঢাকাই যাব ।
বড় মা ঃ বড় মা, কেন কি হলো।
বড় চাচা ঃ কেন বাবা । এখানে কি তোমার কোন অসুবিধা হচ্ছে ?
শিশির ঃ না বড় চাচা। তা ছাড়া দুই একদিনে মধ্যে ক্যাম্পাস খুলে দেবে তো তাই।
বড় মা ঃ আর কিছু দিন পরে গেলে হতোনা বাবা ।
শিশির ঃ না বড় মা, আমি কালকেই যাব
বড় মা ঃ ঠিক আছে বাবা। তুমি যা ভালো মনে করো, তাই করো।
(পরের দিন শিশির তার বড় মা, বড় চাচার কাছে বিদায় নিলো। বৃষ্টি- শিশিরের সাথে সাথে বাস স্ট্যান্ড পযর্ন্ত আসলো । বাস এলেই শিশির বাসে উঠে পড়লো। বৃষ্টি হাত নেড়ে তাকে বিদায় দিল। এবং কিছুকক্ষন থ মেরে পথ পানে চেয়ে রইলো। বৃষ্টির চিন্তা শিশিরকে নিয়ে, শিশিরের চিন্তা কণাকে নিয়ে । ওর চিন্তা মাথার মধ্যে যেন সর্বক্ষন ঘুর পাক খাচ্ছে। প্রকৃতির দৃশ্য দেখছে এমন সময় শিশিরের মনের মধ্যে কণার ছবি ভেসে আসলো তার মন ক্যামেরায়। শিশির চেষ্টা করেও যেন তার ছবি মন থেকে সরাতে পারছে না। গাড়ি দ্রুত ছুটে চললো। এক সময় গাড়ি নির্দিষ্ট স্থানে পৌছালো। শিশির বাস থেকে নেমে। রিক্সা করে বাড়ির দিকে রওনা দিলো)
দৃশ্য ঃ ২০/বিশ
(শিশির বাড়িতে পৌছে গেট থেকে কলিং বেল চাপতেই মা খুলে দিলো। শিশির বাড়ির ভিতর ঢুকতেই, মা খেয়াল করলো। শিশিরের শরিরের দিকে।)
শিশিরের মা ঃ কিরে তোর কোন অসুখ বিসুখ করেছিল নাকি?
শিশির ঃ কই না তো মা ।
শিশিরের মা ঃ তবে, কি ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করিস নি । শরীরের এ কি অবস্থা ।
শিশির ঃ ও কিছু না মা ।
(শিশির সে কথা বলেই তার রুমের দিকে চলে গেল।)
দৃশ্য ঃ ২১/একুশ
(ওদিকে কণা বিছানাই শুয়ে শুয়ে শিশিরের কথা ভাবছে।
কণা ঃ শিশির কি কুষ্টিয়া থেকে এসেছে। নাকি অনুপ ভাই আমার কথা শিশিরকে বলতেই ভুলে
গেছে। আবার হয়তো বলেছে ঠিকই শিশির সেকথা গায়ে মাখেনি। (স্বগত)
দৃশ্য ঃ ২২/বাইশ
(বেশ কিছুদিন অনুপের সাথে দেখা হয়নি। তাই শিশির অনুপের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলো। অনুপের সাথে দেখা হতেই দুজনে আনন্দে দুজনকে জড়িয়ে ধরলো। তারা দুজনেই মন খুলে বেশ কিছু দিনের জমানো গল্প করতে লাগলো। অনেক ক্ষন গল্প করার পর শিশির অনুপকে বললো।)
শিশির ঃ চল আমরা এখন যায়। কালকে আবার কলেজে দেখা হবে। আর তাছাড়া আমার শরীরটা
খুব একটা ভালো লাগছে না।
অনুপ ঃ চল যায় বলে দুজনেই চলে গেল।
দৃশ্য ঃ ২৩/তেইশ
(পরের দিন অনুপ কলেজে গেল কিন্তু শিশির কলেজে আসলো না। এদিকে কণা ও শিশিরের সাথে দেখা করার জন্য ব্যাকুল। কণা অনুপের সাথে দেখা করে শিশিরের কথা জনাতে চাইল।)
কণা ঃ অনুপ ভাই শিশির কি গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছে?
অনুপ ঃ এসেছে।
কণা ঃ কলেজে আসেনি।
অনুপ ঃ না । তবে আসবে ।
কণা ঃ অনুপ ভাই শিশিরকে দয়া করে আমার সাথে দেখা করার ব্যবস্থাটা করে দেবেন। ওর
সাথে যে আমার বেশ কিছু কথা আছে।
অনুপ ঃ ঠিক আছে, তুমি একটু অপেক্ষা করো। আর না হয় আগামী কাল কলেজে এসো, তাহলে
তোমার সাথে দেখা হবে।
কণা ঃ ঠিক আছে। আগামী কালকেই আসবো।
(পরের দিন কণা শিশিরের সাথে দেখা করবে বলে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লো। কণা আর শিলা কলেজে অপেক্ষা করছে। কখন শিশির আর অনুপ আসবে। কণা মনে মনে ভাবছে আসলে শিশিরকে কি বলবে। কি বলে তার সামনে দাঁড়াবে এমন অনেক কথা ভাবতে লাগলো কণা। ।অপেক্ষার ক্ষন দীর্ঘতর। অপেক্ষার সময় যে কি কষ্টের তা কণা আর শিলা উপলদ্ধি করতে পারছে। কিছুক্ষন পর শিলা আর কণা লক্ষ্য করলো অনুপ আসছে কিন্তু শিশির কে দেখতে পেল না।)
কণা ঃ শিশির আসেনি।
অনুপ ঃ আজ আর মনে হয় শিশির আসবে না। কণা তুমি কষ্ট করে কাল এসো।
(কথাটি বলেই অনুপ চলে গেল। কণা হতাশ মন নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো।)
শিলা ঃ তুই একটা কাজ কর শিশির ভাইয়ার কাছে একটা চিঠি লেখ। চিঠির মধ্যে তোর মনের
সব কথা গুলো খুলে বল। তাহলে হয়তো শিশির ভাইয়া তোর মনের কথা বুঝতে পেরে
তোর সাথে দেখা করতে পারে।
কণা ঃ ঠিক আছে। আমি কালকে লিখে আনবো। কিন্তু চিঠিটা আমার হয়ে তুই অনুপের কাছে
দিবি। তাহলে অনুপ শিশিরের কাছে পৌছে দেবে।
শিলা ঃ ঠিক আছে তাই হবে । এখন চল বাড়ি ফিরে যায়।
দৃশ্য ঃ ২৪/চব্বিশ
(পরদিন সকালে কলেজ চত্বরে)
শিলা ঃ এটা নিন ।
অনুপ ঃ কি এটা ।
কণা ঃ চিঠি ।
শিলা ঃ ওটা আপনি শিশির ভাইকে দিবেন । আর বলবেন কণা দিয়েছে। তাহলে বুঝবে। অনুপ
ভাই আপনি জানেন না কণা আজ শিশির ভাইয়াকে খুব ভালবেসে ফেলেছে।
(অনুপ চিঠিটা নিয়ে শিশিরের কাছে গেল। শিশির কলেজ ক্যাম্পাসের দক্ষিনে পুকুর পাড়ে দাঁড়ানো ছিল। অনুপ চিঠিটা শিশিরের সামনে ধরতেই )
শিশির ঃ কি এটা ।
অনুপ ঃ কণা তোর প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খেয়ে তোকে এই চিঠিটা দিয়েছে।
শিশির ঃ যা-- কি সব বলছিস ।
অনুপ ঃ পড়ে দেখ। সব বুঝতে পারবি।
(চিঠিটা হাতে নিয়ে শিশির পড়তে লাগলো।)
প্রিয় শিশির,
পত্রের শিরোনামে সুবাসিত হোক শেফালী, বকুল আর জুঁই চামেলীর রক্তিম প্রভাতে জীবনের আমেজ পূর্ন সোনলী সকালে পাখির কিচির মিচির ডাক শিশিরের সৌন্দর্য্যানভুতি আজ আমার সমস্ত দ্বার উন্মোচন করে ফেলেছি শুধু তোমাকে ভেবে।
শিশির তুমি আজ আমার এই চিঠি কেমন ভাবে গ্রহন করবে তা আমি জানিনা। তবে আমি আজ তোমাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি। আজ আমার ভালোবাসা গ্রহন করে তুমি আমাকে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে দাও।
শিশির পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনের মধ্যে আমিও। শিশির তোমার সাথে আমার সরাসরি অনেক কথা আছে, দেখা করা খুব জরুরী। শিশির তুমি আমাকে আর কষ্ট না দিয়ে দেখা কর। আর বেশী কিছু লিখলাম না। পরিশেষে তোমার সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করে শেষ করছি খোদা হাফেজ।
ইতি তোমার
কণা
শিশির ঃ অনুপ। কণা এ কি লিখেছে? সে আমাকে সত্যিই ভালোবেসেছে নাকি তার মনে অন্য
রকম কোন পরিকল্পনা আছে।
অনুপ ঃ আমার মনে হয় না। কণা তোকে মনে হয় আজ সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছে। কণা
আমার কাছে বেশ কিছু দিন যাবৎ তোর খোঁজ খবর নিচ্ছে। শিশির তুই যায় বলিস না
কেন। আমার মনে হয় কণা তার মনের ভুল বুঝতে পেরেছে।
শিশির ঃ দেখ অনুপ বিধাতার সৃষ্টি নারীগুলোর মন বড় বিচিত্র ধরনের। তাদের মন বুঝা বড়
কঠিন। তাদের মনে কখন যে কি বলে সে নিজেই জানে না। আমার মনে হয় কি জানিস
কণা আবার আমার সাথে নতুন কোন-----।
অনুপ ঃ না শিশির, আমার মনে হয় না।
শিশির ঃ আমি এখন যায়
(শিশির পা বাড়ালো এমন সময়)
অনুপ ঃ কি করবি ?
শিশির ঃ সে দেখা যাবে ।
দৃশ্য ঃ ২৪/চব্বিশ
(শিশির রাত্রে একা একা মনে মনে ভাবছে । কণা আমাকে ভালোবাসার জন্যে চিঠি দিয়েছে। যে কণা আমি এতো ভালোবাসার পর ও তার মন পেলাম না। আর আজ সে আমাকে নিজের ইচ্ছাতেই ভালোবসার জন্য চিঠি লিখেছে। এমন হাজার চিন্তার মাঝে শিশির কণার কাছে চিঠি লিখতে বসলো। কি লিখবে ভেবে পাচ্ছেনা। এক দু-লাইন লিখে ছিড়ে ফেলে দেয়। এমন করে করে শেষ মেশ একটা চিঠি লিখলো ঠিকই কিন্তু কি ভাবে তাকে দেবে তা ভেবে পাচ্ছেনা। পর দিন শিশির চিঠিটা অনুপকে দিলো কণাকে দেবার জন্য। অনুপ চিঠিটা নিয়ে কণার কাছে পৌছে দিল। কণা শিশিরের চিঠিটা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। চিঠিটা খুলে আনন্দে পড়তে লাগলো।)
কণা,
কেমন আছো সুখের ভুবনে ? নিশ্চয় ভালো থাকার কথা। কারণ যারা নিষ্ঠুর হৃদয়য়ের অধিকারীনি তারা ভালো না থাকলে এই সুন্দর তম পৃথিবীতে আর কারা ভালো থাকবে। কেনো কোন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভালোবাসার নামে আমার সাথে ছলনা করছো। কেন আমার সাথে ছলনা করার জন্য এই চিঠি লিখেছো ? কে দিয়েছে তোমাকে সেই নিষ্ঠুর অধিকার ? আমি জানি এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর তুমি আজ দিতে পারবে না । কারণ তোমার মত হৃদয়হীনার কাছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা নাই।
কণা আমি তোমার কাছে ভালোবাসা চেয়েছি তার বিনিময়ে পেয়েছি লাঞ্ছনা। আমি তোমার কাছে গেলে তুমি আমাকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছো। আমি জানি না তোমার মনের মধ্যে আমার জন্য ভালোবাসা কোথায় লুকিয়ে ছিলো। কণা তোমার মনে যদি এই হতভাগার স্থান না হয় তাহলে ছলনা দিয়ে আর ভালোবেসো না । ভালোবাসার স্বপ্ন দেখিয়ে দুঃখের মোহনায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিও না। এমনিতেই বেশ আছি আর কত ? কণা তুমি আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছো। আমি তোমার সাথে দেখা করবো। আর বেশি কিছু লিখে তোমকে জ্বালাতন করতে চাইনা । পরিশেষে তোমকে একটা লাল গোলাপের শুভেচ্ছা জানিয়ে ইতি টানলাম খোদা হাফেজ।
ইতি
শিশির
(চিঠি পড়া শেষে শিলা লক্ষ্য করলো যে কণার চোখ দিয়ে অশ্রু বের হয়ে ধরনীর উপর গড়ে পড়ছে। এবং মনের অজান্তে)
কণা ঃ শিশির আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি আমি তোমার সাথে কোন প্রতারনার জন্য এই
চিঠি লিখিনি। আমি তোমাকে ছলনা দিয়ে নয় ভালোবাসা দিয়ে ভরে দেব।
শিলা ঃ দেখ কণা শিশির ভাইয়া কিন্তু অনেক কষ্ট করে তোর কাছে এই চিঠি লিখেছে। আসলে ও
তোর কাছে থেকে যে আঘাত পেয়েছে তার জন্য এমন সব কথা বার্তা লিখেছে। আমি
বলিকি তুই যে ভাবেই হোক শিশির ভাইয়ার সাথে দেখা কর। দেখা করার পর তোর
মনের সব কথা গুলো খুলে বল তাহলে দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে। শিশির ভাইয়া হয়তো
তোকে গ্রহন করবে। ঐ দেখ অনুপ ভাই যাচ্ছে। চল আমরা অনুপের সাথে দেখা করি ।
আর অনুপকে বলি শিশিরের সাথে জেনো তোর দেখা করার ব্যবস্থা করে দেয়।
দৃশ্য ঃ ২৫/পঁচিশ
(শিশিরের শরীরের অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হয়ে যেতে লাগল। এখন সে ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করে না সব সময় নীরব থাকে। শিশিরের এমন অবস্থা দেখে তার বাবা-মা চিন্তার মধ্যে পড়ে গেল। শিশিরের শরীরের কমলতা কেমন যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। শিশিরের বাবা-মা তার শরীরের অবস্থা দেখে জানতে চাইলো।)
শিশিরের মা ঃ তোর কি হয়েছে বাবা ? তোর শরীরের অবস্থা দেখে আমাদের মনে হচ্ছে তোর কোন বড়
ধরনের অসুখ হয়েছে।
শিশির ঃ না মা আমার তেমন কিছু হয়নি। তোমরা এমনিতেই শুধু শুধু আমাকে নিয়ে ভাবছো।
আসলে আমাকে তোমরা খুব ভালোবাসো তো তাই একটু বেশি ভাবছো।
শিশিরের বাবা ঃ না বাবা তোর শরীর দেখে আমাদের কেমন যেন মনে হচ্ছে।
(কথাটা শেষ না হতেই )
শিশির ঃ বাবা মাঝে মধ্যে মাথায় কেমন যেন ঝিলিক দিয়ে উঠে। তখন মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করে
আবার ঠিক হয়ে যায়। ও নিয়ে তোমরা কোন চিন্তা করনা বাবা সব ঠিক হয়ে যাবে।
(ছেলের এমন কথা শুনে বাবা-মার চিন্তা আরো বেড়ে গেল। তারা সিদ্ধান্ত নিলো ছেলেকে ইন্ডিয়াই নিয়ে গিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে। দু-একদিন পর শিশিরের বাবা-মা শিশির সহ ইন্ডিয়াই রওনা দিলো।
দৃশ্য ঃ ২৬/ছাব্বিশ
(এদিকে কণা শিশিরের প্রতিক্ষাই আছে কখন শিশির এসে তার সাথে দেখা করবে। আজ অনেক গুলো কথা কণার হৃদয়ের মাঝে প্রতিধ্বনি করে চলেছে। চৈত্রের দুপুর এখন মনে হচ্ছে একটা অলসতার ভাব প্রতি দিনের রীতি অনুযায়ী একটু মৃদু নিদ্রা চিপে বসে কিন্তু শিশিরের অব্যক্ত কথাগুলো জানার পরে স্বাভাবিক নিয়ম তার সাথে বেঈমানী করছে। এর আগে এমন হয়েছে তখন শরৎ কাহিনী পড়তে পড়তে নিদ্রা এসে যেত। আবার কখনও কখনও টেপ রেকর্ডার অন করতেই খেসে আসতো চির চেনা মান্নাদের আক্ষেপের সূরগুলো তখন কোথা থেকে যে, এক মায়াবী আমার মনটাকে দিক ভুলিয়ে কোথায় যে নিয়ে যেত তা আমি নিজেই জানিনা। আমি তাকে চিনি না অনেক চেষ্টা ও করেছি কিন্তু আমার ব্যাকুল মনের কাছে কখনও সে ধরা দেয়নি। আমার কখনো কখনো মনে হয়েছে মায়াবী আর আমার মন এক অজানা লুকোচুরি খেলা করে। আর আমি পড়ে থাকতাম এক জীবন্ত লাশ হয়ে গভীর নিন্দ্রায়। ভালোবাসলে মানুষ অনেক কিছু গোপন করতে শেখে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক কথা বলা হয় না । যেমন আমি বলতে পারিনি আমার বর্তমান অনুভুতির কথা । আর তাকে বললেও কি ভাবতো জানিনা। না থাক আমার স্বপ্নের মায়াবীর মত শিশিরের কথা গুলো গোপন থাক। কখন শিশির এসে তার সাথে দেখা করে অনেক দিনের জমানো ভালোবাসার কথা বলে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে অধোরে আলতো চুম্বন দিয়ে আমার শীতল মনটাকে শান্ত করে দেবে। এমন ও নানান কথা কণার মনের মধ্যে কল্পনা করতে লাগলো।)
শিলা ঃ এই কণা
(শিলার ডাক দিতেই কণা চমকিয়ে উঠে বাস্তবতায় ফিরে এসে বললো।)
কণা ঃ কিরে তুই ?
শিলা ঃ কেন অন্য কেও আসার কথা ছিলো নাকি ?
কণা ঃ হেয়ালিপনা রাখতো কি করতে এসেছিস তাই বল।
শিলা ঃ বাড়িতে কাউকে দেখছিনা ভর দুপুরে একা কার কথা ভাবছিলি।
কণা ঃ ভাবছিলাম আর কার কথা । আমার নিয়তি। শিলা আমি কখনো বিশ্বাস করতাম না
মানুষের ভাগ্য নিয়তি নিয়ন্ত্রন করে কিন্তু আজ আমি অসহায় নিয়তির কাছে। তুই তো
জানিস স্কুল জীবন থেকে কলেজ জীবন পর্যন্ত অনেক গুলো বসস্ত পাড়ি দিয়ে আসলাম।
এর মধ্যে অনেকে এসেছিলো আমার কাছে ভালোবাসার আহবান নিয়ে কিন্তু আমার
মনের মনি কোঠায় স্থান নেবে এমন কেউ তাদের মধ্যে ছিলোনা। এটা আমার অহংকার
দেমাগ যাই বলিস না কেন। আমার উপযুক্ত এমন কাউকে চোখে পড়েনি।
শিলা ঃ আরে বাবা এ দেখছি অশোক গাছে বসে থাকা সীতা দেবীর ভূমিকায় প্রহর গুনছে। তা
এতো কথা শিখালো কে ?
কণা ঃ ভালোবাসা কাকে বলে তা আমি আগে বুঝিনি। আমার যুমন্ত মনটা আমাকে বুঝতে
দেয়নি যখন বুঝতে পারলাম তখন আমার মন শিশিরের ভালোবাসা পাবার জন্য ব্যাকুল
কিন্তু আজ আর শিশিরের দেখা মিলছে না। বলতো শিলা আমি এখন কি করবো ? আজ
আমার যে শিশিরকে খুব বেশি মনে পড়ছে।
শিলা ঃ শোন কণা আর বসে না থেকে বরং চল অনুপের সাথে দেখা করি। শিশির ভাইয়ার
কথা জেনে নিই।
দৃশ্য ঃ ২৭/সাতাশ
( ঘুম থেকে উঠে প্রতি দিনের মত আজও অনুপ নদীর ধারে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো। মাঝে মধ্যে অবশ্য শিশিরও আসতো।)
(ইন্টার কাট )
(মনে পড়ে একদিন শিশির এসেছিলো। এসেই নদীতে মাছ ধরতে যাবে। আমি বার বার নিষেধ করেছিরাম এখন নদীতে পানি কামড়ি আছে। একবার যদি কামড়ি ধরে তাহলে মজাটা বুঝবে। কি আর করা যেতেই যখন চাই তখন নিয়ে গেলাম। মাছ ধরার জন্য তেমন কোন কিছুই ছিলো না। শুধু ছিলো একটি পুরাতন হুইল। অনেক দিন মাছ না ধরার দরুন অব্যবহার যোগ্য হয়ে পড়ে ছিলো আমি অনুপকে বললাম ভালো করে রেইনীর তেল মেখেনে । )
শিশির ঃ আরে তার আর দরকার হবে না ।
(কি আর দু-জনই নদীর ধারে গেলাম। নদীর কালো পানি দেখে ভয়ে আর নামতে চাইনা শিশির।)
অনুপ ঃ পানি দেখে এতো ভয় তো মাছ ধরবে কি করে?
শিশির ঃ ভয় ! কে বললো আমি ভয় পেয়েছি। তো নাম দেখি ।
অনুপ ঃ তুই আগে নাম ।
শিশির ঃ না অনুপ তুই তো জানিস আমি সাঁতার জানিনা।
অনুপ ঃ সাঁতার জানিস না এই জন্যই তো কণার প্রেমে সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিস। (কথাটি অনুপ হেসে বলল)
শিশির ঃ তুই একটা রাবিস। এই সময় কেউ এই কথা মনে করে দেয়।
অনুপ ঃ তো ঠিক আছে। মাছ ধরতে যাবি।
শিশির ঃ তুই একটা কাজ কর অনুপ তোর তো নদীতে নামার অভ্যাস আছে, তুই একাই নাম
আর আমি বরং উপর থেকে মাছ কুড়ায়।
অনুপ ঃ তা হলে তুই নামবি না ?
শিশির ঃ নামবো কি করে নদীতে যা শ্যাওলা দেখে মনে হয় আস্তো কুমির লুকিয়ে আছে।
(কি আর করার পিছন থেকে মারলাম এক ধাক্কা সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে পড়ে গেলো কালো পানিতে শিশির। সে কি এক কান্ড ঘটে গেলো। সে কথা মনে হলে এখনো আমার হাসি পায়। নদীতে তেমন পানি ছিলোনা যে, পানিতে একজন মানুষ ডুবে যাবে। কিন্তু শিশিরের আর্তনাদ শুনে মনে হলো নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রান পণ লড়ে যাচ্ছে। আমি ভিষণ ভয় পেয়েছিলাম। শিশিরকে যখন উপরে তুলে আনলাম আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কাঁন্না। এমন অনেক ঘটে যাওয়া ছোট খাটো স্মুতি মনের মধ্যে ভিড় জমাচ্ছে।)
ফ্লাশব্যাক
(পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে যে, কণা আর শিলা দাঁড়িয়ে আছে পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের রক্তিম ছটা কিছুটা এসে লেগেছে দূরের বটো বৃক্ষের সু-উচ্চ শিরে। সূর্য কিরণ ধরণীতে আর এসে পড়ছে না। ছায়া ঘেরা এমনো মূহুর্তে কণার মলিন মুখ দেখে মনে হলো বিষন্নতার এক কালো ধোঁয়া তার সমস্ত হাসি কেড়ে নিয়েছে।)
অনুপ ঃ কি ব্যাপার কণা তোমাকে এমন দেখাচ্ছে যে ?
কণা ঃ ও কিছু না। এমনিতেই মনটা খুব একটা ভালো নেই। শিশির ভাইয়ার খোঁজে
এসেছিলাম। শিশির ভাইয়ার কোথায় আছে।
অনুপ ঃ শিশিরের শরীরের অবস্থা তেমন ভালো না। তাই শিশিরের বাবা-মা শিশিরকে সাথে করে
ইন্ডিয়াই নিয়ে গেছে।
কণা ঃ কেন ?
অনুপ ঃ শিশিরের শরীরের অবস্থা খুব খারাপ তার মাথার মধ্যে মাঝে মাঝে কেমন যেন করে ।
অতিরিক্ত চিন্তা করার জন্য তার শরীরের অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়ে পড়েছে। তাই তার
বাবা-মা শিশিরকে ইন্ডিয়াই ভালো ডাক্তার দেখাবে বলে নিয়ে গেছে।
(অনুপের কথা শুনে কণা নিজেকে খুব ছোট ভাবলো কারণ শিশির তাকে নিয়ে খুব চিন্তা করতো তার জন্য হয়তো শিশিরের এই অবস্থা।)
শিলা ঃ অনুপ ভাই আমরা তাহলে আজ আশি। শিশির ভাইয়া এলে আমাদের একটু দয়া করে
জানাবেন। কেমন।
দৃশ্য ঃ ২৮/আঠাশ
(এ দিকে ডাক্তার শিশিরের সব রকমের পরীক্ষা নিরিক্ষা করে দেখে একটা ব্যবস্থাপত্র হাতে দিয়ে)
ডাক্তার ঃ এই নিন ঔষধ গুলো কিনে ঠিক মত খাওয়াতে থাকেন।
শিশিরের মা ঃ ভালো হবে তো ডাক্তার সাহেব।
ডাক্তার ঃ দেখা যাক ভগবান কি করে। পনের দিন পর আবার আসবেন। আমরা তখন রির্পোট
গুলো ভালো করে দেখে আপনাদের জানাবো।
শিশিরের বাবা ঃ ঠিক আছে ডাক্তার সাহেব। এখন আমরা আশি ।
ডাক্তার ঃ ঠিক আছে আসেন। ভগবান আপনাদের ভালো করুক।
(শিশির ও শিশিরের বাবা মা সহ সকলে মিলে ঢাকায় ফিরলেন। শিশিরের ফিরে আসার কথা শুনে অনুপ শিশিরের সাথে দেখা করতে এলো। শিশির বিছানায় শুয়ে অনেক বার চেষ্টা করলো একটু ঘুমানোর জন্য কিন্তু তন্দ্রাদেবী তার সাথে এতো বেঈমানী করছে যে, এহুনে শিশিরের সিক্ত চোখে দেখে তন্দ্রাদেবীর এতো টুকু কৃপা হয়ে তার চোখ দু-টোকে এক জায়গায় করতে দিলো না। কেন এই ব্যস্ততা ? কোন এক অজানা পরা শক্তি যেন সব সময় তাড়া করে চলেছে। আমি দৌড়াচ্ছি প্রচন্ড গতিতে, আর মনে মনে খুঁজছি ক্লান্ত দুর করার জন্য এতো টুকু স্থান।)
শিশির ঃ পথ চলেছি মৃত্যুর মুখে, পুলসিরাতের নদী বেয়ে তীক্ষ্ণ সেতুর উপর দিয়ে, সামান্য
অসাবধানতার কারণে জ্বলে পুড়ে ছায় হবে। আমার এই অসার দেহ নরকের তপ্ত অনলে।
(স্বগত)
(এমন সময় অনুপের প্রবেশ। শিশির টের ও পায়নী অনুপ এসেছে। )
অনুপ ঃ কিরে শিশির এতো দিন তো জানতাম কণার জন্য শরৎ বাবুর দেবদাস সেজেছিস,
এদানে যে কবি হয়েছিস তাতো জানতাম না।
শিশির ঃ নারে বন্ধু এটা কবিতা নয় ঝড়ের পূর্বাভাস ।
অনুপ ঃ ঝড়ের পূর্বাভাস কি বলছিস শিশির ।
শিশির ঃ প্রচন্ড ঝড়ের পূর্বে অস্থীর পাখি গুলো যেমন ব্যাকুল হয়ে যায় নীড়ে ফিরে যাবার জন্য।
তখন তারা বুঝতে পারে না তাদের আশ্রিত নীড়টি এতোয় অগুছালো যে সামান্য
আঘাতে তছনছ হয়ে যাবে তাদের কাক্ষিত নীড়। আর এর পর যদি প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হয়
তাহলে কি হবে বলতো অনুপ।
অনুপ ঃ কি আর হবে বৃষ্টিতে ভিজে তাদের ডানা যুগোল সিক্ত হয়ে যাবে আর তারপর বৃষ্টিও
থেমে যাবে। খন্ডিতো মেঘের আড়াল থেকে সূর্য্য কিরণ এসে তাদের গায়ে লাগবে আর
মুক্তার দানার মতো ঝরে পড়বে তাদের ডানায় জমে থাকা বারী বিন্দু গুলো। আর তারা
যখন ডানা নাড়া দেবে তখন তাদের সৌন্দয্য পূর্বের চেয়ে দিগুন বেড়ে যাবে।
শিশির ঃ তোর এ ধারনা ভুল অনুপ। ঝড়ের মধ্যে তাদের হারানো নীড় আর ঞ্চাতি জনদের কি
ফিরে পাবে।
অনুপ ঃ শিশির, এটায় তো প্রকৃতির নিয়ম- কিছু পাবে কিছু হারাবে। সে যায় হোক তোর শরীরের
অবস্থা কেমন।
শিশির ঃ সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে ডাক্তার আবার পনেরো দিন পর যাবার কথা বলেছে তখন
নাকি রির্পোট দেবে।
অনুপ ঃ একটা কথা বলি ?
শিশির ঃ কি কথা ?
অনুপ ঃ না মানে কণা তোর সাথে দেখা করার জন্য খুব ব্যস্ত। আমার সাথে কণার দেখা হলেই
শুধু তোর কথা জিঞ্চাসা করে ।
শিশির ঃ কি সব ফাজলামি কথা বলছিস অনুপ ।
অনুপ ঃ আমি সত্যি কথা বলছি শিশির । আচ্ছা শিশির, কণা যদি আমার সাথে তোর এখানে
আসতে চাই তাহলে কি আমি কণাকে এখানে নিয়ে আসবো?
শিশির ঃ কেন ? কণা কি এখানে আসতে চাই ?
অনুপ ঃ না মানে আমাকে কয় একদিন আগে কণা বলেছিল শিশির এলে আমাকে শিশিরের
বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য।
শিশির ঃ না অনুপ ওকে আনতে হবে না। যে কণাকে আমি আমার হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে
চেয়েছি। সে কণা আমাকে নানান রকম অপমান করেছে। আমি চাইনা আমার জীবনে
আর কোন মেয়ে এসে আমার ঘুমন্ত মনটা কে জাগিয়ে উঠাক ।
অনুপ ঃ দেখ শিশির কণা আজ তার ভূল বুঝতে পেরেছে। সে তোর কাছে ক্ষমা চাই। তুই কণাকে
ক্ষমা করে তোর হৃদয় সঙ্গীনী করে নে। শিশির যে ভূল বুঝতে পেরেছে আমার মনে হয়
তাকে ক্ষমা করে গ্রহন করা উচিত। তুই এখন ভেবে দেখ শিশির, কি করবি। তোর যদি
ভালো লাগে তাহলে কণাকে তোর বুকে স্থান দে আমার আর কিছু বলার নাই ।
(কথা শেষ হতেই অনুপ চলে গেল। শিশির একা একা বসে ভাবতে লাগলো। কি বললো অনুপ, কণা আমাকে ভালো বাসতে চাই। কণা আমাদের এখানে আসতে চাই। অনুপ বলে কি কণাকে আমাদের এখানে আসতে বলবো ? শিশির এমন নানান চিন্তা করতে লাগলো )
দৃশ্য ঃ ২৯/উনোত্রিশ
(শিশির বিকালে হাঁটতে হাঁটতে অনুপের বাড়ির দিকে গেল। )
শিশির ঃ অনুপ, কণা যদি আবার তোকে বলে যে, আমার এখানে সে আসবে। তাহলে তুই আমার
এখানে নিয়ে আসবি। তবে কণার পরিচয় কিন্তু তোর খালাতো বোন বলে আমার মার
কাছে উল্লেখ করবি।
অনুপ ঃ ঠিক আছে। আমি কালকে কণাকে তোদের
বাড়িতে নিয়ে আসছি।
শিশির ঃ ঠিক আছে। আমি তাহলে এখন যায়।
(পরের দিন। অনুপের সাথে দেখা কণার । কণা শিশিরের কথা জানতে চাইল।)
কণা ঃ শিশিরের কোন খবর পেলেন।
অনুপ ঃ হ্য পেয়েছি। ও ইন্ডিয়া থেকে ফিরে এসেছে।
কণা ঃ আমি শিশিরের সাথে দেখা করতে চাই।
অনুপ ঃ ঠিক আছে । তুমি বিকেলে আমার সাথে শিশিরের বাড়িতে যাবে। তবে সেখানে গিয়ে
আমি তোমাকে আমার খালাতো বোনের পরিচয় দেব।
কণা ঃ ঠিক আছে অনুপ ভাই বিকেলে আমি আর শিলা আসবো ।
(বিকেলে অনুপ কণা আর শিলা ওরা তিন জন শিশিরের বাড়ির দিকে রওনা দিলো। তারা শিশিরের বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে শিশিরের রুমে গেল। শিশির বিছানায় শুয়ে শুয়ে মান্নাদের একটা গান শুনছে- জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই।) এমন সময় অনুপ কণা আর শিলা শিশিরের রুমে প্রবেশ করলো। শিশির দেখে তাড়া তাড়ি উঠে বসলো এবং তাদের ও বসতে বললো। তারা বসে গল্প করছে এর মধ্যে কাজের বুয়া নাস্তা দিয়ে গেল।)
কণা ঃ ডাক্তার আপনাকে কি বলেছে।
শিশির ঃ তেমন কিছু না ।
(তারা বসে আলাপ করছে এর মধ্যে শিশিরের মা রুমে প্রবেশ করলো। সবাই উঠে শিশিরের মাকে সালাম জানালো। শিশিরের মা অল্প কিছু ক্ষন একে অপরের কুশল বিনিময় করে সকলকে বসতে বলে চলে গেলেন। কণা শিশিরের সাথে মন খুলে গল্প করার চেষ্টা করছে। তবে তেমন কোন সুযোগ পেলো না। এ দিকে সূর্য্যটা আস্তে আস্তে পশ্চিম আকাশে ঢুলে পড়ে ধরনীর বুকে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগলো। অনুপ-কণা আর শিলা তারা তিন জন চলে যাওয়ার জন্য উঠলো। তবে কণার , শিশিরের সাথে তেমন কথা হলো না। কণা হতাশ মন নিয়ে চলে আসলো। কণা বাড়ি ফিরে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলো না । শিশিরকে এতো কাছে পেয়েও তার মনের কথা গুলো খুলে বলতে পারলো না। কণা মনের সাথে বুঝা পড়া করে শিশিরের কাছে চিঠি লিখব বলে মনে স্থির করলো। তবে কি লিখবে সে ? কি বলে আজ সম্বোধন জানাবে শিশিরকে। এমন ও হাজার প্রশ্ন এসে তার মনের মধ্যে এসে নাড়া দিতে লাগলো। কণা মনের সাথে বুঝা পড়া করে লিখতে বসলো।)
প্রিয় শিশির,
প্রথমে তোমাকে আমি এক গুচ্ছো রজনী গন্ধার উষ্ণ মিশ্রিত শুভেচ্ছা ও আমার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা জানিয়ে লিখা শুরু করছি। শিশির আমি তোমাকে কিছুতেই ভুলতে পারছিনা। এখন প্রতি মূহুর্তে তোমার কথা মনে পড়ছে। তুমি আমার জীবনে এমন ভাবে মিশে গেছো যা আজ আমি তোমাকে চিঠির ভাষায় বুঝাতে পারবো না । আমার প্রতি মুহুর্তে তোমাকে এতো বেশি মনে পড়ছে কেন বলতে পারবে শিশির ? এর নাম কি ভালোবাস ! শিশির একটি বার আমাকে বলো ভালোবাসি শুধু তোমাকে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি আমার যদি পাখির মতো ডানা থাকতো তাহলে সত্যিই আমি বার বার তোমাকে দেখে আসতাম। তুমি কখন কি ভাবে কোন মুহুর্তে যে প্রবেশ করেছো আমার হৃদয়ে আমি তা বলতে পারবো না। শিশির আজ আমার, তোমার অধরে বিজয় চুম্বন দিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরতে বড় ইচ্ছে করছে।একটি বার তুমি আমার সাথে দেখা কর। শিশির ভালোবাসার কোন রং নেই, থাকলে হয়তো তোমাকে দেখাতে পারতাম যে, আমি তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি। শিশির তুমি আমাকে গ্রহন কর। আমি তোমার দেওয়া ভালোবাসার যন্ত্রনা আর সহ্য করতে পারছিনা। আর বেশি কিছু লিখে তোমাকে বিরক্ত করলাম না।
খোদা হাফেজ
ইতি
তোমার প্রত্যাশাই কণা।
দৃশ্য ঃ ৩০/ত্রিশ
(কণা চিঠিটি অনুপের মাধ্যমে শিশিরের কাছে পৌছে দিল। শিশির চিঠিটি পড়ছে এমন সময় শিশিরের মা রুমে প্রবেশ করলো। শিশির মাকে দেখে তাড়া তাড়ি চিঠিটা লুকালো।)
শিশির ঃ মা তুমি, কিছু বলবে ।
শিশিরের মা ঃ ইন্ডিয়া থেকে চিঠি এসেছে। আমাদের আগামী কাল যেতে হবে। তুই রেডি থাকিস ।
(শিশিরের মা কথাটি বলেই রুম থেকে চলে গেলো।)
দৃশ্য ঃ ৩১/ একত্রিশ
(শিশিরের বাবা-মা শিশির সহ ইন্ডিয়ার পথে যাত্রা করলো। ইন্ডিয়াই পৌছে শিশিরের বাবা-মা ও শিশির সহ ডাক্তারের কাছে গেলো)
ডাক্তার ঃ কেমন আছেন সব।
শিশিরের বাবা ঃ জ্যি ভাল আপনি কেমন আছেন?
ডাক্তার ঃ ভাল । শিশির তোমার শরীরের কি অবস্থা ।
শিশির ঃ জ্যি ডাক্তার সাহেব আগের চেয়ে একটু ভাল।
(ডাক্তার শিশিরকে এবার ভালো করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে লাগলো। দেখা শেষে ডাক্তার জানালো আপনারা আগামী কালকে আসবেন তখন আমরা সব রির্পোট গুলো দেবো। শিশিরের বাবা-মার তো চিন্তা আরো বেড়ে গেলো। কি হয়েছে শিশিরের, ডাক্তার আজ কেন তার রির্পোট গুলো দিলো না। এমন হতাশা মন নিয়ে তারা হোটেলে ফিরলো। রাত্রে শিশিরের বাবা-মার চিন্তায় ঘুম আসলো না । পরের দিন তারা সবাই এলো ডাক্তারের কাছে। এসে তারা জানতে চাইলো কি হয়েছে শিশিরের। ডাক্তার শিশিরের বাবা কে নিরালয়ে এক রুমে নিয়ে গেলো।)
ডাক্তার ঃ শুনুন বাস্তব যত বড়ই কঠিন হোক, আর তাতে যত বড়ই আঘাত আসুক না কেন তা
আমাদের সবাই কে মেনে নিতে হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।
শিশিরের বাবা ঃ আমার ছেলের কি হয়েছে বলবেন তো ।
ডাক্তার ঃ শুনুন আপনাকে শক্ত হতে হবে। আপনার ছেলের এমন এক অসুখ হয়েছে তাকে আর
কোন ডাক্তার চিকিৎসা করে ভালো করে তুলতে পারবে না। আপনার ছেলেকে এখন
ভালো করার মালিক এক মাত্র উপর ভগবানের। আপনার ছেলে এই পৃথিবীর আর কয়
এক দিনের অতিথী মাত্র । তার যে অসুখ হয়েছে তাতে আর বেশি দিন বাঁচবে না ।
(কথাটা শুনার পর শিশিরের বাবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। শিশিরের বাবা কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়লো সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। কি বলে শান্তনা দেবে ডাক্তার সে ভাষাও খুঁজে পেলো না)
ডাক্তার ঃ দেখুন এভাবে ভেঙ্গে পরলে তো আর হবে না । ভগবানের উপর ভরসা রাখুন।
(শিশিরের বাবা-মা সহ শিশির ইন্ডিয়া থেকে ফিরে আসলো।)
শিশিরের মা ঃ শিশিরের বাবা বললে না তো ডাক্তার কি বলল। শিশিরের কি হয়েছে?
(শিশিরের বাবা বলতে পারছে না। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার পরও শিশিরের খবরটা শিশিরের মাকে দিলো। ঠিক সেই সময় শিশির খবরটা আড়াল থেকে শুনে ফেললো। শিশির আর নিজেকে স্থীর রাখতে পারছে না। সে আর এই পৃথিবীতে অল্প কয়েক দিন বাঁচবে। তার পর এই সুন্দর ধরনীর বুক থেকে চির নিদ্রা নেবে। দূরে চলে যাবে। যেখান থেকে মানুষ আর কখনো ফিরে আসে না । এমন কথা ভাবতে ভাবতে শিশিরের চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।)
দৃশ্য ঃ ৩২/ বত্রিশ
(শিশির আজ কলেজে এসে নীরব খুব একটা কথা বলছে না। অনুপের সাথে দেখা হতেই।)
অনুপ ঃ কেমন আছিস ডাক্তার কি বলেছে।
শিশির ঃ ও কথা বাদ দে তো অনুপ ।
অনুপ ঃ কেন ?
শিশির ঃ না ও কথা শুনলে শুধু দুঃখই পাবি।
অনুপ ঃ না তোকে বলতেই হবে।
শিশির ঃ শোন তাহলে- আমি আর এই সুন্দর পৃথিবীতে কয়েক দিন মাত্র বাঁচবো । তার পর
তোদের ছেড়ে অনেক-অনেক দূরে চলে যাবো। যেখান থেকে মানুষ আর কখনও ফিরে
আসে না। আমি আর তোদের কে জ্বালাতোন করতে আসবো না। বিধাতা আমাকে
তোদের কাছ থেকে চির মুক্তি দেবে।
অনুপ ঃ একি বলছিস শিশিরি! সত্যি করে বল শিশির ডাক্তার কি বলেছে?
শিশির ঃ আর কিছু দিন পর তোরা সব বুঝতে পারবি অনুপ আমার কি হয়েছে।
অনুপ ঃ এই শিশির বাজে চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে। শিশির চল একটু লাইব্রেরীতে
যাই।
শিশির ঃ নারে অনুপ আমার কিছু ভালো লাগছে না। তুই একাই যা আমি বাড়ি গেলাম।
(শিশির বাড়ি চলে গেল। অনুপ লাইব্রেরীতে চলে আসলো। লাইব্রেরী থেকে অনুপ বের হয়ে আসছে এমন সময় কণার সাথে দেখা হলো। কণা শিশিরের কথা জানতে চাইলো।)
কণা ঃ কেমন আছেন অনুপ ভাই ?
অনুপ ঃ হ্য ভালো । তোমরা ?
শিলা ঃ জ্যি ভালো। শিশির ভাই এসেছে।
অনুপ ঃ এসেছে। আগামী কালকে কলেজে এসো শিশিরের সাথে তোমাদের দেখা হবে।
দৃশ্য ঃ ৩৩/ তেতত্রিশ
(পরের দিন কণা শিলাকে বললো আজ শিশিরের সাথে দেখা করতে যাবো। আজ আর ক্লাশ করবো না চল যায়। কণা আর শিলা শিশিরের সাথে দেখা করার উদ্দেশে পথমে কলেজ প্রাঙ্গনে দাঁড়ানো অনুপের সাথে দেখা করল।)
কণা ঃ কি অনুপ ভাই শিশির কলেজে আসেনি।
অনুপ ঃ না এখনও আসেনি।
কণা ঃ আমার উপর থেকে কি এখনো শিশিরের রাগ কমেনি। সে কি আমাকে ক্ষমা করতে
পারবে না। আমি কি ক্ষমা পাবার যোগ্য নই ?
(অনুপ-কণা, শিলা তিন জনে যখন আলাপ করছিল এমন সময় অনুপ শিশিরকে দেখতে পেলো।)
অনুপ ঃ তোমরা এখানে দাঁড়াও আমি শিশিরকে ডেকে নিয়ে আসি।
(অনুপ শিশিরের কাছে এসে)
অনুপ ঃ শিশির, কণা তোর সাথে দেখা করতে এসেছে। তোর সাথে ওর নাকী কিছু কথা আছে।
চল আমার সাথে আমি কণাকে দাঁড় করে রেখে এসেছি।
(শিলা আর কণা দাঁড়িয়ে আছে। কণা মনে মনে ভাবছে শিশির আসছে কি বলবে। কি বলে সম্বোধন করবে এমন ভাবনাই বিভোর ঠিক সেই সময় শিশির আর অনুপ এসে হাজির)
অনুপ ঃ কণা তুমি আর শিশির গল্প করো। আমি আর শিলা ঐ দিক থেকে বেরিয়ে আসি। কি
বলো শিলা।
শিলা ঃ হ্য কণা তোরা গল্প কর। আমরা ওদিক থেকে ঘুরে আসি।
(অনুপ আর শিলা চলে গেলো। শিশির আর কণা তারা দু-জন দাঁড়িয়ে আছে কেউ কিছু বলছে না। শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে দু-জন দু-জনার দিকে চেয়ে আছে এমন সময় অস্বস্থীর ঘোর কাটতেই)
শিশির ঃ কি বলবে আমায় ?
(শিশিরের উচ্চারিত শব্দগুলো কণার কর্ণগোচর হওয়ার সাথে সাথে কণা স্বাভাবিকতায় ফিরে আসলো।)
কণা ঃ শিশির আমায় কি তুমি ক্ষমা করতে পারবে না। আমি মানছি তোমার কাছে আমি অন্যায়
করেছি আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আর তোমাকে দেওয়া সেই কষ্টই আজ আমাকে
পাগলা হরিণির ন্যায় তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আর তার ফল ভোগ করছি আমি। আমার
মনের সাথে বোঝা পড়া করে আমি হেরে গেলাম।
শিশির ঃ এ তুমি কি বলছো কণা । চলার পথে ঘটে যাওয়া প্রতিটি কাহিনীর যদি সুষ্ঠু সমাধান তুমি
দিতে যাও তাহলে ঝরে পড়া দুর্বাঘাসের শিশির বিন্দু গুলো কেন ঝরে পড়ে এর উত্তর কি
তুমি দিতে পারবে ? ঘটে যাওয়া এমন একটা তুচ্ছো হৃদয় বিদারক দুর্বাঘাসের বুকের
কষ্টগুলো নিয়ে তুমি যদি ভাব তাহলে শত বছর বেঁচে থাকলেও দুর্বাঘাসের কষ্ট তুমি
খন্ডাতে পারবে না। তোমার ভাবনা ও শেষ হবে না।
কণা ঃ তোমার ধারনা ভুল শিশির। তোমার ধার না ভুল। সমূদ্রের দুঃসাহসিক নাবিকরা পৃথিবীর
ব্যপকতা নিয়ে মাতা মাতি করে কিন্তু তাদের যাত্রা শেষ হয় না। অপর দিকে চন্ডীদাস
রজকিনীর জন্য শুকনো পুকুরে বার বছর ছিপ ফেলে অপেক্ষায় বসে ছিলো কিন্তু তার
অপেক্ষার শেষ হয়নি। আমি জানি তুমি আমার কাছে ততোটা দুরের নও যে, তোমাকে
পাওয়ার জন্য আমাকে ততোটা বেশি পথ অতিক্রম করতে হবে।
শিশির ঃ হাসালে কণা, হাসালে। ধান ক্ষেতের এক প্রান্তে দাঁড়ালে মনে হয় অপর প্রান্তে দুরের
আকাশটি মাটি ছুয়েছে কিন্তু মাটি আর আকাশের দুরুত্ব অনেক। যাদের মিলন শুধু
কল্পনায় ঘটে। তেমনি তোমাকে আমি দেখে ছিলাম জীবনের প্রথম বেলায় তখন
তোমাকে পাওয়া যতটা সহজ ছিলো এখন ততোটা সহজ নয়। আমার প্রথম বেলায়
তোমাকে পাওয়ার প্রবল ইচ্ছাটি আমার মনে যেমন বাসা বেঁধে ছিলো। অনুরুপ ভাবে
তোমার মনের কোন এক কোনে শষ্যের দানার মত আমার জন্য যদি ভালোবাসার জন্ম
নিতো তাহলে আমাদের মিলন হয় তো সম্ভব হতো। আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে।
কণা ঃ আমি শিকার করছি। তখন আমি ভুল করেছি।
শিশির ঃ একি বলছো কণা, কোনটা ভুল কোনটা ঠিক সেটা আমারও জানা ছিলো না আজ সবই
নিয়তি ।
(ভাবনার অন্তরালে শিশিরের চোখ থেকে নিজের অজান্তে দু-ফোটা অশ্রু এই ধরনীর বুকে গড়িয়ে পড়লো।)
কণা ঃ একি তোমার চোখে অশ্রু।
(শিশির চোখ মুছতে মুছতে)
শিশির ঃ তুমি ভুল দেখেছো কণা। সবার মিলন বেলা আসে অসীম আনন্দ নিয়ে কিন্তু তা শেষ হয়
ক্লান্তির মধ্য দিয়ে। আজ আমাদের মিলন বেলা না হয় দু-ফোটা অশ্রু দিয়ে শেষ হলো।
বাঁকি কটা দিন এভাবে কেটে যাবে।
কণা ঃ কিন্তু আমি ?
শিশির ঃ বিধাতা যদি ইচ্ছে করে কোন এক বেশে হয়তো আমি আসবো। কোন এক জ্যোস্না স্নাত
রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে। মানুষ রুপী জন্তু গুলো দিনের কর্ম শেষে অতি ক্লান্ত
নিয়ে নিদ্রা দেবির বকে মাথা রেখে সুখের নিদ্রা যাপন করবে। রাতের প্রহরীগুলো ও
ঘুমিয়ে পড়বে। শুধু দুর থেকে ভেসে আসবে একটি ক্ষুধার্ত কুকুরের আর্তনাদ এক সময়
সেও ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। এমন এক অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় তুমি যখন শুনতে পাবে গাছ
থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতার মরমর ধ্বনি তখন মনে করবে সে টায় আমি ।
কণা ঃ জান শিশির আমি এখন প্রতি মুহুর্তে, প্রতি ক্ষনে তোমাকে উপলব্ধি করি। তোমার
ভাবনা আমাকে অস্থির করে নিয়ে বেড়ায়। আমার মনে হয় শুধু তোমার কাছে থাকি।
তোমাকে আমি প্রান উজাড় করে ভালোবেসে ফেলেছি। শিশির তুমি শুধু একবার বলো
ভালোবাসি।
শিশির ঃ দেখ অতীতের কথা স্মরণ করে দিয়ে তোমার কষ্ট পুনরায় জাগিয়ে দেয়ার ইচ্ছা আমার
নেই । তবুও আমি আমার জীবনে ঘটে যাওয়া চরম বাস্তবকে অ-স্বীকার করতে পারি না।
জীবনের প্রথম বেলায় আমার প্রেমের ভুবনে তোমাকে প্রেরন করে ছিলাম জীবন্ত
ভালোবাসার উষ্ণ আবেদন। নিয়তির কি পরিহাস। ক্লান্ত রবি যখন ধরনীর বুক তপ্ত করে
ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরছে, তখন তুমি পিছু ডাকছো। এখন আর সময় নেই। কণা আজ আমি
নিঃস্ব তোমাকে দেবার কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই আমার। কণা আমি আমার সমস্ত
ভালোবাসা দিয়ে তোমার ঘুমন্ত মনটাকে জাগাতে চেয়ে ছিলাম। কিন্তু তুমি আমার সেই
ডাককে একটা পাগলের প্রলাপ বলে উপেক্ষা করে তোমার ঠোঁটে ফুটে উঠে ছিলো
কৌতুহলের হাসি। কণা আমার মনের মধ্যে একটা সুন্দর সিংহাসন ছিলো সেখানে আমি
তোমাকে বসিয়ে কত নানান রঙ্গের স্বপ্ন দেখতাম। তোমাকে আমি লাল বেনারসী শাড়ি
পরিয়ে হাতে লাল মেহদী দিয়ে আমার মনের সিংহাসনে আপন মনে তোমাকে সাজাতাম
কিন্তু হঠাৎ আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো। স্বপ্ন আজ শুধু স্বপ্ন হয়ে রয়ে গেলো। কণা আমার
জীবন আকাশের সূর্য্যের আলোটা যখন নিভে যাচ্ছে তখন তুমি আমার জীবনে আসছো।
কণা এলেই যদি, কেন শেষ বেলাতে ? কণা আমার জীবন আকাশের সূর্য্যটা এখন
আর প্রচন্ড কিরণ দিতে পারবে না। আমি তোমাকে ভালো বাসতাম এখনো বাসি কিন্তু
আজ আমি তোমাকে গ্রহন করতে পারছি না। আজ আমি এই ধরনীর কোন কিছুকে
ভালো বেসে আপন করতে চাইনা তবে মনে রেখো আমি যত দিন বাচঁবো ততো দিন
তোমাকে ভালোবাসবো। কণা আমার মত হতভাগাকে ভালোবাসলে তুমি শুধু দুঃখই
পাবে । তুমি আর আমার সাথে দেখা করতে এসো না । আমাকে তুমি ভুলে যাও ।
(কথা শেষ হতেই শিশির চলে গেলো। শিলা আর অনুপ এসে শিশিরের কথা জানতে চাইলো।)
অনুপ ঃ কিরে কণা, শিশির ভাইয়া কই ?
কণা ঃ চলে গেছে।
অনুপ ঃ আমিও তাহলে আশি ।
( কণা মাথা নেড়ে সম্মতি গাপন করলো।)
শিলা ঃ শিশিরের সাথে তোর কি কথা হলো। তোর উপর কি ওনার রাগ কমেছে।
কণা ঃ আমি কিছু বুঝতে পারছিনা। শিশির আমাকে গ্রহন করতে চাচ্ছে না।
শিলা ঃ কিন্তু কেন ?
কণা ঃ সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না। আচ্ছা শিলা শিশির কি আমার উপর অভিমান
করে আমাকে কষ্ট দিতে চায়।
শিলা ঃ তা হবে কেন ?
কণা ঃ যদি তাই বা না হবে। তবে কেন ও আমাকে ভুলে যেতে বলছে। তাকে আমি ভাল বাসলে নাকি শুধু দুঃখই পাবো।
(এমন আলাপ করতে করতে দুজন বাড়ির দিকে রওনা দিলো।)
দৃশ্য ঃ ৩৪/ চৌত্রিশ
( প্রতি দিনের চেয়ে শিশিরের শরীরের অবস্থা আজ একটু বেশি খারাপ। শিশিরের মা দুপুরে শিশিরের জন্য খাবার নিয়ে আসলো। শিশির মাকে ডেকে বলল।)
শিশির ঃ মা তুমি আমার শিয়রে বসো।
(শিশিরের মা কাঁন্না জড়িতো কন্ঠে বললো)
শিশিরের মা ঃ বাবা তোর কেমন লাগছে?
শিশির ঃ মা তোমার মনে পড়ে আমি একদিন রেখাকে মেরেছিলাম তখন আমি খুব ছোট। রেখার
মা যখন তোমার কাছে নালিশ করেছিলো তখন তুমি আমাকে প্রচন্ড মেরে ছিলে। আমি
তোমার উপর অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে ছিলাম। তখন আমি ভেবে ছিলাম
আমি আর বাড়ি ফিরে আসবো না। দু-দিন না যেতেই শুধু তোমার কথা আমার বড় মার
কথা মনে হতো। তোমাকে দেখার জন্য আমার মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠলো। বাড়িতে যখন
ফিরলাম তখন তোমাকে জড়িয়ে ধরে কি যে কাঁন্না।
শিশিরের মা ঃ চুপ কর শিশির চুপ কর ।
(শিশিরের মা আর চোখে পানি ধরে রাখতে পারলো না।)
শিশির ঃ মা তুমি আমাকে একটু আদর করো না, সেই দিনের সে আদর, আজ ও আমাকে একটু
করো না মা । প্রতি দিন রাতে তোমার কোলে শুয়ে ঘুম পাড়ানোর গল্প শুনতাম। মা তুমি
আজ আমাকে একটা গল্প শুনাবে সেই গল্পটা। যেটা আমাকে প্রতি দিন রাতে শুনাতে।
একি তুমি কাঁদছো কেন ? দেখো মা আমি আবার ভালো হয়ে যাবো। আমি সেই দিনের
সেই ছো- শিশির হয়ে যাবো। মা বাবাকে ডাকো না। বাবা শুধু বলতেন আমি নাকি বড়
হয়ে পাইলট হবো। বাবার অনেক স্বপ্ন ছিলো আমি প্লেন চালাবো পাখির মতো আকাশে
উড়বো।
( শিশির মায়ের সাথে কথা বলছে এমন সময় ভারাকান্ত মন নিয়ে শিশিরের বাবা ধীরে ধীরে রুমে প্রবেশ করলো। বাবাকে দেখে শিশির উঠে বসার চেষ্টা করলো কিন্তু মা তার বুকে হাত দিয়ে বাঁধা দিলো।)
শিশির ঃ আমাকে তুমি বাঁধা দিওনা । মনে আছে মা ভোর হলে আমি আর বাবা কান পেতে
তোমার কোরআন তেলাওয়াত শুনতাম। তুমি মধুর সুরে কোরআন শরীফ তেলাওআত
করতে। ইদানিং দেখছি তুমি তাও বাদ দিয়েছো। মা আমার একটা কথা রাখবে। আমি
যখন মরে যাবো তখন তুমি আমার পাশে বসে সেই সুরে কোরআন তেলাওআত করবে।
( ছেলে এই কথা শুনার পর শিশিরের বাবা-মা কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়লো।)
শিশিরের বাবা ঃ ও কথা বলিস না বাবা। তুই মরে গেলে আমরা কাকে নিয়ে থাকবো। এতো বিষয় আসয়
কার জন্য করেছি।
(শিশিরের বাবা কথা গুলো বলার পর আর কাঁন্না সংবরন করতে পারলো না। এমন সময় অনুপ শিশিরের রুমে প্রবেশ করলো। অনুপ শিশিরের বাবা-মাকে দেখে বললো।)
অনুপ ঃ আপনারা কাঁদছেন কেন?
(অনুপের কন্ঠস্বর শুনে শিশির অনুপকে ডাকলো)
শিশির ঃ কে অনুপ ?
অনুপ ঃ হ্য রে ।
শিশির ঃ আয় এদিকে। তোর সাথে আমার অনেক কথা আছে। তুই আমাকে খুব ভালোবাসিস
তাই না ।
অনুপ ঃ তুই ওভাবে কথা বলছিস কেন ?
শিশির ঃ তোর মনে আছে অনুপ। তুই আর আমি মাছ ধরতে গিয়ে ছিলাম। তুই আমাকে ধাক্কা
মেরে ফেলে দিয়েছিলি। সেই দিনের সে কথা আমার খুব মনে পড়ে। চলনা আর একবার
যায় ।
অনুপ ঃ নিয়ে যাবো, তুই সেরে ওঠ ।
শিশির ঃ অনুপ আমি তোকে একটা কাজ দিয়ে যাচ্ছি।
( শিশির তার বালিশের নিচ থেকে একটা ছোট খাম বের করে অনুপের হাতে দিয়ে বললো)
শিশির ঃ তুই এটা ওকে দিস। আর আমার কথা জানতে চাইলে বলবি এই চিঠিতেই সব লিখা
আছে।
(শিশির এই পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দুরে চলে গেলো। এই পৃথিবীর বিচিত্র মানুষ গুলোর কাছ থেকে চির বিদায় নিয়ে স্রষ্টার ডাকে সাড়া দিয়ে প্রকৃতির নিয়মে চোখ বুঝলো। অনুপ শিশিরের বিয়োগ ব্যাথা সহ্য করতে পারছে না। তার মনের মধ্যে হাজারো স্মৃতি আজ এখন ভীষণ ভাবে যন্ত্রনা দিচ্ছে। অনুপ শিশিরের সমাধীর কাজ শেষে করে। শিশিরের লিখা চিঠিটা কণার কাছে পৌছে দেবার জন্য কণার বাড়ির দিকে যাত্রা করলো। অনুপ কণার কাছে যেয়ে শিশিরের লিখা শেষ চিঠিটা তার হাতে দিয়ে বললো কণা এটা শিশিরের লিখা শেষ চিঠি। চিঠিটা হাতে দিয়ে চলে আসলো। কণা শিশিরের চিঠি খুলে পড়তে লাগলো।)
প্রিয় কণা,
পৃথিবীর সৌন্দর্য্য অনুভুতির সমস্ত দ্বার উম্নোচন করে আমার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা থেকে কুড়িয়ে এনে তোমাকে জানায় একরাশ প্রীতি ও রক্তিম শুভেচ্ছা ।
কণা মানুষের জীবন অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত সে সর্বদাই ছুটে চলে কখনো থেমে থাকে না । এই প্রবাহমান জীবনে মানুষ অনেক সুখ দুঃখ অনুভব করে। মানুষ জীবনে দেখে অনেক রঙ্গিন স্বপ্ন যেমন আমি দেখে ছিলাম তোমাকে নিয়ে। যখন এ রঙ্গিন স্বপ্ন বাস্তবে রুপ নেয়, তখন মানুষ খুব আনন্দ অনুভব করে। আর যখন স্বপ্ন-স্বপ্ন হয়েই রয়ে যায়, তখন তার মনের অনেক অজানা স্মৃতি এসে নাড়া দিয়ে যায়।
কণা চলার পথে অনেকের সাথে পরিচিত হতে হয়। এই পরিচিত জনের অনেককেই সে আপন করে নেয়। কিন্তু সবার মুখ বা নাম সব সময় স্মৃতিতে ধারণ করা সম্ভব হয় না। যাকে মন প্রান উজাড় করে ভালোবাসা যায় তার ছবিই মনের দুয়ারে বার বার উঁকি মারে। কণা আমি যাকে ভালোবাসা নামক শব্দটি আমার অন্তরে শক্ত আসন করে বসলাম। তাকে নিয়েই সাজিয়ে ছিলাম আমার জীবনের প্রতিটি ক্ষন, আর আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে যে নামটি বা যার ছবিটা আমার হৃদয় আকাশে উজ্জ্বল তারা হয়ে ছিলো সে হচ্ছে তুমি। আমি মন প্রান উজাড় করে তোমাকে ভালোবেসে ছিলাম । কিন্তু আমার ভালোবাসার মুল্য তুমি কত টুকু দিলে ?
কণা আমি জানি আজ আমার এই চিঠিটা পড়ে তোমার মনের কোন এক কোনে আমার ছবিটা ভেসে উঠবে। কণা আমি তোমাকে যতটুকু ভালোবেসে ছিলাম। আমি জানিনা তোমাকে আমার জীবনের চাইতে আর কেউ এত বেশি ভালোবাসতে পারবে কিনা। কণা আজ আমার অনেক কিছু তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে কিন্তু আমার বলার সে অধিকার আজ আর নেই বিধাতা কেড়ে নিলো। কণা তুমি কেন সে দিন আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে ছিলে ? আজ আবার কেন তোমার জীবনে আমার মত হতভাগাকে স্থান দিয়ে তোমার জীবনটা কে নষ্ট করতে চেয়েছিলে নাকি আমার সাথে ক্ষনিকের জন্য অভিনয় করে পৃথিবীর সমস্ত নারী জাতিকে কলংকিত করতে চেয়েছিলে ? কণা সব সুখ মিলনে হয় না। কিছু সুখ বিরহেতে পাওয়া যায় আবার সব ফুল কখনো ফোটে না কিছু ফুল কোঁড়িতেই ঝরে যায়। আমার জীবনটা ও অকালে ঝরে যাওয়া কোঁড়ির মত ঝরে গেলো। তোমার আমার মিলন আর হলো না। কণা তুমি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো তাহলে আমাকে ভুলে যেও। জীবনটা কে আবার নতুন করে গড়ে তোল। কণা আমার জীবনের শেষ লগ্নে তোমাকে দোয়া করি তুমি যেন সুখি হও। তুমি যখন আমার এই চিঠিটা পড়বে তখন আমি অনেক অনেক দুরে যেখান থেকে মানুষ আর কখনও ফিরে আসেনা । সুন্দর মানুষ সকল প্রেরনার উৎস তাই তোমাকে বলছি নির্জন ছেড়ে লোকালয়ের মধ্যে চলে এসো জীবনটা বুঝতে শিখো । কণা এটাই আমার জীবনের শেষ চিঠি। তোমাকে আমি আর কখনও বিরক্ত করবো না। আমি আর তোমার কলেজের সামনে গিয়ে দাঁড়াবো না আর বেশি কিছু লিখে তোমাকে বিরক্ত করছিনা। কণা আমার জীবনের শেষ বেলাতে তোমার কাছে আমি হাত জোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও । আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি তাই তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে কিনা জানি না। কণা তুমি যদি আমাকে ক্ষমা করতে না পারো তবে যেন অভিশাপ দিও না । পরিশেষে আমার জীবনের সকল সুখ তোমার নামে উৎসর্গ করে তোমার সুখ কামনা করে শেষ করছি।
খোদা হাফেজ
ইতি
শিশির
(কণা শিশিরের লিখা শেষ চিঠিটা পড়ে নীরবে দাঁড়িয়ে তার মনের অজান্তে চোখের জল ফেলছে। কণা শিশিরের লিখা চিঠিটা বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো।
কণা ঃ শিশির আমি তোমাকে ভালো বাসি ।
মন্তব্য (3)