পর্ব তিন

গোয়েন্দা প্রধান আনজুম আসলামের নির্দেশনার আলোকে জারা মেহজাবিন শিমু ও আবরার ফাহিম ঈদের তিন দিন আগে সিলেটে পৌঁছার কথা। স্বপ্নে দেখা সেই দরবেশের অপূর্ণ কথায় একটা অপ্রকাশিত বইয়ের ব্যাপারে বলছিলেন। সেটি সংগ্রহ করা তাদের দায়িত্ব। নির্দিষ্ট দিনে তারা যাত্রা করলেন। সিলেটগামী ট্রেনটি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল। জানালার বাইরে ছুটে চলা সবুজ প্রান্তর, মাঝেমধ্যে ছোট স্টেশন, সবকিছুই যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় ঢেকে ছিল। জারা মেহজাবিন শিমু জানালার পাশে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে ছিল। তার মাথায় ঘুরছিল গোয়েন্দা প্রধানের নির্দেশনার কথা, আর সবচেয়ে বেশি, অপ্রকাশিত সেই রহস্যময় বই। তার পাশেই বসা আবরার ফাহিম মাঝে মাঝে চারপাশ লক্ষ্য করছিল। বয়সে বড় হলেও সে বুঝতে পারছিল, এই মিশনে শিমুর ভূমিকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
“শিমু,” ফাহিম নিচু গলায় বলল, “আমরা জায়গাটা চিনব কীভাবে?”
শিমু চোখ না সরিয়েই বলল, “চিনে নিতে হবে… সরাসরি কিছু পাওয়া যাবে না।”
ফাহিম মৃদু হেসে বলল, “ঠিক আছে, তুমি পথ দেখাও। আমি খেয়াল রাখছি চারপাশ।”
ট্রেনের শব্দের ভেতরেই যেন তাদের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সিলেটে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। শহরের বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, মানুষের কোলাহল, আর কোথাও কোথাও ধূপের হালকা সুবাস, সব মিলিয়ে এক রহস্যময় আবহ। সিলেট শহরে নেমে তারা শাহপরানের দিকে রওনা দিল। সোজা চলে গেল নানার পুরাতন বাস ভবনে। নানা নেই। মামারাও এখন লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছেন। বাড়িতে এখন বাড়াটিয়ারা থাকেন। একটা ফ্ল্যাট খালি আছে, দূর সম্পর্কের একজন আত্মীয় থাকেন। তাকে জানানো হয়েছে আজ ফাহিম ও শিমু এখানে থাকবে। ঈদ করবে এখানে থেকে। তারা পৌঁছা মাত্র দারোয়ান গেইট খোলে দিল। মামার বাড়িতে পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেও শিমুর চোখে ছিল অস্থিরতা। রাতের খাবার শেষে বেলকনিতে বসে আছে তারা দুইজন। শিমু বলল, “বইটা কোথাও প্রকাশিত হয়নি… মানে এটা কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে।”
ফাহিম বলল, “তাহলে আমাদের লোক খুঁজতে হবে।”
শিমু মাথা নাড়িয়ে বলল, “না, সঠিক লোক খুঁজতে হবে… আর আগে তাকে বুঝতে হবে।” কিছুক্ষণ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পর তারা পূর্ণ বিশ্রামের উদ্দেশ্যে স্থানত্যাগ করল।

পরদিন সকাল। তারা বের হলো, কিন্তু সরাসরি কোনো বাড়ি খুঁজতে গেল না। বরং ছোট দোকান, চায়ের স্টল, পুরনো বইয়ের দোকান এসব জায়গায় ঘুরতে লাগল।
ফাহিম খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলছিল,“চাচা, এই এলাকায় কি কোনো পুরনো সম্মানিত পরিবার আছে?”
লোকজন সরাসরি কিছু না বললেও, কয়েকজন একই দিকের ইঙ্গিত দিল, একটা নিরিবিলি গলি, পুরনো বাড়ি, আর একজন অল্পভাষী মানুষ।
বিকেলের দিকে তারা সেই গলির সামনে এসে দাঁড়াল। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা।
ফাহিম নিচু গলায় বলল, “মনে হচ্ছে ঠিক জায়গা।”
শিমু চারপাশে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ… তবে তাড়াহুড়া না।”
তারা কিছুক্ষণ দূর থেকে বাড়িটা লক্ষ্য করল। জানালার পর্দা নড়ছে, মানে কেউ আছে।
অবশেষে ফাহিম দরজার দিকে এগোল, কিন্তু নক করার আগে থেমে গেল।
“তুমি বলবে?”
শিমু শান্তভাবে বলল, “আমি বলি। এই দিকটা আমি সামলাই।”
ফাহিম মাথা নেড়ে পাশে দাঁড়াল।
“ঠিক আছে, আমি খেয়াল রাখছি।”
শিমু দরজায় নক করলো। বেশ কিছু সময় চলে গেল কোন সাড়াশব্দ নেই। তারা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল। এক বৃদ্ধ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, যেন সামনে দাঁড়ানো মানুষকে ভেতর পর্যন্ত দেখে নিতে পারে।
“কি দরকার?” প্রশ্ন করলেন বৃদ্ধ।
শিমু সরাসরি কিছু না বলে নরম গলায় বলল, “চাচা, আমরা এই এলাকার কিছু পুরনো ইতিহাস জানতে চাচ্ছিলাম…”
বৃদ্ধ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন।
ফাহিম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যোগ করল,
“শুনেছি এখানে কিছু সম্মানিত পরিবার আছে… তাই ভাবলাম একটু সাক্ষাৎ করলে হয়তো নতুন অনেক কিছু জানতে পারব তাই আসলাম।”
বৃদ্ধের দৃষ্টি এখনও সন্দেহমিশ্রিত।
শিমু এবার ধীরে বলল, “আমার নানার পরিবারও একসময় এই এলাকার সাথে যুক্ত ছিল…” নাম বলতেই বৃদ্ধের চোখে হালকা পরিবর্তন এলো।
“ভেতরে আসো।” বললেন বৃদ্ধ।
ঘরের ভেতরে ঢুকতেই পুরনো কাগজের গন্ধ। দেয়ালে পুরনো ছবি, তাক ভর্তি ধুলোমাখা বই।
ফাহিম চারপাশে খেয়াল করছিল, তার চোখ এদিক-ওদিক ঘুরছে, যেন প্রতিটা জিনিস মনে রাখছে।
শিমু বৃদ্ধের সাথে সাধারণ কথাবার্তা শুরু করল, পুরনো দিনের মানুষ, দরবেশদের জীবন, তাদের সরলতা।
ধীরে ধীরে পরিবেশটা নরম হয়ে এল।
এক সময় ফাহিম বলল, “চাচা… অনেক সময় কিছু জিনিস প্রকাশ করা হয় না, কিন্তু সেগুলোই আসল ইতিহাস বহন করে… তাই না?”
বৃদ্ধ এবার গভীরভাবে তাকালেন।
শিমু নিচু গলায় বলল, “আর সেগুলো ঠিক মানুষের হাতেই থাকা উচিত…”
কিছুক্ষণ নীরবতা ছেয়ে গেল তিন জনের মাঝে। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বৃদ্ধ বলে উঠলেন, এমনই এক সত্য আমার কাছে আসে কিন্তু আমি সেটা রাখার উপযোগী স্থান পাচ্ছি না। আজ মনে হচ্ছে তোমরা সেই সত্যকে ধারণ করতে পারবে। সেই আমানতের খেয়ানত করবে না। এই বলে বৃদ্ধ ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। আলমারির কাছে গেলেন। চাবি ঘুরালেন। ভেতর থেকে কাপড়ে মোড়ানো একটি পুরনো কাগজের পুটলি বের করলেন। হাতে নিয়ে বললেন “এটা” সেই আমানত। এটা কাউকে কখনও দেখানোর প্রয়োজন বোধ করিনি। আমার মুর্শিদ বলেছিলেন এটা আমানত। উনাকে নাকি উনার মুর্শিদ দিয়েছিলেন। এভাবে যুগ-যুগ ধরে চলে আসছে এটি। আমি আর কয়দিন বাঁচব জানি না। কিন্তু এটাকে হস্তান্তর করার মত মানুষ পাচ্ছি না। আজ তোমাদের পেয়ে মনে হচ্ছে তোমরা এই আমানত রক্ষা করতে পারবে।
ফাহিম শান্ত গলায় বলল, “ইনশাআল্লাহ! আমরা এই আমানত রক্ষা করতে পারব।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বইটি শিমুর হাতে তুলে দিলেন।
“নাও… কিন্তু মনে রেখো—এটা শুধু বই না… এটা দায়িত্ব।”
সালাম বিনিময় করে তারা বেরিয়ে আসলো। বাইরে বেরিয়ে এসে ফাহিম গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
“তুমি দারুণ সামলেছো।” শিমুকে উদ্দেশ্য করে বলল ফাহিম।
শিমু হালকা হাসল, “তুমি না থাকলে হয়তো এত দূর আসাও কঠিন হতো।” বলল শিমু।
ফাহিম বলল, “চলো… এখন আসল কাজ শুরু।”
শিমু বইটা শক্ত করে ধরে সামনে তাকাল। সামনে তখন শুধু রাস্তা না, এক গভীর রহস্য তাদের অপেক্ষা করছে।