১০/২/২০০৩ -_


সবাই আশেপাশে ঘুমিয়ে পড়েছিল। দূরের শিয়ালগুলোও। রাত সাড়ে ৩ টা বাজছিল তখন ঘড়ির কাটায়। শুধু পাশের বাড়ির মাতালটাই জেগে। সে এক রবীন্দ্রসঙ্গীত - প্রিয় মাতাল। রোজ রাতে একটি করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় সে। চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে। রাত্রি হলেই মাদকদ্রব্য গ্রহণের সাথে সাথে তার রবীন্দ্র-প্রীতি উছলিয়ে ওঠে। জাতে সে মাতাল হলেও সুরে-তালে তার বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি হয় না বলেই আমার বিশ্বাস জাগে, আমি বিশ্বিত হই তার গানের গলায়। এদিন গাইছিল,
"সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে।
ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা......।।"

আমার তখন ২৩ বছর বয়স, সদ্য মাষ্টার্স পাশ করেছি, বুনুর বয়স তখন ১৭। পড়াশোনায় অংকে ভীতির দৌলতে বুনু উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে না পারলেও ; সাহিত্য , সঙীত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রসাস্বাদনে রুচিতা ছিল আমার একমাত্র সাথী। মনে পড়ে ছোটোবেলায় কোনো জ্ঞান গর্ভ বিষয় নিয়ে দুজনে পাকা বুড়ির মত আলোচনা করতাম; বড় হয়েই ও আমার কথাগুলির সিংহভাগই কাটত কি দারূন সব যুক্তি দিয়ে। এই মাতালটি তখনও গাইত। একদা সে বামপন্থী ভাবধারায় উদ্বুধ ছিল। তা প্রচুর নেতাদের পিছনে ঘুরেও একরাতে যখন সে বিদেশী মাদক গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হল, সে নিজের আক্রোশ প্রকাশ করতে হাওয়ায় চিল্লিয়ে উঠলো-
"নাল কাস্তের নেতা,
বান্দাকপির পাতা
পাতার ভিতর পাতা
তার ভিতরে পাতা
নেতার ভিতর নেতা
যার কাছেই যাই
আর একজন রে দ্যাখায় দেয়।"

আমরা দু'বোন হাসি থামাতে পারিনি সেদিন, হেসেছিলাম খুব, একসাথে। ঘুমের ঘোরে সে কখনও সখনও একটি পা তুলে দিত গায়ে; মনে আছে আমার।

মনে পড়ে একদিন রসের কুঠিতে সুমন দাসের ছেলে ১৯ বছরের নিপুর জন্মদিন ছিল।নেমন্তন্ন রক্ষা করতে আমাদের দু'বোনকেই জেতে হবে। মনে পড়ে রুচিকা বলেছিল, -"জন্মদিন না। রঙ্গ্ - দিন। বুড়া চ্যাংড়া। ৩ টা করে লুচি আর বুটের ডাল খাওয়াবে। আর গিফ্টের দাম ২৫০ টাকা।" বুকটা কষ্টে মোচড় দিয়ে উঠল। আমার সেই রুচিময়ী বোন রুচিতা, সুমন দাসের সেই ১৯ বছর বয়সের সেই ছেলেটির সাথে একভোরে এককাপড়ে বের হয়ে গেল। ছেলেটির নাম ছিল নিপু। আগের পক্ষের বউ তার গর্ভবতী তখন। বিকেল পর্যন্ত তার কোনো খবর পাইনি আমরা।তারপর আমরা ফেরাতে চাইলেও সে আর ফেরেনি। ১৭ বছর ধরে পাওয়া মা-বাবা ও দিদির কাছ থেকে পাওয়া স্নেহ- ভালোবাসার চেয়ে দেড় মাসের প্রেম তার কাছে বেশি আপন মনে হয়েছিল।



১২/১০/২০০৭-_


এই ক'বছর যাবৎ বোনের কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। আমিও বিবাহিত। বাপের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। নিজের সংসার নিয়ে তাল পাই না। এসে যাবৎ মাকে দেখছি বোনের ছবির দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠতে। দীপ আমার স্বামী বলল পাশে শুয়ে, -

-"তোমার বোন পালিয়েছিল না নিপুর সাথে, ......."

-কথা শেষ করতে না দিয়েই বলি আমি, -"তাতে কার কী? ওর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই আমাদের।"

-"আরে, শোনোই না, নিপুকে নিয়ে কত ঠাট্টা করতাম আমরা। আমরা ওর দুই বিয়েকে বলি 'নিপুর ডুয়্যাল সিম।' তা নিপুর সামনে তোমার বোন সেদিন পেপারওয়ালার সাথে হেসে গল্প করেছে বলে , নিপু ইট দিয়ে মেরে ফেলেছে রুচিকাকে। আবার বলছে তোমার বোনের নাকি নরকবাস হবে।"

দীপ ঘুমিয়ে পড়ে। আমার কাছে স্পষ্ট হয়, মায়ের কান্নার কারণ। বাব নিশ্চয়ই বুনুর শ্রাদ্ধশান্তি ও করবে না। শরীর যেন প্যারালাইসড্ আমার। দীপ বলেছে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে নিপুকে। খুব শিগগিরি শাস্তি হবে তার। বিচারক মন্তব্য করেন আসামী দোষী না নির্দোষ। কঠিন শাস্তি হয় দোষী - র। কিন্তু যে বিশ্বাস করে অন্য একজনের মাথা ইঁট দিয়ে থেথলে দেবার অধিকার তার আছে,(শুধুমাত্র তার বাড়িতে থাকে এবং বিনাপয়সায় খায় তার পয়সায় বলে, যদিও বাড়ির সব ধরনের কাজ সেই অন্য একজনই করে) শাস্তি দিয়ে কী শিক্ষা হবে তার? লোহা আগুনে গলে, পিটিয়ে তাকে নরম করা যায় না।চারিদিক চুপচাপ। আমার চোখে জল। রাত সাড়ে ৩ টা বাজে। শুধু পাশের বাড়ির মাতালটা গান করে ছলে,

-"আগুনের পরশমণি, ছোয়াও প্রাণে।
এ জীবন পুন্য কর, এ জীবন পুন্য কর.........।।"